ভবঘুরে অ-ছাত্রজীবন

সর্বনাশের শুরুটা অবশ্য আরো বছর দুয়েক আগেই হয়েছিল। কোলকাতায় চাকুরিরত মামার সাথে বাবা-মা সহ যখন গাঁয়ের ‘মাঠে-পুকুরে’ ছুটে বেড়ানো একটা দস্যি ছেলেটির হাতে নগদ ১০ টাকা সহ একটা ছাত্রাবাসে রেখে গেল; তখনই। অপরাধ বলতে টিউশনি শিক্ষকের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার একমাত্র কন্যার সাথে কিশোরবেলার ভীরু প্রেম। গোল বেধেছিল অন্যত্র, সেই সুন্দরী চতুর্দশীর রূপবাণে আহত আমার মত আরো যে অনেকেই ইট পেতে রেখেছিল তা আমার অজানাই ছিল। শুধু তাইই নয়, আমার ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ার দরুন ওরা সমবেত ও তীব্র প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে, আমাদের প্রণয়সংবাদটি আমার পিতৃদেবের কানে পৌঁছে দেবে, সেটার অনুমান ক্ষমতা লোপ পেয়েছিল। কিশোর প্রেমে বোধহয় এমনটাই হয়।

যথারীতি একদিন স্কুলফিরৎ গ্রীষ্মের দহনে অভিতপ্ত বিকালে, কিশোরী প্রেমিকার আনা ‘কুল ও নুনলঙ্কার মিশ্রণ’ সাথে আমার নিয়ে আসা নারাণের দোকান থেকে, পুরো একটাকার এত্তোটা চালতার আচার। মিত্রদের নোনা আমবাগানের পিছনটার নিরিবিলিতে আয়েস করে দুজনেই সান্নিধ্য সুখের খুনসুটির ওমটা সবে কিছুটা নিতে শুরু করেছি, দেখি আমার মাত্রাশ্রী ও কন্যার মাতাশ্রী, উনাদের স্বপার্সদ আমাদের দুই কচি প্রাণকে বামাল সমেত ‘খুনে আসামির’ মত আঁটক করে অকুস্থলেই ফৌজদারি আদালত বসিয়ে দিল। প্রথমে দুজনকেই সপাসপ পাঁচনের বাড়ি ও পরে বাড়ি ফিরে আমাকে গোয়াল ঘরের খুঁটিতে বেঁধে উত্যমমধ্যম। ওদিকে কি হয়েছিল তা আর জানা যায়নি আজও। কিন্ত এর পরেও দুই প্রাণে প্রেমের বন্ধনে সামান্যটুকুও মন্দা আসলনা, বরং বাড়ল; তখনই আমাকে ওই কলকাতা নামক জেলখানায় দ্বীপচালান করে দেওয়া হল।

তখন আমি সবে একাদশ শ্রেনীতে উঠেছি, শ্রেয়সী সদ্য নবম শ্রেনীর। অনভস্ত্য শাড়ীতে লটরপটর হয়ে যাওয়া একটা নিষ্পাপ নার্গিস ফুল। টানা চোদ্দমাসের নির্বাসনের পর যখন উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য গ্রামের বাড়িতে ফিরলাম, ততদিনে শ্রেয়সীকেও তার মামার বাড়ি ডুয়ার্সে পাঠিয়ে দিয়েছে ওর অবিভাবকেরা। %

দ্বিপ্রহরে বাবা, দাদু, কাকারা মধ্যাহ্নভোজন ও বিশ্রামে গেলে দোকানঘরের গদির দপ্তরবীহিন মন্ত্রী হতাম আমি। কর্মচারীরা পারিষদবর্গ। তাই সেই তৃতীয় শ্রেনী থেকে কখনো পয়সার অভাব কি- সেটা জানতামনা। তার উপরে এলাকাতে পারিবারিক দাপট থাকার দরুন প্রায় ষষ্ঠ শ্রেনী পর্যন্ত জানতামই না যে, রসগোল্লা, জিলিপি, ঘুগনি বা আলুর চপ খেলে পয়সা দিতে হয়। চাইলেই দিয়ে দিত। হ্যাঁ, পয়সা; কারন তখনও টাকার অনেক দাম। ছেলেমানুষদের কাছে টাকা থাকতনা। ৮০ এর দশক, তখনও এদিকের গ্রামাঞ্চলে যথেষ্ট অভাব, এদিকে দাদুর বড় আড়ৎদারি ব্যাবসা, সাথে রাসায়নিক সার ও সরকারী রেশন ডিলার। ওই ময়রা মোদকেরা হয় পয়সা নিতেননা – দাদুর থেকে রেশন হতে সস্তায় ময়দা চিনি নেবে বলে, অথবা দাদুর থেকে পরে পয়সা সংগ্রহ করে নিত সোম ও বৃহঃস্পতির হাটবারে। যেটা আমার অজানাই ছিল।

বাড়ির সামনে দিয়ে তিনহাত মত চওড়া একটা পিচঢলা রাস্তা, যার পিচ সম্ভবত আমার জন্মের পূর্বে প্রথম ও শেষ বারের মত প্রলেপ পরেছিল। তারপর অন্তত ১৫ বছর রোদ্র বৃষ্টির ঝাপ্টাতে স্মৃতিটুকুই রয়ে গেছে পিচ বাবাজির। সেই রাস্তার দুধারে অগুন্তি বড় বড় ফলের গাছ। এলাকাতে তখনও পূর্ববঙ্গ থেকে আসা মানুষের ঢল নামেনি। বাঁদর ও আমদের মত লেজ বিহীন হনুর দল সারা বছরভর সেই ফলপাকুর খেয়ে আর্ধেক করতে পারতামনা।

মফঃস্বলের শহরে সবে বিদ্যুৎ সংযোগ এসেছে, কারন মামার বাড়িতে গরমে ফ্যান চলত। আমাদের বাড়িতে এন্টেনা বুস্টারের দ্বারা চালিত- টিভি নামক যন্ত্রটা ব্যাটারির সাহায্যে প্রতি সন্ধ্যায় গোটা পাড়াকে অনাহূতর মত আমন্ত্রণ করে আমাকে গৃহহীন করে দিত। সেই থেকেই সম্ভবত পিসির কাছে রাত্রে শোয়ার অভ্যাস, আর তার সাথে পিসির বই পড়ার নেশাটা অজান্তেই আমার মাঝে সংক্রমিত হওয়া।

ছোট থেকে জীবন বাউন্ডুলে লক্ষ্যহীন ছিল, খেলতে খেলতে আর মার খেতে খেতেই কখন যে মাধ্যমিক পাশ করে গেছিলাম সেটা খেয়াল করাই হয়ে উঠেনি। যৌথ সংসার থেকে সদ্য পৃথক হওয়া মায়ের সংসারে- সম্পদের প্রাচুর্য বা দেখনদারি না থাকলেও স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত পরিবার আমাদের। বাবা ব্যবসায়ী মানুষ, সংসার ও আমাদের পড়াশোনার বিষয়ে তিনি বরাবরই উদাসীন ছিলেন। অষ্টমশ্রেনী উত্তীর্ণ মা’এর পরামর্শদাতা ছিল, বাবার খুড়তুতো এক ভাই। সে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরাজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর পঠরতা। আমার ইচ্ছে বা মর্জির তোয়াক্কা না করেই আমাকে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি করে দেওয়া হয়েছিল উচ্চমাধ্যমিকে। অবশ্য শুধালে যে আমি অন্যান্য কলা বা বানিজ্য বিভাগ চাইতাম তেমন আতিসায্য ছিলনা। আমার কাছে বিকালের খেলাটাই ছিল একমাত্র নিয়মিত রুটিন, বাকিটা বিশ্বনাগরিকের ন্যায়। এপাড়া বেপাড়াতে ক্রিকেট খেলতে যাওয়ার সাথে চুরান্ত বাউন্ডুলেপনা।

ভন্যি ঠা ঠা দুপুরে ছাড়িগঙ্গা টপকে জাম পারতে তিন চার ক্রোশ অনায়াসে পাড়ি জমাতে পারতাম। গাছে চড়ে তাল শাঁস, ডাব খাওয়ার মাঝে অনবিল এক আনন্দ পেতাম; তীব্র কালবৈশাখীর ঝড়ে অভিলাষের বাগানে আম কুড়াতে যাওয়া। বাগানের প্রাচীন গাছ গুলো থেকে টিয়াপাখির বাচ্চা, শুঁয়োপোকা সংগ্রহ করার বাতিক ছিল- প্রজাপতি ফোটানোর নেশায়- আর বৈকাল হলেই পৃথীবির সব কাজকে তুচ্ছ করে রেখে খেলার মাঠে পাড়ি জমিয়ে ক্রিকেটে বুঁদ হয়ে যাওয়া। সাদা ইঁদুর, বেজি, শালিক, ভেড়ার বাচ্চা, খরগোশ, ছোট মর্কট যাকে পেতাম পুষব বলে বাড়িতে এলে হাজির করতাম। একবার তো একজোড়া হলুদ কালো দাঁড়াস সাপ এনে হাজির করেছিলাম, পুষব বলে। ওই জীবনে রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলের প্রবেশ হলেও তার প্রভাব খুব একটা ছিলনা এ কথা স্বীকারে কোনো লজ্জা নেই।

দাদুর বাবা বা তদুর্ধ্ব পূর্বপুরুষের কেউ গোমস্থা বা জমিদার টাইপের কিছু একটা ছিলেন, সেই সুত্রে উনি গাঁ বসিয়েছিলেন। ধোপা, জেলে, নাপিত, মুনিষ, চাষা সবই এনেছিলেন ভিন জিলা থেকে। তাদেরই মধ্যে ফটিক বাগে পেশায় জেলে ছিলেন, ওনার সাথে আমার সখ্যতা ছিল ঘনিষ্ট পর্যায়ের। বিলে মাছ ধরতে চলে যাওয়া, কখনো পুল্টুন হাঁসদার সাথে পুকুর থেকে গুগলি তোলা, মাঠে নিড়ানি মুনিষের তদারকি করা, কখনো বাঁধি কির্ষেন সুরাতআলীর সাথে মোষের পিঠে চড়ে গরু-মোষকে কচি তিলগাছ খাওয়ানো। সবই চলত বিনা ক্লেশে।

উঠানের এককোনে কেঁচোর আখাড়া বানানো ছিল, এগুলো ছিপে গেঁথে মাছ ধরা হত। কখনো বহল ফলের আঠা দিয়ে ঘুড়ি বানিয়ে সারাদিন উড়াতে থাকা আবার কখনো ফলসা, জামরুল কুড়িয়ে আনা, কখনো পুকুরপাড়ের সুস্বাদু আঁশফল খেয়ে ফিরে মায়ের হাতে উত্তমমধ্যম। নেপাল মাহাতো, ষষ্টি কয়াল, বাসু ধাঙড়েরা যৌবনে লেঠেল ছিল, বিগত যৌবনে এসে দাদুর কাছে থাকত; ছাতা ধরা, পা টেপা, স্নানের জল তুলে দেওয়া , দোকান ঘর ঝাট দেওয়া ইত্যাদির মত ফাইফরমাইস খাটার কাজ করত। এতে করে তাদের সামান্য মজুরী ও সারা বছরের অন্নবস্ত্রের সংস্থান হয়ে যেত। শীতের দুপুরে কখনো এদের সাথে লাঠিখেলার পাঠও নেওয়া হত। দিনের বেলা আইসক্রিম, পাঁপর, বুড়িরচুল ওয়ালার সাইকেলের সামনে বাঁধা মাইকে বাজত হিন্দি বাংলা গান। দূরে মাইকে সারাবছর কীর্তনের সুর ভেসে আসত, কোথাও না কোথাও আসর বসতই ফি সন্ধ্যাতে। দু ধরনের গানগুলোই অজান্তে মগজের হার্ডডিস্কে স্টোর হয়ে যেত।

এহেন ছেলেকে দুম করে কোলকাতার হোস্টেলে রেখে আসাতে প্রথমে মনে হয়েছিল কত দিন এভাবে বেঁচে থাকব!  আতো মানুষের ভিড় কেন হয় শহরে, কিছুই তো নেই কোলকাতাতে, শুধু বড় বড় বাড়িঘর আর গাদা গাদা যানবাহন। তখন অবশ্যি রাস্তায় বেড়োনোর হুকুম ছিলনা। এর আগে কোলকাতা আসা মানে শীতের সময় বাবার বন্ধুর পরিবার বা তুতো ভাইবোনেদের সাথে হল্লা করতে করতে চিড়িয়াখানা, পাতালরেল, আর জাদুঘরে এসে বিস্মিত হওয়া। হাওড়া স্টেশনে এসে হাওড়া ব্রিজের চেয়েও বেশি অবাক হয়ে চেয়ে দেখা কিভাবে গর্তের মধ্যদিয়ে এত শত শত লোক উঠে আসছে স্টেশনে বা স্টেশন থেকে সুড়ঙ্গে গায়েব হয়ে যাচ্ছে!

উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে স্থানীয় মফঃস্বলের কলেজে প্রাণীবিদ্যা বিভাগে ভর্তি করে দিয়েছিল মায়ের পরামর্শদাদা সেই স্নাতকোত্তর ‘আংরেজ’ কাকাবাবুটি। ইচ্ছা ছিল বাংলা নিয়ে পড়ব, কিন্তু সে কথা শুনছেটা কে! ততদিনে কোলকাতা অভ্যস্ত হতে হতে ইট কাঠ যানজটের শহরের প্রেমে পরে গেছি। সদ্য যুবক পুত্রকে কোন পিতা কাছছাড়া করতে চায়, যখন তাঁর চালু ব্যবসাতে আরো একজন ‘নিজের’ লোকের প্রয়োজন। এদিকে কোলকাতা আমায় ‘আয়, আয়, আয়’ করে হাতছানি দিচ্ছে। অগত্যা মায়ের মনের সুপ্ত ইচ্ছাকে সুড়সুড়ি দিতে লাগলাম, “আমি জয়েন্ট দেব মা”। এদেশীয় সব মায়ের মত আমার মা’ও ছেলেকে ডাক্তার বানাবার ইচ্ছা মনে মনে পুষত। সুতরাং প্রস্তাব মাত্রই মা একপায়ে রাজি, এরই সাথে আমার কোলকাতা ফেরার পথ উন্মুক্ত হয়ে গেল। মফঃস্বলের কলেজের পাঠ চুকিয়ে, বাবার চুরান্ত অমতে, মায়ের ইচ্ছা আর সাপ্তাহিক পাথেয়র উপরে ভিত্তি করে পাড়ি জমালাম কোলকাতা।

শেষ কৈশোরের ছাত্রাবাসের কলকাতা আমার সাথে জেলখানার মত আচরণ করেছিল, সদ্য যৌবনে কোলকাতাতে এসে সেই রোষের শোধ নেওয়ার পালা ছিল। শেয়ালদা নীলরতন সরকার হাসপাতালের উল্টোদিকে ‘আর আহমেদ’ ডেন্টালের কলেজের পাশে লরেটো ডে স্কুল আর প্রাচী সিনেমার মাঝ বরাবর যে রাস্তাটা সোজা নেবুতলা পার্কে চলে গেছে সেটার নাম ডিক্সন লেন। ডিক্সন লেন যেখানে শেষ হয়ে হুজুরি মুল্লা লেন ও কবি নবীন সেন লেনে ভাগ হয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই সংযোগস্থলে একটা মাঝারি আড়াইতলা বাড়ি। ওটাতেই ‘একাকী’ আমি’র প্রথম কলকাতা আস্তানা।

বাড়িটির মালিক ডিভিসির প্রাক্তন প্রকৌশলী তাপস ব্যানার্জী স্যারের, বয়স আন্দাজ চল্লিশ। টকটকে ফর্সা গায়ের রঙ, বাহুতে ঘন লোম, সবুজাভ দাড়ির আভাষ, মাঝখান দিয়ে সিঁথি করা মাথাভর্তি স্যাম্পুকরা চুল, ছ’ফুটের উপরে লম্বা, যেন গ্রীক কাহিনী থেকে উঠে আসা অপূর্ব সুপুরুষ। চোখে চোখ রেখে কথাবলা, ভম্ভীর ব্যারিটোনের আওয়াজ ও অনন্য সাধারণ ডায়লোগ থ্রোয়িং। তার উপরে ওই বয়সে সরকারী চাকরি ছেড়ে ব্যাবসা করবেন বলে চাকরির প্রতিযোগিতা মূলক পরীক্ষার জন্য একটা ‘এডুকেশন সেন্টার’ তথা কোচিং সেন্টার খুলতে পারা, বুকের পাটা ছিল ভদ্রলোকের। পরবর্তীতে ওনার অনেক ডায়লোগ বাংলা সিনেমাতে ব্যবহৃত হয়েছে ওনাকে বিন্দুমাত্র ক্রেডিট না দিয়েই।

আমিই সম্ভবত ওই প্রতিষ্ঠানের তৃতীয় ছাত্র। সিঁড়ির নিচে দু হাত বাই দুহাত খুপড়িতে একটা টেবিল পেতে অফিসের সুত্রপাত। অফিসের ডানহাতে অন্তত ১০০ বছর পুরাতন একটা কড়িবরগার মোটা দেওয়াল বিশিষ্ট স্যাঁতস্যাঁতে চুনসুড়কির মেঝে বিশিষ্ট ঘর। ঘরটির দরজার সামনে একচিলতে খোলা আঙিনা যেখান থেকে শুধুমাত্র বেলা বারোটার সময়ই খানিকক্ষণ সুর্যদেব গৃহে অধিষ্ঠান করতে পারে। পূর্বদিকে আদ্যিকালের একটা লম্বা ছাদের স্নানঘর ও পায়খানা একত্রে। পশ্চিমদিকে দোতলাতে ওঠার সিঁড়ি। প্রথম তিনমাস একমাত্র ওখানে ওই ঘরেই ক্লাস হত। স্যার ও স্যারের সহধর্মিনী সুব্রতা ম্যাডাম ক্লাস নিতেন। আমার সাথে দিনে দিনে নদীয়ার গেদে থেকে কৃষ্ণেন্দু, দক্ষিণ ২৪ পরগণার নুঙ্গি থেকে তন্ময়, পাথরপ্রতিমা থেকে শ্যামল, হুগলীর গোঘাট থেকে হাফিজুল, উত্তর ২৪ পরগণার জগদ্দল থেকে সুদীপ্ত এসে জুটল। কৃষ্ণেন্দু নদীয়ার কোনো এক কলেজে পড়ত, থাকত সপ্তাহে ৩ রাত্রি। সুদীপ্ত আর তন্ময় ক্লাসের দিন আসা-যাওয়া করত। রাত্রে আমার সঙ্গী বলতে বাড়িওয়ালা স্যারের আপন ভাই প্রায় চল্লিশ ছুঁইছুঁই ভবঘুরে তন্ময় ব্যানার্জী, গোঘাটের হাফিজুল আর পাথরের শ্যামল। প্রথম দিকের ছাত্র হওয়ার দরুন স্যার আমাদের কারোর থেকেই আবাসিকের পয়সা নিতেননা।

খুব সকালে উঠে পরে প্রাতঃকর্ম সেরে আমরা সন্তোষ মিত্র স্কোয়্যারের বেঞ্চে কাটাতাম গোটা সকালটা। সকাল সাতটা থেকে শহরের কোনো অভিজাত পরিবারের কেউ প্রাইভেট গাড়িতে চড়ে সপ্তাহে পাঁচদিন স্যারের কাছে একা বা দুইজন বা তিনজন টিউশনি নিত। আমাদের তিনজনের প্রত্যেকের একটি করে বোঁচকা, সেটা ওই সিড়ির পাশে থাক করে রেখে দিতাম আমরা। পরে জেনেছিলাম ওরা নাকি চিত্রাভিনেত্রী মুনমুন সেনের ছোট মেয়ে ও তার বান্ধবি বন্ধুর ব্যাচ। আমাদের সে সময় ঘরে প্রবেশে নিষেধ ছিল। এভাবেই রোজ একজন দুই জন করে মাত্র তিন মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি তার প্রাথমিক ‘টার্গেট’ পূর্ণ করে ফেলল। ছোট্ট ঘরটিতে আর স্থান ধরেনা, তাই তালতলায় S.N. Banerjee Rode এর ‘ রাণী রাসমনি হাই ইস্কুলে’ শনি, রবি ও অন্যান্য ছুটির দিনে ক্লাস হতে লাগল। ফ্যাকাল্টি বাড়তে বাড়তে ছ’মাসে সেটা ২০ পেরিয়ে গেল। আমাদের রাত্রিবাসের ঘরটা দিনের বেলা ফ্যাকাল্টিদের কমনরুম হতে শুরু হওয়াতে প্রতি রাত্রে জুতোর ধুলোকাদা ধোয়ার অতিরিক্ত কাজ জুটলো।

স্যারের ভাই নামেই ভাই, আসলে তিনক্ষরের ভাই। তার অবস্থা পথের ভিখারিদের চেয়েও অধম। শুকনো সজনে ডাটার মত ষিরিঙ্গে চেহারাতে একমুখ অপরিষ্কার দাঁড়ি গোঁফের জঙ্গল। ইয়াব্বড় লালচে চোখ, শিরা উপশিরা দেখা যাওয়া ভুতুরে মার্কা হাতপা। পাঁজরার হাড় গুলো গোনা যাওয়া এক কিম্ভূত দর্শনের জীব, কিন্তু পেটে পেটে বুদ্ধির ছাতিমগাছ। কিছু একটা বিষয়ে অনার্স পাশ করেও কেন যে এমন হাল তার খবর একমাত্র সে ই দিতে পারত। কোনো রকমে দাদার হোটেলে দুটো খায় ডাল আর গালি মিশিয়ে, কখনো সখনও সেন্টারের বিজ্ঞাপন মারতে যায় রেল ষ্টেশন বরাবর, তাতে কিছু নগদ আমদানি হয়। পকেটে সিকিটি থাকলে আবার কর্মে অনিয়মিত। মোটকথা তাপস বাবুর ড্রাইভারের চেয়েও খারাপ হালত ছিল ওনার।

সে বছর প্রথম ক’মাস মফঃস্বলের কলেজেই কেটে গেছিল, আরো কমপক্ষে পাঁচমাস পর কোলকাতার কলেজে ফর্ম দেবে। হাতে অগাধ সময়, স্যারের ভাইয়ের সাথ ও হাত ধরে শুরু হল কলকাতাকে চেনার সে এক আশ্চর্য অভিযান। আমার শারীরিক বৈশিষ্ট যা ছিল সেটা অনেকটা ভুতে চোষা লাশের মত। গোঁফদাড়ি হাতে পায়ে লোম গজায়নি, মাথার তুলনাতে চুল বেশি, শোলমাছের মত পাকা রঙ। বহুবছর বামন থাকার পর হঠাতৎ করে শরীরে গ্রোথ হরমোন ক্রীয়াশীল হয়েছে। এমতাবস্থায় আত্মবিশ্বাস চুরান্ত ছিল যে, যেকোনো মেয়ের প্রথম অপছন্দের তালিকাতে টপলিষ্টে থাকার মত যোগ্যতা আমার জন্মগত প্রতিভা। আমার নিজেরও প্রেমে আসক্তি ছিলনা সেসময়, কারন পূর্বেই বর্ণীত হয়েছে। প্রায় প্রতিদিন মাদারডেয়ারির সামনে থেকে ট্রামে চড়ে দেড়টাকার টিকিটে কলকাতা ভ্রমণ। স্যার তার ভাইকে আসা যাওয়ার জন্য যে রাহা দিত তা প্রয়োজনের তুলনাতে অনেক বেশি। আমাদের দুজনের পথখরচা মিটে যেত হেসেখেলে।

আমার কলকাতা দর্শন হত, আর সে শহর জুড়ে আঠা দিয়ে পোষ্টার মারত। টিকিট কালেক্টরেরা কয়েকদিনেই মোটামুটি পরিচিত হয়ে গেল আমাদের সাথে। সুতরাং ট্রাম থেকে না নামলে আর টিকিট কাটতে হতনা, ট্রাম যদ্দুর যাবে তদ্দুর আমরাও ট্রামের সঙ্গী; জ্যামে ২-৪ মিনিট ট্রাম যেখানেই দাড়াতো, সে নেমেই ২-১০টা পোষ্টার সাঁটিয়ে দিত। পিছিয়ে পরলে হেঁটে ঠিক কোনো আরেকটা জ্যামে আমাদের পেয়ে যেত। বৈকাল বা সন্ধ্যায় ট্রাম আবার নির্ধারিত গুমটিতেই ফিরত। হাফিজুল প্রথমদিকে আমাদের দুজনের সাথে না গেলেও পরের দিকে আমাদের সাথী হয়ে গেল। কোলকাতার রাস্তায় ট্রাম যতদূর যায় সব রাস্তাই আমাদের প্রায় মুখস্থ হয়ে গেল অনতিবলম্বে। বাকি কোলকাতা সম্বন্ধে তেমন কোনো ধারণা ছিলনা। ভিক্টোরিয়া, নলবন, বইমেলা, কিছুই জানতামনা। শুধু ময়দানটা জানতাম, কখনো কখনো বিকালে জুলুজুলু চোখে নেটের ঘেরাতে সাদা পোশাকের দাদাদের বল পেটাতে দেখতাম। ঘরে ফেরার সময় স্ট্রিটলাইটের আলোর উজ্জ্বলতাতে মলিন ক্লান্ত সূর্য তখন ইডেনের মাঠের গহ্বরে তলিয়ে যেত।

কিছু কিছু মুখ এমন থাকে, যাদের দেখলে অকারণেই মন থেকে ঠাটিয়ে একটা থাপ্পর লাগাতে ইচ্ছা যায়। ঠিক তেমনই একজন হাকুঁচ কালো, দাঁড়কাকের কার্বন কপি ছোটকাকার বয়সি একটা ‘লোক’ WBCS এর কোচিং ক্লাসে ভর্তির জন্য এলো তার বিধবা মায়ের সাথে। স্যারকে অনেক কাকুতি মনিতি করে সম্ভবত এক চতুরাংশ কোর্স ফি’র বিনিময়ে সেন্টারে ভর্তি হল মাননীয় সলিল কুমার নস্কর মহাশয়, তাও চারটে কিস্তিতে। বাড়ি কাকদ্বীপ লাইনের কোন এক গ্রামে ছিল, আধুনা হাওড়ার। তিনিও আমাদের ওই বিনি পয়সার রাত্রিযাপনের কুঠুরিতে সহচর হলেন।

ভদ্রমহোদয়কে আমরা পরবর্তীতে অনেক সুনাম অর্জন করতে দেখেছি, বর্তমান নিজ পেশাতে তিনি ভীষণ মর্যাদাপন্ন। সুতরাং গুণের কোনো ঘাটতি ছিলনা। আমাদের সাথে মিশে যেতে ঘড়িধরে ১৫ মিনিটের বেশি লাগেনি তার। ওর পাল্লায় পরে জটা খৈনির নেশার হাতে খড়ি হয়েছিল আমাদের বাকি সকলের। সে অন্যের গলা নকল করতে পারত দারুণ রকমের। আমি নচিকেতার ভক্ত, কিন্তু সে পুরাতন আমলের গানের। পরবর্তীতে বেশ কয়েকমাস আমার গঞ্জিকা সেবনের গুরুদেবও ছিলেন- এক ও অদ্বিতীয় সেই নস্করবাবু। স্যারের ভাই রত্নটিও ‘বাবা’ আশক্ত ছিলেন কিন্তু আমাদের সাথে কখনো ‘বাঁশি’ শেয়ার করেননি। ওনার সাথের রতনকাটারি আর প্রেমতক্তিটি দেখে পরবর্তীতে গঞ্জিকা সেবনের বিষয়ে প্রমান আবিষ্কার করেছিলাম, লাল চোখের রহস্যও ওটাই ছিল। এরই মাঝে পাথরের শ্যামলা দেশে ফিরে গেল, আর পড়াশোনা করবেনা সে।

সলিলকে ওর পদবীর বিকৃতি ঘটিয়ে তস্কর বলে সম্বোধন করত স্যার। যার জন্য সলিল রাগ করে নস্কর পদবীর প্রতি চুরান্ত অনাশক্ত হয়ে উঠেছিল। ইতিমধ্যে তার হাতে বিঘৎ খানেক লম্বা একটা ট্রানজিস্টার আবিষ্কার করলাম এক রাত্রে। নিচের ঘর থেকে রেডিওর আওয়াজ উপরে পৌঁছাতেই, তস্করকে বহিষ্কারের অন্তিম হুশিয়ারি দিয়ে রাখলেন স্যার। এদিকে রেডিওতে গান শোনা কি আর ছাড়া যায়! অগত্যা প্রাচী সিনেমার ঠিক সামনের ফুট ওভারব্রিজটিতে জমে উঠল আমাদের সান্ধ্যকালীন আস্তানা। আহা, কত দিন ওভার ব্রিজের ফুরফুরে হাওয়াতে গান শুনতে শুনতে ভোর হয়ে গেছে তার লেখাজোখা নেই। প্রথম কটা দিন সলিলকে আপনি আজ্ঞে করলেঅ ওর স্পেশাল গুণে কয়েকদিনের মধ্যেই তুই তোকারি শুরু করে দিয়েছিলাম।

হাফিজুল মোল্লা, রোগা প্যাঁকাটি, মাথায় সরষের তেল দিয়ে লেপা চুল ও ফর্সা মাকুন্দ  মুখ। কথাবার্তা খুব একটা বেশি বলতনা, তাই তার পরিবার বা অতীত সম্বন্ধে খুব একটা বেশি জানতেও পারিনি। ভীষণ অগোছালো একটা ছেলে, অর্ধেক দিন ঠকঠাক স্নানখাওয়াও করতনা। তুখোর অঙ্ক কষতে পারত আর হাইসেনবার্গকে গুরু মানত। যদিও আমি জানতামনা ওই হাইসেন বাবু সুচিত্রা সেনের ঠিক কে হন। গানবাজনাতে তার খুব আগ্রহ ছিল, বিশেষত পল্লীগীতি, বাউল এই জাতীয়। এন্ড্রু কিশোর, রুনা লায়নাতে ওর সৌজন্যে কানেখড়ি হয়েছিল। সুযোগ পেলে গানটা যেখানে সেখানে গাইতে পারত সে। আমিও ছোটবেলাতে অনেক বছর তবলা শিখেছি, জুড়িদার হয়ে যেতে মোটেই বাধতনা। তার একটা মাউথঅর্গান ছিল, যদিও বাজাতে জানতনা। শখের বসে কিনেছিল, সলিল ওটা নিয়েই এলোপাথাড়ি পোঁ প্যাঁ করে বাজাতো।

স্যার সন্ধার পর চৌরঙ্গী এলাকার বারগুলিতে নিয়মিত যেতেন সুরাপান করতে। ফিরতেন মাঝ রাত্রের পর অপ্রকৃস্থ অবস্থাতে নিজের গাড়িতে। এদিকে ওই বাড়িরই নিষ্কর্মা ছোট কর্তা আমাদের সজ্জাসঙ্গী হওয়ার দরুন রাত্রে ঘরে ফেরার তাড়া কখনই ছিলনা। ফুট ওভার ব্রিজে আমরা জনা চারেক অকালকুষ্মাণ্ড ছাড়াও আন্ডাবাচ্চা সহ একটি ৬-৭ জনের গৃহহীন উদ্বাস্তু খোট্টা পরিবার থাকত, সাথে গোটাতিনেক ভিক্ষুক ও একটা পাগলের নিয়মিত আবাস। বৃষ্টির সময় এরা ছাউনি দেওয়া বাসস্ট্যান্ডের নিচে, দাঁড়িয়ে বসে রাত কাটাতো বা আশেপাশের কোনো ছাউনির নিচে। ব্রিজের নিচে চান্স পেতনা, সেখানে অন্য আবাসিক। মাঝে মাঝে কিছু মাতাল তার সফরকালে আমাদের সাথে দু চার ঘন্টা কাটিয়ে যেত বটে কিন্তু তারা নিয়মিত ছিলনা। আমাদের দৈনন্দিন আড্ডাটা রোজই প্রায় জমে উঠত ওইখানে, রেডিওর সাথে হরেক রকমের তাসের খেলা।

ভিখারিগুলোর সাথে বেশ একটা সখ্যতা গড়ে উঠেছিল। এক পর্যায়ে এক ভিখারি কাকুর শরীর খারাপ হলে তাকে আমরাই ওনাকে বার কয়েক হাসপাতালে ভর্তি করি। শুধু তাইই নয়, একবার সমাজসেবার পোকা মাথায় কিলবিলিয়ে উঠলে পরে, তার হয়ে আমরা পাক্কা দু-দিন  বিকাল থেকে রাত্রি পর্যন্ত ক্রমান্বয়ে পালা করে ওই ভিক্ষুক বন্ধুর স্থানে তার বাটি নিয়ে বসে যেতাম। যদিও খুব একটা সুবিধা হয়নি, লোকে আশ্চর্যের সাথে আমাদের প্রতি অর্থদানের চেয়ে দৃষ্টিদানই বেশি করত। হাফিজুলের বাড়ি না ফেরার কারন সে কখনও বলেনি, সলিলেরও গ্রামে কেউ ছিলনা ফেরার জন্য,  মা হাওড়ার থেকে কিছু একটা কাজ করতেন। আমি গ্রামে ফিরলে বাবা দোকানে বসিয়ে দেবে সেই ভয়ে আমরা কেউই বাড়ি ফিরতামনা। আমার মা নিজে আসতেন মাসে এক আধাবার, তখনই কোচিং এর মাসিক খরচা সহ আমার রাহা মেটাতেন, বাকি সময় মামা রাহা খরচের সামান্য টাকাটা আমাকে পৌঁছে দিতেন।

আমাদের পড়াশোনার যা গতি ছিল, আমাদের উপর থেকে স্যারের প্রসন্ন দৃষ্টি সরতে বেশি সময় নিলনা। অবশিষ্ট প্রতিব্যাচ ছাত্রদের সামনে আমাদের চারজনের গ্রুপটাকে সার্কাসের জন্তুদের মত উপস্থিত করিয়ে দেখাতেন- আদর্শ বখে যাওয়া ছাত্র ঠিক কাদের বলে। প্রথম প্রথম আত্মসম্মানে লাগলেও স্বল্পভাষী হাফিজুল বুঝিয়েছিল যে- ফ্রিতে কোলকাতার মত শহরে থাকতে গেলে এইটুকু আত্মত্যাগ করতেই হবে। সত্যি বলছি, বেচারা স্যারের প্রতি দয়া জন্মে গেছিল। স্যারও চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলেন- আমাদের ওই গ্রুপের কেউ যদি কোনো কোনোও পরীক্ষাতে উত্তীর্ণ হতে পারে তাহলে তিনি কোচিং ব্যাবসাই ছেড়ে দেবেন। আমরাও স্যারের নুন খেয়েছিলাম, ওনার ঘরে থেকে ওনারই ব্যাবসা কখনই লাটে তুলে দিতে পারিনা।

স্যারের বিশ্বাসকে আমরা যথাযত মর্যাদা দিয়েছিলাম চারজন; কৃষ্ণেন্দু, সুদীপ্ত, আমি ও সলিল। স্যারকে চুরান্ত অপদস্থ করে হাফিজুল যখন ইঞ্জিয়ারিং এ সারা বাংলার মেধা তালিকায় ১১তম র‍্যাঙ্ক করল, স্যারের বৃদ্ধা মাকে প্রথম বারের জন্য আমরা দর্শন করলাম। দোতলা থেকে নেমে এসে তিনি হাফিজুলকে আশির্বাদ করেছিলেন। হাফিজুলের এহেন বিশ্বাসঘাতকতাতে আমরা বাকি তিনজন ভীষণ গুম মেরে গেছিলাম। বন্ধুত্বের পবিত্র বন্ধনের উপরেই আমরা ভরষা হারিয়ে ফেলেছিলাম প্রায়। ওদিকে স্যার হেরে গিয়ে যে এমন সুখী হবেন, জানলে আমরাও চেষ্টা চরিত্র করতাম। দ্বিগুন উৎসাহে তিনি ব্যাবসা শুরু করলেন, বিজ্ঞাপনে ইয়াব্বড় হাফিজুলের ছবি সহ। হাফিজুল ও স্যার কতৃক জোড়া ধোঁকায় আমরা বেশ খানিকটা বেসামাল হয়ে পরেছিলাম।  

সলিলের ছিল সিনেমার প্রতি ঝোঁক। তবে বাংলা সিনেমা নয়, বিদেশী সিনেমা। টিকিট যোগাড় করতে পারলে তবেই হিন্দি সিনেমা। কিছু দিনের মধ্যে কলকাতাকে চেনার রেস কেটে গিয়ে সিনেমা দেখার রোগ পেয়ে বসল। নিউমার্কেট এলাকার নিউ এম্পায়ার, লাইটহাউসের টঙে বসে নামমাত্র মুল্যের স্টুডেন্ট টিকিটে সপ্তাহে প্রায় চারটে করে শো দেখতাম। এই লিষ্টে আধুনা বিলুপ্ত চ্যাপলিনও ছিল। গ্লোব, মেট্রো বা এলিটে ঢোকার মত ট্যাঁকের জোর ছিলনা। ওখানে হিন্দি ও নতুন সিনেমা চলত। নিউ এম্পায়ার, লাইট হাউজ বা চ্যাপলিনে টিকিট ছিল কমদামের, বিদেশী সিনেমার। দেড় দু ঘন্টা আয়েসে চুম্মাচাটি মার্কা সিনেমা দেখে কাটাবো, তাতে ভাষাটা ফ্রেঞ্চ,  চিনা না ইংরাজি ওসব মাথা ঘামিয়ে কি লাভ! যদিও সে সময় কোনো ভাষাই সম্পূর্ণ বোঝার বোঝার মত জ্ঞানগম্মি তেমন ছিলনা। মাঝে মাঝে রিগ্যাল সিনেমাতেও ঢুকতাম, মূলত শীতকালে। যাতে মুখটা ঢাকা থাকে। ওই জনসমুদ্রে কে ই বা আমাদের চিনত, তবুও কেমন একটা চক্ষু লজ্জা লাগত নীল ছবির প্রদর্শনীতে সামিল হতে। ফেরার পথে হগ স্ট্রিটের প্যারিস বারের নিচে থেকে বরফ পান কিনে আমিনিয়ার দিকে জুলজুল চোখে একটু নেত্রপাত করে হাঁটা পথে ফের আমাদের বাসাবাড়িতে ফেরা ছিল নিত্যদিনের রুটিন। সেই পান মিনিট পাঁচেকের মধ্যে মোলায়েম হয়ে মুখের মধ্যে মিলিয়ে যেত।

সুখ কখনই চিরস্থায়ী হয়না। হাফিজুল শিবপুরের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হয়ে গেল, কৃষ্ণেন্দু মফঃস্বলের কলেজে ফিরে গেল, সুদীপ্ত অস্ট্রেলিয়াতে চলে গেল মাসির বাড়ি, সলিলও টালিগঞ্জ সিনেমা পড়াতে কাজের খোঁজে বেশি ব্যাস্ত হয়ে পরল। একথা স্যার জানতে পারাতে সলিলকে যথারীতি বিদেয় করিয়ে দিতে আমি বড় একা হয়ে পরলাম।

এর মাঝে বাবা বার চারেক জবর এত্তেলা দিয়েও আমি না ফেরাতে চরম পন্থা অবলম্বন করলেন। টাকাপয়সা ও মা, দুয়েরই কলকাতা আসা বন্ধ করে দিলেন। দ্বিতীয় সিজেনে টিউশনি ফি দেবার প্রয়োজন ছিলনা, কারন বিগত বছরের অনুত্তীর্ণ ছাত্রদের কোনো ফি নেওয়া হবেনা এটা ছিল প্রতিষ্ঠানটির ঘোষিত নীতি। কিন্তু পেট চলবে কিভাবে?

শুরুতে যখন পয়সার যোগান ছিল তখন নেবুতলা পার্কের ঠিক পিছনে নটবর দত্ত রোডের ভগবতী নিরামিষ ভোজনালয়ে দুবেলা অন্নজলের ব্যাবস্থা হত। স্যারের ভাই তন্ময়ের কল্যাণেই ওই হোটেলের হদিশ পেয়েছিলাম। বাড়ি থেকে রাহা বাবদ যা আসত তাতে আমিষ খাবার জোটার জন্য যথেষ্ট হলেও অল্পবয়সে ধূমপানের নেশার দরুন পয়সা বাঁচাতেই হত। পাইস হোটেল হওয়ার দরুন প্রতিবারই পেট ভর্তি করে ভাত খেতে পেতাম। ৮ টাকায় ভাত, ডাল, সব্জি আর আচার। এর পর যতক্ষণ যতবার ভাত চাইবেন ওরা দেবে সাথে শুধু ডাল। সারা বছর ছ্যাঁচড়া জাতের সব্জিটা পাল্টালেও বাকিগুলোর স্বাদ অকৃত্রিম থাকত। এছাড়া মাড়োয়ারি হোটেল হওয়াতে ঘরদোর, ও টেবিল চেয়ার গুলি বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকত।

কবিগুরু বলেছেন – “কোথা হা হন্ত, চিরবসন্ত! আমি বসন্তে মরি। বন্ধু যে যত স্বপ্নের মতো বাসা ছেড়ে দিল ভঙ্গ, আমি একা ঘরে ব্যাধি-খরশরে ভরিল সকল অঙ্গ”। ব্যাধি আমাকেও পেয়ে বসল, অর্থাভাবের ব্যাধি। সব বন্ধুরা যে যার মত চলে গেছে, আমি একা বাসাবাড়িতে। একা একা সিনেমা দেখা চলেনা, ট্রামে চড়তেও মন চায়না ক্রিকেটও প্রায় ভুলে মেরেছি। এদিকে স্যার ওনার ভাই এর সাথে মেলামেশাটা পছন্দ করতেননা, তাই একাকিত্ব কাটতেই চাইতনা। টিভিতে ক্রিকেট ম্যাচ থাকলে নবীন সেন লেনের একটা ক্লাবে দিনটা কেটে যেত, কিন্তু রাত্রে আবার সেই একা। পড়াশোনাও কিছুই করতামনা প্রায়। কাছের একটা লাইব্রেরিতে গল্পবই পড়া, আর পার্কে বসে মানুষ দেখা।

একদিন অন্ধকারে রুমে একাই শুয়ে আছি, ঘরে ঢুকে স্যার লাইট জ্বালিয়ে শুধালেন- কিরে জাম্বুবান ফ্যান চালাসনি কেন! জবাব দিলাম -এমনিই। স্যার এগিয়ে এসে গায়ে হাত দিয়ে দেখলেন শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। কাকে যেন ডেকে এনে আমাকে সামনের হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসার বন্দোবস্ত করলেন। পরেরদিন অনেকটা রাত্রে আবার এলেন স্যার। শুধালেন কেন বাড়ি যাসনা বা কেন তোর কেউ আসেনা ইত্যাদি ইত্যাদি। রাগে, দুঃখে, কষ্টে, আবেগে কথাগুলো স্যারকে সব উগড়ে দিলাম। স্যার গুম মেরে রইলেন খানিক, তারপর বল্লেন – তুই পড়াশোনা করিসনা কেন! তেমন হলে বাড়িই ফিরে যা। সবাই কি ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হয়! তবে হ্যাঁ বড় ব্যবসা করতে গেলে কিন্তু জ্ঞানগম্যি থাকতে হবে আর যার জন্য পড়াশোনার বিকল্প নেই। নতুবা একটা দূর পর্যন্ত গিয়ে আঁটকে থাকবি। কাল থেকে সকালের ব্যাচে আসবি? আমি ঘাড় কাত করে সম্মতি দিলাম।

স্যার চলে যেতে ভাবলাম, গ্রামে ফেরা মানে সেই দোকানই আমার গতি। অগত্যা পড়াশোনাতে মন দেবার সিদ্ধান্তেই মোহর লাগালাম।

এই ব্যাচগুলোতে ধনী লোকের বাচ্চারা পড়াশোনা করে, এরা আমাদের মত করে কথাবার্তা বলেনা। ইংরাজি শব্দ অনেক বেশি। এখানের ছেলেরা কেউ আমার মত বিড়ি খেতোনা, সব্বাই সিগারেট টানত। হাতে দামি ঘড়ি, কারো ব্যাগে সুদৃশ্য সোনি ওয়াকম্যান, কামেরার মত আশ্চর্য যন্ত্র। এই বাচের ফি’জও অনেকটাই বেশি। প্রতিটি সাবজেক্টের জন্য আলাদা আলাদা শিক্ষক, কেমিষ্ট্রির মত কোনো কোন বিষয়ে একাধিক স্যার ক্লাস নিতেন। স্টাডি মেটিরিয়াল, মক টেষ্ট, গ্রুপ স্টাডি ইত্যাদির মত কত নিত্যনতুন পড়াশোনা করার পদ্ধতি। পড়াশোনাতে যথেষ্ট আগ্রহ তৈরি হলে, স্যার নেশার খেয়ালে অনেক দিন রাত্রি ১০টার পর আমাকে একা পড়াতে বসে যেতেন। আমিও পড়তে বসতাম গুড়গুড় করে। অতি অল্পদিনে স্যারের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠলাম। সত্যিকারের জ্ঞানমূলক শিক্ষাজীবটা শুরু হল। রাত্রের দিকে স্যার ৩-৪ দিন অন্তর অন্তরই আমাকে ৫০-১০০ টাকা করে দিতেন। এতে আমার দিব্যি চলে যেত।

সকালে ২ টাকায় ৪টে কচুরি, ১৬ টাকায় দুবেলার ভাত। মাঝেসাঝে ৩ টাকায় আধাপ্লেট নিরামিষ চাউমিন বা ১ টাকার মুড়ি তেলেভাজা খেলে মনটা গলাছেড়ে গান গেয়ে উঠত। সুতরাং ১০০ টাকা হলে ৫-৬ দিন আরামসে চলে যেত। আমিও স্যারের দোতলাতে যাবার অনুমতি পেলাম, টুকুটাক সাংসারিক ফাইফরমাইস খেটে দিলে দেখতাম স্যার খুশিই হচ্ছেন। পাবে যাওয়া বন্ধ করে ঘরে বসে মদ্যপানের সিদ্ধান্ত নিলেন স্যার, সময় বাঁচাতে। লাগাতার কয়েক মাস আমি দৈনিক লিকার শপ থেকে হরেক স্বাদের রঙিন বোতল ও চাট কিনে আনতাম লিখে দেওয়া লিষ্ট অনুয়ায়ী। একটা সময় দোকানদার ভাবত আমিই বোধহয় এই উন্নত জাতের মদ গুলো রোজ গিলি।

দুপুরের ক্লাসে আমিই একমাত্র তুলনামূলক মলিন পোষাকের, বাকি সকলেই নিপুণ সুবেশা, দারুণ সব সুগন্ধী ম ম করত। নিজেকে কেমন খেলো খেলো মনে হবার দরুন তেমন কারোর সাথে তেমন কথাবার্তা বলতামনা। কটা দিন গড়াতেই স্যারের নেক নজরের কারনে একটি ছেলে এসে যেচে বাক্যালাপ শুরু করল। নাম সমর্পণ সরকার, হাওড়ার বালিতে বাড়ি। বাবা কোনো সরকারী ব্যাঙ্কের মস্তবড় অফিসার, সেটা আলাপের অন্তত এক মাস পর তাদের বাড়ি গিয়ে জেনেছিলাম। সেবারে ২ দিন ছিলাম তাদের বাড়ি, তার মায়ের সন্তানবাৎসল্য আজও আমার চোখের পাতায় উপবিষ্ট। সে যাই হোক, সমর্পণের ছিল ভিডিও গেমসের নেশা। আমি সেই সভ্যতা থেকে তখন সহস্র যোজন দূরে অবস্থান করছি। ওরা নাকি কম্পিউটারে এই খেলা করে। আমার কম্পিউটার নেই, জ্যাঠার ঘরে দূর থেকে দেখেছি হিসাব করতে। এখানে যে খেলাও যায় তা অজানা ছিল এর আগে। তাই এই সব আলোচনাতে কখনো ঢুকতামও না। সমর্পণের বাড়িতে যাওয়া- ওই কম্পিউটার আর তাতে কিভাবে গেমস খেলা যায় সেটা দেখাই মূখ্য উদ্দেশ্য ছিল।

একে একে প্রাঞ্জল, দীপাংশু, মহেন্দ্র, অয়ন প্রমুখের সাথেও সখ্যতা গড়ে উঠল। ব্যাচে মেয়েদের সংখ্যাটাও নেহাত কম ছিলনা। বকুলপ্রীয়া, সোনিয়া, তমসা, হরিণী এরা বেশ সুন্দরী দেখতে ছিল। একমাত্র বর্ণালীই এদের মাঝে একমাত্র কমা, কিন্তু বন্ধু হিসাবে বোধহয় সকলের চেয়ে সেরা ছিল। আমাকে নিয়ে ২৬ জনের ব্যাচের হৃৎপিণ্ডটা কিন্তু ছিল অন্য সে একজন।

১০

পটুয়া পাড়ার শিল্পীরা ঠিক যেমন মনপ্রাণ দিয়ে খাঁজ কেটে কেটে বা যেখানে যতটুকু প্রয়োজন ততুটুকু মাটি লেপে তাদের প্রতিমা গুলো তৈরি করে, কবিরা যেমন করে ক্যাবে তাদের মানসকন্যাকে সাজিয়ে তোলেন, তেমনই- সৃষ্টিকর্তাও অনেক সময় নিয়ে এ মেয়েকে বানিয়েছিলেন নিশ্চিত। যেমন রূপ তার সাথে পাল্লা দিয়ে দেমাক।

ব্যাক্তিগত গাড়িতে চড়ে সে আসত, হুন্ডাই স্যান্ট্রো। তবকা আঁটা ড্রাইভার, সাথে একজন হোস্টেজও আসত তার সাথে। দাদুর জনা চারেক কারপরদাজ থাকতে দেখেছি, জানলাম শহরে বড়লোকেদের মেয়েদের ব্যাক্তিগত কাজের দিদি থাকে, যাকে হোস্টেজ বলে। মেয়েটির মা ফুলবাগান শিশু হাসপাতালের চিকিৎসক, পিতাও কোনো এক নামকরা বেসরকারি হাসপাতালের পরিচিত শল্যচিকিৎসক। একমাত্র দাদা ইঞ্জিনিয়ার, ব্যাঙ্গালোরে থাকে। ইনি ভিক্টোরিয়া ইন্সটিটিউশনে অঙ্ক শাস্ত্রের স্নাতক বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। শহরে গোটা তিনেক বাড়ি ও ফ্ল্যাট আছে বাপের এবং বাপ-মা টাকার কুমীর। এ সব তথ্য সমর্পণের ফ্লপি থেকে গলগল করে বেড়িয়ে এসেছিল। আত্রেয়ীর প্রতি গোটা সেন্টারের অধিকাংশ পুরুষই অনুরক্ত ছিল, সমর্পণ যাদের দলনেতা।

আত্রেয়ী চক্রবর্তী। গোলাপ গোলাপি না আত্রেয়ীর গায়ের রং এ নিয়ে বিতর্কের শেষ ছিলনা ওর ঘনিষ্ট মহলে। পাঁচ ফুট ৯ ইঞ্চি লম্বা, নির্মেদ শরীরে কখনো তাকে সালোয়ার বা ভারতীয় পোষাক পরতে দেখিনি। কোঁচকানো একরাশ চুল কোমর ছুঁইছুঁই, হাতে কেয়ারী করা নখে বাহারি নখপালিশ, পাশে হেঁটে গেলে মন মোহিত একটা একটা সুগন্ধ যেকোনো পুরুষকে আকর্ষন করার পক্ষে যথেষ্ট। কথাবার্তা যেন সিনেমার সংলাপ বলছে, ঠিক স্বভাবিক লাগতনা শুনতে।

এমনিতে সময় অতি অল্প থাকত দুটো ক্লাসের মাঝে। তার উপরে মেয়েরা নিজেদের পড়া নিয়েই ব্যাস্ত থাকত অধিকাংশ সময়। ফাঁকের সময় টুকু ছেলেগুলোর সাথে এক আধটা কথাবার্তা। ইংরাজিতেই এরা অধিকাংশ কথাবার্তা বলত, আমি প্রায় অর্ধেকই বুঝতামনা যে কি বলছে। এভাবে মাস খানেক কেটে যাবার পর, কোনো এক গেম নাকি আত্রেয়ীর কম্পিউটারে ইন্সটল হচ্ছিলনা, তাই সমর্পণ নিজে গিয়ে ইন্সটল করে দেবার প্রস্তাব দিল। নির্ধারিত প্রোগ্রামটা তিনদিন পর এক শনিবারে নির্দিষ্ট হল। এই তিনদিন সমর্পণ আমার কানের পোকা খেয়ে নিল প্রায়। ‘এই প্রথম- তোর বৌদির বাড়ি যাব, উফ কিভাবে ম্যানেজ হবে। আমি তো ভাবতেই পারছিনা, আচ্ছা চুমু কি প্রথব বারেই খাবো? ইত্যাদি ইত্যাদি’। এমনকি ব্যাঙ্ককে হানিমুনে যাবে এমন প্রোগ্রামও খেয়ালের দেশে সাজিয়ে ফেলেছিল, শুধু দিনটা আসতে যা দেরি। আমিও বেশ আনন্দিতই হলাম ওদের সম্পর্কের পরিণতি শুনে।

নির্ধারিত দিনে বীরপুঙ্গব একা প্রণয়ীর বাড়ি যেতে সাহস করলেননা। আমাকে খানসামা বানিয়ে কোলকাতা জীবনে প্রথমবারের জন্য হলুদ ট্যাক্সি চড়ে প্রাচীরে ঘেরা একটা বাগানের সামনে এসে দাঁড়ালাম। আধো আবছায়াতে বুঝলাম এটা বাগান নয়, বাগানে ঘেরা পেল্লাই সাইজের একটা মিনি প্রাসাদ রয়েছে ভিতরে। দুপুর গড়িয়ে তখন বিকেল, ঠিকানা খুঁজে গেটের দারোয়ানকে যা বলার সব সমর্পণ নিজে থেকে দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছিল। আমি শুধুই দর্শক কিম্বা অতিথি। গাছগাছালিতে ঘেরা আছে বলে বাড়িটি প্রায় দেখাই যায়না বাইরে থেকে। গ্রামে এই ধরনের বাড়ি দেখা যায়না। ইংরাজি সিনেমার কল্যাণে এই নক্সার বাড়ি আমি আগেও দেখেছি, তাই চমকে গেলামনা। কিন্তু যারপরনাই পুলকিত হলাম। গেট থেকে বসার ঘর পর্যন্ত অন্তত গোটা ছয়েক দারোয়ান, চাকর, মালী, পরিচারিকাকে লক্ষ্য করলাম। ঘরের ভিতরের এমন জমকালো ও বিদেশী প্রাকারের অন্দরসজ্জা এ জীবনে এর আগে কখনো চাক্ষুষ করিনি। সিনেমার পর্দাতে দেখেছি, তাই প্রাথমিক ঘোরটা কাটতে বেশ অনেকক্ষন লাগল। বাথরুমটাই আমাদের বাবা-মা-ভাইবোনের চারজনের শোয়ার ঘরের চেয়ে একটু বড়।

খানিকক্ষণ পরে আত্রেয়ী নিজে এসে উষ্ণ অভ্যর্থনা করল করমর্দন করে। সমর্পণের সাথে কোলাকুলি করল, আক্ষরিক অর্থেই সমর্পণ হয়ত উষ্ণ হয়ে উঠেছিল। সেই প্রথমবার হাতে হাত লাগিয়ে ছুঁয়ে দেখা, আহা যেন পার্শি মখমলের তৈরি। আমার দৃষ্টিতে বেশ কটু ধরনের একটা ব্যাটাছেলেদের মত অতিছোটো টাইট হাফপ্যান্ট আর বগলকাটা টিশার্ট পরে আছে সে। এলোমেলো লালচে চুলগুলো টেনে মাথার উপরপানে একটা গাডার দিয়ে কষে বাঁধা। সম্পূর্ণ মেকাপ বিহীন সদ্য উনিশের যুবতী। জিরাফের মত লম্বা লম্বা পায়ে মাছি বসলে পিছলে যাবে এমন মসৃণ আর চকচক করছে। বেশ অস্বস্তি হতে লাগল। এতো কম পোষাক পরা মহিলা আগে কখনো সামনে থেকে দেখিনি, তার উপরে এমন মারাকাটারি সুন্দরী। বাড়িতে আমার পিসিদের দেখেছি, তুতো মিলিয়ে গোটা চারেক বোনও আছে। গোটা তিন চারেক প্রেম করার অভিজ্ঞতাও ঝুলিতে ছিল, তবে এমন অশ্লীল পোষাক পরিহিত অবস্থাতে কাউকে দেখিনি।

এর পর পানীয়, নানা ধরনের মিষ্টান্ন দ্রব্য, ভাজাভুজি সমৃদ্ধ জলযোগের পর এলো সুগন্ধী দুধ ছাড়া চা। এভাবে আপ্যায়নও জীবনে প্রথমবার। ওরা দুজনে কম্পিউটার নিয়ে ব্যাস্ত হয়ে গেলে পরে আমি হ্যাংলার মত কখনো জীবন্ত পুতুলটির প্রতি, কখনো ওই মিনি রাজপ্রাসাদটি বৈভব তো কখনো বাউন্ডারির মধ্যে কেয়ারী করা বাগানের শোভা দেখছিলাম। ঘন্টাখানেকের মধ্যে কাজ শেষ হলে এবারে ফেরার পালা। গেমসে এতটাই বিভোর হয়েগিয়েছিল যে ফেরার সময়ের সৌজন্য বিদায়টুকুও জানাতে এলোনা মেয়েটি। সমর্পণের সাথে বাইরে এসে এবারে খেয়াল করলাম- বাইরে বড় পিতলের ফলকে লেখা ডাঃ এস চক্রবর্তী, ও তার নিচে ডাঃ সুদীপ্তা চক্রবর্তী। ৩/১, পাম প্লেস, বালিগঞ্জ পার্ক। কোলকাতা- ১৯।

১১

  এভাবে যখন এদের সাথে একটু একটু করে সখ্যতা গাঢ় হচ্ছে, স্যারও ততদিনে আমাকে প্রায় পুরোদস্তুর কারপরদাজ ভেবে নিয়েছেন মন থেকে। এখন মাসে প্রায় ৫০০ টাকার বেশি আমার হাতে আসে। কিন্তু বন্ধুদের সামনে এই বিষয়টা আমার আত্মসম্মান বোধকে জাগিয়ে তুলল। ঠিক করলাম, স্যারের থেকে আর টাকা নেওয়া যাবেনা। স্যারের ভাই তন্ময়য়ের কল্যাণে শেয়ালদা কোর্টে এক উকিল বাবুর সেরেস্তাতে টেম্পোরারি ফাইফরমাইসের কাজ জোগার করলাম। সাপ্তাহিক ২৫০ টাকা পারিশ্রমিক, সপ্তাহে ৫ দিন, খাসা কাজ। স্যারের থেকে টাকা নেওয়া বন্ধ হলেও নিচের রুমে আমাকে দেখামাত্র ফরমাইস করানোটা ততদিনে অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে দোতলার মানুষগুলোর। প্রমাদ গুনলাম, দোষ ওনাদের নয়, সুযোগ আমিই দিয়েছিলাম। এখন প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে বিকল্প না পাওয়া পর্যন্ত।

কোর্টে যেতাম বেলা দুটোর একটু আগে, পুলিস ফাইলসের সময় আর্দালি- মুহুরিদের হাতে হাতে কাজকর্ম করে দিয়ে বেলা পাঁচটার আশাপাশেই শেষ। শিয়ালদা ফ্লাইওভারটির ভাল নাম বিদ্যাপতি সেতু। এর একটা রাস্তা যেটা পূর্বদিক নেমে যাচ্ছে বি আর সিং হাসপাতালকে বামপাশে রেখে ফুলের চারার দোকানগুলোর দিকে তার নাম পরীক্ষিৎ রায় লেন, তার ঠিক নিচে এনআরএসের পাঁচিলের গায়ে আবিষ্কার করলাম একটা সস্তার হোটেলের। নাম অন্নপূর্ণা ফুকরা।

ফুকরা নামের আক্ষরিক অর্থ আজও আমার অজানা। এখানে ইস্টিশানের পথচলতি লোকজন, আদালতে আসা মানুষজনের কারনে বেশ চালু হোটেল ছিল, তাই দামটা সামান্য বেশি। ১৫ টাকায় মাছভাত, ডিমভাতেরও এমই দাম তবে একজোড়া ডিমের কালিয়া সাথে অতিরিক্ত একটা ভাজি। ফুটপাতের একটা অংশে যেমন টেবিল পেতে দোকান হয়, এটাও ঠিক তেমনই। উপরে কালো ত্রিপলের ছাউনি। ভীষণ রকমের ছিমছাম, বিশেষত্বটা ছিল- এরা পদ্মপাতায় খেতে দিত, সাথে মোটা থার্মোকলের গ্লাসে জল। ব্যাপারটাতে বেশ নতুনত্ব ছিল। এর জন্য অতিরিক্ত ১ টাকা লাগত। এছাড়া পোস্তবড়া বা মাছের ডিমের বড়া নিলে মাত্র অতিরিক্ত ২ টাকা নিত এবং অতিরিক্ত একপ্লেট ভাতের টাকা লাগতনা। মোটামুটি ২০ টাকা খরচা করলে বেশ আয়াসে গরীবের রাজকীয় ভোগ হত। ভদ্রলোকটির নাম শম্ভু মেটে, বাড়ি মেদনীপুরের তমলুকের কাছের কোনো স্থানে। বর্তমানে ২৪ পরগণার ফ্রেজারগঞ্জ অঞ্চলের বাসিন্দা শেষ ৫-৬ বছর ধরে। ভদ্রলোক, ওনার স্ত্রী, ওনার শ্বশুর মশাই, একটা শালীপতিভাই, ও বোনের দেওরের সাথে গ্রামের একটা ১২ বছরের বালক। তাকে টেনিয়া নামে সবাই ডাকত। এরা কত ঘনিষ্ট ভাবে একসাথে লড়ছে জীবন যুদ্ধে, পেটের প্রশ্নে শ্বশুর- জামাই-সুমুন্দি সব সম্পর্কেরই বোধহয় আড়াল আবডাল তুচ্ছ হয়ে যায়। এখানে ভদ্রসভ্যভাবে বেঁচে থাকাটাই একমাত্র মুখ্য বিষয়, বাকি সকল কিছুই অযৌক্তিক।

তারা ওখানেই ঘুমাতো রাত্রে, বেঞ্চের উপরেই জীবন কেটে যাচ্ছিল একটু একটু করে। স্নান সরকারী গঙ্গা জলের ফোয়ারাতে আর সেতুর নিচের পাবলিক টয়লেটে জরুরী কর্ম। এরই মাঝে রাত্রে পুলিশি অত্যাচার, কখনো শিব মার্কেট এলাকার কুচো দাদাদের মদের পয়সার জন্য অত্যাচার। এরা হাসিমুখে সব সইত। অভাবের অত্যাচারে অল্পবয়সে অতিবৃদ্ধ শ্বশুর মশাইটা রাত্রে পাখার বাতাসে মশা তাড়াতে তাড়াতে বলত- পুলিশ বা এই ছোটখাটো তোলাবাজগুলো- এরাও বড় অসহায়। আমরা তবু গতরে খেটে খেতে পারি, এদের মগজে তালা, ভিক্ষা মনে করেই আমরা রক্ত জল করা পয়সা এদের দান করি। পরজন্ম থাকলে নিশ্চই ঈশ্বর আমাদের এই দানের পুরস্কার দেবেন। তুমি বাবা পড়াশুনা করে কালেক্টর হয়ে এই পুলিস গুলো মানুষ কোরো, যতটা পারবে। আমি বুড়ো মানুষ আমাকে ছাড় দেয়, কিন্তু জামাইটিকে বড় মারধর করে কারনে অকারণে। জানো- ক্ষ্যাপা পাগল মুমুর্ষু কাউকে কোনোদিন ফেরাইনি খেতে বসলে, টাকা চায় ঠিকিই কিন্তু কখনো কারো কলার ধরিনি। আমাদেরও খেয়ে পরে চলে গেলেই হবে’।

দর্শন আসলে ফলিত জীবনের অঙ্গ, কোনো কাগুজে বুলি নয় যা স্কুল কলেজে পড়ানো হয়। কতবড় মন হলে এমন নির্বিকারচিত্তে কথাগুলো বলা যায় জানিনা, সারাদিন উদয়াস্ত পরিশ্রমের টাকা কেড়ে নিয়ে চলে যায় এক শ্রেনীর শিক্ষিত চোরের দল।

১২

উপলব্ধি করেছিলাম আত্মসম্মানের বিনিময়ে কোনোকিছুকে বিকিয়ে দেওয়া কাপুরুষের কাজ। লাইটহাউজ সিনেমার দারোয়ান লক্ষণদার সাথে সখ্যতাটা নগদে ভাঙালাম। ১৪ নং সদর স্ট্রীটের লিটন হোটেলের টঙে ম্যান পাওয়ার এজেন্সির কর্মীদের থাকার ছাউনিতে আরো ১২ জনের সাথে থাকা শুরু করলাম। বিভিন্ন সময়ে ওদের ডিউটি হওয়ার জন্য সবসময় একটা না একটা বেড খালি থাকতই। তাই আমি কখনই ওদের কাছে বোঝা হয়ে উঠিনি। এভাবেই মাসখানেক চলে গেল।

ইতিমধ্যে একদিন দুপুরে সাথে করে নিয়ে গিয়ে তাপস স্যার আমাকে পাশের বঙ্গবাসী কলেজে ভর্তি করে দিয়ে এলেন। এক বছরের গ্যাপ দেওয়া ছাত্রের জন্য কোলকাতার কলেজে অনার্স পাওয়া দিনে তারা দেখার মতই কঠিন। স্বাভাবিক ভাবেই প্রাণীবিদ্যা বা উদ্ভিদবিদ্যা বিষয়ে সাম্মানিক বিভাগে কোনো সিট খালি ছিলনা। উপায়ান্তর না দেখে নৃতত্ববিদ্যা বিভাগেই ভর্তি হয়ে গেলাম সাম্মানিক স্নাতক বিভাগে। আমার মাকে স্যার বলেছিলেন- “আমি গাধা পিটিয়ে ঘোড়া বানাতে পারিনা, গাধাকে ঘোড়া বানানোও যায়না। আপনার ছেলে ঘোড়া আর গাধার সংকর, টাট্টু। জীবনে চলার মত করে একে শিক্ষাদীক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করব। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন”। স্যারের কেমন যেন আমাকে শেখাবার রোখ চেপে গেছিল।  

যথার্থ ভাবেই দুপুরের ক্লাস শিকেয় উঠল। তাতে আমার পড়াশোনায় ঘাটতি হলনা, স্যার নিয়মিত রাত্রে আমার ক্লাস নিতেন। ক্লাস শেষ করে সদর স্ট্রিটে ফিরে আসতাম। দুপুরের ব্যাচটার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হতে আমি বেশ কষ্ট পেলেও বাকিরা আমাকে ভুলতে দ্বিতীয় দিন নেয়নি। অদৌ মনে ছিলাম কিনা কে জানে! সমর্পণও কখনো আর খোঁজ নেয়নি। বুঝতে পারছিলামনা জীবনের নিয়মটা ঠিক কোনটা! ব্যাচে থাকার ওই গাঢ় বন্ধুত্ব না ব্যাচ ছেড়ে দিতেই সম্পূর্ণ অচেনা হয়ে যাওয়া।

রাত্রের ক্লাসটা মোটামুটিভাবে সাড়ে দশটার আগে কখনই শুরু হতনা। শনি রোববার ক্লাস হতনা, স্যার পরিবারের সাথে বা সামাজিকতা করতে বন্ধুগৃহে গমন করতেন। সপ্তাহে পাঁচদিন সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে দিনের যাবতীয় ব্যাচ গুলো শেষ হয়ে গেলে, ঘন্টা খানেক স্টাফেদের সাথে মিটিং করে নিয়ে রাত্রি ন’টায় নিজস্ব মজলিশ শুরু করতেন। ১০টা নাগাদ মজলিশ শেষ করে পাজামা পরে নিচে এসে পাড়াতে একটা মিনিট পনেরোর চক্কর কেটে হালহকিকৎ নিয়ে মোটামুটি সাড়ে দশটার সময় আমাকে নিয়ে বসতেন। ওঠার নির্দিষ্ট সময় ছিলনা, কখনো এগারোটাতেই ক্লাস শেষ হত। কোনো অঙ্ক না মিললে বা আমি বুঝতে অসমর্থ হলে সেই ক্লাস রাত দুটো অবধি চলার রেকর্ড ছিল।

ততদিনে কলেজ জীবন উপভোগ করতে শিখেছি। বাঁকুড়ার সোনামুখী এলাকার প্রদীপ নন্দী জর্জ টেলিগ্রাফে একটা বৃত্তিমূলক কোর্স করত, সাথে স্পোকেন ইংলিশ। এরই সাথে কলেজে আমার বিভাগে পড়ত। দ্রুত ওর সাথে সখ্যতা আমার একাকিত্ব কাটালো। আমি ধীরে ধীরে সলিল-হাফিজুলের সাথে কাটানো সেই সুবর্ণ সময়ের খোঁজকে কাটিয়ে উঠলাম। দুপুরের ব্যাচ নিয়ে আমার মধ্যে যে ‘হ্যাঙ্গওভার’ তৈরি হয়েছিল সেটা আস্তে আস্তে ফিকে হতে শুরু করেছিল। হয়ত ভুলেই যেতাম যদিনা আবার ওদেরই মধ্যে হতে আমার ওই রাত্রির ক্লাসে এসে উপস্থিত হত।

১৩

‘বুঝলি ও রাত্রে পড়তে আসবে তোর সাথে। ওর কলেজ খুব স্ট্রিক্ট, তাই দুপুরের ব্যাচে কন্টিনিউ করতে পারলনা’। কে আসবে, কার কলেজ সে সব উহ্য রেখে- কথাকটা একতরফা ভাবে বলে স্যার হনহন করে দোতলাতে উঠে গেলেন। সে রাত্রে আর পড়া হলনা। আমি ভাবলাম এ আবার কোনজন? স্থানীয় হলেও রাত্রি ১২ টার সময় সে ফিরবে কিসে? সেও কি তাহলে এখানেই থাকবে? তার সাথে যদি আমার না পটে! কি জানি কিহবে। এমনই হরেক ভাবনাতে ভাবনাতে অস্থির হয়ে সেরাত্রে ওই ঘরেই ঘুমিয়ে গেলাম।

সকালে উঠে সদর স্ট্রীটের বাসাবাড়িতে ফিরতেই মাথায় বজ্রপাত হল। লক্ষণদা বলে যে দারোয়ানের সাথে এখানে উঠে এসেছিলাম, তিনি মারা গেছেন গতরাত্রে। সৎকারও হয়ে গেছে। আমারও বাস উঠল টঙে। নিউ মার্কেটের একটা দোকানে সেলসম্যানের চাকরি করত সাবির ভাই নামের একজন যিনি রাত্রে আমাদের ঠেকেই থাকতেন। সে প্রস্তাব দিল, দীনানাথ নামের এক বিহারি রেল কর্মচারীর সাথে কিছুদিন রাজাবাজারের একটা স্থানে থেকেছিল। যদি সাহস থাকে তো সেখানে থাকা যেতে পারে। বুঝলামনা কোথাও থাকতে সাহসের কেন প্রয়োজন হয়! দীনানাথ আবার ক্ষ্যাপা পাগল নয়তো! হলেই বা কি, আমিও বাচ্চাছেলে নই। একান্তই না হলে স্যারের ভাই তন্ময়ের পাসটা খালিই আছে। রাতের পড়া সেরে ওখানেই শুয়ে পরা।

সেইদিনিই দুপুরে কলেজে অন্যান্য দিনের মতই চার পিরিয়ড করে কোর্টে না গিয়ে গেলাম সাবির ভায়ের নির্দেশিত স্থানে। বেলা দুটো নাগাদ শিয়ালদা সেন্ট জন’স চার্চের গেটের কাছে একজন দাঁড়িয়ে থাকবে কমলা রঙের রেলের গেঞ্জি গায়ে, এমনই প্রোগ্রাম সেট হয়েছিল। যথা সময়ে পৌঁছে দেখি বছর পঞ্চাশের একজন রোদে পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া বিহার প্রদেশের মানুষ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন, একটা বড় হাতুড়ি ও নোংড়া চটের থলে সহ। বুঝতে বাকি রইলনা, ওই অপেক্ষার হেতু আমি। পরিচয় দিতে উনি ওনাকে অনুসরণ করতে বল্লেন। শিয়ালদার দিক থেকে রাজাবাজার ঢোকার একটু আগে ডানহাতে ESI হাসপাতালের পাশ দিয়ে মহারাণী স্বর্ণময়ী রোড ধরে একটা গোরস্থানের গেটের সামনে এসে দাঁড়ালাম। আমরা যেতেই ফেজ টুপি ওয়ালা একজন দারোয়ান গোছের লোক অতি উৎফুল্লিত হয়ে দীনানাথকে স্বাগত জানালো। ওনাদের দুজনের পিছুপিছু আমিও ভিতরে গেলাম।

প্রথমটাতে ভেবেছিলাম দীনানাথ তার বন্ধুর সাথে বোধহয় দেখা করতে এসেছে। বেশ অনেকটা ভিতরে যাওয়ার পর একটা উন্মুক্ত খোলা শানবাঁধানো চত্বর, ফেজটুপি বলল এটা জানাজার স্থান। আরো জানালো এই ফাঁকা স্থানটিতে লাশটিকে কবরে মাটিচাপা দেওয়ার আগে অন্তিমবার মন্ত্রপাঠ করে তার জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করা হয়। এবারে সে একটা ছোট্ট মত ঘর দেখালো ওই চত্বরের পাশেই, ওখানে রাতের পাহারাদার থাকার স্থান। আমি দীনানাথের দিকে তাকাতে সে বলল- ‘বাবুয়া, এ সিরাজ আছে। আমার ইয়ার, আমরা দুজনেই বালিয়া জেলার ভোজপুর থেকে অসেছি। আমরাই এখানে থাকতাম, সিরাজ আভি আভি সাদি করেছে। তাই আমি আকেলা হয়ে গেছি। তুমি চাহালা থাকতে পারো। কোই আসুবিধহা হোবেনা’। আমার শিরদাঁড়া বেয়ে হিমেল স্রোত বয়ে গেল। বুড়ো বলে কি!, একম খাঁ খাঁ একটা গোরস্থানের ভিতরে রাত্রে একা? কাভি নেহি। বুঝলাম সঙ্গদষের ফলে আমার অন্তরাত্মাও হিন্দিতে কথা বলছে। ওদের আর কিছু বল্লামনা। আসার সময় উত্তেজনাতে বাইরের পরিবেশের প্রতি ভ্রুক্ষেপ ছিলনা, ফেরার জন্য বাইরে আসতেই চামড়া পচার বীভৎস গন্ধ ধক করে নাকে লাগল। চারিদিকে দেখি লবন মিশ্রিত গরু, মোষ, ছাগলের চামড়া স্তুপ।

কোনোমতে ফিরে এসে স্থির করলাম, থাকলে এই স্যারের ঘরেই থাকব, নতুবা দেশে ফিরে বাবার সুপুত্র হওয়ার সময় হয়েছে। খুব হয়েছে পড়াশোনা। মনটাও খারাপ ছিল, ফেরার পথে সুরেন্দ্রনাথ কলেজের গলি থেকে  হাফপ্লেট চাউমিন খেয়ে স্যারের বাড়িতে এলাম। সারাদিনে অন্তত গোটা পাঁচেক সংবাদপত্র নেওয়া হয় সেন্টারে, জামাকাপড় ছেড়ে সেগুলরই একটা পড়তে পড়তে কখন হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে গেছি। ‘হ্যাঁ মা, আমি পৌঁছে গেছি। তুমি চিন্তা কোরোনা। তাপসীদি আমার সাথেই আছেন। কোনো সমস্যা নেই’। একটা মহিলা কন্ঠে এই কথোপকথন শুনে ভাবছিলাম বোধহয় স্বপ্ন দেখছি, চোখ খুলতেই দেখি সত্যিকারের এক মেয়ে। একটি নয় দুটো। ওই অবস্থাতেই সোজা খাড়া হয়ে সটান দাঁড়িয়ে পড়লাম। পড়নে একটা রঙচটা হাফপ্যান্ট, গায়ে ছেঁড়া স্যান্ডো গেঞ্জি। যারপরনাই লজ্জিত ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমি আর ঐ কথাবলা স্ত্রী লোকটি দুজনেই আলোর দিকে মুখ করে। ঘরে অন্য মাঝবয়সী মহিলাটি আমার দিকে মুখ করে, ওনারা দুজনে একে অপরের সামনাসামনি  দুটো প্লাস্টিকের টুলে। ঘোরটা কাটতেই বুঝলাম দুই আগন্তুকই আমার উপস্থিতিকে গ্রাহ্যের মধ্যেই ধরেনি। আরো কয়েকমিনিটের মধ্যে বিষয়টা ভীষণ অপমানসূচক বিরক্তিতে পৌঁছে গেল।

আমি এবারে আমার লোটাকম্বল গুছিয়ে ওদের পাশকাটিয়ে বাইরে যাবার উপক্রম করতে দরজার কাছে পৌঁছাতেই একটি মহিলা কন্ঠ প্রায় চেঁচিয়ে উঠে বলে উঠল- একি কোথায় চললেন? ক্লাস করবেননা? আমি ভীষণ রাগে পিছনপানে তাকিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু পিছন ফিরতেই দুপুরের গোরস্থানে থাকতে হবে শোনার  চেয়েও জোরালো একটা বিদ্যুতের শক অনুভব করলাম মস্তিষ্কে, সাথে গোটা শিরদাঁড়াটাই জমে বরফ। পা যেন হাতির সমান ওজন, তুলতে পারছিনা। চোখ বিস্ফোরিত, হাঁ মুখের ভিতরে জ্বিহ্বা যেন লক্ষকোটি বছরের তৃষ্ণাতে অবস হয়ে আছে।

জানিনা ঠিক কত সেকেন্ড ওই ভাবে ছিলাম, আমাকে গুনতে বললে সেটা কয়েক মাস, কয়েক বছর বা কয়েক শতাব্দী কিম্বা সৃষ্টির শুরু থেকেই হয়ত ওইভাবে দাঁড়িয়েছিলাম। আমার জন্মও হয়েছে শুধু মাত্র এভাবে দাঁড়াবার জন্যই। এবারে একটা রিনরিনে আওয়াজ সহ খিলখিল হাসির সাথে শুনলাম- ‘এটা আফগানিস্থানের হেরট অঞ্চল নয়, আমিও তালিবান দলের- জম্বুবান’। শুনতে শুনতে কানটা জ্বলে গেল। আমি বুঝতে পারলামনা,  তালিবান দলে জাম্বুবান কেন থাকবে? আর এমন একটা সুমধুর স্বরে কানটা জ্বলছে কেন? পরক্ষণেই বুঝলাম স্যার কখন এসে পিছনে দাঁড়িয়ে আমার কান মুলে দিয়েছেন। সুতরাং বাকি কথাগুলো বলতে বলতে মেয়েটি থেমে যেতে শুধু মাত্র স্যারের জাম্বুবান শব্দটাই আমার কানে ঢুকেছে, এমনই অচৈতন্য অবস্থাতে ছিলাম ।

কান পর্যন্ত এঁটো করে হেসে স্যারকে বললাম – হ্যাঁ স্যার, এই তো আসছি , এক মিনিট। ট্রাউজারটা গলিয়ে একটা জামা জড়িয়ে নিলাম যেটা হাতে পেলাম। আমাকে মাটিতে শতরঞ্জিতে দেখে মেয়েটিও মাটিতেই বসল, স্যার রইলেন টুলে। অপর মহিলাটি বাইরে বেড়িয়ে গেলেন। স্যার বল্লেন- কাল যার কথা বলছিলাম, এর নাম আত্রেয়ী। তোদের দুপুরের ব্যাচে ছিল। এবং একই ভাবে আত্রেয়ীকেও আমার সংক্ষিত পরিচয় দেওয়া হল। মেয়েটি জবাবে বলল- হ্যাঁ এ একদিন আরেকটা বন্ধুর সাথে আমার বাড়ি গেছিলো, চিনি। সেই নগ্নপায়ে মাছি পিছলে যাবার কথাটা মানসপটে ভেসে উঠল। ছিঃ ছিঃ, মনে মনে কি না কি উল্টোপাল্টা ভাবছিলাম। এ তো দেখছি দিব্যি আমাকে মনে রেখেছে। তবে এটুকুই, পরবর্তী দুইপক্ষকালে ‘হাই হ্যালো বাই’ এর বাইরে আর কোনো কথা হয়নি। আমি শুধু অপার বিস্ময়ে আড়চোখে ওই রূপের ঐশ্বর্যের ঠিকরে পরা ছটাটুকু শুষে নিতাম। এর বেশি আমার আর কোনো ‘অওকাত’ও ছিলনা।

১৪

এদিকে বাড়ি ফিরে বাবার আদর্শ সন্তান হবার যাবতীয় নীলনক্সা সুদূর প্রশান্ত মহাসাগরের জলে ডুবিয়ে আসলাম দৃঢ় ভাবনা বয়ে। ডুবন্ত টাইটানিকের সাথে দেশের ফেরার ইচ্ছাও যেন কখনো আর না ফেরে। কিন্তু রাত্রে কোথায় থাকব? এখানে থাকা মানেই আবার আত্রেয়ীর সামনে স্যারের বাড়ির ভৃত্যের কাজ! পাকা ফোঁড়ার মত আত্মসম্মান টনটন করে উঠল। আত্রেয়ী সাথে প্রথম রাত্রের ব্যাচে পড়ার দিনটাই আমার শেষ স্যারের বাড়িতে থাকা। পরদিন সকাল হতেই শাঁইশাঁই করে দৌড়ালাম নিউমার্কেটে সাবির ভাই এর দোকানে, দীনানাথের খোঁজে। শুনলাম শেঠ তাকে অন্য কোথাও পাঠিয়েছে, রাত্রে ফিরবে। খানিকক্ষণ ভ্যাবলা হয়ে ভেবে দেখলাম আরে কি ভুলটাই না করেছি। গেটকিপার সিরাজ তো সারাদিনিই ওখানে থাকে, ওখানে গেলেই তো সমস্যা মিটবে। আবার উর্ধ্বশ্বাসে দৌড় লাগালাম রাজাবাজারের পানে।

গেটের ভিতরে যথেষ্ট লোকসমাগম হয়েছে, সকাল নটা মত বাজে। সাদা পোষাক পরিহিত কিছু মানুষ তাদের নিকটাত্মীয় বা বন্ধুর শেষ যাত্রার সঙ্গী হয়ে এসেছেন। এদিকে কলেজের সময় হয়ে যাচ্ছে, কিছুতেই এলাকা ফাঁকা হচ্ছেনা। অগত্যা কলেজ না যাওয়ার সিদ্ধান নিয়ে রয়ে গেলাম। আরো ঘন্টাখানেক পর বেলা সাড়ে এগারোটা নাগাদ এলাকা আবার নিঝুম হল। এবার আমাকে দেখে সিরাজে আবার হাসি ফুটেছে। সে দেহাতি হিন্দিতে বলল- ভাই, এখানে থাকাতে কোনো ভয় নেই। কেউ আসেনা রাত্রে এ এলাকাতে। সামনেও কিছু ট্যানারি, আর তারও পিছনে ইন্ডিয়ান অয়েলের ঘেরা জমি , সেটাও ফাঁকা’। আমি বললাম আরে ওই ফাঁকাটাই তো সমস্যা বাপু। সে বলল আশেপাশে অন্তত ৩ টে মসজিদ আছে ৫০০ গজের মধ্যে। সারারাত সেখানে মুসল্লিরা থাকেন।

সিরাজ আরো কিছু বলছিল, আমি সেগুলোর প্রতি ধ্যান না দিয়ে ভাবলাম, একমাত্র এই গোরস্থানই আমার শহরে পড়াশোনা, বাবার দোকানের কবরে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে। এবং সেটা স্যারের বাড়ির কারপরদাজ না হয়েও মামনির রূপসাগরে লাবডুব খেতে খেতে। মন চাইছিল ইয়াহু বলে আর্কিমিডিসের মত প্রায় উলঙ্গ হয়ে রাজপথে দৌড়াতে। নিজেকে সংযত করে শুধালাম, আচ্ছা গোরস্থানে আবার পাহারা কিসের রাত্রে! সিরাজ বলল- সেকি আপনি জানেননা! পাহারা না থাকলে যে কঙ্কাল চোরেদের পোয়াবারো। আমি আর বেশি ব্যাখ্যাতে না গিয়ে বললাম- তুমি না হয় মুসলমান, কিন্তু দীনানাথ তো হিন্দু। এখানকার যারা কর্মকর্তা আছেন ওনারা এল্যাও করেন? সিরাজ তো হেসেই কুটোপুটি। সে বলল, বাবু আপনি কি শখে এখানে থাকতে এসেছেন! নিশ্চিত মহাবিপদে পরে তবেই এমুখো হয়েছেন। গোরস্থানে কে আসবে বলুন, দীনানাথ থাকে বলে ওকে ২ হাজার টাকাও দেওয়া হয়। তুমিও পাবেন।

বুঝলাম, প্রয়োজনের কোনো ধর্ম থাকেনা। আর চোরেদেরও। তাই পূর্বপুরুষদের কঙ্কাল বাঁচাতে ধর্ম কোনো বাঁধা হয়না। অতএব আমার ব্যবস্থা পাকা হয়ে গেল। রাত্রে একটা নতুন মাদুর, ব্যবহৃত একটা চাদর ও বালিশ পেলাম সিরাজের থেকে। কোনো বাড়ির খাট থেকে এটা সদ্য আনা হয়েছে, কোনো মৃতের ব্যবহৃত বাতিল সামগ্রীও হতে পারে। সিরাজ বলল- হোটেলে শোয়ার আগে এত ভাবেন বাবু যে কে এটাতে আমার আগে শুয়েছিল? আমি তখন বললাম, এমনই আরেকটা চাদর হবেনা সিরাজদা? সিরাজ হো হো করে হেসে উঠল।

সন্ধ্যার একটু আগেই দীনানাথ এসে হাজির। আমাকে দেখেই অনেকটা ঝুঁকে গিয়ে প্রায় প্রণাম করে আরকি। আমি সম্মান দেখিয়ে সরে গিয়ে বললাম আমি এবারে বেড়োবো। সেই রাত্রে ফিরব। দীনানাথ বলল দিনের আলো থাকতে থাকতে আলোর সুইচ, পায়খানা বাথরুম, ও টর্চের জাইগাটা দেখে রাখতে। সিরাজ বলল, যেখানে সেখানে পিসাব করবেনা, এর ভিতরে ‘দারু ওর অউরত’ ছাড়া রাত্রে সব কিছুই আনার পার্মিশন আছে। তবে দিনের বেলাতে যেন গান না শোনা হয়, রাত্রে মানা নেই; কারন ওটা শুনে বারণ করার মত কেউ থাকেনা আশেপাশে।

রাত্রে ফুকরাতে খেতে গিয়ে দুমকরে মেটেবাবুর মেয়ের দেওরটিকে আমার সাথে রাত্রিবাসের প্রস্তাব দিতে সে লুফে নিল, এবং সেরাত্রে আর আমার থেকে কোনো টাকাপয়সা নিলনা। সারাদিন কেটে যেত রাত্রির ওই দুইঘন্টার প্রতীক্ষাতে। আর দুই ঘন্টা যেন চোখের পলক ফেলতে ফেলতে কেটে যেত। রাত্রিতে ফিরে দেখতাম দীনানাথ তার ক্লান্ত শরীরে মরণঘুম ঘুমাচ্ছে। গোরস্থানের ভুতেরাও ওর কাছে এসে যদি ভয় দেখাতে আসে, এমন জিন্দা লাশ দেখে ওরাও ত্রস্ত হয়ে সব্বাই কবরের ঘেরা নিরাপত্তাতে লুকাতো। সাধন, মানে ওই ফুকরার মেটেবাবুর মেয়ের দেওর ছেলেটি, তাকেও সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে হত। সে ও সময় নষ্ট না করে তারাতাড়ি ঘুমিয়ে যেত। সার্কাসের খেলার সময় রঙিন আলোর যেমন ফুলঝড়ি ফোটে, আমার মনের মাধুরী মিশে গাছের ফাঁক দিয়ে হলুদাভ ভেপার লাইটের ভুতরে আলোকেও যেন বাহারি রঙিন আলোর ঝর্না বলে মনে হত।

চামড়ার তীব্র গন্ধকে এখন অনায়াসে উপেক্ষা করতে শিখে গেছি। রাতের গোরস্থানের ভয়াল ভয়কে  ফলোঅন করিয়ে ইনিংসে হারিয়েছি। চতুর্দিকের ঝিঁঝিঁ ডাকা নিঃস্তব্ধতাকে প্রতিনিয়ত স্লেজিং করাতে সে কখনো আমার স্বত্তাকে গ্রাস করতে পারেনি। এর পরে আরো পরিণত বয়েসে এসে- ‘আমি গোরস্থানে রাত কাটানো পালোয়ান’ এই বিশ্বাসে এক সন্ধ্যায় গ্রামের গোরস্থানে ১০ মিনিটের বেশি থাকতে পারিনি। বুকটা কেমন যেন ছাঁৎ করে উঠছিল মুহুর্মুহু।  যেদিন যেটা অনুভব করতে পারেনি, সেটা আজ বুঝি; আমি প্রেমে পরেছিলাম।

প্রেম সত্যিই মানুষকে বাহ্যিক হিতাহিত জ্ঞানশূণ্য করে তোলে। বিচার বুদ্ধি নয় আবেগের বসে যাবতীয় সিদ্ধান্ত গুলো নিতে থাকে। হৃদয়ে সবগুলো চরিত্র একসাথে থাকতে পারেনা। প্রেম থাকলে ভীরুতা বা ভয় থাকবেনা, আর দুরুদুরু ভয়ের সিদ্ধান্তহীনতা থাকা মানেই প্রেমের গভীরতাতে গলত আছেই আছে। আমি জীবন দিয়ে উপলব্ধি করেছি। আজ পর্যন্ত আমি প্রেমে ঠকিনি। প্রেম মানে শুধুই নারীর প্রতি পুরুষের প্রেম নয়। দায়িত্ব, কর্তব্য , বিশ্বাস, উপলব্ধি, ও দর্শনের প্রশ্নে সত্যের প্রতি অবিচল থাকাটাও বড় প্রেম। আদর্শের সাথে প্রণয়। যারা সফলকাম মানুষ, তাদের প্রতেকের জীবনে এমন গভীর প্রেমের কাহিনী ছত্রে ছত্রে আঁকা আছে।

১৫

সেরাত্রে বাইরে তুমুল বৃষ্টিটা শুরু হল রাত্রি নটা নাগাদ। পড়তে পড়তেই রাস্তা ছাপিয়ে ড্রেনের জল নিচে ঘরের পাদানিতে এসে পৌছালো। আস্তে আস্তে সে উঁচু হতে লাগল। প্রমাদ গুনলাম, রাজাবাজারে ফিরতেই হবে, এখানে রাত কাটানো নিরাপদ নয়, বৃষ্টি বাড়লে জল নিশ্চিত ঘরে ঢুকবে। এ জল সবটাই ড্রেনের জল। ভাবতেই গাটা ঘিন ঘিন করে উঠল। স্যার উপরে গেলেন, পড়া শেষ। আত্রেয়ী বাড়ির পানে ফিরতে উদ্যত হয়েও একটু থমকে বলল-

  • বাড়িতে একটা ফোন করে জানিয়ে দিবি
  • ফোন! আমি!
  • কেন বাড়িতে ফোন নেই?
  • হ্যাঁ তা অবশ্য আছে, সেটা দেশের বাড়িতে

গত ১৫ বছর ধরেই বড়িতে টেলিফোন আছে। কালো ডায়ালের রিসিভারটা বদলে গেল বছরেই বিটেল কোম্পানির সবুজ রঙের বাহারি একটা নতুন বোতাম সুইচ ওয়ালা ফোন এসেছে ঘরে। কিন্তু এঘরে তো কোনো ফোন নেই। লক্ষ্য করলাম আত্রেয়ীর হাতে কালো মত একটা যন্ত্র। যেটা বাড়ির টেলিফোনের  কানে ধরে কথা বলি শুধু সেইটুকুই। ওতেই আবার নাম্বারের বোতাম। বিঘৎখানেক দেশলাই কাঠির মত সরু রেডিওর মত এন্টেনাও চিকচিক করে আলোতে। বুঝলাম এটাই তাহলে সেই মোবাইল টেলিফোন। যদিও আমার আরো আগেই বোঝা উচিৎ ছিল, শুরুর দিনেই সে তার মায়ের সাথে কথা বলছিল। আসলে রুপের সম্মোহনে বাকি সব বিচারবুদ্ধি তখন লোপ পেয়েছিল।

  • তুই চৌরঙ্গী এলাকাতেই তো থাকিস! সমর্পণ বলছিল।

এটা দুর্দান্ত আশাজনক ও চরম নিরাশাজনক কথা ছিল আমার জন্য। আশাজনক এই জন্য যে সে আমার সম্বন্ধে খোঁজখবর রাখে। নিরাশাজনক এই জন্য যে সমর্পণের সাথে সম্পর্ক এখনও অটুট। আমি আমতা আমতা করে বললাম-

  • ইয়ে মানে, না, মানে । আমি তো উত্তরে থাকি।
  • তাহলে তো ভালই হল। তোকে আর ভিজে ফিরতে হচ্ছেনা। আমি নামিয়ে দেব, যদ্দুর গাড়ি যাবে তোর বাড়ি পর্যন্ত।

প্রমাদ গুনলাম, কিন্তু আরো কিছুক্ষণ সঙ্গসুধার লোভে মুখ ফসকে বেড়িয়ে এলো-

  • আচ্ছ, তাই হোক তবে

রাস্তায় আসতে আসতে গাড়িতে কিছুটা স্বগতোক্তির মত করে একাই কথা বলতে শুরু করল।

  • আরে আমি তো রাত্রে একা পড়তেই আসতেই চাইছিলামনা। রাত্রে একাকি মেয়েকে ছাড়তে মা রাজি ছিলেননা। তখন স্যারই বলেছিল তোর কথা, যে ও খুবই শান্ত ভদ্র। তাই একটা সমবয়সী সাথী থাকাতেই রাত্রের ব্যাচে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কদিন একটু ভয়ে ভয়েই ছিলাম। এখন এক্কেবারে বিন্দাস। বলা ভাল তোর ভরসাতেই এখানে আসা, আর স্যারের মত এমন একজন ‘ডেসপ্যারেট পিডাগ্যাগ’কে এভাবে একা পাওয়া; জাষ্ট অসাম।

বলেই উত্তেজনাতে আমার ডানহাতটা মুঠো করে চেপে ধরল। ও বসেছে ড্রাইভারের পিছনটাতে, সামনের সীটে সেই হোস্টেস দিদি, ওনার পছনে আত্রেয়ীর বামপাশে আমি। সেভাবেই আরো কতশত কিছু বলেই চলল। শুনলাম ও আমাকে তুই বলে সম্বোধন করছে। পিডাগ্যাগ শব্দের মানে জানিনা। আর এতদিন পর্যন্ত যে মেয়েটিকে চিনেছিলাম, সেটা ছিল বাইরের পৃথিবীর জন্য মোটা খোলস। আসলে সে আমাদের আশাপেশের আর পাঁচটা মেয়ের মতই খুব মাটির কাছাকাছি। আকর্ষনটা আরো তীব্রতর হয়ে উঠল। সে তখনও ধরেছিল আমার হাতখানা, কিন্তু অনুভব করলাম আমার বুকের ভিতরে যেটা ধুকপুক করে সেটা শিরা উপশিরা বেয়ে ঐ হাতের মাঝে এসে তিড়িংবিড়িং করে ঝাঁপাচ্ছে। চাইছিলাম, এই রাতের যেন কখনো শেষ না আসে, আমাদের গন্তব্য বলে কিছু আসলে ছিলইনা। এভাবেই অনন্তকাল ধরে আমরা চলতে থাকব BT রোড ধরে।

  • কিরে, সিঁথির মোড়ে এসে গেছি। এবারে কোনদিকে, দমদম না ডানলপ।

চকিতে আমার হুঁশ ফিরল। বললাম-

  • আরেহ যাহ, আমি তো রাজাবাজার নামব। আসলে গাড়িতে চড়ে আসা অভ্যেস নেই তো। তার উপরে বৃষ্টির ছাটে কাঁচ অস্পষ্ট, দেখতে পাইনি। আমি চলে যাব অসুবিধা হবেনা।
  • স্যার যে তোকে জাম্বুবান বলে ডকে, সেটা নেহাৎ খারাপ কিছু বলেনা। ভুল হয়েছে তো হয়েছে। আমিও বকরবকর করে যাচ্ছি সেই থেকে। শোভাবাজার যাব। মোটেই ভেজা হবেনা, আর নিতান্তই যদি ভিজতে হয় তাহলে চ, দুজনেই ভিজি।

বুঝলাম আমার উপস্থিতি ওকে কোথাও একটা তৃপ্তি দিয়েছে। আমার মত মেনিমার্কা ছেলের সাথও উপভোগ করছে চুটিয়ে। আমার হাতটা কিন্তু তখনও ওর মুষ্ঠিবদ্ধ। আমি মোটেই সেই বন্ধন থেকে মুক্ত হতে চাইছিলামনা বলে সম্ভবত ওর পক্ষ থেকেও কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছিলনা।

ফাঁকা রাস্তায় হুস করে রাজাবাজারে পৌঁছে গেলাম। এবার এহাত ছাড়াতেই হল, আমি APC রোডের উপরেই নেমে যেতে চাইছিলাম। আসলে আমার আস্তানাটা কি অদৌ দেখাতে দেবার বা কাউকে নিয়ে আবার মত স্থান! কিন্তু সে আমার চেয়েও বেশি একরোখা। আমাকে আমার বাড়ির দরজা পর্যন্ত দিয়ে যাবেই যাবে। খানিক দূর দূর এসে অখনই নেমে যেতে উদ্যত হই, ঠিক তখনই গাড়ির অন্ধকারের মধ্যেও চোখ বড় বড় করছিল সম্ভবত। অগত্যা গোরস্থানের সামনে এসে দাঁড়াতে চোখে যারপরনাই একটা বিস্ময় রেখে স্থাণুবৎ দাঁড়িয়ে রইল। আমি সেই হলুদ ভেপারের রাস্তা দিয়ে এসে ঘরে ঢুকে যাবার পরও দেখি তখনও গেটের বাইরে গাড়িটি দাঁড়িয়ে। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে আবার স্থানটা অন্ধকার ও নিস্তব্ধতাতে গ্রাস করলে বুঝলাম সে চলে গেছে।

আজ আমার ভীষণ ভয় হল। না সেটা কোনো প্রেতাত্মা বা জ্বীন ভুতের নয়। একটা ফুল ফোটার আগেই শুকিয়ে যাবার ভয়। সম্ভাবনার মৃত্যু, আমাকে সারারাত তাড়া করে বেড়ালো। ভোররাতে আবার ভীষন জ্বর আসল। সকালবেলা সাধন একটু ওষুধপথ্যের ব্যবস্থা করেদিল। একটু বেলা হতে ফুকরার মালিক মেটেবাবু একপ্রকার জবরদস্তি করে আমাকে শেয়ালদা থেকে গ্রামের ট্রেনে তুলে দিল।

প্রায় ৯ মাস পর বাড়ি ফিরতে মায়ের সে আর আনন্দের সীমা নেই। সেদিনিই জ্বর তেপান্তরের সীমা টপকে পালিয়েছিল মায়ের শুশ্রূষাতে। কিন্তু মনে তখন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। কেন আমি অন্য কোথাও নেমে কোনো একটা সরু গলির মুখে  একটা বাড়ির দরজার আড়ালে লুকিয়ে পরিনি। তাহলে  আর আজকের এই দিনটা দেখতে হতনা। পরক্ষনেই মনকে সান্ত্বনা দিলাম- আর যাই হোক আমি প্রবঞ্চনা করিনি তার সাথে। সেটা সত্য সেটাই ঘটেছে। তবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম যে এবার আমি ব্যাবসাই করব মন দিয়ে। মফঃস্বলের সেই কলেজ থেকে পাশকোর্সে সায়েন্স নিয়ে ভর্তি হয়ে যাব। এদিকে মা নাছোড়বান্দা, বোনকে নিয়ে যেতে হবে ঐ কোচিং এ ভর্তি করতে হবে। বাবা হেব্বি খুশি, ডাক্তার না হতে পারার দরুন মা মনে মনে একটু কষ্ট পেলেও , ছেলে ঘরে ফেরার আনন্দে আহ্লাদে সে কষ্ট মশা কামরানোর মত কষ্ট ছিল।

১৬

কটাদিন চুটিয়ে এদিক সেদিক পুরাতন বন্ধুদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করলাম, বাড়িতে গত ৩০ বছর ধরে একটা এম্বাসেডর আর একটা মহেন্দ্র কমান্ডো জিপ ছিল। বাবা M-80, এক কাকা ভেস্পা স্কুটার, আরেক কাকা ইয়াম্মা RX-100 চালাতো। দাদু গাড়ি পছন্দ করতেননা। ঘোড়ায় টানা এক্কা বা জুড়ি গাড়িই ছিল ওনার পছন্দ। সকালে ভেস্পা, দুপুরে জিম নিয়ে হল্লা, তো বিকালে খেলতে যাওয়া ইয়াম্মা চড়ে।

গতমাসেই এখানে বিদ্যুৎ এসেছে, ঘরের শিলিং জুড়ে লাল-কালো পেঁচানো নরম তার। নেলকো কোম্পানির শাটার ওয়ালা টিভিটা এখন সারাদিন চলছে। ব্যাটারি শেষ হয়ে যাবার ভয় নেই, সেটা মজুদই আছে। ঠুংরি, গজল, ডিডি ন্যাশানাল, ডিডি বাংলা এমনকি বাঁশের ডগায় বাঁধা এলিমিনিয়ামের এন্টেনা ঘুরিয়ে দিয়ে বুস্টারের কান মোলা দিলে বাংলাদেশের দু-একখানা চ্যানেলও আসত।

সেদিন শুক্রবার, সন্ধ্যায় ব্যাটাছেলের মত করে পোষাক পরা ও ছেলেদের মত করেই ছাঁটা চুলের একটি মেয়ে কি সুন্দর গান গাইছে। সুরটা ভীষণ মনে ধরল, নাম দেখালো ফাল্গুনী পাঠক। মা ডিমমুড়ি করে দিয়েছে, সেটাই চেবাচ্ছি। সারাক্ষণ ফোন বেজেই চলেছে। তখন কি হত, গোটা এলাকার যাদের যত ফোন সব আমাদের নাম্বারেই আসত। আমাদের নিচে ঘরের সামনেই একটা হাতুড়ে ডাক্তারের চেম্বার ছিল, সেখানে রোগী কম ফোনের প্রত্যাশী মানুষ বেশি থাকতেন।

বিরক্ত হয়ে ফোনটা তুলে হ্যালোর বদলে মুখ থেকে বেড় হল- ক্যারে। ভীষণ কর্কশ একটা যান্ত্রিক আওয়াজে কেউ কারো কথা শুনতে না পেয়ে রেখে দিলাম। এভাবে আরো বার পাঁচেকের পর আবার সেই ব্রজ্রাঘাত। ‘তুই কি মানুষ না জানোয়ার। জ্বর হয়েছে মানলাম, বাড়ি গেছিস তাও মানলাম। তাবলে আমাকে একটা খবর দিবিনা। কত কষ্ট করে স্যারের কাছ থেকে সেন্টারের রেকর্ড বুক ঘ্যাঁটে ফোন নাম্বার যোগাড় করেছি। যখনই ফোন করি একজন মহিলা বা একটি বাচ্চা মেয়ে ফোন তোলে। বাড়িতেও কি মন টেকেনা জাম্বুবান? কালকে রাত্রে যেন কোচিং এ দেখি, নতুবা আমিই তোর বাড়িতে আসব।

একে মা মনশা তার উপরে ধুনোর গন্ধ। প্রেম হোক বা বন্ধুত্ব বা নেহাতই রাত্রের ব্যাচে আরেকটা প্রানীর উপস্থিতি- কিন্তু এটুকু বুঝলাম আমাকে আত্রেয়ীর ভীষণ প্রয়োজন। এও বুঝলাম এবারে বাবা যেহারে খুশি হয়ে আছে, ফের কোলকাতা পালালে ত্যাজ্যপুত্র হওয়াটা সময়ের অপেক্ষা। তাও মাকে বললাম, তোমার মেয়েকে কোচিং এ ভর্তি করবে তো? কাল আমি যাচ্ছি, সব সেট করেই ফিরব। থাবামুঠো যেটুকু টাকা পেলাম, মায়ের কাছ থেকে একপ্রকারের রাহাজানি করে, বাবা ঘুম থেকে উঠার আগেই আমি পগারপার।

সন্ধ্যার সময় স্যারের বাড়ির গলির ভিতরটাতে একটা দোকানে চা খাচ্ছিলাম, প্রথমেই সজোরে একটা আঘাত অনুভব করলাম পাছাতে, হাতের চায়ের ভাড়টা ছিটকে পরে গিয়ে পিছন ফিরতেই ঘাড়ের কাছে ফোঁসফোঁস করে গরম নিঃশ্বাস। প্রকাশ্য রাস্তার মাঝে, দুহাত দিয়ে আমাকে জাপটে ধরেছে আত্রেয়ী। সমর্পণের সাথে এমন আলিঙ্গন দেখেছিলাম, লম্বা আমারই সমান প্রায়, এক আধা ইঞ্চির ফারাক। আমি বুঝে উঠতে পারছিলামনা আমার কি করা উচিৎ, পালটা ওকে জাপটে ধরা নাকি ন্যালাক্ষাপার মত দাঁড়িয়ে থাকা। এটা বুঝছিলাম আমি আর তাকিয়ে থাকতে পারছিলামনা, ওর শরীরের সুগন্ধ, উষ্ণতা ও নিবিড়ভাবে এই ছোঁয়ার গুণে আমি অবস হয়ে গেছি।

গাড়িটা রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে লোকজনের স্বাভাবিক যাতায়াতের পথে বাঁধা সৃষ্টি করছিল। গাড়ির ভিতর থেকে বয়স্কা এক মহিলা হাঁক দিলেন- এই রিয়া, সেন্টারে গিয়ে বন্ধুর সাথে গল্প করবে। কানের পাশে গরম নিঃশ্বাস ফিসফিসিয়ে বলে উঠল- আমার মা।    

১৭

 আমার একটু বেশিই যেন অদ্ভুত লাগছিল। যে খুশিটা আমার প্রকাশ করা উচিৎ ছিল, সেটা এর কাছে কেন দেখছি? স্যারের নানা প্রশ্নবাণ সামলিয়ে সেরাত্রের কোচিং শেষ করে এবারে ফেরার পালা। কিন্তু এ মেয়ে আমাকে ঐ গোরস্থানে ফিরতে দেবেনা। একপ্রকার ওর মায়ের অনুরোধে সে রাত্রে ওদের গাড়িতে চড়ে বসলাম। পৃথিবীর সকল মায়েরাই বোধহয় একই রকমের মমতাময়ী হন। সামান্য কটা দিনের পরিচয় আর স্যারের পক্ষ থেকে একটা সার্টিফিকেট। এর ভরষাতে একটা প্রায় অচেনা অজানাকে ঘরে আশ্রয় দিতে যাচ্ছেন।

অন্ধকারে ঠিক ঠাওর করতে পারিনি যে কোনদিকে যাচ্ছি। গাড়িটা একটা পেল্লায় থামওয়ালা  বাড়ান্দায় এসে থামল। গাড়ি থেকে নেমে খানিকটা বিহ্বল হয়ে হয়ত সেই বালিগঞ্জের বাড়িটার সাথে মেলাতে চেষ্টা করছিলাম। ব্যাপারটা আত্রেয়ী বুঝতে পারল। সে বলল- আরে এটা আমার দাদুর বাড়ি। ওর মা মুচকি হেসে বলল চলো চলো ভিতরে চলো। এবং সেই ঢোকা থেকে আগামী কয়েক মাসের জন্য ওটাই ছিল আমার রাজকীয় আস্তানা। সেরাত্রে আমাকে একটা বেশ বড় সাইজের কার্পেট বিছানো ঘরে শুতে দিয়েছিল। অনেকদিন বন্ধ থাকার পর যে পরিষ্কার করেছে সেটা বিছানার গন্ধ শুঁকে বোঝা যাচ্ছে।

শোভাবাজার হাটখোলা পোষ্ট অফিসের ঠিক পিছনে, নন্দলাল সেন স্ট্রিটের উপরে একটা দোতলা সাবেকি আমলের বাড়ি। পরে যেটা জেনেছিলাম- এক সিন্ধি ব্যবসায়ীর থেকে আত্রেয়ীর মা, মানে আন্টির দাদু এ বাড়ি কিনেছিলেন। আন্টি ছিলেন ওনার পিতার একমাত্র সন্তান, পিতা-মাতা দুজনেই গত হয়েছেন। এ বাড়ির মালিকানা স্বাভাবিক ভাবেই আন্টির উপরে বর্তেছে। মানুষ জন না থাকলে যতটা শ্রীহীন হওয়া সম্ভব এ বাড়িও তার ব্যাতিক্রম ছিলনা। সাবেকি আমলের কড়িবর্গার দোতলা বাড়ির পোর্টিকো দিয়ে ভিতরে ঢুকেই একটা ফাঁকা জাইগা। চারিদিকে খান ছয়েক ঘর, মাঝখান দিয়ে সিঁড়ি উপরে দোতলাতে উঠে গেছে। দোতলাতেও ওই খান চারেক পেল্লাই ঘর। সে ঘরগুলোর সামনে অংশটা নিচের ফাঁকা স্থানটির দিকে ফুট ছয়েক অতিরিক্ত বাড়ানো ক্যান্টিলিভার রেলিং ঘেরা বারান্দা। উপরের দোতলার ছাদ থেকে একটা ভাঙ্গাচোরা ঝুলে ভর্তি ঝাড়লন্ঠন এর সুরম্য অতীতের গল্প শোনায়।  

নিচেটা ধুলোতে ঢাকা অপরিষ্কার হলেও, উপরের ঘর চারটেতে মেঝেতে পুরু গালিচা পাতা। পরে আত্রেয়ী বলেছিল, এটা ওর বাবা তার বন্ধুদের নিয়ে এখানে পার্টি-ফার্টি দিতেন। সামনে একটা ছোট দারোয়ানের ঘর। বাড়ির পিছনে সারভেন্ট কোয়ার্টার।

পরদিন সকালে ব্রেকফার্ষ্টের টেবিলে আমাদের দুজনকে বিদায় জানিয়ে ডিউটিতে যাবার আগে আন্টি আমাকে উদ্দেশ্য করে জানিয়ে গেলেন, এই বাড়িতে নিঃসঙ্কোচে থাকতে। মাঝে মাঝে তিনি আসবেন, আর রিয়া তো আছেই। এটাও বোঝাতে চেষ্টা করলেন- উনি আসলে চেয়ে ছিলেন আমাকে বালিগঞ্জের বাড়িতেই রাখতে, কিন্তু ওটা একটু দূর হবে। তার চেয়ে এটা অনেক বেশি কাছে। এখানে যেহেতু কেউ থাকেনা তাই তুমি একটু হাতপা ছাড়িয়ে থাকতে পারবে। এটাও উনি আমাকে মনে করিয়ে দিয়ে গেলেন।

একজন রান্নার দিদি খাবার পরিবেশন করছিলেন। স্নান করে আমরা দুজনেই কলেজ যাব। আমি রাত্রে ফিরব এটা স্থির হয়েই আছে, কিন্তু এ ফিরবে কিনা জানিনা। ওর মায়ের কথায় একটা ধন্দ লেগেছিল, যে –‘রিয়া তো আছেই’। আজকের আগে আমি কখনো আত্রেয়ীকে সম্বোধন করিনি। সুযোগ বা প্রয়োজন কোনোটাই আসেনি। তাই তুই, তুমি না আপনি বলে ডাকব বুঝে উঠতে না পেরে বললাম- আপনিও এখানে থাকবেন? সে একটা ডিমসিদ্ধ সবে মুখে ভরে চেবাতে শুরু করেছিল, তীব্র একটা হাসির চোটে লালা মিশ্রিত ডিমের কুসুমে আমার মুখমণ্ডলে মোজায়েক নক্সা তৈরি করল। হাসি থামলে ইয়াব্বড় একটা জিভ ভেঙচে নিজেই একটা ছোট তোয়ালে মত এনে মুখটা যখন মুছিয়ে দিতে লাগল, মন চাইছিল মুখে আলকাতরা মেখে এসে এভাবে যেন আজীবন বসে থাকি।

ওর শরীরের ফেরোমন আমাকে এমনিতেই মাতাল করে তুলত, এবারে চেয়ারে উপবিষ্ট আমাকে কুঁজো হয়ে যখনও মুখটা মুছছিল, দুটো নাকের মাঝের দুরত্ব কমে মাত্র কয়েক ইঞ্চিতে এসে ঠেকেছে। সে অনর্গল কথা বলেই চলেছিল, কম্পিত লাল ঠোঁটের খাঁজকাটা কুহকতা আমাকে অথর্ব করে দিচ্ছিল। গোটা জীবনে ওষ্ঠাধারকে এই রূপে কখনো আবিষ্কার করিনি এর আগে। গোলাপের কুঁড়ি বোধহয় এমন অধরের ছোঁয়াচ পেলে তবেই সে পাপড়ি মেলে ধরে।

তুই আসলেই একটা জম্বুবান। তবে তোকে আমি কিউট একটা নিক নামে ডাকব। জুমু। আমাকেও আপনি বলবি হতভাগা? -সে বলল। আমি বললাম- তো কি, জুমুর সাথে মিলিয়ে আমিও কি চুমু বলে ডাকব। আবার সেই প্রাণখোলা হাসি হেসে বলল এই তো খোকার বোল ফুটেছে। আমাকেও তুই করেই ডাকবি। আর হ্যাঁ, আমি বালিগঞ্জেই ফিরব। মাঝে মধ্যে কলেজ থেকে এখানে আসব, তোর অসুবিধা হবেনা। কাজের মাসির বাড়ি বসিরহাট। ওনারা আউট হাউজে সপরিবারে থাকেন, ওনার স্বামী কোথায় একটা কাজকম্ম করেন। ছেলেপুলেরা এক্কেবারে কচি নয়, ফাইভ সিক্সে পড়ে। উনি আর ওনার এক বিধবা দিদি এ বাড়ির রক্ষনাবেক্ষন করেন, ফ্রিতে কোলকাতায় থাকা সাথে বেতনও মেলে। নিশ্চিন্তে থাক। আর হ্যাঁ, আজ সন্ধ্যায় একটু বেড়োবো, রেডি হয়ে থাকিস। বুঝলাম এই পরিবারটিরও হাল আমারই মত, সেই আশ্রয়ের খোঁজ।

১৮

কয়েকঘন্টাতেই জাইগাটা ও পরিস্থিতি অনেকটা আয়ত্তের মাঝে চলে এলো মগজে। ব্রেকফার্ষ্ট করে সে একটা ঢোলা প্রিন্টেড টি-সার্ট ও টাইট ট্রাউজারের সাথে হিলতোলা জুতো পরে হিপি সেজে বেড়িয়ে গেল, ঢাউস রোদ চশমা সহ। ৯টা থেকে সাড়ে দশটা পর্যন্ত কম্পিউটার কোর্স আছে, তারপর কলেজ করে সম্ভবত বালিগঞ্জ হয়ে আবার সন্ধ্যায় এখানে ফিরবে। আমার সেই এগারটাতে ক্লাস, আধা ঘন্টার হাঁটা পথ। সাড়ে ১০টার সময় বেরোলেই হবে। একটু হাঁটতে বেরোলাম, আশপাশটা দেখার জন্য। মিনিট খানেকের হাটাপথের মধ্যেই পেলাম কুমোরটুলি পার্কের খোঁজ। বুঝলাম এর আশেপাশের বাংলার প্রতিমাশিল্পের ধাত্রীগৃহ। আরো কিছুক্ষণ হাঁটতেই টিনের ছাউনি দেওয়া বাঁশের বেড়ার ঘরে অসংখ্য শিল্পীরা তাদের প্রতিমা গড়তে ব্যাস্ত।

মনে মনে নিজেকে ভাগ্যবান মনে হল, আমার প্রতিমা স্বয়ং ঈশ্বর তৈরি করেই আমার কাছে প্রেরণ করেছেন। পরক্ষণেই মনে হল- ছিঃ, এসব কি ভাবছি, এরা বড়লোক, তারচেয়েও অনেক বড় মনের মানুষ। একটা দৃশ্যত অসহায় ছেলের জন্য একটু সাহায্য করছেন মাত্র। আর আত্রেয়ী এমনিতেই বন্ধুবৎসল, সমর্পনকেও সে জড়িয়েই ধরেছিল। ওভাবে কি বাড়িতে, মা, বোন, পিসি, কেউ কি মুখ মোছায়নি! কাঁদলে কি কেউ বুকে টেনে নিতনা! আমরা কি বন্ধুদের সাথে গলায় মিলিনা! এটা কোলকাতা আরো আধুনিক। তাই ছেলে মেয়েতেও কোলাকুলি এক্কেবারের সাধারণ ঘটনা। আমি মিছিমিছি কল্পনার পায়েসে কেজি কেজি খোয়া ক্ষীর ঢেলে যাচ্ছি।

আর ঘুরতে ভালো লাগলনা। বাড়িতে ফিরে স্নান সেরে নিলাম। এদের বাথরুমে স্নানের যাবতীয় প্রসাধনই মজুদ ছিল। নরম তোয়ালেতে শরীরটা মুছে, ঘরে এসে আবার চিত হয়ে শুয়ে হাবিজাবি ভাবতে লাগলাম। খাটটা অনেক পুরাতন, মেহগনি কাঠের তৈরি। নারকেল ছোবড়ার জাজিমের উপরে শিমুল তুলোর গদি। ঘরে একটা কবাড বা ওয়ার্ডরোব, যার নিচের তাকে পাশবালিশ, লেপ কম্পল সবই ধরে থাকে এমন বড়। একটা পড়ার টেবিল ও চেয়ার। এক কোনে কপাটওয়ালা দেওয়াল আলমারির পশে একটা আলনা। একটা বড় ডিম্বাকৃতি আয়না সমৃদ্ধ ড্রেসিং টেবিল। সবকিছুর রঙই হাকুচ কালো। নতুন বস্তু বলতে শুধু বাথরুমের গরম জলের মেসিন আর ঘরের মিউজিক সিস্টেম। এতে ক্যাসেট ও সিডি উভয়ই চলে। বাড়িটা সম্ভবত আসবাব সমেত কিনেছিল। গেটের বাইরে মাধবীলতার ঝাড়ে ঢাকাপরা মার্বেল ফলকে চটে যাওয়া দেবনাগরী হরফে লেখা ছিল ‘স্বপ্নমহল’। ভাবছিলাম শতবছর পূর্বে কে কোন স্বপ্নের উদ্দেশ্যে এ বাড়ি তৈরি করেছিল, আর আজ কে সেগুলোর ভোগদখল করছে। জানালাতে মশা প্রতিরোধক নেট লাগানো। উপরে ফ্যানটা বেশ পুরাতন কিন্তু কি চমৎকার হাওয়া। ঘড়টির বিশেষত্ব হচ্ছে, উত্তর দেওয়ালে জানলাটা লম্বাচওড়াতে হাতখানেক, কিন্তু সেটা ছাদ থেকে ফুট তিনেক নিচ থেকে শুরু হয়ে মাথার ফুটখানেক আগে শেষ হয়ে গেছে। জানালাতে মোটা মোটা লোহার রড পোঁতা। এ যেন পুরাতন বাংলা সিনেমার শুটিঙের সাজানো সেট। উপরি পাওনা বলতে এ বাড়িতে একটা লাইব্রেরি আছে, আন্টির বাবা সরকারী আমলা ছিলেন, এ সব তাঁরই সংগ্রহ।

নিচেথেকে হাঁক এলো- দাদাবু ভাত দেই দিয়েচি। আমি একটা গেঞ্জি গায়ে গলিয়ে ভাত খেয়ে এলাম। আমার দেশের বাড়িতে পড়শি ছোটকা কাকাদের বাড়িতে গেলে ঠাকমা এমনই স্বাদের রান্না করতেন। উনি পূর্ববঙ্গ থেকে এসেছিলেন, স্বাদটা মিলে যেতে একটা অন্য সুখ পেলাম। টানা কতগুলো মাস হোটেলে খেয়ে মুখ মরে গেছিল। দুদিন আগে বাড়িতে মায়ের হাতের রান্না, এবার বাসন্তি মাসির হাতের রান্না। জীবনে সুসময় এলো বলে মনে হল।

বেশ কয়েকদিন পর কলেজে গিয়ে দেখলাম অনেকটা পড়া এগিয়ে গেছে। মনটা ফুরফুরে ছিল, তাই প্রদীপের থেকে ক্লাসনোটস টুকে নিতে বিন্দুমাত্র বিরক্তি লাগলনা। সন্ধায় আমি রেডি হয়েই ছিলাম। দেখলাম আমি অতি দ্রুত উত্তেজনাকেও বসে এনে ফেলেছি। একটা দুধসাদা আলাদা গাড়ি এনেছে, এটা লম্বা মতন অনেকটা, কোম্পানি ফিয়াট। গাড়িতে চড়তেই সে বলল, বাবা দিল্লি গেছেন এক কনফারেন্সে তাই ওনার গাড়িটি নিয়ে এসেছে আজ। এই গাড়িটার ভিতর শীততাপ নিয়ন্ত্রিত। আমাদের বাড়ির এম্বাসেডর বা আত্রেয়ীর নীলচে স্যান্ট্রোতে এসি ছিলনা। শুধালাম আমাদের গন্তব্য কদ্দুর। সে বলল বাবার হাসপাতাল, তোর কিডনি খুলে বেচে দেব। কিছু বললামনা দেখে শুধালো- আবার কি ওই আপনি আজ্ঞের কেস নাকি! এক কাজ কর তুই লাগাতার খানিক আমাকে তুই তোকারি কর দেখবি সাবলীল হয়ে গেছিল। নরম জাইগাটা ধরে ফেলেছে।

আমিও বুঝে গেছি, বললাম -না না, তেমন কিছু নয় রে। কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস! সে বলল- গুড স্টার্ট, কিপ ইট আপ। অফিসটাইমের ভিড় ঢেলে যে এলাকাটাতে আমি পৌছালাম এ আমার পূর্বপরিচিত স্থান, নিউমার্কেট এলাকা। এতবার লাইটহাউসে সিনেমা দেখে গেছি কিন্তু ঠিক তার উল্টোদিকের ফুটপাতে অমন ঝাঁ চকচকে একটা শপিং মলও ছিল, তার খোঁজ ছিলনা আমাদের কাছে। শ্রীরাম অর্কেড, এখানেই প্রথববারের জন্য ক্যাপসুল লিফটে চড়ে তেতলাতে উঠে এলাম। বুঝলাম এই হচ্ছে সব অত্যাধুনিক পাশ্চাত্য সভত্যার পোষাকাশাকের অন্যতম বিপণি। হয়ত কিছু কেনাকাটা করবে। আজকাল আমার পছন্দের লিষ্টে কুমার শানুর গান প্রচুর যোগ হতে লাগল, বাংলাতে মান্না দে। সেটা কিছুটা বুঝে ফেরার পথে মিউজিক ওয়ার্লড থেকে কয়েকটা নতুন গানের ক্যাসেট-ডিস্কও কেনা হল।

১৯

‘নে পছন্দ কর দেখি’- বলে কিছু জিন্স প্যান্ট এর দোকানে আমাকে এনে দাঁড় করালো। এর আগে মায়ের জন্য শাড়ি, বোনের জন্য ফ্রক কেনার অভিজ্ঞতা ছিল। জিন্স কখনো কিনিনি, আমাকে কখনো জিন্স কিনে দেয়নি মা, নিজেরও পরতে মন যায়নি। আসলে ইচ্ছা তৈরিই হয় সামনের কাওকে দেখে। আমি বললাম , আমি কি আর পছন্দ করতে পারি, যে পরবে এটা তার উপরেই ছাড়া উচিৎ। কারন কে কি পোষাকে স্বচ্ছন্দ্য সেটা তো অন্যজনে জানবেনা। সে আকাশ থেকে পরার মত অভিব্যাক্তি এনে কপাল কুঁচকে বলল, সেটাই তো বলছি। তোর পোষাক তোকেই দেখেশুনে নেওয়া উচিৎ। এবারে আমার পালা ছিল আকাশ থেকে পরার।

অনেক টালবাহানার পর এগুলো ধার স্বরূপ নিচ্ছি শর্তে আমি রাজি হলাম। অবশ্য এর পর আড়াই বছর আমি কোনো পোষাক কিনিনি, কারন প্রতি মাসেই কোনো না কোনো ছুতোনাতায় সে নিজেই কাপড়জামাতে আমার ঘরের আলমারি বোঝাই করে ফেলেছিল। জীবনের প্রথম স্যুট, রেমন্ড কোম্পানির তৈরি। ওরই জন্মদিনের পার্টিতে পরার জন্য, সে এক আলাদা ইতিহাস। পোদ্দার কোর্টের বড় শোরুমে গিয়ে তার মাপ দেওয়া হয়েছিল।

এভাবে মাঝে মাঝেই একআধাদিন সন্ধ্যায় বাইরে বেড়োতাম। একদিন রেস্টুরেন্টে খেতে গেলাম, তো একদিন কফিসপে। প্রথমবারের জন্য ধর্মতলার অভিজাত সিনেমা হলে ‘কুছকুছ হোতা হ্যায়’ দেখতে গেলাম। পুরু গদিআঁটা চেয়ারে, গমগমে আওয়াজ। গ্রামের সিনেমাহল, বা লাইটহাউজের টঙের সাথে এর কোনো তুলনায় চলেনা। সে আমাকে জুমু বলেই ডাকত, আমার লজ্জা ভাবটা কেটে যাওয়ার পর থেকে আমিও ওকে চুমু বলেই ডাকতাম, এমনভাবে যেন শৈশব থেকে এটাই ওর একমাত্র নাম। ওতেই আমরা ভীষণ ভাবে অভ্যস্ত হয়ে গেছিলাম।

আবার গভীর একটা উপলব্ধি হল- বড়লোক বাড়ির মেয়ে সে। বাবা-মাকে সেভাবে পাইনি জীবনে আমাদের মত। এক দাদা তার সাথে বয়সের ফারাক ১৪ বছরের। গোটা জীবনটাই হয়ত বন্দি ভাবে আয়া কাজের মাসিদের কাছে কেটেছে। বড় হয়ে বৈভব পেয়েছে, ওর সমাজে প্রায় সকলেই ওইরকমই আলালের ঘরের দুলাল। ওরা কখনই আমাদের মত প্রাণখোলা নিঃশ্বাসে বড় হয়নি। আশেপাশের বাচ্চারাও যেহেতু ওরই মত ছিল, তাই আমার কাছে একটু অন্যরকম জীবনধারার সন্ধান পেয়ে আমার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে উঠেছিল। তবে সম্পর্কটা শুধুই বন্ধুত্ব, এর বাইরে এক বিন্দুও অন্য কিছু ছিলনা এই পর্ব অবধি। ওর বাবা মা মেয়েকে চিনত, বা হয়ত ছেলেবেলা থেকে সময় দিইনি বলে তেমন তোয়াক্কা করতনা ওনাদের, তাই এই রকম মেলামেশাতে কখনো বাঁধা তো দেননিই। বরং ওর মা আমার  খোঁজখবর রাখতেন। আমার মনেরও সেই প্রাথমিক প্রেম প্রেম ভাবের ঘোরটা কেটে গিয়ে সলিলের একটা স্ত্রীরূপ হিসাবে ওকে আবিষ্কার করলাম। পারফেক্ট পার্টনার।

ওর বাবা-মায়ের মধ্যে প্রায়ই অশান্তি হত শুনতাম। আত্রেয়ীর কথাতে – বাবা মা দুজনেই একই প্রফেশনের। দুজনেই একে অন্যের চেয়ে বেশি প্রতিভাবান ও অভিজ্ঞ মনে করেন। দুজনেই ভাঙবেন তবু মচকাবেননা। তাদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা বন্ধু বৃত্ত রয়েছে, কিন্তু কেউই সামাজিক অনুষ্ঠানে একসাথে যাবেনননা। অদ্ভুত রকমের একটা দাম্পত্য নিয়মে তারা সংসার করেন। মাঝে মাঝেই তর্কবিতর্ক ঝগড়াতে পৌঁছে যায়। চলে অশ্রাব্য গালিগালাজও। উপলব্ধি হল-, অশান্তির সময় গালিগালাজটা আমাদের গ্রামের অশিক্ষিত দেহাতি মানুষগুলোর একচেটিয়া সম্পত্তি নয়, শহরের হাই সোসাইটিতেও উন্নত খিস্তির যথেষ্ট চাষ রয়েছে। যেদিন ঝগড়া হত, সেদিন তো বটেই, কখনো কখনো ২-৩ দিন পর্যন্ত কেউ মেয়ের খোঁজ নিতনা। তারা অন্য বাড়িতে বা বন্ধুদের বাড়িতে থাকতেন। আত্রেয়ী একা ন্যানির কাছে থাকত, তবে মা ফোনে খোঁজ খবর নিত। বুঝলাম হয়ত এই কারনেই আমাকে বালিগঞ্জে না নিয়ে গিয়ে এই শোভাবাজারে রেখেছে।

সেদিন সন্ধ্যাতে পড়া ছিল, আমি গেলেও আত্রেয়ী এলোনা। আমি স্বাভাবিক রুটিনে ডিনার করে লাইব্রেরি থেকে একটা অনুবাদিত রুশি এডভেঞ্চার বই পড়ছিলাম খাটে উবু হয়ে। আমার একটা বাজে স্বভাব আজও আছে, খালি গায়ে জাঙ্গিয়া পরে গামছা জড়িয়ে শুয়ে থাকা। কেউ না থাকলে আমি আজও  ওভাবেই থাকি। হঠাৎ দরাম করে ভেজানো ভারি কাঠের দরজাটা সশব্দে খুলে গিয়ে চন্ডী রূপে আত্রেয়ী এসে সামনে দাঁড়ালো। পিছনে পিছনে সারভেন্ট কোয়াটারের বাচ্চা গুলো বাদে বাকি সকলেই বাইরের আধা অন্ধকারে এসে জড়ো হল। আত্রেয়ী এবারে ঝাঁঝিয়ে উঠে বলল- বললাম তো ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ো। এখানে কি নাইট শো’তে ফিল্ম দেখতে এসেছো। রাস্কেলের দল’। দেখলাম একজনও সেখান থেকে নড়লনা। বুঝলাম এমন ঘটনার পূর্ব অভিজ্ঞতা এদের সকলেরই আছে। এবারে সে ততোধিক রেগে গিয়ে আরো কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারলনা, মুখ দিয়ে শুধু একটা লম্বা নিঃস্বাস ফেলে বলল- মাসী ভাত দাও। রতনদা, এই নাও যাও। এই বলে একটা ১০০ টাকার কয়েকটা নোট দিল মাসীর স্বামী রতনদার হাতে। দেখালাম এবারে সকলেই সুড়সুড় করে চলে গেল। 

২০

কি হা করে দেখছিস? আজ প্রথম দেখলি? খাবি আমাকে? নে খা ইডিয়ট। কথাগুলো বলে বড় বড় চোখে আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে রইল পিটির বিশ্রাম স্টাইলে। বাসন্তি মাসির বিধবা দিদি গাড়ির চাবিটা ঘরে দিয়ে গেল, বুঝলা আত্রেয়ী নিজেই গাড়িটা চালিয়ে এসেছে। আমি বললাম- সে নাহয় আমাকে গরম দেখিয়ে শান্তি পেলে অবশ্যই বেশি বেশি দেখা, কিন্তু ব্যাপারটা কি! বাছা বাছা কয়েকটা কাঁচা খিস্তি মেরে বলল- ওরা আবার ক্যালাকেলি করেছে। নির্ঘাট ওরা টা যে ওর বাবা মা, সেটা না বললেও বুঝে যাওয়ার জন্য কোনো ক্রেডিট ছিলনা। চল ভাগ ও পাশে, আমাকে শুতে দে। আমি বুকের বালিসটা সরিয়ে উঠে বসতেই ধপ করে লাশের মত গদিতে শুয়ে পরল উবু হয়ে। আমি বললাম- ওঘরে গিয়ে পোষাক পালটে ভালকরে শুলে হয়না, ঘুমিয়ে গেলে দেখবি ভাল লাগবে দেখবি। পারলে প্রায় কামড়ে দেবে এমন ভাবে খেঁকিয়ে উঠে বলল- কেন আমি কি তোকে রেপ করব নাকি হারামি! এর সাথে চার অক্ষরের বোকা খিস্তির সম্বোধন। আমি কথা না বাড়িয়ে তড়িঘড়ি বই এর প্রতি মননিবেশ করলাম।

একটু পর রতনদা এসে বলল- দিদিমণি , সব রেডি।  চোখের উপর থেকে হাতটা সরিয়ে আমার প্রতি দৃষ্টি হেনে বলল- চ। এবারে সে খেয়াল করল আমি গামছা পরে। বলল- হস্তমৈথুন করছিলি নাকি! কাঁচি চালিয়ে দেব কোনোদিন। ওরে স্টুপিড গামছা কেন! এটা কোনো পোষাক হতে পারে? ওহ ভগবান, জোটেও আমার কপালে বিচিত্র একেকটা প্রোডাক্ট। আমি কথা না বাড়িয়ে গেঞ্জির বারমুডাটা পা বেয়ে গলিয়ে ওকে অনুসরণ করলাম। সিঁড়ি দিয়ে নিচে একটা হলঘরের মত জাইগার এক প্রান্তে মৃদু আলো জ্বলছে, কাছে যেতে দেখলাম মিনি একটা বার। রতনদা চলে গেলেন। টেবিলে গোটা দুয়েক বোতল, একটা হুইস্কি অন্যটা টাকিলা, ট্রে’তে বরফের টুকরো। একপাত্র কষা রান্না মাংস, চানাচুর ও আর কয়েকয়টা আপেল কুচি।

নে শুরু কর বলে আমাকে ইশারা করতে- আমি সিটিয়ে গেলাম। সে আমার প্রতীক্ষা না করেই গ্লাসে ঢেলে শুরু করে দিল। বললাম – আমি মদ খাইনা। এবারে সেই রিনরিনে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, তোকেনা গ্যাং রেপ করা উচিৎ। শালা মাল খাসনা এ কেমন স্পেসিমেন, হিজড়ে নাকি বে। অনেক জোড়াজুড়ির পরও আমাকে রাজি করাতে না পেরে, আবার সেই চার অক্ষরের বোকা সম্বোধন।  আমি ভরা পেটে একমনে চানাচুর চেবাতে লাগলাম। এ মেয়ে এক্কেবারে ট্রেইনড মাতাল, বাড়িতে নিশ্চই এ চল আছে। ধীরে ধীরে নেশা গাঢ় হলে গান, নাচ, সহ খিস্তিরও ফোয়ারা ছুটল। আমার এই প্রথমবারের জন্য একে বেশ ঘৃণা লাগল। ছিঃ, মেয়েমানুষ এইভাবে মদ খেয়ে মাতাল হবে? বেহেড নচ্ছার কোথাকার। রাত্রি একটা নাগাদ সে পুরোপুরি সংজ্ঞাহীন হয়ে কথাবার্তা বন্ধ করতেই দেখলাম, অন্ধকার ফুঁড়ে সেই কাজের মাসির দিদি এসে উপস্থিত হলেন। সাথে আরো জনা তিনের ধরাধরি করে কোনো একটা ঘরে তাকে শুইয়ে দিল। আমার বিরক্তি এমন পর্যায়ে উঠেছিল যে কোন ঘরে নিয়ে গেল সেই জানার ইচ্ছাটুকু ছিলনা।

রাত্রে শুয়ে অনেকক্ষন ভাবতে লাগলাম। এ যে মাতাল হয়, সেটা কষ্ট ভোলার একটা পন্থা মাত্র। ছোট থেকে ওকে কোনো আপনজন যদি কাছে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বোঝাতো, এতো সুন্দর একটা ফুটফুটে জীবন কি আর এমন বখে যেত! জীবনে টাকাটাই সব নয়, সকলেরই কিছুনা কিছুর অভাব আছে, তাই আমি একাই শুধু জীবনে দুঃখী মানুষ নই। এভাবেই কখন ঘুমিয়ে পরেছিলাম। একটা গুনগুন রবীন্দ্রসঙ্গীতের আওয়াজে চোখটা খুলে দেখি ঘরে আলোর বন্যা। পরনে প্রায় হাঁটু ছোঁয়া একটা সাদা রঙের কলার ও বোতাম ওয়ালা টিসার্ট। নিচে সর্টস পরে থাকলেও তা অদৃশ্য, দৃশ্যমান বলতে ওই মাছি পিছলে যাওয়া জিরাফের মত পা জোড়া। ভিজে চুলগুলো এলোমেলো করেই একটা প্লাস্টিকের ক্লিপ দিয়ে আঁটা। আমাকে চোখ খোলা দেখেই পাশে এসে বলল সরি। কাল রাত্রে একটু অসভ্যতামি করে ফেলেছি। কাল খুব আপসেট ছিলাম। আমি মৃদু হাসলাম। সে বলল চল আজ বাইরে গিয়ে কচুরি খাবো। আমি ফ্রেশ হতে চলে গেলাম। বললাম চুল গুলো খুলে দে-

আমি প্রাতঃকর্মাদি সেরে বাইরে যাবার জন্য তৈরি, আত্রেয়ী ঘরে ঢুকল। বাইরে মেঘ করেছে, সূর্য মেঘের আড়ালে। নাহ, বাইরে যাবনা। মাসী বলল ঘুগনি হবে আমি লুচি বানাতে বললাম, চ ছাদে যায়। একটু গল্প করি। বিনা বাক্যব্যায়ে ছাদে গেলাম, সেখান থেকে গঙ্গা দেখা যায়; অপূর্ব দৃশ্য। গার্ডওয়ালে কনুই রেখে গঙ্গার দিকে চেয়ে ছিলাম। সে শুধালো-

  • কাল একটু বেশিই অসভ্যতামি করে ফেলেছি নারে!
  • ঠিক আছে, ও এমন মাঝে মধ্যে হয়। কিন্তু-
  • কি কিন্তু
  • কিছু মনে না করলে বলব
  • বাব্বাহ, ন্যাকামু দেখে বাচিনা। আমি মেয়ে না তুই!
  • তুই মদ খাস কেন?
  • তুই বিড়ি খাস কেন?
  • নেশা করি
  • আমিও তাই
  • নিয়মিত খাস?
  • না, বালদুটো অশান্তি করলে তবে, আর উৎসবে
  • খাবিনা আর, ভাললাগলনা
  • এ, বেশি গার্জেনগিরি মারাসনা। এমনিতেই কাঞ্চনে অতিষ্ট

আমি আর কিছু বল্লামনা। খানিকক্ষণ পর, গুমোট পরিস্থিতি কাটাতে নিজেই একটা মান্না দের গান ধরলাম, এবং দু কলি গাইতে গাইতে নিচে ঘরে চলে এলাম।

২১

ঘরের জানালার রেলিং দিয়ে দেখলাম বাইরের বাগানে বাসন্তি মাসির ছেলেমেয়ে দুটি একটা শিউলি গাছের নিচে ফুল কুড়ানো খেলছে। হঠাৎ নাগপাশের মত দুটো সরু হাত পিছন থেকে আমাকে জড়িয়ে ধরল। কিছু বলতে যাওয়ার আগেই সে বলল- রাগ হয়েছে বুঝি! মদ না খেলে যে আমি মরে যাব, কে বাঁচাবে ওই অসভ্য দুটোর যন্ত্রণা থেকে? বললাম- আমি বা এই বাসন্তী মাসিরা কি বেঁচে নেই? আমাদের দুরবস্থা বা যন্ত্রণা কম? আমরা কে মদ খায়?

এবারে পিছন থেকে একটা গলা খাঁকারিতে হাতটা সে ছেড়ে দিল, মাসির দিদি ডাকতে এসেছেন, খাবার রেডি। সে বলল নিচে যাবনা একটা খবরের কাগজ বিছিয়ে এই ঘরেই যেন খাবার দিয়ে দেয়। খেতে খেতেই শুধালো-

  • তোর বাড়িতে আর কে কে আছে
  • মা, বাবা আর বোন
  • তুই ওই গোরস্থান কোত্থেকে জোগার করলি! চৌরঙ্গির মেস কি হল? তুই কি স্যারের নিচের ওই গুদামঘরে থাকতিস?
  • গোরস্থান খারাপ জাইগা? গোরস্থানে যাওয়ার জন্য কত লোক মরছে জানিস!
  • ওখানে যাওয়ার জন্য কেউ মরেনা, মরলে তবে কেউ শ্মশান বা গোরস্থানে যায়।

মৃদু ধমক দিয়ে সে কথাটা বলল। এবারে আবার শুধালো- বলবিনা! আমি মুখে একগ্রাস লুচি নিয়ে সংক্ষেপে ইতিহাসটা বর্ণনা করলাম। এবারে আমি শুধালাম, তোর হঠাৎ এতো দয়া গজালো কেন আমার প্রতি? চেনা নেই জানা নেই দুম করে ঘরে এনে তোলা, এই ভাবে গলায় গলায়! সত্যি বলছি আমার কিছু হজম হয়নি আজও।

একটু একটু গম্ভীর হয়ে গিয়ে বলল, ওই শুয়োরের বাচ্চাটার জন্য। বললাম কে! সে বলল চিনবিনা, ন্যাশানালে পড়ে। বড় তার দেমাক। আমি না শুধাতেও সে ফের বলল, কাঞ্চন গাঙ্গুলী। বাবার বন্ধুর ছেলে, বাবা এক প্রকার ঠিক করে রেখেছে ওর সাথেই আমার বিয়ে দেবে। সারাক্ষণ আমাকে ফলো করে, ওর গার্জেনগিরি জীবন অতিষ্ট করে দিয়েছে। গতমাসে আমার সাথে চরম ঝামেলা হয়েছে, তাও আমার সাথে ঘুরঘুর করে। আমি বললাম – তার মানে আমি গিনিপিগ! হাতের কাছে আমিই সহজলভ্য ছিলাম, আমার সাথে সম্পর্কের একটা ভান করে ওকে দেখানো। বাহঃ মিস চক্রবর্তী বাহ। আমি জানিইনা যে আমি একটা চরিত্রে ন্যাচারাল অভিনয় করে চলেছি। সাহায্যের ভান করা এই থিয়েটার কবে শেষ হবে তাহলে! আমাকেও সেই ভাবে আশ্রয় খুঁজতে হবে, আগে থেকে বললে হয়রানি হয়না। আমি আঁচাতে চলে গেলাম বেসিন পানে।

সেও উঠে পরল, বাথরুম থেকে এসে দেখি আন্টি এসেছেন। মেয়ের সাথে ঘরে কথা বলছেন, আমি আর ঘরপানে গেলামনা। বারান্দার গরাদ দিয়ে দেখি বাসন্তী মাসির ছেলেটি কিছু মুনিয়া পাখী পুষেছে, সেগুলোই দেখছিলাম। ঘর থেকে ডাক এলো। ঢুকতেই আন্টি বললেন, কোনো অসুবিধা নেই তো! আসলে কাল ওর বাবার সাথে একটু মনমালিন্য হয়েছে বলে পালিয়ে এসেছিল। দেখলাম মুখ হাঁ করে আত্রেয়ী ওর মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। আন্টি বলে চললেন- ও খুবিই আবেগী। আমাদের পরিবারে সবাই খুবই খোলা মনের। মাঝেসাঝে একটু ড্রিংস করে। তুমিও কররে পারো, তবে লিমিটে। ও ওর দাদাকেও জড়িয়ে ধরে, ওর বাবাকেও। আসলে বাচ্চা তো, আমাদের সকলের আদরের বলে একটু বেশিই প্রশ্রয় পায়। ওভাবে জড়িয়ে জাপটে ধরলে মনে কিছু কোরোনা কেমন। আজ রাত্রে আমিও এখানেই থাকব কেমন। এখন এলাম, চেম্বার আছে। তার মানে ওই জড়িয়ে ধরার খবর মানে পৌঁছে দিয়েছেন এ বাড়ির গোয়ান্দা দিদি।

মা চলে যেতেই বলল, কি ধারিবাজ মহিলা মাইরি। ঝগড়া করলে দুই ভালচার মিলে, আর বলে কিনা আমার সাথে মনমালিন্য। সন্দেহ করে সন্দেহ, এনাকে বুড়োটা সন্দেহ করে। আচ্ছা তুইই বল একটা ৬১ বছরের বুড়ি কার সাথে এই বয়সে লাইন মারবে! আমার চোখ কপালে উঠে যাবার দশা তখন। এ বলে কি! ৬১? আত্রেয়ী আমার মনের কিন্তুটা সম্ভবত বুঝতে পারল, বলল- রোগা পটকা বলে মনে হচ্ছেনা, চুলে কলপ মারে। আরে কমপ্লিট রাস্টিক মাল, নাহলে ৪২ বছর বয়সে কি ভাবে কাওকে জন্ম দেয় নিজে ডাক্তার হয়ে! আরো হাজার বিষোদ্গার করে চলল। আমি মন দিয়ে শুনে চললাম।

এবারে বলল- কি বুঝলি। বললাম- কি আর বুঝব! ৪২ বছর বয়সেও জন্ম দেওয়া কি সংবিধানে মানা!  দিয়েছেন বলেনা এমন সুন্দরী একজনকে কেউ বউ হিসাবে পাবে। ইয়ে সমর্পণের সাথে কি তোর সম্পর্ক কদ্দুর?  সুন্দরী? আমি ? বাব্বাহ। তা তোর যখন আমাকে সুন্দরী মনেই হচ্ছে, প্রেম করবি আমার সাথে! আমি বললাম – সকাল সকাল দু-ঢোক মেরে এলি নাকি! সে বলল- তুই কি ভাবিস, তোর মনোভাব আমি বুঝিনা! বলনা, আমাকে তোর পছন্দ! আর কি বললি! ওই বেয়ার্ডলেস ফুলটা, সারাক্ষণ মগজে ওর চুমু খাওয়ার ধান্দা। বুঝলাম, আমিও সমর্পণের মতই প্রায় মাকুন্দ, গোঁফের একটা রেখা থাকলেও দাঁড়ি নৈব নৈব চ। আমার ভাবনা যদি জানত আমাকেও গঙ্গাতে ডুবিয়ে মারত।

এভাবে কেউ কাওকে প্রোপোজ করতে পারে কিনা আমার জানা ছিলনা। বস আমি আসছি- বলে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেল। বড়লোকের মেয়ের খেয়াল বলে কথা, আমি হেসে খবরের কগজের প্রতি মনোনিবেশ করলাম। দেখি এক আঁজলা লাল ডাটির সাদা শিউলি ফুল আমার সামনে কাগজে রেখে- এক হাঁটু গেড়ে বলছে I love you. আমি তখন উবু হয়ে বারমুডা টিশার্ট পরে শুয়ে। খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে বললাম, তোর রূপ সৌন্দর্য বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ছিলনা, আজ অভিনয় ক্ষমতাটাও দেখলাম। জয়মা বলে লেগে যা, দিব্যাভারতী মরে গেছে, কাজল কালো, শিল্পা শেট্টি খ্যেদা নাকি। তোর কপাল খুললেও খুলতে পারে, প্রতিদ্বন্দী শুধু করিশ্মা আর রবীনা।

দাঁত কালানে বাঞ্ছারাম। তোর মত একটা যমের অরুচিকে যে প্রপোজ করে, তার বুদ্ধিমত্তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই হবে। অভিনয় যখন ধরে ফেলছিস সেটা অভিনয় আর রইল কি করে! সুন্দরী হলে তুই অন্তত রিফিউজ করতিসনা। আমি আঁকতে জানি, ভরতনট্যম শিখেছি। হারমোনিয়ামও বাজিয়েছি বছর চারেক। অকাট্য যুক্তি দিয়ে জবাবগুলো আমার দিকে ছুঁড়ে দিল। এবারে আর ভণিতা নয়- সোজা ঠারো হয়ে দাঁড়িয়েছে। বলল- বিয়ে করতে পারবি আমায়? মেনে নেবে তোর বাড়িতে? আমি গ্রামে যেতে রাজি। তোর বাবা কি করে?

২২

আমার চোখে সর্ষে ফুল তখন। সে চিল্লিয়ে নিচে মাসিদের উদ্দেশ্যে বলল- তোমরা কেউ আমি না বলা পর্যন্ত উপরে এসে ডিস্টার্ব করবেনা। আমার দিকে তাকিয়ে বলল- আমিনা এদের সাথে থাকলে একদিন আত্মহত্যা করব। মানসিক ভাবে মুক্তি চাই। আমি তোকে হেল্প করেছি। তোর সারাজীবনের ভার আমার, কিচ্ছু করতে হবেনা তোকে, আমি ঠিক চাকরিবাকরি একটা পেয়ে যাব। সোনারপুরের দিকে আমরা একটা বাড়ি কিনে নেব। বুঝলাম বিষয়টা সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছে। হয়তবা আমার এ বাড়ির পাটও গুটালো। বললাম কি ক্ষ্যাপামি হচ্ছে চুমু! জীবন অনেক পরে আছে, সবে ফার্ষ্ট ইয়ার। একদিন ঝগড়া হয়েছে, সব মিটে যাবে। একটু গান শুনি, দিয়ে কলেজ যাব। সে বলল- না আমি হানিমুনে যাব। গেলে তুই বা যাকে পাবো তাকে নিয়েই, প্রয়োজনে কুত্তাটার সাথেও। নাহলে কাঞ্চনটার হাত থেকে বাঁচতে পারবনা। আই মাস্ট হ্যাভ টু বি আ বিচ।

আমি কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, খানিকটা চিৎকার করেই সে বলল – আমি কি মেয়ে নই? কেন আমার কথাটা সিরিয়াসলি নিচ্ছিসনা? চোখে মুখে সে কি আকুতি, যেন মাঝসমুদ্রে কেউ জাহাজ ডুবিতে মাসখানেক ধরে খাবি খাচ্ছে মৃত্যুর প্রতীক্ষাতে। হঠাৎ করে নিমেষে উন্মাদের মত উর্ধাঙ্গ সম্পূর্ণ নিরাভরন করে আমার চোয়ালে ডানহাত দিয়ে প্রচন্ড চাপ দিয়ে উপরে তোলার চেষ্টা করতে করতে বলল- দ্যাখ আমি মেয়ে কিনা! কিসের তোর এত এরোগেন্স, কেন এভাবে আমাকে রিফিউজ করছিস? কেন আমার প্রস্তাবে রাজি হচ্ছিসনা তুই। কিসে আমার কমতি? এবারে ভয়ে আমার সর্বাঙ্গে কাঁটা দিয়ে উঠল, এমন অদ্ভুত পরিস্থিতিকে কখনো পরিনি। চেয়ে দেখি উর্ধ্বাঙ্গে সুতোটুকু নেই। থরথর করে কাঁপছে, শরীরের সব রক্ত মুখমণ্ডলে জমা হয়েছে, একটা টোকা মারলেই ফিনকি দিয়ে বেড়োবে। কি হলো বল- সর্টটাও খুলতে হলে বল। কাম অন, বল বল বল…। সর্টটা খুলে সম্ভবত প্যান্টি পরে দাঁড়িয়ে, আমি বালিশে মুখ গুঁজে। নীলছবি বা এমন উলঙ্গ কোনো মেয়েকে কল্পনা করলে স্বাভাবিক অবস্থাতে পুরুষাঙ্গ কঠিন হয়ে ওঠেনা এমন পুরুষ পৃথিবীতে নেই, কিন্তু অদ্ভুতভাবে আমার সমস্ত যন্ত্রপাতি যেন পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে গেল।

বল্লাম- যদি চাস যে আমি এখানে থাকি তাহলে এমন পাগলামি করবিনা প্রমিস করতে হবে। বালিশে মুখ গুঁজেই বলে চুপ রইলাম। মিনিটদুয়েক সব চুপচাপ, তারপর দেখি আমার পাশে এসে সেই বালিসেই আমার মত করে উবুড় হয়ে মুখ গুঁজে দিল। আমি মাথা তুলে দেখলাম গেঞ্জিটা পরে নিয়েছে। আমি নিজেকেই অবাক করে কেমন যেন মোহাবিষ্টের মত উবুড় হয়ে শুয়েই ওর পিঠে বাঁহাতটা রাখতে, মুরগির বাচ্চা যেমন মায়ের পালকের আড়ালে লুকিয়ে যায় তেমনই দুহাতে যতটা জোড়ে সম্ভব আমাকে আঁকড়ে অতবড় লম্বা শরীরটা কুন্ডুলি পাকিয়ে আমার বুকের মধ্যে সেঁধিয়ে গেল। প্রথম বার রাস্তার উপরে আলিঙ্গনে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ছিলাম, এবারে আপন থেকেই আমার হাত দুটো ওর মতই শক্তকরে জাপটে ধরল। ওভাবে সম্ভবত ঘন্টাখানেকেরও বেশি কেটেছিল। ‘দাদাবু, ভাত ঠান্ডা হইযাবে, লিচে আসুন’- আওয়াজে ঘোর কাটল।

দুজনেই যারপরনাই লজ্জিত হয়ে স্নান করে নিচে নেমে এলাম। এর পর অনেকক্ষণ আমরা কেউ কারো দিকে তাকায়নি পর্যন্ত। সেরাত্রে আর পড়তে এলোনা। আন্টি রাত্রে এবাড়িতে শুতে এলেও আত্রেয়ী বালিগঞ্জেই রয়ে গেল। দুদিন কোনো খোঁজ নেই, আমি ভাবছি এভাবে আর বেশি দিন এবাড়ির ছাদ আমার কপালে নেই। ওদিন ওভাবে আমার বোধহয় জড়িয়ে ধরা উচিৎ হয়নি। যা হোক হবে এই ভেবে কলেজ চলে গেলাম।

সেকেন্ড পিরিয়ডের পর আমি সিগারেট খেতে বাথরুমে গেছি। ক্লাসে ফেরার পথে দেখি গেটের মুখের বাইরেটাতে একটা ছেলেদের জটলা। আমি সেদিকে না গিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে নিজের সীটে এসে বসতেই পলাশ বলল- তোর মাল এসেছে বাইরে। দরজার বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখি আত্রেয়ী দাঁড়িয়ে। একটা সাদা টপ, ঘন নীল জমিতে সোনালি জরির কাজকরা একটা সিল্কের লং স্কার্ট। আমার কলেজে ওকে দেখে ঠিক যতটা আমি আশ্চর্য হলাম, লংস্কার্টও ঠিক ততটাই অবাক করল। ততোক্ষণে স্যার ঘরে আসাতে ইশারাতে ওনার অনুমতি নিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে বাইরে এলাম।

শুধালাম- তুই ? এখানে? কেন? দুদিন কোনো খোঁজ খবর নাই, কি ব্যাপার কি! কঠিন চোয়ালে প্রশ্ন করল- আমি আর মদ না খেলে তুই কি আমাকে বিয়ে করবি? আশেপাশে অন্য ক্লাসের ও ইউনিয়নের ছেলেরা লক্ষ্য করছে, অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। আমি বললাম নেশা কাটেনি বুঝি? সে বলল- বলনা, খুব জরুরি। বল্লাম এভাবে কথা হয়না, চল উপরের কোনো ফাঁকা রুমে যায়। ও বলল বাড়ি চ, মানে শোভাবাজার। আমি কিন্তু কিন্তু করতেই ও স্মার্টলি স্যারকে বলে আমার ব্যাগ নিয়ে বাইরে আসতে ক্লাসে একটা চাপা হাসির গুঞ্জন উঠল। দোতলা সিঁড়ির কাছে এসে বলল- কি হ্যাংলারে তোদের কলেজের ছেলেগুলো। আমি বল্লাম- ওরা কি আর এমন সুন্দরীদের রোজ দেখতে পায়! যে কটা মেয়ে এখানে পড়ে, সবই মিস নাইজিরিয়া হওয়ার উপযুক্ত। আমার পিঠে একটা মৃদু থাপ্পর মেরে বলল – ওভাবে বলতে নেই কারো রঙ নিয়ে, এ কি আর কারোর হাতে, তাছাড়া তুই নিজে কি ব্যাটা দাঁড়কাক। বললাম- আমি দাঁড়কাক হলে তুই যে আস্তাকুড় এটা মেনে নিচ্চিস তো? সিঁড়ির শেষ ধাপে সবে পৌঁছেছি, গালে চটাস করে একটা চুমুর শিলমোহর পরল। বলল- আমি আয়না দেখেছি, তোর কথা বলার ভঙ্গি আমার চেয়েও বেশি সুন্দর আমার দাঁড়কাক।

দূর থেকে আমাদের জিএস রাকেশ সিটি মেরে উঠতেই প্রায় দৌড়ে আমরা কলেজ থেকে রাস্তাতে এসে পড়লাম।  দোতলা তিনতলা থেকে অন্য ছেলেরা তখন টিটকিরি দিচ্ছে রীতিমত। আমি বল্লাম- কেন করলি এমন শো-অফ, খুব দরকার ছিল। সে বলল তুই যে আমার প্রপোজ গ্রহন করলি সেটার প্রাপ্য দেবনা? আমি শুধালাম কই করেছি! সে বল্লো- ওই যে কাক ডাস্টবিন খুঁটে খাবে। বলেই বেখাপ্পা হাসিতে আবার আমার উপরে ঢলে পরল। বললাম- তুও যে একজনের বাগদত্তা! সে বাম হাতের মধ্যামাটা দেখালো, আর বললো- অবশ্যই আমি একজনের বাগদত্তা। আর সেটা তুই, জীবনটা আমার, বাজার থেকে লোকে বেগুনও বেছে কেনে, আমি আমার জীবনকে বাছবনা? দিনের ব্যাচে তুই হাঁদার মত আমাকে দেখতিস, রাত্রের ব্যাচেও তাই, অসভ্যের মত ড্যাবডেবিয়ে চেয়ে থাকতিস। কি ভাবিস আমি লক্ষ্য করিনি- তোদের সব পাঁজি কটাকে লক্ষ্য করতাম। জবাব দিলাম- ডাঃ চক্রবর্তী যে কি নমুনা বানিয়েছেন অন্য ছেলে হলে তুইও টের পেতিস। সে বলল- তুই একটা ভেড়া, আমি তোর স্থানে থাকলে এদ্দিনে কবে প্রপোজ কর আরো কত কিছু করে ফেলতাম। আমি হাঁটা থামিয়ে বললাম-  আরো কতকিছু মানে! ও মন্টুর বাপ শুনছো বলে ডাকতিস নাকি! আবার ভ্রু ধনুকের মত বাকিয়ে বলল-  ম্যাগো, নাম আর খুঁজে পেলোনা- মন্টু। ব্যাটা গেয়ো ভূত। 

শুধালাম গাড়ি কই! জবাব এলো- উঁ… রাজাই জামাই, গাড়ি ছাড়া চলেনা। জানিস আজ আমি বাসে এসেছি, ওই বন্দিদশা আমি কমপ্লিটলি উইন্ডাপ করেছি। যে যা ঝগড়াঝাঁটি করে করুক, আমি আর ওতে নেই। আজ হেঁটেই ফিরব। বললাম- কত ঢঙই আর দেখাবি। সে বল্লো- দেখলেই যেন কত দেখো। জবাব দিলাম- সেদিন যা দেখিয়েছি… উফ, টাইটানিকের রোজ। আমি চোখ বুজলেই উন্মাদ হয়ে ওই দৃশ্য দেখতে পায়। বলে এবারে আমি ওর নাকটা জোরে টিপে লাল করে দিলাম। পারলে যেন আবার সে অমনটা করতে রাজি আজই, এমনটা ভাব দেখিয়ে একটা বার আমার কাঁধে মাথা ঘসে দিল।

ঘরে ফিরে বলল, আপাতত একটা টিভি, ইস্ত্রি, আর ফ্রিজ চাই। আচ্ছা উপরের ওই জানালাটার স্থানে একটা এসি বসালে হয়না! আমার আবার এসি সহ্য হয়না… নিজে নিজেই বকে যেতে লাগল। বললাম এবার তো থাম, তাছাড়া থাকব আমি, পুরাতন এই উঁচু ঘর এমনিতেই ঠান্ডা। সে বললো- আমি গোরস্থানে থাকব নাকি! যাই হোক ছাড়। আচ্ছা এর আগে তুই কটা প্রেম করেছিস। বললাম। শুধালো চুমু খেয়েছিস? বললাম- না। সে বলল- আমি কটা খেয়েছিস জানিস! আমার জবাবের তোয়াক্কা না করেই বলল ৩ জনকে ৭ টা। আয় তোকে আমার অভিজ্ঞতা শেয়ার করি, বলেই রীতিমত ঝাঁপ দিয়ে কানের লতিতে একবার কামড়ে গভীর চুম্বনের আবদ্ধে দুই প্রান এক হয়ে গেলাম। মাঝে একবার বলেছিলাম তোর মুখে মুখ দিলে এইডস হবেনা তো! রোজ দাঁত মাজিস? নাহলে  পরেরবার মুখে কন্ডোম লাগাবো। জবাবে বলল- শিয়ালদা ফ্লাইওভারের নিচের সব স্টেশনারি দোকান গুলোতে সাজানোই থাকে সারসার প্যাকেট, আশা যাওয়ার পথে দেখেছি। এক পেটি কিনে আনবি, নাহলে তোর মন্টু এসে হাজির হবে। বলেই আবার লালা স্বাদ নিতে ব্যাস্ত হয়ে পরল। মনে নমেই ভাবলাম এক পেটি! সে তো অনেক, কিন্তু বলব কিকরে মুখ কি আর আমার জিম্মায় তখন!

জীবনের একটা গণ্ডি সম্পন্ন করে, আবার একটা প্রেমের সম্পর্কে প্রবেশ করলাম। কোলকাতার পূজো পায়ে হেঁটে দেখলাম, বইমেলার ধুলোতে ফিসকাটলেট খেতে শিখলাম। একোয়াটিকার জলে সাঁতার শেখালাম ওকে, নন্দন-সদন-একাডেমী চিনলাম। কফিহাউজ থেকে নলবন হয়ে সিটিসেন্টার একটা ম্যাপ তৈরি হল। সপ্তাহান্তে নতুন সিনেমা ও থিয়েটার দেখা অভ্যস্ত হল, ইডনে খেলা দেখা, নচিকেতা, কুমার শানু অলকা ইয়াগ্নিকের লাইভ শো দেখা- শারীরি ভাষা বদলে গেল। পোশাক বদলালো, স্বাদ বদলালো, কথাবার্তাতে  সলাপরামর্শ করে কোর্টের ফরমায়েসির কাজ ছাড়লাম। প্রথমবার প্লেনে চড়ে শিলিগুড়ি গেলাম ডুয়ার্স ভ্রমণে। আসলে আমারই টাকা, আপাতত সে ধার স্বরূপ দিচ্ছিল এমন মন্ত্র সারাক্ষণ মনে করিয়ে দিয়ে দিয়ে এসব চলত। এরপর আমার কাজ বলতে ছিল শুধুই পড়াশোনা। শুরু হল নতুন এক জীবনযাত্রা।

-সমাপ্ত            

লেখকঃ তন্ময় হক

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *