যুগ যুগ ধরেই মানবসমাজ শিল্প-সৌন্দর্য্যের পূজারী। সেই আদিমকাল থেকেই নানান অকৃত্রিম উপায়ে সৌন্দর্য্যের সাধনা করে চলেছে। এই সাধনার ফলস্বরুপই এসেছে শৈল্পিক মানসিকতা, জন্ম নিয়েছে শিল্পকলা। নিত্য ব্যবহৃত জিনিষে শিল্পের ছোঁয়া নিয়ে ধীরে ধীরে মানবসমাজে নিজস্ব জায়গা করে নিয়েছে ‘লোকশিল্প’ রূপে। লোকশিল্পের অর্থ হল লোক অর্থাৎ আমমানুষের শিল্প, যাতে না থাকে বাহুল্যেমোড়া ঝাঁ ঝকঝকে বিলাসিতা, না থাকে বর্হিবিশ্বকে সন্তুষ্ট করার চাহিদা। থাকে সারল্যতা, নিজস্বতা এবং সর্বোপরি নিজেদের সাধারণ চাহিদা পূরণের ইচ্ছে। এই ইচ্ছের সাথেই শৈল্পিক মনের ভাব,কামনা-বাসনার মিশেলেই তৈরী হয় অমর লোকশিল্প।

মোটামুটিভাবে লোকশিল্পের তিনটি পর্যায়ে আছে বলা ধরা হয়। প্রথম পর্যায়ে লোকশিল্পের রীতি, অর্থাৎ কিভাবে তা করা হবে। দ্বিতীয় পর্যায়ে তার ব্যবহারিক প্রয়োগ এবং তৃতীয় পর্যায়ে সমষ্টিগত ভাবে তা ছড়িয়ে দেওয়া।

ভারতবর্ষের নানান প্রান্তে নানান লোকশিল্প নিজ নিজ পরিসরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। লোকশিল্পের অন্যতম উদাহরণ হলো সূচিশিল্প। সূচিশিল্প অর্থাৎ সূচ ও সুতোর সাহায্যে সেলাই। শুধু সেলাই বললেও ভুল হবে, আমার মত অনেকের কাছে সূচিশিল্প মানে মনের ভাব প্রকাশের এক অন্যতম মাধ্যম। যেখানে শিল্পী তার কল্পনার মাধুরী রংবেরং এর সুতোর সাথে মিশিয়ে তীক্ষ্ণ অথচ সূক্ষ্ম অস্ত্রে একের পর এক শৈল্পিক পটভূমি এঁকে যায়। হয়তো সেটা সামান্য ফুল-পাতা তবুও তাতে শিল্পীর হাতের ঘামের গন্ধের সাথেই একক শৈল্পিক আবেশ থেকে যায়। এর জন্য প্রয়োজন অসীম ধৈর্য, নৈপুণ্য, লেগে থাকার মানসিকতা ও দক্ষতা।

সূচিশিল্পের অন্যতম নিদর্শন হলো আমাদের গ্রাম বাংলার ‘কাঁথাশিল্প’। ‘কাঁথা’ শব্দটি শোনামাত্রই আমাদের মতো মধ্যবিত্তদের চোখে ভেসে ওঠে ছোট্ট বাচ্চার বিছানার কথা অথবা হালকা শীতে গায়ে দেওয়া জিনিষটার কথা। আজকের আধুনিক যন্ত্র সভ্যতাতে কাঁথার চল হয়ত খুবই কম, নগর জীবনে প্রায় নেই বললেই চলে, কিন্তু একসময় উষ্ণতার জন্য কাঁথার কোনো বিকল্প ছিলনা। কথাতেই আছে বর্ষার ছাতা আর শীতের কাঁথা মোটেই হাতছারা কোরোনা।

কাঁথা শিল্পের ব্যাপ্তি যে শুধু এটুকুই নয় তা প্রাচীন ইতিহাস ঘাঁটলেই জানা যায়। ভারতীয় সূচিশিল্পের ইতিহাসে কাঁথা শিল্প আদিমতম। লিখিত প্রামাণ্য নথি হিসাবে প্রায় ৫০০ বছর আগে কৃষ্ণদাস কবিরাজের লেখা “চৈতন্য চরিতামৃত” এ কাঁথার উল্লেখ পাওয়া যায়, যেখানে কবি লিখেছেন চৈতন্যের মা সাঁচী তাঁর পুত্রের জন্য পুরীতে পূর্ণ্যার্থীদের হাতে কাঁথা পাঠিয়েছিলেন। সম্ভবত এটিই সবথেকে প্রাচীন নিদর্শন যেখানে কাঁথার উল্লেখ পাওয়া গেছে। কথিত আছে ভগবান বুদ্ধ ও তাঁর অনুগামীরা ছেঁড়া কাপড় একসাথে জুড়ে কাঁথা তৈরী করতেন রাত্রিকালে নিজেদের শরীর ঢাকার জন্য। ঋকবেদ, উপনিষদ, মেগাস্থিনিসের ‘ভারতবৃত্তান্ত’, পাণিনির অষ্টাধ্যায়ীতেও কাঁথার উল্লেখ পাওয়া গেছে।

সংস্কৃত শব্দ “কন্ঠা” থেকেই সম্ভবত “কাঁথা” শব্দের উৎপত্তি, যার অর্থ ‘ছেঁড়া কাপড়’। যদিও ‘কন্ঠা’ অর্থে নীলকন্ঠ শিবকেও বোঝানো হয়। আঞ্চলিকভাবে কাঁথা শব্দটির বিভিন্ন উচ্চারণ আছে- ‘ক্যাঁথা’, ‘কাঁতা’, ‘ক্যাতা’, ‘কেথা’ ইত্যাদি। ওড়িশা প্রভাবিত বাংলার অংশে কাঁথাকে আবার ‘গুদড়ি’ও বলা হয়।

লোকশিল্পের তিনটি পর্যায় যদি কাঁথাশিল্পে পর্যালোচনা করা যায় –

প্রথমেই আসবে রীতি বা কৌশল। কাঁথা মূলত বাংলার মেয়েদের দ্বারা ঘরোয়া বা কুটির শিল্প। গৃহবধূরা তাদের অবসর সময়ে পুরোনো শাড়ি, ধুতি ৩-৪টে করে জুড়ে কাঁথা তৈরী করতো। সেলাই করার সুতো হিসাবে পুরোনো সিল্ক শাড়ির পাড় থেকে সুতো খুলে সেগুলো সূচে ব্যবহার করতো । এইভাবেই কাঁথা শিল্প ‘first rerecycling art of the world’ হিসেবে বিস্তার লাভ করেছিল। সেলাই এর ফোঁড় বা স্টীচটি হলো ‘রান’ স্টীচ। ইংরেজী শব্দ ‘run’ থেকেই এটি উদ্ভুত বলে আমার ধারণা। কারণ একবার সূচে সুত ভরে নির্দিষ্ট পথে একপ্রকার দৌড়ই বটে কাঁথাস্টীচ।

লোকশিল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে আছে এর ব্যবহারিক প্রয়োগ, কী ভাবে বাড়ির মহিলারা কাঁথা স্টীচকে কাজে লাগাতেন বা লাগান! ব্যাবহারিক ভিত্তিতে বহুদিন থেকেই কাঁথার নানান প্রকারভেদ আছে, যেমন- সুজনী কাঁথা,লেপ কাঁথা, ওয়াড় কাঁথা, বাচ্চাদের শোয়ার কাঁথা, বোচকা কাঁথা, বর্তন ঢাকনি, দস্তরখান, নক্সি থলি, আরশিলতা, জায়নামাজ, আসন ইত্যাদি। সবক্ষেত্রেই কাঁথা স্টীচ ব্যবহৃত হয়। এগুলোতে নানান ধরনের ফুল-পাতা, মূর্তি ইত্যাদি যা শিল্পীর মনে আস তেমনটাই নক্সা হিসেবে ফুটে উঠে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে নক্সাতে দেব-দেবীর প্রতিকৃতি ফুটে উঠে, ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে নানান জ্যামিতিক প্যাটার্ন,ফুল-পাতার আধিক্য বেশী হতো। আবার তৎকালীন সমাজব্যবস্থার নানান চিত্রও ফুটে উঠতো। এছারাও, আদিবাসী, বৌদ্ধ, জৈন, শিখ, পার্শি সমাজেও তাদের নিজ নিজ ভাবনার প্রকাশ সূচীশিল্পের দ্বারা প্রতিভাত হয়েছে যা আজও নিজ নিজ সংস্কৃতিতে বহমান।

নক্সার কথা হচ্ছে যখন, নক্সীকাঁথার কথা আসবে না তা কখনো হয়! কাঁথা শিল্পের অন্যতম নিদর্শন হল ‘নক্সীকাঁথা’। ‘নক্সী’ কথাটি এসেছে বাংলা শব্দ ‘নক্সা’ থেকে। পল্লীকবি জসীমুদ্দিনের ‘নক্সীকাঁথার মাঠ’ কাব্যে আমরা দেখেছি কীভাবে সাজু রুপাই এর বিরহে কাতর হয়ে তার মনের কষ্ট নক্সীকাঁথাতে ফুটিয়ে তুলেছিল। এখনকার যুগে আমরা অনেকেই যেমন নিজস্ব ডাইরীতে নিজেদের কথা লিখে রাখি, তখনকার গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে গৃহবধূদের কাছে নক্সীকাঁথা ‘personal diary’ হিসেবেই গণ্য করা হয় অনেকের কাছেই। এক একটা নক্সীকাঁথা এক একটা কাহিনী ব্যক্ত করে সে গৃহবধূদের রোজকার জীবনযাত্রার কাহিনী হোক বা সমকালীন কোনো ঘটনা বা কোনো পৌরানিক কাহিনী। নক্সীকাঁথা আজও সারাবিশ্বের সূচিশিল্পের ইতিহাসে এক অনন্য স্থান অধিকার করে আছে।

এরপর আসবো লোকশিল্পের তৃতীয় পর্যায়ে অর্থাৎ এই শিল্পকে যেভাবে সমষ্টিগতভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কয়েকশ বছর ধরে চলে আসা গ্রামবাংলার গৃহবধূদের এই শিল্প ঘরে ঘরে প্রচলিত ছিল। এর একটা অন্যতম কারণ ছিল পদ্ধতিগতভাবে ‘রান’ স্টীচ ভীষণ সহজ এবং সহজেই শিখণযোগ্য। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই শিল্প কোথাও না কোথাও গুটিকয়েক সমাজে মধ্যে আবদ্ধ হয়ে ঘরের অভ্যন্তরে রয়ে গিয়ে অন্তরালে হারিয়ে যাচ্ছিল। ১৯৪০ এর দশকে কাঁথাশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করে বিশ্বায়ণের উদ্যোগ নেয় Kala Bhabana Institiute of Fine Arts, যা শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ একটি সংস্থা। এরপরে কাঁথাশিল্প ঢিমেতালে বিস্তার লাভ করলেও সবথেকে বেশী ছড়িয়ে পড়ে ১৯৮০ এর দশকে শামলু দুদেজা এবং তাঁর কন্যা মলিকা দুদেজার হাত ধরে। তাঁরা কাঁথাশিল্পকে বিশ্বের দরবারে বাণিজ্যিকভাবে উত্তরণ ঘটানোর এক আমুল প্রয়াস করেন। তিনি বহু সেলাই জানা ঘরোয়া মহিলাদের নিয়ে SHE( Self Help Enterprise) গড়ে তোলেন যার অধীনে অবসর সময়ে তারা আড্ডাচ্ছলে একসাথে বসে একের পর এক কাঁথা স্টীচের নিদর্শন গড়ে তোলে। যার চাহিদা শুধু এদেশে নয়, সারা পৃথিবীতে দিন দিন উত্তোরত্তর বেড়েই চলেছে। SHE এর তত্ত্বাবধানে ‘শক্তি’ ও ‘দোয়ার পে রোজি’ নামক দুটি সংস্থা গড়ে ওঠে যা কাঁথা শিল্পের বাজার ধরতে অন্যতম ভূমিকা গ্রহণ করে।

বর্তমানে বীরভূম, বর্ধমান, হুগলী, উত্তর ও দক্ষিন ২৪ পরগণা, মুর্শিদাবাদ ইত্যাদি জেলায় লক্ষ লক্ষ মহিলারা এই শিল্পের আধুনিকীকরণে বানিজ্যিকভাবে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে জড়িত। হাল ফ্যাশনের জগতে একটি অন্যতম সংযোজন হল ‘বুটিক’ যেখানে নিত্যনতুন পোষাক-পরিচ্ছদের সম্ভার তৈরী হয় এই সূচিশিল্পের ওপর ভর করেই। শাড়ি, চুরিদার, পাঞ্জাবী, কুর্তি, কুর্তা ইত্যাদি নানান পোষাকের পাশাপাশি বাড়ির অন্দরমহলের সাজসজ্জা, ব্যাগ, মানিপার্স…. সবেতেই এখন কাঁথা শিল্পের সাবেকিয়ানার সাথে আধুনিকতার ছোঁয়া। এরফলে একদিকে যেমন প্রাচীন এই শিল্প আজও তার প্রসার সগর্বে করে চলেছে তেমনই প্রাচীন গ্রামবাংলার বধূদের হাতে তৈরী হওয়া এই শিল্প আজকের দিনে বহু নারীর রুজিরোজগারের সংস্কার ঘটানোর পাশাপাটি একটা সমৃদ্ধশালী অতীতকে বয়ে নিয়ে চলেছে।

ভারতীয় লোকশিল্পের অন্যতম জনপ্রিয় ঐতিহ্যশালী নাম কাঁথাশিল্প যুগে যুগে আরো বিস্তারলাভ করুক এই স্বপ্ন ও ইচ্ছে আগামী প্রজন্মের কাছে দাবী হিসাবে রেখে গেলাম।

তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট

~শেহনাজ আলম হক

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *