© সুব্রত মন্ডল

পর্ব- ১


ট্রেনটা যখন পুনে স্টেশন ছাড়ল সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে ।   ট্রেনে সিটের পজিশান যা খুশি হোক দুটি জানলা আমার মা আর মেয়ের দখলেই থাকে।  দুপুরে ভাতঘুমের তন্দ্রার ফাঁকে, মায়ের সামান্য গচ্ছিত সম্পদ কেউ একজন হাতিয়েছে ।  কত কি ঠিক খোয়া গেছে জানতেও পারছি না, সামলে নেওয়া যাবে।  তবুও হাত খরচা বাঁচানো সঞ্চয় বলে কথা।  নিষ্ফল আক্রোশে মা তখনও ফুঁসছেন, আমি আর ঘাঁটালাম না।   সারাটা রাত এখনও ট্রেনেই কাটাতে হবে ।  

ট্রেন চারটে পঁচিশে যখন পুনের প্লাটফর্মে এল, পাশওয়েতে তখন খুব হুড়োহুড়ি আর ধাক্কাধাক্কি।  সহযাত্রীকে ফিরে দেখার সময় থাকেনা, যে কোন উপায়ে লাগেজ সমেত সবাইকে ট্রেনে অন্তত উঠতে হবে, তারপর বাকি সকল কিছু।   হাঁকডাকের বহর আর ভাষা শুনে বুঝলাম এক বাঙালি পরিবারও উঠল।  আমার আবার কাজ বাড়ল, নিজের ব্যার্থতা অপদার্থতা আর অসহায়তা মায়ের সামনে লুকোবার প্রানান্তকর চেষ্টার সাথে সাথে, লাগেজ গুলোকে ভাগাভাগি করে নিচের সীটের তলায় চেন দিয়ে বাঁধার পূনর্বিন্যাস চালিয়ে যাচ্ছি।  আমার শ্রীময়ী কটমটে দৃষ্টিতে গোটাটার তদারকিতে।  

রাস্তা ঘাটে পরিচিত মানুষ বেশী একটা পচ্ছন্দ করিনা, তাতে পরিবারের সাথে সময়টা কম পরে যায়, আর ভিনরাজ্য ভ্রমনে বাঙালী সহযাত্রী হলে তো কথাই নেই- 
” কোথায় থাকেন” 
 “ও মা ! কোলকাতা” 
“কোলকাতার কোথায়? “
“আমার বাড়ী না- সোদপুরে ” 
“আপনাদের দক্ষিন কলকাতা! ওখানে আমার মাসি থাকে ইত্যাদি ইত্যাদি।  


পশ্চিমঘাট পর্বতমালাকে ডান দিকে রেখে ছুটে চলেছে ট্রেন ।  কোষ্টাল মহারাষ্ট্রর সাথে এদিকের বহু পার্থক্য , এটা বৃষ্টিছায়া অঞ্চল আর রুক্ষ।  এতদিন এসব অঞ্চলের নাম লোকসভা ভোটের ফল বার হবার শুনতাম, – ” সাতারা ” বড় শহর! কিন্তু  মা পর্যন্ত বলে উঠল- পাঁশকুড়ার এর থেকে বড়! স্টেশনটা দেখেই ভক্তি হেবেনা।  ট্রেনের জানলা দিয়ে ভারত দেখার সুযোগ হাতছাড়া করতে মা রাজী নয়।   সোজা হিসাব “পয়সা দিয়ে কি ঘুমোতে এসেছি ? খানিকটা বয়স জনিত কারনেই রেলযাত্রায় মা প্রায় গোটা রাস্তাটাই জেগে থাকে, যদিও তার পরেও ছিনতাই।  নিজের বাঙ্কের দু দিকে মা আর আমি, ঠাকুমার মাথার উপর নাতনি আর আমার উপরের বাঙ্কে শ্রীময়ী।  অন্ধকার নেমে আসছে , দু একবার পাশ হয়ে যাওয়া ছোট ছোট স্টেশনের ম্যাড়ম্যাড়ে আলো গুলো ছাড়া সেভাবে আর কিছুই দৃশ্যমান নয়।  

মা ষাটোর্ধ আমুদে মানুষ হলেও আড্ডামহলাতে আট থেকে আশি সকলের সাথেই ফিট।  রেল কামরার যে কোন খোপে একটা বাঙালি পরিবার থাকলে, তাদের সাথে চটকরে কুটুম্ব পাতিয়ে,  মোটামুটি নিজের আর সেই কুটুম্বের হাঁড়ির খবর লেনদেন করে ফেলাটা তাঁর চিরকালীন অভ্যাস।  আমার অপছন্দ হলেও, এক্ষেত্রেও এর কোন ব্যাতিক্রম ঘটলনা।  সহযাত্রীর সাথে গল্পের সুবিধার্থে মা উল্টোদিকের সিটের একেবারে ঐ কোনায় যাওয়াতে আমার শিকেতে জানালার জুটে গেল।  অন্তত আগামী তের ঘণ্টার অকপট মজলিস।  কন্যারত্ন যথারীতি আমার উল্টো দিকের জানালাতে, তার ডান পাশে একটি ফুটফুটে বাচ্চা ছেলে শিশুসুলভ ক্রীড়াতে মত্ত।  টুকটাক দু দিক থেকেই কথাবার্তা কানে কর্নস্থ করার ফাঁকে,  ট্রেনের রুট চার্ট, অ্যাটলাস আর গোয়ার ইতিহাসে চোখ বোলাচ্ছি।  বাচ্চারা ডোরেমন নিয়ে কথা বলছে, তাদের ভাষা ইংরাজী।   আশ্চর্য সেটাতে নয়, পরের ঘটনাক্রমে।  আমার স্ত্রীও শ্বাশুড়ির সাথে সেই পি.এন.পিসি পার্টিতে অংশ নিয়েছে।  এটাই ট্রেন জার্নির মাহাত্ত্ব।


-মা ক্ষিদে পেয়েছে 
ইতিমধ্যেই ঘড়ি রাত আটটার কাঁটা ছাড়িয়েছে,  পরিস্থিতি অনুধাবন করে কুটুম্ব ভদ্রমাহিলা শিশুটিকে নিয়ে আপন সীটে ফেরৎ গেলেন।  মেয়ে তার শিশুবন্ধুকে আশ্বস্ত করল- “এখুনি আসছি “।

বাড়িতে সবাই এক ছাদের তলায় থাকি কিন্তু খাওয়ার সময় সকলের আলাদা আলাদা।  চলন্ত ট্রেনের পাওনা কিন্তু এই সাথটুকুই।  হাতধুয়ে মেয়ের হাত ধরে প্যাসেজের বেসিন থেকে ফিরছি , মেয়ে হাত ছাড়িয়ে সটান ঢুকে গেল একটা খোপে।   ঘুরে দেখলাম সেই বাঙালি পরিবার, এরা প্রায় আমাদেরই মতই নিউক্লিয়াস।  শুধু এদের বাচ্চাটি একটু ছোট, সেই ডোরেমন বাচ্চাটি।   বাচ্চাটা এতক্ষন মায়ের সাথে দুষ্টুমি করছিল, প্রায় সমবয়সী বন্ধু ফেরৎ আসাতে খুশি হয়ে- নিজের আর তার মায়ের মধ্যে জায়গা করে দিল।  মায়ের সেই কুটুম্ব মহিলাটি তাঁর ছেলের সাথে আমার পরিচয় করে দিলেন।  কিছুটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমাকে সম্মান রক্ষার খাতিরে বসতেই হোল সেই ভদ্রলোকের পাশে।  এদেরও প্রায় আমাদের মতই পরিবেশ, বাচ্চাটির মা জানলার দিকে মুখকরে কাঁচের ভিতর দিয়ে কিছু অন্ধকার করছেন।   তাঁরা মা ছেলেতে গল করে যাচ্ছেন, মাঝে মধ্যে আমার মতামত চাইছেন,  এভাবে কিছুক্ষন পর বাধ্য হয়ে মেয়েকে ডাকলাম- চল মা, ওখানে মা ঠাকুমা অপেক্ষা করছেন।   

গলার আওয়াজ শুনে বাচ্চার মা, ভদ্রমহিলাটি আমার দিকে মুখ ঘোরালেন।  পাসওয়ের ঝাপসা সাদাটে আলোর সামান্য ফিনকি তার মুখটুকু দৃশ্যমান করছে।  চোখাচোখি হতেই শিরদাঁড়াতে তীব্র বিদ্যুৎপৃষ্ট হওয়ার মত অভিঘাত অনুভব করলাম।  ট্রেন ৭০-৮০ কিমির স্পিডে সমুখপানে চললেও, আমি এক লহমাতে সেই আবছা সাদা আলোকের গতিতে ছুটে চললাম পিছনপানে।  যৌবনের কুঞ্জবনে কাটানো স্মৃতি সমুদ্রের বুদ্বুদে ঢাকা পরে গেলাম।  কয়েকটা মূহুর্ত মাত্র, পা যেন সিমেন্ট দিয়ে বাধিয়ে দিয়েছে।  “পাপা চলো” ডাকে সম্বিৎ ফিরে এলো।  বয়স্কা মহিলা ও সেই ভদ্রলোকটির সাথে আলঙ্কারিক সৌজন্য বিনিময় করে ফিরে এলাম।  শরীরটা মেয়ের সাথে চলে এলেও, মনটা ওই পাশের খোপের সাদা লাইটের কিরণের সাথে মিশে গিয়ে সমানে সেই মুখচ্ছবিটিতে প্রতিসারিত হতে লাগল।  নাহ, বার্থে শুয়ে শুয়ে আর এটল্যাস বা গোয়া গাইডের পাতা উল্টাতে মন চাইছিলনা।  স্মৃতি, ক্রমশ তার আবছা হয়ে আসা ফাইলগুলোর ধুলো সাফ করে, আমার সচেতন মনের টেবিলে হাজির করে প্রতিটি পৃষ্ঠা পুনঃস্মরণ করার হাতছানি দিচ্ছে।

আমাদের খোপ অন্ধকার, দু দিক থেকেই পর্দা ভেদ করে মৃদু আলোর আভা আসছে।  রাত্রি সাড়ে দশটা, কাঁচে চোখ লাগিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম।  মিরেজ জংশন পারহোল , মহারাষ্ট্রের শেষ স্টেশন।  বিছানা আর আমার ঘুমের সম্পর্ক সমানুপাতিক সে বাড়ী হোক বা ট্রেন, কোন ফারাক নেই।  রায়বাগ , বেলগাঁও দিয়ে ক্যাসেল রক পেরিয়ে চলেছি।  রাত তিনটে চোখে তবু ঘুম নেই,  কর্নাটক বর্ডার পার হয়ে পূর্ব দিক দিয়ে গোয়ায় ঢুকলাম।  অজানা উৎকণ্ঠাতে বারবার জল খাচ্ছি, সকলের গায়ের কম্বল চেক করছি, লাগেজগুলো চেক করছি।   আপার বাঙ্কে স্ত্রী নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে।  মাঝে মাত্র একটা পলকা দেওয়াল, দুপাশে দুটো আলাদা পৃথিবী।  বারেটা বছর বড় কম সময় নয়।  

পর্ব -২

ভূগোল, ইতিহাস, এ্যানথ্রোপলজি না জেনে কোন অঞ্চল ভ্রমণ আসা উচিৎ নয় তাতে মানুষ ও প্রকৃতি দুজনকেই চিনতে অসুবিধা হয় ।  গোয়া রাজ্যের উত্তর প্রান্তে মহারাষ্ট্র ,পূর্বে আর দক্ষিনে কর্নাটক আর পশ্চিম দিকে গোটাটাই বীচ আরব সাগরের উপর।  দুটি জেলা , নর্থ আর সাউথ।  ট্রেন রাজ্যে সাউথ জেলা দিয়ে ঢুকছে ।   নর্থে ছটি তালুক – পারনেম, বিছোলিম, সাত্তারি, বার্ডেজ, তিসত্তয়াড়ি  এবং পোন্ডা।   আর সাউথে পাঁচটা- স্যালসেট, মার্মাগাঁও, ক্যানাকোনা, কুয়েপেম, ও  স্যানগুয়েম।   নর্থে তিনটে আর সাউথের চারটে তালুকের মধ্যেই সব বীচ গুলো, লম্বাতে ১০১ কিঃমি।  ট্রেন সামান্য লেট চলছে , সাড়ে ছটায় মনে হয় মাড়গাঁও ।  কুয়েপেন তালুকের চার্চোরেম স্টেশন পার হলেই প্রায় এসে যাওয়া।  আসলে টিকিট ছিল ভাস্কো ডা গামা অবধি , ভাস্কো দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ন সমুদ্র বন্দর ও রাজ্যের বৃহত্তম শহর , এর অদূরেই রাজ্যের একমাত্র এয়ারপোর্ট ডাবোলীন।  ফ্লাইট নিতেই পারতাম তাতে জীবনের অনেকটা রস অপূর্ণ থেকে যেত।   

সবাই প্রস্তুতি নিচ্ছে মাড়গাঁও নামার, আমিও এক গোয়ানীজ ভদ্রলোকের সাথে কথা বলে বুঝলাম এখান থেকেই মীরামার যাওয়া সুবিধাজনক।  বেশীর ভাগ গাড়ীস্ট্যান্ড এখানেই, অতএব সিদ্ধান্ত বদলাম ।  মাড়গাঁও, আপামর ফুটবলপ্রেমি বাঙালির কাছে খুব পরিচিত নাম, এখানে স্টেড়িয়াম আছে।  গোয়ার এ মাঠ বাংলার মোহনবাগান ইষ্টবেঙ্গলের ইত্যাদি টিম গুলোর কাছে এ্যাওয়ে ম্যাচের বদ্ধভূমি।  প্রথম বারে দুরন্ত আর শান্ত দুই মা সাথে কিছু লাগেজ সহ নেমে, প্লাটফর্মে বড় মায়ের জিম্মাতে রেখে, অবশিষ্ট লটবহর আর “অগ্নিসাক্ষী”র সন্ধানে কামরার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।  টাইম ম্যানেজমেন্টে কোন অসুবিধা হবারই কথা নয় কিন্তু ট্রেনের গায়ে চিটানো প্যাসেঞ্জার লিষ্টটা দেখতে গিয়েই গোলটা বাঁধল।  কোন এক হারামি ছিঁড়ে দিয়েছে।  

অনেক দিন পর বেদম ঝাড়ও খেলাম কর্ত্রীর কাছে, এখন তো শুধু স্ত্রী নয় মেয়ের মা ও বটে।  কিন্তু সে গালিগালাজ আমার ভাবনার ঘরে বিক্ষেপ ঘটাতে পারলনা, কান গৃহিণীকে সমর্পন করে, চোখ-মন শ্যেন দৃষ্টিতে চেয়ে আছে অন্য গেটের পানে।   দিনের আলোতে ময়না করতেই হবে।  একটিই মাত্র ঝলক ছিল , সত্যি তো ? নাকি মায়া বিভ্রমে পরে, ফালতু স্মৃতির পাতা হাতড়ে ভেবে গেছি।  সেই খোলা চুল, প্রশস্ত কপাল, কাটারির মত ভ্রু…  সারাটা রাত সাধের ঘুম ঠিক কি কারনে দান করেছি, সেটা চাক্ষুষ করে চক্ষু কর্নের বিবাদভঞ্জন না করা পর্যন্ত তৃপ্তি পাচ্ছিনা।  

তিনি, ছেলের হাত ধরে নামলেন। শরীর মহিলা সুলভ ভারিক্কি হয়েছে। সৌন্দর্য বেড়েছে? কি জানি প্রথম যৌবনের প্রেমিকের চোখের রঙ বোধহয় কখনই ফিকে হয়না, যতদিন যায় আরো গাঢ় হয়, বিলক্ষন অনুভব করলাম। একটিবারের জন্যও চোখাচোখি হতে দিলনা অত্যান্ত দায়িত্ব সহকারে। তবে হাত দশেক দূর থেকে জরীপ করে নিলেন, পা থেকে মাথা আর মাথা থেকে পা, বারবার। চোখ নামক এক্সরে মেশিন দিয়ে অন্য একটা শরীর এর ছবি অন্তরে ছেপে গেল। ততক্ষনে নিশ্চিত হয়ে গেছি, তাই খুব ইচ্ছাছিল একবার চোখে চোখ রাখব। বয়স ব্যক্তিত্ত্ব কে অনেক পরিনত করে, তাই সেটা অপূর্নই রয়ে গেল। অবজ্ঞাও যে এত মধুর হতে পারে আগে কখনও ভাবিনি।

প্রথমে ভেবেছিলাম গোটা ট্যুরের জন্য একটাই গাড়ী বুক করব, কিন্তু গোয়ায় স্বদেশী বিদেশী ট্যুরিষ্ট এত বেশী যে কোন ড্রাইভারই নিজের এলাকার বাইরে যেতে রাজী হল না। তাছাড়া এখানে নর্থ সাউথ , আলাদা স্ট্যান্ড এসব সমস্যাও আছে।   দমন আর দিউ এর সাথে গোয়াও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসাবে ভারতে ঢুকে ছিল,  ১৯৮৭ তে গোয়া ভারতের ২৫ তম রাজ্যের মর্যাদা পেয়েছে। পর্তুগীজ শাসনের ছাপ সর্বত্র। এদের বেশীর ভাগের নামে , ধর্মে, একেবারে অঙ্গে প্রতঙ্গে, বাসস্ট্যান্ড, লাইট পোষ্ট একমকি গাছের ডাল গুলোতে পর্যন্ত বাঁধা আছে পর্তুগালের কালচারের নিশানা।  তবে মানুষগুলো সকলেই আদ্যপান্ত্য ভারতীয়।  

গোয়া বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে নীল জলের সমুদ্র সৈকত, ফেনি , মাছ ভাজা, সুলভ মদিরা আর সঙ্গীতমুখর উচ্ছল প্রানস্পন্দনের একটা জীবন্ত ছবি। দুপাশে পাকাধানের মাঠের মধ্যিখান বরাবর হাইওয়ে দিয়ে যে গাড়ী ছুটে চলেছে, নারকেল গাছ গুলো বাদ দিলে তাকে নিশ্চিন্তে আমাদের পূর্ব বর্ধমান জেলার কোন অংশ বলে চালিয়ে দেওয়া যাবে। ড্রাইভার বিশুদ্ধ হিন্দি বলার আপ্রান চেষ্টা করলেও কোঙ্কনি টানটা যে যাবার নয়, সেটা বুঝতে পারছেন না। জুয়ারী নদীর উপর ব্রীজ পেরিয়ে মীরমার যেতে হবে। মান্ডভী নদী যেখানে আরব সাগর ছুঁতে চাইছে, ঠিক সেই সঙ্গমে গোয়া ট্যুরিজিমের নিজস্ব অতিথি নিবাস- “মীরামার রেসিডেন্সি কমপ্লেক্স”। সামনে একে বারে সৈকতে র গায়ে ছবির মত কিছু কটেজ। ওগুলোতে বুকিং পায়নি, অগত্যা তিনতলায় সমুদ্রমুখী একটা ঘরই বরাদ্দ এবারের জন্য।

পর্ব -৩

মীরামারে থাকার থাকার সবচেয়ে বড় সুবিধা হল এর ভৌগলিক অবস্থান। রাজ্যের রাজধানী পাঞ্জিম বা দোনা পাউলা থেকে দুরত্ব মাত্র তিন কিমি। ফর্ম ফিলাপের আনুষ্ঠানিকতার ঠেলায় ঠেলায় পেট চুঁই ছুঁই করছে। রিশেপশনিষ্ট তরুনীটি দ্রুততার হাতে বোর্ডার সামলাচ্ছে। হাসিমুখে তাদের ভাষাতে ফরেনার ম্যানেজ করলেও বাংলা বলতে পারেনা মোটেই, ববে ভাঙা ভাঙা বোঝে সম্ভবত। রিশেপশানের বারন্দা থেকেই পাম গাছের ঘন সারি, মান্ডভীর নীল জল, ঢেউ এ ভাজা  হলুদ রং মিহি বালি , সঙ্গে হালকা বাতাস , আহা ভ্রমণের মনোরম পরিবেশ। তিনতলার বারন্দা থেকে জলের দিকে মুখ করে দাঁড়ালে মীরামার নামের সার্থকথা বোঝা যায়, পর্তুগীজ ভাষায় ‘miramar’ মানে ‘viewing the sea’। দূর প্রান্তে এ্যাগুয়েরা ফোর্ট দেখা যাচ্ছে।

ক্লান্ত শরীরে কিছুক্ষন বিশ্রাম নেবার পর, বাইরে বার হবার সময় মায়ের হাতে সামান্য কিছু দিলাম, সর্বক্ষন যদিও আমার সাথে থাকবে। তবুও অর্থের সাথে স্বাধীনতার একটা সম্পর্ক আছে  মনজগতে। প্রথম গন্তব্য রেঁস্তোরা, জমিয়ে খাওয়া , মা আর উনি মাছ আমি আর মেয়ে চিকেন। রাত জাগা বাঙালি, স্নান করে চারটি ভাত যেই পেটে পড়েছে, চোখের শাটার খুলে রাখা দায় হয়ে পড়েছে। সময় এখানে  কিন্তু নিরুপায়, পয়সা দিয়ে কেনা সুতরাং পরের গন্তব্যে।

প্রায় সব ধর্মের বহু তীর্থ স্থান দেখেছি তবুও চার্চ সকল সময় অনন্য অভিজ্ঞতা। ওল্ড গোয়ার Basilica of Bom Jesus চার্চ। রোববার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ছটা থেকে সন্ধ্যা ছটা পর্যন্ত খোলা, প্রবেশ মূল্য নেই । গাইডের কথামত- ষোড়শ শতকে তৈরি এই অনন্য উপাসনা ঘর। এই ওয়ান্ড হেরিটেজ সাইটেই রাখা আছে St. Francis Xavier এর অনন্য কারুকার্য মন্ডিত রুপোর কফিন।

গোয়া ভ্রমণে এসে, সঙ্গীতসাম্রাগী লতা মঙ্গেশকরের পৈত্রিক বাড়ী ও মঙ্গেশী মন্দির দেখেননি এমন মানুষ নেই। চারিপাশে সবুজ মাঠ , আম জাম, নারকেল গাছে ভরা, মন্দিরে। ইষ্ট দেবতা মঙ্গেশ, আদতে শিবলিঙ্গ। অনেক গুলো সিঁড়ি চড়ে গর্ভগৃহে পৌছাতে হয়। এখানে আমসত্ত্বের মত কাঠালসত্ত্ব পাওয়া যায় শুনলাম, এমন জিনিসটি আর কোথাও পায় নি।

এখন অনেকটা দক্ষিন প্রান্তে চলে এসেছি। সম্পূর্ণ ভেষজ জিনিস দিয়ে তৈরি গোয়ার প্রথম ও একমাত্র নৃতাত্ত্বিক মিউজিয়াম- চিত্রা মিউজিয়াম, স্যালসেটে। মিউজিয়াম না বলে পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ বলা যেতে পারে । অন্তত দুশ রকমের বিষয় বস্তুর উপর চার হাজার রকমের খুঁটিনাটি দেখার জিনিস সংরক্ষিত এখানে। অতীতের কৃষক ও মৎসজীবি গোয়ানীজরা কেমন করে আজ খনি আর পর্যটন কে আঁকড়ে ধরে একটা উন্নত জাতিতে পরিনত হয়েছে, এখানে না এলে সেই ইতিহাসটা স্বচক্ষে দেখা যেত না। প্রতিটা বিভাগই আলাদা কমিউনিটির বিভিন্ন ব্যক্তিকে সামনে বসিয়ে রেখে, অনেকটা স্পিলবার্গের Schindler’s List মত। মাইথোলজি থেকে এথ্রোপলজি, চিত্রকলা থেকে ভাষ্কর্য জীবন্ত মডেল, কি নেই! মীরাবাঈ এর শোয়ানো লাল রং এর মূর্তি আজও মনে আছে।  পায়ের তলায় সর্ষে , এত বড় ভারতবর্ষের বহু মিউজিয়াম ঘুরে এসেছি, ড্রাইভারের জোরাজুরিতে আসতে রাজী না হলে বহু কিছু অভিজ্ঞতা হারাতাম, টিকিটের টাকা কড়ায় গোন্ডায় উশুল। হলফ করে বলতে পারি কোলকাতা হলে অন্তত তিন থেকে চারবার যেতাম।

কোলভা সাউথ গোয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় বীচ। একে বারে ফ্ল্যাট আর লম্বায় পঁচিশ কিমি মত। কোলভাতে টেউ এর উচ্চতা খুব কম। পাইন , পাম আর নারকেল গাছের ঘন সবুজ সারি , শেষ মাথার থেকেও কিছুটা দূরে যেখানটা নাকের মত উঁচু হয়ে আছে ঠিক সেইখানে আরব সাগরের দিকে তাকিয়ে কাবো ডি রামা ফোর্ট, পৌরানিক মতে রামচন্দ্র তার বনবাসের অনেকটাই এখানে কাটিয়ে ছিলেন। দূরত্ব মাড়গাঁও থেকে তিরিশ কিমি। গোয়াতে ফোর্ট মোট এগারোটা, নর্থে সাতটা আর সাউথে চারটে। মাড়াগাঁও ফোর্ট দর্শনীয়, মাড়গাঁও থেকে মাত্র চার কিমি দূরেই ইতিহাস প্রসিদ্ধ রাচেল ফোর্ট। এখানেই বিজাপুরের সুলতানের সঙ্গে বিজয়নগর রাজার যুদ্ধ হইয়েছিল। আরও কিছুটা দক্ষিনে সরে গেলে গোয়া কর্নাটক বর্ডারে কারোয়ার গ্রামের কাছে দ্বীপের ভেতর আন্দিভ ফোর্ট। সংস্কৃত শব্দ অঞ্জনী থেকে এই নামটির উৎপত্তি। বর্তমানে এটি একটি চার্চ। ১৯৬১ সালে ভারতের গোয়া বিজয়ের সূত্রপাত ‘ওপারেশন বিজয়’ এপথেই শুরু হয়েছিল।

একা থাকলে বীচ বরাবর অন্তত দু কিমি নিশ্চিত হাঁটতাম , আর সময়টা অন্তত বছর দশেক পিছনে গেলে, হাত ধরাধরি করে এক কিমি তো নিশ্চিত ছিল। এখন খুব দূরন্ত মেয়েকে নজরে নজরে রাখতে হয়। গোয়ার উচ্চবিত্তরা কোলভা আসে বায়ু পরিবর্তনের জন্য , স্থানীয়রা একে Mundanca বলে। এখানে গোয়া ট্যুরিজিমের ঘর একেবারে সৈকতে র উপর। পাটে বসতে চলা সূর্যের রং পাল্টেছে, মা এমনিতে খুব ফর্সা, এই আলোতে ওনাকে শাড়িপরা ফরেনার মনে হচ্ছে।

শিলাবতীর পাড়ে শিকড় আর গঙ্গা পাড়ে জন্ম- বড় হওয়া- বাসস্থান, তবুও কোথাও কোন দিন নদীবক্ষে ভ্রমন করিনি, ইচ্ছাও করেনি।   এখানে কিন্তু মান্ডভীর উপর না ঘুরলে নাকি গোটা ট্যুর মাটি হয়ে যাবে, ড্রাইভার কাম গাইড় আর বাড়ির লোকেদের এমনটাই মতামত। টুরিষ্ট হিসাবে সবার কিছু না কিছু ফালতু খরচা হবেই, অগত্যা একগাদা টাকা খরচা করে ক্রুজে ওঠা। রোলিং আছে , নদীর ধার ঘেঁসে আমি , বাঁদিক থেকে স্ত্রী ,মা ,মেয়ে সীট করে নিলাম। দু পাশে আলো ঝলমলে পাঞ্জিম, ডেকের উপর নাচ গানের ব্যবস্থা। সুর সব চেনাশোনা কিন্তু ভাষা আলাদা। গায়ক, গায়িকা সেই কোঙ্কনী সুর কোন বিখ্যাত সিনেমার কি ভাষাতে ব্যবহার হয়েছে তা ব্যাখ্যা করছেন।

ফুরফুরে হাওয়াতে চোখ বন্ধ হয়ে গেছে, সুতরাং ঘণ্টা খানেক ঘুমানোর পাকা বন্দ্যোব্যাস্ত। হঠাৎ কোমরে হালকা ঠেলা- শুনছ…। বিবাহিত পুরুষ মাত্রই জানে শব্দটির কি মাহাত্ত্ব। ‘ছ’ অক্ষরটির উপরে স্বরক্ষেপন দিয়ে শাসন থেকে হুলুস্থুল, অনুনয় থেকে সোহাগ, সবই বোঝানো যায়। রাত্রি দুটোর ‘শুনছ’ আর এই লোকালয়ের ‘শুনছ’ এক নয়। কারন খুবই সামান্য, ডেকের উপরের সেই নাচাগানার জাইগাতে মেয়ে চলে গেছে। আমার উঠার অপেক্ষা না করে শ্রীময়ী নিজেই চলে গেলেন, যথারীতি আবার ঘুমের তাল ভাজতে লাগলাম। ক্রুজ খুব স্লো চলছে মীরামার গিয়ে আবার পাঞ্জিমে ফেরৎ আসবে। আবার সেই- শুনছ… সেই বাচ্চাটাও নাচছে, মেয়ে আবার গেল। আবার সেই নিষিদ্ধ লোভ, এবার ঘুম ছুটে গেল। উচিৎ নয় ,তবুও সীট ধরে ধরে চোখ ঘোরাতে থাকলাম, অবশেষে অর্জুনের লক্ষ্যভেদ। এবার আর আড়চোখে নয় নয়নে নয়ন মিলল। পাশে বসে ভদ্রলোক নিশ্চিন্তে নাচ গানে মগ্ন। মা এর পাশে তার কুটুম্ব বন্ধু চলে এসেছেন। দিনের শেষে চারটি বাংলা বলতে পেরে দুই বুড়ীই খুব খুশি।

  
স্ত্রীর মাথাটা ধরে বাচ্চাটির বাবার দিকে ঘুরিয়ে দিলাম। 
বললাম- ঐ লোকটা তোমাকে দেখছে
সব মাহিলা যা করে থাকেন ইনিও তার ব্যাতিক্রমি নন, সর্ব প্রথমেই বুকের কাপড় ঠিক করার দিকে মনযোগ দিলেন। অখণ্ড অবসর, দৃষ্টিস্থির, বামহাত স্ত্রীর ডানহাতে। পলক কে আগে ফেলে তার পরীক্ষা চলছে , Hard Nut to Crack. স্ত্রীকে আরও অমনোযোগী করে দিয়েছি। মান্ডভী বয়ে চলেছে আপন গতিতে, মনের চোরাস্রোত কিন্তু ক্রুজেও কিছু বদল হয়নি, ট্রেনের মতই উল্টো দিশাতে বয়ে চলেছে। নামার সময় সেই ভদ্রলোক আমাদের আবিষ্কার করলেন, নিপাট অমায়িক মানুষ। এতক্ষন ধরে ইর্য়াকি করছিলাম বুঝতে পেরে গৃহকর্তী কপট ক্ষুব্ধ হলেন। তবে এতে কোন দাম্পত্য ক্ষতি নেই। এক ডজন দিন অতিক্রান্ত, গোটা ট্যুরে আমার বিছানা তো মেঝেতে, এক্সট্রা বেড়ে। তাই বিশেষ চাপ ছিলনা। বৃদ্ধা মা, কচি বাচ্চা আর ওনার দখলে প্রতিদিনের পাল্টে যাওয়া খাট। দুজন ব্যাক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ দিয়ে বোধহয় পারফেক্ট জুটি তৈরি হয় না।

পর্ব- ৪

ভোর বেলা সৈকতে  এসে গেছি ,দু কিমিঃ লম্বা সৈকত। এই সমুদ্রে তীব্র আন্ডার কারেন্ট, জলে নামা নিরাপদ নয়। এখানকার প্রায় সব সৈকতেই লাইভ সেভার আছে, লাইফ বোর্টও মজুদ। তবুও গত সপ্তাহে দুজন নাকি মারা গেছে। সৈকতের বালি কাল যেমনটি দেখেছিলাম আজ তার থেকেও বেশী হলুদ। মেয়ের অন্তহীন দৌড়াদৌড়ি অফুরন্ত জীবনীশক্তির মূর্ত প্রতীক।

জীবনে প্রথমবার ওয়াটার সাফারি, বেশ চিন্তায় আছি। কোথাও একটা পড়েছিলাম, এই ডলফিন সাফারি এরিয়ার মোহনাতে নানা ধরনের পরিযায়ী পাখি দেখা যাবে। ওমা কোথায় কি? বোটই এখনও আসেনি। গোয়া বুঝতে গেলে পর্তুগালের ম্যাপে একবার চোখ বোলাতেই হবে। ইউরোপের উওর পশ্চিম কোনে আটলান্টিকের তীরে, স্পেনের খাঁজ কেটে পশ্চিমবাহিনী নদী আর খাঁড়ির মুখের সামনে ফোর্ট নিয়ে তৈরি একটা অর্থনৈতিকভাবে উন্নত ক্রিশ্চিয়ান রোনাল্ডোর দেশ। দেশের মূল নদী মীরা আর লিমিয়া। একেবারে সমুদ্রের গায়ে খাঁড়ির উপর রাজধানী লিসবন। নিরাপত্তা জনিতকারনে ফোর্ট গুলির অবস্থান একেবারে গোয়ার মত, বলা ভাল গয়ার পর্টগুলো পর্তুগালের আদলে তৈরি।

দুটি সদ্য গোফগজানো ছেলে ইঞ্জিনচালিত বোট নিয়ে সৈকতে নিয়ে আসতেই তাতে চড়ে বসলাম। খান দশেক রো, প্রতি ’রো’তে চারটে চেয়ার- দু পাশে দুটো করে। আমরা যে যার পরিবার সমেত বোট ভর্তি করে বসলাম। ছোট বাচ্চাগুলোর দেহের ওজন অনুসারে সামান্য কিছু পরিবারকে এধার ওধার করে নিল, বোটের ভারসাম্য বজায় রাখতে।  ইঞ্জিন স্টার্ট করার পরে দুজন যাত্রী দৌড়ে এল, হেল্পারের শত ইচ্ছা সত্ত্বেও অন্যজন রাজী হল না। বলল- দুজনের জন্য চল্লিশ জনের রিস্ক নিতে সে অপারগ। হায় রে- ব্যারাকপুর বা কালনার ঘাটে যদি এমন মাঝি থাকত… 

যেদিকেই তাকায় ডলফিন ঠিক তার উল্টোদিকে মাথা তোলে। ঢেউ প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে ক্রমশ, নৌকাটা ছোটবেলায় জমা জলে ভেসে যাওয়া কাগজের নৌকার মত টেউয়ের মাথায় উঠছে আর নামছে। সামনের সহযাত্রী ছেলেটা দারুণ আত্মবিশ্বাসী, অভয়বাণী দিচ্ছে Center of gravity মেপে তৈরি বোট, সুতরাং বিন্দাস। আমার আশা আর আশঙ্খা দোলাচলে, চারজনই যে একসাথে আছি। ক্রমশ এ্যাগুয়েড়া ফোর্ট নজরে স্পষ্ট হল। রাজ্যের বা তৎকালীন দেশের বৃহত্তম ডবল ওয়ালের সীফোর্ট, খাঁড়ির উত্তর মুখে পাহাড়ের উপরে। এখান থেকে সমুদ্র বহুদূর পর্যন্ত দেখা যায়। পর্তুগীজ শাসনে এই ফোর্টের বিরাট গুরুত্ব ছিল, ঘুরপথে পাঞ্জিম ১৮ কিমি। পর্তুগীজ ভাষায় Aguada মানে জল, তা থেকেই নামকরন। ভেতরে তিনটে উষ্ণ প্রসবনও রয়েছে। অতীতে এখান থেকে জাহাজে মিষ্টি জল সরবরাহ করত। ভেতরে বিরাট জলের আধার আছে। অপূর্ব নৈসর্গিক দৃশ্যের কারনে অনেক সিনেমার সুটিংও হয়েছে। এখানকার অন্যতম আর্কষন চারতলা বিশিষ্ট লাইট হাউস।  

মীরামার সৈকতে মাকে ডাইভার আর হেল্পার দুজনে মিলে কোলে করে নামিয়ে দিয়ে গেল। জানলাম ছেলেটি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, বাড়ির সবকটা বোর্ট নিজে তৈরি করেছে। প্রতিবেশীদেরও অনেক বোট রিপেয়ারের কাজও করে। সিজিনাল টুরিষ্ট তো আছেই। সবিনয়ে টিপস্ প্রত্যাখান করতেই,  নিজের সাথে ওদের ছবি তুলে রাখলাম। পদবী দিয়ে ধর্ম দিয়ে মাপা যায়না।  

আমাদের হাওড়া স্টেশনের বাইরে যেমন বাসের লাইনে উঁচু ডিভাইডার আছে এখানেও ঠিক সেরকম তবে মাঝে কোন রোলিং সেই এমন কি কোন শেডও নেই। ঝুড়িতে করে ফল সবজি নিয়ে হকার বসেছে আর তার ফাঁক গলে যে যার মত বাস ধরে নিচ্ছে। পাঞ্জিম রাজ্যের রাজধানী, এখান থেকে সব অংশের লোকাল বাস ছাড়ে।  হেল্পার গুলো কোঙ্কনী ,হিন্দি ছাড়াও ইংরাজিতে প্যাসেঞ্জার ডাকছে। একজন ফরেনারকে অন্য কোন এক ভাষা বলে নিজের বাসে তুলেনিল, এক হেল্পার। জমাটির দিক থেকে এই বাসস্ট্যান্ডকে খুব বেশী হলে তারকেশ্বর বাস স্ট্যান্ডের সঙ্গে তুলনা করা যায়। এছাড়াও আন্তঃরাজ্য পরিবহনের জন্য অন্য একটি সাজানো গোছানো বাসস্ট্যান্ড আছে।

মাকে একটা দোকানে বসিয়ে গোটা বাজার চষে নিলাম। স্যান্ডইউচ ,বার্গার ,চিকেন লালিপপ, রোল ,পাও, ফ্রুটস আর জুস কিসের দোনাক নেই এই ফুটপাতে! ঢোকলা, খাবরা, ফাবরা সমেত গুজরাঠী দের আলাদা ব্যবস্থা। অবিশ্বাস্য , দাম কোলকাতার থেকেও কম। বাজার, লোকাল বাস , চিৎকার, ফুটপাতের দোকান ,ক্রেতা বিক্রেতার বিরক্তিকর দড় কষাকষির আদিখ্যেতার কাছে সাথে সপিং মলের কোন তুলনাই হয়না। কোনো এলাকাকে সঠিক ভাবে জানতে হলে সেখানকার লোকেদের বাজারে ঢুঁ না মারলে গটাটাই অধরা থেকে যাবে। নতুবা গোয়া মানেই কিন্তু ‘রাস্তা জুড়ে স্বল্পবসনা বিদেশিনীদের বাহার’ এর বাইরে কোন স্থানীয় অভিজ্ঞতা থাকা সম্ভব নয়। এক দোকানদার ভিন্ডালু ,সসেজ আর ফিসকারীর কথা বলল, পেটে জায়গা নেই।

  
বেড়াতে এসে বার মনে রাখা মুশকিল ,এক দোকানদার বলল ”আজ শুক্রবার, মাপুঁসা ঘুরে আসুন, আজ হাট বসে “।   মাপুঁসা গোয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর। গোয়াতে কলকাতার মত রক বা ঠেক কালচার নেই, আর স্থানীয়দের কারও তাকাবার সময়ও নেই। মঠ, মন্দির, চার্চ , ফোর্ট আর সমুদ্র সৈকতের বাইরেও একটা গোয়া আছে।

পাঞ্জীম রক্ষার উদ্দেশ্যে তৈরি পর্তুগীজদের হাতে তৈরি রেইস মাগোস ফোর্ট মান্ডবী নদীর এক্কেবারে উত্তর প্রান্তে অবস্থিত। সেখানে হালকা চক্কর মেরে চলে এলাম স্পাইস মার্কেটের জন্য বিখ্যাত মাপুঁসা, বিঘে খানেক জায়গা জুড়ে সেই হাট। হোলসেল থেকে রিটেল সব চলছে রমরমিয়ে।  ছোট এলাচ, বড় এলাচ , লবঙ্গ , গোলমরিচ , দারুচিনি , শাহজিরা , জায়ফল , জয়ত্রী, জিরে, কালোজিরে , মৌরি , মেথি, হিং , শুখনো গোটা নারকেল আরও নাম না জানা কত কিছু মশালা তার ইয়াত্তা নেই। সব মাদুরের ফরাসে ঢালা আছে । ফলেরও অনেক দোকান, কোলকাতার মেছুয়া ফলমার্কেটও দেখেছি। কিন্তু এখানে এক নতুন প্রজাতির তালের মত দেখতে কালো একটা ফল আছে।  নাম শুধাতে জানলাম Kokum,  কোঙ্কনী ভাষায় বলে Bhirand, যেটা এরা তেঁতুলের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করে। গোটা পশ্চিমভারত জুড়ে এই Kokum এর সরবৎ অত্যন্ত সুপায়ী। একটু দূরে গ্রামীন তাজপুরের মত এখানেও শুঁটকি মাছের উগ্র কটু গন্ধে নাক ঝালাপালা।

রাত অনেকটা তবুও ঘুম আসছে না। মেঝে আর খাটের মধ্যে পার্থক্য বলতে উচ্চতাটুকু। দেওয়ালের ধারে মা, তারপর নাতনি, আর মেয়েকে মাঝখানে সুরক্ষা প্রদান করে খাটের প্রান্তে মেয়ের মা। কুট করে কোমরে চিমটি কাটলাম, ফিসফিসিয়ে উত্তর এল- ‘কি হচ্ছে কি! মা জেগে আছেন’। বিয়ের আগে দুটো বছর ধরলে বারোটা বছর, গোটা একটি যুগ।

নিঝুম রাতে বারান্দার বেতের চেয়ারে একা, সামনে সমুদ্রের উত্তাল নীল টেউ, নোনতা বাতাসের সোঁসোঁ শব্দ, ঝকঝকে আকাশ, সারাদিনের দৌড়ঝাঁপে শরীর ক্লান্ত হলেও, মনের ক্ষুধা এখনও অটুট। অবাক করে দিয়ে শ্রীময়ী বিছানা থেকে উঠে এল। আসলে নীরবতার ভাষাও অনেক সময় ঠোঁট কে হার মানিয়ে দেয়। বক্ষলগ্না এক নিশ্চিত সামাজিক সম্পর্ককে, নিবিড় ভাবে আলিঙ্গনাবদ্ধের চরম সুখানুভূতির মাঝেও, প্রথম যৌবনকে অস্বীকার করে ফেলে দেওয়া যে অসাধ্য, সেটাও বেশ অনুভূত হচ্ছিল। প্রেম কি একমুখি? কাওকে বেশি ভালবাসলে কি অন্য ভালবাসাতে ভাটা পরে? নাহ, আজ চাকুরি জীবনের মধ্যপ্রান্তে এসেও এ প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। হয়ত ভালবাসাতে কোনো কমতি ছিলনা তাই।

পর্ব – ৫

আজ মেয়ের জন্মদিন, কোলভা ক্যানসেল করে বর্তমান হোটেলেই এডজ্যাস্ট করে নিয়েছি। দোনা পাওলা সৈকত, মীরমার থেকে অটোতে মিনিট দশেক লাগে। অফ সিজিন, তাতেও সকাল বেলাতেই প্রচুর ফরেনার। আসলে মুখ্য আকর্ষন দোনা পাওলার ওই দুর্দান্ত ভিউ পয়েন্ট। সামনে উন্মুক্ত আরব সাগর, আর তার নীল জল। সৌন্দর্য অনুভব করতে হয়, ভাষার সাধ্য কি তার প্রকা, সে প্রেমে হোক বা ভ্রমণে। আরব সাগর এখানেই মান্ডভী আর জুয়ারীকে একইসাথে দুহাত দিয়ে নিজের বুকে জডিয়ে ধরেছে।  জীবনের ক্ষেত্রে কি এ অসাধ্য সাধন সম্ভব?  জানিনা কোন ভাগ্যবানের সম্ভব, তবে আমি তাদের দলভুক্ত নয়, সেটা বলাই বাহুল্য।   

ফেরি ব্রীজের কাছে দুধসাদা দোনা পাওলা স্ট্যচু আছে। কিছুদিন আগেকার রোহিত শেট্টির বিখ্যাত সিনেমা ‘সিংহম’ এর দৃশ্য স্ট্রিট লাইট ভেঙে জিপের স্টিয়ারিয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া, এখানেই সুটিং হয়েছিল। এছারাও প্রখ্যাত হিন্দি সিনেমা এক দুজে কে লিয়ের সুটিং এখানেই হয়েছিল। স্থানীয় মানুষজন একে “Image of India” বলে। গোয়া ইউনিভার্সিটি ও ল্যাশানাল ইনস্টিটিউট অফ ওসানোগ্রাফি এখানেই অবস্থিত।

মীরামারে খাবারের দাম প্রচন্ড চড়া। পাঞ্জিম যেতে পারলে ভালো হোত, ট্যুর বেশ বড় সুতরাং মাকে বিশ্রাম দেওয়া প্রয়োজন। তাই একাই পাঞ্জিম থেকে কেক আর ক্যান্ডেল, কিনতে চললাম। ফিরে দেখি রুম হুলুস্থুল, সমস্ত জামা কাপড় কেচে বারান্দাতেই মেলে দিয়েছে। বাঙালী, বেড়াতে গেলেও জামা কাপড় লন্ড্রতে দেবেনা, আর কড়িডরে দড়ি টাঙিয়েই শুকাতে দেবে, সেটা হোটেল হোক বা হাসপাতাল। জার্নির শরীরে লাঞ্চ করে লম্বা ঘুম, উঠে দেখি ঘর শুনশান। তিনজনেই সৈকতে  ঘুরতে গেছে।  

ঘরোয়া অনুষ্ঠান সম্ভবত একেই বলে, এক ছাদের তলার তিনজন ছারা চতুর্থ কোন প্রাণী নেই। ওরা তিনজনেই খুব সাজাগোজা করেছে, মহিলা সাজার ফুরসত পেলে সুর্যকেও ১০ মিনিট লেট করিয়ে ছারবে। হাজার হোক, ছবি উঠবে তো, ওটাই সাজার মুখ্য উদ্দেশ্য, ভবিষ্যতের স্মৃতি। আকস্মাৎ রুমের বেল বাজল। কিছুতো ওর্ডার করিনি, আসে পাশে হাজার কিমির মধ্যে কোনো আত্মীয়স্বজন নেই। উঠে দরজা খুলতেই খানিকটা অপ্রস্তুত অবস্থায়।

এ কাজটি যে মায়ের, তাতে কোন সন্দেহ নেই।  কিছু বলার আগেই বাচ্চাটি পাশ কাটিয়ে নির্দ্বিধায় রুমে ঢুকে পড়ল। দুটি বাচ্চা হইচই করে একটা ঘরোয়া পরিচিত পরিবেশ তৈরি করেছে, এদের তো মুখোশ নেই। উভয়ে উভয়কে কেক খাইয়ে দিচ্ছে, এদৃশ্যটি আমিই ক্যামেরাবন্দী করলাম। ওপাশে যাবার মানসিক আকুতি আছে, এপাসে দায় ও দায়িত্ব।  কোন এক মহান চিত্রপরিচালক বলেছিলেন- অভিনয় গুনটা মানুষের স্বপ্রতিভ প্রতিভা, অটাকে অনুকরন করা যায়না। আজ হাড়ে হাড়ে টের পেলাম।

ভদ্রলোককে ডিনারের আমন্ত্রন জানালাম, অর্থ আজ তুচ্ছ। একদিকে প্রানাধিক প্রিয় কন্যার জন্মদিন পালন, অন্যদিকে প্রথম যৌবনের পালে বাতাস। জানি ভদ্রলোকের একা সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা নেই, মজলিশে স্বামী স্ত্রী বসবার ভঙ্গী দেখলে বলে দেওয়া সম্ভব- পরিবারের রাশ কার হাতে। অন্যপ্রান্ত থেকে চোখের ভাষাতে অনুমতি এল। বারন্দায় চেয়ারে ভদ্রলোক সমুদ্রের রূপ গিলছেন, আমি রোলিং এ হেলান দিয়ে ঘরের ভেতর পাশাপাশি ‘সৌন্দর্য আর গ্ল্যামার’ কে উপভোগ করছি। দুটো টেবিলকে একসাথে জুড়ে আটজন, দূরত্ব অনেকটাই কম ‘মুখোমুখি’, তবুও কেও কাউকেই চিনিনা।

পর্ব – ৬

পাঞ্জীম ঘুরে মাণ্ডবি ব্রীজ পেরিয়ে পনের কিমিঃ দূরে Calangute, মূল নাম এসেছে কোঙ্কনী শব্দ ‘Koli-gutti’ থেকে, যার মানে জেলেদের বাড়ী। চারিপাশে গিজগিজ করছে মানুষ, কটেজে ঢোকার মুখে ডানদিকে একটা শক্ত লালমাটির ফুটবল মাঠ আছে। গোয়ার বীচ লীগ ব্রাজিলের মতই খুব জনপ্রিয়, জাতীয় দলের বহু প্লেয়ার পর্যন্ত এই রকম ঝামা মাঠে খেলেছে। এগুলোই গোয়া ফুটবলের সাপ্লাই লাইন।

গোয়া ট্যুরিজিমের কটেজ সমুদ্রের গা ঘেঁসে, কিন্তু আমাদের জন্য নির্ধারিত ঘর এখনও পুর্ববর্তী বোর্ডার খালি করেননি।   বুকিং স্লিপ এর প্রতিলিপি রিসেপসনে জমা দিয়ে বাইরে প্রাতরাস সারলাম। রাস্তাঘাটে ঘুরতে ফিরতে প্রচুর ফরেনার চোখে পরবে, বেশীর ভাগই দুজনের দল। এর থেকে বেশী বড় দল মানেই বয়ষ্ক মানুষদের টিম। প্রত্যেকের পিঠেই ঢাউস ব্যাগপ্যাক, আর হাতে অবশ্যই জলের বোতল। আমাদের মত গাড়ী ভাড়ার ঝামেলা নেই, এনারা শুধু হাঁটেন। দূরত্বটা বেশী বা কম, কোন ব্যাপারই নয়।  ঘরর ঝনকাঠেই যেন ঢেউ ধাক্কা মারছে, সৈকতের উপরেই বাস। পরিবেসের নিরিখে ক্যালাঙ্গুট যেন এক টুকরো পুরী বা দীঘা, বিরক্তিকর বাঙালি কালচারের লোকজন গিজগিজ করছে গোটা এলাকা।

জলে ঢেউ আর স্রোত দুইই আছে, লাল হলুজ ইষ্ট বেঙ্গল জার্সি সুলভ পোশাক পরা লাইফ সেভারের দল স্থায়ী মই এর উপরের টং থেকে সমানে বাঁশি বাজাচ্ছে।  সমুদ্রে একটু দূরে যাবার উপাই নাই।  Parasailing, Water-Skiing and Wind Surfing এর মত ওয়াটার স্পোটর্স এর ব্যবস্থা ট্রেন্ড গাইডের সাহায্যে। সাত কিমি মত লম্বা ও অনেকটা চওড়া সৈকতে যতদূর চোখ যায় গোটা, পাড়ের ধার বরাবর অসংখ্য নারকেল গাছের নিচে ততোধিক স্টল, সেখানে টুপি, সুইমিং কস্টটিউম ও বাহারি টুপি,  বডি লোশন, তোয়ালে, হাফপ্যান্ট, রোদচসমা, চপ্পল, ডাম, ঠান্ডা পানীয় কি নেই সেখানে। গরম গরম চিংড়ি ছাড়াও অন্যান্য সামুদ্রিক ভাজা মাছে স্টলও আছে । যার জন্য Calangute কে Queen of Beaches বলা হয়।

বার্থেজ তালুককেই গোয়ার জনপ্রিয় বৈচিত্রপূর্ণ আর বৈশিষ্টপূর্ণ সৈকতগুলি অবস্থিত। আজকের শুরুটা হল পাঁচশ বছরের পুরানো ফোর্ট পর্তুগীজ স্থাপত্যের নিদর্শন বহনকারী ‘চাপোরা’ দিয়ে। ফোর্টের উপর থেকে ভাগাটোর বীচ, ওজরান বীচ, মরজীম বীচ আর চাপোরা নদীর মোহনা পুরটা দৃশ্যমান। আরব সাগরের নীল, কালো ও সবুজ রং এর জল বৈচিত্র স্পষ্ট বোঝা যায়। তাই পর্যটকদের কাছে খুব জনপ্রিয় এই ফোর্ট। সমুদ্র, নদী আর সবুজ বনানীর মেল বন্ধন ঠিক যেন শিল্পির নিপুন হাতে আঁকা ছবি। গোয়ার প্রতিটি সৈকতের বালির রং ও দানার আকারে পার্থক্য আছে। চপোরা সৈকতের বালি মিহি সাদা। মাপুঁসা থেকে দশ কিমি, দুরত্বে, পাম আর নারকেল গাছে ভরা বীচ ফোর্টের গা থেকে শুরু হলেও, চপোরা আসলে মতসজীবীদের গ্রাম।

পশ্চিমবাহিনী ছোট বড় নানান নদী আর খাঁড়ির কারনে, ভারতের পশ্চিম উপকুলে একটানা সৈকত বরাবর হেঁটে যাওয়া যাবে না। চাপোরার দক্ষিন দিকে বাগাটোর সৈকত। দূরত্ব বেশী নয় তবুও সড়ক পথে অনেকটাই ঘুরে আসতে হয়। এই সৈকত মুলত সাদা চামড়ার বিদেশিদের দখলে। এই সৈকতের নিজস্ব বৈশিষ্ঠ হল, গঙ্গার মত পলিযুক্ত সাদা বালি আর মাঝে কালো কালো পাথর, এখান থেকে পাম ও নারকোল গাছের ফাঁক দিয়ে সূর্যাস্ত দেখাটা লাইফটাইম অভিজ্ঞতা।

প্রায় তিরিশ কিমি লম্বা পাথুরে লাইনে গোয়ার প্রাকৃতিক বাউন্ডারি হল আঞ্জুনা সৈকত। জল সরে গেলেই লাল কালো পাথরের বিভিন্ন অংশ মোজাইক দানার মত রং ফুটে অপরূপ সৌন্দর্য প্রকটিত করে। ঝামা পাথরের এই অপরুপ সৈকতেই   রঙ্গিলা সিনেমার একটি পরিচিত গানের দৃশের সুটিং হয়ে ছিল।

চ্যাঙড়া যুবকদের জন্য আদর্শ স্থান হচ্ছে বাগা সৈকত। ক্যালাঙ্গুট সৈকতের সাথে প্রায় জুড়ে থাকা এই সৈকতটিতে ফেনি , ককলেট , মকটেলের গ্লাস নিয়ে স্বল্পবসনা বা সম্পূর্ন্রুপে উর্ধ্বাঙ্গাবরণহীন বিদেশি জুটিতে সৈকতের বালিতে লুটোপুটি। কোলকাতার ভিক্টরিয়া, সল্টলেক সেন্ট্রাল পার্ক বা নলবন, এই সৈকতের পরিবেশের কাছে নেহাতই শিশু শ্রেণীর। অবশিষ্ট ভারত গোয়া বলতে ঠিক যেটা ভাবে, এটা সেই জাইগা। সবকিছুই খোলামেলা আর ঢিলেঢালা।

পর্ব – ৭

অনেক বইপত্র পড়ে, রীতিমত প্রস্তুতি নিয়ে গোয়া এসেছি, কিন্তু যাত্রার শেষ অঙ্কে এসে যা অভিজ্ঞতা তাতে, অন্তত দু মাস থাকলেও গোয়ার সবটা নিখুঁত ভাবে দর্শন করা সম্ভবপর নয়। সামান্য কটি লোকমুখে পরিচিত সৈকত, দুর্গ আর নির্দিষ্ট কিছু দ্রষ্টব্য স্থানের সাথে, প্রকৃতির উজাড় করে দেওয়া সৌন্দর্য ছাড়াও স্থানীয় আমজনতার রোজজীবনের অন্দরে ঢুকে, গোয়ার অন্তর দেখার চেষ্টা করেছি।  

পঞ্চাশ কিমি দূরে মাড়গাঁও রেলস্টেশন সড়কপথে এক ঘণ্টার কিছু বেশী। শেষ বেলায় এসে সম্যক বুঝেছি গোয়ানীজদের নিয়মানুবর্তিতা আর সময় জ্ঞান টনটনে তাই ট্রাফিকজ্যামের কোন ভয় নেই। মা আর স্ত্রী গাড়ী থেকে নামতেই রাজী হোল না তবুও ফতেদারাতে জওহারলাল নেহেরু স্টেড়িয়াম আর মাড়গাঁওতে আমাদের বদ্ধভূমি না দেখে ফিরলে, একজন ফুটবল প্রেমী হিসাবে কোনদিনিই নিজেকে ক্ষমা করতে পারতামনা।  হাতে অনেক সময়।

গোটা ভ্রমণ জুড়ে অন্তরের পরিচয়কে চক্ষুদিয়ে অচেন বানিয়ে, লাগাতার সেই অভিনয় কন্টিনিউ করা বড় দুঢ়হ কাজ ছিল। তবে সেটা বুঝলাম,  সেটা হল- পেশাদার অভিনয়টা অন্তর থেকেই আসে। নূতন করে পাবার কিছু না থাকলেও হারাবার মত গোটা জীবন যেখানে পরে আছে, সেখানে সন্দেহ নামক করাল বিষবাষ্পের থেকে দুটি ভরন্ত পরিবারকে বাঁচাতে পারার তৃপ্তি সারা জীবনের সম্পদ।

   
কোলকাতা অভিমুখী ট্রেনটা ছাড়ার আগে ক্যাটবেরির বাক্সটা বাচ্চাটার হাতে তুলে দিয়ে বন্ধুত্ব করে নিলাম । মায়ের পায়ে হাত দিয়ে প্রনামের সময়, একটা বৃত্ত সম্পূর্ন হল। শেষ মুহুর্তের আলো আঁধারিতে অভিনয়ের খোলস খানিকটা ছিরে যেতেই একটা অনুরোধসূচক আদেশ ফুটে উঠল।
“শরীরের যত্ন নিও-”

সেই ১২ বছর আগের ভীষণ পরিচিত ভঙ্গি, সেই দাপট আর সেই অনবিল ভাববাচ্য , যেটা একমাত্র ক্রিজে থাকা দুত ব্যাটসম্যানকে রান-আউট থেকে বাঁচায়। সেদিন সূর্যোদয়ের লালচে আভাতে ক্যালাঙ্গুট সৈকতে, স্ত্রীর হাত শক্ত করে ধরে হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলাম- যাত্রাশুরুর ট্রেনের কামরাতে ঐ হঠযোগটা, ‘এ্যাসেট না লায়াবিলিটি’! বুঝতে পারিনি আজও। তাই এই ধরনের ভ্রমণে লাভ ক্ষতির করাটা নিতান্তই বোকামি।

——

সমাপ্ত

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *