কবিতার আধুনিকতা; ও বর্তমান পরিস্থিতি-২

আজিকালের আধুনিক কবিদের মধ্যে, বিশেষত এই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে যাদের মূলত প্রকাশ, তারা ঠিক উদ্দেশ্যে কবিতা লেখেন , অধিকাংশ জনেই তার ব্যাখ্যা দিতে অপারগ। কাজ নাই, চলো কবিতা লিখি এই গোছের। কেবলমাত্র, বন্ধু বৃত্তে আরো অনেকেই যেহেতু এই চর্চা করিয়া থাকেন, সেই হেতু “আমি” না লিখিলে কেমনে প্রশংশা পাইব? এই ভাবনা থেকেই বেশিরভাগ জনেই কবিতার নামে মল-মুত্র ত্যাগ করিয়া থাকেন। আর প্রশংসা শুনিবার জন্য যত জনকে সম্ভবপর ততজনকে সাথে বেঁধে নেন। জোর করে কি কবিতা শোনানো সম্ভব? সেই সুকুমারি ছড়ার একুশে আইন ন্যায় একটু পরিবর্তন ঘটাইয়া, সেথায় যারা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে, তাদের ধরে ট্যাগের বলে, কানের কাছে নানার স্বরে, কবিতা শোনায় লক্ষ ড্যাস।

কবিতা তো কবির আবেগ। তাহা জোর করিয়া একপ্রকার ঘাড় ধাক্কা দিইয়া শোনাইবার অপচেষ্টা আজিকাল শিল্পের পর্যায়ে উত্তীর্ণ হইয়াছে। একটা সত্য ওনারা বুঝতে চাহেননা, যে তার কবিতা যদি সত্যিই উৎকর্ষতার মান অতিক্রম করিতে পারেন, পাঠককূলই তাহাকে সমাদরে মাথায় তুলিয়া রাখিবেন, ও তাহার পুনঃপুনঃ প্রচার করিতে থাকিবেন। একটা বিষয় মনে রাখিতে হইবে, সাফল্যের কোন হ্রস্বতর পথ হইতে পারেনা। সমালোচোনা সহিবার অসীম শক্তির সহিত নিরলস প্রয়াসের দীর্ঘ যুগলবন্দিই সফলতার বৃত্তের প্রবেশপথ দেখাইতে সক্ষম।

কাব্য চর্চার সহিত প্রতিষ্ঠার আত্মীয়তা অত্যন্ত দুর্মূল্য। কারন সফলতার যে পথে প্রতিষ্ঠার মঞ্চ প্রস্তুত হয়, তাহা অত্যন্ত বন্ধুর। সাহিত্য জ্ঞান আমার মতে সর্বাধিক পাঠককুলের কাছেই সঞ্চিত। বাকি যারা সাহিত্যচর্চাটা দু কলম লেখালখির মাধ্যমে বহিঃপ্রকাশ করিয়া থাকেন তাহারা কেহই উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত নন, কারণ সাহিত্য সৃষ্টির নির্দিষ্ট পাঠ নেই, কবিত্ব আরো মারাত্বক, ইহা প্রায় সম্পূর্নটাই আত্মগত ও স্বাভাবিক পরিস্ফুটন। কবিগুণ একপ্রকারের স্বভাবগুণ, কোন গুরু ধরিয়া কবি হওয়া অসম্ভব।

সমকালীন খ্যাতিমান কবিগনের কবিতাতেও, যাহাকে আমরা আধুনিক কবিতা বলিয়া জানি, সেই সকল কবিতার অভ্যন্তরে একটা গল্প থেকে থাকে, যদিও অধিকাংশ কবিতাতেই ছন্দের প্রভাব মুক্ত। কিন্তু সেগুলি বুদ্ধিদীপ্ত ভাবনার সোনালী ফসল। কিন্তু সেই সকলকে অনুকরণ করিয়ে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের স্বঘোষিত কবির দল, কবিতার নামে যে দলবদ্ধ বিশৃঙ্খল অত্যাচারে বিদ্ধ পাঠককূলকে খোঁচাইয়া খোঁচাইয়া কাব্যগরল পানে বাধ্য করিয়া থাকেন, তাহা হইতে নিষ্কৃতি কোথায়? আরে বাবা কবিতা অনুভব করিতে হয়, আত্মস্থ করিতে হয় উপলব্ধি করিতে হয়।

শুধু মাত্র “ বাহ, অপূর্ব, অনবদ্য, দারুন, সুন্দর, অবিশ্বাস্য ইত্যাদি” রোজ ব্যবহৃত ভোঁতা ভাষাগুলি শোনার অভিপ্রায়ে? আর কিছু হউক বা না হউক, এই কবিদের পাল্লায় পড়িয়া এই কতিপয় শব্দবন্ধগুলি তাহার কার্যকারিতা হারাইয়াছে নিঃসন্দেহে। কারণ আসলে কোনটা অপূর্ব? কোনটা অনবদ্য? কোনটা অবিশ্বাস্য? বনলতা সেন? নাকি দেবতার অভিষাপ? না কি ওই “রেচন পদার্থ “ গুলো। যাহারা প্রতিষ্ঠিত বা মহান তাহাদের কথা ছাড়িয়া দিন , বাকি যাহারা অধ্যবসায়ের সহিত প্রতিদিনিই চেষ্টা করিতেছেন, তাদেরও যে গুটি কয়েক সুন্দর সৃষ্টি, সেগুলিই বা কি ভাবে ই গনপ্রশংসার ভীড়ে আলাদা করিবেন হে কবিবর? একবার পরখ করে দেখুন আপনার সৃষ্টপদটি কি আদৌ খাদ্য তো? অখাদ্য বা সুখাদ্যের বিচার নাহয় পাঠক করিবেন পড়িবার পর। অন্যের কথা ছাড়িয়া দিন, নিজের তৈরি কান্ডকারখানায় কি মুড়ি মিছরি একই দড় হইয়া যায়নি আপনি নিজেও?

কবিতার শরীরে কাব্যালঙ্কার থাকতেই হবে, ইহাই কবিতার প্রাথমিক শর্ত। কবিতা পাঠের সময় পাঠকের মনে যদি কোন চিত্রকল্প না জাগ্রত হয়, কোন গল্প, বা চরিত্র, বো জীবনবোধ বা দর্শন খুঁজিয়া না পায়, তাহলে সেটা কি কবিতা? না কি কবিতার নামে আসলে কবিতার শ্রাদ্ধবাসর। কবিতার প্রথম শ্রোতা বা পাঠক তো আসলে যিনি লিখিতেছেন তিনিই। তিনি কি বলিতে পারিবেন যে তিনি ঠিক কি পরিমান কাব্যালঙ্কার- রুপক-অনুপ্রাশ-ছন্দ বা দর্শন জীবনবোধের দ্বন্দ্ব মশালা স্বরুপ মিশাইয়াছেন!! না, তিনি পারিবেন না, তিনি শুধু ট্যাগ নামক অস্ত্রের অপব্যবহার করিয়া, ঘাড় ধরিয়া আপনাকে পড়িতে বাধ্য করাইতে পারেন মাত্র। একটা নমুনা পরিবেশন করিলাম,

কবিতাটি নিম্নরূপ
ওগো আমার প্রেমিকা
কাল চুমেছিনু তব ললাটে
আজ তুমি নেই সাথে
তাই পাদিতেছি খাটে।।

মানে ছন্দ মিলাইবার জন্য যা ইচ্ছে তাই কিছু একটা দিলেই হইল। অথবা নিন্মরূপ

গোরোস্থানে আসার আগে
টাটা করেছিলাম সকলকে,
সকলেও আমায় টিটকিরি করেছিল
তারপর বহুদিন আর খোঁজ নেয়নি কেউ
একা অন্ধকারে আছি রোজ বিড়ি খাই
ডিগবাজি ও খাই,
শুধু ভাত খাইনা, কারন আমার সুগার
তবে গালি খাই, কারন পাওনাদারদের ধার শোধ করতে পারিনি।
আমি মাতালদের সর্দার ছিলাম
তাদের বউয়েরা আমার গুষ্ঠিদ্ধার করে আজও।
এই নির্জন গোরোস্থানে বসে আমি রোজ সকলকে করি টাটা।

ইহাও নাকি একটি আধুনিক কবিতা। ভাবিতে কষ্ট হয়, কেহ লেখে তিনি হাগেন, কেহ লেখেন তিনি গালিখান আর ডিগবাজি। ইহাদের কি কারাগারে অবরুদ্ধ করিবার প্রয়োজন নয় অবিলম্বে ,সুস্থ স্বাভাবিক মস্তিষ্কে যাহারা এগুলোকে জাহির করিয়া জনসমক্ষে প্রকাশ করিতে পারেন, তাদের মানসিক সুস্থতা লইয়া প্রশ্ন রহিল।

কুমোর যেমন কাঠের কাঠামোর উপরে কাদামাটি লেপনের মাধ্যমে একটু একটু করিয়া মূর্তির মধ্যে সৌন্দর্য প্রতিষ্ঠা করিয়া থাকেন, তেমনই কবিকেও তার চেতনার রঙে রাঙানো পাঁপড়ি দিয়া একটি একটি করিয়া কবিতার শব্দমালা গাঁথিতে হয়, তবেই না সেই কবিতা হয় কাব্যিক সৌন্দর্যের প্রেমময় মুর্তি। সামান্যতম বিচ্যুতিও যেখানে কবিতার অপঘাত মৃত্যু ঘটায় বলেই শিল্পরসিকদের অভিমত, সেখানে এমন কাব্যচর্চা একধরনে সামাজিক গর্হিত অপরাধ, যাহা অন্তত কবিতারই স্বার্থে আইন প্রনয়নের মাধ্যমে বন্ধ করা উচিৎ।প্রয়োজন গন প্রত্যাখ্যান ও প্রতিরোধ।

এর পর আসিবে কবির কাব্যচর্চার স্বাধীনতা। স্বাধীনতা আর স্বেচ্ছাচারিতা এক নহে। গোলাপ চাষ, বা ধানের চাষ আর গাঁজার চাষের সামাজিক মূল্য কি এক? সুতরাং যত্রতত্র খোলা স্থানে মলমুত্র ত্যাগ করিবেন না যেমন সত্য, তেমনই খোলা মঞ্চে যত্রতত্র কবিতার নামে রেচন ত্যাগিবেন না। অনেকেই ভাবিয়া নেন যে, তিনি ঢেকুর তুলিলেই একটি কবিতার জন্ম হয়, তাহাদের অনুরোধ, সেই সকল বদহজমের ফসলকে নিজস্ব সংগ্রহের রাখিয়া দিন দয়া করিয়া, সামাজিক ভদ্রতার খাতিরে প্রকাশ্যে আপনার এই ঢেঁকুরের বদনাম না করিলেও নিজস্ববৃত্তে আপনাকে লইয়া খোরাক পরিবেশন করিয়া থাকে আপনারই নিকট বন্ধুস্বজন।। কারন আপনার নিজস্ব রচনা (রেচন হইলেও) আপনার নিকটে অবশ্যই ভাল, কারন স্বিয় ত্যাগকৃত গন্ধবায়ুতে দুর্গন্ধের পরিমাপ নিরুপন করা সকল সময় সম্ভবপর হয়না নিজের দ্বারা। সামাজিক মাধ্যমেও বিভিন্ন মঞ্চ রহিয়াছে , যাহা উঠতি প্রতিভাদের জন্যই সংরক্ষিত। জল মাপিতে হইলে ওই স্থানই সর্বত্তোম।

সময়ের তাড়নাতেই সময়োপযোগী কবিতার জন্ম হইয়াছে, এখনও হইতেছে, আগামীতেও হইবে। বাস্তবের প্রেক্ষিত হোক বা কল্পনার পটভূমিতে অঙ্কিত, প্রগতিশীলতা বা আধুনিকতার নামে যেন শৈল্পিক নান্দনিকতা না হারাইয়া যায়। সৎ চেষ্টা সফল হইতে বাধ্য, ইতিহাস সাক্ষী। পাঠকের চৈতন্যের প্রতি অবশ্যই সৃষ্টির দায় বর্তাইয়া থাকে। ফাঁপা শব্দবন্ধের মেকি গড্ডালিকাপ্রবাহে ভাষিয়া না যাইয়া সমালোচোনার জন্য আহ্বানও জরুরী।

মেদ যেমন সুন্দরী নারীর আবেদনকে কুশ্রী করিয়া দেয়, তেমনি কবিতারও অতিরিক্ত শব্দ কবিতাকে গুরুত্বহীন করিয়া তোলে, সমালোচোনার অনুশীলনই পারে আগামীর কবিতাকে মেদবর্জিত ঝরঝরে আকর্ষনীয় রুপ দিতে।

কবিতা কবি বিনে জন্মলাভে অক্ষম। আর সেই পতাকা থাক যোগ্যের হাতে, আর নিজেকে যোগ্য বানাতে প্রয়োজন কাব্যবোধ, সাথে প্রচুর অনুশীলন, আর প্রতিষ্ঠা লিপ্সা। কবিতা হউক সাবলীল আর প্রাঞ্জল। মোটের উপর কবিতা মানুষ ও মানবতার কথা বলুক। তাহার জন্য কবি শিক্ষিত হউক বা না হউক, কাব্যজ্ঞানরহিত যেন না হন। কবিতা মাথা উঁচু করে সমাজ ও রাষ্ট্রের সংস্কারের সামাজিক চিন্তায় চিন্তিত হয়ে, অন্ধকার দূর করার মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে, সমাজ বদলের অঙ্গীকারে উৎসাহ জোগাবে মানুষের হৃদয়কে। নিয়ে যাক রুপকথার অন্তরে, শোনায় সুখ দুখঃখের গীতমালা।

শুধু শব্দের খেলা নয়, সমকালীন কবিতায় থাক শব্দের সঙ্গে শব্দের মেলবন্ধন বা গাঁথুনি, প্রয়োজনে ছন্দও স্থান পাক অন্ত্যে। বাক্যবিন্যাসে থাকুক মজবুত ভিত, যা সমাজ ও কালকে স্পর্শ করার ক্ষমতা রাখবে, এই বিশ্বাসটা আগে নিজের মধ্যে জন্মাক। আর সেটা সম্ভব হইলে তবেই কবিতার শরীরে ধরা পড়িবে ভালোবাসা ও মমতার প্রলেপ।

@তন্ময় হক

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *