চালচিত্র- ১

মাছেভাতে বাঙালি বললে আমাদের আমোদের পালে হাওয়া লাগে। পৃথিবীর সকল প্রান্তেই মাছ জুটুক বা না জুটুক, দিনেরশেষে একটিবার হলেও ভাত চাই ই চাই। গরীবের ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’, তো অহংকারী বড়লোকের ‘ভাত ছড়ালে কাকের অভাব হয়না’ এমন হরেক নীতিতে বিশ্বাস। বাঙালীর শত্রুর দল অধিকাংশ ‘হাতে না মেরে ভাতে মারা’র মত আপ্তবাক্যে বিশ্বাসী হলেও আমরা আসলে অধিকাংশেই জানিনা ঠিক ‘কত ধানে কত চাল’ হয়। এই ভাত সংক্রান্ত বাগধারাই কি সমাজে কম?

সারা পৃথিবী জুড়ে খাদ্যের মূল যোগান হিসাবে ভাতই জনপ্রিয়। সভ্যতার আদি কাল থেকেই গম, ভুট্টা, জোয়ার, মিলেট জাতীয় শস্যের সাথে ধান চাষ করা হয়ে থাকে। এশিয়া আর আফ্রিকা মহাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য হল চাল, যেটা ধান গাছের বীজ। বিরিয়ানি হোক বা ফ্রায়েড রাইস কিম্বা দৈনিককার হেঁসেলের ভাত, সবই তৈরি হয় চাল থেকে। চালের প্রজাতির উপরেই ভাতের গুনাগুণ নির্ভর করে। একটা সময় ছিল যখন সারা বছরে শুধুমাত্র একবারই ধানের চাষ হত, এখন প্রযুক্তির কল্যাণে দুইবার বা তিনবারও ধান চাষ হয়ে থাকে। ধান গাছের সকল অংশই মানুষের ব্যবহার যোগ্য।

চাল খাদ্য হিসাবে, ধানের গাছ বা খড় পশুখাদ্য হিসাবে ও ছাওনির কাজে, ধানের খোসা বা চোকলা বিকল্প জ্বালানী হিসাবে , ধানের মিহি কুঁড়ো থেকে ভোজ্যতেল – Rice Bran Oil প্রস্তুত হয়। পাকা ধানগাছ কেটে নেবার পর সেই কর্তিত অংশ বা নাড়া গুলো গ্রামগঞ্জের চাষীবাড়িতে চুলোর জ্বালানীহিসাবে ব্যবহৃত হয়, এছারা ওইগুলো গোবরের সাথে পচিয়ে জৈব সারও প্রস্তুত করা হয়।
ছোট্ট করে ধানের চাষ সম্বন্ধে একটু জেনে নেওয়া যাক।


নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের মূলত সমতল জমিতে ধানের চাষ হয়ে থাকে। তিনমাসের একটু বেশি সময় নেওয়া ধান চাষের জন্য গোটা সময়ের প্রায় ৯০% সময় জুড়ে প্রচুর জলের প্রয়োজন হয়। ধান সরাসরি জমিতে বুনে চাষ করা হয়না, বা হলেও ফলন হয়না। প্রথমে ধানের বীজকে জলে ভিজিয়ে চটে বা কাপড়ের বস্তায় ২৪-৪৮ ঘন্টা পর্যন্ত রেখে দিলে ধান কলিয়ে যায় ছোলার মত। এর পর সেই অঙ্কুরিত ধানবীজগুলোকে আগে থেকে সার-খোল দিয়ে প্রস্তুতকরা ছোট কাদা জমিতে ছিটিয়ে দেওয়া হয়। চারা ধান গাছগুলি বিঘৎ খানিক লম্বা হলে, সেগুলো বীজতলা থেকে শিকড় শুদ্ধু সাবধানে উঠিয়ে জল জমা মূল জমিতে নির্দিষ্ট সারিতে রোপন করা হয়।
বাৎসরিক হিসাব বিভাগের ভিত্তিতে ধানচাষকে তিনটি বিভাগে ভাগ করা হয়; আমন, বোরো ও আউস ধান।

আমন ধানই বেশি পরিমাণে চাষ করা হয়। আমন শব্দটিকে হেমন্তের অপভ্রংশ বলে মনে করা হয়। বৈশাখ- জ্যৈষ্ঠ মাসে বীজতলা প্রস্তুত করে, ভরা বর্ষাতে প্রতিটি জমিতে যখন জল জমে থাকে তখন মূল জমিতে রোপন করা হয়। কার্তিক অগ্রহায়ন মাসে সোনালি ফসল চাষির খামারে তোলা হয়। একর প্রতি সর্বোচ্চ ৩০ কুইন্টাল পর্যন্ত ফলন হয় এই মরসুমে।


শীতের সময় কৃত্রিম সেচের উপরে নির্ভরশীল ধানচাষকে বোরো ধান বলা হয়। বোরো চাষকে খাদ্য বিপ্লবের অংশ হিসাবে ধরা হয়, কারন বিশ্বজুড়ে খাদ্য সঙ্কটের অনেকটাই কমাতে সমর্থ হয়েছে এই যুগান্তকারী কৃষি প্রগতি। বাংলা নববর্ষে বোরো ফসল পাওয়া যায়। অধিকাংশ সরু ধানের চাষ এই সময়ই হয়ে থাকে। এই মরসুমের সর্বোচ্চ ফলন একরপ্রতি ২০ থেকে ২২ কুইন্টাল পর্যন্ত হয়।


আউসধান সারা বছরই চাষ করা সম্ভব, কিন্তু তেমন ফলন হয়না একরপ্রতি সর্বোচ্চ ১৫-১৮ কুইন্টাল মাত্র। এই ধান যেমন খরা সহ্য করতে পারে তেমনই বন্যার জলের সাথে পাল্লা দিয়ে টিকে থাকতে সক্ষম। চৈত্রের খরাতে বীজ বুনে দেওয়া হলে আষাঢ়েই ফসল পাওয়া যায়। এই অল্প সময়ের জন্য তথা আশু নাম থেকে আউস নামের উৎপত্তি। একটা সময়ের এই জনপ্রিয় চাষ, বোরো চাষের প্রভাবে আজকাল অত্যন্ত কম জমিতেই হয়।
এতো গেল ধান চাষের কথা। এখন দেখা যাক চালের নানান প্রজাতি।

চাল সাধারণত দুই ধরনের; মোটা চাল ও সরু চাল। ভারতবর্ষের পাহাড়ি অঞ্চল ও গোবলয়ের কিছু রাজ্য বাদে সর্বত্র চালই প্রধান খাদ্য শস্য, পড়শি দেশ বাংলাদেশেও তাই। সারা পৃথিবীর নিরিখে চালকে অবশ্য বাসমতি আর নন-বাসমতি প্রজাতিতে শ্রেনিবিভাগ করা হয়। এর পরের বিভাগটি প্রক্রিয়াকরনের উপরে নির্ভরকরে হয়, সিদ্ধ চাল, এক সিদ্ধ বা এক ভাপা চাল ও আতপ চাল। পচিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের বাঙালীরা ছাড়া সকল ভাতপ্রিয় জাতিই আতপ বা এক সিদ্ধ চাল খেতে পছন্দ করে।

ভারতের কৃষি এবং খাদ্য দপ্তরের মানদণ্ড অনুযায়ী নন বাসমতী ক্যাটাগরির চাল দুই ধরনের, Common Rice ও Grade-A Rice। খাদ্য সুরক্ষার আওতাতে বা গনবন্টন ব্যবস্থার অন্তর্গত সাপ্তাহিক রেশন, মিড-ডে মিল, অন্নদয় ও অন্ত্যদয় যোজনা, SGRY, BPL, APL, নারী ও শিশু সুরক্ষা ইত্যাদি সরকারি প্রকল্পে যে চাল সরবরাহ করা হয়ে থাকে সেগুলো প্রায় সবই ওই কমন রাইস প্রজাতির। উৎসবের মরসুমে সময় বিশেষে গ্রেড-এ ধরনের চালও দেওয়া হয়ে থাকে।

চালের গুনগত মান নির্ভর করে মূলত চারটি জিনিসের উপরে। দৈঘ্য, দানার আভ্যন্তরীন আদ্রতা, উপস্থিত ভাঙা দানা বা খুদের পরিমাণ ও অপমিশ্র উপাদানের পরিমাণ। প্রজাতি বিশেষে চালের দানার দৈঘ্য কমবেশি হলেও বাকি তিনটির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক গুনমান সূচক আছে। দানার আভ্যন্তরীণ আদ্রতার প্রামাণ্য সূচক ১৪.২০%। ক্রমান্বয়ে ভাঙা চাল বা খুদ ও অপমিশ্র পদার্থের পরিমাণ যথাক্রমে ৫% ও ০.২%। সুইজারল্যান্ডের SGS নামক কোম্পানিকৃত গুনমান শংসাপত্রই বিশ্বজুড়ে সর্বাধিক স্বীকৃত ও গ্রহণযোগ্য।

… ক্রমশ

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *