রিলায়েন্স জিও

রিলায়েন্স জিও মার্কেটে আসার পর থেকেই চারদিকে সাড়া পড়ে গেছে।

বহুদিন ধরে বদ্ধ জলার মত স্থির থাকা ইন্ডিয়ান টেলিকম মার্কেটে জিও-র আবির্ভাব প্রায় ছোটখাটো সুনামি বললে অত্যুক্তি হবে না। এখন স্বাভাবিক ভাবেই প্রায় ৫০% কম রেটে কিভাবে রিলায়েন্স এত ডাটা এত মানুষকে প্রোভাইড করবে সেটা নিয়ে অনেকেরই কৌতুহল। তার উপর রয়েছে আনলিমিটেড ফ্রি ভয়েস কল! শুনতেও অবাস্তব লাগে।

এরমধ্যে নরেন্দ্র মোদী জিও-এর প্রায় ব্র‍্যান্ড আইকন হয়ে গিয়ে এতে কিছু রাজনৈতিক মশলাও মিশিয়ে দিয়েছেন। তাই রাজনৈতিক লাভের জন্য বা নেহাতই ভারতীয় সুলভ সংশয় থেকে অনেকেই বলছেন এটা জালিয়াতি, মুকেশ আম্বানি ডাকাত ইত্যাদি ইত্যাদি।

তাহলে প্রশ্নটা দাঁড়ালো এটা কি তাহলে জালিয়াতি? কিভাবে এত কিছু সম্ভব? প্রশ্নটা সহজ। উত্তরটা বেশ বড়। কিন্তু এককথায় উত্তর হ্যাঁ সম্ভব। এর মধ্যে কোন জালিয়াতি নেই। পুরোটাই প্রযুক্তিগত উন্নতি এবং ব্যবসায়িক ভিশন এর ফল। গোটা ব্যাপারটা বুঝতে হলে আমাদের শুরু করতে হবে একদম গোড়া থেকে।

১. কিভাবে ডাটা নেটওয়ার্ক কাজ করে?

সহজ ভাষায় বললে আমাদের চারপাশের টাওয়ার গুলো অনেকটা বাড়ির ওয়াইফাই হটস্পটের মত, শুধু সাইজে বড় এবং রিচ অনেক বেশি। যেমন বাড়ির রাউটার কানেক্টেড থাকে নেটের কেবল এর সাথে তেমনই টাওয়ার এর কানেকশন থাকে তার নীচের অপটিকাল ফাইবারের সাথে। অপটিকাল ফাইবার হচ্ছে আধুনিকতম কমিউনিকেশন সিস্টেম যাতে টেরাবিটস পার সেকেন্ড রেঞ্জে ডাটা ট্রান্সমিশন হয়। এবার আমরা মোবাইল বা ডঙ্গল থেকে যে ডাটা পাঠাই তা টাওয়ার রিসিভ করে এবং অপটিকাল ফাইবারের মধ্যে দিয়ে যে টাওয়ারে দরকার পাঠিয়ে দেয়। এই ফাইবারের আবার বিভিন কোয়ালিটি হয়। ২জি-৩জি এর জন্য যে ফাইবার ইউস করা দরকার ৪জি বা ৫জি এর জন্য স্বাভাবিক ভাবেই তার থেকে অনেক বেশি দামী ও গুণমানের ফাইবার প্রয়োজন হবে। এখানে ব্যান্ডউইডথ ব্যাপারটাও জেনে রাখা দরকার। কথাটা অনেকজায়গায় বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়। এক্ষেত্রে ব্যান্ডউইডথ হল সেই ফ্রিকোয়েন্সি রেঞ্জ যেটার মধ্যে কোন একটা কোম্পানি ডাটা পাঠাতে পারে। স্বাভাবিক ভাবেই যার হাতে যত বেশি ব্যান্ডউইডথ যে তত বেশি সংখ্যক মানুষকে হাইস্পিড ডাটা দিতে পারবে।

২. এখন ভারতে টেলিকম কোম্পানি গুলোর কি হাল?

ভারতের বেশিরভাগ টেলিকম কোম্পানি চায় একটা স্ট্যাগন্যান্ট পুরোনো সিস্টেম টিকিয়ে রেখে ব্যবসা চালিয়ে যেতে। তাদের কেনা ব্যান্ডউইডথ যেমন কম তেমনই তাদের কেবল নেটওয়ার্ক বহু পুরনো যা মূলত ভয়েস কলের জন্য বানানো। তাতে ডাটা পাঠালে স্বাভাবিক ভাবেই স্পিড বা কোয়ালিটি কমবে। এয়ারটেল বা ভোডাফোন কিছু ৪জি কোয়ালিটি কেবল লাগালেও তার সংখ্যা কম। তারা বরং অন্য নন-টেলিকম কোম্পানির থেকে অপ্টিকাল ফাইবার ভাড়া নিয়ে কাজা চালাতেই বেশি উৎসাহী। এখন টেলিকম অনেকটাই ওয়ান টাইম ইনভেস্টমেন্ট। অর্থাৎ শুরুতে সমস্ত টেকনোলজি গড়ে তুলতে প্রচুর খরচা, কিন্তু তারপর সেই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সার্ভিস দিতে খরচা প্রায় নেই। তাই বাকি কোম্পানি যাদের অলরেডি একটা প্রযুক্তি গড়ে তোলা আছে তারা নতুন প্রযুক্তিতে ইনভেস্ট করতে আগ্রহী নয়। তারা ওই পুরনো প্রযুক্তি ব্যবহার করেই কাজ চালাচ্ছে। ফলস্বরূপ আমরা স্লো নেট পাচ্ছি এবং টাকাও বেশি গুনতে হচ্ছে। বেশির ভাগ টেলিকম কোম্পানি নিজেদের মধ্যে অলিখিত চুক্তি করে একই রকম রেট রেখে গ্রাহককে মুরগী করে যাচ্ছে। এয়ারটেল ভোডাফোন আইডিয়ার নেটপ্যাকের দামগুলো দেখলেই আইডিয়া পাওয়া যাবে সেটার।

৩. জিও কোথায় আলাদা?

প্রথমেই জানা দরকার জিও রিলায়েন্সের নিজস্ব ভেঞ্চার না। ইনফোটেল ব্রডব্যান্ড নামক একটি কোম্পানি ২০১০ সাল নাগাদ ভারতের সব সেক্টরে ৪জি স্পেকট্রাম (ব্যান্ডউইডথ এর-ই অন্য নাম সহজ ভাবে বুঝতে গেলে) জেতে। মূল কারণ ছিল অন্য বড় কোম্পানিরা তখন থ্রিজি সামলাতেই ব্যাস্ত, ৪জি নিয়ে কারো মাথা ব্যাথা ছিলনা। কিন্তু মুকেশ আম্বানি এইসময়েই ইনফোটেলের ৯৬% শেয়ার কিনে নেন এবং পরর নামকরণ হয় জিও। আচ্ছা ২০১০ এই ৪জি স্পেক্ট্রাম পেয়ে গেলে ৬ বছর ধরে অপেক্ষা করার কি কারণ? কারণ হল এই ৬ বছর ধরে গোটা ভারতে রিলায়েন্স বিশাল বড় অপ্টিকাল ফাইবার নেটওয়ার্ক তৈরী করেছে। কতটা বড়? রিলায়েন্স প্রায় ২৫০০০০ কিমি ব্যাপী অপ্টিকাল ফাইবার, ৯০০০০ টাওয়ার স্থাপন করেছে। আর এই নেটওয়ার্ক শুধুই বিশাল না অত্যন্ত উন্নত মানেরও বটে। এখানে ২৮৮ বা ৯৬ ফাইবারের কেবল ব্যবহার হয়েছে যেখানে বাকি কোম্পানিরা ১২-২৪ ফাইবারের কেবল ইউজ করে। বেশি ফাইবার মানে একসাথে বেশি ডাটা পাঠানো সম্ভব। সাথে এটাও বলা দরকার এই কেবল এতই উন্নত যে এই গোটা সিস্টেম ৫জি ব্যবহার করারও উপযোগী। অর্থাৎ জিও পুরো থমকে থাকা প্রাচীন একটা সিস্টেমে এক ঝটকায় কাটিং এজ প্রযুক্তি এনে ফেলেছে। এদের কভারেজ ভারতের প্রায় ৭০% এরিয়া যা বাকি সমস্ত ৪জি প্রোভাইডারদের এরিয়া যোগ করলে যা হয় তার থেকেও বেশি। তাই এয়ারটেলের “ওয়াইডেস্ট ৪জি নেটওয়ার্ক”এর দাবিটা যে একেবারেই ফালতু তা বলাই যায়।

৫. আনলিমিটেড ফ্রি কল? কিভাবে সম্ভব?

যারা হোয়াটস্যাপ বা ফেসবুক বা স্কাইপ কলের সাথে পরিচিত তাদের কাছে এটা খুব বিস্ময়ের হবার কথা না। ব্যাপারটা হল যেখানে এখন কোম্পানি গুলো ভয়েস কলের জন্য আলাদা প্রযুক্তি (প্রাচীন এবং স্লো) ব্যবহার করে সেখানে জিও ভয়েস কলকে ডাটায় পরিবর্তন করে তাদের ৪জি নেটওয়ার্ক এর মাধ্যমেই ট্রান্সমিট করবে। যার ফলে ভয়েস কলিং এর জন্য আলাদা কোন খরচ বা প্রযুক্তি তাদের লাগছে না। তাই একবার ডাটাপ্যাক ভরালে ইন্টারনেট সার্ফিং এর মত ভয়েস কলিং ফ্রি করতে ওদের কোন সমস্যাই নেই। আর কল কোয়ালিটি নিয়েও চিন্তার কারণ নেই। স্কাইপ বা হোয়াটস্যাপ যেখানে সর্বোচ্চ ৩জি ব্যাবহার করে সেখানে জিও ৪জি ব্যবহার করবে। ভয়েস কল বা ভিডিও কল দুটোই উন্নত মানের হবে।

৪. কেন জিও সব মোবাইলে পাওয়া যাবেনা?

জিও ভয়েস কলিংএর জন্য VoLTE প্রযুক্তিযুক্ত ৪জি সেট দরকার, নর্মাল থ্রিজি বা তার থেকে কমমানের সেটে এটা কাজ করবেনা। VoLTE টেকনোলজি ব্যবহার হয় ভয়েস কলকে ডাটায় কনভার্ট করতে। আগেই বলেছি জিও নর্মাল ভয়েসকল সাপোর্ট করেনা। তাই এই টেকনোলজি না থাকলে জিও সিম কাজ করবে না। কিন্তু এখন ৪০০০ টাকাতেও VoLTE স্মার্টফোন পাওয়া যাচ্ছে, আর ভবিষ্যতে সব ফোনেই এই টেকনোলজি থাকবে আশা করাই যায়।

৬. তাহলে জিও কি আমার খরচা বাঁচাবে?

উত্তরটা একইসাথে হ্যাঁ এবং না। জিওর ১৪৯ টাকার প্যাকে ৩০০ এমবি ৪জি এবং আনলিমিটেড কল পাওয়া যাবে। যারা মোটামুটি নেট ব্যবহার করে তাদের কাছে ৩০০ এমবি কিছুই না। কিন্তু শুধু কল করতে হলে এই অফারটা অসাধারণ। এরপরের অফার হল ৪৯৯ টাকা। খেয়াল করা দরকার মাঝে কিছুই নেই। এবার ৪৯৯ টাকায় আমি পাচ্ছি ৪জিবি ডাটা আর ফ্রি ভয়েস কল। মোটামুটি এখনকার অন্য কোম্পানির ৪জি স্কিমে সারা মাস কল করলে আর ৪জিবি ডাটা চাইলে ১০০০ টাকার কাছে খরচা। সেদিক দিয়ে টাকা বাঁচবে। কিন্তু জেনারেলি আমরা ১-২ জিবি ডাটায় সারামাস চালিয়ে দিই এবং তাতেও ৪০০-৫০০ খরচা পড়ে। কিন্তু জিও ১-২ জিবির কোন প্যাক রাখছেনা। তারা গ্রাহককে প্রলুব্ধ করছে ৪৯৯ এর প্যাকটাই নিতে। তাই দেখতে গেলে বেশিরভাগ গ্রাহকই হয়তো একই পরিমাণ টাকা খরচা করবে মাস গেলে। কিন্তু তাতেও যাকে বলে ভ্যালু ফর মানি দু থেকে তিন গুন বেশি পাওয়া যাবে। তাই খরচা একই থাকলেও অনেক বেশি ভাল ইন্টারনেট ব্যবহারের অভিজ্ঞতা পাওয়া যাবে।

সবদিক থেকে বলা যায় এটা সবার জন্যই উইন উইন সিচুয়েশন। রিলায়েন্স ভারতের একটা বিশাল সংখ্যক গ্রাহক ধরে, স্টেট অফ দ্যা আর্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করে আর বুদ্ধি করে প্যাকের দাম সেট করে যথেষ্ট লাভ করবে। গ্রাহক উন্নত পরিষেবা পাবে একই খরচায়। সাথে টেলিকম মার্কেটে কম্পিটিশন বাড়বে, অন্য কোম্পানিরাও বাধ্য হবে পরিষেবা ভাল করতে। অন্য কোম্পানিগুলো নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ না করে বছরের পর বছর পুরনো প্রযুক্তি ব্যবহার করে চলেছে বলেই এখন নেট এর খরচা এরকম। জিও পুরো বেস থেকে শুরু করে নতুন ভাবে প্রযুক্তি গড়ে তুলেছে, তাই এরকম ভাবে অভূতপূর্ব কম দামে দিতে পারছে। জালিয়াতি কোথাও নেই, পুরোটাই প্রযুক্তির কামাল। এই প্রযুক্তিগত বিপ্লবটা ভারতের টেলিকম শিল্পে খুব দরকার ছিল। জিও সেই অভাবটাই পূর্ণ করেছে এই যা।

তথ্যসূত্র: কোরা এবং বিভিন্ন সংবাদপত্র
কৃতজ্ঞতাঃ আশিষ দাস।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *