চারমিনারে শেষ টান দিয়ে সেটাকে ক্যারামের স্ট্রাইকারের মতো দুই আঙ্গুলের সাহায্যে জানলা দিয়ে বাইরে ফেলে দিয়ে ভদ্রলোক মুখার্জি বাবুর দিকে ফিরলেন।

বয়সের ভার একটু হলেও আগের সেই ঋজু দেহটাকে কিঞ্চিৎ ঝুঁকিয়ে দিয়েছে। তবে পরিমিত আহার বলেই ( সামনের টেবিলে রাখা গুঁড়ো চিনির প্যাকেট গুলোয় হাত পড়েনি) হয়তো সেই ভাবে বৃদ্ধ হতে দেয়নি।
ঢিলে আদ্দির পাঞ্জাবির হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে রাখা অবস্থায় একবার আড়মোড়া ভেঙে শুরু করলেন, “আমি আর নতুন কেস নিই না মুখার্জি বাবু।” 

– “কিন্তু মি. মিত্তির, আপনি ছাড়া এই ব্যাপারে কেউ আমাকে সাহায্য করতে পারবেন না। একটু দেখুন প্লীজ। ম্যাডাম খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে আছেন। সামনে ইলেকসান… এখন..”

– “রাজনৈতিক মামলা আমি নিইনা। সে গুলো আমার গুরু হোমস নিতেন। আপনি বরং তার কাছেই…”

– “গিয়েছিলাম স্যার। কিন্তু মৌমাছির ওপর গবেষণায় সিদ্ধ বলে ওনাকে ম্যাডাম অলরেডি ডেঙির মশা নিয়ে কিছু কাজ দিয়েছেন। উনি এখন সেই কাজেই ব্যস্ত…”

-” ব্যোমকেশদা কি করছেন? তাঁকে গিয়ে বলুন।”

– ” স্যার, সেখানেও গিয়েছিলাম। কিন্তু ওনার এখন এক মুহুর্ত সময় নেই। খোকার খোকা হয়েছে কি না… উনি এখন নাতি নিয়েই ব্যস্ত।”

– ” আপনারা প্রজ্ঞাপারমিতা মুখার্জির সাথে…”

– ” কি আর বলি স্যার, এটাই আমাদের সমাজের দূর্ভাগ্য। মিসেস মুখার্জির ছেলে বুম বুম সামনের বার icse দেবে। তাই উনি এখন আর নতুন কোনো কেস…”

– ” বুঝেছি। সব ঘাট পেড়িয়েই তারপর আপনি আমার কাছে এসেছেন। “

– ” এই ভাবে লজ্জা দেবেন না স্যার। আপনি কোলকাতায় আছেন সেটাই জানতাম না। তা এই সেদিন আপকার কাজিন এর সাথে বেঙ্গল চেম্বার্সে দেখা হলো। সমস্যাটা শুনে উনিই আপনার কাছে আসতে বল্লেন…”

কথা হচ্ছিলো রজনী সেন রোডের একটা পুরোনো আমলের বাড়ির একতলায় বসে। বাড়ির বর্তমান মালিক প্রদোষ মিত্র, মি. মিত্তির বা ফেলুদা ওরফে ফেলুবাবু নামে যিনি খ্যাত তার সাথে রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের বরিষ্ঠ আই পি এস মুখার্জিবাবুর। একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি মামলার ব্যাপারে মুখার্জি বাবুকে মি. মিত্তিরের কাছে আসতে হয়েছে।

নোটবন্দীর পর অন্য একটা বিষয়ের তদন্ত করতে গিয়ে মগনলাল আগরওয়ালের বাড়ির ড্রয়ার থেকে একটা ডাইয়েরী উদ্ধার হয়৷ তাতে অনেক অনামী নামের সাথে এক গুরুত্ব পূর্ণ ব্যক্তির নামে ৩৪৫ কোটি টাকা বে আইনি লেনেদেনের হদিশ মেলে। সম্প্রতি সেই ডাইয়েরী মুখার্জি বাবুর অফিসের ড্রয়ার থেকে খোয়া যায়৷ বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা।

পুলিশের হেফাজত থেকে ডকুমেন্ট গায়েব৷ ওনার চাকরী নিয়ে টানাটানি। ফেলুদার কাছে গোপনে উদ্ধার করার আর্জি নিয়ে মুখার্জি বাবু ট্যাক্সি করে হাজির।

রজনীসেন রোডের বাড়িটা নতুন সরকার ফেলুদার বাবার নামে “জয়কৃষ্ণ মিত্র ধরনী” নাম দিলেও তা এখনও লোকমুখে প্রচলিত হয়নি, ঠিক যেভাবে শত প্ররোচনাতেও উনি রাজনীতির কানা গলিতে প্রবেশ করেনিনি। বৃদ্ধ বয়সে এসে আজকাল ফেলুদা ওনার পিতার পথে হেঁটেই মেধাবী দুঃস্থ ছাত্রদের অবৈতনিক অঙ্কের ক্লাস নেন।

তপেশের চাটার্ড একাউন্টের একটা ফার্ম রয়েছে লালবাজারে ‘সেন টি কোম্পানির’ তেতলাতে, যথেষ্ট ভাল ওর পসার, তার পরেও প্রতি সন্ধ্যায় বাড়ি যাবার আগে ফেলুদার কাছে আসা চাই ই চাই, সে শীত গ্রীষ্ম বর্ষা যা ই হোক। বৈকাল ঘনিয়ে সন্ধ্যা হব হব, মুখার্জী বাবু জানেন তপেশ না আসা পর্যন্ত ফেলুদা কিচ্ছুটি রা কাটবেননা। ইতিমধ্যে চাকর সম্ভু এসে একপ্রস্থ চা আর নিধুর গরম গরম ভেজিটেবল চপ পরিবেশন করে গেছে। ফেলুদা দ্যা হিন্দুর সম্পাদকীয়তে চোখ রেখে বসে আছে। ঘরে আনন্দবাজার, এই সময়, সংবাদ প্রতিদিনের মত সংবাদপত্রও টেবিলের উপরে রয়েছে।

নিচে মোটরের শব্দে মুখার্জী বাবু ভাবলেন এই বোধহয় তপেশ এসে পৌছালো, কিন্তু যিনি ঘরে ঢুকলেন তিনি অবিকল ঈশ্বর লালমোহনবাবুর ওরফে জটায়ুর কার্বনকপি। মুখার্জী বাবু ভীষণ ভাবে ঘাবড়ে গিয়ে বল্লেন- জটায়ু মারা গেছেন আজ ৭ বছর হল, নিমতলা শ্মশানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদাতে মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছিল, আমি নিজে ম্যাডামের সাথে সাথে তখন ছিলাম, আপনি…। মুখার্জী বাবুর মুখ হা হয়ে রইল।

ফেলুদা হাতের কাগজটা চার ভাঁজ করে টেবিলে রাখতে রাখতে বল্লেন- জিনের অদ্ভুত চরিত্র সম্বন্ধে কিছু  জানেন? জিনতত্ত্ব। মেন্ডেলিয় আর আনবিক জিনতত্ত্ব অনুযায়ী প্রকট আর প্রচ্ছন্ন জিনের খেলাতে মাতুলান্যায় দর্শন অস্বাভাবিক কিছু নয়। সন্তোষ তেমনই তার মামার মত দর্শন ও চরিত্রের অধিকারী হয়েছে, আমার খুব ন্যাওটা। পেশাতে ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক, কিন্তু আজগুবি বাংলাটা মামার মতই লেখে। আমিও শুরুতে বেশ অবাক হয়ে গেছিলাম, কিন্তু সিধু জ্যাঠার কল্যাণে সব পরিষ্কার হয়ে গেল। মুখার্জী বাবুর এবারে দ্বিতীয়বার অবাক হওয়ার পালা, তিনি ওই হা মুখ দিয়েই অস্পষ্ট উচ্চারণ করে বললেন- সিধু জ্যাঠাও এখনও বেঁচে? ফেলুদা একটু মুচকি হেসে, ‘চেন্নাইয়ের চমক’ রহস্যের কিনারা করে দেওয়ার দরুন মিঃ ‘থিরিমানে’ যে আইফোনটি উপহার দিয়েছিলেন সেটার স্ক্রিনে ‘উইকিপিডিয়া’ পেজটা দেখালেন।

এতক্ষণে লালমোহন বাবু সদৃশ্য ব্যাক্তিটি কথা বলে উঠলেন- আরে মোহায়, এরা জানে কট্টুকু, সিধু জ্যাঠাকেই তো হুবহু টুকে নিয়ে এটা বানিয়েছে সাহেবগুলো। ইয়ে, এ অধমের নাম সন্তোষমোহন গাঙ্গুলী। মামার ওই জটায়ু নামটাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি আরকি। ফেলুদা বললেন- ফেসবুকে পেজও বানিয়ে চাট্টি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন সেটাও বলো। সন্তোষমোহন বাবু লজ্জায় একটু জিভে চুক চুক আওয়াজ করে নিয়ে বল্লেন- ফেলুদাকে তো আর ও রাস্তায় নিয়ে যেতে পারলামনা, আমি আর যুগের হাওয়া বাঁচিয়ে চলি কতক্ষণ, তাই অগত্যা।

ফেলুদা চাকর সম্ভুকে ডেকে ঘরে জানালা গুলো বন্ধ করতে বলে বললেন- জানালা খোলা থাকলে আর দেখতে হবেনা, আমার গ্রুপের রক্ত অমিল। সন্তোষ বাবু বললেন- একটু খোলা চামড়া দেখেছে কি শত্রুপক্ষের কামানের গোলার মত মশককুল হামলা করে বসবে।

সিঁড়ি পথে থপথপে আওয়াজে সন্তোষ বাবু বলে উঠল- ওই বোধহয় তপেশ ভাই এলো। স্থুল বপু তপেশের চুলে পাক ধরেছে, কিন্তু থাইরয়েডের প্রকোপে ওকে ফেলুদার চেয়েও অধিবৃদ্ধ দেখাচ্ছে। ধপ করে সোফায় বসে ঘাম মুছতে মুছতে বলল- তপেশ বলল- সন্তষদা, মামার মত আপনিও দেখছি মাদ্রাজি সবুজ রঙের একখান মারুতি যোগাড় করেছেন।

এবারে ফেলুদার দিকে চেয়ে বলল- ভেবেছিলাম ফাইল কিছু বাড়বে এবছর, তা তো হলইনা, উলটে এবারে বাজার ভীষণ মন্দা, বাজারে নগদের ঘাটতি। ফেলুদা বললেন- টাকা যা ছিল সবই ওই ছগনলালদের মত শিল্পপতির দল লুটে নিয়েছে, মগনলালের যোগ্য সন্তান বটে। মুখার্জী বাবুর দিকে উদ্দেশ্য করে বল্লেন- আপনি কাগজপত্রগুলো আমাদের মেল করে দিন, রাত্রে একটু স্টাডি করে নিয়ে কাল কথা বলে নেব, তোপশে- আমাদের একটা গ্রুপ চ্যাট বানিয়ে নে। আর কিছু কি সন্দেহ করছেন?

মুখার্জী বাবু বললেন- আমার সন্দেহ ওই বেনামি সম্পত্তি দিয়ে কাশ্মীরে লগ্নি করতে পারে, একটা আড়কাঠিকে ধরেছিলাম, সে কাশ্মীরি শাল বিক্রির আড়ালে হাওলার কাজ করত। আমাদের দপ্তরের নিন্মপদস্থ কেউ জড়িত আছে। রাজনৈতিক চাপ তো বোঝেন, তাই স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে না পেরেই আপনার স্মরণাপন, আপনি কাল্ট ফিগার, নবান্ন হোক বা সাউথ ব্লক, আপনাকে কে আঁটকায়। ছগনলালের টাকা ওই শালওয়ালার মাধ্যমেই কাশ্মীরে পৌছেছে। এখন সেই টাকা যে ছগনের সেটা প্রমানের পাশাপাশি আর বামালও উদ্ধার করতে হবে ফেলুবাবু।

সন্তোষ বাবু প্রায় লাফ দিয়ে বাচ্চাদের মত হাততালি দিয়ে উঠল, বলল- মামার ভূস্বর্গে ভয়ঙ্কর গল্পে প্রখর রুদ্রের অভিযানের কথা পড়া ইস্তক কাশ্মীর যাবার শখ, সেটা মনে হয় এবারে পূর্ণ হবে।

ফেলুদা বললেন- এই অশান্ত সময়ে কাশ্মীর! মুখার্জী বাবু অভয় দিয়ে বল্লেন- সমস্যা নেই, সরকারি খাতির ও সুরক্ষা দুটোই পাবেন। তপেশ বলল- জম্মুতে আমার ক্লায়েন্ট রওশন বেগ আছে, স্থানীয় বড় ফল ব্যাবসায়ী, আমাদের কোনো সমস্যা হবেনা। ফেলুদা বল্লেন- তোমারও কি মামার মত জ্যোতিষের কাছে আবার অভ্যাস আছে সন্তোষ? সন্তোষ বাবু কুতুকুতু চোখে বল্লেন- আলবাৎ, মামার বিখ্যাত উক্তি ‘ট্রাভেল ব্রডনস দি মাইন্ডস’ আমিও মেনে চলি ফেলুদা, মেচেদার ভবেশ ঠাকুরের ছেলে তার বাপের চেয়েও বড় সংখ্যাতত্ববিদ, নরশচন্দ্র ভট্টাচার্য। দমদমে চেম্বার, উনাকে কিছু মুখে বলতে হয়না, কপালে দৃষ্টিপাত করেই ভাগ্যগণনা করতে পারেন। কিসের পটভূমিকাতে লেখা বললেই উপন্যাসের নাম বলে দেন। সিজিত থেকে আমাদের ওই হালিশহরের চক্কোত্তি ছোঁড়াটা, সবার কপাল খুলে দিয়েছে নরেশ ভচ্চায্যি। এই ফেসবুকের যুগেও আনন্দ পুরস্কার বাঁধা, তার উপরে সানডে সাপসেন্স, ফিল্ম রাইটস, অনলাইন সত্ত্ব- সব বিয়য়ে মন্ত্রপূত তাবিজ দিয়ে গোটাটা রেডি করে দেন। আজই কাশ্মীরের উপরে এক নাম বেছে দেবার জন্য হোয়াটসএপে জানিয়ে দিচ্ছি।

…ক্রমশ

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *