অথঃ কৃষ্ণধন কথা

কালো টাকাটা কি?

ট্যাক্স না দেওয়া রোজগারই হল কালো। তাহলে কালো টাকা কারা কামাই করে?

একজন ভিখারীও কালো টাকা রোজগার করতে পারে, যদি না সে তার আয়ের উৎস রাষ্ট্রকে জানায়। কর ব্যাবস্থা রাষ্ট্রের একমাত্র চালিকাশক্তি। সেটা প্রতক্ষ্য কর হোক বা পরোক্ষ কর। প্রতক্ষ্য কর হল ইনকাম ট্যাক্স, সেল ট্যাক্স, ভ্যাট, সার্ভিস ট্যাক্স ইত্যাদি। পরোক্ষ ট্যাক্স রাষ্ট্র তার ব্যাবসা থেকে আমদানি করে বা পুঁজির উপরে লাগু করে। যেমন শুধু আমদারিন হিসাবে যে প্রট্রোল ভারতের বাজারে লিটারপ্রতি ২৬ টাকায় পাওয়া উচিৎ সেটা কিনতে হয় কমবেশি ৭০ টাকাতে। সুতরাং ৪৪ টাকা হল পরোক্ষ কর। আমাদের দেশের আয়ের ১৩% সম্ভবত প্রতক্ষ্য কর থেকে প্রাপ্ত। বাকি সবটাই পরোক্ষ কর।

আমাদের ১৩০ কোটির মাত্র দেড় কোটি মানুষ ইনকাম ট্যাক্স দেয়। এটাই আমার মতে কালোধন জমা হওয়ার সবচেয়ে বড় কারন। আমাদের দেশে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার নিয়মে IT File ম্যান্ডেটারি করলেই অনেকটা লাভ হত বলে আমার ধারনা। কালো কামাই বন্ধ না হলে কালো ধন জমা বন্ধ হবে কিভাবে?

আমার ৫০ বিঘা সম্পত্তি রয়েছে। তার থেকে একটা রোজগার হয়। আমি যদি কালো টাকা রোজগার করি, সেটা আমি বেশি বেশি করে দেখাবো আমার এই বিপুল রোজগার কৃষি থেকে এসেছে যেটা সম্পূর্ন কর মুক্ত। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় আমার জমি আমার খাতায় কলমে, সেটা ভেস্টেড, বা ভাগচাষী বর্গাদারেররা চাষ করে আমায় সৎসামান্য দেয়। এই কালো টাকা বন্ধ। কিভাবে করবে সরকার??

কালো টাকা আমার কাছে কালো। কিন্তু আমি যখন বাজারে গিয়ে দুকিলো খাসির মাংস ১২০০ টাকায় কিনলাম, বা এককিলো গলদা চিংড়ি ১০০০ টাকায় কিনে নিয়ে এলাম সেটা কিন্তু সাদা হয়ে গেল। কারন ওই মাংস বা চিংড়ি বিক্রেতারা প্রান্তিক মানুষ।বা তারা করের আওতাতেও আসেননা।

এভাবেই কালো টাকা বাজারে খাটে, যেটা বাজার অর্থনীতির চালিকা শক্তি। যতটা না একলপ্তে বার ঢের বেশি ছোট ছোট এই ভাবে। তৃতীয় শ্রেনির একটা কর্মচারীর ঘুষের ৫০০০ টাকা বা সরকারি স্কুলের একজন শিক্ষকের গৃহশিক্ষকতা করে রোজগারের কালো টাকা ভোগ্যপন্যের পিছনেই ব্যায় হয়ে যায়। ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধিপায়, উৎপাদন বাড়ে, কর্মদিবসের সৃষ্টি হয়। রোজগার ছড়িয়ে পরে। ফ্রিজ টিভি মোবাইল মোটরসাইকেল থেকে বালিস লেপ কম্বল সবটাই এক্সট্রা ইনকামের টাকায় কিনি, আর নগদে। কে কবে চেক দিয়ে কিনেছি? সবটাই নগদেই কিনেছি। বাড়ির খাবারের চালটা আলুটা কবে চেক বা কার্ডে কিনেছি, মুষ্টিমেয় কিছু শহুরে বা উৎসাহী মানুষ ছাড়া। সবটাই নগদে। সেটা সাদাতে হোক বা কালোতে। তাই কালো রোজগারের পথটা কঠোর পথে বন্ধ করতে হবে। কারন কালো টাকা বাজারেই থাকে, সেটাও রোজকার অর্থনীতিরই অংশ।

আর এই সত্যটা না অনুধাবন করে নোটবন্দির ফলে আজকের এই দুরবস্থা।সমাজ বিরোধীর চাকু আর ডাক্তারের চাকুর পার্থক্যটাই এখানে।

জঙ্গী হামলা কমেনি নোট বাতিলের প্রভাবে, সরকারের সেই দাবি ফোলা বেলুনের মতই চুপসে গেছে। সংবাদে প্রকাশ সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের পর আমাদের ২৫ জন বীরসেনা শহীদ হয়েছেন। আর পারিকর বাবু মোদীজীর নামসঙ্কীর্তনেই ব্যাস্ত। বর্তমান রাষ্ট্র জনগনকে অবশ করে রাখতেই উৎসাহী। তা সে রাজ্যই হোক বা কেন্দ্র। রাজ্য মিছরির ছুড়ি। নাচ গান উৎসব দিয়ে ব্যাথা ভুলিয়ে রেখেছে। কেন্দ্র আবার সেই “একটা লাঠিকে না ভেঙ্গে কিভাবে ছোট করবেন, সিম্পল – পাসে একটা বড় রেখেদাও। আপনা থেকে আগেরটা ছোট দেখাবে। তাই কেন্দ্র কখনও গোমাংস, কখনও সিমান্তে যুদ্ধ পরিস্থিতি, মেকি জাতীয়তাবাদ আর এখন অর্থনীতিকে কোমায় পাঠিয়ে মানুষের রোজকার মৌলিক সমস্যাগুলো কে বালির বাঁধ দিয়েছেন। জনহিতে করছি বলে বিজ্ঞাপনের অন্ত নেই। কিন্তু কোন দিশাতে? শুধালে শুধু প্রাক্তনদের ব্যার্থতার তুলনা আর দেশদ্রোহিতার ছাপ্পা পাওয়া যাচ্ছে। আরে বাবা আগের সরকার ব্যার্থ বলেইনা আপনারা দায়িত্বে এসেছেন।

যুগেযুগে পন্ডিতরা বলে এসেছেন পেটে টান পরলে মানুষ ধর্মগ্রন্থ ছিঁড়ে খায়। এ পরিস্থিতিতে সেই পেটে লাথ পরেছে। তাই রাজনীতির রং দল জাত সাদা কালো ভুলে এই নরনারায়নের দল কিন্তু রাষ্ট্রের এই ভাঁওতাতে খুব বেশিদিন ভুলবেনা। তোষামোদি বংশবদের দল আগে পালটি খাবে। আপনাদের যন্তরমন্তর ঘর থেকে মগজধোলাই করে যে নমুনাগুলোকে আপনাদের হয়ে চেঁচিয়ে বাজার গরম করে রেখেছে, ভুলে যাবেননা তাদের মগজটাই ধোলায়ের জন্য উপযুক্ত। আপনার থেকে উন্নত যন্তরমন্তর কেও তৈরি করলেই তারা ওদের হয়েই চেল্লাবে। আপনারা না ঘরের থাকবেন না ঘাটের।

জানুয়ারিতে নাকি বেনামি সম্পত্তির উপরে নজর দেবেন। বেনামী সম্পত্তি!! হা হা হা। নামের আমি নামের তুমি নাম দিয়ে যায় চেনা। কিক সিনেমার একটা দৃশ্যের কথা খেয়াল করলেই। বুঝে যাওয়া যায়। সম্পত্তি যারা বানায় বা যারা কারবারি তারা মোদির থেকে অনেক চালাক। শিক্ষিত ও ইউনিটিবদ্ধ। ডিসেম্বর টা আগে কেন্দ্র উৎ্রাক তারপর জানুয়ারি। আমার ব্যাক্তিগত বিশ্বাস, কেন্দ্র সরকার পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যাবে ২০০৯ সালের রাজ্যে সিপিএম এর মত। কারন এবার নিজেরা যে সারমেয়গুলোকে ট্রেইন্ড করেছিল অন্যদের পায়ে কামরানোর জন্য, সেই মালগুলোই প্রভুকদের ছিঁড়ে খাবে। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি এভাবেই হয়।

গ্রামেগঞ্জে বেকারের সংখ্যা রোজ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। গতমাসেও একটা ভাল ড্রাইভারের জন্য মাথাকুটে মরেছি। আজকাল রোজ সকাল হলেই ২-৪ জন কর্মপ্রার্থী অফিসে আসছেন, যার ভিতরে একজন ড্রাইভার তো আছেনই। মুম্বই সুরাতে যারা কাজ করতেন গহনা শিল্পে, তারা ফিরে আসছেন। পর্যটন শিল্পেও মন্দার দররুন বেকারত্ব। এনারা নাজানেন মাঠেরকাজ, না ভ্যান রিক্সা চালাতে পারবেন। তাই চার দেওয়ালের ভিতরে স্থানী কারখানাতে মোট বওয়ার কাজ হলেও সেটাই চাইছেন। কাল মিলে দেখি মুটিয়া দিলের কিছু লেবার দামি বাইক জিয়ে কাজে এলেন। সর্দারকে শুধাতে জানলাম, গাড়িটা আগের কেনা। এখন ওই গাড়ি আর তার স্টেটাস রক্ষা করার জন্য এই ঘেড়াটোপের আড়ালে ভদ্রশিক্ষিত সন্তানের মুটেগিরি। এরা তো আপাতত বেঁচে গেল, কিন্তু যারা এটাও করে উঠতে পারলনা?

আমাদের ব্যাবসা সুত্রেই সমাজের নানান মানুষের সাথে উঠাবসা। তেমনই একজনের কাছে কৌতুহল বসতই জানলাম, পতিতাপল্লিগুলোর অবস্থা শিউরে উঠার মত। কাষ্টমার নেই। কারন এখানে সাধারনত “কালো টাকার” কারবারিদের আর স্কুল কলেজের ছাত্রদেরই আনাগোনা নগদ টাকার ফোয়ারা। অথচ রোজ এই আদিম পেশাতে অনেকেই অভাবের জ্বালায় ভীর জমাচ্ছে। বলুন কে কার্ডে পে করে বেশ্যাবাড়ি যায়? মোদীজি বোধহয় সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা এই ব্যাবসাতেই দিয়েছেন।

শীতে ফুল ও ফুলগাছের ব্যাবসা জাষ্ট ধ্বংস। আমাদের সমুদ্রগড়ের তাঁতের ব্যাবসাতে সেলাইন ঝুলছে। কারিগরেরা অধিকাংশেই ঘরে ফিরে গেছে। চালের এক্সপোর্ট বন্ধ। তার সাথে জুড়ে থাকা ঠিকাশ্রমিকগুলোও কর্মহীন। কন্টেণাড় ট্রেলার তাদের ড্রাইভার মালিকেরা কড়িকাঠ গুনছেন। পেঁয়াজ সরষে চাষে ব্যাপক ঘাটতি।

ম্যাসাকার অবস্থা।

প্লাস্টিক কার্ড হলেই দেশ ডিজিটাল হয়না। কারন আমরা কার্ড দিয়ে সেই নগদ টাকাই তুলি, ব্যাঙ্কের বদলে ATM থেকে। আমাদের দেশে অনলাইন সপিং করি, কিন্তু পে অন ডেলিভারি সিস্টেমে। এই তো আমাদের ডিজিটাল দেশের নাগরিক।

ডিজি হবে কিনা সময় বললেও রিংটাল যে হয়ে বসে আছে সেটা দেখাই যাচ্ছে।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *