গল্পের ছেলেবেলা

আমাদের জীবনকে ভাগ করলে দেখাযাবে, সবচেয়ে মধুর সময় কেটেছিল ইস্কুল জীবনটাই। এটা প্রায় সকলেই একবাক্যে স্বীকার করবেন। তখন না থেক কোন পিছুটান, মনে থাকেনা কোন টেনশন নামক মহামারী। খাওয়া পরার চিন্তা মুক্ত। শীত গ্রীষ্ম বর্ষা কোনকিছুই আলাদা করে মনে রাখার দায় নেই। শত্রুতা মনে রাখার দায় থাকেনা। একটা মুচকি হাসিতেই বিনা কারনে বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। থাকেনা রাজনীতি আর ধর্মের কূটকচালির পাঁকে নিমজ্জিত ভাবনারা। সামাজিক ভালমন্দের অত দায় নিতে হতনা। কঠিন ভুল করে ফেললেও একবার ভ্যা… করে কেঁদে ফেল্লেই সব মাফ। জুতটা পালিশ আছে কিনা, জামা ইস্তিরি করা আছে কিনা, আয়নাতে কেমন দেখতে লাগছে, চুলের জন্য ছোট চিরুনি, পকেটে রুমাল, সানস্ক্রিন বা কোল্ড ক্রিম মাখা হয়েছে কিনা ইত্যাদির মত সকল মামলার উর্দ্ধ্বে। পকেটে একটা টাকা থাকলেই সেই দিনের জন্য আমিই রাজা। বড় সুখের ছিল সে সময়।

হৃদয়ে যৌবনের রং লাগে না কি হৃদয়ের রঙই যৌবনকে রাঙায়! সেটাই হোক বয়ঃসন্ধির পরেই যখন খুব একা একা লাগত, চারিপাসের কত আত্মীয়স্বজন, তাও যেন কেমন ফিকে ছিল জীবনটা। স্কুল, টিউশনি, খেলার মাঠ, হ্যারিকেনের আলোতে পড়তে বসলেই ঢুলুনি, আর সাথে সাথে পৌছে যেতাম সেই কল্পলোকে। কোন এক নাম না জানা স্বপ্নচরী মুখের উপর এক অদৃশ্য মায়াভরা পরশ ছুইয়ে দিত। বড় সুখ পেতাম সেই স্বপ্নে। চেষ্টা করতাম তাকে ছোঁয়ার, অস্থির ভাবে হাত বাড়াতাম। মিলিয়ে যেত স্বপ্নের মধ্যেই। “ওঠ ভাত খেয়ে নে” – মায়ের ডাকে তন্দ্রা কাটত। কিন্তু মনে রয়ে যেত সেই স্বপ্নের আবেশ। পরদিন স্কুলে, খেলার মাঠে, টিউশনিতে , পথে চলতে চলতে সারাক্ষণ মাথার মধ্যে থাকত সেই আগের সন্ধ্যায় দেখা স্বপ্নটা।

জানিনা সেটাকেই প্রেম বলে কিনা, আজও বুঝিনি। প্রেমিক হবার একটা মন ছাড়া কিছুই ছিলনা। সেটা আজ বুঝলেও সেদিন এটুকুও জানতাম না। একসাথে বড় হওয়া প্রতিবেশি খেলার সাথী বান্ধবীদের কাছে গেলে তারা কেমন একটা দুরত্ব বজায় রাখে। আমিও সেই সময় কেমন যেন অজানা কারনে দুরত্ব রাখতাম, মানে বাহ্যিক মন চাইত তাদের সাথে মন খুলে গল্প করি, কিন্তু অবচেতন মন থেকে একটা বাঁধা পেতাম। স্কুলে টিউশনিতে সহপাঠিনীদের কে হঠাত করেই কেমন যেন আমাদের বা আমার থেকে আলাদা বলে মনে হতে লাগল। এটা আরো মারাত্বক আকার নিল, যখন ক্লাশ নাইনে উঠলাম। মেয়েরা স্কুলে গাঢ় সবুজ পাড়ের শাড়ি পরে আসতে লাগল, বামদিকের সারির বেঞ্চ তাদের জন্য নির্দিষ্ট হল। আমাদের মধ্যে দু একজন ছাড়া কেউই ফুলপ্যান্টটুকু পড়ত না। তবে মাস চারেক পর, এক আধজন ছাড়া সকলেই ফুলপ্যান্ট পরেই আসত।

আমাদের মাঝে নরত্তোম এর মত একেকজনের দাড়ি গোঁফের জঙ্গল থাকলেও, আমাদের গ্রুপের প্রায় কাররই নুন্যতম গোঁফের রেখাটুকু ছিলনা। আমি তো আবার এক কাঠি বাড়া ছিলাম, আমার মাথায় বাবুই পাখির বাসার মত এক ঝাঁকা চুল ছাড়া, ভ্রু তেও খুব কমই লোম ছিল। ক্লাস এইটে আমার ওজন ছিল সাতাশ কেজি। খুসখুসে চামড়ার নিকষ কালো রং। লম্বা ডিমের মত্থুতনির হাড় বের করা মুখ। দুর্ভিক্ষের কবলে পরা কালাহান্ডি বা আমলাশোলের মানুষের মত পাঁজর বের করা শরীরের সাথে রিকেট রোগীর মত মানানসই চারপিস হাতপা। আমাজলের জঙ্গলে ছেরে দিলেই কোন একটা জংলীর দলে স্বজাতী বলে নিজেদের দলে ভিড়িয়ে নিতই নিত। তার উপরে সম্বৎসরকাল রোগে ভোগার দরুন, হাতে পায়ে, মাজায়, গলায় মিলিয়ে কেজি খানিক মাদুলি, তাবিক , কবজ, শিকরবাকর ইত্যাদি ছিল। এক কিম্ভূতকিমাকার দুপেয়ে জন্তু।

এই বিশেষ প্রজাতির দেহবৈশিষ্টের দরুন, মনের ভিতর কখনই প্রেমের পাখি বাসা বাঁধেনি। অন্যকে দেখে ভাবনা এলেও, জন্ডিস, আমাশা আর ম্যালেরিয়া ভোগা জীবনে সে আত্মবিশ্বাস কখনই বাড়তে পারেনি। তবে গাছে চড়া, সাইকেল চালানো, দৌড়ে পগার পাড়, বা গঙ্গাতে সাঁতার কাটতে আমার জুড়ি মেলা ভার ছিল। একই জীবদ্দশাতে আন্ডার ওয়েটে ও অভার ওয়েটের সুফল ও কুফল খুব কম মানুষই পেয়েছেন। আক্ষরিক অর্থেই ঝড়ের সময় মা আশঙ্কায় থাকতেন, যে আমি সামান্য বেগের বাতাসেও উড়ে যেতে পারি। এমনই কেটেছে আমার কৈশরবেলা। আবার ফিরি স্কুলের ঘটনায়।

ক্রমেই বুঝলাম, আমাদের মধ্যে কিছু তো একটা পরিবর্তন ঘটছে। আজকালকার অতিআধুনিক বাচ্চাদের মত আমরা মোটেই পরিণত বুদ্ধির ছিলাম না। আমি একা নয়, আমাদের তৎকালীন বন্ধুচক্রের প্রায় সকলেরই একই দশা। তিনজনের বাৎসরিক রেজাল্টের গুনে,রোলনাম্বার তাদের ৬০ এর পরে হলেও আমাদের বাকি ৬ জন প্রথম ১০ এর মধ্যেই ছিলাম। অবশ্য তাতে আমাদের বন্ধুত্বের পথে সেটা কখনই অন্তরায় ছিলনা। তবে প্রথম হত গৌরাঙ্গ। আর ও ছিল আমাদের সকলেরই জাতশত্রু। ওই সিক্স থেকে নাইনের চারটি বছর, কত বাবা মা যে নিজের সন্তানকে গৌরাঙ্গ বানানোর স্বপ্ন দেখত তার ইয়াত্তা নেই। আমাদের বিশেষ করে আমার বাবা মার কাছে কিছু চাইলেই একটাই কথা, আগে গৌরাঙ্গের মত রেজাল্ট কর, তারপরে ভাবব। তারপরে ভেবনা আমার পক্ষে যাবে না বিপক্ষে যাবে, এই সিদ্ধান্ত না নিতে পারার দরুন কখনই আর ক্লাসে গৌরাঙ্গের মত রেজাল্ট করা হয়নি, আমাদের কারোরই।

বসু, নিমাই, সুবীর ওই উপরোল্লেখিত তিনজনই ক্লাস নাইনের হাফ ইয়ার্লির আগেই বাকি পরিচিত অপরিচিত মেয়েদের সাথে দারুন সখ্যতা গড়ে তুলল। অপরিচিত মেয়ে মানে, পাশেই দুটো গার্লস স্কুলে ক্লাস এইট পর্যন্ত ছিল। নাইনে আমাদের ইস্কুলেই একসাথে ক্লাস হত। ওদের মধ্যে বাসু, আদর্শ ভাই মার্কা রোগা পাতলা চেহারার। ভাইদ্বিতিয়ার রাখির দিনে সবাই শঙ্কাতে স্কুলে অনুপস্থিত থাকলেও বাসু ছিল বিন্দাস। নিমাই বাসুর সাথে সাথেই থাকত। লম্বা কালো প্যাকাটি মার্কা চেহারা। চোখগুলো কোটরে ঢোকা, উষ্কখুষ্ক চুল। নিন্মবিত্ত চাষী পরিবারের সন্তান। মাঝখান থেকে ও কি যেন করে ক্লাসের অন্যতম সুন্দরী দীর্ঘাঙ্গী সোমার সহত ঘনিষ্ট হয়ে গেল। মানে টিফিনের সময় তারা দুজনে বকুলতলায় গিয়ে বসে, সোমার আনা টিফিন নিমাই লজ্জা লজ্জা মুখ করে খায়। সোমার পরিবার পুর্ববঙ্গের বসাক। লাল ইস্কুলের মেয়ে। পৈতৃক তাঁত কাপড়ের ব্যাবসা। হাতখরচের জন্য যথেষ্ট টাকা থাকত সাথে।

আমরা হা ঘরে হাভাতের দল। পড়াশোনাটা কিছুটা মন দিয়েই করতাম, তবে প্রেম কি তখনও জানিনা। বাড়ি থেকে প্রায় কিছুই টাকা পয়সা দিত্না। দাদুর কাছে চেয়েচিন্তে, আর বাবার পকেটমেরে যৎসামান্য যেটুকুই জুটতো, বিড়ি আর খেলার সরঞ্জামের চাঁদা দিতেই অপর্যাপ্ত থাকত। সারাদিন সাইকেল চালাই, ক্রিকেট ফুটবল ক্যারাম নিদেনপক্ষে বর্ষায় তাসও খেলি। এহেন নিমাই এর কাজকর্ম দেখে, একমাত্র ঈর্ষা জনিত কারনেই, ও আমাদের ঘোষিত প্রকাশ্য শত্রু রূপে চিহ্নিত হল।

ইতমধ্যে বাসু ভাই সেজে গোপিনীকুলের মাঝে লীলা করতে করতেই তার দিনমান ফুরসৎ নেই। সুতরাং আমাদের দল থেকে প্রায় বিতারিতের দলে নাম লিখিয়েছে। সুবীর বৈশাখি নামের এক মাসীমা সদৃশ্য মেয়ের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। বৈশাখী আমাদের থেকে নাহলেও প্রায় বছর পাঁচ সাতের বড়। ভারী পরিনত চেহারা, বুদ্ধিতেও পরিপক্ক। সুতরাং চোদ্দ পনেরোর সুবীরকে কেন সে পাত্তা দেবে? কিন্তু সুবীরও নাছোড়বান্দা। রোজ চিঠি লেখে বৈশাখীকে। টিফিনে নারানদার দোকানের আলুকাবলি আচার এনে খাওয়ার জন্য সাধে। কিন্তু বৈশাখী নট নরনচরন। হুমকিদেয় যে হেডস্যারকে বলে দেবে। কিন্তু কি এক অজানা কারনে শেষ পর্যন্ত কোনদিনিই স্যারদের কানে একথা বৈশাখী তোলেনি। সুতরাং সুবীরকেও আমরা জেনেবুঝেই ত্যাগ করলাম।

গৌরাঙ্গ নির্বিকার চিত্ত। ওর এসব কিছুতেই কোন হোলদোল ছিলনা। বাকি ছেলেরাও পুজোর আগে আগেই কোন না কোন মেয়ের সাথেই সখ্য স্থাপন করেনিল। রয়ে গেলাম আমরা হতভাগা জনা ছয়েক। এতে করে ফ্রাস্টু খেয়ে আমাদের দৌরাত্বপনা মারাত্বক হারে বেড়ে গেল। আমরা সমগ্র জুটিদের সামনে “দেখ কত ভাল আছি” গোছের দেখাতে দেদার খরচ করতে লাগলাম। হাতখরচার জন্য বরাদ্দ টাকা ওখানেই শেষ। সুতরাং খেলার ব্যাট বল, ফেদার র্যােকেট বা ফুটবল কেনার জন্য অগত্যা সঙ্গদোষে চুরি বিদ্যাতে হাত পাকালাম।

চোর হলেও অত্যন্ত বিনয়ী আর ভাবাদর্শ মেনে চলা ছিঁচকে চোরে রুপান্তরিত হলাম। সন্ধ্যায় স্কুলের নেপালী বাহাদুর, অন্যান্য দেশওয়ালি ভাইদের সাথে পাসের কোল্ডস্টোরের আড্ডাখানায় গেলে আমরা, সরাসরি খেলার মাঠ থেকে স্কুলবাড়ির ছাতের গা পাইপ আর কার্নিশ ধরে সোজা তিনিতলার বিল্ডিংএ। সবে নতুন ক্লাস রুম সাজানো হয়েছে। এখনো ওখানে কোন ক্লাস হয়না। জানালা দরজা নেই। শুধু চেয়ার বেঞ্চি। এর পর গোটা দুয়েক বেঞ্চ সমবেত ভাবে ধরাধরি করে, উপর থেকে সোজা মাটিতে। আর মাটিয়ে পড়তে পড়তেই সেই বেঞ্চ উনুনে জ্বালানোর এক্কেবারে উপযুক্ত হয়ে যেত। এবার সেগুলোকে জড়ো করে সাইকেলের ক্যারিয়ারে বেঁধে সোজা ময়রার দোকানে কিলো দরে বেচে দেওয়া। তাতে গোটা চারেক ক্যাম্বিস বলের দাম উঠে যেত, মানে দু হপ্তার দায়ে নিশ্চিত।

আমরা আমাদের প্রতিবেশিদের কাছে এখনকার ভাষায় তোলা তুলতেও গেছিলাম। আমরা গ্রামের ছেলে, খেলার সরঞ্জামের জন্য মাসিক দশ টাকা চাঁদা চাই। বলাই বাহুল্য, এক দুজপন ছারা প্রত্যেকেই চাঁদার বদলে বাড়িতে নালিশ করেছিলেন। সুতরাং আমাকে গোয়ালে বেঁধে গনপিটুনির আয়জন করেছিল মা। আমার সাথিদেরও ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে একই দশার শিকার হতে হয়। মনের মাঝে জ্বলে উঠে প্রতিশোধের স্পৃহা। সুতরাং সেই সকল কালপ্রিট প্রতিবেশীদের সবক শেখানোটা অবশ্যকর্তব্যে দাঁড়িয়ে গেল। সাথী হইসাবে আরো কয়েকজন পাড়ার ছোকরাকে পেয়ে গেলাম। শুরু হল নতুন ধরনের দুঃসাহসিক অভিযান।

ফি সপ্তাহে বৃহস্পতি আর শনিবার নির্দিষ্ট টার্গেটের বাড়িতে সকলে পৌছে, তার বাড়ির নারকেল বা আম গাছ থেকে যাবতীয় সমস্ত ফল পেড়ে পরদিন সকালে এক বেপাড়ার দালাদের কাছে বেচে দিতাম। সেখানে থেকে প্রাপ্ত অর্থ থেকে, বাড়িতে বলার দরুন তিনগুন ক্ষতিপূরন সহ আমাদের চাঁদা, দশ টাকা মাথা পিছু আমাদের ৯ জনের মজুরী, বাজারে নিয়ে যাওয়ার ভ্যানভাড়া ফিক্সড ২০ টাকা সহ বাকি সমস্ত টাকা সেদিন সন্ধ্যায় দরজার ফাঁক দিয়ে গলিয়ে দিতাম। এর মধ্যে আমাদের ৯ জনের বাড়িও সামিল ছিল। কারন আমি বরাবরই সমষ্টিকে ব্যাক্তি স্বার্থের উর্ধ্বে স্থান দিয়েছি। ফল মাকড় না থাকলে, মাচার পাটকাটি, পালার খড়, এমনকি দুবার নধর পাঁঠাও বেচে দিয়েছিলাম।

তবে আমরা আদর্শ নিয়ে চলা মানুষ, সুতরাং ও পয়সায় কেও একটা বিড়ি পর্যন্ত কিনে খাইনি। বিনয়ী আর ভাবাদর্শ গুন গত চোর। সকলেই জানত এগুলো আমাদেরই কান্ড, কিন্তু প্রায় সব বাড়িরই ছেলে আমাদের সাথে খেলত বলে কোনদিনিই ধরা পরিনি। তবে বেশ কয়েকবার তারা খেয়ে চম্পট দিতে হয়েছে। একবার তো আমি একটা ছোট দুতলা বাড়ি সমান নারকেল গাছে, ডাব পাড়তে উঠেছি, আর সেই গাছে ছিল পেঁচা। পেঁচার ডানা ঝাপটানিতে বাড়ির নেড়িটা বেদম ক্যাও ক্যাও জুড়ে দিল। নিচে যারা ছিল, তারা পাশের পানা পুকুরের নিরাপদ আশ্রয়ে আত্মগোপন করল, আমিও সড়াৎ করে নামতে গিয়ে, বুকের আর দু বাহুর সমস্ত ছাল বাকল নারকেল গাছেই ছেরে রেখে এলাম। সে রাত্রে বাড়ি ফিরে আর কৈফিয়ত দেওয়া যায়না, বাবা এলে ঠ্যাঙানি হবে, ভয়েই অস্থির। বাবা আসার আগেই তেড়েফুঁড়ে জ্বর চলে এলো, সে যাত্রায় মানে মানে রক্ষে। পাক্কা দু সপ্তাহের রোগভোগের পর মামরিপড়া বুক নিয়ে মুক্তি। সেই আমার জীবনের শেষ চুরি, আর শেষ গাছে চড়া। অবশ্য এর পর মন চুরিতে মননিবেশ করেছিলাম।

অবশ্য মাস আটেক পর কারেন্ট আসার পর এই অভিযানের পরিসমাপ্তি ঘটে। ব্যাকটু আবার স্কুল। এবার আর বেঞ্চ নয়, এবার বাল্ব। একটা বাল্ব খুলে বেচলে তিন টাকা পাওয়া যেত, যদিও নতুনের দাম পাঁচ টাকা। গোটা দশেক বাল্ব বেচলেই দু হপ্তার কাজ কমপ্লিট। অবশ্য ওখানে কিছু ভাঙ্গা কাচ ছিটিয়ে দিতাম, যাতে মনে করে কোন নিওশাচর পাখীর কাণ্ডকারখানা। দেখতে দেখতে মাধ্যমিক এসে গেল। বাড়ি থেকে বেড়োনো প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। সকল অভিযানের ওখানেই পরিসমাপ্তি ঘটল।

প্রায় নিরুপদ্রপেই মাধ্যমিক দিলাম। তারপর তিনি মাস অনন্ত ছুটি রেজাল্ট বের হওয়া পর্যন্ত, ভেবেই ছিলাম আবার পুরাতন সাথীদের সাথে পুরাতন জগতে ফিরত যাব। কিন্তু ললাট লিখন অন্য ছিল। বাবা কান ধরে হিড়হিড় করে সাথে করে দোকানে নিয়ে যাওয়া শুরু করলেন। আনুষ্ঠানিক ভাবে আমার কর্মজীবনের সূচনা ঘটল শিক্ষানবিশি রূপে। এরপর কিছুদিন নিরস কাটলেও, সপ্তাদুয়েক পর থেকেই ওটা অভ্যাস হয়ে গেল। কোথা দিয়ে যে তিনটে মাস কেটে গেল বুঝতেই পারলামনা। যথারীতি সময়ে রেজাল্ট বেড়হল। রেজাল্ট দেখে বাবা-মা অত্যন্ত হতাশ হলেন, তারা বোধহয় ভেবেছিলেন তাদের সন্তান বাংলায় প্রথম দশে থাকবে। তবে আমার প্রাপ্ত নাম্বার, প্রতিবেশী সহপাঠিগনের অবিভাবকদের ঈর্ষার কারনে বাবামায়ের সে দুঃখ কিছুটা লাঘব হয়েছিল। উল্লেখযোগ্য ভাবে আমি সেই… গৌরাঙ্গের থেকে অনেক ভাল রেজাল্ট করেছিলাম, এবং নাম্বার বিচারে স্কুলে প্রথম।

ওই স্কুলেই ভর্তি হলাম। ইচ্ছাছিল সাহিত্য নিয়ে পড়ব। বাবার ইচ্ছা ছেলে বিজ্ঞানি হোক, মায়ের ডাক্তার। কিন্তু ছেলে জানে তার অদৃষ্টে উন্মাদ হওয়াই লেখা আছে। অনেক দড়িটানাটানির পর বাবা মায়ের মিলিত ইচ্ছার প্রকোপে বিজ্ঞান বিভাগেই ভর্তি হলাম। পুরাতন বন্ধুদের একজনই আমার সাথে, সাইন্সে ভর্তি হল প্রদীপ। বাকি সকলই অপরিচিত ছেলেমেয়ের ভিরে আর একজনই পরিচিত, সে হল গৌরাঙ্গ।

স্কুলেরই এক শিক্ষকের কাছে সন্ধ্যাবেলা অংক শিখতে যেতাম। তিনি আবার বনেদী পরিবারের সন্তান, স্কুলের পাসেই বাড়ি। সেই পুরাতন আমলের ঢাউস কড়িবরগার ঘরদোর। আমি ছাড়া আর তিনজন পড়ুয়া সহপাঠি ছিল। ক্লাস টুয়েলভের পাত্রদা, শ্রীরুপাদি, আর স্যারের দাদার পালিতা কন্যা। বড় দুজন দাদা দিদি, তারা ও আমি সর্বদাই নিরাপদ দুরত্ব বজায় রাখতাম। আমার কথা বলার কেও থাকতনা। একাই পড়াশোনা করে বাড়ি। স্যার এলে তবেই ওই অপরিচিতা মেয়েটি স্যারের পাশে এসে কেরোসিন বাতির কাছে মুখ ঝুকিয়ে একমনে পড়তেন। দিনে কখনই তাকে দেখিনি।

ওই কেরোসিনের আলোতেই দেখতাম, এক অল্প বয়সী মেয়ে একমনে পড়াশোনা করে চলেছে। কেরোসিনের বাতির মৃদু আলোক যেন ওই লাবন্যকে মোহময়ী করে তুলেছে। ধীরে ধীরে জানলাম ও ক্লাস এইটে উঠেছে সবে। নামটা জানলাম অভিশ্রী। আমার যাবতীয় লৌকিক চিন্তাধারা যাবতীয় আবর্তিত হতে থাকল ওই মৃদু আলোকে দেখা একটা বালিকা মুখচ্ছবিকে ঘিরেই। কিছুদিন পর এমন দাঁড়ালো , যে শুধু মাত্র ওই মৃদু আলোকের রূপ দর্শনের জন্যই পড়তে যাওয়া, পড়া তো ছুতো। সে অবশ্য ততোদিনে কোনোদিনিই আমায় একবারের জন্যও দেখেছে বলে মনে হয়না। আমার মনে হতে লাগল, এ ই তো সেই , যাকে আমি সেই কৈশরের সূচনালগ্নে, সন্ধ্যার ঢুলুনির ঘোরে যে মায়াবিনিকে দেখতাম, সেটা তো এরই মুখচ্ছবি। একেই তো আমি হন্যে হয়ে পথেঘাটে খুঁজে চলেছি অহর্নিশ।

একটা একটা করে দিন গড়ায়, ওই ভাললাগাটা ক্রমে নেশায় পরিণত হল, পরে মহামারীতে। তাকে নিয়ে কত রংবেরঙের স্বপ্ন দেখা শুরু হয়ে গেল। কিন্তু অপর প্রান্ত নির্বিকার। এরই মধ্যে সময় অসুঙ্কলান জনিত কোন কারনে বড় দুই সহপাঠী দাদা দিদি, সকালের ব্যাচে চলে যাওয়াতে, আমি একা। তাতে করে আমার কল্পলোকে বিরাজ করতে আরো সুবিধেই হল। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটাতে স্যার যেতে বললেও আমি সেই পাঁচটা থেকেই স্যার বাড়ির আনাচে কানাচে ঘুরঘুর করতাম।

এমনই একদিন , তখন আমি স্যারের বাড়ির প্রায় বাতিলের খাতায় নাম লেখানো, একটা কালিমাখা কাঁচের হ্যারিকেন নিয়ে কিছু একটা ভাবছি, হঠাৎ অন্ধকার বলে উঠল “আজ ছোটকা বাড়ি নেই” । আমি আচ্ছা বলে বাইরে যাব, মনে এল কে বলল এ কথা? দ্রুত আবার ঘরে ঢুকতে গিয়ে সামনা সামনি ধাক্কা অন্ধকারে। মা গো বলে, একটা মেয়েলী কন্ঠ শুনে বাড়ির অন্যান্য মহিলারা ছুটে এলেন। দেখি সেই রূপসী। মাথায় একটু জল টল দিয়ে, বাড়ি ফিরলাম।

পরদিন আবার সন্ধ্যা ছটাতে হাজির। যথারীতি বাড়ির কাজের মাসি হ্যারিকেন সাপ্লায় দিয়ে গেলেন।খানিক পরেই – “এ্যাই, কাল আমার স্কুলের সামনে ঘুরঘুর করছিলে কেন”? আমি চমকিয়ে দেখি, অভিশ্রী। আমি থতমত খেয়ে বললাম,

– ইয়ে মানে এমনিই।
– এমনি মানে কি? ওই কতগুলো নচ্ছার ছেলেদের সাথে ঘোরাঘুরি! ছোটকাকে বলব?
– না মানে ওরা তো আমার বন্ধু, একসাথে পড়ি
– ম্যা গো, কি বন্ধু ছিরি।
বলেই আবার তিন লাগে দোতলায়। মা ছাড়া অন্য কোন মহিলা এতটুকুও শাষনও করেনি কোনোদিন। এমনকি আমার বোনও আমার বিরুদ্ধে যেতনা, অন্তত প্রকাশ্যে। আমরা এমনিই কন কারন ছাড়া বিভিন্ন স্কুলের সামনে দলবেধে সাইকেল নিয়ে যেতাম। তবে এটুকু বুঝলাম, স্কুলের ওতো দূর থেকেও ও আমাকে নজরে রেখেছে। এটা ভেবেই আমার সারা শরীরের রোম খাড়া হয়ে গেল।

এর পর থেকে আমি যাওয়ার খানিক পরেই একয়াট পরিষ্কার কাঁচের ডিমলাইট নিয়ে আমার সাথে এসে যোগ দিত। স্যার আসত প্রায় আটটার সময়। আমার তো লটারি লেগে গেল। এমন ভাবেই একমাসেই একটা সুন্দর বন্ধুত্ব হয়ে গেল। তখনও আমি তাকে দিনের আলোতে কখনো দেখিনি। একদিন হঠাত বললো , আজ আমাদের স্কুলে বিজ্ঞান মঞ্চের বাস আসবে, তাতে নাকি নানা ধরনের দর্শনীয় জিনিসপত্র থাকবে। যাবে?
– আমি বললাম, আমাকে এল্যাও করবে?
– বলল, হ্যাঁ, কাল বন্ধুদের এলাও আছে। তবে একটা কথা, এখানে আসবে না। আমি বাসস্ট্যান্ডে থাকব , তুমি ওখানে এসো, তারপর একসাথে যাবো।

বাড়ি থেকে ওদের স্কুল প্রায় ৮-৯ কিলোমিটার দূরে , পৌরসভা এলাকায়। সত্যি বলতে সে রাত্রে আমি ঘুমাতেই পারিনি। এই প্রথম কোন মেয়ের নিমন্ত্রণে কথাও যাব। সারা পৃথীবির যাবতীয় সুখের ঘোরে আমি। বুঝতেও পারছিনা এটাই প্রেম কিনা! আবার কাওকে শুধাতেও পারছিনা। এক দমবন্ধ সুখানুভুতি। আগেই বলেছি, চোষা ডাটার মত আমার চেহারা, যে পোষাকই পরিনা কেন, ঠিক মর্কটই লাগে। খুব ভাল মনে আছে, একটা ফুলহাতা ইস্ত্রি না করা জামা সেদিন গুজে পরেছিলাম। ঘরের সেন্ট মাখলে সে নানা কৈফিয়ত কাকিমার কাছ থেকে লুকিয়ে সেন্ট নিতে গিয়ে, কাকার একখানি বেল্টও পেয়ে গেলাম।

হুশ করে সাইকেল চালিয়ে সোজা বাসস্ট্যান্ড। উত্তেজনায় আমি তখন রোবট। দেখি কেও কোত্থাও নেই। মনটা খারাপ করে প্রায় এক ঘন্টা পর এক্কেবারে বিধ্বস্ত ভাঙ্গা মন নিয়ে যখন ফিরে আসব বলে সাইকেলে চড়ছি, হঠাৎ সামনের বাস থেকে চিৎকার।
– ওই… দাঁড়াও দাঁড়াও?
– আমাকে বলছেন?
– তো আর কাকে বলব, হুনুরাম
ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। ক্ষানিক বাদেই, বাস থেকে কালো ফ্রম আর গোলাপী একটা টপ পরে একটা বছর তের চোদ্দোর মেয়ে দাঁড়ালো। কোথায় যেন দেখেছি একে মনে করতে পারছিনা। ভীষন ফর্সা হাতপা, গাল দুটো পুরো গোলাপী, যেন টোকা দিলে রক্ত ঝড়বে, হাতের গলার নীল শিরা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, ঠিক বিদেশী পুতুলের মত নাকচোখ। বয়সে তুলনায় বেশ লম্বা চওড়া।

আসলে মনটা এমনিতেই ভারাক্রান্ত। এমনিতেই আজও সরাসরি মেয়েদের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারিনা, সেদিন তো আরো, আড়চোখে ওই টুকু দেখে নিয়ে শুধালাম, কিছু বলবে?
– নেকু, কিছু বলবে! তোমার নাম কি?
– আমি বেশ আশ্চর্যের সাথে বললাম, নাম জানো না আবার কি দরকার?
– বেশ বোলোনা, রাত্রে যেন আর আমার সাথে কথা বোলোনা।
কথাগুলো এবার আমার মনখারাপের ঘোর কাটিয়ে বাস্তবের সামনে নিয়ে এলো। এবার চিনতে পারলাম, এ তো সেই অন্ধকারের লাবন্যময়ী। সে বেশ জোরের সাথে বলল, কি হল???
– আসলে আমি থিক তোমায় চিনতে পারিনি, মানে কোন দিন দিনের আলোতে দেখিনি তো, তাই…
এক নিঃশ্বাসে কথাকটা বলেই থামলাম।
– থাক আর মস্করা করতে হবেনা। এমা, এটা তো বাথরুমের পাশে, চলো ইস্কুল পানেযাওয়া যাক।
আমি মন্ত্রাবিষ্টের মত ওর পিছন পিছন চলতে লাগলাম।
– আচ্ছা, কুড়ে তো তুমি, সাইকেল থাকলে আমরা হাঁটছি কেন!
আমি বললাম ঠিক আছে তুমি চালাও, আমি হাঁটছি। একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে, সাইকেলের সামনের রডে চড়ে বসল। অনুভব করলাম ওর ঘাড়ের কাছ দিয়ে কেমন একটা মাতাল করা সুমিষ্ট গন্ধ আসছে, চুলগুলো হাওয়াই উড়ে আমার মুখচোখ ছুঁয়ে যাচ্ছে, আমি ক্রমেই নিস্তেজ হয়ে পড়ছি। আমার সারা শরীর কাঠ হয়ে গেছে, শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা হিমেল স্রোত বয়ে চলেছে। কেও যদি দেখে ফেলে কি হবে এই ভাবনাতেও আমার হার্ট ফেল করার দশা। এর পর ঠিক কি কথা বার্তা বলেছিলাম মনে নেই।

স্কুলের গেটে ঢুকতে গিয়েই দেখি আমার নিজের বোন, খুড়তুতো বোন সহ ওদের বান্ধবীদের টিম যথারীতি হাজির। ওই বিজ্ঞান মঞ্চের বাস। ওমা সাথে দেখি মা ও এসেছেন। আমি আর নেই। তিন লাফে ওকে নিয়ে নিরাপদ দূরে এসে, ওকে বললাম তুমি যাও আমি কোনমতেই স্কুলে ঢুকবনা। কারনটাও বললাম। ও বলে গেল খানিক দাঁড়াও, যাব আর আসব। চলে যেওনা যেন।

আমি একটা মিস্টির দোকানের বেঞ্চিতে বসে ভাবতে লাগলাম, এ কি ওই মেয়েটাই? পৃথিবিতে কেও এতো রূপসীও হতে পারে? ওর রূপচ্ছটায় সূর্যকেও সেদিন ম্লান লাগছিল।

আসি যায় ক্লাস করি, কেমন একটা গা ছাড়া ছাড়া ভাব। আরো মাস চার পাঁচ কাটার পর আমি মটামুটি বাবার আস্থাভাজন হয়ে উঠছি, যদিও গালি খাওয়ার পরিমান বহুগুন বেড়েছে। মাধ্যমিকের আগে বাবাকে দেখলেই তার সামনে থেকে পালাতাম, রাশভারী মানুষ, সপ্তাহে কদিচ কদাচিৎ মুখোমুখি হতাম। এখন তো পড়াশোনার সময়টুকু ছাড়া প্রায় সর্বক্ষনই পিতৃ সহচর্যে। ইতিমধ্যে বোন কিছুটা বড় হওয়াতে ও মায়ের অনেক কাছাকাছি চলে এসেছে। ব্যাবসার গদিতে বসার দরুন পয়সার অভাব মিটে এখন, ব্যাক্তির তুলনায় অপ্রতুল টাকা থাকে পকেটে। খেয়াল করলাম টাকা আসার সাথে সাথেই সেই ক্লাস সেভেন এইটেই ইচ্ছা গুলোও মরে গেছে । তখন ভাবতাম যেদিন টাকা রোজগার করব, সেদিন ব্যাটা তোর গোটা ঘুগনির গামলাটাই কিনে নেব। অথচ মাত্র তিন চার বছরের ব্যবধান, পকেটে টাকা আছে, অথচ সামনের বাচ্চা বাচ্চা ভাইগুলোর “ কাকু আমাকে দাও, কাকু আমাকে দাও” করে অধৈর্য চিৎকার ডিঙিয়ে একপ্লেট ঘুগনিও খেতে পারিনি।

দ্রুত সময় বদলে যাচ্ছিল। দেশের উন্নয়নের পালে বিশ্বায়নের হাওয়া লেগেছে। সেটা প্রতক্ষ্য পরিলক্ষিত হচ্ছিল সমাজের সর্বস্তরে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি আর যোগাযোগ ব্যাবস্থা উন্নত হতে শুরু করার দরুন সহজে কাঁচা টাকার আমদানি শুরু হয়ে গেল। সাধারনত গরীব গ্রামাঞ্চলে যেমনটি হয়ে থাকে, অধিকাংশ সহপাঠীই “অনেক পড়াশোনা হয়েছে,” ভেবে নিয়ে টাকা রোজগারের তাগিদে জীবনযুদ্ধে নেমে পড়ল। সুতরাং হারাধনের অন্তিম কয়েকটি সন্তান রূপে আমরা কয়েকজন টিমটিম করে টিকে রইলাম গোটা এলাকায়।

তখন বাবার দুটো গাড়ি, একটা বাজাজ M-80, আরেকটা জাঁদরেল পানাগড় থেকে কেনা সেকেন্ডহ্যান্ড আর্মির বুলেট। ওই ভারী বুলেট সামলানো আমার কম্ম ময়, তাই মাঝে মাঝে মা কে পটিয়ে, বাবার অলক্ষ্যে ওই M-80 নিয়েই স্কুলে যেতে লাগলাম। কিছুদিন পর ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে গেলেও বাবা আর উচ্চবাচ্য না করার দরুন, ওই M-80 একপ্রকার আমারই হয়ে গেছিল। কিন্তু বুলেটর প্রতি একটা তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল। আজও সেই মোটর সাইকেলের বিলাসিতা আমি কাটিয়ে উঠতে পারিনি।

ধীরে ধীরে ইলেভেনের পাঠ শেষ করে এবার বারো ক্লাশ। কঠিন সময়। কিন্তু ততদিনে আমার প্রথম প্রায়োরিটি হয়ে উঠেছে ব্যাবসা। সারাদিন ব্যাবসা সংক্রান্ত নানান কাজকর্মের ফাঁকে সময় পেলে তবেই পড়াশোনা। এই প্রত্যক্ষ ব্যাবসাতে থাকার কারনে আমার মনস্তত্বেরও চরম পরিবর্তন খেয়াল করছিলাম। খেলাধুলার পাঠ প্রায় ডকে উঠেছিল, আড্ডা মারার সময় ছিলনা। তাছারা সব থেকে বড় কথা তখন হাতে হঠাৎ করে লক্ষীর ঝুলি খুলে গিয়ে শখ গুলো সব বিভিন্ন দিকে মোর নিয়ে নিল, যেগুলোর ভাবনা একবছর আগে মাথাতেও ছিলনা। যেমন তখন সবে স্পাইস মোবাইল কোম্পানি উঠেছে, কোলকাতা ছাড়া কোথাও টাওয়ার নেই। কিন্তু পকেটে পয়সা থাকলে, আর খরচের স্থান না থাকলে যা হয়, এক ঢাউস মোটোরোলার সেট কিনে বাড়িতে নিয়ে এলাম। জীবনে শনির দৃষ্টি শুরু হল।

বাবা বুঝে গেছিলেন, ছেলে আমার অজ্ঞান, সুতরাং বিজ্ঞানী হবার ভাবনা কবর দিলেও, মা তার ছেলেকে ডাক্তার করার স্বপ্নে জল ঢালতে নারাজ। অতএব, কোলকাতায় চাকুরিরতা মামার সাথে শলাপরামর্শে আমাকে কোলকাতায় রেখে পড়াশোনা করানোর পরিকল্পনা পাকা হয়ে গেল। এদিকে বাবা বেঁকে বসলেন, কারন ততদিনে ব্যাবসার ৮০ % দৈনন্দিক কাজকর্ম আমাকেই করতে হয়। আর মা সেটা লক্ষ্য করেন, যে এই ব্যাবসা আর কাঁচা টাকার পাল্লায় পরে ছেলে উচ্ছুন্নে যাচ্ছে। বাবার তীব্র অমত সত্বেও আমি রাজি হয়ে গেলাম। কারন কোলকাতার হাতছানি। এভাবেই সমাপ্তি ঘটল আমার স্কুলজীবনের।

কোন এক সময় শুধু তোমাকে নিয়েই আমার সকল স্বপ্ন , সকল আশা , সকল চাওয়া পাওয়া ছিল ,, বলতে পার তুমি আমার একটা পৃথিবী ছিলে ,, ভাবছ কথাগুলো মুখের কথা ,, না এটা তুমি ভাবতে পার না কারন তুমি জানতে তোমাকে কতটা ভালোবেসে ছিলাম ,, কিন্তু এখন ভুলতে চাচ্ছি ,শুধু মুক্তি নিতে চাচ্ছি এই নষ্ট স্মৃতিগুলো থেকে ,,জানি না কেউ কাউকে ঠিক এভাবে অসাধারন মিথ্যা ভালোবাসার অভিনয় করে কষ্ট দিয়েছে কি না ,, আজ হয়তো ভাবছ হঠাত্‍ করে আমি এত বদলে গেলাম কেন ,, সত্যিই আমিও বদলে গেছি ,,তোমার মত ,, তাই তো তোমার জন্য অপেক্ষায় আর নেই ,,তোমার জন্য হৃদয়ে একটু ভালবাসা ও আর নেই ,, মুছে দিতে চাচ্ছি তুমি নামক কষ্টটা কে ,, আর চাই না কোন এক পথের বাকেঁ তোমার সাথে আমার দেখা হয়ে যাক ,,, চাই না মনে করতে ভালোবাসার মানুষ বদলের একজন কে ,, যে সুখের জন্য সব পারে , যে হৃদয় ও ভাঙ্গতে পারে ,, তবে মনে হচ্ছে সেদিন আর বেশি দুরে নয় , যেদিন তুমি তোমার সুখের জন্য কাদবে ,, আর সেদিন হয়তো মনের অজান্তেই একটু হাসবো আমি।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *