(১)

নিরাপদ বাবু খুবই শান্তশিষ্ট গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ, দীর্ঘ কর্মজীবনে গ্রামেরই ইস্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন। নিজস্ব বিষয় ছিল ভূগোল। দাপটের সাথে কত গাধাকে যে ঘোড়া করেছেন তার লেখাজোখা নেই, আবার যারা ঘোড়া ছিল, তাদের পক্ষীরাজ বানিয়ে দিয়েছেন। ঋজু শালগাছের মত চেহারাতে বারো-হেতে ধুতিও হাঁটু ছুঁয়েই শেষ হয়ে যায়, সারাজীবনে কাকডিম রঙের ফতুয়া পরেই কাটিয়ে দিয়েছেন, খোঁচা খোঁচা গোঁফের উপর কখনই তেমন যত্ন নেননি সাজ পোশাকের মতই। প্রশস্ত কপালের উপরে ঠিক কোথা থেকে টাক’টা শুরু হয়েছে, ইঞ্চি মেপে বলা ভীষণ কঠিন। চরিত্র গঠনই মানুষের একমাত্র কর্ম, এটাই ছিল ওনার বীজমন্ত্র। বৃদ্ধ বয়সে পৌঁছে  চুলের রঙে আর কোথাও কৃষ্ণ বর্ণের রেখা অবশিষ্ট নেই, হঠাতই নিয়মভঙ্গের বড় শখ জন্মেছে আজকাল; সেই নিয়ম, যে কঠিন বলয়টা উনি নিজেই নিজের চারিদিকে বানিয়েছিলেন দীর্ঘকাল ধরে। একটা সময় তিনি বিশুদ্ধ নিরামিষাশী থাকলেও আজকাল টুকটাক মাছ ডিম খেতে শিখছেন, যদিও মাংসে এখনও পৌঁছাতে পারেননি। জীবনের তেষট্টিটা বসন্ত পাড় করে ওনার বোধদয় হয়েছে- আরেকটা যদি জন্ম না পায়, তাহলে এই আমিষের স্বাদটা চির জীবনের মত অধরা রয়ে যাবে। তবে হ্যাঁ, তাই বলে অখাদ্য-কুখাদ্য তিনি এর পরেও ছোঁবেননা, শুধুই সুখাদ্য এটা প্রতিজ্ঞা করেছেন।

নিরাপদ সামন্ত তেমন বনেদী বাড়ির ছেলে না হলেও গেরেস্তবাড়ির সন্তান বটে, বেশ কয়েক বিঘা মাঠাল ধেনো জমির সাথে, বাগান, পুকুর, সব্জি ক্ষেত ও বিলের পাশে দখলি জমি নিয়ে একর বিশেক হবে, একমাত্র সন্তান হাবুলকে বেশ গুছিয়েই দিয়েছেন। মাতৃহীনা হাবুল ইংরেজি শেখা আধুনিক মানুষ, জেলা সদরে একটা উকিলের দপ্তরে আর্দালির কাজ করে বেশ দু-পয়সা রোজগার করে। এক সহৃদয় মক্কেলের দাক্ষিণ্যে একটা সেকেলে মোটরগাড়িও জুটিয়ে গাঁয়ে হাজির করেছে কিছুদিন হল। চড়া হোক বা না হোক, বাড়িতে একটা মোটরগাড়ি রয়েছে, এটা কী কম অভিজাত্যের কথা! এই মোটরগাড়ি দেখা ইস্তক নিরাপদ বাবুর মাথার ভেতরটা কিলবিলিয়ে উঠল, খুঁটে বাঁধা গেঁয়ো জীব হয়েই তিনি রয়ে গেছেন এতকাল। অথচ ম্যাপবই জুড়ে ছিল তার অবাধ যাতায়াত, কখনও তিনি গোবি মরুভূমিতে মরুদ্যান খুঁজছেন তো পরক্ষণেই পেরুর মাচুপিচুর পাহাড়ে ট্রেকিং করছেন, এই তিনি অষ্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডে বিচে পায়চারী করছেন তো পরক্ষণেই খাইবারের গিরিখাতে পথ ভুলে একসা কান্ড। সারাজীবনে স্কুল আর সাংসারিক দায়িত্বকে অগ্রাহ্য করে কোলকাতা শহরেই মাত্র দু’বারের বেশি যাওয়া হয়ে ওঠেনি।

সারাজীবন যে কৃচ্ছসাধন করে এসেছেন, এবারে তার পুরস্কার পাবার বেলা। নিজেই নিজেকে পুরষ্কিত করবেন বলে ঠিক করলেন নিরাপদবাবু। অবশিষ্ট জীবনটা তিনি দেশে দেশে ঘুরে ঘুরে বেড়াবেন, পেনশনের টাকায়। ওনার বাবা স্বর্গীয় তারাপদ বাবু ৮১ বছরের পরমায়ু লাভ করেছিলেন, ঈশ্বর হরিপদ সামন্ত মানে নিরাপদ বাবুর ঠাকুরদা ৭৫ বছর বয়সে গত হন, তেনার পিতা শ্যামাপদ… না থাক, লিষ্টি যথেষ্ট লম্বা হয়ে যাচ্ছে ভেবে নিরাপদ বাবু থেমে গেলেন। তবে এটুকু বুঝলেন, যে ওনাদের বংশের গড় আয়ু ওই ৭২ বছরের মত, সেই হিসাবে উনি আরো ৯ বছর বাঁচবেন। সুতরাং, জীবনকে তিনি আর বছরে বা মাসে নয়, এক্কেবারে দিনের হিসাবে ভাগ করে নিলেন। সাকুল্যে ৩০০০ দিনের কিছু কমবেশি দিন তার পরমায়ু অবশিষ্ট, যদিনা এর মাঝে অপঘাতে মৃত্যু হয়।

অতএব, প্রতি দশদিনে নতুন একটা স্থানে পৌঁছাতে পারলে অন্তত ৩০০টি স্থান তিনি দর্শন করতে পারবেন, ২০০ হলেই বা ক্ষতি কি! নিতান্ত ১০০ হলেও তিনি যারপরনাই খুশি। সেখানে গিয়ে প্রাণভরে তিনি খাবেন স্থানীয় সব সুস্বাদু খাবার, ঐতিহাসিক স্থানে ভ্রমণ করবেন; কারন এ জীবন আর ফিরে পাবে কিনা কেউ জানেনা। তাই যে কটা দিন বাঁচবেন – বাঁচার মতই বাঁচবেন বলে পণ করলেন। বিলের ধারের জলাজমিগুলোকে হাতফিরৎ করে বেশ কিছু নগদা আমদানি করে নিলেন, হাবুল ও বৌমা দুজনের জোড়া আপত্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সামনের বুধবারই যাত্রা শুরু করবেন বসে স্থির করলেন। চতুর্দিকের যেকোনো দিকেই তিনি যেতে পারতেন, কারন নির্দিষ্ট কোনো স্থানে যেতেই হবে এমন কোনো বতিক তার নেই, তবুও নাতি বিল্টুর সাথে ছোটবেলার সেই –‘ইশ বিষ ধানের শিষ’ ছড়া কেটে, পশ্চিম দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *