আজ প্রায় সপ্তাহকালের অধিক সময় ধরে #আমারছাত্রজীবন শীর্ষক স্মৃতিচারণ পর্বটি যথেষ্ট ঈর্ষনীয় ভাবে পাঠককুলকে সন্তোষ প্রদান করে চলেছে। অকপটের কাছে আমি চিরঋণী এমন আন্তরিকভাবে পরিচালনা করার জন্য। ধারাপাত, বর্ণপরিচয়, নামতা, হ্যারিকেনের বাতি, ২ পয়সার আচারের গল্প আমাদের নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করেছে ছত্রে ছত্রে। তাই আমি এক্কেবারে ওই শিশু দশার বর্ণনা না করে ছাত্রজীবনের একটা বিরাম অধ্যয়ের সংক্ষিপ্ত বিবরণ বর্ননা করব। 

ভজন মামা বলতেন- ব্যাটা, হাঁস হয়ে যা হাঁস। জলে থাকবি কিন্তু গা ভিজবেনা, উবু হয়ে ডুব দিবি জ্ঞানসাগরে, প্রতিবারই ঠিক কিছুনা কিছু গেঁড়ি গুগলি পাবিই। খিদে তৈরি করতে হবে অন্তরে, খিদে। পেটের খিদে নয়, ওটার অধিকাংশটাই মল হয়ে বেরিয়ে যাবে। জ্ঞানের খিদে থাকলে তাকে আটকে রাখার সাধ্যি কোনো পার্থিব শক্তির নেই। জ্ঞান কখনো বোঝা হয়না, বরং পালকের মত হালকা হয়ে। ব্রহ্মজ্ঞানের যদি হদিশ পেয়ে যাস তাহলে এই নশ্বর দেহটা মূল্যহীন হয়ে যায়। তাই পড়াশোনা কর, রোজদিনকার ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে সেটাতে সম্পৃক্ত হয়ে আগামীতে প্রয়োগ করলেই একজন সফল মানুষ হবি, সুখী হবি।

আমি তখন দুরন্ত কিশোর। বাবার বদলির চাকরীর দরুন মাসের অধিকাংশ দিনিই প্রবাসে থাকতেন। মা ধর্মকর্ম নিয়েই মেতে থাকতেন, অভিভাবক বলতে ভজন মামা। তিনিও খুব একটা সময় যে আমার পিছনে ব্যায় করতেন তা নয়, ফলত যা হবার সেটাই হয়েছিল। পাড়ার কিছু লম্পট বন্ধুদের পাল্লায় পরে বড়বাজারে সাট্টার ঠেকে আনাগোনা বাড়ল, রোববারে রেসের মাঠে নিয়মিত হয়ে পড়লাম ২৫ পয়সার টিকিটের গ্যালারিতে। প্লেস, দোনালা, টানালা খুচখাচ আমদানির মাঝে একআধটা জ্যাকপটও এসে যেতে লাগল। সেখানকার কামাই দিয়ে- বৌবাজারের নিষিদ্ধ পল্লিতে পর্যন্ত যাওয়া শুরু হল। গঞ্জিকা ও কারণ সেবন সহ নানান নিষিদ্ধ রঙিন মৌতাতের নেশায় তখন বুঁদ। দিনেদিনে লাম্পট্য পরিস্থিতির বাইরে যাওয়ার উপক্রম হয়ে উঠল।

বরাহনগর দীর্ঘদিন কোলকাতার পাশে থেকেও নিজের স্বতন্ত্রতা বজায় রেখেছিল। কোলকাতার বুকে হাতেটানা রিক্সা চললেও এখানে কিন্তু প্যাডেল রিক্সা চলত। আধুনা রাজারহাট-নিইটাউন নিবাসী বন্ধুরাও কোলকাতা বলেই পরিচয় দেন, কিন্তু আমাদের সময়ে বরাহনগর নিজ নামেই পরিচয় দিত, অদূরের টালা ট্যাঙ্ককে সাক্ষী রেখে। মায়ের বাবা চাকুরিসুত্রে মহারাষ্ট্রের অমরাবতী জেলার ছোট্ট টুলির স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেছিলেন। স্বভাবতই ওনাদের সাথে যোগাযোগ খুবই কম ছিল। ভজন মামা মায়ের আপন ভাই ছিলেননা, গুরুভাই। বাবা মা সহ ওনারা তিনজনেরই দীক্ষাগুরু ছিলেন বরাহনগরের প্রভুমহারাজ। সেই সুত্রেই এই সম্পর্ক স্থাপন। এই মামাই ছিলেন মায়ের বাবা, দাদা সহ সকল ধরনের পরমাত্মীয়। গুরুর আদেশে ভজন মামাই আমাদের সংসারের অলিখিত অভিভাবক ছিলেন। মামা প্রায় বাবার দ্বিগুন বয়সী বৃদ্ধ মানুষ ছিলেন, গেরুয়া বস্ত্রাধারী অত্যন্ত ধীরস্থির। স্কুলজীবনের আঁশটে গন্ধ নিয়ে সে বছরই আমি কলেজে উঠেছি। মামা কলা বিভাগে ভর্তি করে দিল স্থানীয় পিসিএম কলেজে। অনেকের মতই আমারও মনে হয়েছিল অনেকটা বড় হয়ে গেছি। সেখানের ছাত্রসংসদের কিছু সাথীদের সংস্পর্শে এসে ধীরে ধীরে নকশাল আন্দোলনের প্রতি জড়িয়ে যাওয়া ছিল এক অলঙ্ঘ্যনীয় নিয়তি।

কলেজে ভর্তির কিছুদিনের মধ্যেই মামা বললেন- কানু চল, তোকেও একবার প্রভুমহারাজের কাছে নিয়ে যাব। দেখবি তোর চঞ্চলতা কেটে যাবে। কয়েক দিনের মধ্যেই মা ও মামার সাথে আশ্রমে গেলাম। দেখি এক শান্ত সৌম্য মুণ্ডিতমস্তকের সহাস্য মুর্তি। প্রণাম করে কাছে বসতেই বললেন মহারাজ বললেন- ।। দীক্ষা মূলং জপং সর্বং দীক্ষা মূলং পরং তপঃ, দীক্ষামাশ্রিত্য নিবসেৎ কৃত্রশ্রমে বসদ।। ঈশ্বরের নৈকট্য সকলে অর্জন করতে পারেনা, সেক্ষেত্রে উপায় একমাত্র গুরুকে দেবজ্ঞানে পূজা করা। এ ছেলের গুরুস্থান খুবই দূর্বল, আত্মা অতি চঞ্চল, স্মৃতি দূর্বল। ব্যায়াম দরকার, মগজের ব্যায়াম। পরিব্রাজনে না গেলে তেমন কোনো আশা নেই, স্বদেশে তোর বিদ্যার্জন নেই। জ্ঞানান্বেষণে অভিপ্রয়াণে গেলে বৈদগ্ধ হবার সম্ভাবনা অতি উজ্জ্বল। মা আমার আতঙ্কে কেঁদে উঠলেন- গুরুদেব, কতইবা ওর বয়স। কিকরে ও বিভূঁইতে থাকবে? আমিই বা ওকে ছেড়ে কিভাবে থাকব? মহারাজ বললেন- তুই তো মা, মা কি সন্তানের মঙ্গল চায়না? ইঙ্গিতপূর্ণ মৃদু হেসে তিনি ধ্যান সমাধি নিলেন।

বাবার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হল, তিনিও জানলেন যে, ছেলে বোমা গুলি আগ্নেয়াস্ত্রর প্রতি এমনই আশক্ত- যেকোনো সময় প্রাণহানি ঘটতে পারে। এছাড়া রাষ্ট্রীয় খাঁড়া যখন তখন নেমে এলে পারিবারিক সম্মান ভুলুন্ঠিন হবে। যেকোনো মূল্যে আমাকে সেই মুহুর্তে কোলকাতা থেকে তাড়ানোই ছিল প্রথম কার্য। বাবা বিচক্ষণ মানুষ, গুরুদেবের কথাকে ধ্রুব সত্য মেনে আগামীর পরিকল্পনা স্থির করলেন। আমি বুঝে উঠতে পারিনি- যে ছেলে কলেজে পড়ার সুযোগ পায়, তার কিভাবে আশা থাকতে পারেনা। তাছাড়া অনেক সহপাঠিরই ঝোলাতে হাতবোমা, পিস্তল থাকে, শুধু আমার ক্ষেত্রে দোষ কেন? অগত্যা সিদ্ধান্ত হল আগামী কয়েক বৎসর পরবাসে থেকে পড়াশোনা করতে হবে। যদি দেখা যায় আশানুরুপ চারিত্রিক উন্নতি হচ্ছে, তখন আবার কোলকাতায় ফিরিয়ে আনা হবে। বিড়ম্বনার চুরান্ত। কিন্তু প্রবাস মানে কোন সে দেশ? গুরুদেবের আরেক শিষ্য তার সমাধান করলেন।

লোকে বলে বার্ধক্যের বারানসী, আমি কৈশোরেই বারানসী প্রাপ্ত হলাম। মনিকর্ণিকা ঘাটের এক আশ্রমপতি ভিক্ষু মহারাজের আস্তানাতে আমার নিবাস বরাদ্দ হল। শিক্ষাবর্ষ তখন শুরু হয়ে গেছে, তদসত্বেও ইতিহাস বিভাগে একটা সুযোগ সৃষ্টি করে আমাকে প্রবেশন করানো গেল। একপ্রকারের রাতারাতি এই প্রব্রজনের কারনে মনোজগতে এক অদ্ভুতপ্রকারের চপলতা সৃষ্টি হল। দিনে দিনে অচেনা অজানা স্থানে ভাষার ব্যবধান আমাকে বান্ধবহীন ও অন্তর্মুখী করে তুলল। আশ্রম মহারাজ শ্রী বিপ্লব ভট্টের দৈনন্দিন ন্যায়সঙ্গ ও নীতিবচন আমার দণ্ডার্হ ভাবের প্রশমন ঘটিয়ে পুণ্যাত্মার অভ্যুত্থান ঘটাতে শুরু করল। শুরুতে এটা পড়াশোনার প্রতি মননিবেশে সহায়ক হলেও ক্রমেই আমার মধ্যে বৈরাগ্য ভাবের অধিক্য প্রকট হল। ব্রহ্মজ্ঞানার্জের জন্য তপস্যা অভিলাষ জন্ম নিল, ভ্রমণের নেশা রক্তেই ছিল।

ক্রমে অষ্টাদশবর্ষে উত্তীর্ণ হয়ে দ্বাদশ শ্রেনীর বাৎসরিক পরীক্ষা দিয়ে কোলকাতা না ফিরে, কুম্ভ ফিরৎ একটি সাধু সঙ্গের সাথে হিমালয়ের দিকে অনির্দিষ্ট সময় যাত্রা শুরু করলাম। অসৎ সঙ্গের আমিষাহার সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করে সেলাই বিহীন কাপড়, পুঁটুলি, খড়ম ও একটা যষ্টি নিয়ে রওনা দিলাম, লক্ষ্য কেদারনাথ। এমন নিরাসক্ত সদ্য যুবার সন্ধান পেয়ে অনেক গুরুই আমাকে শিষ্য হিসাবে গ্রহণে ইচ্ছুক হলেও আমি স্বামী প্রসুনাচার্যের অনুচর হলাম। নিয়মিত শ্রবণ, মনন ও নিদিধ্যাসনের কল্যাণে ততদিনে পরলৌকিকতা ও চতুর্থ পুরুষার্থ লিপ্সা আমার সত্তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে।

এমতাবস্থাতে নির্বাণের পথ বেয়ে আমার সত্তার অবলুপ্তি ঘটা ছিল শুধুই সময়ের অপেক্ষা, কারন দিনেদিনে আমার কামনা বাসনা নিবৃত্তির পথে এগোচ্ছিল। প্রথমে হরিদ্বারের আখাড়াতে আস্তানা গাড়লেও, বিষ্ণুঘাট এলাকা বাঙালীদের ঘাঁটি। সেই সুত্রে সদ্য যুবক সন্ন্যাসীর পরিচয় খুঁজে খবর কোলকাতা পৌঁছে যায়, বাড়ি থেকে যোগাযোগ করে আমাকে সংসারে ফেরানোর চক্রান্তের কোনো ত্রুটি ছিলনা, কিন্তু তখনও পর্যন্ত আমি লক্ষ্যে ছিলাম অবিচল। পাহাড়ের পাকদন্ডী বেয়ে রিপু সংহার করতে করতে, ঋষিকেশ, গুপ্তকাশী, দেবপ্রয়াগ, হর কি পৌড়ি, রুদ্রপ্রয়াগ, প্রভৃতি স্থানে পক্ষ বা মাসাধিককাল অধিষ্ঠান করে উখিমঠ এসে পৌছালাম, গোটাটাই পদব্রজে। মন্দাকিনীর শীতল জলে পুণ্য স্নান অন্তরে চরম তৃপ্তি দান করত। এরপরের লক্ষ্য হচ্ছে কিছুদিন এখানে গুরুসেবা করে গৌরিকুন্ড হয়ে কেদারধামে কিছু মাসের সাধনা শেষে হিমালয়ের আরো গহীনে যাত্রা।

আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের পথ সন্তদের পথ হয়না, সেটা আধ্যাত্মিক হোক বা পার্থিব। পাহাড়ি যে পথে সন্ত-পরিব্রাজকেরা যাতায়াত করেন তা অনেক দুরহ, নির্জন ও অপেক্ষাকৃত জটিলতা মুক্ত। সেদিনের বৈরাগ্য দৃষ্টিতে অনুভব করা গোটা যাত্রাপথ আজও আমার কাছে চোখ বুজলেই জীবন্ত হয়ে উঠে। সেই উপলব্ধি থেকে আজ প্রকৃতির রূপকে বিশ্লেষণ করতে পারি। চারিপার্শ্ব জুড়ে ছড়ানো ছিটানো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার সব নিদর্শন। ঈশ্বর বিশ্বপ্রকৃতিকে এখানে অবসরে তার সবটা রূপ ঐশ্বর্য উজার করে দিয়েছে। যতদূর চোখ যাবে কোত্থাও কেউ নেই, সুদূরে বরফের জটাধারী ধ্যনস্থ হিমালয়। আকাশ কখনো তার সমস্ত নীলিমা ঢেলে দিচ্ছে, কখনো পেঁজা তুলোর মত মেঘেদের সাথে লুকোচুরির খেলতে ব্যাস্ত, পরক্ষণেই সন্ন্যাসীর মত সাদা কুয়াশার চাদরে নিজেকে মুড়ে নিচ্ছে, কখনো জীবনের সমস্ত গ্লানি দৈন্যতাকে শুষে নিয়ে করাল কৃষ্ণ রুপ নিয়ে দৃষ্টিকে সঙ্কুচিত করে দিয়ে অবিশ্রান্ত রুধির ধারা ঝরিয়ে ভূপ্রকৃতিকে শীতল করে দিচ্ছে।

সমতলের মানুষের কাছে পর্বত চিরকালই আকর্ষনের কেন্দ্রবিন্দু। নিছক ভ্রমণবিলাসি মানুষের মধ্যেও দেবভাবের উদয় হবে এই পথে এলে। সুউচ্চ বনানীরাজির মাঝে অজস্র ভেজা পাতায় ঢাকা নুড়ি পাথর বিছানো পায়ে হাঁটা পথ, কখনো তারই ফাঁকে জমে থাকা পিচ্ছিল বরফ। সূর্যদেবও দৃঢ় প্রতিজ্ঞ পর্নাঙ্গদলের সামান্য ফাঁক দিয়ে তার কিরণ ও উত্তাপ পৌঁছে দিতে। বৃষ্টি এ অঞ্চলে যেকোনো সময় চলে আসতে পারে, বর্ষণের অনেকক্ষণ পরও জঙ্গলের পথে টিপটুপটাপ শীতল বারিধারা ঝড়তেই থাকে অবিরাম। ঋতুচক্রের পরিবর্তনের সাথে কতশত নাম না জানা লতা গুল্ম রঙিন পুষ্পরাজি এক দারুণ দৃষ্টিসুখ প্রদান করে মুগ্ধ করে দেয়। পাহাড়ের গা বেয়ে ঝরঝর করে ঝরে পরা ঝরনা, ফাটলের অন্ধকার দিয়ে কুলুকুলু শব্দে অন্তরালে বয়ে চলা জলস্রোত, পাখির কলকাকলির সাথে ঝরে পরা পাতার ছন্দে এ অঞ্চলের গোটা হিমালয়ই যেন দেবতার গর্ভগৃহ। চড়াই উৎরাই পথের পাশে খাড়াই খাদের নিচে স্রোতস্বিনী মন্দাকিনী তীব্রবেগে ছুটে চলেছে অলকানন্দার সাথে সঙ্গমের টানে, অতঃপর ভাগীরথীর কোলে নিজেদের সমর্পণ করে মাগঙ্গা রূপ নিয়ে ভারতভূমির মেরুদণ্ড হয়ে জীবজগতের যাবতীয় পাপতাপ, ক্লেদ, গ্লানি, গরল ইত্যাদি আপন বুকে করে, আমার কোলকাতার উপকন্ঠে সাগরে সমাধি নিচ্ছে সৃষ্টির আদি থেকে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে। আমি তখনও সম্পূর্ণ মহমুক্ত হতে পারিনি, কারন কোলকাতাকে ‘আমার’ বলে মত হত।

সকল কিছু ঠিকঠাকাই চলছিল, কেদারধাম ছেড়ে আরো উত্তরে তখন আমদের তিন যুবা সন্ন্যাসীর বাস তপোবন অঞ্চলের একটি হ্রদের তীরে। যাত্রার এই সময়টা গুরুদেব ধামের আশ্রমেই থাকেন ভক্তদের দর্শন দেবেন বলে। সেদিন সন্ধ্যাহ্নিকে বসে আমরা দীর্ঘ রাত্রি অতিক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছি। সহসা উপরের অদূরবর্তী জঙ্গলের অভ্যন্তর হতে আতঙ্কগ্রস্থ কিছু মানুষের আওয়াজ প্রতক্ষ্য করলাম। এই নির্জনে কদাপিও মানবের উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়না সন্ত ব্যাতিত, তথাপি সন্ত এরূপ চিৎকারও করেনা। পুনঃর্বার একই ধ্বনির কারনে আমাদের সকলের মন বিচলিত হল।

বাইরে বাতাসে শোঁ শোঁ গর্জন ক্রমেই তীব্রতর হচ্ছিল, কুয়াশা মেঘে ঢেকে যাচ্ছিল প্রান্তর, দৃশ্যমানতা কমে মাত্র কয়েক গজের মধ্যে। শক্তি সংরক্ষণ প্রণালী সমৃদ্ধ বৈদ্যুতিন বাতি তখনও সাধুদের হাতে সহজলভ্য ছিলনা, বাতাসের দাপটে তেলের কুপি অকেজো। ওদিকে বিরুদ্ধ আবহাওয়াতে সাহায্য চেয়ে পরিত্রাহী চিৎকার আরো সুস্পষ্ট। নকুলেশ্বর নামের গুরুভাইকে আস্তানাপ্রহরাতে রেখে আমি ও বিভূতি দুইজনে মিলে সেই শব্দের উৎস অভিমূখে যাত্রা করলাম। খুব বেশি উপরে উঠতে হলনা, অদূরেই একটি স্থানে দুই স্ত্রীলোক ও একজন সঙ্গী পুরুষকে আবিষ্কার করলাম। আরো কাছে যেতে দেখলাম, পুরুষটি যথেষ্ট আহত অবস্থায়। মহিলা দুইজন ভয়ঙ্কর রকমের শঙ্কিত ও আতঙ্কগ্রস্থ। পুরুষটিকে আমাদের দুইজনের কাঁধের সাহায্যে ধরাধরি করে গুহামুখের উন্মুক্তস্থানে নিয়ে এলাম। কিছুক্ষণ পর দুর্যোগ কেটে আকাশে তারকারাজি প্রতীয়মান হল। এ অঞ্চলের রাত্রি সে অর্থে নিকষ কালো অন্ধকার হয়না, একটা মৃদু স্নিগ্ধ আলোকাভাষ চরাচরকে দৃশ্যমান করে তোলে। যদিও এ আলোকে উপস্থিত আগন্তুকদের বয়স সম্বন্ধে অনুমান করা গেলনা।

পরদিন সকালে আস্তানাতে ফিরে দেখলাম স্ত্রীলোক দুইটি সদ্য যুবতী, বিত্তবান ঘরে ভদ্রসন্তান ও অসামান্য রূপবতী। সাথের পুরুষটিও সমবর্ষীয়। ওরাও বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠরত, পরিবারের সাথে পঞ্চকেদার দর্শনে এসেছে। রুদ্রনাথ, তুঙ্গনাথ, কল্পেশ্বর ও মধ্যমহেশ্বর ঘুরে এবার কেদার দর্শনে এসে পৌঁছেছেন। এরা অল্পবয়স্ক ছেলেছোকড়া, ধর্মকর্ম বা গুরুদ্বিজে তেমন ভক্তিশ্রদ্ধা জন্মায়নি। তাই অভিভাবকদের অমত স্বত্বেও ‘ট্রেকিং’ করে গোমুখে পৌছানোর পথে এই বিপত্তি। দলে আরো অনেকে ছিল কিন্তু এরা দলছুট হয়ে পরেছিল কোনো কারনে।  বরফসঙ্কুল পথে চিত্রগ্রাহক যন্ত্রে প্রকৃতিকে অবরুদ্ধ করার নেশায় বরফে পা পিছলে বেশ কয়েকফুট নিচে গড়িয়ে হাঁটুতে চোট পেয়ে বসেছিল। অন্ধকারে সাথে কেবল দুই স্ত্রীলোক। তারা সাহসী কিন্তু এ প্রতিকূল অঞ্চলে তারা বড্ড অসহায়, পাহাড়ি ভাল্লুক বা বরফচিতার দেখা পাওয়া মোটেই অস্বাভাবিক নয় সেটা এরা জানত। তাই ওই ধরনের চিৎকার খুবই স্বাভাবিক ছিল।

এই তিনজন সহপাঠী ও পড়শি। একটি কন্যা যতীন জৈন নামক ছেলেটির বাগদত্তা, নিবাস মারোয়ার প্রদেশে। এরা সকলেই জৈনধর্মালম্বী পরিবারের, কিন্তু ওদের কোনো একজন করে অবিভাবক হিন্দু ধর্মাবলম্বী হওয়ার দরুন এই তীর্থযাত্রা। ছেলেটির হাটুর আঘাত স্থানে যথেষ্ট ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল পাথরের আঘাতে, পিঞ্জরাস্থিতেও চোটের কারনে আপাত শয্যাশায়ী। অবস্থার উন্নতি হতে কয়েক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে আমার অনুমান। প্রবল স্নায়বিক উত্তেজনার দরুন মেয়ে দুইটিও ধুমজ্বরে অসুস্থ হয়ে পরল সে রাত্রে। জড়িবুটি দিয়ে যতটা প্রাথমিক চিকিৎসা সম্ভব, চেষ্টার ত্রুটি রাখলাম না। তাদের সাথের ঝোলাতে শুকনো খাদ্যসামগ্রী ছিল যথেষ্ট পরিমাণে। ওদের সাথে অস্থায়ী তাবু বানাবার সরঞ্জাম ছিল, তবুও আমাদের স্থায়ী আস্তানাতে ওদের রাত্রিবাসের ব্যবস্থা করে অনতিদূরে আমরা তাবু বানিয়ে সেই আস্তানাতে ওই রাত্রির নিমিত্ত তিনগুরুভাই পাড়ি জমালাম সেবা শুশ্রষার পর। এদিকে রাত্রি থেকে আবার খামখেয়ালী আবহওয়ার ভীষণ অবনতি ঘটল, অবিরাম বর্ষনে বিপদসঙ্কুল পাহাড়ি রাস্তা চলাচলের অনুপযুক্ত হয়ে গেল।

ঈশ্বরের লীলা বোঝা ভার, কখন কিভাবে কাউকে কোন মায়াজালে বিদ্ধ করবেন তা জ্ঞানের অতীত। তৃতীয় দিনের দিন অন্য দুই গুরুভাইয়ের একজন লোকালয়ের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিল আর্তদের অবরুদ্ধ দশার সংবাদ পৌঁছে দিতে, অন্যজন খাদ্যান্বেষনে। মরুবাসীনি কন্যাদ্বয় কয়েক প্রহরের শুশ্রষাতেই অনেকটা আরোগ্য অনুভব করলে, একটি কন্যা তার অসুস্থ প্রয়ণীর শিয়রে উপবিষ্ট হয়ে তাকে সঙ্গ সুধা দান করছিল।  অন্যটি সে তার সহজাত স্ত্রীজাতি সুলভ চপলতাতে দেবভূমির মুগ্ধতার ধারাবিবরণী করতে লাগল, নৃত্য গীত ইত্যাদি অনবিল আনন্দের বহিঃপ্রকাশ সহ। সেবার ছলে ও এই মোহনীয় কৌমার্যের প্রভাবে মনের মধ্যে পূর্বরাগের সৃষ্টি হল,  মদনদেবের বাণে আক্রান্ত হলাম অচিরেই। চতুর্থদিন সকালে গুরুদেব, মরুবাসীনিদের কয়েকজন পুরুষ আত্মীয়,  স্থানীয় প্রশাসনের কিছু ব্যাক্তি ও কয়েকজন কুলি এলো দুর্গম পথ বেয়ে, আহত পুরুষ ও মেয়ে দুটিকে সাথে করে নিয়ে যেতে।

ফিরে যাবার কালে চপল মেয়েটি আমার হাতটা তার মুষ্ঠিবদ্ধ করে কৃতজ্ঞতার সর্বশেষ প্রকাশ করাতে আমার হৃদয়ের মধ্যে মারাত্বক পর্যায়ে অভিঘাত পৌঁছাতে পাগল। পরবর্তীতে কন্যার পিতাশ্রীও আমাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপনে ভরিয়ে দিলেন। আমাকে উনাদের ঠিকানা দিয়ে গেলেন, যেন অবশ্যই তাদের আতিথেয়তা গ্রহণ করে ওনাদের ধন্য হবার সুযোগ দিই। অতঃপর তাঁরা রওনা দিলে আমার হৃদয়পুরের ব্যাকুলতা গুরুদেবের দৃষ্টি এড়ালোনা। সেরাত্রে তিনি আমাদের সাথেই রয়ে গেলেন।

অনেকরাত্রে তখনও আমার দুচোখে নিদ্রা নেই, গুরুদেব এসে শিয়রে বসলেন, বললেন- ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ; এই হচ্ছে চার পুরুষার্থ। এর মধ্যে মোক্ষ পরমপুরুষার্থ। যার মাঝে ভোগের লালসা রয়ে গেছে, কিম্বা কাম বাসনা অতৃপ্ত, সে ত্যাগ কিভাবে করবে? তোর মাঝে ধর্মে কোনো ঘাটতি নেই ঠিকিই, বাহ্যিক বা লৌকিক ভোগের নিবৃত্তি ইচ্ছাশক্তির বলে করায়ত্ত করতে সক্ষম হলেও অন্তর থেকে মোহমুক্তি ঘটেনি। তুই ফিরে যা, সংসার কর। দেহত্ববাদ অন্তরের কোনে জিইয়ে রাখলে এই কৃচ্ছসাধনা করেও মোক্ষ লাভ হয়না। সংসারও এক পর্যায়ের ধর্মসাধনা, যেখানে রসতত্ত্বের মাধ্যমে লীলা সম্পাদিত হয়। তোর প্রাণ ঈশ্বরের প্রতি পুরোপুরি সমর্পিত হতে পারেনি, বিপথের জীবন তোকে সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল, আজ ঈশ্বরের অপূর্ব সৃষ্টি সংসারে পূনঃঅন্তর্ভুক্তি ঘটাচ্ছে। ওখান থেকে ফিরে আবার নাহয় মোক্ষের পথে নিজেকে উতসর্গ করবি, এ তো তোর চেনা পথ। অতি অল্প তোর বয়স-।

আমি গুরুদেবের পায়ে লুটিয়ে পরলাম, বললাম- আমার যে রাধাভাব তার সবটাই ওই বিশেষ নারীর কারনে। এমনও কি হতে পারেনা যে- সে কুহকিনী। আমার সাধনাকে প্রতিহত করার জন্য ঈশ্বরের তরফে এ এক পরীক্ষা? গুরুদেব বলিলেন- সে বড়ই সুলক্ষণা, আচারে ও বাহ্যিক দর্শনে অতীব রমণীয়। প্রগলভ কিন্তু বিবেকবতী ও সাহসী, তোর জন্য এ অতি উত্তম নির্বাচন। আমি আজই ওর পিতার সাথে যোগাযোগ করছি।

এরপর গুরুদেব ফিরে যাবার দ্বিতীয় দিবসে আমার ডাক এলো লোকালয় হতে, যথাস্থানে পৌঁছে আমার ঠিকুজি কোষ্ঠী বংশপরিচয় বর্ণনা করে কন্যার পিতার নিকট আমার হয়ে পাণিপ্রার্থনা করলেন। সব শুনে গুরুজনেদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত হল পুনরায় সমতলে ফিরে আমি বিদ্যাচর্চাতে মনোনিবেশ করব, উচ্চশিক্ষালাভের জন্য।

পরে স্ত্রীর কাছে জেনেছিলাম, আমার ওইরূপ সুপুরুষ গৌড় দিব্যকান্তি চেহারার প্রতি সে নিজেও আকৃষ্টতা অনুভব করেছিল, তার উপরে আমার সেবাকর্ম ওকে আমার প্রতি অনুরক্ত হতে বাধ্য করেছিল। পুনঃরায় বেনারসে ফিরে এলাম, ভর্তি হলাম ত্রীবর্ষীয় স্নাতক শ্রেনীতে। পরবর্তী বছর গুলিতে বিশেষ সাম্মানিক বিভাগে দুটি বিষয়ে বিশেষ স্নাতকোত্তর সম্মান হাসিল করলাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। সন্ত জীবন পরবর্তী ৭ বৎসর পর চুরান্ত পর্যায়ের প্রেমিক জীবন উপভোগ করে আমাদের প্রণয়, বিবাহের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল। ভজনমামা, বাবা-মা, দেখে যেতে না পারলেও আজ আমি চুরান্ত একজন সুখী মানুষ, শুধুমাত্র লব্ধ জ্ঞানের বাস্তব প্রয়োগের কারনে।

-ইতি 

~প্রেমানন্দ বাচস্পতি

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *