সম্পাদকীয় – কবিপক্ষ ১৪২৪

অন্তরের ভাবনা আর অনুভূতি সকলকে সচেতন ও সরল ভাবে প্রকাশ করিবার ধারাকে অকপট বলিয়া মান্যতা প্রদান করা হয়। যাহা কোনপ্রকার পরিস্থিতি বা ব্যাক্তির প্রভাবে আচ্ছন্ন হইবেনা এইশর্তে। চারিত্রিক বৈশিষ্টের গুণাবলীতে, পক্ষপাতশূন্যতা, খোলাখুলি স্পষ্টা ভাবের প্রকাশ ক্ষমতা, সততা, উদারতা, উন্মুক্ত চিন্তা করার শক্তি, সহজবোধ্য, আন্তরিকতা, অকৃত্রিমতা থাকলে তাঁহাদিগকে অকপটু নামে ভূষিত করা যাইতে পারে। ভাবনাতে গোপনীয়তা, কূটনীতি, বিচক্ষণতা ইত্যাদি অকপটুতার পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে। অকপটতা আর স্বেচ্ছাচারের মধ্যিকারের প্রভেদটার নাম জ্ঞান আর সেই ফারাকটা একমাত্র মেরামত করিতে পারে শিক্ষা। পাঠ্যপুস্তকের নীরস অনুশীলনের বাইরে এক পৃথিবী গ্রন্থসাহিত্যের মনিমুক্তের ভান্ডারে নিজেকে নিমজ্জিত করিতে পারিলেই প্রানের শান্তি, জীবনের মোক্ষলাভ।

ধর্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভাবামি যুগে যুগে।

ধর্ম, যাহার আক্ষরিক অর্থ ধারণ করা। প্রতিটি ধর্মই শান্তির বানী প্রচার করিয়া থাকে, যে শান্তি অনুভূত হয় হৃদয়পটে। মনুষত্বের মহত্তম জাগরণই মহৎ অভিব্যাক্তির প্রকাশ। যাহাদের নিকটে ধর্মের অর্থ, যুক্তি আর বাস্তবতার সহিত আবেগের সংমিশ্রণ ঘটাইয়া আত্মিক ঐশ্বর্যকে মহিমান্বিত করিবার পন্থা, তাহাদের নিকটে সংস্কৃতি তথা কৃষ্টি সেই সকল ধর্মীয় আচারের বহিঃপ্রকাশ। স্বভাবতই গ্রন্থসাহিত্য নাম্নী বস্তুসামগ্রীদল উক্ত ধর্মের শাস্ত্রস্বরূপ। বিগ্রহ নিশ্চল স্বভাবগত কারনেই, তথাপি যোগী- তপস্যি ব্যাক্তিবর্গগন বিদিত থাকেন, কোন পদ্ধতিতে বিগ্রহে প্রান প্রতিষ্ঠা করিতে হয়। এই ধর্মের বিগ্রহ অন্তরে প্রেথিত, যাহা যুগে যুগে প্রাসঙ্গিক ও সঞ্চারিত হইতে থাকে শাস্ত্রের সুধামৃত পানের মধ্য দিয়ে। নব্য চেহারাতে অবস্থান্তরিত প্রবাহমান “কৃষ্টি ও সংস্কৃতি” আচারের অকপট প্রকাশ নূতন পীঠস্থানে, উন্মেষের খোঁজে নব আঙ্গিকে কারন আত্মা অবিনশ্বর।

সাহিত্য উৎপাদন অসাধ্য দূঢ়হ। সাহিত্যরচনা ব্যাক্তির মৌলিক গুণ, যাহা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে নির্জ্ঝরনীর মত অন্তর হইতে সৃজন হইয়া থাকে। যাহারা নিজগুনে নিজের সম্মুখভাগের বন্ধুর পথকে মসৃণ করিয়া আগাইয়া গিয়া নিজেকে স্ব-প্রতিভাগুনে উদ্ভাষিত করিয়াছেন, তাহারা প্রাতঃস্বরণীয়। সকলের চরিত্রে সেইরুপ কাঠিন্য থাকেনা, যে তাহারা অদৃষ্টকে আপনার কাঙ্ক্ষিত পথে চালিত করিতে পারিবেন। এই গুণীদের গুণের পৃষ্ঠপোষকতা করিবার সৌভাগ্য অর্জন করিতে পারিলে, সঠিক মঞ্চে উপস্থাপিত করিয়া সমাদর করিবার ব্যবস্থাপনা করিতে পারিলে, এই অনাম্নীরাই মরুতে ফুল ফোটাইতে সক্ষম হইবেন। সাফল্য সর্বদাই অনুশীলনতত্বের উপরে সমর্পিত।

জ্ঞান, যাহার ব্যাবহারিক প্রয়োগ দ্বারাই উন্নতির উন্নতি সাধন সম্ভব। পাঁচটি ভিন্ন পরিসরের মানুষ, তাহাদের ভিন্ন ভিন্ন জীবন দর্শন, চেতনার পরিসরও বিচিত্র। সেই অনুযায়ী জ্ঞানের ধ্রুবক সংজ্ঞা পাইতে গেলে, সেই পৃথক মতাদর্শ, ভাবনা, চেতনা, দর্শন ইত্যাদিগুলো অন্বীক্ষা করিয়া একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে হয়। গ্রন্থপুস্তকই সেই প্রতীতি সমূহের সম্মীলনগাহ। আদিপুরুষ গুহামানবেরা গুহাচিত্র নির্মান করিয়াছিলেন। অতঃপর সমাজের কলেবর যত বৃদ্ধি পাইয়াছে, ততরুপে হরেক বিধিবদ্ধ প্রণালি মোতাবেক সেই ব্যাক্তিজ্ঞান গুলি সংরক্ষিত হইয়াছে। পুরাকালের শিলালিপি, বস্ত্রখণ্ড, পত্রপুঁথি হইয়া কাগজের পুস্তক, এবং বর্তমানের অন্তর্জালের মাধ্যমে শয়নকক্ষে সম্পূর্ণ গ্রন্থাগার সজ্জিত হইয়াছে। পুস্তক শুধুইমাত্র জ্ঞানার্জনের জন্য একটি একমাত্রিক মাধ্যম নহে। ভাবনারা কাগজের হরফে প্রকাশিত হইয়া থাকে পুস্তকে, যেখানে চলমান সমাজের প্রতিচ্ছবি প্রতিফলিত হইয়া থাকে নিরন্তর। কৃষ্টি, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি সকল কিছুই পরম্পরা ভিত্তিক, শ্রুতিউত্তর যুগে সেই পরম্পরাকে নিব্যূঢ়চিত্তে বহন করিয়া চলিতেছে। গ্রাসাচ্ছাদন আশ্রয়াদির জন্য উপযোগী ধনোপার্জ্জন প্রয়োজন। তেমনই মানসিক খোরাক অধিগত হইয়া থাকে গীতবাদ্য, ভাস্কর্য বা ললিতকলার ইত্যাদি মাধ্যম হইতে। এই সকল উপস্থিতিকে উপেক্ষা না করিয়াও বলা যাইতেই পারে, সাহিত্য প্রেমের নান্দনিকতা দ্বারা সৃষ্ট মনোরঞ্জনের আবেদন, হৃদয়বৃত্তিতে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করিবার ক্ষমতা ধারণ করে। যাহার জন্য গ্রন্থসাহিত্যের প্রাসঙ্গিকতা চিরন্তন।

মানব সামাজিক জীব। অরণ্যবাসী গুহা মানব ক্রমউন্নতি সাধনের মাধ্যমে আজিকের কারিগরি কান্ডজ্ঞান সর্বশ্ব পৃথিবীর শীর্ষে আরোহণ করিয়াছে। ইহার মূলে প্রেথিত আছে মানবের কিছু বুনিয়াদি স্বভাব প্রকৃতি। অজানাকে অন্বেষণের আখাঙ্খা, জ্ঞানস্পৃহা, নিরন্তর অত্যুত্তমতার তীব্র অভিলাষ। ভাবনা ভাবিবার ক্ষমতা সকলে ধারণ করেননা, কেহ কেহ সক্ষম হন। একটি স্বপ্ন, যাহা অন্তরের গোপনে লালিত থাকে। সেই একাকি ভাবনা লক্ষ সম্ভাবনাতে পরিপূর্ন হইলেও, তাহা তুল্যমূল্য পার্ষদ ব্যাতিরেকে জড়বৎ। যাঁহারা একই মননে স্পন্দনে স্পন্দিত হইয়া থাকে ভিন্ন মাত্রায় ভিন্ন নামে, তাঁহারাই কেবল সেই অনুরণনের চোরাস্রোত অবলোকন করিতে সমর্থ। সেই কামনার লাভাস্রোত মিলিত হইয়াই সূচিত হয় ক্ষীন প্রবাহের, যাহা ঈপ্সিত লক্ষ্যের সুমুখপানে ধাবিত হয়। নদী আর জীবন, এই দুয়েরই উৎসস্থল বড় বন্ধুর। বহু চড়াই উৎরাই বন্ধুর পথ অতিক্রম করিতে হয় সমতল ভুমিতে কুলুকুলুরবে প্রবাহিত হইবার অভিপ্রায়ে, যাহার তীরে সভ্যতা বসতি স্থাপন করিয়া থাকে। দিশা সঠিক না হইলে সেই নদী বা জীবনও পথ হারায়। কালের নিয়মে তথায় সংস্কার সংগঠিত না হইলে আবর্জনা আর বর্জ্যের ভীরে জীবন নদীর গতিরুদ্ধ হয়। অন্তরের শক্তিপুঞ্জই সেই দূষণ শুচিশুদ্ধ করিতে সক্ষম। ধর্ম যেথায় কর্মের রূপ, জীবন তথায় গৌরবের প্রত্যক্ষমূর্তী। ঐক্যের ধর্মই প্রানের ধর্ম, জীবনের মন্ত্র।

অকপট সাহিত্য পত্রিকা সেই সম্ভাবনাময় জীবনের নাম।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *