ফেসবুক চরিত মানস

আমরা আসলে প্রতিনিয়ত সারপ্রাইজড হতে চায়, তাই কারনে অকারণে নোটিফিকেশ ট্রের দিকে আঙুল চলে যায়। কি মেইল এলো, ইউটিউবে কোন নতুন ভিডিও আপলোড হল কিনা? ফেসবুকে নতুন কি কি কমেন্ট এলো, ইত্যাদি ইত্যাদি। শুনেছি একসময় মানুষ সাপের ছোবল খেয়ে নেশা করতেন, কারো আবার বিদ্যুতের হালকা শক খাওয়াও অন্যতম নেশা। বুঝুন ঠ্যেলা। আসলে সাধ্যের মাঝে আমরা সকলেই একটু সহনীয় শক পেতে চায়, এই জন্য তৈরি হয় তীব্র আসক্তি। মাঝরাত্রে ঘুম থেকে উঠে আজকাল আর কেউ গায়না- ‘সহেনা যাতনা, দিবস গনিয়া গনিয়া বিরলে… নিশিদিন বসে আছি, শুধু পথ পান চেয়ে, সখা হে এলেনা…’। এর চেয়ে মোবাইলের টুকুস করে নেটটা অন করে নতুন কি পোষ্ট এলো, আমার পোষ্ট বা কমেন্টে কটা লাইক এলো গুনতে থাকি। গোটা পোষ্টটা পড়ার পর, আমার উপরে এস্যিড হামলা করার মন যাবে অনেকের, চাপাতি নিয়ে জবাই করতে মন যাওয়াও দোষের কিছু নেই। দেশদ্রোহী বলে পাকিস্তানে পাঠাতে মন চাইলেও আপনাকে কেউ চাড্ডি বলে অপবাদ দেবেনা, নিশ্চিত। আমি শুধু বলব ধৈর্য রাখুন। আপনি বুদ্ধের (ভট্টাচার্য না গৌতম যেটা পষাবে সেটা বেছে নেবার পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে আপনার) দেশের লোক, গান্ধীর দেশেরও বটে, হিংসা আপনাকে মোটেই শোভা দেয়না।

এর মাঝে যদি অকপটের মত এরকম ইভেন্ট আসে, যেখানে একটা সন্ধ্যার জন্য ‘আমি’ থাকব হটসিটে। অকপটের গণ্যিমান্যি ব্যাক্তিবর্গরা ‘আমার সন্তান তুল্য’ লেখনীটিকে পরম মমত্বে গ্রুপের দেওয়ালে সেঁটে দেবেন, পিন পোষ্ট, পোষ্টার করে- আহা। যেন আমি সাক্ষাৎ বাঁকাচাঁদ বাড়ুজ্জ্যের উত্তরপুরুষ, অথবা সুজ্জিপোভু দেবের মানত করা সাঁঝবাতি। তাতে সে লেখা খাজাই হোক বা ‘লেডি ক্যানিং’ এর স্থানে ‘স্যার নামখানা’ টাইপের লজ্ঝরে মাল, বুভুক্ষের দেশে পচা রুটির মত ওটাই  সকলে মিলে চেটে-চুষে খেয়ে ধন্যি হয়ে উঠলে, লেখকের বুক পাক্কা ৫৭ ইঞ্চি করে দেবেন। ৫৬ ইঞ্চি অলরেডি এগজিস্ট আছে তাই ওটা ৫৭ই রাখা হল। সবই ওই- ‘একদিনের রাজা’ টাইপের মাইন্ড গেম। আমার লেখা নিজের টাইমলাইনে বা এই গ্রুপে দিলেও সাতটা লাইক আর ৪ টে কমেন্টর বেশি সিন্নির লায়েক হইনি কখনো, মাঝে মাঝে – with talukder & 76 others কেদ্দানি সহ। তা, এখানে এমন রাজকীয় খাতির সহ, লাইক-কমেন্ট-প্রশংসার বন্যা কে আর না চায় বলুন। ইয়ে, আপনিও যদি চান এমন খাতির পেতে, তাহলে ঝটাপট লিখে, নিয়মাবলীর পোষ্টে দেওয়া ঠিকানাতে পাঠিয়ে দিন। এরপর দূরদ্বীপবাসিনী হয়ে নিজের দিন আসার প্রতীক্ষা করতে থাকুন।  

এতো গেল ভণিতা, এবারে মুল লেখাতে আসি। সাধারণত ব্যাপকার্থে আমাদের রক্তের মতই ফেসবুক ব্যবহারকারীদের মধ্যে দুই ধরনের প্রাথমিক গ্রুপ আছে, যথাক্রমে- দাতাগ্রুপ ও গ্রহীতাগ্রুপ। এদের মাঝে আবার পজিটিভ ও নেগেটিভ শ্রেণীবিন্যাসও আছে। সার্বিক দাতা ও সার্বিক গ্রহীতার মত চরমাভাপন্ন বিভাগের লোকজনও নেহাত কম নেই। মধ্যপন্থাভোগীদের বিভিন্ন বিন্যাসও রয়েছে থরেথরে। এসবটা নিয়েই আমাদের আজকের এই আলোচনা।

  • ফেসবুকে আমরা যারা থাকি তাদের মধ্যে শতাংশের হিসাবে লেখক ২% এরও কম, এনারাই সার্বিক দাতা। বাকি আরো ৫-৬ শতাংশ মানুষ নামী অনামী লেখকের তথা অন্যের লেখা শেয়ার করেন গ্রুপ বা টাইমলাইনে। উপরোক্ত ২ শতাংশের মধ্যে দেড় শতাংশ ভীষণ এলিট সম্প্রদায়ের, ওনারা একমাত্র নিজেদের টাইমলাইন ও নির্দিষ্ট এক আধটা গ্রুপে ছাড়া মোটেই কোথাও লেখা দেননা। তবুও এনাদের এমনই ক্রেজ যে, প্রায় প্রতিটা সাহিত্যধর্মী গ্রুপে এনারা আছেন। ঠিক কোনো না কোনো গুণমুগ্ধ তেনাকে ঢুকিয়ে নিজেকে ধন্য করেছেন। এনারা নিজের পোষ্ট বাতিত কোথাও মন্তব্যের বাজে খর্চা করা সমীচীন মনে করেননা, কমেন্ট করলেই যেন কৌমার্য হারাবেন। একআধজন বাইচান্স একটা কমেন্ট করে ফেললে সেই পোষ্টকারী যেন উক্ত লেখকের অটোগ্রাফ পেয়েছেন, এমন উল্লাসে ভেসে যান। বাকি আধা শতাংশ লেখক সর্বঘটের কাঁঠালিকলা, যেমন তেড়ে লেখেন, তেমনই অকাতরে কমেন্ট বিলিয়ে সকলকে খুশি করেন।
    • এরপর আসে ওই ৫ শতাংশ লেখা শেয়ারকারীর দল। এদের মধ্যে কিছু শতাংশ পৃথিবীর সমস্ত গ্রুপেই সম্ভবত আছেন। ঠুংরি-গজল-সেমিপানু-ভ্রমণ-সাহিত্য ইত্যাদি, যে গ্রুপেই দেখেন কোনোটাতে অনেক কমেন্ট হয়েছে, পোষ্ট না পড়েই সটান কপি পেষ্ট করে আরো ৫-৭টা গ্রুপে সেগুলো দায়িত্ব নিয়ে সেঁটে দেন। এনারাই সেই পক্ষীকুল, ভাল লেখার ফল খেয়ে আচিলে পাঁচিলের ফাটলে হেগে, সেই ফলের বীজ বাজারে ছড়িয়ে, অনামি লেখককে রাতারাতি ভাইরাল বানিয়ে দেন। আরেকটা শতাংশ নির্দিষ্ট গ্রুপ থেকে, নির্দিষ্ট লেখকের লেখা, নির্দিষ্ট কিছু অন্য গ্রুপে কপি পেষ্ট করতে থাকেন। এনারা ভ্রমর বা মৌমাছি প্রজাতির, নির্দিষ্ট ফুলের মধু আগে নিজে খেয়ে নেন। পরে সেই পরাগ অন্য ফুলে পৌঁছে দিয়ে লেখককে গর্ভবতী থুড়ি গর্ববতী করে তোলেন। অবশিষ্ট শেয়ারকারী দলটা না বুঝেই শেয়ার করেন। ধরা যাক কোনো একটা লেখা ১০ জনে শেয়ার করেছেন বা কমেন্টে লিখেছেন ‘শেয়ার করলাম’, ব্যাস- কমেন্টটা পড়া মাত্রই এই জাতীয় শেয়ারকারী প্রজাতিটা শাঁ শাঁ করে ঝেঁপে নিজের টাইমলাইনে ও অন্য গ্রুপে ভর্তি করে দেবেন।
    • বাকি ৯৩ শতাংশের অন্তত ৭-৮ শতাংশ রোজ শুধু ছবিই ছাপেন। নাহ নিজের ছবি নয়, সুপ্রভাতের সূর্য, চায়ের কাপ, শুভরাত্রির নীল চাঁদ, সবুজ তারা, ডানা ওয়ালা পরী, সাদা পায়রার ছবি সাঁটেন যত্রতত্র। এর মাঝে কর্মসুত্রে বাইরে বেড় হলে, ঘাসের মাঠ থেকে রকেটে ভাঙা ঘাট, মানকচুর বন থেকে রতির মহেন্দ্রক্ষণ হয়ে, ছেলে ছোকরার দল ও রাজহংসের মল পায়ে দলে, সব-সব-সব্ব কিছুর ছবি সাঁটাতে থাকেন অকাতরে। এদের মাঝে এক জনও নিজে ছবি তোলেননা, সবটাই অন্যের তোলা ছবি ঝেঁপে ফোটোগ্রাফারকে ক্রেডিট না দিয়েই, অন্যত্র সেঁটে সুখ পান।
    • কিছু শতাংশ থাকেন SS সংগ্রাহক। এনারা কোথাও সামান্যতম কেচ্ছা পেলেই সেটা রাষ্ট্র করার দায়িত্ব নিয়ে নেন। ইনবক্সে চালাচালি করে সে কি গোপনতা রক্ষার মন্ত্রগুপ্তি- হ্যাঁ দাদা, আমি বলেই এটা তোমাকে বিশ্বাস করে দিলাম। কাওকে জানাবেনা যেন, তাহলে আর আমার মান সম্মান থাকবেনা। অপর দিক থেকে আশ্বাস আসে- আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন, আমাকে সমস্ত কেচ্ছার খবরাখবর লাগাতার দিতে থাকলে আমি মুখে সেলোটেপ মেরে থাকব, ইত্যাদি। ঝগড়াঝাঁটিতে এই SS বাণ নিক্ষেপ করে প্রতিপক্ষ যে ঘায়েল হয়েছে তার লেখাজোখা নেই, এমন অস্ত্রের জুড়ি মেলা ভার। অনেকসময় কবিরা তাদের খোয়া যাওয়া কবিতার SS টাঙিয়ে সহানুভুতির শোরুম খুলে বসেন।
    • মধ্যরাতের শিকারি। এনারা সারা দিন ফেসবুকে আসেননা বা আসার সময় পাননা। তবে রাত হলেই গুটিগুটি এসে কবিতা বা শব্দজালের ফাঁদ পাতেন, স্ত্রী পুরুষ নির্বিশেষে। সমমনোভাবাপন্ন কাউকে পেয়ে গেলেই আগামী এক আধ মাসের জন্য সেটা নিয়েই খেলা চলে, ভ্যালিডিটি ফুরালে আবার চলে নতুনের খোঁজ।
    • বক্সার প্রজাতি। এ বক্সিং মানে ঢিসুম-ঢুসুম ওয়ালা হাতাহাতি নয়। এ হল গিয়ে ইন-বক্সিং। এমনিতে এনারা মেনিমুখো টাইপের হয় ন্যাতানো পাঁপড় গোত্রের হয়ে থাকে। ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জাননেননা।  কোনো পোষ্টে একটা কচি মেয়ে/ছেলে, বৌদি বা বৌদির সোয়ামীকে কমেন্ট করতে দেখলেই নোলাজুড়ে লালার ঝর্ণা ছোটে। সেই ভেজা পথ বেয়ে ইনবক্সে গিয়ে লাগাতার ‘হাই’ তুলতে থাকে।
    • চ্যাটাচ্যাটি। না চাঁটাচাঁটি নয়, চ্যাটাচ্যেটিই। ইনবক্সের রেলপথ যদি একবার খুলে যায়, তখন ফেসবুক হয়ে যার গৌণ। সর্বক্ষণ টুং টাং শব্দে ইনবক্সের অন্তরালে চলে আদিম আলাপ। বিলাপ শেষে তা এক সময় প্রলাপে পরিণত হয়ে যায়।
    • বিদূষক/বিশেষক প্রজাতি। কমেন্টারদের মধ্যে এদের বংশের আদমশুমারি সবচেয়ে বেশি। ওয়াও, অনবদ্য, দুর্দান্ত, চমৎকার, ফ্যান্টাস্টিক, ব্যাপক, সো বিউটিফুল, গর্জিয়াস, সুন্দর লাগছে, সো কিউট, ঝাক্কাস, এক্সেলেন্ট, নাইস, সুইট, অপূর্ব, আউটস্ট্যান্ডিং সহ বাছা বাছা বিশ্লেষণের কারখানা এনারা। প্রত্যেকে একেকটা মুর্তিমান গুলবাজ মিথ্যুক। আপনি যে পোষ্টই করুন তাতেই এগুলো বসিয়ে দেবে। এক ‘বৃদ্ধা কুমারী’ একবার তার সবুজ রয়ের কফের ছবি দিয়ে লিখেছিল- আর বোধহয় বাঁচবনা। তাতেও ওই উপরের বাছাবাছা বিশ্লেষণ কমেন্টে এসেছিল। চাটুকারিতার নিরিখে এরা প্রত্যেকেই একেকজন তারকা বিদূষক।
    • তোষামোদ। এরা বিশেষন প্রজাতির এক্সটেন্ডেড তথা কাব্যিক ভার্সন। কমেন্টে সাহিত্য রচনা করার বিরল গুণের অধিকারী, এনারা এটা করে কখনো ক্লান্ত হননা। অন্যেরা যেখানে- কি কমেন্ট করবে ভেবে চুল ছেঁড়েন, সেখানে এনারা অনায়াসে মুদিখানার বিলের মত লম্বা………… কমেন্ট করে দিতে এতটুকু পরিশ্রান্ত হননা।
    • সুকুমার সেন, পবিত্র সরকার ও সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় মহাশয়দের পাণ্ডিত্যকে একটা মিক্সচারে ঘ্যেটে, সেটাকে একের পঁচাত্তর (1/75) দিয়ে গুণ করলে যে সংখ্যাটা দাঁড়াবে তার পূর্ণ অংশটা ছেঁটে, দশমিকের পরের মানটা নিলে যেটা হয়, সেই মানের ‘ভাষা তথা ব্যকরণবিদে’ ফেসবুকের পাড়ায় এক প্রজাতির বাস রয়েছে। ‘কি’ সঠিক না ‘কী’ সঠিক, ভিড় না ভীর, ভেষে না ভেসে, কল্যাণ নয় কল্যাণ ইত্যাদি নানান ব্যকরণ গত ক্রুটি, তিনি নিজে থেকে আপনাকে শিখিয়ে দিয়ে যাবেন। এনারা সাধারণত কোনো পোষ্ট বা অন্য ইনোভেটিব কমেন্ট তেমন কিছু করেননা।
    • বিশ্লেষক। ধরা যাক আপনি মান্নাদের একটা গান নিশুতি রাত্রে পোষ্ট করলেন, কিন্তু কিছু গোলযোগের কারনে সেটা কেবলমাত্র – ‘ও চাঁদ’ এই টুকুই প্রকাশ পেল। জ্যোছোনা টেকনিক্যাল error এর কারনে নিজেকে সামলে নিয়ে অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। এবার বিশ্লেষকের দল প্রবেশ করবে কমেন্ট বক্সে- আচ্ছা, চাঁদ। এটা ভৌতবিজ্ঞানের বিষয়। অপর একজন- আপনি ডাকছেন, মানে আজ পুর্নিমা। আরেকজন- অমাবস্যাও হতে পারে, তাই চাঁদের আবাহন চলছে। ছিদ্রান্বেষী বিশ্লেষক- চাঁদের সাথে আছে কলঙ্ক, মানে আপনি নিষিদ্ধ কিছু চাইছেন কি? জিজ্ঞাসু বিশ্লেষক- চাঁদ পুরুষ বা মহিলা যা কিছু হতে পারে এখানে, তবুও শুধায়- ও মশাই আপনিও কি রেনবো কালারে নাম লেখালেন নাকি! আপনি নিজেও ভেবে উঠতে পারবেননা যে, শুধু ‘ও চাঁদ’ শব্দের এত ব্যাখ্যা হতে পারত। এনারা তালপুকুরের ঘটি থেকে তৈমুরের পটি – সকল বিষয়ে বিশ্লেষণ করে দেবেন সময় ও সুযোগ পেলে। 
    • আঁতেল। আপনি একটি কবিতা লিখেছেন, প্রেমের। আঁতেল এসে কমেন্ট লিখবেন- ‘হাফ স’। আপনি জর্জ বার্নার্ড শ এর নাম শুনেছেন হয়ত, কিন্তু হাফ স এই প্রথমবার। এর মানে? না উনি কোনোমতেই  বুঝিয়ে দেবেননা ওই। এ যেন প্রফেসর শঙ্কুর কর্ভাসের ‘ক’। এবারেই আপনার কল্পনা শক্তির চুরান্ত পরীক্ষা। হাফ স মানে কি? হাফিজ সইদ কি? সেতো পাকিস্তানি আতঙ্কবাদী। পাকিস্থান মানেই তীব্র ঘৃণা, গরীব দেউলিয়া দেশ। মানে আপনার কবিতাটা, আঁতেল বাবুর অপছন্দ হয়েছে, তাই ঘৃণা ও আতঙ্কে ভুগছেন এটা পড়ে। সুতরাং লেখক হিসাবে আপনি দেউলিয়া তথা পাকিস্তান। আপনি যদি আশাবাদী হন তাহলে ভাবনার গাড়ি আরো ছোটাতেই পারেন। সেক্ষেত্রে- পাকিস্তান আমাদের সেনার উপরে কাশ্মীরে হামলা চালাচ্ছে, অমন সুন্দর কাশ্মীরে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। ইয়েস সুন্দর কাশ্মীর। তারমানে উনি ফেসবুকের বাকি সব আতঙ্কেভরা কাব্যের মাঝে এটাকেই সুন্দর কাশ্মীরের নিসর্গ বলে মনে করেছেন। এবারে আপনার আপ্লুত হবার পালা। আপনি বাম ঘেঁষা হলে আঁতেল বলবে- দেশী কোনো নীতি নেই! বিদেশী ভাবধারার প্রতি এই আসক্তি ভাল নয় বাবু। তৃনমূল বা বিজেপি করো। নিদেন পক্ষে শিবদাস ঘোষ। কমিউনিষ্ট শব্দ নৈব নৈব চ। আপনি যদি বলেন আমি শিবভক্ত, আঁতেল বাবুটি যুক্তি দেবেন- শিব? কোথায় থাকে জানো? কৈলাশে। তিব্বত । সেটা এখন লাল চীনের অধীনে। চাইনিজ দেবদেবীর উপরে এতো ভক্তি ভালনা বাপু, রামে ফেরো বাছা দেশী রামে ফেরো। পার্বতীও তাঁর বালবাচ্চা সহ চীন লাগোয়া নেপালেই থাকে। বিদেশী নাগরিক, বিনা পাসপোর্টের অবৈধ ইমিগ্রেশন করেন। কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতী সব বাতিল। শুধুই রাম। তবে হ্যাঁ বছর বছর ওনাদের হিমালয়ে না পাঠিয়ে দার্জিলিং এ একটা হোমস্টে করে দেওয়া যেতে পারেনা? ৩৪ বছর বামেরা রাজত্ব করে গেল, কংগ্রেস ৬৫ বছর। কেউ কিচ্ছুটি ভাবলইনা এ নিয়ে, স্ট্রেঞ্জ। যাই হোক, এতক্ষণে আপনার প্রেসার বেড়ে গেছে, আপনি আলাপ থেকে পালিয়ে বেঁচেছেন। এখন কোনো আঁতেল যদি কাব্য করে, সেক্ষেত্রে আপনি চুরান্ত অসহায়। কমেন্ট করার মত কোনো শব সরি শব্দ পাবেননা ব্রহ্মাণ্ড খুঁজে। কেমনতর হয় সে পোষ্ট? নমুনা- “আমার বগলের তলদেশে যে নদীটি ছিল, আজ তার উপবাস। এদিকে মাদি শকুনটা আজ মানচিত্র আঁকছে দীঘির জলে, প্রিয়তোমার খাটজুড়ে কলমি শাকের চাষ, আমার পোষা ইলিশমাছে শুঁয়োপোকা খায়না”। ক্ষমতা থাকলে এ আধুনিক কাব্যের বাখ্যা করে দেখান।
    • অধৈর্য পাঠক। আমার এই লেখাটা, অধিকাংশ জনই এই পর্যন্ত এসে পৌছাবেননা। শুরুতে দু লাইন পড়েই শুরু করবেন- ধুর এত্তো বড় লেখা কে পড়ে! কয়েকজন লিখবেন – ইট পাতলাম; দিয়ে আর আসবেনা। দু চারজন আবার কমেন্ট করেবেন- ছোট ছোট করে লিখতে পারেননা, অনেকের সুবিধা হয়। ভাবখানা এমন যেন- বাংলা সিরিয়ালে সব নায়কের কেন একাধিক বউ, এ বিষয়ে কারন দর্শিয়ে ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসাবে বক্তিতা করাবার জন্য উনি রাষ্ট্রপুঞ্জে যাচ্ছেন, তাই বড় লেখা পড়ার সময় নেই।
    • দু লাইনের সাহিত্যিক। প্রতি ১৫ মিনিট অন্তত অন্তত যেভাবে এ স্থনেই থাকুননা কেন, সেই অবস্থাতেই তিনি নিয়মিত স্ট্যাটাস আপডেট করতে থাকেন। নমুনা- ‘আমি কেন’? কিম্বা ‘অমিত বিক্রম’। ভাবনার জন্য রইল আপনার গোটা দিন। অমিত শাহ থেকে অমিত মিশ্রের স্পিন যা খুশি ভাবুন, বিক্রম সারাভাই থেকে বিক্রম বেতাল- বাঁধা দেবার কেউ নেই।  কিছু বললে সাহিত্যিক বলবেন- আমার টাইমলাইনে আমি লিখেছি, আপনার কি মশাই?
    • টিম ক্যাপ্টেন। এনারা এখানেই যান একটা ছোটখাটো দল নিয়েই যান। যেন বাল ঠাকরে ও তাঁর পিচ খুঁড়ে দেওয়া কোদাল বাহিনী। এনারা যা করেন, দল বেধেই করেন। আপনা সাধ্যি কি এদের সাথে পেরে উঠবেন।
    • বাণী কুমার/কুমারী। এনারা হরেক রকমের এ্যাপস থেকে নিয়মিত ‘কোটেড’ বাণী প্রচার করতে থাকবেন।  যেন সাক্ষাৎ বিলে, বা মার্ক টোয়েন। তার বাণীর অধিকাংশই ঝাঁপা, তাতে কি? উনি আপনাকে জবাব দিলে তো। আজই একটা এমন বাণী পড়লাম- ‘সামান্য দুটো বিচি নিয়ে নিজেকে পুরুষ ভাবছেন? এই হিসাব মত আপনার সাইজের অগুন্তি বিচি সমৃদ্ধ কাঁঠাল তো তাহলে সাক্ষাৎ মহাপুরুষ’। আমার তখন হাসতে হাসতে শহীদ হয়ে যাবার অবস্থা।
    • কবি ও দেড়লক্ষ কবিতা। ফেসবুকের জনপ্রিয় কবি শ্রাবণী আচার্য, অমরেশ, শ্রীপান্থ, তুরীয়ানন্দ, হীরাউল, আফরোজ প্রমুখেরা প্রতি দিন নিজেদের গর্ববতী করে তোলেন, আত্মসঙ্গমের বিচিত্র ক্ষমতাতে। শীত, গ্রীষ্ম, বরষা, এনাদের কলম সিসমোগ্রাম, কখনই থামেনা। মহাপ্রয়াণের পূর্বে এনাদের প্রত্যেকের অন্তত দেড়লক্ষ করে কবিতা থাকবেই, বাকি অনুসারী কাব্য আলাদা। আমি ভাবি ৩ মাস আগের প্রসবিত কবিতা নিজেই চিনতে পারেন তো? পরিচিত এক মহীয়সী আবার কবির চেয়ে, চোর হিসাবে দরের শিল্পী। তিনি ‘ক’ বাবুর দুলাইন, ‘খ’ বাবুর ১১ টা শব্দ, ‘ঙ’ বাবুর ছন্দ বিন্যাসের সাথে সাফলিং করে, একটা বিউটি ক্যামেরার সেলফি সহ, কাব্যটি বাজারে ছাড়েন রোজ। বিদুষকের দল এখানে নিয়মিত শতাধিক লাইক কমেন্টে ভুষিত করে কবিনীকে উৎসাহিত করে চলেন।
    • সর্বসত্ব সংরক্ষিত। এনাদের ভয় উপরোক্ত ওই মহিয়সীদের। তাদের থেকে নিজের শিল্পকে রক্ষা করার জন্য ওই শব্দবন্ধটি লেখার শেষে বা শুরুতে সেঁটে দিয়ে, ছোটো সেলুজের হাতের তৈরি লপসি আর তারিফ একসাথে খেতে থাকেন।
    • ঝাঁপা কবি। যদি কোনো কবিতা মনে ধরে গেল অমনি সেটা নিদের টাইমলাইনে বা ক্লজ গ্রুপে নিজের নামে চালিয়ে দেবেন ধরা না পরা পর্যন্ত। সেটা রবীন্দ্র-নজরুল হয়ে আজকের শ্রীজাত মাই আমার আপনার কবিতা পেলেও ছারেননা। ধরা পরলেও নির্বিকার থাকার এক আশ্চর্য ক্ষমতার অধিকারী এনারা।
    • আধুনিক কবি। আঁতেলদের কাব্যিক ভার্সন এনারা, যৌনতা খুব প্রিয় বিষয়। উদাহরন- ‘সেদিন তোমায় দেখেছিলাম বেবুনের গোলাপি পাছার দর্পনে, যেদিন ঝর্ণা বৌদির দুধের শক্তি বাড়িয়েছিল হরলিক্স। তোমার সবুজ যোনির জমিতেকি আমি একাই হলধর? আমি সেখানে পেঁয়াজের চাষ করে পৃথিবীকে আমিষক্ত বানিয়ে যাব, এটাই আমার অন্তিম আকাঙ্ক্ষা’। এর পরও কিছু লিখলে আপনারা খামে করে আমার জন্য গনধোলাই পাঠাবেন সেটা বলাই বাহুল্য।
    • হুইশ্যাল ব্লোয়ার। পৃথিবীর উষ্ণায়ন, প্লাস্টিক দূষন, কন্যাভ্রণ হত্যা, ও পণপ্রথার বিরুদ্ধে লাগাতার আওয়াজ তোলেন, এসি ঘরে বসে চিপস আর কোল্ডড্রিংস খেতে খেতে। এনাদের বিশ্বাস, একমাত্র এনারাই শুভবুদ্ধিসম্পন্ন, বাকিরা শুভাপ্রশন্ন।
    • অনু গল্প লেখক। কিছু লেখক বাজারে এমনও আছেন, যাদের লেখা গল্প অন্যেরা কেউ খুঁজে পাননা। এনারা অনু গল্প/উপন্যাস লেখক। উপযুক্ত আণুবীক্ষণিক যন্ত্র সহ দেখলে দেখা যাবে, সেখানে লেখা রয়েছে- ‘প্রতিভাবান বালিকাটির জরায়ুর ভ্রূণ পরীক্ষা করে তাকে বাপের বাড়ি ফিরে গর্ভপাত করার নির্দেশ দিলেন বড়লোক শাশুড়ি’। হ্যাঁ, এটাই অনু গল্প বা উপন্যাস। এর মধ্যে প্রতিভা আছে, বাল্য বিবাহ আছে, জোর করে গর্ভপাত আছে, অবৈধ চিকিৎসক, ভ্রুন হত্যা আছে, ধনী গরীব বৈষম্য আছে, সাথে ফ্যামিলি ভায়োলেন্স। আর কি চাই? রেডি অনু উপন্যাস।
    • প্রকাশক। প্রতিটি সাহিত্য গ্রুপে এক বা একধিক প্রকাশক আছে। ওনারা স্বল্প মূল্যে কবিতা সঙ্কলণ প্রকাশ করে থাকেন। ১০০ জন কবির কবিতা নিয়ে পুস্তক, আপনারটা ১৮ নং পৃষ্ঠার চতুর্থ স্থানে রয়েছে। মাত্র ৩০০ টাকার মিনিময়ে কবিতা প্রকাশের মত এমন মহা সুযোগ আর কোথায়? এনারা একক সঙ্কলণও প্রকাশ করেন বটে, সেগুলোর পরিমাণ আর খরচ কখনো বাজারে লিক হয়না।
    • খরিদ্দার। ১০০ কবিতার মাঝে আমার তো মোটে একটা কবিতা, বাকি ৯৯ জনকেও আমার মতই বইটা কিনতে হবে ১২১ টাকা দিয়েই। ভাবা যায়, আমার কবিতার ১০০ জন বিদগ্ধ পাঠক। ৯৯ জন অন্য কবি ও একজন প্রকাশক, গোটাগুটি একশত জন। একটু লজ্জা লজ্জা করে অটোগ্রাফও দিই মাঝেমাঝে।  একক বই এর ক্ষেত্রে, বই মেলাতে আমার মত একক গ্রন্থ প্রকাশিতব্য লেখক নেহাত কম নয়। খাতিরের কারনে আমি ২০-২৫ লেখকের নই কিনলে, ওনারাও সৌজন্য দেখিয়ে একটা করে আমার বই কেনেন। মেলা শেষে অর্ধেকের বেশি অবশিষ্ট থাকেনা প্রথম সংস্করণের ৫০ টি কপির। বছর ভর মেলা কি আর কম হয়?
    • কবি, লেখক, গায়ক, আবৃত্তিকার, সুরকার, অভিনেতা, চিত্রশিল্পী। আজকাল মাল্টি ট্যালেন্টের যুগ। ধরা যাক আমার এই লেখাটা দু চারজনে ভাল বলল। অমনি আমাকে কবি হতে হবে, তাতেও যদি দু চারটে সুখ্যাতি আসে তখন- পর পর গায়ক, আবৃত্তিকার, সুরকার, সহ অভিনেতা, স্ক্রিপ রাইটার, মুখ্যশিল্পী, শেষে পরিচালক সহ যা যা হয়ে দেখানো যায় সব সেজে বা হয়ে, তার ছবি ফেসবুকে পোষ্ট করা জাতীয় কর্তব্যের মধ্যে পরে।
    • ফিল্ম ডিরেক্টর। কিছুজন ফেসবুক করেন শুধুই ছবি পরিচালনা করার জন্য। অবশ্য প্রতিভাতে এনারা হলিউডকে টেক্কা দিয়ে মুনুড বা মার্সুডে যাওয়ার উপযুক্ত। শেষোক্ত দুটোর অবস্থান একটা চাঁদে আর অন্যটা মঙ্গলে, ওখানকার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। শুধু টাকার অভাবে এই প্রতিভাবান পরিচালক চিৎপুরের যাত্রাপালার অনিয়মিত এক্সট্রাদের দিয়ে অভিনয় করিয়ে ইউটিউবে ফিল্ম আপলোড করেন। পৃথিবীর বাকি কিছু নিয়ে এনাদের তেমন কোনো মতামত থাকেনা, এনারা অবশ্যই নির্বিরোধী শ্রেণীর।
    • DSLR বাবু। এনাদের ওই একটিই সম্বল। হলুদ গোধূলি, নীল প্রজাপতি, বেগুনী কৃষ্ণচূড়া সহ মাঝেমধ্যে নিজের এডিটেড থোবড়ার ছবিতেই এদের ব্রহ্মান্ড। মাঝে সরু করে লেখা নিজের নাম।
    • ট্যাগিষ্ট। ‘ব্রজতোষ বাবুর স্ত্রীর নতুন ব্রা’ এটাই ফটিকের ফেসবুক পোষ্ট। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই কারন এতোদিনে এই ধরনের বিষাক্ত পোষ্টের এন্টিডোট আমাদের সকলের আছে। আমোদটা হচ্ছে এর পর। – with Surobhi Jnan & 99 others. এরা যা খুশি লিখুক, পোষ্ট করুক, শেয়ার করুক- শ খানিক পাবলিককে ট্যাগ করে তাদের নোটিফিকেশন বক্সে শব্দব্রহ্মের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তবেই সুখ। ত্যাগ না করা পর্যন্ত ট্যাগ এনারা করতেই থাকবেন।  
    • রাজনৈতিক তর্জার বায়েন। ধরুন কেউ একটা মা ও শিশুর ছবি পোষ্ট করন- অমনি একশ্রেনীর কমেন্টার এসে – ‘মুসলমানের বাচ্চারা এভাবেই আমাদের হিন্দুস্থানকে শুষে খাচ্ছে, দেশছাড়া কর কাটার বাচ্চাদের’। এবারে, একটা ভ্রমর ও ফুলের ছবি পোষ্টালেন, কমেন্ট আসবে- ‘এটা বিজেপি আর সঙ্ঘ পরিবার, আমার ফুলের মত ভারতদেশে ব্রিটিশদের পাচাঁটা জীবের দল হুল ফটাচ্ছে। ব্যাটা মধুহীন কালো কীটের দল’, ইত্যাদি। যারা যেকোনো বিষয়ে রাজনীতি এনে ফেলতে উস্তাদ, তেনারাই সেই বায়েন।
    • ধর্ম প্রচারক। কাকভোর থেকে গভীর রাত্রি পর্যন্ত এনারা নিজেদের টাইমলাইনে, শত শত গ্রুপে নিজেদের ধর্মসম্প্রদায় সম্বন্ধীয় পোষ্ট চিপকে দিয়ে পালাবেন। যেমন- মা মনসার ছবি, দেখা মাত্র শেয়ার করুন। কিম্বা- রাত্রে শুতে যাবার আগে কমেন্টে ১ হাজার আল্লাহ লেখা আসবে কি? কোথায় সব আল্লাহ ভীরুর দল! এই ধরনের ঝাঁট জ্বালানো পোষ্ট কারীর সংখ্যা নেহাত কম নয়।
    • ব্রতীর ৫১ পিঠ। একটাই পোষ্ট, তার গুরুত্ব থাকতেও পারে, আবার নাও পারে। কিছু জন আছেন, এনারা পৃথিবীর প্রায় সর্ব গ্রুপেই থাকেন। একটা পোষ্ট যদি কোথায় খুঁজে পান বা নিজে প্রসব করলেন, কয়েক মুহুর্তে অন্তত ৫১টা জনপ্রিয় গ্রুপে সেগুলো প্রচার ও প্রকাশ করে জাতিকে জাগ্রত করার কাজটা করবেন। আপনার চেনাজানা যে কটা গ্রুপ আছে, সর্বত্র দেখবেই সেই একই জনের একই পোষ্ট । টাইমলাইন জুড়ে বাকি সব ব্ল্যাক আউটের মত উবে যাবে ব্রতবাবুর প্রকোপে।
    • পেশাগত উন্নাসিক। এনারা কেউ চিকিৎসক, কেউ আমলা, কেউ উকিল, কেউ ইয়ে। নিজেদের পরিচিত সার্কেলের বাইরে এসে হরেক গ্রুপগুলোতে সিং ভেঙে বাছুরের দলে দিব্যি রয়েছেন। নিজেরা ইয়ার্কি ঠাট্টা করবেন তুরীয় মেজাজে, কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু অন্যেরা কেউ সেই একই মাত্রার ইয়ার্কি ওনাদের সাথে করলে, উনি সর্বপ্রথমে চরম বিরক্ত ও আহত হবেন, সংশ্লিষ্ট অবশিষ্ট জনেদের সাথে ওনার সামাজিক পেশাগত উচ্চতার কথা বারংবার মনে করিয়ে দিয়ে, খাপ পঞ্চায়েত বসাবেন।
    • সুচিন্তক। এনারা ত্রিসন্ধ্যা আপনার কিসে ভাল হবে, সে বিষয়ক নানান ছোটবড় জ্ঞানের বারিধারা তর্পন করতে থাকবেন নানান পোষ্টে, কমেন্ট বক্সে এমনকি আপনার ইনবক্সে পর্যন্ত।
    • ফেকুচরন তলাপাত্র। এদের নাম ‘লাল তারা’, ‘নীল চাকা’, ‘বাপের বখাটে’, ‘হরষিত উন্মাদ’ থেকে ‘পোলাও ঋষি’ যা কিছু হতে পারে। যারা নিজের নামে কম জনপ্রিয়, অপ্রিয় বা খিস্তিখাস্তা মারতে পারেনা তারা এমন বিচিত্র নাম নিয়ে দ্বৈত্ব সত্তার প্রচার ও প্রকাশ করে থাকেন।
    • সাংবাদিক। এনারা সকাল বিকাল নানান নিউজ লিঙ্ক পোষ্ট করতে থাকেন। কিছু জন এদের মধ্যে যারা গুরুঠাকুর, তাদের নিজেদের সাইট রয়েছে। তারা লিঙ্ক কম দেন, বরং তার সাইটের পাঠক সংখ্যা ঠিক কত, বা কত হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে সেটা আপনাকে জানিয়েই ছাড়বেন।
    • রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব। এনারা লাল, নীল, গেরুয়া সবুজ সকল বর্ণের হয়। অষ্টপ্রহর এনারা নিজ-দলের হয়ে প্রচার আর বিপক্ষদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ট্রল মিম ইত্যাদি করে চলেন। মহাবিশ্বের বাকি কোনো কিছুতেই এনাদের কোনো আকর্ষন থাকেনা। সমস্যা হয় বর্ণচোরাদের নিয়ে, সকালে বাম তো সন্ধ্যায় রাম, দুপুরে সবুজ, রাত্রে এক পাত্তর খেলেই অবুঝ। তখন কাঁচা খিস্তি দিয়ে আপনাকে রগরে দেবে রীতিমত।
    • সাম্প্রদায়িক উষ্কানি। আজই দেখছিলাম, একটা ধাঁধাঁ পোষ্ট হয়েছিল। একটি বাচ্চা ও একজন প্রাপ্তবয়স্কর তিনটে ছবি ছিল সেখানে- বলতে হবে কে কিডন্যাপার। একজন কমেন্টে লিখেছেন- তৃতীয়জন। সাথে এও লিখেছে- এ নিশ্চিত মুসলমান, বাচ্চা মেয়েটিকে ধর্ষন করবে। পচাগলা মানসিকতা। হিন্দু ধর্মের হলে এদের একমাত্র আলচনার বিষয়, মুসলমানেরা কেন অতোগুলো করে বিয়ে করবে, মক্কা যেহেতু শিব মন্দির, কবে সেটা ওদের ফিরত দেবে। বেদ, পুরাণ, মহাভারত পাঠে তাদের কোনো ইন্টারেস্ট নেই। তেমনি এরা মুসলমান হলে- হিন্দুরা কেন গোবর খায়, ব্রহ্মা কেন নিজ কন্যা সরস্বতীকে বিয়ে করেছিল ইত্যাদি নিয়ে এই দলের ভাবনার অন্ত নেই। কোরাণ বা হাদিস নিয়ে এদের কোনো ইন্টারেস্ট নেই। মহা হচ্ছে, এই দুই দলেরই কমন শত্রু নাস্তিকেরা, বাছাবাছা খিস্তি দেয় এদের। কেউ কেউ আবার স্বধর্মকে গালি দিয়ে সেকুলার সেজে বিপক্ষ গোষ্ঠীর কাছে হিরো হয়ে যায়। এদের এটাই কাজ সারাদিন ধরে।
    • পাঁকের কীটাণু। আপনি নাচুন, গান করেন, আবৃতি করুন, আড্ডা মারুন, গল্প লিখুন, কোনো কিছুতেই এরা ভুলেও আসবেনা। কোনো ধর্মীয় বা রাজনৈতিক উস্কানিমূলক পোষ্ট আসুক, অমনি নারায়ণী সেনার মত শূন্য থেকে দল দলে হাজির হয়ে, বাছা ও কাঁচা খিস্তি করে, আবার উধাউ হয়ে যাবে। এদের অনেককেই সেই পোষ্টেই দেখলেন জীবনে প্রথমবারের জন্য। মানে এই ধরনের পোষ্ট না হলে এদের কোনো এক্টিভিটি খুজেই পাবেননা। এরা পাঁকের শুয়োর, পাক না থাকলে এরাও অন্য নর্দমা খোঁজে।
    • অতৃপ্ত আত্মা। এনারা কোনো কিছুতেই খুশি হননা। ওধিকাংশই স্বামীবিচ্ছিন্না বা স্ত্রী বিয়োগ হয়েছে। অতৃপ্তির একটা কড়া বর্ম এদের শনির বলয়ের মত ঘিরে থাকে। এদের সাথে আধাঘণ্টা বাক্যালাপ করলে আপনি নিজেও আত্মহত্যা প্রবন হয়ে পড়বেন শিঘ্রই। ফেসবুকের অন্তত ২৫% প্রোফাইলই লিঙ্গভেদে অতৃপ্ত আত্মা।
    • ব্লকব্লকানি। কিছু হলেই এনারা ব্লক করে দেন, আবার খুলে দিয়ে কিছুদিন পর আবার ব্লক করে দেন। এই চক্রবাল ঘুড়তেই থাকে।
    • সাহিত্য বাসরের বর্ণনা। একটা শ্রেনী ‘গোলাপি শালিকের নীলচে গলা’ মার্কা কবিতা লিখে, সেটা বিভিন্ন বাসরে মোবাইল দেখে পাঠ করে শোনান। পরবর্তী এমনই আরেকটা বাসর আসা অবধি ওই প্রোগ্রামটারই ভিন্ন ভিন্ন এঙ্গেলের ছবি লাগাতার প্রকাশ করতে থাকবেন।
    • হিংসুটে কমেন্টার। এরা প্রথমে এসে খুব উৎসাহে কমেন্ট করবেন, কিছু যেই দেখবে অনেকগুলো কমেন্ট আরো হয়েছে, এবং তাতে ওনার চেয়েও ভাল ভাল বিশেষণে সুখ্যাতি বা ওনার চেয়েও মারাত্বক ধরনের গালি দিয়েছে, উনি হীনমন্যতাতে ভুগে প্রথমেই নিজের কমেন্ট ডিলিট করে দেবেন। পারলে অন্যের কমেন্টে গিয়ে ঝাল তোলা কমেন্ট করবেন। অনেক সময় আনফ্রেন্ড করে দেওয়া থেকে থেকে শুরু করে অকারণে ব্লক পর্যন্ত করে দিতে কসুর করেননা এনারা।
    • তৈলাক্ত কমেন্টার। বিশিষ্ট জনের পোষ্ট এলে তিনি কমেন্ট করতে আসবেনই আসবেন। দ্বিতীয় কোনো পোষ্টে তিনি কমেন্ট করবেননা, কিন্তু ঐ বিশেষ বিশেষ কেউ কমেন্ট করলেই তিনি তার কাঁধের ঝোলা থেকে কমেন্টের বর্মি বাক্স বেড় করে কমেন্টের তুবড়ি ছোটাবেন।।
    • বিরোধী পার্টি। ধরুন আপনি লিখলেন লাল গোপাল পছন্দ, সে বলবে আপনি সিপিএম। আপনি বলবেন কুমড়োর ছক্কা দিয়ে ভাত খেলাম, সে বলবে- বুঝেছি, ব্যাটা চাড্ডি। মানে আপনি যা ই বলবেন, তিনি এসে ঠিক তার উল্টো বিষয়টা বলবেনই বলবেন।
    • সর্বজ্ঞ। আঁতুড়ঘর থেকে শ্মশান যাত্রার মাঝে মানুষ যেখানে যেখানে যেতে পারে বা গেছে বা যাবার কল্পনা করেছে, এনারা সেই সকল স্থানের সর্বত্র গমন করতে পারেন অনায়াসে এবং সমস্ত বিষয়ে জ্ঞান রাখেন। আপনি যা ই পোষ্ট করে রাখুন, ঠিক দেখবেন এক আধা লাইনের একটা বাণী ছেড়ে গেছেন। এনারা সিধু জ্যাঠার উত্তরপুরুষ।
    • পরবর্তীর অপেক্ষাতে, চলুক…। এনারা স্তাবক নন, কিন্তু গুণমুগ্ধ বটে। ওদিকে নিজেকে খুব বেশি প্রকাশ করতে পারেননা নানা বিষয়ে। তাই এক্তিয়ারের বাইরে গিয়ে কোনো পোষ্টে কমেন্ট করতে বাধ্য হলে ওই উপরের শব্দ দুটো লিখে দেন- পরবর্তীর অপেক্ষাতে, কিম্বা চলুক।
    • ইমোজি রত্ন। আপনার পুত্রের খাতার লশাগু থেকে পোষা বেড়ালের কষা-গু, সর্বত্রই এনারা একটা থামস আপ বা ওই ধরনের ইমোজি সেঁটে দৌড়ে পালাবেন, অন্যত্র। কান্ডজ্ঞানহীন লাইক, লাভ সাইন, হা হা ইমোজি দিতে এনাদের জুড়ি নেই।
    • স্বভাব প্রেমিক। আপনি যদি মহিলা হন, তাহলে এনাদের আপনি প্রত্যক্ষ করতে পারবেন সহজেই। আপনি একটা যা কিছু খুশি পোষ্ট করে দেখুন, সে শুধুমাত্র আপনার রূপের প্রশংসাসূচক বানীই লিখে যাবে। পরবর্তীতে ইনবক্সে হানা দিলেও তাতে আশ্চর্যের কিচ্ছু নেই।
    • স্বভাব কবি। এনারা সর্বত্র ছন্দ খুঁজে পান। ধরুন কবিবর বর্ষায় যাচ্ছেন কোথাও, লিখবেন- ‘ হেব্বি বৃষ্টি মাথায় ছাতা/ পথে কে হেগেছে, এক্কেবারে যাতা’। আবার ধরুন ঘনিষ্ট কেউ মারা গেছেন- ‘ সমর গেছে স্বর্গলোকে, সংসারটা বেহাল/দুই বাচ্চার মা হলেও, বৌটা বেশ ডাগর মাল’। যে কোনো পরিস্থিতিতে চার লাইন নামিয়ে দিতে এনাদের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই।
    • ফিউসনিষ্ট। এনারা সব কিছুতেই ট্রাই মারেন। এদের পোষ্ট গুলো অনেকটা এমন হয়- ‘ইলিশ মাছের ডালনা রাঁধছি, কপিস জায়ফল বাটা দেব মাসী’? অথবা একটা এডিটেড ভিডিও বানালো, যেখানে সানি লিওনির পানুর সাথে রবিশঙ্করের সেতার আর পিট বুলের র‍্যাপ। আপনি বুঝতেই পারবেননা আপনার চোখ বুজে সেতার শোনা উচিৎ, নাকি ইমানদন্ডের ভৌত পরিবর্তনের সাথে যাওয়া উচিৎ, নাকি র‍্যাপের তালে হামহামগুড়িগুড়ি ডান্স করবেন। পুর ঘ্যেটে ঘ হয়ে যাবেন।
    • প্রশ্নদাদুর আসর। এনারা সবই জানেন, তার পরেও বোকা বোকা প্রশ্নের শেষ নেই, অনেক সময় তা যেথেষ্ট কন্ট্রোভার্সিয়ালও হয়। সেমন- ‘মোদী কেন প্রধানমন্ত্রী হল’, কিম্বা ‘ মুহাম্মদ (সাঃ) কেন মুসলমানেদের শেষ নবী’ ইত্যাদি। এদের আপনি শতবার বলুন যে জনগণের ভোটে জিতে মোদীজি প্রধানমন্ত্রী, বা যারা কোরান আর মুহাম্মদ (সাঃ) কে মানেন তারাই একমাত্র মুসলমান, সেখানেই লেখা আছে ওই শেষ নবীর বিষয়টা। কিন্তু মাস খানেক ঘুরতে না ঘুরতেই আবার সেই একই প্রশ্ন অন্য আঙ্গীকে এনে ঠিক হাজির করবেন।
    • নাহ, আর সব কিছু আগের মত নেই। এনারা কখনো কোথাও আসবেননা, মাঝে মাঝে অমাবস্যা পূর্ণিমার গাঁটের ব্যাথার মত উদয় হয়ে বলবেন- ‘নাহ আর সব আগের মত নেই’। শুধু এ টুকুই আর কিচ্ছুটি বলবেনা শত কমেন্টের জবাবেও।
    • টামিমলাইনে নেই, গ্রুপে আছে। এমন অনেক নমুনা আছে, গ্রুপের ভিতর তিনি দশমহাবিদ্যা পারদর্শী, কিন্তু টাইমলাইনে ডুবুরি নামালেও দুটো উই’য়ে খাওয়া ডিপি ভিন্ন আর কিচ্ছুটি পাবেননা।
    • খাইখাই। এই জাতিটা হেব্বি কিউট। এদের যাবতীয় পোষ্ট ও কমেন্ট গুলো জুড়ে খুশবুদার বিরিয়ানি, পোলাও, রসগোল্লা, কালিয়া, ফিরনি ইত্যাদির উপরেই নিমজ্জিত থাকে। এরা মোটেই হার্মফুল হননা। নির্বিরোধী কিন্তু হ্যাংলার একশেষ।
    • কাঠিবাজ। এরা শুধুমাত্র খোঁচা দিতে অভ্যস্ত, তাতে আপনি এদের যতই বাপান্ত করুন। আপনাকে ছেড়ে আবার অন্যত্র গিয়ে সেই একই অশান্তি শুরু করে দেবেন।
    • বিরহের মুর্ত প্রতীক। এরা কবিতা লেখে, সাথে একা নিঃসঙ্গ ছেলে বা মেয়ের ছবি দেবে। স্ট্যাটাস গুলো খানিক এমনতর হয়- ‘বেঁচে আছি আজও, তোমার অপেক্ষাতে’ বা ‘সুখে থেকো প্রিয়, আমার দ্বীর্ঘশ্বাসের ঝঞ্ঝা বয়ে আনুক সাগরের কৃষ্ণ বারিধারা, শীতল হয়ে তুমি আবার ভাবতে বোসো। দেখোতো আমার মুখটা মনে আসে কিনা’? কয়েক বার এই সব পোষ্ট পড়লে মনে হবে সুখ নামের শব্দটা আসলেই ইলিউশন, দুঃখ আর যন্ত্রনাই একমাত্র সত্য।
    • খিস্তিবাজ। ধরুন আপনি ফেসবুকে লেখা লিখেছেন, সেখানে একজন ‘ভাগ চুদির ভাই’ বলে কমেন্ট লিখে গেল। আপনি রাগবেন না শান্ত থাকবেন সেটা আপনার বিষয়, কিন্তু আপনি এটা বুঝলেন যে আপনি খিস্তিই খেয়েছেন। এখন আপনি এমন একটা পোষ্ট করেছেন, যেখানে বাকিরা সকলে ধন্য ধন্য করছে, সেখানে ওই খিস্তিবাজ এসে কমেন্ট করবে- ‘উরিশ্লার চুতিয়া, কি পোষ্ট চুদিয়েছো বাঁড়া, মারানে লেখককের পোঁদ মেরে দিলে যে আঠা আঠা করে’। এখন আপনি মাথা ঠুকে ঠুকে ফাটিয়ে ফেললেও বুঝে উঠতে পারবেননা, সে আপনাকে খিস্তি দিল না প্রশংসা করল। অতঙ্কগ্রস্থ করে দেবার মত বিষয়। অনেক সময় ভদ্র লেখকদের পোষ্টে কেউ বাজে কমেন্ট করলে, এমন খিস্তিবাজেদের হায়ার করে নিয়ে যান সেই লেখক। খিস্তিবাজেরা যে কোনো পরিস্থিতিতে, যাকে যেখানে খুশি খিস্তি দিতে পারে। তাই লেখকের পক্ষে কমেন্টারের গুষ্টি উদ্ধার করে বিশেষ শ্রেনীর বাহবা কুড়িয়ে নিতে এরা সিদ্ধহস্ত। 
    • সমাজসেবক। এনারা নাকে পোঁটা পথশিশু, চোখে পিঁচুটি খ্যাপাপাগল, লোলচর্ম গরীব বৃদ্ধবৃদ্ধা, শীতের গরীব পল্লিতে শীতবস্ত্র প্রদান অনুষ্ঠান, অনাথ বা বৃদ্ধাশ্রমে খাবার প্রদানের ছবি দিয়ে, হেব্বি লাইক কমেন্ট রোজগার করেন। অনেকে তাদের উপরে ছোটগল্প বা কবিতা লিখে বেদনার বঙ্গোপসাগর সহ পামির মালভূমির সাইজের হৃদয়ের প্রমান দাখিল করেন।
    • আমি চলে যাব কিন্তু…। এনারা দারুণ অভিমানী। হয়ত আপনি শ্যামকে গালি দিচ্ছেন, সে সেটা গায়ে টেনে নিয়ে বলবে- আমি কিন্তু চলে যাব। এখন শ্যামের স্থানে রহিম, বা রবীন্দ্র-নজরুল- জীবনানন্দ, শচিন, আক্রম, লিও- আর্কিমিডিস যিনিই হোকনা কেন, ওনার চলে যাওয়ার হুমকির কোনো পরিবর্তন হয়না।
    • আজ অনেককে তাড়ালাম। এনারা মাঝেমাঝেই টাইমলাইনে গুছিয়ে দু লাইনের বিজ্ঞাপন দেন- আজ ফ্রেন্ডলিষ্ট থেকে আগাছা মুক্ত করলাম। ভাবটা এমন যেন, এ খবরে আলিয়া ভাট শুটিং চলা কালীন অজ্ঞান হয়ে যাবে, বা ইভাংকা ট্রাম্প রেগে গিয়ে কিম জং উনের সোনাপোনাতে বাবাকে দিয়ে রকেট গুঁজে দেবে।  এনারা হচ্ছেন সেই প্রজাতির নমুনা যারা- পারেনা মারাতে, উঠে রাত থাকতে।
    • সুন্দরী বউ এর সাথে ছবি। এটাই এনাদের একমাত্র USP, ফেসবুকে আসার একমাত্র কারন। কোনো এক ভাগ্যক্রমে সুন্দরী স্ত্রী জুটে গেছে। সেই স্ত্রীর সাথে শুয়ে, বসে, ঘুমিয়ে, দাঁড়িয়ে, পোষাক পরে, আধা ন্যাংটা হয়ে, সোজা করে, উলটো করে মোটকথা ১০১ রকমের পোজে ছবি দিয়ে যুব সমাজে একটা নিজের পরিচিতি তৈরি করেন।
    • কচি সাজার অপচেষ্টা। কারোর ২৪শের পর আর বয়স বাড়েনি, কারো সেই নব্বয়েই দশকে জীবন থমকে। এরপর প্যারিসের শ্যেন নদী দিয়ে কোটি কোটি গ্যালন জল সমুদ্রে পৌঁছে গেলেও এনাদের সেই কচি বেলার ফ্রেঞ্চ কিসের অভিসার কোনো টাল খায়নি। জনগণ যতই যা বলুক এনারা কিন্তু নিজ সিদ্ধান্তে অবিচল থাকেন।
    • গান শোনানো। এনারা গান ছাড়া আর কিচ্ছু বোঝেননা। আপনার মুডের বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করেই এনারা আপনাকে তার পছন্দের গান শোনাতে কসুর করবেননা।
    • লাইভ মামনি। এনারা ছুতোনাতায় লাইভে আসে। মুড খারাপ হলেও আসেন, মুড বিন্দাস থাকলে তো কথাই নেই। নাকের ডান পাশের ৩৩ নম্বরের কুমারী ব্রণটা দেখাতে আসে। জন্মদিনে ১৯ নং বয়ফ্রেন্ডের দেওয়া, ২৬ সাইজের কেলভিন কেলিনের লঞ্জেরির লাইভ প্রদর্শনীতে এনারা সিদ্ধহস্ত। বাকি অন্য বিষয়ে এনাদের তেমন দড় না থাকলেও লাইভের কারনে এদের ফলোয়ার সংখ্যা গগনচুম্বী।
    • লাইভ শেয়ার। নেকু মামনিরা লাইভে এসে একটু উড়ু প্রদর্শন বা বক্ষ বিভাজিকা প্রদর্শন করে বলে- আমার ভিডিও যে বেশি বেশি শেয়ার করবে তাকে আমার ফোন নাম্বার দেব। ব্যাস, এই এক মন্ত্রে শয়ে শয়ে ক্যালানে কার্তিকের দল শেয়ার শুরু কর দেবে সর্বত্র।
    • ভিডিও শেয়ার। এরা সারাদিন শুধু ফেসবুকে ভিডিও ক্লিপস দেখেন। সামান্য একটু ভালো লাগলেই সেটা টাইমলাইন সহ হরেক গ্রুপে বিলিয়ে দিতে থাকেন অকাতরে।
    • অনলাইনে টাকা কামাও। এনারা হরেক প্রপোজাল নিয়ে বিজ্ঞাপনও দেন, কেউ ইনবক্সে এসেও হাজির হয়ে যান। দারুণ বন্ধুত্ব করে একমাত্র কাজ হচ্ছে- ‘অনলাইনে টাকা কামাও’ গষ্ঠীতে যুক্ত করা।
    • ছেলে মেয়ের ছবি। এনারা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আপন সন্তান, পোষ্য ইত্যাদির ছবি পোষ্ট করে যাবেন, আপনাকে ট্যাগ সহ।
    • ভ্রমণ বিলাসির ছবি। এনারা সারা বছরই কিভাবে যে ভ্রমণ করেন ভগাদাই জানেন। আর সেই ভ্রমণপথের গাদাগাদা ছবি দিয়ে আপনার টাইমলাইনে ট্রাফিক জাম করে দেবে বাকিদের। আপনি তাকে যতই বোঝান, তিনি থোরাই কেয়ার করেন।
    • অন্তরালের আত্মীয়। এনারা আপনার ধরা ছয়ার বাইরে। নির্দিষ্ট কারোর জন্যই ইনি ফসবুকে এসেছেন। তার বাইরে এদের কোনো এক্টিভিটি আপনি ট্রেসই করতে পারবেননা, কিন্তু সবুজ বাতি দেখে বুঝবেন তিনি শ্বাস নিচ্ছেন।
    • সেলফি বাজ। এটা সবচেয়ে ভয়ঙ্কর প্রজাতি। কারনে অকারণে লক্ষ কোটি সেলফিতে ফেসবুকের দেওয়াল ভরিয়ে তুলতে জুড়ি নেই। চোখ গুলুগুলু করে, ঠোঁট গোল করে, জিভ ভেঙচে ফুরসৎ পেলেই দু চারটে সেলিতি তুলে সেগুলো দেওয়ালে সেঁটে দেবে। প্রতিদিন একই লোকের থেকে একই ক্লিশে বিশেষন শুনে মোটেই ক্লান্ত হননা। নার্সিসিজম রোগে ভোগা এই নমুনা গুলোর যেন জন্মই হয়েছে সেলফিতে বাকিদের জীবন অতিষ্ট করে দেবার জন্য। হয়েক রকমের এ্যাপ ব্যবহার করে, কাত্যায়নীকে ক্যাট বানিয়ে আত্মরতির চরম পর্যায়ে নিয়ে যায় নিজেদের। অনেকে আবার নিজের অখাদ্য কবিতার বিজ্ঞাপনে নিজের থোবড়া ব্যবহার করে এমন লাইক কমেন্ট উপার্জন করেন রোজ, যে রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকলে আজ ওই লেভেলে পৌছাতেননা দেবতার গ্রাস লিখে।
    • অন্য শিল্পী। এনারা লেখালেখি ছাড়া বাকি সব কিছু করেন, এনাদের সাথে বহু জনের সহাবস্থান থেকে, মুলত এনারা কমেন্টার হন নিজেদের প্যাশনের বাইরে। কিন্তু শুধু মাত্র নিজেদের পোষ্টেই কমেন্ট করেন, অন্য কারো পোষ্টে যাননা, যেন অন্যত্র কমেন্ট করলেই সে একটা কিডনি চেয়ে বসবে। উন্নাসিকতার চুরান্ত নিদর্শন।
    • সেকেন্ড একাউন্ট। নিজেকে পরিচিত মহলে লুকাবার জন্য, কখনও কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ডের দোহায়তে, একটা প্রোফাইল উড়ে গেলে অনেকেই দ্বিতীয় বা তৃতীয় একাউন্ট বানিয়ে ছিলেন। সেক্ষেত্রে একই নামে অনেক একাউন্ট দেখা যায়। এদের একটা সময়ে একটা একাউন্টই খোলা থাকে, কিন্তু কোনটা খোলা সেটা আপনি ধরতে পারবেননা।
    • এঞ্জেল প্রিয়া- কিছু বলবনা। ফেসবুক দেবতা অভিশাপ দেবেন।
    • সি- ফেসবুকার, মানে সাইলেন্ট ফেসবুকার। এনারা ফেসবুকে থাকে, এনাদের গতি বিধি দেখলে মনে হয় কোমায় আছেন। আসলে না, এনারা শুধুই নেন কিছুই দেননা। এনারা পিওর গ্রহীতা শ্রেনীর।
    • আংরেজ কা অওলাদ। এনারা কারনে অকারণে ইংরাজিতে কমেন্ট করতে থাকবেন, আপনি অচিরেই হাল ছেড়ে দেবেন। আরেকটা দল রোমান ফন্টে বাংলা দিখে দিমাগ চেটে দেবেন লাগাতার।
    • সর্বশেষে আসেন তেনারা, যাদের নিঃশুল্ক শ্রমের কল্যাণে আজকের ফেসবুক এতোটা সুন্দর। ঘরের ঘেয়ে বনের মোষ তাড়ানো যে প্রবাদ, সেটাকে এনারা কিম্বদন্তীর পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। কয়েকজনকে নিয়ে গ্রুপ তৈরি করে, লোক জোগার করে হাট বসানো। সেই হাটে আরো পাহাড়াদার রাখা, খুঁজে খুঁজে পোষ্ট আনা, পোষ্টার বানানো, নতুন নতুন আইডিয়া আনা, রোজ কিছু জনকে ‘আজকের সেরা’ পুরস্কার প্রদান, গ্রুপে গ্রুপে শিল্প সাহিত্যিকদের বিশেষজ্ঞ প্যানেল তৈরি, সে নিয়ে মতাঐক্য, ল্যাং, কুৎসা, ও আরেক গ্রুপের জন্ম। এদের মধ্যে কাষ্ট সিস্টেম রয়েছে, বর্ণপ্রথা রয়েছে, শ্রমের বন্টন রয়েছে, চলমান সমাজদর্পন। শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ দর্শনের কলি’য় ভার্সন, এনারা অর্জুন। এনারা জীববিজ্ঞানের এ্যামিবা। ভরের নিত্যতা সুত্র। এনারা প্রায় সর্বজ্ঞ, এনারা এডমিন। গ্রুপ এডমিন।

হাফিয়ে গেছি মাইরি, সেই কখন থেকে লিখছি। আর পারলামনা। এবারে সেই কবিতাটা আবার শোনায় ,

‘যেথায় দেখিবে বাওয়াল

হেথায় গাড়িবে ফাল

পাইলেও পাইলেও পাইতে পারো

মন্ত্রপূত বাল’

আপাতত আমার কাছে ওই মন্ত্রপূত এক খেইই রয়েছে, সেটা নিয়েই আরেক প্রস্থ লিখে এবারের মত বিদেয় নেব। এই মন্ত্র মেনে আমি ফেসবুকের বিলুপ্তপ্রায় ‘মন্দার বোস’ জাতের গ্লোব ট্রটার। বাকিটা নিজেই বুঝে নিন নাহয়।

একটা শেষ ঘটনা বলিঃ-

আগেকার দিনে লেখক পরিচয়ে লেখা থাকত লেখক ‘ক’ বাবু পেশাতে ছিলেন শিক্ষক, ডাক্তার, মোক্তার বা ব্যবসায়ী ইত্যাদি। তিনি সারাজীবন সাহিত্য সাধনা করে গেছেন ইত্যাদি ইত্যাদি। যেমন প্রণম্য সাহিত্যিক বনফুলের জীবনীর একটা উদাহরণ দিই- “ছোটবেলা থেকেই বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ লক্ষ্য করা যায়। স্কুলে পড়ার সময়ে তিনি ‘বনফুল’ ছদ্মনামে কবিতা রচনা করেন। সম্পাদনা করেন বিকাশ (১৯১৫) নামে হাতে-লেখা একটি সাহিত্যপত্রিকা। তাতে প্রকাশিত হতো প্রবন্ধ, কবিতা, গল্প, অনুবাদ প্রভৃতি। এ সময় থেকে তাঁর সাহিত্যবিষয়ক রচনা প্রকাশিত হয় ভারতী (১৮৭৭), প্রবাসী (১৯০১), কল্লোল (১৯২৩) প্রভৃতি বিখ্যাত পত্রিকায়। এসব পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর কবিতার নিখুঁত ছন্দ এবং গল্পের বিষয় নির্বাচন ও ভাষার ওপর দক্ষতা পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তাঁর কবিতার প্রধান বিষয় নিসর্গ চেতনা, প্রেম ও আত্ম-উপলব্ধি। কবিতার আঙ্গিক বিবেচনায় লক্ষ করা যায়, তিনি লিখেছেন দীর্ঘকবিতা, গদ্যপদ্যের মিশ্রণজাত কবিতা, সনেট, হাইকু প্রভৃতি। বাংলা কবিতার আধুনিক ধারার সঙ্গে তাঁর কোনো সংযোগ ছিল না; তিনি ছন্দমিলের পুরানো ধাঁচেই কবিতা লিখেছেন। বনফুলের কবিতা (১৯৩৬), অঙ্গারপর্ণী (১৯৪০), চতুর্দশী (১৯৪০), আহবনীয় (১৯৪৩), করকমলেষু (১৯৪৯), বনফুলের ব্যঙ্গ কবিতা (১৯৫৮), নতুন বাঁকে (১৯৫৯) প্রভৃতি তাঁর কাব্য সংকলন”।

এখন ধরুন আপনার চরম অভিশাপের কবলে পরে জনৈক মণ্ডল বাবুও মহান না হোক, কুচো সাহিত্যিকের সরণির পথিক হয়ে গেলেন। ২০৪০ সালের উইকিপিড়িয়াতে তখন তার সম্বন্ধে লেখক পরিচিতিতে লেখাটা কেমন থাকতে পারে?-

“ছোটবেলা থেকেই মণ্ডল মহাশয়ের সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ লক্ষ্য করা যায়, স্কুল থেকে ফেরার পথে ব্যাগে করে হলুদ সেলোফেন কাগজে মোড়া বটতলা সাহিত্যের প্রতি নিগুঢ় আকৃষ্টতা কৈশোরেই আজকের সফলতার সূচনা লগ্ন ছিল তা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়। এছাড়া জুয়ার প্রতি একটা ভয়ানক টান অনুভব করতেন, এটা তাঁর জীবনস্মৃতি গ্রন্থে (২০৩১) নিজেই উল্লেখ করেছেন। পেশাতে তিনি ছিলেন কেন্দ্রীয় শুল্ক দপ্তরের পদস্থ কর্মী। সেই সুত্রে বাংলার বিভিন্ন স্থানে বদলিতে যেতে হত। এবং অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন। ফেসবুকে এসে পড়ার সময়ে তিনি ‘উন্মাদ’ ছদ্মনামে খিস্তি সমৃদ্ধ দর্শন রচনা শুরু করেন, নিজের টাইমলাইনে। পরবর্তীতে পথের দাবী (২০১৬) নামের একটি ভার্চুয়াল গ্রুপ করেন মিজানুরকে সাথে নিয়ে। পরে হকে সাহেবের অকপট নামের একটি ফেসবুকে গ্রুপে এসে ওনার সাহিত্য চর্চাতে দিগন্ত খুলে যায়। সেখানে নানান ধর্মীয় নাস্তিকতা ও রাজনৈতিক ভাবধারা ও ‘অকপট আর আগের মত নেই’ পোষ্টের ভিড়ে নিয়মিত সাহিত্য চর্চা করতেন। যাদের মধ্যে কুড়ির ঝুড়ি, অল্পকথায় গল্প, আমার ছাত্র জীবন সাহিত্যবাসরের কথা উল্লেখযোগ্য। পর্দার আড়াল হতে সম্পাদনা করেন অকপট সাহিত্য পত্রিকা (২০১৭) নামে কাগজে ছাপা একটি সাহিত্যপত্রিকা। তাতে প্রকাশিত হতো প্রবন্ধ, কবিতা, গল্প, অনুবাদ প্রভৃতি। এ সময় থেকে তার সাহিত্যবিষয়ক রচনা প্রকাশিত হয় গুরুচন্ডালী (২০১০), বইপোকা (২০১৩), গর্বের ৩৪ বছর (২০১৭), খেলার জগৎ (২০১৮), বসিরহাট (২০১৬), দ্যা টিচার্স রুম (২০১৪) প্রভৃতি বিখ্যাত ফেসবুক গ্রুপে। এসব পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধের নিখুঁত বিন্যাস এবং গল্পের বিষয় নির্বাচন ও ভাষার ওপর দক্ষতা পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তাঁর রচনাএ প্রধান বিষয় রাজনৈতিক চেতনা, প্রেম, ভ্রমণ ও আত্ম-উপলব্ধি। প্রবন্ধের আঙ্গিক বিবেচনায় লক্ষ করা যায়, তিনি লিখেছেন ভ্রমণ কাহিনী, গদ্য মিশ্রণজাত স্মৃতিকথা, হাস্যরস, সংগৃহীত প্রজাতির রচনা, প্রভৃতি। বাংলা কবিতার আধুনিক ধারার সঙ্গে তাঁর কোনো সংযোগ ছিল না; তিনি খেলাধুলা, প্রবন্ধ ইত্যদি পুরানো ধাঁচেই রচনা লিখেছেন। মণ্ডল বাবুর রচিত কিছু জনপ্রিয় পুস্তক হল- জ্ঞান ও উন্মেষ (২০১৯), প্রবঞ্চক্ষণে প্রণয় (২০২০), দুয়ার্সের চা বাগান (২০২১), এবং সুচরিতা (২০২২), বসির মিঞার হাট (২০২৩), বামপন্থার প্রাসঙ্গিকথা (২০২৫), মণ্ডলবাড়ির আটচাল (২০২৭) প্রভৃতি তাঁর কাব্য ও প্রবন্ধ সংকলন। আগামীতে তিনি ভারতবর্ষের ‘সোনালী চতুর্ভুজ’ নামের উপন্যাস নিয়ে ভারত ভ্রমণে ব্যাস্ত”।

এবার আপনার বলার পালা-

@tanmay haque

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *