সম্পাদকীয়- উৎসব ১৪২৪

সমাজ একটি জীবন্ত শরীরের ন্যায়, যাহার পদপৃষ্ঠের নখরও সামান্যতম চোটগ্রস্থ হইলে ওই শরীরের মস্তকে অস্থিরতা শুরু হইয়া যায়। অসুস্থতার মূল কারনই হইল দুষ্ট সংক্রামক রোগের বীজাণু, সমাজের পীড়ার ক্ষেত্রেও এ নিয়ম ব্যাতিক্রম নহে। প্রামাণ্য যুক্তিগ্রাহ্যতার বাহিরে যাইয়া কল্পিত ভ্রমকে, সত্য রূপে প্রতিষ্ঠিত করিবার ব্যাধি আজিকের সমাজে দুষ্ট সংক্রমণকারি মহামারী রূপে বিস্তারলাভ করিয়াছে। আশাবাদী মানুষসকলই ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা হন ও উন্নত আগামী গঠন করিয়া থাকেন, যাহার জন্য প্রয়োজন দৃঢ় সংকল্প। তথাপি কেহ প্রবল আশাবাদী হইয়া, বাস্তব ভুলিয়া কল্পিত ভবিষ্যতে অনেকেই বসবাস করিতে শুরু করিয়া দেন; সেই একই বাস্তব সংকল্প ও উদ্যোমের সহিত। সমাজে তখনই উন্মাদ নামক প্রজাতির সৃষ্টি হয়, যাহাদের অযৌক্তিক উন্মত্ততাই সমাজের বুকে অস্থিরতার জন্ম দান করিয়া থাকে।

সামাজিক জীব মানব ক্ষুন্নিবৃত্তি নিবারনের জন্য পৃথক পৃথক পেশার সহিত যুক্ত হইয়া থাকে। সামাজিক অবস্থানের বিচারে গোটা পৃথিবীজুড়িয়া সম্মানের পেশা হিসাবে স্বীকৃত ‘বিজ্ঞানচর্চা’ জনপ্রিয়। আজিকের অবশিষ্ট শিক্ষিত সমাজ, বিজ্ঞানের সেবকদিগকে পৃথক সম্প্রদায় হিসাবে বিজ্ঞের মর্যাদা দান করিয়া থাকে। এক্ষেত্রে বিজ্ঞান আর বিজ্ঞ শব্দ দুইটি উপস্থিত, অতএব পরিসরে যুক্তি নামক শব্দ বন্ধটিকেই যে সর্বচ্চো পদে আসীন করানো হইবে, তাহা বলাই বাহুল্য। যুক্তি সর্বদাই প্রামান্য দলিলের উপরে নির্ভরশীল, কল্পিত প্রতীতি সংজ্ঞার উপরে নয়। কিন্তু সার্বিক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন উদ্যাপিত করিবার জন্য কতিপয় ব্যাক্তিবর্গের গন্ডি অতিক্রম করিয়া, গোটা সমাজেরই উচিৎ যুক্তিগ্রাহ্য মতামতকে প্রাধান্য দিয়া আপনাভ্যন্তরে জারিত করিয়া লওয়া।

প্রতিটি ধর্মীয় মতবাদই তাহাদের পুস্তকে দাবি করিয়া থাকেন যে তাহারাই শ্রেষ্ঠ ও সর্বচ্চ সহনশীল মতবাদের অধিকারী। আম জনগন, যাহাদের সাধারন বুদ্ধিতে সেই মতবাদ মর্মোদ্ধার করিতে অক্ষম হইলে বা প্রশ্ন উঠাইলেই সহনশীলতার ব্যবহারিক প্রয়োগ ভুলিয়া; মারন অস্ত্রের ঝঙ্কার দ্বারা শান্তি কায়েম করিতে রত হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ইহার কোনো হিন্দু, মুসলমান, খ্রীষ্টান, শিখ, বৌদ্ধ , ইহুদী ইত্যাদি প্রভেদ নাই, আঞ্চলিক শক্তির বিচারে যে দল বলশালী, তাহারাই উপরোক্ত পদ্ধতিতে সহনশীলতা প্রদর্শন করিয়া থাকে।

বিজ্ঞানীগনও এই সমাজেই বসবাস করেন, তথাপি আপন অধ্যয়ন বিনা বহির্বিশ্বের যাবতীয় সমাজের প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা সাধারনত তাঁহারা দেখাননা। যুক্তির দক্ষ বিশ্লেষণ এনাদের থেকে ভাল আর কেই বা করিতে সক্ষম নিজ নিজ বিষয়ে। অথচ সামাজিক অস্থিরতার প্রশ্নে তাঁহারা সম্পূর্ণ মূক ও বধিরতা অবলম্বন করিয়া থাকেন। ধর্মগ্রন্থগুলি দাবি করিয়া থাকে তাহার অভ্যন্তরেই যাবতীয় বিজ্ঞানচর্চার বীজ প্রেথিত, অথচ যাহারা নতুন কিছু আবিষ্কারক হিসাবে ঘোষিত; তাঁহারা কোথাও দাবি করেননি যে, কোনো বিশেষ ধর্মগ্রন্থ পড়িয়াই এই আবিষ্কার করিয়াছেন অথবা নুন্যতম সাহায্য পাইয়াছিলেন।। অথচ তাহারা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাতে নিজেদের সুরক্ষিত কক্ষেই বন্দি করিয়া রাখেন, আর দেশ তথা সমাজকে কিছু অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত রাজনৈতিক নেতাদের হাতে উন্মুক্ত করিয়া দেন।

নিকৃষ্ট স্বার্থবাজেদের দল সকল সময় আবেগকে পুঁজি করিয়া থাকেন, গ্যালিলিও–কোপারনিকাসদের আমল হইতেই যুক্তির সহিত স্বার্থান্ধদের বৈরিতা সর্বজন বিদিত। ঈশ্বরবাদের সহিত বিজ্ঞানের প্রতক্ষ্য সংঘাত নেই, কুসংস্কার, অলৌকিক বিশ্বাসের সাহিত অবশ্যই রহিয়াছে। জনগন পরিকল্পিত ছলচাতুরিতে পারদর্শী নয়, তাহারা যুক্তিও বোঝেন। প্রয়োজন শুধু যুক্তিবাদীদের সাথে জনগনের ক্রম সম্মেলনের। রাষ্ট্রকেই এই সকল যুক্তিবাদী সম্মেলনের পৃষ্ঠপোষক হইয়া; ইহার সহিত জুড়িয়া থাকা সকল ব্যাক্তিকে সামাজিক সুরক্ষা প্রদান নিশ্চিত করিতে হইবে, মানবজাতীর স্বার্থে।

এক্ষনে রাষ্ট বা রাষ্ট্রপিতাই যদি কুযুক্তির প্রজ্ঞাপন করেন তথা পৃষ্ঠপোষক হয়, সাধারন জনগনের সমাজকে দুষ্ট সংক্রমন থেকে বাঁচাইবে কে?

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *