(১)

বৈশাখের ভোরবেলা। সারাদিনের ফোসকা ওঠা তপ্ত দহনের পরে শেষরাতে তুমুল বেগ নিয়ে ঝাঁপিয়ে এসেছিল কালবৈশাখী। পৃথিবীর বুক আকন্ঠ তৃষ্ণায় সারারাত পান করেছে ঘোর বর্ষারূপী অমৃতসুধা। এমনই আপাত শীতল বৈশাখী ভোরবেলায় সারাদিন দরদর করে ঘামতে থাকা দেহগুলি আর একটু বেশী ঘুমের আবদার করেই ফেলে।

নীলার অবশ্য এত আয়েশ করে ঘুমানোর সুযোগ নেই। তার এক সপ্তাহ পরেই তার ফার্স্ট ইউনিট টেস্ট। ক্লাস নাইনে উঠে যেন সে সব ধোঁয়াশা দেখছে। স্কুলের দিদিমনিদের পড়ানো তার মাথার ওপর দিয়ে চলে যায়। গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো প্রাইভেট টিউশনিও নেই তার। তার কানে বাজছে ক্লাস টিচারের কথা, “ইউনিট টেস্টের আগেই সব প্রজেক্ট খাতা জমা দিবি বুঝলি । নাহলে পরীক্ষায় বসতে পারবি না।” সাত সাতটা প্রজেক্ট বই কিনতে হবে তাকে। কোথায় পাবে সে এত টাকা ! বাবাকে সে কদিন থেকেই বলছে। আর মা তো তার কোনো কথা শুনেও শোনে না। কী হবে তাহলে ! এক অজানা শঙ্কায় সে যেন সংকুচিত হয়ে গেল। চাওয়া আর পাওয়ার বিস্তর তফাতেই হয়তো মন ও শরীর এভাবেই সংকুচিত হয় !

(২)

একটু আলো ফুটতেই নীলার মা, বাসন্তী উঠে পড়লো। মুখুজ্জে বাবুর বাড়িতে সকাল সকাল না গেলে তার বউ এর আবার মুখ হাঁড়ি হয়ে যায়। চায়ের জলটাও তাকে গিয়ে চড়াতে হয়। দরজা খুলে বেরোতেই ঠোক্কর খেয়ে পড়লো দোরগোড়ায় শুয়ে থাকা সুবলের ওপর। পড়তেই প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে চিৎকার করে উঠলো, “মাল খেয়ে এ দোরগোড়াতেই তোকে পড়ে থাকতে হলো। মরার আর জায়গা পেলি না। জীবনটা জ্বালিয়ে খেল গো এ মরদটা।” এত চিৎকারে নীলা ঘর থেকে ছুটে এলো। নীলার মা রাগে গজগজ করতে করতে বালতিটা নিয়ে চলে গেল প্রয়োজনীয় কাজ সারতে। ততক্ষণে সুবলের ঘুম ভেঙেছে কিন্তু ঘোর কাটেনি। নীলা আলতো গলায় ডাক দিল, “বাবা ! তোমার কোথায় লাগলো নাকি বাবা ! ” নীলা একটু এগিয়ে আসতেই সুবল লাফিয়ে উঠলো, ” আমার কাছে আসিস না মা। আমাকে ছুঁস না। আমি আগে ডুব দিয়ে স্নানটা সেরে আসি মা। তারপর আসিস। “

নীলা তার বাবার এমন আচরণ প্রায়ই দেখে। সে সবই জানে কেন সুবল এমন সকাল সকাল তাকে দূরে ঠেলে দেয়! অথচ এই সুবলই তাকে প্রাণের চেয়েও বেশী ভালোবাসে। আত্মীয়-অনাত্মীয়দের গর্ব করে বলে, “নীল পুজোর দিন জন্মেছে গো আমার মেয়ে । তাই তো নাম ‘নীলাম্বরী’ রেখেছি।” আদরের ডাকে তা হয়ে গেছে নীলা। সুবলের আন্তরিক ইচ্ছেতেই তো নীলা স্কুলে পড়ছে। নাহলে বাসন্তীর তো কোনো ধ্যানই নেই। সে সংসারের যত অভাব অনটনেই নিজেকে পিষে যাচ্ছে সেই ছোট থেকেই। নীলার পড়াশোনাটা তার কাছে বাহুল্যতা আর সুবলের ভীমরতি ছাড়া আর কিছু নয়। বাস্তবের পলিমাটি যখন শক্ত পাথরের মতো হয় তখন তাতে ফসলের অপত্য স্নেহটাও বোধহয় হারিয়ে যায়। নীলার প্রতি বাসন্তীর অনুভূতি, এমনটাই হয়তো !

(৩)

বাসন্তী সকাল সকাল কাজে যায়, বাপ-বেটির জন্য যাইহোক দুটো রাঁধে নীলা কচি হাতেই । কাজ সেরে চারটি ভাত মুখে তুলে নীলাও বেরিয়ে পড়ে স্কুলের জন্য। কিন্তু সুবল সেই যে কখন স্নান করতে গেল তখনও ফিরলো না। নীলা মুখ গোমড়া করে ভাবছে, “আজও প্রজেক্ট বই এর কিছু হলো না। বাবা এখনও এলো না।” ভাবতে ভাবতেই দরজার দিকে আসতেই সুবল হাজির ভিজে গায়ে। নীলা কিছু বলতে যাওয়ার আগেই সুবলই বললো, ” জানি মা তোর বই লাগবে। আজ কিছু একটা ব্যবস্হা করে তোর বই আনবোই রে নীলা।” কথাটা শুনে নীলার খুশি হওয়ার থেকে চিন্তিত হয়ে পড়লো বেশী। “কী জানি কি করবে বাবা ! ” , মনে মনে আওড়াতে আওড়াতে স্কুল চলে গেল নীলা। মনে তার থেকে গেল না পাওয়ার তৃষ্ণা আর এক অজানা শঙ্কা।

ভিজে গায়েই হাঁড়ি থেকে ভাত নিয়ে গোগ্রাসে গিলছে সুবল। নেশা কাটলে ক্ষিদের প্রতাপ হয়তো বাড়ে তা তখনকার সুবলকে দেখলেই বোঝা যায়। সবে ভাত শেষ করে চুলটায় একটু চিরুণী দিচ্ছে ওমনি তার নোকিয়া ১২০০ বেজে উঠলো।
– হ্যালো
– কোথায় আছো সুবল দা ?
– এই তো ঘরে।
– চলে এসো তাড়াতাড়ি। আজ পাঁচটা কেস আছে।
– পাঁচটা ! কিন্তু আজকাল তো আমি এক-দুটোর বেশী করতে পারি না। মনটা আর টানে না রে।
– ধুস কী যে বলো সুবলদা ! ভালো বখশীষ পাবে গো। একটা পার্টির অবস্হা বেশ ভালো ।
– বলিস কী !
– তুমি চলে এসো এক্ষুনি । বিকেলের মধ্যেই সব ডেলিভারী দিতে হবে।

ফোনটা কেটে একমুহূর্তেই সুবলের মাথায় এলো নীলার বই কেনার কথা। ভাবামাত্রই জামাটা গলিয়েই ঘর লাগিয়ে চাবিটা পাশের বাড়ি দিয়ে বেরিয়ে পড়লো সুবল।যাওয়ার পথে ভুপেনের দোকান থেকে দু বোতল চোলাই নিল। পয়সাটা বাকি রাখলো রোজকার মতোই। দোকান ছাড়ার আগেই কয়েক ঘোঁট পেটে ঢুকিয়ে মহুকুমা হাসপাতালের দিকে রওনা দিল সে।

(৪)

অল্প অল্প টলছে পা সুবলের, মাথাতেই যেন এক ঘোর নিমেষেই কব্জা করে নিচ্ছে তাকে। সেই ঘোরেই বিড়বিড় করে বলতে থাকে সে, “আমি সুবল ডোম। লাশ কাটা আমার পেশা। আমার মনে কোনো দয়া-মায়ার জায়গা নেই। নিমেষেই চিড়ফাড় করে দিতে পারি আমি তরতাজা এক লাশকে। আমার বাপও লাশ কাটতো । আর আমিও…….” হঠাৎ তার পা আরও বেশী টলতে লাগলো। বসে পড়লো সে হাসপাতাল মোড়ের বটতলায়। মন থেকে ডুকরে উঠলো তার যেন এক দীর্ঘশ্বাস। লাল হয়ে যাওয়া চোখে শূন্যে তাকিয়ে মনে মনে বলতে লাগলো, ” এ কাজ আমি আর পারি না মানতে। ডোমের ছেলে হলে কী ডোমই হতে হয় ! দুনিয়াতে এতকাজ থাকতেও অন্যকাজ কেন পারি না…….. কেন পারি না ! ” শহরতলির এক পায়রার খুপরির মতো ছোট্ট বাসার ভাড়া জোটাতে আর দুবেলা তিনজনের পেট বাঁচাতেই সুবলের রোজগারও কুলোয় না। তার ওপর এমন কাজ সে মেনে নিতে পারে না। সেও চেয়েছিল অন্য এক জগৎ। যেখানে থাকবেনা রোজ রোজ মানুষ কাটার সাধ্যি। দুপুরের প্রখর রৌদ্রতাপে ঝলসে যাচ্ছে তার শরীর…….. ঝলসে যাচ্ছে তার মনও। আর যেন সে তলিয়ে যাচ্ছে বাস্তবতার নিগূঢ় গহ্বরতলে। এক জীবনে চরম বাস্তবতাই মানুষকে হাজার বার মরতে বাধ্য করে। সুবলও যেন সেই পথেরই পথিক। তাই তো সে চায় নীলা হয়ে উঠুক তার সব অপূর্ণতার পূর্ণতা।

মোবাইলের রিংটোনে হুঁশ ফিরলো তার। কানে ভেসে এলো নীলার কন্ঠস্বর যেন, “আমার বই না পেলে পরীক্ষা দিতে পারবো না বাবা……” প্রায় অবশ হয়ে যাওয়া পায়ে হঠাৎই বল পেয়ে গেল সে। ফোনটা ধরেই দৃঢ় গলায় বলে উঠলো, “এসে গেছি। রেডী কর বডিগুলো।”

(৫)

মর্গে ঢুকলেই ডোমদের সমস্ত মানবিক গুণ প্রশমিত হয়। তাদের চোখে-মুখে-হাতে-আচারে-ব্যবহারে চরম পেশাদারিত্ব ফুটে ওঠে। । লাশ কাটার সাথে সাথে লাশের মরণের কারণ নিয়েও নানান কাটাছেঁড়াও চলে তাদের। সঙ্গে থাকে চোলাই এর বোতল। সুবলও তার ব্যতিক্রম নয়।

ততক্ষণে ডাক্তার বাবু হাজির হয়েছেন। গলায় আরও দু ঢোঁক ঢেলে একটা বিড়ি ধরিয়ে হরেনকে শুধালো সুবল,
– কী কী কেস রে আজ? মেয়ে বডি আছে নাকি !
– তিনটে অ্যাক্সিডেন্ট। পুলিশে বলল একটা আগুনে পোড়া আর একটা রেপ কেস গো দাদা।
– নে নে শোওয়া এক এক করে। রাম, দুই তিন করে শুরু করি।
– এই তো প্রথমটা রেডি।
– কোন পার্টি বকশীষ দেবে বলেছে?
-৫ নাম্বার বডির পার্টি বেশ মালদার। ভালো সেলাই দিতে বলেছে। ভালো বকশীষও দেবে।

এই হচ্ছে মানবজীবন। বেঁচে থাকা অবস্হায় দাম পাক না পাক, লাশ হয়ে গেলে ঠিক তার দরদাম শুরু হয়ে যায়।

এক এক করে একদা সাধ করে সাজানো শরীরে ছুরি চলতে থাকে। হাতুড়ির ঠুকঠাক শব্দে খুলে যেতে থাকে জীবন্ত অবস্হায় হাজারো জল্পনা-কল্পনা ধারণকারী মাথার খুলিগুলি। বস্তা সেলাইয়ের মতো ছুঁচ-সুতোর টোপ পড়তে থাকে ছিন্নভিন্ন দেহগুলিতে। সুবলের হাত চলছে দুরন্ত গতিতে। নেশায় রক্তিম চোখে এক অভিজ্ঞ ডোমের দৃষ্টি। গলায় রঙিন জলের তৃষ্ণা। এক এক করে চারটে বডির পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট ডাক্তার লিপিববদ্ধ করতে থাকেন। কানের গোঁজা বিড়িটা বের করে ধরিয়ে নিয়ে হরেনকে বললো,
– নে নে শেষটা শোওয়া, দেরী করিস না। বোতল শেষ হতে চলল। এটা কী কেস রে !

পাশে দাঁড়ানো পুলিসের একটা কনস্টেবল বলে উঠল-
– এটা রেপ কেস রে… একেবারে বাচ্চা মেয়ে। বড়লোকের একটাই মেয়ে, স্কুলে পড়ত। নোট আনতে টিউশন মাষ্টারের কাছে গেছিলো। সব্বনাশ করে জানটাই মেরে দিল মেয়েটার জানোয়ারটা।

কথাটা শোনামাত্রই বিড়িটা মুখ থেকে পড়ে গেল সুবলের। কাছে এসে আধঢাকা লাশটার মুখের দিকে তাকালো সে। একদৃষ্টিতে চেয়ে থাকলো….. বেশ কিছুক্ষণ। নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করে বলতে লাগলো সে, ” চোখদুটো সেই একইরকম টানা টানা। গায়ের রঙটাও সেই সোনা রঙ। মুখের আদলটাও এত আপন !” হাতের আঙুলের দিকে তাকিয়ে অস্ফুটে বলতে থাকে, ” এগুলো তো সেই আঙুল যা আমি ছোটবেলায় ধরে হাঁটতে শিখিয়েছি।” হঠাৎই ডুকরে উঠে লাশটির বুকে মাথা রেখে তীব্র আর্তনাদ করে উঠলো সে, “নীলা…..”
যে লাশটা রক্তে ভাসার কথা ছিল সুবলের চাকুতে, এই মুহূর্তে সে নিজেই ভেসে গেল সুবলের চোখের জলে।

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা হরেন দরদর করে ঘামছে। কিছুই বুঝতে পারছে না কী দেখছে সে ! এ কোন সুবল ? ডাক্তার বাবুও রীতিমতো অবাক। পুলিসের কনস্টেবল গুলো বেশ বিরক্ত।

(৫)

মিনিট দশেক কেটে গেছে। ডাক্তারবাবু বাইরে দাঁড়ানো পুলিশের সাথে জরুরী কথাবার্তা সারতে গেছেন। রেপ কেস বলে কথা, অনেক কাগজ বানাতে হবে ! হরেন তখনও ঠায় দাঁড়িয়ে দেখছে সুবলের সেই অদ্ভুত অযাচিত মায়াকান্না। চারিদিকে ছড়ানো ছেঁটানো কাটা-গোটা লাশ, বাতাসে মর্গের উদ্ভট অসহ্য গন্ধ, রক্তে লেপা ছুরি-কাঁচি-ছুঁচ সব যেন সাক্ষী সেই দৃশ্যের। এমন এক অমানবিক পরিবেশে এক ডোমের এত মানবিক কান্না সত্যিই যেন এক অবিস্ময়কর।
ডাক্তার বাবুর হঠাৎ পুনঃপ্রবেশে হরেন উদ্যত হলো সুবলকে সামলাতে। এক ঝটকায় টেনে তুললো সে মেয়েটের লাশ থেকে তাকে।

-কী ব্যাপার ! দেখি একটু ( এই বলে মেয়েটির লাশটি চেক করতে থাকলেন আঘাতের চিহ্নগুলো দেখার জন্য)। নে হরেন শুরু কর এবার। 
– আজ্ঞে স্যার এক্ষুনি হয়ে যাবে। আসলে সুবল দা একটু অসুস্হ আজ।
– তোর কথাতেই তো আজ সুবলকে ডাকলাম। নাহলে ফটিক তো রেডী ছিল।
– এ বডিটা তাহলে ওনাকে দিয়েই করিয়ে নেন স্যার। সুবল দা একটু……..
– কিন্তু তোর কথাতেই তো টেন্ডারটা দিলাম।
– ও স্যার একটু……
– বুঝেছি নেশা জোর চেপে গেছে। এই তোদের দোষ। যা পালা তোরা। ফটিক বাইরে গাছতলায় মাল টানছে পাঠিয়ে দে যা।
– আজ্ঞে স্যার।

হরেন মূর্তমান সুবলকে সেই দমবন্ধ পরিবেশ থেকে হিড়হিড় করে টেনে বাইরে নিয়ে এলো। প্রবল এক ঝাঁকুনি আর একমগ জলের ঝাপটা দিয়ে সুবলের হোঁস ফেরালো সে।
– তোমার হয়েছে টা কী সুবল দা? আজ ১০ বছর ধরে তোমার সাথে আছি । কোনোদিন তো তোমায় এমন দেখিনি ! ও সুবল দা ( আরো একবার দুই কাঁধ ধরে ঝাঁকিয়ে)
– নীলা মর্গে শুয়ে কেন! ও কে কী……….!
– কে নীলা? ও নীলা নয়। তোমার নীলা এখন স্কুলে আছে হয়তো। এই তো সাড়ে তিনটে বাজে। তুমি কী নীলাকে চেনো না ! বুঝেছি আজ নেশা সত্যিই ভালো চড়েছে।
– ও নীলা নয়?
– না। ও এক বড় ঘরের মেয়ে। তোমায় বললাম তো তখন !
– তবে যে চোখ, হাত, গায়ের রং সব নীলার মতো ?
– তোমার কী হয়েছে সুবল দা ? চলো বাড়ি চলো।
– তবে ও অন্য কোনো সুবলের নীলা তো। ঐ মেয়েটিও পড়তেই চেয়েছিল। কিন্তু তার কপালে জুটলো রেপ ! নীলাও তো পড়তে চায়। তবে কী কোনোদিন এমনভাবেই আমাকে নীলার লাশ কাটতে হবে ?

সুবলের এমন প্রশ্নে হরেন স্হির হয়ে যায়। তারও চোখে এক মুহূর্তে ভেসে ওঠে তার দু বছরের মেয়ের মুখটা। সুবল ও হরেন সমাজের এক আপাত প্রচারে না থাকা শ্রেনীর মানুষ। তাদের মনে মস্তিষ্কে আজ ঘাপটি মেরেছে সমাজে বহুল প্রচারিত দুর্ঘটনা — রেপ।

(৬)

হাসপাতাল লাগোয়া ফুটপাথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে দুজন – সুবল ও হরেন। বিকেল গড়িয়ে এসেছে।রাস্তা দিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে মানুষের ব্যস্ততা। তখনও তীব্র রোদের আতাশ বাতাসে জড়িয়ে। দরদর করে ঘামছে মানুষজন। এক অসহ্য গুমোট চারপাশে। ডোম পাড়ার মোড়ে ঢুকতেই শোনা যাচ্ছে সন্ধ্যা দেওয়ার শাঁখের আওয়াজ। দু হাত এগোতেই বাসন্তির সাথে দেখা হলো দুজনের। দুজনের এমন নিশ্চুপতা তাকেও অবাক করলো। তার সাথে সুবলের এমন অপ্রকৃতিস্থ অবস্হা তার মনে অর্থহীন প্রশ্ন জাগিয়ে তুললো। বাসন্তী কিছু শুধানোর আগেই হরেন তাকে সব ঘটনা খুলে বললো। রাস্তায় খাপছাড়া হয়ে হাঁটতে থাকা তিনটে মানব-মানবীর মধ্যেও বাতাসের গুমোট পরিবেশটা আরও তীব্রভাবে ঘিরে ধরলো। স্তব্ধ, নিস্তব্ধ চারিদিক যেন। গভীর কালো মেঘ পূব আকাশে ছেয়ে এলো। মুহূর্তেই যেন নেমে আসবে এক তুমুল ঝড়।

নিস্তব্ধতা ভাঙলো নীলার প্রাণোচ্ছ্বল আওয়াজে। কখন যে বাড়ির এক চিলতে উঠোনে পৌঁছে গেছে তারা বুঝতেই পারেনি। নীলার কন্ঠে খুশির আবেশ, “বাবা তোমরা এসে গেছো! আরে হরেন কাকু তুমিও যে !” বাসন্তী কোমল ভাবে বললো, ” সন্ধ্যে হয়ে গেছে মা। ঘরে ঢোক।” বাসন্তীর এমন নরম ব্যবহার নীলাকে একটু অবাকই করলো। সে তোয়াক্কা না করেই সুবলের দিকে এগিয়ে এলো একটু সাবধানেই। নীলা জানে এখন তার বাবা তাকে ছোঁবে না। গলায় দলাপাকানো আনন্দ নিয়ে সে বলে উঠলো,”বাবা আমার প্রজেক্ট বই আর লাগবে না। যোগাড় হয়ে গেছে। আমার দিদিমনিরাই যোগাঢ় করে দিলেন।” নির্বাক চাহুনিতে সুবল তার প্রাণের টুকরো নীলাকে প্রবল উষ্ণতায় ও অজানা ভবিষ্যতের আবছা আশঙ্কায় আঁকড়ে ধরলো। যেন সে সকল কষ্ট থেকে এইভাবেই আঁকড়ে ধরে তাকে বাঁচাবে। জগতের সকল পিতাই হয়তো এভাবেই তার সন্তানকে আঁকড়ে রাখতে চায়।

হতভম্ব নীলা। তার লাশকাটা বাবা লাশ কেটে এসে আজ প্রথমবার স্নান না করে তাকে ছুঁয়েছে। এ ছোঁয়ায় আজ যেন অন্যমাত্রা। নীলা অনুভব করছে তবু বুঝে উঠতে পারছে না কী !

(৭)

মেঘের ঘনঘটা আরও বাড়লো। আকাশের বুক চিরে খেলে গেল বিদ্যুতের রেখা। উত্তপ্ত বাতাসে শুরু হলো বাঁধহীন রেষারেষি। উঠোনের তুলসী তলার প্রদীপের শিখা টলটল করতে থাকলো। ধেয়ে এলো কালবৈশাখী।
উন্মত্ত বাতাসের আনাগোনায় আরও সতর্ক হয়ে গেল সুবল। আঁকড়ে ধরেই নীলাকে ঘরে নিয়ে এলো। ঘরের খোলা জানালার কপাটগুলি অবাধ্য হয়ে উঠেছে যেন ! অন্ধকার ঘর মাঝেমধ্যেই আলোকিত হয়ে উঠছে। চুড়ান্ত তৎপরতায় সকল অগোছালো অবাধ্য কারণগুলিকে গুছোতে লাগলো বাসন্তী। কিন্তু প্রকৃতির অবাধ্যতা রুখবে এমন সাধ্যি কার !

হ্যারিকেন জ্বাললো বাসন্তী। অদূরে পিঁড়েতে বসে হরেন। আর ঘরের মেঝেতে শক্ত বাহুডোরে বাঁধা হয়ে বসে আছে হয়তো এই মুহূর্তে পৃথিবীর সুরক্ষিত মেয়ে। কিন্তু এ সুরক্ষা কত দিনের বা কত ক্ষণের ? এ প্রশ্নের উত্তর কে বা দেবে! বাসন্তীর চোখে বেয়ে এলো শীতোলষ্ণ ধারা। তার আপাত কঠোর প্রাণে আজ এ কেমন মমতার ফল্গুধারা জেগে উঠেছে ! সে নিজেও বুঝে উঠতে পারছে না।

বাসন্তির সাথে তাল মিলিয়েই শোঁ শোঁ আওয়াজে ঝড়ের শেষে নেমে এলো শীতল বৃষ্টি। সারাদিনের ঘর্মাক্ত ত্বকে এলো স্বস্তির ছোঁয়া। এক দগ্ধ পোড়া দিনের পরিসমাপ্তি। আজকের দহন জ্বালা জুড়ালো হয়তো ক্ষনিকের জন্য কিন্তু কাল কী ! 
এ প্রশ্ন সুবলের, বাসন্তীর, হরেনের, নীলার আর তার সাথে জ্বলন্ত পৃথিবীর বুকে বাসা বাঁধা প্রতিটি প্রাণের।

কাল কী !

শেহনাজ আলম

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *