উপহার

একটা উপহার দেবেন?

ফেসবুকের এই পাড়াতে, এই ইথারের দুনিয়াতে, আমরা পরস্পর কতজনকে চিনি! বা বলা ভালো কতটুকু চিনি? অধিকাংশ জনকেই সামনা সামনি চিনি না, তবে আমাদের চেনার প্রবল আগ্রহ।

তাই কি?

বিপ্লবী প্রোফাইল থেকে নেকু প্রোফাইল, কবি থেকে কাঠিবাজ, স্ট্যাটাস চোর থেকে ডিজিটাল ভিখারি, সকলকেই আমরা চিনতে চায়, যে কাজটা সোজা নয় মোটে। আমাদের কাছে প্রত্যেকের পরিচয়- ও মাকু, এ নেকু, সে ছকু, এরপর সেকু-ফেকু-লেকু এমন তো কতই আছে। এরও পর আছে- ও গরুখোর/শুয়োরখোর, এ চাড্ডী, সে দিদিরভাই ইত্যাদি ইত্যাদি। হলদে সবুজ ওরাংওটাং খুঁজতে গিয়ে বেনিয়াসহকলা গুলিয়ে গোবর হয়ে গেছে।

আমাদের ‘অকপট’ পরিবার কি এমন হতে পারেনা! যেখানে আমরা সবাই সবাইকে চিনব, কিন্তু এই নির্দিষ্ট ভাবে দেগে দেওয়াটা থাকবেনা। প্রতিটা ব্যাক্তিকেই প্রত্যহ কতশত চরিত্রে নিজের “Role play” করতে হয়। মানবিক গুণ বসতই আমরা বহুমুখী বা বলা ভাল আমাদের চরিত্রের shape হল বহুমাত্রিকা যুক্ত। একটি পুরুষ- একজন মহিলার সামনে পুত্র, আর এক মহিলার সামনে স্ত্রী, অপর এক মহিলার সামনে পিতা ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রতি মুহুর্তে আমাদের এই সকল পারিবারিক সম্পর্কগুলোর সাথে নিখুঁত Adjust করে চলি। মায়ের সাথে স্ত্রী বা কন্যার আচরণ যেমন করিনা, ঠিক তেমনি স্ত্রীর বা কন্যার সাথেও মায়ের মত আচরন করিনা, যখন তিনজন একই সময়ে সামনে উপস্থিত থাকে তখনও।

আমরা একই গাড়িতে চড়ে একই উদ্দেশ্যে একই গন্তব্যে একই মানুষের সাথে মিটিং করতে যাচ্ছি। Conference Room এ ঢোকার আগে পর্যন্ত আমরা টিমের সকলেই বন্ধু বা সহকর্মী, কিন্তু টেবিলে আলোচনা শুরু হতেই – আমি মালিক, আরেকজন ম্যানেজার, আরেকনজ COO, আরেকজন সেলস এক্সিকিউটিভ ইত্যাদি। পরস্পরের তালমিল থাকে সামনের মানুষটির সামনে একটাই দল হিসাবে, কিন্তু আলাদা আলাদা।

তাহলে ভার্চুয়াল এই পৃথিবীতে তিনটে আলাদা আলাদা রকমের মানুষ হলেই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায় কেন?

প্রতিটা মানুষের সব কিছুই একই উপাদান দিয়ে তৈরি, তাও দেখতে প্রত্যেকেই আলাদা, আমাদের বহুমাত্রিকটা শুধু তার রাজনৈতিক আর ধর্মীয় পরিচয়েই কি আবদ্ধ? মোটেই সেটা হতে পারেনা বা হবার কথা নয়। অথচ বৈদ্যুতিন সংবাদ মাধ্যম আর Internet চালিত অন্তর্জালীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গুলিতে যেন আমরা শুধুই ধর্মীয়-রাজনৈতিক জন্তু, ও একমুখী। আমাদের প্রেম থাকতে নেই, আবেগ থাকতে নেই, ভালবাসা থাকতে নেই, কর্ম থাকতে নেই, সহমর্মীতা থাকতে নেই, নিখাদ আড্ডা থাকতে নেই, সব থেকেও যেন থাকতে নেই। আমরা শুধুই রাজনীতির রঙ দিয়ে ছাপিয়ে দিই, এটা কোন সামাজিকতা?

আমরা যারা নিজেকে উদার ভাবি, সৎ ভাবি, অসুস্থতা পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত ভাবি, আমরা কি অদৌ চেষ্টা করি সামনের মানুষটিকে জানার?

উলটো দিকে আমরা যেভাবে সামনের মানুষটার সামনে নিজেকে উপস্থাপন করি, ওই ভাবে কি তার পক্ষে আমাদেরকে চিনে নেওয়া সম্ভব? আমাদের নিজশ্ব কৃষ্টি, পারিবারিক ঐতিহ্য, সামাজিক অবস্থান, আত্মার শৈল্পিক বিকাশ কতটুকু জানাবার চেষ্টা করি? আবার চেষ্টা করলেও কতটুকু অন্যেরটা জানতে চেষ্টা করি?

সামনের মানুষটাকে আমাদের বর্তমান দর্শন পদ্ধতিতে চিনে নেওয়া বা চিনিয়ে দেওয়া সম্ভব?

এ আমাদের মস্ত ভুল, আর আমরা সেই ভুলের Tradition সমান ও সমান্তরাল ভঙ্গীতে বয়ে নিয়ে চলেছি ও পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে নিখুঁত ভাবে Inject ও করে দিচ্ছি নিপুনতার সাথে।

আমাদের এই ভার্চুয়াল জগতে যতনা ঘনিষ্ট বন্ধু তৈরি করতে পেরেছি, তার চেয়ে ঢের বেশি ‘শত্রু’ তৈরি করেছি। আমাদের মাঝের সবথেকে ভাল মানুষটাও, তাৎক্ষণিক ভাবে ভীষণ রেগে, জাত তুলে, রাজনৈতিক বিশ্বাসকে হ্যাটা করে ‘খিস্তি’ দিয়ে, সামনের জনের বুদ্ধির উৎকর্ষ বিষয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে নির্ধ্বিধায় মন্তব্য করে ফেলেন। অপরপক্ষে নিজের ওজন না বুঝেই সামনের জনের সমালোচনা করে থাকি নুন্যতম লজ্জাটুকু না পেয়ে।

ঝগড়া নয়, শালা নয়- ভাই বলে সেই কথাটাই বলুন অথবা তাকে উপেক্ষা করুন সহাস্যে। হয় তার  গোটাটা দেখুন, শুধু অর্ধেক বা দৃশ্যমান অংশটুকু নয় নয়। নতুবা এইভাবেই কিন্তু অন্ধের হস্তীদর্শন হতে থাকবে।

সামনের মানুষকে যদি চিনতে একটু সময় লাগে লাগুক, তবুও সৎ প্রচেষ্টাটা থাকুক।

একবার করেই দেখুনা, জীবনটা বদলে যাবে নিশ্চিত।

Think positive; See yourself giving yourself a gift. You will get the best gift of life for a lifetime.

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *