সারা বছরের নিরিখে একলপ্তে অনেকগুলো টানা ছুটি পাওয়া যায় এক গ্রীষ্মকালীন আর এই পূজোর সময়ে। ভ্রমণের স্থান বলতে গেলে যদি একা বা বন্ধুর সাথে যাওয়ার হয় সেক্ষেত্রে ভিতরকনিকার জঙ্গলই হোক বা মধ্যপ্রদেশের চান্দেরি দূর্গ; ল্যাদ খেয়ে কাটানোর জন্য সকল স্থানই সমান, যার পোষাকি নাম হাওয়াবদল। কিন্তু এই সময় বাচ্চাদের স্কুল কলেজেও ছুটি থাকে, তাই সপরিবারে ভ্রমণের মজাটাই আলাদা। এখনকার কোলকাতা ও শহরতলীতে শীত হল এক-আধ দিনের অতিথি মাত্র, কখন আসে আর কখনইবা পালায় অনুভূতই যায়না। বাকি সময়টা হল, অসহ্য গরম, গরম আর সহনীয় গরম। পূজোর সময়টা হল সেই সহনীয় গরমের মধ্যে। উত্তরবঙ্গ সহ সিকিমের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বর্তমানে মোটেই ভ্রমণ বান্ধব নয়, রইল বাকি কাছাকাছি দীঘা আর পুরী; সুতরাং সেই খাড়া বড়ি থোর। হিমাচল, কাশ্মীর বা গোয়া যাতায়াত সময় সাপেক্ষ এবং খানিকটা ব্যয়বহুলও। অথবা দেখা যাবে ও জাইগা আগে বেশ কবার গেছেন; অতএব নতুন স্থানের খোঁজ। আমরা দেব সেই সুলুক সন্ধান। চলুন পাড়ি দিই আমাদের উত্তর পূর্ব ভারতবর্ষের উদ্দেশ্যে।

উত্তরপূর্ব ভারতবর্ষের রূপ বাকি অবশিষ্ট ভারতের থেকে ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ভৌগলিক রূপের বিচারে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। এখানকার মায়াবী প্রকৃতিক সৌন্দর্য যেকোনো গোমরাথোরিয়ামকে কবি বানিয়ে দেবার ক্ষমতা রাখে। আসাম, অরুনাচলপ্রদেশ, মিজোরাম, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা ও মনিপুর নামক ৭টি অঙ্গরাজ্য দিয়ে এই উত্তরপূর্বাঞ্চল গঠিত, যাদের একত্রে সেভেন সিস্টার স্টেট ও বলা হয়ে থাকে। উত্তর পূর্বের প্রায় ২০০০ কিলোমিটার জুড়ে আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে চীন, ভুটান, মায়ানমার ও বাংলাদেশের সাথে। এই সাতটি রাজ্যই ভ্রমনপিপাসুদের স্বর্গ, কারন ছবির মত সুন্দর ল্যান্ডস্কেপের সাথে উদ্ভিদ ও জীববৈচিত্র তাক লাগিয়ে দেবার মত এবং অপ্রতিম। সাথে জঙ্গল সাফারি, খরস্রোতা নদীতে র্যাাফটিং, পাহাড়ী পথে ট্রেকিং সহ নানান এডভেঞ্চার স্পোর্টসের হাতছানির দূর্দমনীয় টানকে প্রত্যাখ্যান করার ক্ষমতা নেই।

ক্লাস সিক্সের ভুগোল বইতেই জেনেছিলাম চেরাপুঞ্জির নাম, পৃথিবীর সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত যুক্ত অঞ্চল। গারো, খাসি আর জয়ন্তী পাহাড় দিয়ে তৈরি এই ছোট্ট রাজ্যটার নাম মেঘালয়, যেখানে চেরাপুঞ্জি অবস্থিত। সংস্কৃত এই নামের বাংলা মানে হল মেঘেদের আবাসস্থল। মেঘালয়ের রাজধানি শিলং কে পাহাড়ের রাজা নামে অবিহিত করা হয়, এখানকার পাইন বনের দৃশ্য সময়কে যেন বন্দি করে রেখে দেয়। এ জিনিস নিজে চাক্ষুষ না করলে বর্ণনাতে ব্যাখ্যা করা কঠিনিই নয়, অসাধ্য। সবুজ গালিচা বিছানো পাহাড়ি পথের বাঁকে বাঁকে পোষা ভেড়ার পালের মত দেখা মিলবে মেঘেদের ছানাদের। মূলত ব্রিটিশদের হাতে পূননির্মিত সাহেবিকেতার কান্ট্রিহাউসের পীঠস্থান ‘প্রাচ্যের স্কটল্যান্ড’ শিলং নিজেই যেন চিত্রকরের আঁকা দিগন্ত বিস্তৃত পটশিল্প।

এই শিলংকে কেন্দ্র করে গোটা মেঘালয়কে উপভোগ করাই সবচেয়ে সেরা সিদ্ধান্ত। নয়নাভিরাম ভূদৃশ্যের পাশাপাশি কতগুলো মন্ডলে মেঘালয়ের সৌন্দর্যকে ভাগ করে নেওয়া যেতে পারে।

১) মেঘের সাথে খেলা-
চেরাপুঞ্জি পাহাড়ের দক্ষিণ ঢালের মৌসরামেই যেহেতু পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়, সঙ্গত কারনেই সারা বছর এখানে মেঘের কুম্ভমেলা বসে। সারাটাক্ষন একটা স্যাঁতস্যাঁতে যাদুকরী আবহওয়ার এক অন্য রকমের ভ্রমণের আদর্শ গন্তব্য এই মেঘালয়।

২) জীবন্ত সাঁকো-
গাছের শিকড় দিয়ে তৈরি হওয়া এক আশ্চর্য সাঁকোর দুরন্ত অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে হলে আপনাকে যেতেই হবে মেঘালয়। জীবন্ত গাছের শিকড়গুলোকে নিপুণ পদ্ধতিতে বুনে এ এক আশ্চর্য স্থাপত্য কারিগরি। জল, বৃষ্টি, ঝরনা, পাহাড়, ও ধস কবলিত প্রদেশের সড়ক যোগাযোগ ব্যাবস্থাতে সেই আদিম কাল থেকেই স্থানীয় উপজাতিরা বিশেষ ধরনের গাছকে ছোট থেকে পরিচর্যা করে তার শিকড় জুড়ে জুড়ে এই ধরনের সেতু বানিয়ে তুলেছে। পাহাড়ি খাদগুলোর খরস্রোতা প্রবাহ থকে রক্ষা পেতে ও দুই প্রান্তকে জোড়ার জন্য এই ধরনের সেতুর নির্মান। যেটা প্রাকৃতিক উপায়ে সম্পূর্ন মজবুত হতে প্রায় ৫০ বৎসর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দ্বিতল, ত্রিতল বিশিষ্ট সাঁকোও দেখা যায়। কংক্রিট পূর্ববর্তী যুগের মানুষের এ এক অলৌকিক স্থাপত্যশিল্প যেটা আজও এক বিস্ময়, সেটা স্বচক্ষে দেখা একটা লাইফটাইম দর্শন সুখের অন্যতম।

এছারা অরুনাচল প্রদেশের জিরো ভ্যালী, তওয়াং, আসামের মাজুলি উপদ্বীপ, মনিপুরের মৈরাং-লোকটাক হ্রদ, যুকৌ ভ্যালী অফবিট ভ্রমণের জন্য আদর্শ স্থান।


পরবর্তী সংখ্যাতেও থাকবে এমনই আকর্ষনীয় সুলুক সন্ধান।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *