মেলাঃ সেদিন আর এদিন

মেলা আর মিলন শব্দটি বোধ হয় একই ধাতু থেকে উৎপত্তি। মেলাতেও মিলন হয়, আবার মিলনবেলাতেও মেলা বসে যায়, হয়ত সেটা সুখের মেলা, বা সোহাগের। তাই মিলন আর মেলা একে অপরের পরিপূরক। মেলা ব্যাপারটা এই প্রজন্ম কিছুটা জানলেও আগামী ডিজিটাল প্রজন্ম কিন্তু জানবেও না কি ছিল এই মেলা। ফিল্ম আর কাব্যেই হয়ত উল্লেখ পাবে। জানবেই না, যে কি অমোঘ টান এই মেলা। সারা সারা বছর অনন্ত প্রতিক্ষা।

ইন্টারনেটউত্তর যুগে তথা আজ থেকে কমবেশি ২৫ বছর আগেও মেলা কতটা প্রাসঙ্গিক ছিল জনজীবনে, আজ হয়ত পুরোটা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়নি, তবে আজকের বিশ্বায়নের ভারতীয় জীবনে মেলার প্রাসঙ্গিকতাও নেই। হয়ত এভাবেই যুগের পরিবর্তন হয়। আজকাল ফুড ফ্যাস্টিব্যাল হয়, ট্যুর ফ্যাস্টিব্যাল, শপিং ফ্যাস্টিব্যাল। গালভরা নাম সাথে তার মুল্য। যেন দেখনদারিটাই মুখ্য। ওতেই আত্মতৃপ্তি। সিঙ্গাপুর -দুবাই-হংকং-ব্যাঙ্কক…. আজকের পৃথিবীর.মেলার টপ গন্তব্য। যত মাদারির ভীর ওখানেই। যদিও গোটা অন্তর্জালের পৃথিবিটাই তো একটা মেলা। কত্ত মানুষ গিজগিজ করছে সব সময়। হরেক স্যোস্যাল মিডিয়া, কোটি কোটি মানুশ সারা বিশ্বজুড়ে, পোষ্ট লাইক কমেন্টের বন্যা। আপন বাপন চৌকিচাপনের দিন শে্ষ। সবসময় হৈহৈ রইরই কান্ড। ২৪x৭ মেলা।

যা ইচ্ছা কেনা যায়, আলাপ বিলাপ সব কিছুই। শুধু মাধ্যমটা পাল্টেছে। দ্রুততম যুগে সংজ্ঞা বদলাচ্ছে সবকিছুরই, সেখানে মেলাও বদলাচ্ছে।

আগে সার্কাসে বাঘ সিংহ থাকত, ওরা হিংস্র জানোয়ার, আজকাল সরকার থেকে বন্ধ করে দিয়েছে, মাববিক কারনে। শুধু মানুশই খেলা দেখায়, হয়ত এটা রূপক, কারন মানুষের হিংস্রতা আজ পশুর হিংস্রতাকে শত গুন ছারিয়ে গেছে। তাই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর জীব তো মানুষই, তাই ওরাই আজ সার্কাস করে। মেলায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়।

আজকাল মেলা আমার কাছে কিছুটা আতঙ্কের, আমার মত ভিতুর সংখ্যা দেশে কম নেই। কোথায় যে কখন কোন হিংস্র জানোয়ার থুরি মানুষ থাবা বসাবে কেউ জানেনা।

ইথারীয় জগতেও বা শান্তি কই!! এখানে মুখ কম মুখোস বেশি। আগেকার অনেক বড়লোকের পার্টিতে মুখোস পরে ডান্স হত, এখন তো এমন অবস্থা যে নিজের আসল মুখকেই লোকে চেনেনা, সবাই মুখোস দেখেই অভ্যস্ত। আসলে মেলার অত্তো বড় মাঠ আজ ৬ ইঞ্চি স্ক্রিনে বন্দি, আর হাঁটছি দুই হাতের দুটো বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে। কতদূর আর পারা যায়।

ছোটবেলায় পৌষ সংক্রান্তি মেলায় যেতাম বাঁশি কেনার লোভে, সাথে প্রচুর সস্তার খেলনা। মাদারি, সাপখেলা, দড়ির উপর হাঁটা, জিমন্যাস্টিকস, চড়কি, কালিপটকা বাজি, ফুলছড়ি, তারাবাজি, জিলাপি, প্যাঁদানি পরোটা, চিনেবাদাম, বুড়িরচুল সাথে বায়োস্কোপ আরো কত্তো কি। সে এক মায়াবি পৃথিবী। তখন ভাবতাম বড় হয়ে যখন নিজে পয়সা রোজগার করব যখন আর ভীড়ে হারিয়ে যাবার ভয় থাকবেনা, লম্বা হব, সবটা দেখতে পাব, তখন সবটা একা একা ঘুড়ব আর যা ইচ্ছা খাবো। আজ প্রায় ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি, পকেটে টাকাও থাকে, অন্তত সেই দিনের থেকে ঢের বেশি, হারাবার ভয় তো ঘুনাক্ষরেও নেই। কিন্তু সেই কচি মনটা আর নেই। তেতো একটা মানসিংহ আজ উলঙ্গ সমাজে ধর্ষিত হচ্ছি, পারলে নিজেও ধর্ষন করছি । লম্বা হলে যে মেলা দেখার বদলে নিজেদের ঘাঁ এ ভরা ন্যাংটা স্বরুপটা আবিষ্কার করব তা স্বপ্নেও ভাবিনি।

মাঝে স্কুল লাইফের শেষে খুচরো প্রেমের হিরোগিরি চলত, ভীরে সাইকেল চালানোর কেরামতি দেখিয়ে কোন বিশেষ জনের দৃষ্টি আকর্ষন পেতে। মনে পরে নগদ ২০ টাকা দিয়ে কাঁচের শিশিতে একটা রজনীগন্ধা সেন্ট মেলাথেকেই কিনেছিলাম, ওটাই আমার কেনা প্রথম প্রসাধন। হরেক রকমের সস্তার সিগারেট খাওয়ার মজা আজ বেনসন হেজেসেও পাইনি। তার সাথে থাকত ওই বয়সের দুর্নিবার আকর্ষন স্বল্পপোষাক পরিহিত সভ্য সমাজের চোখে অশ্লীল নেটো গান। একমাত্র মেলাতেই সেটা সহজলভ্য ছিল। সেদিন বক্ষবিভাজিকা, থলথলে চর্বিযুক্ত নাভি সহ বেঢপ থাই দেখেই পিসার টাওয়ার হেলে যেতো, আজও দেখি, তবে দর্শনটা অন্যত্র এটাই যা ফারাক।

এখনও আমি নিয়ম করে মেলায় যায়, তবে শুধু মানুষ দেখতে। তবে দিনে কম যায়। রাতের দিকেই যায়। বয়েস বাড়ার সাথে সাথে লম্বাতেও যেমন বেড়েছি, দৈহিক ও সামাজিক আয়তনেও প্রয়োজনের তুলনায় বেশিই বেড়েছি, তাই সমাজটাকে খুব কাছ থেকে দেখা যায়। কত ধরনের মানুষ মেলাতে ভীড় করে, দোকানদার, সস্তায় মাল খোঁজা খদ্দের, বাবাজী, ফকির, জ্যোতিষ, দালাল, মজুর, চাষী, প্রেমিক, শিল্পী, বাবু, সেচ্ছাসেবক, পুলিশ, সাইকেল স্ট্যান্ডের ডাকপার্টী , চাঁদা কালেক্টর, পকেটমার, মাইক হাতে ঘোষোক, বাউল, সেবাদাসী, পর্ন সিডির দোকানি, বাঁশি, ক্যাটক্যাট করে আওয়াজ করা বাজনার ভীরে রাজনৈতিক নেতাদের ভীর সহ বেশ্যা, তার দালাল, নব্য প্রেমিকের ছোঁকছোঁক করা হাত…….
কত্তো কিছু…..

কত ধরনের গন্ধ যে মেলাতে উড়ে বেড়াই তার খবরই বা কজন রাখে! মেলার প্রতিটি ধুলোতে একটা করে গল্প লুকিয়ে থাকে। তাদের না শুধালে তারা বলেনা। সমাজকে এতো কাছথেকে দেখা ও উপলব্ধি করার আজও সেরা উপাই এই মেলা।

শুধু এগুলো দেখতেই আমি কমপক্ষে চারপাঁচটা মেলা ঘুরি, শান্তিনিকেতন পৌষ মেলা, আমাদের উৎরান্তি মেলা, কলকাতা বইমেলা, আর নবদ্বীপ রাসমেলা….. জীবন জানতে হলে মেলাই সেরা স্থান। নিজের মুল্যায়ন টাও এখানেই করা যায়, যদি আপনি চান।

@tanmayhaque

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *