নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের গেট দিয়ে এইমাত্র যিনি বেরিয়ে এলেন, পাসপোর্টে তাঁর নাম কুশল মিত্র।

সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার, জাপানের কিয়টো শহরে বাস। আন্তর্জাতিক গেমিং কোম্পানি নিন্টেন্ডোর একজন সিনিয়ার ডেভেলপার। বহুবছর পর তিনি নিজের দেশে ফিরছেন। স্ত্রী পুত্র জাপানেই থেকে গেছেন। ইন্ডিয়ার পলিউসান নাকি তাদের সহ্য হবে না! কুশল বাবু বেশ কিছুদিনের ছুটি পেয়ে দেশে ফিরছেন। ইচ্ছে আছে, আগামী পনেরো দিন এখানেই কাটাবেন।

পিতা মাতা গত হয়েছেন আগেই। থাকার জায়গা নিয়ে একটু চিন্তা ছিলো। ফেসবুকে সেটা ঘনিষ্ট মহলে জানাতেই মেসেঞ্জারে সংক্ষিপ্ত বার্তা, ” চলে আয়, আমার বাড়িতে থাকবি।”

প্রেরক? ছোটোবেলার অভিন্নহৃদয়ের সাথী, কমলেশ ব্যানার্জী।

প্রি পেইড ট্যাক্সিতে উঠে কুশল বাবু বল্লেন, ” চলুন, পটল ডাঙা স্ট্রিট… “

উত্তর কোলকাতার একটা বেশ পুরাতন বাড়ির সামনে এসে ট্যাক্সি দাঁড়াতেই, যে এসে দাঁড়ালো সে যেন প্যালারই যমজ, -কাকু আসুন বলে ভিতরে নিয়ে গেল, ট্যাক্সি ভাড়াটাও সে ই দিল। যে ভদ্রমহিলা শরবৎ নিয়ে এলো, ওই ছেলেটি পরিচয় করিয়ে দিল তার মা বলে। অতিথি বুঝল এটা প্যালার বউ, ওনাকে শুধালো- প্যালা কই? ভদ্রমহিলা বল্লেন- আপনাদের গল্প তো পৃথিবী বিখ্যাত। আপনার বন্ধু সে বাজারে গেছে, আপনি এসেছেন সেই আবদারে আজ খাসির মাংস খাবে লোভ সামলাতে পারছেনা।

কই… কোথায় হতচ্ছাড়া ক্যাবলাটা, পটলডাঙার চারের এক- জাপানে গিয়ে কেমন নিনজা হল দেখি। আমার সাথে বিশাল ভুঁড়ি, মাথায় অষ্ট্রেলিয়ান হ্যাট সাথে মহা এক ঝাঁটার মত গোঁফ ওয়ালা লোকটি বলে উঠল- দেহা দে কাবুল্যা, জাপান থন আইসো, সাহেব হইসো দেহা দে।

সিঁড়ির মুখে তিনজনের দেখা দেখা হতেই, একপ্রস্থ কোলাকুলি সেরে বৈঠখখানার ঘরে তিনজনে গিয়ে বসল। ক্যাবলা বলল- তারপরে হাবুল, তোদের ইষ্ট বেঙ্গলের শতবর্ষ কেমন উদযাপন করলি। আমি বললাম- হাবুল যে এখন ওই ক্লাবের সেক্রেটারি হয়েছে। ক্যাবলা বলল- তোকে দেখেও যে চেনার উপায় নেই প্যালা, কেমন চকচকে টাক বানিয়েছিস রে- কথা শেষ করার আগেই আমার স্ত্রী বাজার থেকে আনার জলখাবারের প্লেটগুলো সাজাতে লাগল, সাথে খুকিও ছিল। সে টুক করে ক্যাবলা আর হাবুলকে নমষ্কার করে নিল। ক্যাবলা বলল- কিরে প্যালা, আজও কি তো সিঙি মাছের ঝোল খাওয়াবি নাকি?

নিচের রাস্তায় একটা ট্যাক্সির হর্ণের লাগাতার আওয়াজে খুকি বাইরে বারান্দা দিয়ে দেখে এসে বলল – ক্যাবলা কাকুকে ডাকছে। আমরা তিনজনেই বারান্দা দিয়ে রাস্তার দিকে তাকাতে দেখি রাস্তা জ্যাম করে একটা হলুদ ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে। পিছনের সিটের জানালা দিয়ে একটা খাঁড়ার মত নাকটা দেখে আমাদের বুঝতে অসুবিধা হলনা আমাদের নেতা শ্রীমান ভজহরি মুখুজ্জ্যে তথা টেনিদা এসে হাজির। হাবুল বলে উঠল- খাইসে, এহন কি হইবো! ক্যাবলা বলল- কি আবার হবে, নির্ঘাৎ ভাড়াটা মেটাতে হবে আমাদের কাউকে, তোরা বস আমিই যাচ্ছি।

ট্যাক্সি থেকে নেমে বাড়ির রোয়াক পেরিয়ে, উঠোন পেরিয়ে সিঁড়ির কাছে আসতেই তিড়িং বিড়িং করে লাফিয়ে সিঁড়ি টপকে সোজা খাবার টেবলের সামনে। হাবুল কিছু বলতে যাচ্ছিল, টেনিদা বলে উঠল- মেলা বকিসনি, দুনিয়াটাই নেমকহারাম। তুইও জাপান পালানি, আমাকে বলতে পারতিস, আমারও সেজো মেসো জাপানের মন্ত্রী ছিল, তোকে খাতির যত্ন করত। বলেই অধরের কচুরির প্লেট, কালাকাদ, জলভরা, আর পনিরের কাঠি কাবাবগুলোর দখন নিয়ে, সেগুলো একাই সাবার করে বলল- বাড়িতে কতদিন পর বন্ধু এসেছে শুধু এই কটা কচুরি এনেছিস প্যালা? তোর বুদ্ধি এখনও সেই লিলুয়ার রাঙা পিসিমা পর্যন্তই, ভাগ্যিস খেলারাম আমাকে এসএমএসটা করে দিল, নতুবা কি পুদিচেঋটাই হত ভেবেছিস? তোর রোগা পেটে এই কচুরি খেলে হাসপাতালে নিয়ে দৌড়োদৌড়ি করতে হত! হাবুল কিছু বলতে যাচ্ছিল, টেনিদা ওর টাকে স্বভাবমত একটা রামগাট্টা মেরে বলল- তুই কিছু বলবিনা বিশ্বাসঘাতক। ভরা মরশুমে যে ইলিশ খাওয়াতে পারেনা তার অমন এক্সপোর্টের বিজনেসের কোনো মূল্য নেই। সেই কখন বেড়ি থেকে বেড়িয়েছি, আধাঘন্টার উপরে, পেট চুইচুই করছে, আরো কিছু খাওয়া দেখি ক্যাবলা। ক্যাবলা বলল- আর্সালানের চিকেন বিরিয়ানি না আমিনিয়ার মাটন? টেনিদা বিচ্ছিরি রেগে গিয়ে বলল- দেখ ক্যাবলা, বামুনকে একম লোভ দেওয়া রোগটা তোর সারলনা আজও, তোকে চাটিয়ে চেন্নাই পাঠিয়ে দেব, পরের জন্মের ওই মুরগি বা ছাগল হয়ে জন্মাবি।। হাবুল বলল- টেনিদা তুমি হেই আদ্যিকালের নোকিয়া ১১০০ সেটটা বদলাইতে তো পারো, অহন এন্ড্রোয়েডের বোতাম টিপলেই বাসায় বইস্যা বইস্যা সুইগি-জমাটোতে খাবার হাজির হইয়া যায়।

হাজির শুনেই টেনিদা বলল- এমন বলিসনা হাবুল, শেষে কি আমার হার্টফেল করাবি!  ট্রিম ট্রিম ট্রা- লা –লা – লা করে অভ্যাস বসে টেনিদা নেচে উঠতেই আমরা কোরাস ধরলাম। জানালাতে একটা কাক বসেছিল, সে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গোঁত্তা খেয়ে ল্যাম্পপোস্টে ধাক্কা খেয়ে মাটিতে পরে গেল।

…ক্রমশ

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *