রবিকাহনঃ প্রেম প্রেম খেলা

সম্পর্কের টানাপোরেন আনেক দিনের, শেষমেশ সম্পর্কটা ভেঙেই গেল। হঠাৎ করেই কাল বৈশাখি যেন সব কিছু ওলঠ পালট করে দিল। সুদীপ্তর জীবনে এটাই ছিল সব চাইতে বেশি হারানোর যন্ত্রণা কারন মনিকাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখে ছিল সে। জীবনের প্রথম ভালো লাগা, প্রথম প্রেম। এভাবে সব কিছু শেষ হয়ে যাবে কোনো দিন কল্পনাও করেনি সুদীপ্ত । শ্রাবনে অঝর ধারাই যেমন বৃষ্টি ঝরে তেমনি প্রতি মাঝ রাতেই বালিশ ভিজে যেত কান্নাই, দুচোখ বাধা মানেনি। মনিকার হঠাৎ করে এই পরিবর্তনের মানে খুজতে গিয়ে বার বার জড়িয়ে পরেছে স্মৃতির অন্তরালে। মনে পরে যায় সেই সব দিন গুলোর কথা, একদিন মনিকা সুদীপ্ত কে না দেখলে থাকতে পারতো না। আজ ভাবলে অবাক লাগে সুদীপ্তর।

এই কি সেই মনিকা যে সুদীপ্তর মুখে একবার “এই শোনোনা” শোনার জন্যে হাপিত্যেশ করে বসে থাকত। হুম, সত্যিই সব কিছুর পরিবর্তন হয় সময়ের সাথে, তাই আজ সব কিছু নকল লাগে, নকল ভালোবাসা, মনে হয় সবি অভিনয়! কাছে আসা, হাজার প্রতিশ্রূতি আর ভালোবাসাটাই। তবু তো চলতে হবেই, জীবন থেমে থাকেনা। সুদীপ্ত ও তাই ব্যাথাকে সঙ্গী করেই আইন পড়া শেষ করে। দেখতে দেখতে অনেক গুলো বৎসর কেটে গেছে, শুনেছে মনিকার বিয়ে হয়ে গেছে এ শহরেরই এক বড় শিল্প পতির সাথে। সেটাও নাকি আবার লভ ম্যারেজ। কিন্ত সুদীপ্ত ভালবাসাকে তার জীবনের অভিষাপ মেনে নিয়ে দ্বিতীয়বার আর কাউকে আনতে চাইনি জীবনে, কিম্বা বলাভাল আনতে পারেনি। অবশ্য মনে মনে অন্য মেয়েদের প্রতি কেমন যেন একটা বিতৃষ্ণা। দেখতে দেখতে আরো তিনটে বৎসর কেটে যায়। আজও স্মৃতির পাতা থেকে ঝরে পড়ে অতীতের টুকরো টুকরো মান, অভিমানে জড়ানো কথা। এখনো মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙে যায়, স্বপ্ন দেখে মনের অজান্তেই চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে।সে রাতে আর ঘুম আসেনা। মোবাইল নেটে আজগুবি সব জিনিস খুজতে থাকে।

সুদীপ্ত বড় আইনজীবি আজ, সুনামও করেছে আনেক। তাই মা লক্ষীর কৃপায় ধন সম্পদ উপচে পরেছে। হাজারো বস্তু সুখের ভীরেও মানসিক সুখ যেন তার কাছে চাতক পাখি, আজও প্রথম প্রেমকে ভুলতে পারেনি সুদীপ্ত ।মাঝে মাঝে ককিয়ে ওঠে মনের অন্তঃকোনে লুকিয়ে থাকা নিষ্পেষিত যন্ত্রণা । তাই কাজের ব্যাস্ততার মধ্যে দিয়ে জোর করে ভুলে থাকার চেষ্টা।

সেদিন যখন সুদীপ্ত তার বৈঠকখানায় বসে মক্কেলদের সাথে কথা বলছিল হঠাৎ চমকে ওঠে একটা চেনা গলার স্বর শুনে। আশতে পারি সুদীপ্ত বাবু? পক্ককেশ যে বৃদ্ধটি দ্বারপ্রান্তে তিনি যে মনিকার বাবা। যিনি এক সময় সুদীপ্ত কে নিজের সন্তানের থেকে কম স্নেহ করতেননা, সুদীপ্তও তাঁকে বাবামশাই বলেই ডাকতো। তাই নামধরে ডাকা মানুষির কন্ঠে বাবু ডাক শুনে সুদীপ্ত একটু চমকেই উঠেছিল। সে উঠে গিয়ে প্রনাম করে, তাঁকে নিয়ে তার অতিথিশালায় গেল। সোফাই বসে মনিকার বাবা অমল বাবু সুদীপ্তর দিকে কাষ্ঠল নজরে চেয়ে থাকে। তাঁর চোখ এড়াইনা সুদীপ্তর পরিপাটি করে সাজানো গোছান ঘরবাড়ি। সুদীপ্তর কথাতেই ধ্যান ভাঙার মতো চমকে ওঠে,
~কেমন আছেন বাবামশাই,
~তোমার কিছুই পাল্টাইনি সুদীপ্ত, তুমি সেই আগের মতই আছো।

সুদীপ্ত এবার তার আবেগ আর ধরে রাখতে পারেনা, হ্যা বাবা মশাই আমি সেই আগেরই সুদীপ্ত। কিন্ত মনের গভীরে একটা বিরাট এক জ্বালাময়ী ক্ষত নিয়ে জীবনের গতিপথটাই পরিবর্তন হয়ে গেছে। মজার ব্যাপার হল সেটা আপাতদৃষ্টিতে দেখা যায় না। অমল বাবু মাথা নিচু করে নিশ্চুপ হয়ে যান।
সুদীপ্তঃ ছারুন সে সব কথা বলুন আজ এতো গুলো বৎসর পর!

চোখের কোনায় তখন জল অমল বাবুর। যান সুদীপ্ত, “জীবন বড় বৈচিত্রময়, কখন আলো আবার কখন আধার,কখন ভালো কখন মন্দ আবার কখন জোয়ার তো কখন আবার ভাটা, আজ আমরা বড় অসহায় সুদীপ্ত । পেনশানের সামান্য টাকায় তোমার মাসিমার শেষ চিকিৎসা করা হয়, তারপরও শেষ রক্ষা হয়নি, তোমার মাসিমা গত হবার পর রোড এক্সিডেন্টে মনিকাও বিধবা হয়। শেষের দিকে ব্যাবসা ভালো যাচ্ছিল না বলে মোটা টাকার লোন নেয় রমেশ। আর ওর এক্সিডেন্টের পর ওর সব সম্পত্তি ব্যাঙ্ক নিলাম কররিয়ে নেয়। মনিকা এখন আমার কাছেই থাকে। সুদীপ্তর মনে হল যেন মথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল, এই পরিস্থিতির জন্য ও মোটেও প্রস্তুত ছিলনা। ঠিক কি উত্তর দেবে, বা কি উত্তর হওয়া উচিৎ সেটা ভুলে খানিক বধির হয়ে থাকল। আনন্দ হচ্ছে না করুনা হচ্ছে না প্রীয়জন বিয়োগের যন্ত্রণা , নাহ সুদীপ্ত কিছুই মনে করতে পারছেনা।

চাকর মন্টুর ডাকে সুদীপ্তর সম্বিৎ ফিরল। কল্পনার জগত থেকীকলহমায় বাস্তবের রুক্ষ জমিতে, সে ভাবল এই মনিকাই একদিন আমাকে অস্বিকার করে চলে গেছিল, কারন সেদিন আমার কাছে আয়েশ করার মত যথেষ্ট ধনসম্পদ ছিলনা, আমার বাগদত্তা দীর্ঘদীন বিয়েটা ঝুলিয়ে রেখেছিল, আমার একটা দীর্ঘস্থায়ী রোজগারের বাহানা দেখিয়ে। শুধু আমার সেদিন দোষ ছিল আমি বেকার, আসহায়, ওর সরকারি চাকুরে বাবার তুলনায় গরিব ছিলাম। সেদিন সকলেই দায় এড়িয়েছিল। বাবামশাইও……

তাই সুদীপ্তও কেমন যন্ত্রের মত বলে ফেলল, এখন আমি কি করতে পারি বাবা মশাই।

~মনিকা ভীষন ভেঙে পরেছে। কারোর সাথে কথা বলেনা, কোথাও বেড়োই ও না। আর তোমার সামনে এসে দাড়াবে তার সাহষ ই বা কোথাই। নিয়তির কাছে সব হরিয়ে ভরসা শুধু আমাদের শেষ সম্বল রমেশের করা ইন্সুরেন্সের এর টাকাটুকু। কিন্তু ইন্সুরেন্স কোম্পানি নানা আজুহাত আর কাগজ পত্র চেয়ে ক্রমাগত হয়রান করাচ্ছে, যদি আমাদের একটু সাহায্য কর, তাহলে চিরজীবন ঋণী হয়ে থাকব।

সুদীপ্ত আমতা আমতা করে শুধাল,
~ সব কগজ পত্র এনেছেন।
~না বাবা সবতো আনা হয়নি, তবে কাল যদি তুমি একবার আমাদের বাড়িতে আসো তাহলে ভালো হয়। এটা আমার অনুরোধ।

সুদীপ্ত আজান্তেই হারিয়ে যায় পুরানো স্মৃতি ধরে, মনে পরে যায়, এমনই রোজ বিকালেই সুদীপ্ত যেত মনিকার সাথে দেখা করতে ওদের বাড়িতে, মনে পরে সেদিন বিকালের কথা আকাশে কালো মেঘে ছেয়ে গেছে বৃষ্টিও হচ্ছে মুশলধারে, সুদীপ্ত ভাবে আজ বিকালে আর যাবেনা আর যাবেই বা কি করে এই বৃষ্টিতে, বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে তবু এ বৃষ্টি যেন কিছুতেই থামবার নয়। তখনি মনিকার ফোন হ্যালো, এই সোনা তুমি আজ এলেনা যে, দেখনা বাবা মা নেই বাড়িতে, বাজার করতে গিয়ে বৃষ্টিতে আটকে পরেছে।

প্লিজ সোনা এসোনা, কাতর কন্ঠে মনিকা বলে আমার ভীষন ভয় করছে তুমি তারাতারি এসো না। সুদীপ্ত আর কিছু বলতে পারেনা, মনিকার কাতর মায়াভরা কন্ঠে বশ হয়ে যায় সুদীপ্ত ছাতা নিয়ে বেরিয়ে পরে। আকাশে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। সুদীপ্ত পৌছে গেটের সামনে গিয়ে বেল বাজাতেই ত্রস্তপদে বেরিয়ে আসে মনিকা। সুদীপ্ত ভাবে মনে হয় তারই জন্য বোধ হয় মনিকা অপেক্ষায় বসে ছিল। বৃষ্টির মধ্যে দিয়ে সদর গেট খুলে সুদীপ্ত ড্রইং রুমে প্রবেশ করে। ইলেকট্রিক নেই তাই চতুর্দিক ঘন অন্ধকার।

~ এমা তুমিতো একদম ভিজে গেছ, সুদীপ্ত হাসি মুখে বলে তুমিও তো ভিজে গেছ। এস এস ছাতার তলাই এসো দুজনই ঘরে ঢুকতে ঢুকতে চাপ ভিজে যায়। ঘরে ঢুকতেই জোর বিদ্যুৎ সহ বজ্রপাত মনিকা আর সুদীপ্ত কে আলিঙ্গন বদ্ধ করার জন্য অনুঘটকের কাজ করল। দুজনের সরিলে যেন বিদ্যুৎ খেলে যায়, এই প্রথম এতো কাছে আশা দুজনার তবু শীতল শরীরে দুজনই উষ্ণতা খুজে পায় আর এক আজানা শিহরন। সুদীপ্ত মনিকার মুখ উচু করে কম্পিত ওষ্ঠে এঁকে দেয় প্রথম চুম্বনের রেখা।

সুদীপ্ত উন্মত্তের মত আঁকরে ধরে মনিকা, আন্ধকার ঘরে দুজনেই চুপ। সলজ্জ আকুতি তাঁর বেশী সাহষী করতে তখনও বাধা দিচ্ছে। আরেকটা বজ্রপাত… তার পর আর কোন বাধা মানেনি দুটি উষ্ণ শরীর। জীবনের প্রথম আলিঙ্গনে মেতে ওঠে যৌবনের আদিম খেলায় দুজনেই। তাদের উষ্ণ ঠোঁট, প্রতিটা রোমকূপ বিন্দু বিন্দু যৌনতার মধু শুষে নিচ্ছে। তার পর শৃঙ্গার ভালোবাসার আজানা সুখের পরশ, উত্তেজিত মাংসপেশীর আঘাত করাঘাতের পর, দুজনেই দুজনকে আরো মোহিত করে, শৈথিল্যসুকের সাগরে ভেষেযায়। বিছানার চাদর সাক্ষী থেকে যায় সেই মধুর সন্ধ্যার… কারন চাঁদ তারা কেউ ছিলনা সেদিন।

ক্রমশ…

~পুনঃলিখন
@তন্ময়

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *