মুসলমান তুমি নিজেকে চেনো

প্রথম কিস্তি

বিড়ম্বনারা আমার শেষ নেই, এমন একটা নিপাট বাঙালী নামের সাথে প্রগতিশীল পশ্চিমবঙ্গীয় বাঙালী সমাজ- খাপ খাইয়ে নিতে বেশ কয়েক মিনিট সময় নেয়; এটা ছোট থেকে নিয়মিত হবার দরুন অভ্যাসে গা-সওয়া হয়ে গেছে আমার। আমার নামটা রাখা হয়েছিল জিয়াউল হক, জানিনা ঠিক কেন ও কবে থেকে আমার মায়ের নামের সাথে মিলিয়ে রেখে তন্ময় নামটাই পার্মানেন্ট হিসাবে রয়ে গেছে। এখন এটা নিয়ে অনেকেরই সমস্যার শেষ নেই, কবি নজরুলের কবিতার লাইন ধরে বলতে পারি-

“হিন্দুরা ক’ন, আড়ি চাচা !

যবন না আমি কাফের ভাবিয়া খুঁজি টিকি দাড়ি, নাড়ি কাছা !

মৌ-লোভী যত মৌলভী আর ‘মোল-লারা’ ক’ন হাত নেড়ে,

‘দেব-দেবী নাম মুখে আনে, সবে দাও পাজিটার জাত মেরে !’

ফতোয়া দিলাম কাফের কাজী ও,

যদিও শহীদ হইতে রাজী ও !

‘আম পারা’-পড়া হাম-বড়া মোরা এখনো বেড়াই ভাত মেরে !’

হিন্দুরা ভাবে, ‘পার্শী-শব্দে কবিতা লেখে, ও পা’ত-নেড়ে !

আনকোরা যত ননভায়োলেন্ট নন্-কো’র দলও নন্ খুশী ।

‘ভায়োলেন্সের ভায়োলিন’ নাকি আমি, বিপ্লবী -মন তুষি ।

‘এটা অহিংস’, বিপ্লবী ভাবে,

‘নয় চরকরা গান কেন গা’বে ?’

গোঁড়া-রাম ভাবে নাস্তিক আমি, পাতি-রাম ভাবে কনফুসি !

স্বরাজীরা ভাবে নারাজী, নারাজীরা ভাবে তাহাদের অঙ্কুশি !

নর ভাবে , আমি বড় নারী -ঘেঁষা ! নারী ভাবে, নারী বিদ্বেষী”।

শেষ লাইনটা বরং এ ভাবে বলাই যায় – “মোল্লা ভাবে, আমি বড় হিঁদু -ঘেঁষা ! হিঁদু ভাবে, হিঁদু বিদ্বেষী”।

ভুমিকাটা বড় ঘ্যানঘ্যানে ন্যাকামু মার্কা আত্মমৈথুন ধরনের হয়ে গেল, কারন আমরা অধিকাংশ ‘ভারতীয়’ মুসলমানেরা ভীষণভাবে ক্ষণিমতি বা জড় বুদ্ধি সম্পন্ন। সোজা কথাটা সোজা করে বলতে পারলে এতটা দুর্দশাতে থাকতামনা। আমরা এমন একটা সময়ে বসবাস করছি যেখানে সারাক্ষণ আমাদের ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়- এই বোধহয় আমাকে এই দেশে বাস করার জন্য নাগরিকত্বের প্রমান দাখিল করতে হবে, দেশপ্রেমের তাজা প্রমান দিতে হবে। যেকোনো সময় রাষ্ট্র আমাদের মাঝ থেকে যাকে খুশি তুলে নিয়ে যেতে পারে যেকোনো অজুহাতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই না ফেরার দেশে।

গোটা বিশ্বজুড়েই ইহুদি নিয়ন্ত্রিত বিশ্ব প্রচার মাধ্যমের কল্যাণে ‘মুসলমান মানেই তার উপরে নিঃশর্তে সন্দেহ করা যায় সন্ত্রাসবাদী হিসাবে’, এটা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। সুতরাং এমন পরিস্থিতিতেও মুসলমান কেবল প্রতক্ষ্য ‘আল্লার করিস্মার’ ভরসাতে রয়েছে- যে আমাদের জন্য রাতারাতি কোনো জাদু হবে, যা আমাদের আর্থসামাজিক পরিস্থিতি দুম করে বদলে দেবে। শুধু জন্মদানের নিয়ন্ত্রনটা নিজেদের হাতে রেখেছি, নতুবা শেষ ৭০ বছরে প্রায় ৬% বেশি বাচ্চা পয়দা করেছে মুসলমানেরা।

এত সকল কিছুর পরেও স্বাধীনতার আগে ব্রিটিশ চক্রান্তে ‘নেহেরু-জিন্না’ সমক্ষমতা ভোগের জন্য ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগের ঋণ পরিশোধ করে চলতে হচ্ছে আমাদের প্রজন্মকে। শিক্ষা ও পরিকল্পনা বিহীন ধর্মীয় গোষ্ঠী হিসাবে ভারতীয় মুসলমান, নিজভূমে আমরা নিজেদেরই প্রজন্মান্তরে পরবাসী করে রেখেছি দায়িত্ব নিয়ে।

আম ভারতীয় হিসাবে সংবিধান সুত্রে, জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলে যে কয়টি মৌলিক অধিকার জন্মসুত্রে প্রাপ্ত হই সেগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করি-

১) সাম্যের অধিকার, মানে কোনোপ্রকার ভেদাভেদ থাকবেনা। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, জন্মস্থান ইত্যাদির কারনে জীবনযাপন বা চাকুরী বা পরিসেবার পাবার জন্য কোনোরূপ বৈষম্য বা অস্পৃশ্যতা থাকবেনা।

২) আপন সংস্কৃতি রক্ষা ও শিক্ষার অধিকার। নিজ সংস্কৃতির অবাধ অনুশীলন ও প্রগতীশীল উন্নত শিক্ষা ব্যাবস্থার পরিমণ্ডল পাওয়াটাও সাংবিধানিক অধিকার।

৩) স্বাধীনতার অধিকার। স্বাধীন ভাবে মত প্রকাশ, যেখানে খুশি দেশের মধ্যে যাওয়া, থাকা, খাওয়া, সভা, সমিতি, সমাবেশ করা, এবং যেকোনো পেশা বেছে নেওয়া, মনমত জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়া ইত্যাদি আমাদের স্বাধীনতার অঙ্গ।

৪) শোষনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অধিকার। বাধ্যতামূলক শ্রম, শিশু শ্রম, মানব পাচার, দাস প্রথা ও বিধিবিরুদ্ধ কাজকর্ম জোর করে করানো নিষিদ্ধি।

৫) আপন ধর্মাচারনের অধিকার। ধর্মের ভিত্তিতে পেশা নির্বাচন করা। ধর্মীয় কৃষ্টি ও রীতি নিয়মের সংরক্ষণ ও উদযাপন করা, ধর্মীয় কারনে উৎসব করা ও সেই নিমিত্ত অর্থসংগ্রহ করা বৈধ। ধর্মীয় ও সেই সম্বন্ধীয় সংস্কৃতির উপরে প্রথাগত শিক্ষা গ্রহন করাও সংবিধান স্বীকৃত। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য তাদের পৃথক ভাষাভাষী ধর্মীয় গ্রন্থ সংরক্ষণ, ও সেই সংক্রান্ত পছন্দসই শিক্ষা গ্রহনের অধিকার আমাদের মৌলিক অধিকার।

৬) সংবিধানে উল্লেখিত যাবতীয় সুযোগ সুবিধা বুঝে নেওয়ার অধিকার। এটা আলাদা করে উল্লেখ করা রয়েছে, যে সংবিধানে উল্লেখিত সকল সুবিধা বুঝে নেওয়াটাও মৌলিক অধিকার। এছাড়া নাগরিক জীবনে নিজ সম্পর্কে গোপনীয়তা রক্ষা করাও আমাদের সংবিধান স্বীকৃত অধিকার।

তথাকথিত যে মুসলিম দুনিয়া, তারা আমাদের মত ‘হিন্দু’ দেশের কনভার্টেড মুসলমানদের ‘ছহি’ মুসলমান বলে স্বিকৃতিই দেননা। এদেশের কতজন মুসলমানের রক্তে আরবিয়ান রক্ত রয়েছে? আমাদের পূর্বপুরুষেরা হয় নিকৃষ্ট ব্রাহ্মণ্যবাদের অত্যাচারে মুসলমানত্ব গ্রহণ করেছিল, অথবা সম্রাট বা সুলতান বা নবাবের থেকে ভুসম্পত্তি ও ক্ষমতার লোভে ধর্মীয় পরিচয় পরিবর্তন করে মুসলমানিত্ব গ্রহণ করেছিল; আর এটা করেছিল সমাজের তৎকালীন অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষেরা। গোদা বাংলাতে এটাই এদেশের মুসলমানদের ইতিহাস।

অঙ্কের হিসাবে পৃথিবীর প্রতি তিন জনের একজন মুসলমান নাগরিক। আসলে এটা একটা শুধুই সংখ্যা, নতুবা ইন্দোনেশিয়ার ( বিশ্বের মোট মুসলমানের সংখ্যার ১৩% এর কিছু বেশি) পর আমাদের ভারতেই গোটা মুসলিম দুনিয়ার প্রায় ১২% এদেশে বাস করি। যা সৌদি আরবের মুসলমান সংখ্যার ৭ গুণ, পাকিস্তান বা বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি। যদিও এটা সরকারী পরিসংখ্যান, আমার ব্যাক্তিগত মত এটা ইচ্ছাকৃত ভাবেই কম দেখানো রয়েছে, আসলে আরো অনেকটা বেশি। https://www.pewforum.org/2015/04/02/muslims/pf_15-04-02_projectionstables74/

তাহলে আমাদের সমস্যাটা কোথায়? সংখ্যা থাকার পরেও  এই দেশে আমরা কেন হীনজাত শ্রেনীর নাগরিক? কারন আমাদের সংখ্যাটা ওই গুন্তিতেই সীমাবদ্ধ। আমাদের মাঝে যেটার সবচেয়ে বেশি অভাব সেটা হল যুগোপযোগী শিক্ষার। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের ২০১৬ সালের একটা তথ্য অনুসারে আমাদের দেশের প্রায় অর্ধেক মুসলমান জনসংখ্যাই পুঁথিগত ভাবে অশিক্ষিত। https://indianexpress.com/article/india/india-news-india/muslim-illiteracy-rate-india-census-report-education-3006798/ সুতরাং বুঝতেই পারছেন, অক্ষরজ্ঞান বিহীন একটা ধর্মীয় গোষ্ঠী বংশপরম্পরায় শুধুমাত্র শ্রমিক শ্রেনী হয়েই রয়ে যাচ্ছে। এ তো গেল প্রাথমিক শিক্ষার হিসাব, কিন্তু উচ্চশিক্ষা! সেখানে মোট মুসলিম জনসংখ্যার মাত্র ৪.৯% সুযোগ পায় । https://www.dnaindia.com/india/report-number-of-muslims-in-higher-education-remains-low-2673637 ভারত দেশের গোটা ১৩০ কোটি জনসংখ্যার হিসাবে শতাংশের হারটা আন্দাজ করতে পারছেন? ১৪.২০ শতাংশ মোট ভারতীয় মুসলমান জনসংখ্যা ধরলে সেটা ওই ১৩০ কোটির নিরিখে মাত্র শয়ে ০.৬৫৮ জন। মানে উচ্চশিক্ষাতে সুযোগের ক্ষেত্রে প্রতি ১৪৪ জনে একজন মাত্র ভারতীয় মুসলমান সুযোগ পায়।

এবারেই সেই অতি জঘন্য ও প্রায় রাষ্ট্রবিরোধী কাজটির সামনে এসে উপস্থিত হই, রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্ন করা। রাষ্ট্র কখনো প্রশ্ন পছন্দ করেনা, নিঃশর্ত আনুগত্যের কোনো বিকল্প নেই। অশিক্ষিত মুসলমানেদের কাছে সময় কোথায় প্রশ্ন করার? পেটের চিন্তার পর, তাকে সর্বক্ষন উৎকণ্ঠাতে থাকতে হয়, এবং নিজেকেই অবচেতনে প্রতিনিয়ত জিজ্ঞাসা করে- “অদৌ আমি এ দেশের নাগরিক তো”?, সে রাষ্ট্রকে প্রশ্নটা করবে কোন সাহসে?

দ্বিতীয় কিস্তি

আমরা পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান। হ্যাঁ মুসলমান, বাঙালী মানে এখানে শুধুই হিন্দু বা সনাতন ধর্মীয় মানুষেরা!  গত ২-৩ দিন আগে নৈহাটি ষ্টেশনে দুপুরের গরমে শশা কিনতে গিয়ে শশা বিক্রেতা মাঝবয়সী ভদ্রমহিলা বললেন আপনাদের রোজা শুরু হলে এই শশা’ই ১০ টাকা পিস খেতে হবে বাঙালীদের। আমি মোটেও তাজ্জব না হয়ে বললাম বাড়িতে সবাই জানে যে আপনারা বাঙালী? সমবেত আরো কয়েকজন সহযাত্রীর মাঝে ঈষৎ তাচ্ছিল্যপূর্ণ হাসির রোল উঠল। এটা হয়ত প্রতীকী, কিন্তু এমন অভিজ্ঞতা আমাদের ভারতীয় মুসলমানেদের কাছে প্রায় সার্বজনীন।

আসলে আমরা নিজেরাই হিসাব জানিনা। ভারতে ৯ কোটি ২৭ লক্ষ ও বাংলাদেশে ১৬ কোটি ৩০ লক্ষ বাঙালির বাস। অবশিষ্ট বিশ্বে আরো প্রায় আরো লাখ বিশেক বাঙালী বাস করে। https://en.wikipedia.org/wiki/Bengalis ২০১৬ সালের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের ১৪ কোটি ৫০ লাখ, পশ্চিমবঙ্গের ৩ কোটি ৯০ লাখ ও অবশিষ্ট বিশ্বের ১২ লাখ মানুষই মুসলমান। ২৫ কোটি ৫৭ লাখ মানুষের মধ্যে ১৮.৫০ কোটি বাঙালিই মুসলমান, যা শতাংশের বিচারে ৭২ শতাংশ। https://en.wikipedia.org/wiki/Bengali_Muslims এর পরও শশা’ওয়ালী জানেন ওনারাই বাঙালী, আসলে জানানো হয়েছে। যেমন আমরা শিখে এসেছি ও চলেছি বাঙালির সার্বজনীন উৎসব নাকি দুর্গাপুজো, যেটা মাত্র ২৫ শতাংশের মত বাঙালীই পালন করেন, সারম্বরে আরো কম। ৫ শতাংশ বাদ দিলাম, কারন দুই বাংলার জৈন, খ্রিষ্টান, শিখ, আদিবাসী প্রমুখ এনারাও বাঙালীই বটে। নাস্তিক, শাক্ত, ব্রাহ্ম, বৈষ্ণব এনাদের কথা তো ধরলামইনা, তাহলে অঙ্কটা ২০% এরও কমে নেমে চলে আসবে। আসলে যেমনটা আমাদের শেখানো হয়েছে, আর আমরা শিখেছি। শুধু RSS বা আজকের বিজেপির দোষ দিয়ে কি লাভ? আসল ইতিহাসকে সেভাবে কখনই আমাদের জানানো হয়না। যেমন আমরা শিখছি বীর সাভারকর কতটা বীর ছিলেন, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে ওনার ভূমিকা গান্ধী- নেহেড়ুর চেয়েও বেশি। নিশ্চই আগামী ১৫-২০ বছরের মধ্যে বীরের এইটুকু অগ্রগতি টুকু হবেই হবে। কোথাও আর উল্লেখ থাকবেনা মুসলমানেরা কখনও স্বাধীনতা নামক যুদ্ধে লড়েছিল বলে, অতএব আমাদের আগামীর প্রজন্ম বিস্মৃতির অন্তরালে হারিয়ে যাওয়া একটা ধর্ম ভিত্তিক জাতির কথা কখনো জানতে পারবেনা। গডসের দিব্যি, এমন স্ববিরোধী জাতিকে অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা করে কার এমন হিম্মত রয়েছে?

আমাদের শেখানো হয় শিশুপাঠ্য থেকে, এই ১৫-২০ শতাংশের সনাতনীয় উচ্চবর্ণ হিন্দুদের কৃষ্টি সংস্কৃতিই তোমার আগামীর পরিচয়। নিন্ম বর্ণের হিন্দুরাও এই অত্যাচারের শিকার। ঘরে আমরা কি শিখি? সাধারণ জ্ঞান, ইতিহাস বা ভূগোল এই সকল কিছু? মোটেই তা না। স্কুলের ছুটিতে একটা আম মুসলিম বাড়িতে শিশুকে কোরান হাদিস শেখানো হয়। তোতাপাখির মত আমপাড়া, কায়দা, সূরা মুখস্ত করানো হয়, মানে মতলব না জানিয়েই। ৫০% মুসলমান অবশ্য এই সূরা, দোয়া দরুদও জানেননা। বাকিদের মধ্যে ৯০% ‘সূরা, কোরান, হাদিস’ জানা মুসলমান সারাজীবনেও জানতে পারেননা যে, রোজ যেগুলো নিষ্ঠাভরে জপে গেলেন তার মানে বা অর্থ ঠিক কি ছিল! কে বাঁচাবে এদের ধুর্ত রাষ্ট্রপরিচালকদের হাত থেকে।

আমরা সকল ‘পড়ালেখা’ করা মুসলমান ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে কিভাবে যেন শিখে যায় কত হরেক ফিকিরে ‘মুসলমানত্ব’ পরিচয় লুকাতে হয়। কিভাবে তীব্রভাবে দূর্গাপুজো, হোলি, দীপাবলি, বড়দিন ইত্যাদি জানানদিয়ে পালন করে নিজেকে প্রায় হিন্দু বা উচ্চশ্রেণীর মুক্তচিন্তাধারার ‘আধুনিক মুসলমান’ প্রমান করতে হয়। যে মুসলমানত্বে শুধুই নামটুকু আরবি, বাকিটা সবই দেশীয় বাঙালী হিন্দু সংস্কৃতির। ভাবটা এমন যেন, জন্ম হয়েছে মুসলমানের ঘরে এটা আমার অদৃষ্ট দোষ, তবে আমি দৃশ্যত কৃষ্টি সংস্কৃতির সভ্যতাতে যে কোনো হিন্দু বা খ্রিষ্টান বন্ধুদের গুণে গুণে টেক্কা দেব। ভেবে দেখুন, আপনার অমুসলিম বন্ধুগুলো কি আপনার মত এই অদিখ্যেতা দেখায়? এরা জানেও না কোরাণে কি লেখা আছে, অন্য ধর্মগ্রন্থের কথা ছেড়েই দিন। এরা জানেনা মুসলমান হবার জন্য ফেজ টুপি আর দড়ি রাখাটা হিন্দুদের টিকি রাখার মতই ঐচ্ছিক। নামাজ পড়ার জন্য উর্ধাঙ্গ ও পায়ের হাতু পর্যন্ত ঢাকা হলেই চলে। এরা শুধু জানে কোরানে জ্বেহাদ কথাটা লেখা আছে, তাই মুসলমানেরা মানুষ খুন করে। আসলে এদেশে গরু খাওয়াই যেন মুসলমানত্বের একমাত্র সূচক। আমরা মুসলমানেরা রোজার ত্যাগ না করেই যখন ঈদের উৎসবে মেতে উঠি, খুশির ঈদ পালনে। খুশি কাদের? যারা এক মাস দিনের বেলা কঠিন কৃচ্ছসাধনের পর দিনের বেলা ‘খাদ্য, পানীয় ও যৌনতার’ অধিকার ফিরে পায়, খুশি তো তাদের। আমরা রোজ গাণ্ডেপিণ্ডে গিলে ঈদের খুশির উৎসব পালন করি। এ যেন বাঁজা মহিলার পোয়াতি সুখ। মুসলমানকে অত্যাচারিত হওয়া থেকে কে আঁটকাবে?

সাম্প্রদায়িক লেখা মনে হচ্ছে তাই না? আজ্ঞে আমার জাতিগত পরিচয়কে শ্রদ্ধা করতে ও তার কৃষ্টি কালচারকে অনুশীলন করতে আমার ভারতীয় সংবিধানই আমাকে অধিকার দিয়েছে। তাই আপনি ছিদ্রান্বেষণ করতেই থাকুন, আমার কিচ্ছুটি যায় আসেনা।

সুন্নি ও শিয়া নিয়ে তেমন স্পষ্ট ধারণা অনেক মুসলমানেদেরই নেই। অমুসলমাদের অনেকের ধারণা সুন্নি মুসলমান মানে বোধহয় এরা শুনে শুনে মুসলমান হয়েছে। আসলে ব্যাপারটা তা নয়, ইসলামের শেষ নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর জীবনধারাকে সুন্নত বলা হয়, আর এটা যে সকল মুসলমানেরা মেনে চলেন তাদের সুন্নি বলা হয়। অন্য ভাগটি হচ্ছে শিয়া। মুহাম্মদের (সাঃ) এর মৃত্যুর পর একদল মুসলমান(!) দাবী করে- যেহেতু মুহাম্মদ(সাঃ) মারা গেছেন তাই তাঁকে মানার প্রয়োজন ফুরিয়েছে, বরং ওনার জামাতা আলী (রাঃ) কেই ওনার উত্তরসুরী হিসাবে মানতে শুরু করেন। এই নতুন সম্প্রদায়কে ‘শিয়াতুল আলী’ বা আলীর অনুসারী হিসাবে ডাকা হয়। শিয়া শব্দটি শিয়াতুলের সংক্ষেপ রূপ যার অর্থ ‘অনুসারী’। মোট মুসলমানের ১০%ই মাত্র শিয়া অনুসারী। এর বাইরে ইসলাম বলে দাবীকৃত যাবতীয় দল উপদল গুলো ভুয়ো, কাঁঠালের আমসত্ব টাইপ।

আমাদের ভারতীয় সমাজের মধ্যে একটা ধারণা প্রচলিত আছে, মুসলমানেরা সেই সাবেক কালের ধ্যনধারনা নিয়ে পরে আছে, অতএব এরা কূপমুন্ডক ইত্যাদি; এরা আর আধুনিক হতে পারলনা। আসলে আমরা জবাব দিতে পারিনা, অভ্যাস নেই বলে। নতুবা বলাই যায় ৭০০০ বছরের সনাতন বা  প্যাগান বা আর্য ধর্ম, ৩০০০ বছরের ইহুদি ধর্ম, ২৫০০ বছরের বৌদ্ধ ধর্ম আর ২০০০ বছরের খ্রীষ্ট ধর্ম, এর পাশে ১৪০০ বছরের পুরাতন ইসলাম- কোনটা আধুনিক হল সুধী? আপনি আপনার ধর্ম মানুন, কিন্তু অন্যের সম্বন্ধে জ্ঞান দেবার আগে তথ্যগতভাবে অন্তত সঠিকটা বলবেন। আসলে আমাদের গোঁড়াতেই তো গলদ। শিক্ষা নেই। তর্ক কিভাবে করতে হয় সেটাও শিখতে হয়।    

রামকৃষ্ণ মিশন, বিদ্যাভারতী, সরস্বতী বিদ্যামন্দির, সেন্ট জেভিয়ার্স, সেন্ট পলস, ইত্যাদি স্কুলে যথাক্রমে হিন্দু ধর্মীয় ও খ্রীষ্টীয় মতে উপাসনা করে স্কুল শুরু হলে সেটা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি লঙ্ঘিত হয়না, কিন্তু মাদ্রাসা নাম বললেই মিনি হার্ট এটাক হয়ে যায় এক শ্রেনীর ভারতীয়ের। শব্দগত মর্মার্থ হিসাবে বিদ্যালয়-স্কুল-মাদ্রাসা সমার্থক।, অথচ মাদ্রাসার নাম নেওয়া মানেই সন্দেহজনক জঙ্গি জঙ্গি ভাব এসে যায় সামাজিক বন্ধুদের মনে।  সরকারী হিসাব মতেই গোটা ভারতে ১২০০০ এরও বেশি RSS পরিচালিত স্কুল রয়েছে https://en.wikipedia.org/wiki/Vidya_Bharati। মিশনারি স্কুলের সংখ্যাও ৪ হাজারের বেশি https://en.wikipedia.org/wiki/List_of_Christian_schools_in_India। সেখানে গোটা ভারতে মাদ্রাসার সংখ্যা কত? নাহ আমি কোনো ভরষাযোগ্য লিষ্ট খুঁজে পাইনি ইন্টারনেটে। এটাই আমাদের জাতির বর্তমান পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করে দিতে বোধহয় যথেষ্ট। এমন অগোছালো জাতির ভবিষ্যৎ থাকাটাই আসলে পাপ।

তৃতীয় কিস্তি

আমরা হিন্দু মুসলমান এত বছর ধরে পাশাপাশি আছি, কিন্তু অনেকে জানেনইনা মাদ্রাসা আসলে কি এবং কেন, কি এর পরিচালন ব্যবস্থা এবং কারা এখানে পড়তে আসে। সকলের আগে জানা দরকার মাদ্রাসা আসলে কয় রকম? মাদ্রাসা মানে পাঠশালা, ভারতে এটা দুই ধরনের। একটা হাই মাদ্রাসা, যেটা রাজ্য সরকার গুলো পোষিত, ও সেকেন্ডারি বোর্ডের স্কুল গুলোরই অনুরূপ। অন্যটি হচ্ছে কওমি (কওমের বাংলা অর্থ সম্প্রদায়) বা চালু ভাষাতে খারিজী (এই শব্দ নিয়ে বিবাদ আছে) মাদ্রাসা। এদের প্রাথমিক স্কুলের নাম মকতব। এখানে বাচ্চারা আবাসিক স্কুলের নিয়মে ভর্তি হয়, এগুলো সরকার স্বীকৃত কিন্তু বিন্দুমাত্র খরচার দায়ভার গ্রহন করেনা। এরা মূলত লুঙ্গি চুড়িদার পরিধান করে ও মাথায় ফেজ টুপি পরিধান করে, বাচ্চা বুড়ো নির্বিশেষে।

আরবি ধারাপাত “আল কায়দা” থেকে শুরু করে কোরান ও হাদিসের উপরে নানান ধরনের কোর্স,  ইসলামের ইতিহাস, দর্শন ইত্যাদির উপরে পাঠ্যক্রম সমাপ্ত করে পরীক্ষাতে উত্তীর্ণ হলে তবেই শংসাপত্র ও উপাধি মেলে। উত্তরপ্রদেশের দেওবন্ধে এই শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। মৌলানা মানে শিক্ষক, মুফতি মানে শরিয়তি সামাজিক আইন বিশেষজ্ঞ, কাজী মানে বিচারপতি, হাফিজ মানে গোটা ৯০০ পৃষ্ঠার কোরানটা দাঁড়ি- কমা, কোলন সহ নির্ভুল ভাবে মুখস্ত রয়েছে যার, মুয়াজ্জিন মানে যিনি নামাজের জন্য আজান দেন, মৌলভি মানে পণ্ডিত, ক্বারি সাহেব মানে আরবি ব্যকরন ও উচ্চারনের বিশেষজ্ঞ, উস্তাদ মানে নির্দিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ প্রমুখ নানা ধরনের উপাধি ইসলামী মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাতে রয়েছে। 

এর পাশাপাশি নাম সই করা ও খবরের কাগজ পড়ার মত বাংলা শিক্ষা, যৎসামান্য ইংরাজি শিক্ষা ও নুন্যতম দৈনন্দিন প্রয়োজনের মতকরে কিছুটা অঙ্ক শেখানো হয়। প্রথাগত বিজ্ঞান, ভূগোল বা বিশ্ব ইতিহাস পড়াতে আমি নিজে তেমন কিছু দেখিনি। একটু বড় হলে এদের নানা ধরনের বৃত্তিমূলক শিক্ষা দেওয়া হয়, যাতে পেশাগত ভাবে কিছু করে খেতে পারে। এর পাশাপাশি থাকে ক্রমগাত নীতিগত সামাজিক শিক্ষার নিরন্তর অনুশীলন, ইসলামিক জীবনধারা অনুসারে। যাতে আর যাই হোক, চোর, ডাকাত, পকেটমার বা রাস্তায় উচ্চিংড়ের মত আচরন না করে। এই গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাটার সবটাই অবৈতনিক। এদের খাওয়া দাওয়া, শিক্ষকদের বেতন, মাদ্রাসার স্কুল ঘর ও আবাসিক গৃহের রক্ষণাবেক্ষণের যাবতীয় সমস্ত খরচা, দেশীয় মুসলমানেরা নির্দিষ্ট চাঁদার ভিত্তিতে দিয়ে থাকে। ইসলাম ধর্মে জাকাত নামে দানের একটা সিস্টেম আছে, যেটা আমাদের আয়করের মত। সাড়ে সাত ভরি সোনা বা সাড়ে ৫২ ভরি রূপা বা সমমুল্যের অধিক যা কিছু নগদ বা ভূসম্পত্তি থাকবে সেটার উপরে নিখুঁত অঙ্ক কষে বাৎসরিক ২.৫০ (আড়াই) শতাংশ হারে যাকাত দিতে হয়। এটা বিশ্বজনীন হিসাব, ডলার হলে ডলারে দেবেন , দিনার হলে দিনারে আর টাকার দেশে বাস করলে টাকাতে। ইসলামের মুল পাঁচটি স্তম্ভের ইমান ও নামাজের পরই জাকাতের গুরুত্ব, এর পরে রোজা ও সর্বশেষে হজ্জ্ব (শুধু সমর্থবানদের জন্য আবশ্যিক)।

এই জাকাতের প্রথম দাবিদার নিজের গরীব আত্মীয়, তারপরে নিকটবর্তী পড়শি (মুসলমান হতেই হবে তার কোনো প্রয়োজন নেই), তার পরে অবশিষ্ট টাকাটা বৃহত্তর মুসলমান সমাজের উন্নতিকল্পে মাদ্রাসাতে পৌঁছে যায়। ইসলামিক নিয়মে জাকাত ফাঁকি দেওয়া সম্পত্তি শুয়োরের মাংসের মতই নিষিদ্ধ, তাই নগণ্য কিছু শতাংশ মুসলমান ছাড়া সাধারণত কেউই জাকাত ফাঁকি দেয়না। বুঝতেই পারছেন এই জাকাতই হল মাদ্রাসার মূল রাজস্ব। এছাড়া  এককালীন নানা দান আছেই। প্রতি সপ্তাহে প্রতিটি মুসলমান বাড়ি থেকে মাদ্রাসার ছাত্র ও শিক্ষকদের জন্য এক-দু মুঠো পরিমাণ চাল সংগ্রহ করা হয়, যার নাম মুষ্টি চাল। প্রতিটি ফসলের মরসুমে মুসলমানেরা তাদের উৎপাদিত ফসলের সামান্য একটা অংশ মাদ্রাসার জন্য দান করে থাকেন মাঠ থেকেই। মাদ্রাসার পরিচালন সমিতিতে সেক্রেটারি, চেয়ারম্যান, ও কোষাধক্ষের পদ থাকে; যেগুলো স্থানীয় গ্রাম গুলি থেকে মুরুব্বিরা ভোটের মাধ্যমে পদগুলিতে আসীন হন, এই কমিটিকে ‘সূরা’ বলে অবিহিত করা হয়। সভ্যদের জনাব ও বয়স্ক সম্মানীয়দের হজরত নামে সম্বোধিত করা হয়। সুতরাং বুঝতেই পারছেন, মাদ্রাসা গুলোর টাকার উৎস কি! ২০ কোটি ভারতীয় মুসলমানের অর্ধেকও যদি বছরে ১০০ টাকা করে দেয়, সেটাও অঙ্কে ১০০০ কোটি টাকা।

মুসলমান, মানে মুসল্লম ইমান। সন্ধি ভাঙলে এটাই দাঁড়ায়, যার অবিধানিক বাংলা রূপ ‘মজবুত বিশ্বাস’। কার উপরে বিশ্বাস? আল্লাহর উপরে বিশ্বাস, তথা একেশ্বরে বিশ্বাস, কোরানের উপরে বিশ্বাস, আল্লাহর নবী (দূত) রাসুলাল্লাহ (সাঃ) এর উপরে বিশ্বাস, ওনার হাদিশের উপরে বিশ্বাস। এখানেই টুইষ্ট, আমরা অনেক মুসলমান এগুলো বিশ্বাস করি ঠিকিই কিন্তু নবী সাহেব (সাঃ) যে অনুশীলন করতে বলেছে সেটা শুধু মানিনা। মানে জেনে পড়িনা বলেই জানতে পারিনা- যে দেশে জন্মেছো তার প্রতি ভালোবাসা তথা দেশপ্রেম ইমানেরই একটা অঙ্গ। ইসলামে কোথায় বলা আছে রাম বাবুর খাবে আর হরি বাবুর গাইবে? আমরা জানিনা তাই উত্তর দিতে পারিনা। ইসলামিক তত্ব অনুযায়ী যার দেশপ্রেম নেই সে প্রকৃত মুসলমানই নয়।  

রাজনীতির স্বার্থে, অবৈধ ক্ষমতা দখলের জন্য সর্বত্র আজ মিথ্যার চাষ। অক্সফোর্ড অবিধানে একটা নতুন ভাষা সংযোজিত হয়েছে কয়েক বছর আছে- Post truth age. বর্তমান যুগে সত্যেরও সত্যত্যা নিয়ে সন্দিহান হয়ে থাকতে হয়। https://en.oxforddictionaries.com/definition/post-truth ধর্মের নামে যেকোনো ব্যবসাই আজ ভীষণ ভাবে রমরমিয়ে চলে। যেহেতু আমরা নিজেরা কেউ কোরানের বাখ্যা পড়ে দেখিনি, তাই স্বার্থবাজ কোনো মৌলানা বাক্তিস্বার্থে যখন কিছু ফতোয়া দেয়, সেটাকেই আমরা ইসলাম বলে মেনে নিই। ইসলাম সেটাই সেটা ওই ১৪০০ বছর আগে মুহাম্মদ (সাঃ) যেটা বলে, লিখে ও করে গেছিলেন। আমি বা আপনি যেটা ব্যাখ্যা করব সেটা ইসলাম নয়। ইসলামের মাধুর্যতা তার অবিকৃততাতে অপরিবর্তীততাতে। নতুবা এ অনেক ধর্মগ্রন্থের মত মহাকাব্য হয়ে যেত। কোরান বা হাদিশ নতুন ভাবে লিখিত হবেনা কখনো। ইসলামে প্রশ্নহীন আনুগত্যের স্থান নেই, কারন শুরুর জামানার ইসলামে ধর্মগুরু আর রাষ্ট্রগুরু কোনো আলাদা পদ ছিলনা। ইসলামে কোনো উপজাতিভেদ নেই, সেটা যদি কোথাও দেখেন জানবেন ওটা কোনো ধান্দাবাজের আমদানি।      

এজন্যই আজকাল আমাদের জিজ্ঞেস করা হয়, আমরা ভারতীয় না মুসলমান। বুঝিনা একটা কুকুর বেড়াল শেয়াল গরু ‘ভারতীয় ও পশু’ একত্রে হতে পারলে আমরা কেন ভারতীয় মুসলমান হবনা? ভাগ্যিস পাকিস্তানের সাথে আজকাল আর ক্রিকেট ম্যাচ হয়না। এর পরেও আমার কাছে আমার স্বপ্নের নায়ক শচীন হলে স্বপ্নের অলরাউন্ডার ওয়াসিম আক্রমই থাকবে। আমাদের প্রতিটি ‘কসমোপলিটান’ সামাজিক অনুষ্ঠানের খাবার টেবিলে প্রায় জোর করে প্রসঙ্গ তোলা হয় তোরা গরুখোর। হ্যাঁ, গরুর মাংস আমরা অবশ্যই খায় অধিকাংশ খ্রিষ্টান, আদিবাসী,  উত্তরপূর্ব,-কেরালা-গোয়াজিন হিন্দুদের মত। নাহলে দেশের পশুপালন ব্যাবসাটাই প্রায় লাটে উঠে যেত। এই কথাটা আমরা বলতে পারিনা, পারিনা বলেই আখলাকেরা খুন হয়ে গেলেও আমরা চুপ থাকি। এই সুযোগে সতীশ সাবরওয়াল, সুনীল কাপুর, মদন এ্যাবোট সহ সঙ্গীত সোম নামক গোমাতার পুজারী ব্যাবসায়ীদের মাংসের জন্য প্রয়োজনীয় গরু সুলভে মিলে যায়। http://muslimmirror.com/eng/out-of-six-largest-meat-suppliers-in-india-four-are-hindus/ এসব ছেড়ে দিন, আপনারা কখনো জানেননা যে- রাজাবাজার, চিৎপুর নাখোদা মসজিদের চতুর্পাশে, টিপু সুলতাম মসজিদের উত্তর গায়ে বা পূর্বতন চ্যাপলিন সিনেমার সামনের রাস্তা ধরে কর্পোরেশন ও নিউমার্কেট বিল্ডিং এর নিচতলা জুড়ে অমুসলিম গোমাংস প্রেমীদের দাপট। মেটিয়াব্রুজ বা এদিকে পানিহাটি এলাকার কথা নাহয় নাই বা বললাম। এই মাংস্প্রেমীদের সকলেই মুসলমান? নাকি সস্তায় রেডমিটের লোভে যাদের ভিড় জমে তাদের একটাই জাত- ‘খাদ্যরসিক’।

আসলে আমরা এই ছোটখাটো অপমান, একটু আধটু মারধর, গোটা জাতিকে ধরে মা বোনকে পতিতাপল্লির স্থায়ী বাসিন্দা রূপে গালি খেতে অভ্যস্ত হয়ে গছি। গ্রামাঞ্চল ও মফঃস্বলের পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ।

চতুর্থ কিস্তি

ঘিঞ্জি, অপরিচ্ছন্ন গলি, প্লাস্টিকের কোঁচকানো বস্তার পর্দাতে ঘেরা সদর দরজার সামনে একটা ড্রেন। আর ড্রেনের সামনে একটা ক্ষয়াটে রাস্তা, যা কতযুগ আগে যেন তৈরি করা হয়েছিল। কিছু বড়বড় বোল্ডার আর তার পাশে ন্যাংটা ও অর্ধ উলঙ্গ কিছু নাকে পোঁটা চোখে পিঁচুটি ছেলেমেয়ে হাঁসমুরগি ও গৃহপালিত ছাগলের সাথে পরম নিশ্চিন্তে খেলা করছে। বাতাসে চড়া মশলার গন্ধ, শব্দে চুটুল হিন্দি গানের সুর আর তামাটে রুপালী রঙের চুলের সদ্য কিশোর ও যুবকদের পুণঃপুণঃ যাতায়াত কর্ণবিদারক শব্দব্রহ্মে বাহারি মোটর বাইক সহযোগে। মাথাঢাকা কিন্তু কানখোলা শাড়ি পরিহিত টিপ বিহীন ঈষৎ পৃথুলা মহিলাদের ইতিউতি চাহনি… মুসলমান মহল্লাতে আপনাকে স্বাগত।

মোটামুটি গোটা ভারতবর্ষ জুড়েই এটাই চিত্র। নামে গ্রাম হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইউরোপের পশুখামার গুলো এর চেয়ে পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যবিধিসম্মত। পাশাপাশি এই অবস্থা কি আর কোথাও আছে? আছে, মূলত নিন্মবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে যেমন বাগদি, হাঁড়ি, ধাঙড়, মুচি, মেথর ইত্যাদি পাড়াতে লক্ষ্য করা যায়। এখানেও ওই অশিক্ষা আর নেশা, এদের প্রগতির পথে অন্তরায়। এখান থেকে খেলা শুরু। আমাদের তাহলে রাষ্ট্র কি দিচ্ছে, আর আমাদের প্রাপ্য কি ছিল? নিন্মবর্নের হিন্দুদের জন্য ‘কোটা’ নামের রক্ষাকবজ রয়েছে, শিক্ষা চাকরি সর্বত্র। আপনি মুসলমান! উড়িব্বাস নবাব বাদশার উত্তরসুরী, অতএব জেনারেল কাষ্ট। সংবিধানে যে মৌলিক অধিকারের কথা উল্লেখ আছে আমরা মুসলমানেরা সেটা জানিইনা, কারন আমরা পড়িনা। তাই আমাদের রাজ্যের মুসলমান তথা সংখ্যালঘু দপ্তরের মন্ত্রী একজন ব্রাহ্মনকে দিব্বি মেনে নিয়েছি। এমন অধঃপাতিত জাতিকে কার ক্ষমতা টেনে উপরের দিকে তোলে।

আপনি APJ ABABDUL KALAM সাহেবের কথা বলছেন! আজ্ঞে রাষ্ট্র বা কোনো ব্যাক্তি বা সমষ্টি মিলে কালাম তৈরি করা যায়না, যেমন রবীন্দ্রনাথ তৈরি করা যায়না। আমাদের আলোচ্য বৃহত্তর সমাজ নিয়ে, যারা প্রতিদিন পিঁপড়ের মত দুদানা খাদ্যের জন্য লড়াই করছে। সংবাদে প্রকাশিত প্রতিটি চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, ছিনতাই ও প্রায় সকল রকমের দুষ্কর্ম ও অসামাজিক কাজে ৭০% এরও বেশি অভিযুক্ত ও প্রমাণিত আসামী মুসলমান সম্প্রদায়ের। কারন এদের কাছে বিকল্প রুজির বিকল্প প্রায় নেই। সঙ্গদোষ ও লোভে পড়ে সমাজবিরোধীদের সাথে মিশে যাবার পর রাষ্ট্রের হুশ জাগে।

কেন্দ্রে বিজেপি সরকার, যাদের মূল নির্বাচনী ও রাজনৈতিক ম্যানিফেস্টোই হচ্ছে অন্ধ মুসলমান বিরোধিতা, হিংসা ও জাতি দাঙ্গার মাধ্যমে ভোটের মেরুকরন ঘটানো। অতএব এই সরকার মুসলমানদের জন্য কিছু করবে সেটা সাইকেলে চড়ে চাঁদে যাবার মতই অলীক। মুক্তার আব্বাস নাকভি বা শাহনাওয়াজ হুসেনের কথা বলবেন? তাহলে শুনুন মীরজাফর কোনো অমুসলমানের নাম নয়। তাই ফালতু আলোচনা না করে মূল বিষয়ে আসা যাক।

পরিবর্তনের সরকার ৩৪ বছরের বাম দুর্গকে গুঁড়িয়ে ক্ষমতাতে এসেছিল যে নৌকাতে সাওয়ার হয়ে তার মধ্যে সাচার কমিটির রিপোর্ট প্রচার করে বিপুল ভাবে মুসলমানদের মধ্যে আসার সঞ্চার ঘটিয়ে। তাদের বঞ্চনার দিন হয়ত শেষ হবে। মৌলিক অধিকারের স্থান ফিরে পাবে, সামাজিক সম্মান ফিরবে। আজ ৮ বছর অতিক্রান্ত; আর মমতা ব্যানার্জী মাথায় হিজাব নেয়না। মুসলমানের ভোটে হারজিতের ফয়লা হয় এ বাংলাতে, ক্ষমতার দম্ভে আজ প্রকৃত রূপ বেড়িয়ে কঙ্কালসার চেহারাটা মুসলমানদের কাছে স্পষ্ট। মেকি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঢঙে আজ মুসলমানের বর্তমান পরিস্থিতি তাহলে কি?

২০১৬ সালে প্রতীচি ট্রাস্টের করা সমীক্ষা ও ১৫ই ফেব্রুয়ারি ২০১৬ সালে প্রকাশিত ‘The Hindu’সংবাদ পত্রের একটা প্রতিবেদনে বাংলার মুসলমানেদের বঞ্চনার যে ভয়াবহতার উল্লেখ আছে তা পরের কিচতিতে জানাবো।

তৃতীয় কিস্তি

————

মুসলমান দরদী, মাদ্রাসা মন্ত্রী, হিজাব ওয়ালি মমতা ব্যানার্জীর পুলিশের লাঠি কতটা মিষ্টি দোস্তো!! মাদ্রাসা শিক্ষাকে ইতিহাস করতে তৃনমূলে অবশ্যই ভোট দিন।

সাচার কমিটির রিপোর্ট দেখিয়ে এই মুসলমান ‘ভোটব্যাঙ্ক” এর উপরে ভরষা করেই মমতা ব্যানার্জী ক্ষমতাতে এসেছিল। আজ কতটা পরিবর্তন হয়েছে? গাঁয়ে গঞ্জে কটা মুসলমানদের উন্নতি হয়েছে? ভিনরাজ্যে সোনাপালিশ, রাজমিস্ত্রী, জরির কাজ, সহ নানা ধরনের দিনমজুরের কাজ করে বর্তমানে এরা কিছু পয়সার মুখ দেখছে, রাজ্যে পাঠাচ্ছে। কারন ভিন রাজ্যে বা বিদেশে রোজগার ঢের বেশি। তাই কেউ যদি একটা পাকা বাড়ি বানিয়েছে দেখবেন, জানবেন সেটাতে মমতার কোনো অবদান নেই।

তবে হ্যাঁ, এক শ্রেনীর লোক যারা তৃণমূলের বিভিন্ন পদে আছে তাদের ফকিরি অবস্থা থেকে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে, চুরি ও বাটপারির অর্থে। স্থানীয় প্রশাসনের সাথে মিলিভগত বল্গাহীন তোলা আর সরকারী প্রকল্পের ঝাঁপা টাকায় মোচ্ছোব হচ্ছে। এতে গোটা জাতি এতটুকুও এগিয়েছে?

শুধুই ফাঁপা বিজ্ঞাপন, অধিকাংশ মুসলমান অধ্যুষিত গ্রাম গুলোতে সেই মোরাম বা ইট পাতা ভাঙাচোরা রাস্তা। যেখানে অন্য সংখ্যাগুরু অধ্যুষিত গ্রামে যান, দু-চার পরত করে ঢালাই দেওয়া রাস্তা।

এই পরিবর্তনের জামানাতে কটা মুসলমান ছেলের চাকুরি হয়েছে? গুনেছেন কখনও? শতাংশের হিসাবই বা কে রাখছে।

মুসলমান নাম দেখলে অনেক ব্যাঙ্ক লোনই দিতে চায়না, ব্যাবসা করবে কোত্থেকে!! এই সার্বিক পরিস্থিতি।

দুটো সাইকেল আর একমুঠো হারামের টাকা ছুড়ে দিলেই আপনারা যখন খুশি তখন আর আপনাদের অধঃপতন ঠেকাবে কে?

নতুন কটা মাদ্রাসা হয়েছে তার কোনো পরিসংখ্যান নেই, কিন্তু RSS এর স্কুল এই সাত-আট বছরে পাল্লা দিয়ে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে।

মমতা ব্যানার্জী তেরঙ্গা পতাকার নিচে আশ্রিত RSS। এরা ববি হাকিমের মত পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করা ‘নামধারী’ মুসলমানকে ছুঁড়ে দেবে কিছু ক্ষমতা, যারা প্রায় চাকর বাকর শ্রেনীর। আর এক শ্রেনীকে এরা ব্যবহার করে, যেমন সিদ্দিকুল্লাহ। এনার অবস্থা ধোবীকা কুত্তা, না ঘরকা না ঘাটকা।

আপনার হয়ে বলার কেউ নেই এই অস্থির সময়ে। নিজেরা জোট বাঁধুন, মূর্তিমান এই শয়তান সরকারকে উৎখাত করুন আপনার উত্তরসুরীর ভবিষ্যতের স্বার্থে।

BJP ও তার পিতা RSS এর শাখা সংগঠন গুলো, সংখ্যালঘু তথা নিন্মবর্ণের হিন্দুদের ঘোষীত শত্রু। মমতা ব্যানার্জী আরো বিষধর সাপ, ও কবীর সুমনের মত নির্লজ্জগুলোকে পছন্দ করে। এ মুখোস ধারী শত্রু।

মুসলমানেদের ব্যাবহার করে ভোটের স্বার্থে। এক আধটা পঞ্চায়েত প্রধান করেই দায় শেষ, ক্ষমতা সেই দক্ষিন কোলকাতার বর্ণহিন্দুদের কাছেই কুক্ষিগত রয়েছে শুরু থেকে। যেখানে নিতান্ত নিরুপায় সেখানেই একমাত্র ইমানদার টুপি ওয়ালা মুসলমানদের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়েছে।

বিকল্প খুঁজে নিন, যারা আপনার হাঁড়িতে বা ধর্মে হাত দেবেনা।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *