সম্পাদকীয় – চড়ুইভাতি ১৪২৪

রাষ্ট্র, আপামর জনসাধারণের নিকটে একটি বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান, আশ্রয়, অন্নের যোগান, সার্বভৌম কতৃত্বকারী জিম্মাদার স্বরূপ। কোনো নির্দিষ্ট ভৌগলিক সীমানা ‘রাষ্ট্র’ হিসেবে মনোনীত হয় যখন, তাহা সমুদয় রাষ্ট্রসমূহ দ্বারা স্বীকৃতও হয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালিত হইয়া থাকে একটি নির্দিষ্ট ‘সরকার’ এর মাধ্যমে। সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, বিজ্ঞানভিত্তিক নীতি দ্বারা সৃষ্ট বহুস্তরীয় জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে।

প্রশিক্ষিত আমলাতন্ত্র ও তাহাদের সাথে সমগ্র দেশজ জনগনের অনুকল্পরূপে মনোনিত বা নির্বাচিত প্রতিনিধি নির্বাচন হয়, ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শ যুক্ত বহুদলীয় বিচারধারার মাধ্যমে, যাহার নাম রাজনীতি। রাষ্ট্রের একেবারে নিম্ন বুনিয়াদি স্তর হইতে রাজনীতি শুরু হয়। রাজনীতিবিদদের কর্ম হইল, অন্তর্দেশীয় ও আন্তর্দেশীয় নানান বিষয়াদির উপরে কার্য সম্পাদন করা, যাহা নাগরিকদের তথা রাষ্ট্রের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করিবে; অর্থাৎ রাজনীতিবিদদের দ্বারাই রাষ্ট্রের গঠনমূলক ও কার্যমূলক নীতি রচিত, সংশোধিত হয়ে প্রশাসনের মাধ্যমে প্রয়োগ হইয়া থাকে।

রাজনীতির কারবারিদের সহিত এককালে অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল নীতিশিক্ষা, আজিকের দিনের প্রেক্ষিতে অবশ্য দুর্নীতির সাথেই সহাবস্থান, নীতির জলাঞ্জলী দিয়ে। নীতি হইতে আদর্শ, দর্শন, ধর্মতাত্ত্বিক ও নৈতিক বিচ্যুতিই হলো দুর্নীতি। যখন কোনো রাষ্ট্রের রাজনীতি, দুর্নীতি দ্বারা সম্পৃক্ত হয় অর্থাৎ যখন রাজনীতি হইতে নীতির বিচ্যুতি ঘটে, তাহার প্রভাব রাষ্ট্র তথা সমগ্র জাতির উপরে কর্কটব্যাধি রূপ ধারণ করে। দুর্নীতির বিস্তার আপাত দৃষ্টিতে খুব সাধারণ ভাবে শুরু হয়, অন্তহীন রিপু লোভের বসবর্তী হয়ে যাহা সিমা ছাড়াইয়া যায় অতীতকে।

দুর্নীতির করাল গ্রাস আমাদিগের রাষ্ট্র ভারতবর্ষের ‘গণতান্ত্রিক’ ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘুণপোকার মতো দুর্নীতি কুরে কুরে ধ্বংস করিয়া চলিয়াছে। রাজনীতির তৃনমূলস্তর হইতে দুর্নীতি “বায়োলজিক্যাল ম্যাগনিফিকেশনে”র মতোই ঊর্ধ্বমুখে স্তরে স্তরে উত্তোরত্তর বৃদ্ধি পাইয়াছে। যাহার শুরু আছে কিন্তু ইহার অন্ত কোথায় তাহা অজানা। আক্ষেপ নয়ে, ইহা ভয়াবহ; কারন দুর্নীতির এই জালেই ধরা দিয়েছেন দেশীয় রাজনীতির প্রায় ৯৫% রাজনীতিবিদ তথা জননেতা; যাঁহাদের নির্বাচন করিইয়া আমি, আপনি ও আমরা। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জনগণ ভোটাধিকার প্রয়োগের যে নিয়ম, তাহাতেই সর্বাপেক্ষা বৃহৎ দুর্নীতি, যেকোনো উপায়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করিবার লিপ্সা। গোটা দেশ অশুভের নাগপাশে বন্দি।

জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হইয়া ক্ষমতা হাসিল করিয়া, জনগণ প্রদেয় করের টাকাতেই তাহাদের আমৃত্যু চড়ুইভাতির আয়েসী কার্যকাল শুরু হইয়া যায়। দীর্ঘমেয়াদী বিচারব্যবস্থার ফাঁক গলাইয়া এই আয়েসী চড়ুইভাতির মৌরিশপাট্টার সমাপ্তি কিসে! ক্ষুদ্রস্বার্থজীবি জনগণ যবে ভাবনাতে স্বাবলম্বী হইবে, তখনই সম্ভব। কিন্তু কোন মন্ত্রবলে!

প্রশ্নটাই সবচেয়ে বড়।

দায়ী কে বা কারা কখনও ভেবে দেখেছেন!

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *