স্মৃতির পথ বেয়ে অকপট অতীতে

(১)

পুস্করিণীতে হঠাৎ একটা ঢিল ছুড়লে তাতে তরঙ্গের উৎপত্তি হয় বটে কিন্তু পাড়ে তার অভিঘাত পৌছানোর আগেই সেই তরঙ্গ রাশি মিলিয়ে যায় স্থৈতিক হরিধারার মাঝে। মুহুর্মুহু ঢিল বৃষ্টি সম্ভব নয় মনের পুকুরে। তাই বেশ কয়েক তাল মাটির চ্যাঙড় ফেলাতে শুধু ঢেউই পাড়ে এসে চুম্বন করল তাই নয়, বরং তলদেশে থেকে অনেকটা মাটি, যেটা সময়ের প্রকোপে পাঁকহয়ে তলদেশে উদ্দেশ্যহীনভাবে কতশত বছর ধরে ঘুমাচ্ছিল, তারা আন্দোলিত হয়ে হৃদয়ের মানসপটে বুড়বুড়ি কেটে উঠে এলো, শান্ত টলটলে জলতলকে বেশ খানিকটা ঘুলিয়ে দিয়ে। বৃদ্ধবয়সে এসে স্কুলজীবনস্মৃতি রোমন্থন এমনই কঠিন কিছু, আমাদের মত ডিমেনসিয়া রোগে আক্রান্ত বৃদ্ধের সমীপে।

পন্ডীচেরির ক্লাব মহিন্দ্রা রিসর্টে এলে উঠেছি আমরা স্বামীস্ত্রী দুজনে। আমরা ক্লাব মহিন্দ্রার সদস্য হওয়ার দরুন সারা বছর এদের রিসর্ট গুলোতে থেকে ভ্রমণের সুযোগ পায়। ভাবনাতে স্কুল জীবনকে নিয়ে স্মৃতি উপড়ে আনার প্রচেষ্টার খামতি ছিলনা কোনো। কটা দিন লাগাতার সৈকতে ঘুরতে ঘুরতে গত ৮ তারিখ গেছিলাম  গেছিলাম মাতৃমন্দির হয়ে অরবিন্দ আশ্রমে। রাধিকা অবাঙালী, তবে ঋষি অরবিন্দের নামটা জানে। সন্ধ্যার অবকাশ যাপনকালে রিসর্টের লনের কেদারাতে হেলানদিয়ে রাধিকাই শুধালো- ‘বাঙালীদের মধ্যে এত স্বাধীনতা সংগ্রামী কিভাবে জন্মাতো, তোমাদের বংশলতিকাতে কেন এমন স্বাধীনতা সংগ্রামী নেই’? রাধিকাকে বেশ কিছুটা আশ্চর্য করে উত্তেজনার সাথে বলে উঠলাম- আলবাত আছে, বাঙালী বীরের জাত তাই স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আঁতুড়ঘর এই বাংলা। তারপর আবাই মিইয়ে গিয়ে বললাম, কাল বলব তোমাকে। কাল আর বাইরে যাবনা। জানালা দিয়ে সমুদ্রের ঢেউ গুনব আর স্মৃতি চারণ করব।

মনের পুকুরে বড় চ্যাঙরটা সম্ভবত রাধিকাই ছুড়েছিল। সারারাত উথালপাতাল করে পরদিন সকালে প্রাতঃরাশের টেবিলে রাধিকাকে বললাম, কালকে তোমার প্রশ্ন আমার স্মৃতির মেঘে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। ৮-৯ বছর বয়সে আমার দাদামশাই এর কাছে আমাদের বাচস্পতি বংশের গৌরবান্বিত ইতিহাস শুনেছিলাম। আমরা বৈদিক ব্রাহ্মণ, শুনে শুনে মুখস্ত রাখার বিদ্যা উর্ধ্বতন বংশের প্রায় সকলেরই ছিল। সেখান থেকে কিছু আজ লিখব ফেসবুকে। ওদেরও স্মৃতি রোমন্থনের উপরে একটা সুন্দর সাহিত্যচক্রের আয়োজন করেছে।

বেঁচে থাকলে বংশের ইতিহাসের উপরে একটা লিখিত পুস্তক রচনা করে যাবার তৃষ্ণা জন্মেছে। রাধিকাকে বললাম তোমার বিলেতবাসী পুত্রকেই নাহয় বইটা প্রকাশ করতে বোলো। রাধিকা মুচকি হেসে বলল- ওটা বিলেত নয়, ক্যালিফোর্নিয়া, আমেরিকা। আমিও হেসে বললাম – ওই হল আরকি। রাধিকা বলল- বই ছাপানো বা ফেসবুকে দেওয়া আগে আমি শুনি সেই সংক্ষিত ইতিহাস। আমি তো সানন্দে রাজি হয়ে বললাম, তাহলে আর দেরি কিসের, শুভস্য শিঘ্রম।  

মনে পরল, এমনই ঘোলাটে একটা পরিস্থিতিতে আমার অতীত বর্তমানের দিকে অভিমুখী হয়েছিল। যদিও ডিমেনসিয়া রোগ আমাদের বংশানুক্রমিক, সেই কথা অবশ্য অনেক পুরাতন। সেটা নিয়েই কিছু স্মৃতিচারণ, আমিও পুরোপুরি ডিমেনসিয়ার কবলে মুছে যাওয়ার আগে।

(২)

উর্ধ্বতন পূর্বপূরুষদের মধ্যে অধমের স্মরণজালে থাকা, স্মৃতি ঝুল ঝেরে রাধিকাকে বলতে শুরু করলাম। সেই অগোছালো বলাগুলোকে পর্যায়ক্রমে সাজিয়ে যেমনটা দাঁড়ালো- ঈশ্বর মাধবানন্দ গোস্বামী ছিলেন সাবর্ণী গোত্রীয় কুলীন রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণ; জন্ম ময়মনসিংহের নেত্রকোনা গঞ্জে। ছোটবেলা থেকেই তার বিচারবুদ্ধি ও পাণ্ডিত্য স্থানীয় জমিদারকে অত্যন্ত আকৃষ্ট করে, যথারীতি এই হীরকের সহিত তিনি তার কন্যাকে বিবাহবন্ধনের মাধ্যমে মাধবানন্দকে কুটুম্বে পরিণত করে নেন। সেই জমিদার নিজে তেমন শিক্ষিত না হওয়ার দরুন পণ্ডিত জামাইকে পেয়ে গর্বে ফুলে উঠেছিলেন, এবং কাশীতেও প্রেরণ করেছিলেন ন্যায়শাস্ত্র অধ্যায়ন করার জন্য। সেখান থেকে ফিরে স্থানীয় বিভিন্ন তর্কসভাগুলোতে মাধবানন্দের জ্ঞানের বিচ্ছুরণ নদীয়ার রাজসভাতে পৌছাতে দেরি হলনা।

নবাবের উত্তরসূরি মীর কাশিম তখন রাজার মৃত্যুদন্ডের পরোয়ানাতে সাক্ষর করে দিয়েছেন। একমাত্র বাঁচার উপায় হচ্ছে, রবার্ট ক্লাইভকে যেকোনো উপায়ে সন্তুষ্ট করা; নতুবা সাক্ষাৎ মৃত্যু। দেশ বিদেশ থেকে বড় বড় পন্ডিতদের কাউকে তলব করা হল তো কাউকে আমন্ত্রণ করে ডেকে আনা হল। যথারীতি মাধবানন্দেরও ডাক পরল, কৃষ্ণনগরের রাজসভাতে।

চৈতন্য ভাগবতে লেখা আছে- ‘নানা দেশ হইতে লোকে নবদ্বীপে যায়/নবদ্বীপে পড়িলে সে বিদ্যারস পায়’। ফিরিঙ্গী সাহেবসুবোরাও সেকালে নবদ্বীপকে ‘অক্সফোর্ড অফ ইষ্ট’ নামে ডাকত। সুতরাং রথদেখা ও কলা বেচার এহেন সুবর্ণসুযোগ কেউ কিভাবে হাতছাড়া করতে পারে! ততদিনে মাধবানন্দ পণ্ডিত নিজেই টোল খুলে বসেছেন ঈশ্বরগঞ্জ এলাকাতে। টোলের কয়েকজন বরিষ্ঠ ছাত্রদের সাথে যথারীতি তিনি উপস্থিত হলেন কৃষ্ণনগরের রাজদরবারে।

এরপর রাজামহাশয় পণ্ডিত মাধবানন্দের সহিত বেশ কয়েকদিন নিগূঢ় শলাপরামর্শের পর, ফোর্ট উইলিয়ামে এমন যুক্তি সাজিয়ে অভেদ্য কড়া চিঠি লিখলেন যে, পরের ইতিহাসটা সকলেই জানেন। শুধু মৃত্যুদণ্ড রোধই হয়নি, সাথে অতিরিক্ত পাঁচ পাঁচখানা পরগণার শাসন ক্ষমতাও পুরস্কার স্বরূপ লাভ করেন কৃষ্ণনগরের মহারাজা। এতে মহারাজা যারপরনাই খুশি হয়ে যখন মাধবানন্দকে রাজসভার নবরত্নে যোগদান করতে বললেন। তখন তিনি তা সবিনয়ে প্রত্যাখান করে মাধবানন্দ বলেছিলেন- ‘আমি গরীব ব্রাহ্মণ, আমার যশ চাইনে, আমি পড়াশোনা করেই সবচেয়ে বেশি সুখপার্জন করি। খ্যাতি অহং বয়ে আনে, বরং আমার এই অবদানের কথাটা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ না করলেই প্রসন্ন হব। আপনি আমাকে নবদ্বীপে কিছুদিন বিদ্যার্জনের সুযোগ করেদিলে ধন্য হব, শুনেছি সেখানে মহা পণ্ডিতদের সব বাস’। কৃতজ্ঞতা স্বরূপ মহারাজাও পন্ডিতের মান রেখেছিলেন, কোথাও ওনার নাম উল্লেখ রেখে ওনার মর্যাদাতে হানি পৌছাতে দেননি।

সেই মত মাধবানন্দ নবদ্বীপে বিদ্যাচর্চা করতে এসে স্থানীয় পণ্ডিতদের নয়নের মনি হয়ে উঠলে, তারা ওনাকে ময়মনসিংহতে ফিরতে দিলেননা। ততদিনে মাধবানন্দও নবদ্বীপকে আপন করে নিয়েছে। স্ত্রী কামিনীসুন্দরী আর খোকা বিবেকানন্দকেও ঈশ্বরগঞ্জের পাঠ চুকিয়ে পাকাপাকিভাবে নবদ্বীপে এনে স্থিতু হলেন। মাধবানন্দের শিষ্য পুষ্পদন্ত দেবনাথ, গুরুদেবের বাণী ও জ্ঞানকে পুস্তক আকারে রচনা করেন। নীতিমালা সমৃদ্ধ পুস্তক ‘উণাদিপুষ্পমালিকা’, আর ব্যকরণের উপর লেখা ‘ধাতুপীড়া কৌমুদিনী’ বই দুটি পণ্ডিত ও বিদ্যার্থী যুগ্ম মহলেই বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। বৃদ্ধবয়সে মাধবানন্দও আজকের ডিমনেশিয়া রোগের প্রাদুর্ভাবে ময়মনসিংহ সহ মহারাজাকে বাঁচাবার ইতিহাস ইত্যাদি কোনোকিছুই লিপিবদ্ধ করে যেতে পারেননি।

নবদ্বীপ ও অগ্রদ্বীপে নামসঙ্কীর্তনের পাশাপাশি ‘মৈমনসিংহ-গীতিকার’ প্রচার প্রসার ও ঘটান এই মাধবানন্দই। অনেক পরে ঊণবিংশ শতাব্দীতে এসে দীনেশচন্দ্র সেন ও চন্দ্রকুমার দে মহাশয় এই গীতিগুলোকেই সংগ্রহ করে লিপিবদ্ধ করেন। ১৭৭৮ সালে ‘নাথালিয়েন ব্রাসি হ্যালডেন’ সাহেব হুগলি প্রেস থেকে প্রথম বাংলা ব্যকরণ রচনা প্রকাশিত হয়। শোনা যায় সাহেব নিয়মিত নবদ্বীপে এসে মাধবানন্দের সহিত বিদ্যাচর্চা ও জ্ঞানার্জন করতেন।

মাধবানন্দ পুত্র পণ্ডিত বিবেকানন্দ শাস্ত্রীও- তর্কালঙ্কার ও বিদ্যারত্ন উপাধিতে ভুষিত হয়েছিলেন, এক্কেবারে বাপের ব্যাটা ছিলেন। সুচিন্তাবীদ ও সুলেখক ছিলেন। ১৭৯৯ সালে তরুন বিবেকানন্দের প্রতক্ষ্য সহযোগিতাতে ‘ফরস্টার’ পাদ্রী প্রথম বাংলা শব্দকোষের জন্ম দেন। এছাড়াও ‘দোম এন্তোনিও’ সাহেবের ‘ব্রাহ্মণ-রোমান- ক্যাথলিক’ সংবাদ পত্রে শাস্ত্র সংক্রান্ত কলামে নিয়মিত বিবেকানন্দ তর্কালঙ্কারের লেখা ছাপা হত। এমনকি আধুনিক বাংলা গদ্য সাহিত্যের অন্যতম জনক, ‘উইলিয়াম  কেরি’ সাহেবও নাকি সেই সময় কখনো নবদ্বীপে এসে কখনো পন্ডিতকে কোলকাতা অঞ্চলে ডেকে, বিবেকানন্দের সাথে ব্যকরণ বিষয়ে আলোচনা করতেন। অসমর্থিত সুত্রের মতে নরেন্দ্রনাথ দত্তের সাধু জীবনের নাম গ্রহণের পিছনে নাকি পন্ডিত বিবেকানন্দ শাস্ত্রীর পাণ্ডিত্যর প্রতি প্রগাঢ় আসক্তি একটা বড় কারন ছিল। যেটা ওনার শিক্ষাজীবনে গভীর রেখাপাতের ফলাফল। যদিও এর কোনো ঐতিহাসিক সত্যতা বা প্রামাণ্য দলিল আমার কাছে নেই।

বিবেকানন্দ তর্কালঙ্কারের একমাত্র পুত্র অখন্ডানন্দও ভীষণ বিদ্বান ছিলেন। তিনিও ন্যায়রত্ন উপাধী লাভ করেছিলেন। তিনি নানান ধরনের সংস্কৃত পুঁথির বঙ্গানুবাদ করে নবদ্বীপের পাঠক সমাজে চরম জনপ্রিয় হয়েছিলেন। শেষ বয়সে অখন্ডানন্দেরও স্মৃতিভ্রম ব্যারাম হয়েছিল, ফলস্বরূপ নবদ্বীপের একদল পন্ডিতদের সাথে বিবাদ চরমে পৌছালে, তিনি সপরিবারে বাংলার শিক্ষাজগতের আরেক পীঠস্থান ভাটপাড়াতে পাড়ি জমালে সেই সমাজ ওনাকে তার বর্তমান অবস্থাতে সাদরে সম্মান জানিয়ে নিজেদের সমাজে আপন করে নেন।

অখন্ডানন্দের পুত্র শুদ্ধানন্দ জ্যোতিষ বিদ্যায় অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করলে, ওনাকে প্রথমে তর্করত্ন ও পরে বাচস্পতি উপাধিতে ভূষিত করা হয়। সেই থেকেই আমাদের বাচস্পতি পদবীর শুরু। সে সময় কলিকাতার সম্ভ্রান্ত পরিবারগুলোতে বাকসিদ্ধ বেদজ্ঞ এই ব্রাহ্মণের জনপ্রীয়তা ছিল আকাশচুম্বী। ওনার লিখিত পুস্তকগুলো তৎকালীন হোরাশাস্ত্রের টোলগুলোতে অবশ্য পাঠ্য ছিল। যেমন- ‘পরাশরী ধ্যনকল্প’, ‘কল্পতরু পারিজাত’ ইত্যাদি। জ্যোতিষ শাস্ত্রের ইতিহাসে আজও এই পুস্তকগুলির সথেষ্ট সমাদর রয়েছে।

ওনারই চতুর্থ পুত্র আমার প্রপিতামহের পিতা, ঈশ্বর ভৈরবানন্দ বাচস্পতি বিস্তর ডিগ্রী হাসিল করে ব্রিটিশদের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেন ও তৎকালীন আইনসভাতে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন। অক্ষয়কুমার দত্তের সম্পাদনায় তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা ছিল ব্রাহ্ম সমাজের মুখপত্র। সেখানে আইন বিষয়ক নানান খুঁটিনাটি বিষয়ে প্রবন্ধ লিখতেন ভৈরবানন্দ বাচস্পতি। একবারা রাজা রামমোহন স্বয়ং একটা সংখ্যার প্রবন্ধের স্তুতি করে পত্র লিখেছিলেন। ভৈরবানন্দ একসময় বিদ্যাসাগর মহাশয়ের খুব প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছিলে। শ্রদ্ধানন্দ ও সৌদারনন্দ দুজনেই বাউন্ডুলে হয়ে যাওয়াতে ও বংশের অন্যধারা মহামারীতে লুপ্ত হওয়ার কারনে সবই কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে।

ব্রিটিশদের বন্দি গননার জন্য, আর ধর্ম প্রচারের নাম লেখার প্রয়োজন না হলে বঙ্গদেশে কেইবা আর এই সব সংরক্ষণ করত! আজ ভাবি হায়, থাকলে কি ব্যাপারটাই না ঘটত।

রাধিকা প্রশ্ন করল, এই শ্রদ্ধানন্দ আর সৌদারনন্দ কে ছিলেন?

আমি বললাম, মধ্যাহ্নভোজনের সময় আগতপ্রায়। স্নানাহার সেরে বাকি আখান নিয়ে আবার আমরা বসব।

(৩)

দাদামশাই শ্রদ্ধানন্দ বাচস্পতি মহাশয় ছিলেন ম্যাজিসিয়ান, যাকে বলে জাদুকর। হরেকরকমের দিশিবিদেশি ভেল্কি দেখানো থেকে নজরবন্দি করে কুহেলিকা-প্রহেলিকা মায়াবিদ্যাতে যথেষ্ট বুৎপত্তি লাভ করেছিলেন। ওনার পিতা তথা আইনজ্ঞ ভৈরবানন্দের তৃতীয় সন্তান শ্রমণানন্দ বাচস্পতি, ভাটপাড়ার আমসমাজ সহ পন্ডিতকুলে যথেষ্ট লোকপ্রিয় হইয়েছিলেন ধ্বন্বন্তরী কবিরাজ হিসাবে। শ্রমণানন্দ, সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র সম্পাদিত বঙ্গদর্শন মাসিক পত্রিকাতে সাহিত্য সমালোচনা বিভাগে অনেক কড়া ভাবে নিজের মত লিখতেন। ভাটপাড়া নিবাসী শ্রমণানন্দ কবিরাজ কাঁঠালপাড়ায় বঙ্কিমচন্দ্রের পিতা যাদবচন্দ্রের পরিবারে চিকিৎসা সুত্রেই পূর্বপরিচিত ছিলেন।

আপন কনিষ্ঠ পুত্রের এহেন ম্লেচ্ছাচারী আচরনের দরুন ত্যাজ্যপুত্র করতে সম্ভবত দ্বিতীয়বার ভাবেননি তিনি। নতুবা সমাজচ্যুত হতে হত। যদিও শ্রদ্ধানন্দের জ্যেষ্ঠোভ্রাতা সৌদারনন্দ ছিল অজীর্ন রোগে ভোগা একজন শীর্ণকায়া মানুষ। পরিশ্রমের কাজ তিনি করতে পারতেননা, সেভাবে বিদার্জনও করেননি। বিলাতি শিক্ষাঘরানার পিতামহের আস্কারাতে নাট্যাভিনয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পরেন। হাতিবাগান অঞ্চলে এসে তখন তিনি থিয়েটারে পরচুলা পরে, ঠোঁট রাঙা করে স্ত্রীলোকের ভূমিকাতে অভিনয় করতেন। নতুন নাম হয়েছিল সৌদামিনী। গিরিশ ঘোষের ‘বিল্বমঙ্গল ঠাকুর’, ‘প্রফুল্ল’, বিদ্যাবিনোদের রূপের ডালি, আলমগীর ইত্যাদি পালাতে চুটিয়ে চরিত্রাভিনয় করেছিলেন।

নাট্যজীবনে শুরুতে অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফী সাহেবের মত প্রখ্যাত অভিনেতার বিপরীতে স্ত্রী চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের বাহবা অর্জন করেন। বনবিহারিণী, ক্ষেত্রমণি, সুকুমারী, কুসুম প্রমুখ তৎকালীন নামজাদা অভিনেত্রীদের পাশাপাশি চুটিয়ে অভিনয় করে যথেষ্ট সুনাম কামিয়েছিলেন। মধ্যচল্লিশে অকৃতদার সৌদারনন্দ সংসার বিমুখ হয়ে সন্ন্যাসী জীবন বেছে নিয়ে রুদ্রপ্রয়াগে আস্তানা গেড়েছিলেন। মুন্ডমালীনী চন্ডিকার সাধনা করে তন্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে উঠেন। তিনিই যৌবনে বরাহনগরের বাগানবাটিকাটি নির্মান করেছিলেন, যেটা আমার আজীবন ঠিকানা ও বর্তমানের কোলকাতাস্থিত একমাত্র সাকিন। শেষ বয়সে ইনিও ফিরে এসেছিলেন বরাহনগরে, এনার সম্বন্ধে পরে কখনো বিশদে লেখা যাবে। ইনিও তার পিতা কতৃক ত্যাজ্য হয়েছিলেন।

শ্রদ্ধানন্দ সাড়ে ছ’ফুটের সুঠাম বাঙালী। গৌড়বর্ণের সুঠাম শরীরে মাথার উপরে কোঁকরানো একরাশ ঘন চুল কাঁধ ছুঁয়েছে, নাকের নিচে পাকানো রাজস্থানী গোঁফ, কানে মাকড়ী। সবচেয়ে বিশেষত্ব ছিল চোখ জোড়াতে। ওটি দিয়েই সম্মোহিত করতেন দর্শকদের। ত্যাজ্য হয়ে বিতাড়িত হবার পর বড়দার বরাহনগরের বাড়িতে আশ্রয় নেয় শ্রদ্ধানন্দ। সেখানে থাকাকালীনই নাট্যজগতের দিকপাল লেখক মাননীয় শ্রী ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদের কাছে নাটক রচনার হাতেখড়ি হয়, ও পরে রামেন্দ্রসুন্দর ত্রীবেদীর কাছে নাটক বিষয়ে জ্ঞানার্জন করেন। পরবর্তীতে বড়দার সাথে মতবিরোধের জেরে বরাহনগরের গৃহও ত্যাগ করেন।

ঝুঁকি নেওয়ার মত বুকের পাটা ছিল ওনার। এবারে হাওড়ার শিবপুর অঞ্চলের প্রিয়নাথ পালিত নামের এক বন্ধুর বাড়িতে ঠাঁই নিয়েছিলেন। সে বছরই মোহনদাস গান্ধী দক্ষিন আফ্রিকা থেকে ফিরে স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন, ১৯১৫ সন। দেশে তখনও কমিউনিষ্টরা দল গঠন করে উঠতে পারেনি। কিন্তু বাম মতাদর্শ নিয়ে ময়মনসিংহ, বরিশাল, কুমিল্লা প্রভৃতি স্থানে গোরা পুলিসের সাথে বামমনোভাবাপন্ন স্বদেশীদের লড়াই শুরু হয়ে গেছে। ময়মনসিংহের সাথে শ্রদ্ধানন্দের নাড়ীর টান, তাদের অনেকের সাথেই নিয়মিত যোগাযোগ ছিল বাচস্পতি বংশের। ওই অঞ্চলের অনেক বিপ্লবী লুকিয়ে থাকার আস্তানা হিসাবে হাওড়া জেলার গঙ্গাতীরস্থ এই শ্রমিক গুমটিগুলোতে আত্মগোপন করত। অচিরেই সেই স্বদেশী আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে গেল শ্রদ্ধানন্দ। হয়েছিলেন গোপন সমিতির সদস্যও, নতুন ছদ্মনাম হয় বিপিন।

ছোটখাটো অনেক গোপন বিপ্লবী অভিযানের পর, বছর দুয়েকের মধ্যে খেজুরি বন্দর এলাকাতে একদল ব্রিটিশ সেনাদলের উপরে অতর্কিতে আক্রমণের নেতৃত্বের দায়িত্ব অর্পিত হয় শ্রদ্ধানন্দ তথা বিপিনের উপর। কিন্তু দলেরই একজন বিশ্বাসঘাতকতা করার দরুন দলের অর্ধেক লোকই ধরা পরে যায়। তবে সুচতুর শ্রদ্ধানন্দ ভাগীরথীর জলে ঝাঁপ দিয়ে, হাতানিয়া-দোয়ানিয়া সাঁতরে সুন্দরবন এলাকাতে এসে উঠেছিল। পরে দাঁড়ি গোঁফ বৃদ্ধি করে আত্মগোপন করে ছিলেন কিছু মাস। অতঃপর লোকালয়ে ফিরলে পরে রক্তিম বসন পরিহিত স্বামী শ্রদ্ধানন্দকে গোরা সৈনিকেরা চিনে উঠতে পারলনা, এদিকে সমন জাড়ি হয়েছিল বিপিনের নামে। কিন্তু সাধু বেশে কি আর শ্রদ্ধানন্দের জীবন চলে, সুতরাং লুকিয়ে বর্মাপ্রদেশ গিয়ে একটা জাপানী জাহাজে খালাসীদের পাচকের চাকরি নিয়ে দেশ ছেড়ে, বেশ কয়েক বছর কখনো মাদ্রাজ, কখনো কালিকট, কখনো সৌরাষ্ট্র হয়ে করাচি, তো কখনো হিমালয়ে, খুব এদেশ ওদেশ ঘোরাঘুরি করে ১৯২১ সাল নাগাদ কোলকাতা ফেরেন। বাচস্পতি বংশে এই প্রথম কেউ আমিষ ভক্ষন করেছিল, পেঁয়াজ রসুনের মত নিষিদ্ধ বস্তুর ছোঁয়াচ অবশ্য থিয়েটার পাড়াতেই লেগেছিল দুই ভাইয়ের উপরে।

পুরাতন আস্তানাতে না ফিরে বজবজ বন্দর হয়ে সরশুনা অঞ্চলের পুরাতন বিপ্লবী কমরেড রসিকলাল নিয়োগীর বাড়িতে আশ্রয় নেন। সেখানে থাকাকালীনই বিখ্যাত রায়চৌধুরী পরিবারের কোন এক শরিকের কন্যা ষোড়শী পারুলবালার সাথে প্রেমসম্পর্কে আবদ্ধ হন, ও পরবর্তীতে বরকর্তা সৌদারনন্দের উপস্থিতিতে ধৃতিহোমে, পাটিপত্র থেকে দধিমঙ্গল, শঙ্খকঙ্কন, শুভদৃষ্টির পর কন্যার পিতা যাদবলাল রায়চৌধুরী শ্রদ্ধানন্দকে কন্যা সম্প্রদান করেছিলেন। পারুলবালা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন, নিজে চিঠি লিখতে ও পড়তে পারতেন। বাড়িতে কল্লোল, কালিকলম, প্রগতি ইত্যাদি নানা ধরনের সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকা পড়তেন পারুলবালা।

সংসার জীবন এক বৎসর যেতে না যেতেই শ্রদ্ধানন্দের ভূপর্যটক চরিত্র হাফিয়ে উঠেছিল। ইতিমধ্যে পুনঃর্বার বিপ্লবী রাজনীতিতে জড়িয়ে পরে শত্রুপক্ষের দ্বারা চিহ্নিত হয়ে গিয়ে শ্রদ্ধানন্দের বিপিন পরিচয় ফাঁস হয়ে যায়, ও  অচিরেই আত্মগোপনের প্রয়োজন দেখা দেয়।

রাধিকা শুধালো- শ্রদ্ধানন্দ আবার চলে গেল? ওনার স্ত্রী পুত্রদের কি গতি হয়েছিল?

আমি বললাম- অতো ভেবোনা গিন্নি, ওনারা যদি অসুরক্ষিত থাকতেন- আমি কি আর জন্মাতাম! চলো, বরং একটু সৈকতে যায়। অপরাহ্ণের সমীরণে একটু গা ভিজিয়ে আসি। সন্ধ্যার পর আবার এ আখ্যান শোনাবো।

(৪)

সন্ধ্যার আঁধারে রিসর্টের লনে মানুষজন প্রায় নেই, সকলেই বাজারের দিকে যান। দুধ চায়ের সাথে উষ্ণ ‘বেবি কর্নে পকোরা’ চেবাতে চেবাতে রাধিকা বলল- শুরু করো। আমি বললাম- এ কি ক্যাসেট রেকর্ডার, সুইচ টিপলেই চলবে! কোথায় যেন ছেড়েছিলাম? জবাব এলো- পুনঃরায় দাদামশাইয়ের আত্মগোপনের দরকার পরেছিল… আমি শুরু করলামঃ-

ইতিমধ্যে বন্ধু কানাই মণ্ডলের মাধ্যমে শ্রদ্ধানন্দ সন্ধান পান ‘দ্যা গ্রেট র‍্যেম্যান সার্কাসের’, বড়িশার চন্ডিমেলা ময়দানে তখন তাবু ফেলেছে মালাবারের বিখ্যাত সার্কাস পার্টি। শ্রদ্ধানন্দের মাথায় বুদ্ধি খেলে গেল, আরো ঘনিষ্ট সুত্রে খোঁজ নিলেন যে সেই দলে কোনো ম্যাজিশিয়ান নেই। পুরাতন নেশা আবার চেপে বসল; আত্মগোপন হবে রোজগারও আসবে আবার দেশে দেশে ভ্রমণের ত্রিবেণী সঙ্গম। ছদ্মবেশে সার্কাসে তাঁবুতে পৌছালেন তিনি, ভারতীয় সার্কাসের অন্যতম জনক ‘কল্যাণ গোপালন’ যথারীতি হতে হাতে চাঁদ পেলেন শ্রদ্ধানন্দকে পেয়ে। মাসিক ৮০ টাকা ও খোরপোষের বিনিময়ে কাজ পাকা হয়ে গেল। শুধু শ্রদ্ধানন্দ নামটা হয়ে গেল স্যাডিন।

গোপালনকে সেদিন যে ম্যাজিকটা শ্রদ্ধানন্দ দেখিয়েছিলেন, সেটা ছিল বগলের ভিতর থেকে টিকটিকির ছানা বেড় করে আনার ভেল্কিটা। এমন ধরনের জাদুর জন্যই সে বিখ্যাত ছিল ভাটপাড়া, নৈহাটি, এপারে ফরাসডাঙা, মাহেশ প্রভৃতি অঞ্চলের বাবুবিবিদের কাছে। প্রথমেই ঘিনিঘিনে একটা টিকটিকির উপস্থিতি বগলে অনুভব করে সে এক মেলেচ্ছো কান্ড বাঁধিয়েছিলেন গোপালন সাহেব। আতঙ্কে চিৎকার জুড়েই দিয়েছিলেন আরেকটু হলে। পরে শ্রদ্ধানন্দ তথা ‘দ্যা গ্রেট ম্যাজিসিয়ন স্যাডিন’ সেটা ম্যাজিক হিসাবে বিশ্বাস দেওয়াতে সম্বিৎ ফিরলে, সে তখন হেসেই লুটোপুটি।

প্রায় কয়েক সপ্তাহ পর দোলের আগে তাবু গুটিয়ে কটকের উদ্দেশ্যে রওনা দিল দল। ততদিনে পারুলবালা সন্তানসম্ভবা। সে স্বামীকে বোঝালো যে, গোরাদের হাতে গ্রেপ্তার হলে হয় দ্বীপচালান অথবা যাবজ্জীবন জেল। এর চেয়ে সার্কাসের তাবুর ভিতরে সুরক্ষাই বর্তমানে শ্রেয়, লুকিয়েচুরিয়ে লেখা সাক্ষাতের সুযোগ একটা থাকবে। দেশ নিশ্চই দ্রুত স্বাধীন হবে, তখন সংসার করা হবে চুটিয়ে। এই আশা নিয়ে সার্কাস দলের সাথে ব্যার্থ মনোরথে রওনা দিল শ্রদ্ধানন্দ।

ইতিমধ্যে কন্যার প্রসবক্ষণ এগিয়ে এলে শ্বশুরবাড়ির কুল ভাটপাড়াতে যোগাযোগ করেন পিতা  যাদববাবু, প্রথমে কিছুটা দোনামনা করলেও সম্বন্ধীর মধুর আচরন, কুলবংশ, ও বংশপ্রদীপের সুখে- নাতির মুখদর্শনে এসে বৃদ্ধ শ্রমণানন্দ নাম রাখলেন ভবানন্দ বাচস্পতি, আমার পরম পূজনীয় স্বর্গীয় পিতাঠাকুর।

রাধিকা আকাশের দিকে মুখ তুলে বিড়বিড় করে স্বর্গীয় শ্বশুরমশাইকে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে নিল মনে মনে।

আমারও মনটা ভারাক্রান্ত হল, বললাম নৈশভোজের পর বিছানাতে শুয়ে শুয়ে বাকি গল্পটা শোনাবো। চলো এই রিসর্টের বিশিষ্ট পদ ‘ডাব-কাঁকড়া’ দিয়ে দুটো রুমালি রুটি জমিয়ে খাওয়া যাবে। রাত্রের আঁধারেও রাধিকার বড় বড় চোখের শাসনটা বেশ ঠাওর করে বুঝলাম, এ বয়সেও তির নিশানাতে লাগে।

(৫)

মহিলা মানেই বাতিকগ্রস্থ। সেবা, বাৎসল্যে ওনারা অসামান্য, পাশাপাশি সন্দেহতেও। রাধিকার বয়স হয়েছে, কিন্তু দিনের শেষে সে মহিলাই। খুনসুটির ভাঁড়ারে কখনো উপাত্ত ভাঁটা আসেনি। এই বংশচর্চার মায়া ওকে বেশ প্রভাবিত করেছে দেখলাম, কার কখন কোন ওষুধ ধরে কে জানে। রাত্রে শুয়ে এসবই ভাবছিলাম, রাধিকা ছেলে, মেয়ে, নাতি-নাতনি, ভাইয়ের স্ত্রী ও এক দুটো পড়শির সাথে রোজদিনকার নির্ধারিত ফোনালাপ সেরে আমাকে বলল- কই আর বললেনা। আমি বললাম- কি করব , দেখছিলেনা কত ব্যাস্ত ছিলাম। প্রেম যেমন কখনো বৃদ্ধ হয়না, তেমনি স্ত্রীও কখনো বোকা হয়না। পাশে বসে আমার আদুর শরীরে একটু হাত বুলিয়ে বলল- আমাদের প্রেমের ফসল যে ওরাই। আমি বললাম – তোমার ওই পড়শিতে আমার কোনো হাত ছিলনা। চোখ বড়বড় করে  রাধিকা বলল- তারপর বলো, শ্বশুরমশাইয়ের নামকরনের পর?

আমি শুরু করলাম।   

স্বাধীনতার পর কয়েক বছরের জন্য ভাটপাড়াতে ফিরেছিলেন শ্রদ্ধানন্দ। প্রথমে কোলকাতায় ফিরে ভাটপাড়ার খবর জানতে পারেন, যে ওনার পিতা তার পুত্রবধুকে সসম্মানে গৃহে ফিরিয়ে নিয়েছেন। যদিও পারুলবালার সেখানে মন তেকেনি বেশিদিন, সে পিতৃগৃহেই ফিরে আসে। শ্রদ্ধানন্দ ভাটপাড়া পৌছনোর পূর্বেই শ্রমণানন্দ একটু বেশী বয়সে জলে ডুবে সমাধি গ্রহণ করেন। শেষ বয়সে শ্রমণানন্দ ওই স্মৃতিভ্রম রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। সে সময়ে ঘাটে উপস্থিত পড়শিদের কৌতুকমিশ্রিত বয়ান অনুযায়ী-  গঙ্গাস্নানে গিয়ে কোবরেজ মশাই বোধয় জল থেকে উঠতে বা নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গিয়েছিলেন।

পিতার মৃত্যু সংবাদ শ্রদ্ধানন্দকে কাতর করে তুলেছিল। ভাটপাড়াতে আর মন টেকেনি শ্রদ্ধানন্দের। বড়িশা থেকে স্ত্রী পুত্রকে নিয়ে বরাহনগরে দাদার বাড়িটিতে এনে সেখানে বসবাস শুরু করেন। এরই মাঝে সোদপুর অঞ্চলের ঘোলাতে কয়েক বছর যাবত, ‘পারুলছাপ’ কাপড় কাচা সাবানের কারখানা, মধুমালা চানাচুর, মতিহারি নস্যি, ‘ত্রিলোকবালা’ তরল আলতা সিঁদুর, স্বদেশী ছাপ গেঞ্জি ফতুয়া ইজের কারখানার মত অনেক ধরনের বুনিয়াদী ব্যবসার প্রচেষ্টা করে সফল হয়েছিলেন। তবে কিছুতেই মন টেকাতে না পেরে প্রথমে প্রয়াগে যাত্রা করেন সাধু হবেন বলে। সেটা না হয়ে এক বাঙালী নায়েব হিরন্ময় তালুকদারের সাথে প্রয়াগের ঘাটে পরিচয় হয়, সেই সুত্রেই মধ্যপ্রদেশ অঞ্চলে চিত্রকূটে এক নেটিভ স্টেটের রাজার এস্টেটে কোনো একটা পদে যোগদান করেন বলে জানা যায়।

বৃদ্ধ বয়সে আগে ওনারও স্মৃতিভ্রম রোগ হলে সেই রাজার পক্ষ থেকেই ভাটপাড়ার বাড়িতে শ্রদ্ধানন্দকে রেখে যান। ততদিনে বিস্তর আধুনিক চিকিৎসা কলকাতা শহরে এসে গেছিল। ফলে শ্রদ্ধানন্দ স্বল্পসময়ের জন্য স্মৃতি ফিরে পেয়ে আমার প্রথম কৈশোরে উপরোক্ত ইতিহাসগুলো বর্ণনা করে যান।

আমার পিতা ভবানন্দ- রায়চৌধুরী পরিবারের পৌত্র। তিনি আইন নিয়ে পড়াশোনা করে, হাকিম পদে চাকুরী গ্রহণ করেন। কলিকাতার সাউথ সুবার্বান কলেজে পড়বার সময় বীরভূমের তারাশঙ্করের সাথে কিছুদিন ঘনিষ্ট সহচর্য লাভ করার সৌভাগ্য হয়েছিল ভবানন্দের। প্রথমদিকে বদলির চাকুরীর দরুন ধকলে জ্যাঠা মশায়ের মত অকৃতদার থেকে যাবার বাসনা জন্মেছিল। কিন্তু প্রবাসী বা শনিবারের চিঠিতে নিয়মিত লেখালেখি করার দরুন পত্রমিতালিতে আমার মায়ের সাথে আলাপ প্রণয়ে পৌছায়; এবং অনেকটা বেশি বয়সেই বিবাহ করেন। চাকুরিরত অবস্থাতেই অতি অল্পবয়সে ওনারও স্মৃতিভ্রম হলে, চিকিৎসকের পরামর্শে তিনি দার্জিলিং পাহাড়ে স্বাস্থ্য উদ্ধারে গিয়ে পা পিছলে মায়ালোকের উদ্দেশ্যে রওয়া দেন। যদিও আমি তার আগেই কোলকাতা ছেড়েছি।

বাকিটা তুমি জানো। এই হল আপাতত সংক্ষিপ্ত বাচস্পতি বংশের ইতিহাস।

ইস্কুল জীবনের স্মৃতি হাতরাতে গিয়ে কি সব মনিমুক্ত বেড়িতে এলো, ধন্যবাদ অকপট।

রাধিকার সাড়াশব্দ না পেয়ে মোবাইলের মৃদু আলোকে দেখলাম নিদ্রাদেবী রাধিকার দুচোখের উপরে রাজ্যপাঠ জাঁকিয়ে বসেছে। সুতরাং আমিইবা কেন মিছিমিছি জেগে থাকি। আগামীকাল আবার স্কুল জীবনের খোঁজে ডুবুরি নামাতে হবে, অকপটের সাহিত্যবাসর কি আর ছোটখাটো বিষয়!

-বিদায়

~প্রেমানন্দ বাচস্পতি

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *