গুপ্তধন

রাত্রি দ্বিপ্রহর, কাপালিক চক্ষু বুজিয়া ধ্যনে নিমগ্ন। হঠাতই অদূরে তক্ষকের চিৎকারে কাপালিক চক্ষু উন্মিলিত করিলেন। যজ্ঞের অগ্নিতে মন্ত্রপূত ধুনি সংযোগ করিতেই অগ্নির লেনিহান শিখা চতুর্দিকের কালিমা দূর করিতে সম্পূর্ণ এলাকাটি দৃশ্যমান হইতে দেখা গেল, ভবতোষ একা আসেনাই আজি। অথচ কাপালিকের কঠিন নিষেধ ছিল পারিসদবর্গ বা লেঠেল সঙ্গে করিয়া না আনিতে। কার্তিকের কুজ্ঝটিকা ক্রমশ সেই আলোকবর্তিকাকে পুনরায় ধুম্রজালিকার অভ্যন্তরে গ্রাস করিয়া লইতেছিল যেমনটি গুপ্তধনের ধনলিপ্তা ক্রমেই অনচ্ছ বোধ হচ্ছিল।

ভবতোষ রায়চৌধুরী, ওনার মতে রায়চৌধুরী বংশের সম্ভবত একমাত্র জীবিত প্রজন্ম, হাঁফকলেরা রোগে যখন গাঁ উজার হয়ে গেছিল তখনই সম্ভবত সকলেই গত হয়েছিল। বিগত ৬-৭ বছরে যখন আর কেউ আসেনি, ধরে নেওয়া যায় আর কেউ জীবিত নেই। পড়াশোনা বেশ কিছুটা করিয়া কিছুদিনের জন্য লক্ষ্ণৌ চলে যায়, সেখানে কোনো একটা মহামারির কবলে পড়িয়া শারীরিক ভাবে প্রায় অক্ষম হইয়া বর্ধমানের দোগাছিয়ার পৈতৃক ভিটেতে ফিরিয়া আসে। বছর ত্রিশেক আগে এই খড়ি নদী বেয়েই একবার কোলকাতা গেছিল, পথিমধ্যে ভাটপাড়া নামক স্থানে বেশি কিছুদিন ছিলেন চটকলের বস্তিতে, অতঃপর সেখান থেকেই সোজা নবাবের দেশ লক্ষ্ণৌতে রওনা দেয় একটা সাহেবি কোম্পানীতে চাকুরী নিয়ে। ভবতোষ সারা জীবনে সংসার না করলেও যৌবনে ভীষণ নারী আসক্তি ছিল, বিশেষত গোলাপি চামড়ার ফিরিঙ্গি মেমসাহেব- শয্যসঙ্গীনি পেতে তো জীবনের সকল কিছু বাজি লাগিয়ে দিত। লক্ষ্ণৌ যাবার মূল উদ্দেশ্য ছিল মুজরা গান ও বাইজির নেশা। যৌবনের গোটাটাই রিপুর পিছনে ব্যায় করেছিলেন, কিন্তু অকৃতদার।

দুইজন ভৃত্য পরিবৃত হইয়া প্রায় শয্যসায়ী অবস্থাতে দিনাতিপাত হয়। একদিন অপরাহ্নে হঠাত করেই বাবাজীর আগমন মাস সাতেক আগে। গ্রামেরই অদূরে সোনাকুড়িতে বাঁকা ঘড়ি নদীর পাশে আস্তানা গেড়েছিল এই বাবা। কর্তাবাবুর ব্যামোর চিন্তায় ব্যাকুল, চাকর বিহারী বাবাজীকে গৃহে আনিয়াছেন। বেশভূষা ও বিভূতির কল্যাণে বয়স আন্দাজ করিবার উপায় নাই।

কিছুদিন যাবৎ সপ্তাহে একআধবার আসতেন কখনো দু সপ্তাহে একবার, পরে সেটা বাড়তে বাড়তে আজকাল এ বাড়িরিই খানকার পাশের একটি ঘরে পাকাপাকিভাবে রয়ে গেছেন মাস তিনেক হল।

তখন সবে ব্রিটিশ কোম্পানির পত্তন হয়েছে, ভবতোষের তস্য প্রপিতামহ কামিনীরঞ্জন চৌধুরী, বড়লাটের থেকে রায়বাহাদুর খেতাব হাসিল করে ইয়া ব্বড় জমিদারির পাট্টা পেয়েছিল। পরবর্তীতে আরো দুটো প্রজন্ম প্রচণ্ড প্রতাপশালীও ছিল, তারা রানীর অনুগত নেটিভ রাজা থাকার দরুন তাদের সম্পত্তি এতটুকুও নড়চড় হয়নি। কিন্তু দেশ স্বাধীন হতেই জমিদারী প্রথার বিলোপ ঘটল, সরকার তো আর ওই বিপুল অর্থ, রত্ন, স্বর্ণালঙ্কার হঠাত করেই যেন গায়েব হয়ে গেল। ভবতোষের এ বিষয়ে কোনোদিনই আগ্রহ ছিলনা, কিন্তু কাপালিকই রোজদিনকার আলাপচারিতার সুত্রে এই ইতিহাস জানতে পারে।

আজকাল ভবতোষ বেশ খানিকটা সুস্থ বোধ করার দরুন, সকালে বিকালে পরিভ্রমণে বাহির হন। খটকাটা বেশ কয়েকদিন থেকেই লাগছিল, আরেকটু সুস্থ হয়ে উঠতেই কাটোয়া থেকে নামজাদা কবরেজ মশাই কে আনিয়ে চিকিৎসা করাতে লাগলেন। অচিরেই বাবাজির বাস উঠল ভবতষের দালানবাড়ি থেকে। গুপ্তধনের শখ তাকে নেশার মত পেয়ে বসল। সারা দালান ও তৎসংলগ্ন পুকুর, খামার, গোলা, মড়াই, পুকুর তন্ন তন্ন করে খুজেও নুন্যতম সুত্র না পাওয়ার হতাশা ক্রোধে পরিণত হল।   

…ক্রমশ

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *