অস্মিতা

১)

যা ভ্যাপসা গরম তাতে কে বলবে এটা আশ্বিন মাস। দিনভর ঘেমে স্নান করতে করতে, অবশিষ্টটুকু নিংড়ে কোনো মতে মেদনীপুর লোকালটা ধরল অস্মি। সাথে অষ্টম বর্ষীয় পুত্র আয়ুষ। মহিলা কামরাতে উঠে ছেলেকে কোনো রকমে সিটের মাঝে গুঁজে দিয়ে ব্যাগটাকে সিটের তলাতে রেখে দিল।

মেচেদা আসতেই মা-ব্যাটার বসার জাইগা হয়ে গেল। আলন্ত শরীরে জানালার বাতাস লাগতেই চোখে অমাবস্যা করে ঘুম এলো। ঠিক কতক্ষণ ঘুমিয়েছিল মনে নেই, হঠাৎ ছেলের ডাকে সম্বিৎ ফিরল, ‘মা, খিদে পেয়েছে। ঝালমুড়ি খাবো’। অস্মি ভাবল একটু জল নেওয়া দরকার, ব্যাগের বোতলে সামান্যই অবশিষ্ট, ছেলে এক্ষুনি ঝাল লেগেছে বলে লাফাবে। নামবে কি নামবেনা ভাবতে ভাবতেই ১০-১৫ মিনিট অতিক্রান্ত হয়ে গেল। অন্য যাত্রীরা উসখুশ করলেও অস্মি এতক্ষণ শান্তই ছিল। এক সহযাত্রীর জিম্মাতে পুত্রকে রেখে জলের সন্ধানে নামল, স্টেশনে তখন শতশত বিরক্ত মানুষ। মাইকে ঘোষণা হচ্ছে অনিবার্য কারন বসত ট্রেন ছাড়তে বিলম্ব হচ্ছে, ইত্যাদি। জল ভরে এসে দ্রুত ট্রেনে চড়ে বসল অস্মি, বাইরের রেলবোর্ডে লেখা ভোগপুর ষ্টেশন।

২)

অস্মিতা মণ্ডল, চাকুরীজীবী বাবার একমাত্র কন্যা। তারা মেদনীপুরের অদূরে সাপকাটা গ্রামের বাসিন্দা ছিল। মেদনীপুর শহরে চাকরীর দরুন তারা ভাড়া বাড়িতে থাকত। মেধাবী অস্মি উচ্চশিক্ষার জন্য কোলকাতার প্রেসিডেন্সীতে ভর্তি হয়েছিল। নীলাঞ্জনের সাথে সেখানেই আলাপ। প্রেম, বিয়ে, ও পাঁচ বছরের লাগাতার অশান্তি শেষে অবশেষে ডিভোর্স।

অস্মির বিধবা মা সাপকাটাতে ২ কুটরি ঘর নির্দিষ্টভাবে মেয়ের নামে লেখাপড়া করে দিয়েছিলেন। সকালে দুটোখেয়ে ছেলেকে স্কুলে দিয়ে নিজেও মেদনীপুরের একটি ইংরাজি মাধ্যমের  স্কুলে পড়াতে চলে যায় অস্মি। ডিভোর্সের সময় ছেলের জন্য কোর্টের নির্দেশ মত যে টাকাটা নীলাঞ্জনের থেকে পেয়েছিল, সেটার ব্যাঙ্কসুদে ছেলের পড়াশোনা চলে। ওই টাকাতে দুজনের সংসারও আরামসে খেয়ে পড়ে চলে যেত, কিন্তু অস্মির আত্মসম্মান বোধ, ওই টাকাকে ঘৃণা করতে শিখিয়ে নিজেকে স্বাবলম্বী করে তুলেছে।

৩)

এ্যাবাকাসের একটা পরিক্ষার জন্য অস্মি ছেলেকে কোলকাতা এনেছিল আজ। ছেলেকে জল খাইয়ে, ফেসবুকে অকপটে ঢুকতেই এক পোষ্টে চোখ আঁটকে গেল। আদিবাসী সমাজ অনির্দিষ্ট কালের জন্য জাতীয় সড়ক, রাজ্য সড়ক, ও রেল লাইন অবরোধ করে রেখেছে। ক্রমে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসলেও অবরোধ ওঠার কোনো লক্ষণ নেই, কারো কাছে কোন জবাবও নেই। রাজ্য প্রশাসন যেন অস্মির চেয়েও বেশি অসহায়। কাঁহাতক আর মোবাইল ঘাঁটা সম্ভব? এদিকে ব্যাটারিও তলানির দিকে। স্টেশনে একআধটা মোবাইল চার্জিং পয়েন্ট আছে বটে, কিন্তু সেখানে যা ভিড় যাবার সাধ্যি কি!

ছটপটানির মাত্রা চূড়ান্ত অবস্থাতে পৌছালো, তখন ঘড়ির কাটা রাত্রি দশটা ছুঁইছুঁই। ছোট্ট স্টেশন, খাবারদাবার প্রায় শেষ, ভরষা শুধু জল। প্ল্যাটফর্মের উপর থেকে যত্রতত্র প্রস্রাব পায়খানা করছে তিনটে ট্রেনের যাত্রীরা, বিরক্তিতে চিৎকার করছে। শোনার জন্য নিজেরা ছাড়া আর কেউ নেই, রেলকর্মীরাও নিতান্ত অসহায়। রাতটা স্টেশনেই কাটাতে হবে, অগত্যা একটা খবরের কাগজ কিনে মা ছেলেতে শুয়ে পড়ল, আরো অনেক অনেক মানুষের মত।

রাত তখন দেড়টা-দুটো হবে সম্ভবত, স্টেশন জুড়ে হৈচৈ। সড়ক পথ কিছুটা খুলেছে মাঝরাত্রে, কিছুদূরে হাইরোডে সহযাত্রীরা নাকি একটা পিকাপ-ভ্যানেরও ব্যবস্থা করেছে। মন্দের ভাল, তাই অনেকেই যাচ্ছে। ঘুমন্ত ছেলেকে প্রায় পাঁজাকোলা করে যতক্ষণে পৌছালো রাস্তার ধারে, ততক্ষণে ভিড়ে ঠাসা পিকআপ-ভ্যান চলে গেছে। প্রায় সুনসান রাস্তায়, ওই মাঝরাত্রে এবারে অস্মি দিশেহারা হবহব প্রায়, ঠিক সেই সময় একটা মারুতি ভ্যান এসে দাঁড়ালো, সেটাও ভিড়ে ঠাসা। অস্মি শরীরের যাবতীয় শক্তিকে কেন্দ্রীভুত করে সেই গাড়িতে চড়ে বসল। এরই মাঝে গাড়ির নাম্বারটা বরাবরের মত টুকে নিতে ভোলেনি। সহযাত্রীরা সকলেই সম্ভবত ঘুমাচ্ছিলেন, অদ্ভুত এক নিরবতার মাঝে সে নিজেও ঘুমন্ত ছেলেকে কোলে করে ঘুমিয়ে পড়ল।

৪)

চোখ খুলতেই দেখল, পূব আকাশ লাল। বাড়ির সামনের রোয়াকে ছেলেকে নিয়ে শুয়ে আছে সে। মরণ ঘুম এমন চোখে লেগেছিল যে, কখন এসে পৌছেছে বেমালুম ভুলে গেছে। প্রাত্যহিক কর্মাদি সেরে টিভিটা খুলে সংবাদের চ্যানেলে দিতেই- অবরোধ, ইসলামপুর ইত্যাদি হরেক খবরের মাঝে, একটা খবরে সে স্তম্ভিত হয়ে রইল। গতকাল বিকালে হাওড়ার ফুলেশ্বরের কাছে একটি ডাম্পারের সাথে একটি মারুতি ভ্যানের সংঘর্ষ; ড্রাইভার সহ গাড়িটির বাকি ৭ জন যাত্রীও নিহত হয়েছেন। পার্সের ডায়েরি খুলে নাম্বার মিলেয়ে নিতেই, অস্মির শিরদাঁড়া বেয়ে হিমেল স্রোত বয়ে গেল।

এটা এমন একটা বিষয় যেটা অন্য কাউকে বললে নিশ্চিত অস্মিকেই উন্মাদ বলে দেগে দেবে, তাই সব কিছু ভুলতে ছেলেকে আঁকড়ে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল সে। 

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *