স্ত্রী রত্নধন

“শোনো…, আমি বলেই সহ্য করে নিলাম, অন্য কেউ হলে করতনা, পালাতো তোমাকে ফেলে…”

বাঙালী পুরুষ ‘এ্যাই, শোনোনা’ এমন আদুরে সোহাগ মাখা ডাকের চেয়ে, সবচেয়ে বেশি যে ডায়লোগটি ত্রিসন্ধ্যা শুনতে অভ্যস্ত, তা নিঃসন্দেহে ওই উপরের কোটেশনের মধ্যের বাণীটা। এর পরেও আমরা পুরুষেরা হয়ত অনেকটা ‘মহান’ বলেই এ সমস্ত টীকা-টিপ্পনী গুলোকে না শোনার মত করে উপেক্ষা করে কাটিয়ে দিই। এটা পড়ে যদি @সাকিল ভাবে বিয়ে সে করবেনা, তাহলে তার মত বোকা আর তৃতীয়টি নেই, কারন দ্বিতীয় নাম্বারে @ম মণ্ডল রয়েছে।

ঘরে বৌ পোষার বিস্তর সুবিধা। কয়েকটি বিষয়েই আজ আমি আলাপআলোচনা করব। ইয়ে, এমনিতে আমরা হলেম গিয়ে বিশ্বনাগরিক, তাই উন্নত পশ্চিমা বিশ্বের নিরিখে আমরা বৌ পুষি বৈকি; কখনও বৌ দ্বারাও আমরা অনেকে পোষিতও হয়। মোটের কথা আমরা একসাথে রয়ে যায় আমৃত্যু, এক আধটা ব্যাতিক্রম ছাড়া। প্রেমিক প্রেমিকারা একে অপরের চোখের তারায় থাকতে পারে, হৃদয়ে থাকতে পারে, আরো অনেক অনেক জাইগাতে তাদের নিবাস হতেই পারে। কিন্তু বিবাহিত স্বামী-স্ত্রী কেবলমাত্র একে অপরের অস্থি মজ্জাতেই থাকে, আর অভ্যাসে। আমি বলি তোমাকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি, তিনি ফোঁস ঝেরে বলেন- আমাকে মজ্জায় মজ্জায় চিনতে তার বাকি নেই। এভাবে বিগত ১০ বছরে একে অপরের লোহিত রক্ত কণিকা উৎপাদন স্থলে অবস্থান করার ফলে, আমাদের বহু কিছুরই স্থায়ী ভৌত পরিবর্তন ঘটে গেছে, কিছু রাসায়নিকও। বিজ্ঞান বলে একটি লোহিত কণিকা ২০ সেকেন্ডেরর মধ্যে গোটা বডি ঘুরে আসতে পারে। স্ত্রীরাও মজ্জাতে থাকেন, যা লোহিত কনিকার জন্মস্থান, তাই ওনারা ২০ সেকেন্ডেই আমাদের শরীর জুড়ে থাকা মন নির্ভুল ভাবে স্ক্যান করে বা পড়ে নিতে পারে অনায়াসে। লোহিত কনিকাতে হিম নামের পদার্থ থাকে, তাই পুরুষেরা হিম শীতল হয়ে বসে থাকার ক্ষমতা সম্পন্ন। হিমোগ্লোবিন ১২০ দিন পর বিলিরুবিন বিলিভার্ডিনে ভেঙে মলে হলুদের ফোড়ন দিয়ে বেড়িয়ে যায় পায়ুপথে, পুরুষের স্মৃতির মতনই। বৌ কিন্তু ২০১৩ সালের জুন মাসের ১৯ তারিখ বিকেল পাঁচটা বাজতে পাঁচে যখন কারেন্ট ছিলনা, তার মায়ের সাথে গুরুত্বপূর্ণ বাক্যালাপের মাত্র ৭৭ মিনিটের মাথায় আমি কেমন ভাবে মুখ ভেঙচে ছিলাম সেটার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়ে দেবে।

ইন্দ্রদার কমেন্টে আমার চৈতন্য হল, আবিষ্কার করলাম এক অনন্ত সত্যকে। মানুষের, বিশেষত নারী-পুরুষের চোখই হল সবচেয়ে বড় হটস্পট, সামান্য চোখের ইশারাতেই ওয়াইফাই লাইন এক্টিভ হয়ে যায়। পাসওয়ার্ড ম্যাচ করলেই কেল্লা ফতে, ডেটা ট্র্যান্সফার শুরু হয়ে যায়। বাচ্চা বয়সে মায়ের সাথে প্রতিটা শিশুরই চোখে-চোখে, হটস্পট-ওয়াইফাই কানেকশন থাকে। চোখের ইশারাতে প্রেমে, কত বড় বড় সিদ্ধান্তই যে আমরা নিয়ে ফেলি তাই লেখাজোখা নেই। তবে হ্যাঁ, এটা ওই বিয়ের পর মধুচন্দ্রিমা পর্যন্তই। এরপর ওটা অদৃশ্য অপটিক্যাল কেবলে বাঁধা ক্লোজসার্কিট কামেরাতে পরিণত হয় নিরবিচ্ছিন্ন ল্যান কানেকশনে, ডেটা তখন জিবিতে ট্র্যান্সফার হয় মুহুর্তে। বাসে উঠে যেই না কলেজে পড়া সুমুখশ্রীর কন্যাটির দিকে চেয়েছো, ওমনি ওদিক থেকে চোখ বড় বড় সমৃদ্ধ দাঁত কিড়মিড় ডেটা চালান হতে থাকবে – ‘আজ বাড়ি ফেরো, তারপর দেখাচ্ছি মজা। বুড়ো বয়সের ভিমরিতি ছোটাবো।’ এই বানীময় ডেটাটা আপনি যেদিন উপলব্ধি করতে পারবেন, সেদিন জানবেন এজন্মে আর আপনার দ্বারা কিছু হবেনা; গোজে বাঁধা গরুর মত বৃত্তের ঘাস খেলেও অত্যদিকে চেয়ে জাবর টুকুও কাটতে দেবেনা।

কিম্বা বিয়ে বাড়িতে, যেইনা একপিস অতিরিক্ত মাটনে কামড় বসাবেন, অজান্তেই আপনার চোখে স্ত্রী রত্নটির দিকে যাবেই যাবে, তা তিনি যেখানেই থাকুন। আপনার হার্ডওয়্যার সিস্টেমের সফটওয়্যারের ‘ওয়াইফ ম্যালফাংশান’কেই দিনেদিনে পার্মানেন্ট আপডেট ভার্সন বানিয়ে নিয়েছে। আপনি দৈববানীর মত অন্তরে শুনতে পাবেন- ‘মিনসের নোলা চুকচুক করে শুধু, ন’মাসের পোয়াতির মাপের ভুঁড়ি নিয়ে এতটুকু লজ্জা নেই। আমার বাপের বাড়িতে বলে- এখনও নাকি আমাকে কনে সাজালে আবার বিয়ে হয়ে যাবে ড্যাঙড্যাঙ করে, আর উনি ছোট মেয়ের দাদুর বয়সী হয়ে বসে, এক্সট্রা খাসির পিসে সাঁটাচ্ছেন, নির্লজ্জ বেয়াহা। ফেরো বাড়ি, সাতদিন লাউ চচ্চড়ি আর সজনে ফুলের বড়া খাওয়াবো’। এ শুনতে পঞ্চইন্দ্রিয়ের কিছুরই দরকার নেই, অটো মেটিক রিস্টোর সিস্টেম।

মাঝে মাঝেই এদের এ্যানিমিয়াও হয়। অনেকেই বলবেন, অধিক রজঃস্রাবের পীড়াজনিত কারন হেতু এই রোগের প্রাদুর্ভাব। আমি গণনা করে দেখেছি, যাদের স্বামী গৃহে থাকেনা অধিকাংশ সময় তাদেরই এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি। স্ত্রী থাকেন মজ্জাতে, আয়রন সম্বলিত লোহিত কণিকার আঁতুড়ঘরে। সুতরাং স্বামী না থাকলে মজ্জা পাবে কোথায়! সুতরাং এ্যনিমিয়া হওয়া কি খুব অস্বাভাবিক?

সব সময় বউ যে কটু কথাই বলে তা তো নয়, সোহাগ করে ‘ভুড়ি ও টাকে’ হাতবুলিয়ে আদরও করে। তবে সেটা বাপের বাড়ি ও অর্থনৈতিক কারনেই বেশী। এমন সোহাগে, আবেগে গলা বুজেও আসে, কিন্তু তৎক্ষণাৎ নিজেকে সামলে নিই। একবার এমন দিনেই গলা বুজে আসার কথা উনাকে কয়েছিলাম বড় ইমোশোনাল হয়ে- তার পর পক্কা আড়াই দিন ওলগাছের ডাটি চচ্চড়ি, কচুর লতি আর কচু, ওলের পদে পাত ভরে থাকত। ‘কেন’ করেছো, স্ত্রীকে একথা শুধাবার মত বীরপুরুষ বাংলার মাটিতে কমই জন্মেছে। আমি মধ্যবিত্ত, ভয়-সাহস দুটোই আছে, তাই অসীম সাহস এনে শুছিয়েছিলাম- এমন চুলকানি পদের সমাহারের কারন কী? জবাব এসেছিল- বল্লে যে গলা বুজে এসেছিল, তাই এগুলো। এ খেলে সব গলার রোগ সেরে গোটা হাইরোড ক্লিয়ার। সেই শেষ বারের মত ওর সামনে গলা বুজে আসা, এখন তো চোখ-কানও বুজে গেছে।

আমার বড় কন্যে, ন্যাপা। যদিও ওর ডকনাম মিঠি ও স্কুলের নাম সামিয়া। সে আবার আমার মতই খাদ্যরসিক, উঞ্ছো বেরসিকেরা যাকে পেটুক বলে। তবে চাইনিজ তার যাবতীয় ভক্তি খাবারে। মোমো, চাইমিন, নুডলস, হরেক ধরনের স্যুপ, হট বিনস, ক্রিসপি ফ্রায়েড রাইস, চিলি চকেন ইত্যাদি; তা মেয়ের মা রেঁধেও দেয় সানন্দে। আমি একটু লেবু চা চাইলেই খ্যাঁক করে উঠে। আমিও কি ছেড়ে কথা বলি- ছোট কন্যা ১৮ ঘন্টাই খায় মানে ওকে খেতে হয়, শারীরিক সমস্যার দরুন। কিন্তু সে প্রায় সর্বভুক, বাড়িতে টিকটিকি মারলেও সে সেটাকে বিট লবন দিয়ে চুষে খাবার বায়না ধরে। সারাদিন ‘ডোরেমন-সিনচ্যান’ দেখে আর অখাদ্য কুখাদ্য সবেতেই মুখ লাগায়, বয়স ৫। বৌকে বলি- ‘এ ফসল কার? আমার জমি আমি কাউকে ভাগে দিইনি কক্ষনো, তার পরেও ফিরিঙ্গী মার্কা হাইব্রিড ফসল? কিভাবে?”। গরম তেলে  কাতলার পেটি ছেড়ে দেখেছন, সেম রিয়্যাকশন থাকে।

আজকাল আর এলার্ম ঘড়ি লাগেনা, খুব ভোরে ওঠার প্রোগ্রাম না থাকলে। নিয়মিত ইন্টারভ্যালে কাঁসর কীর্তন বাজতে থাকে- ‘ইয়া আল্লাহ, বেলা বারোটা বাজতে চলল, খানিক পর সন্ধ্যা হবে। কোথায় রাস্তায় একটু দাঁড়িয়ে মেয়েগুলোকে ছেড়ে আসবে, বা বাজারে গিয়ে টাটকা শাক-মাছ কিনে আনবে তা নয়, উপুর হয়ে সিল মাছের মত ঘুঙরি মারছে’। প্রথম প্রথম উঠে পড়তাম ধরফর করে, আজকাল চালাক হয়ে গেছি। প্রথব বার কাঁসি বেজেছে মানে, মেয়েদের সাথে আমাকেও উঠাচ্ছে। তা মেয়েরা নাহয় ইস্কুল যাবে, আমি পৌনে সাতটার মত অত ভোরে উঠে কী করব বলুনতো? এরপর সেকেন্ড পিরিয়ডের ঘন্টা বাজে আটটা বাজতে দশে, এবারে ঘরের এসি বন্ধ করে জানালা খুলে দেবার পালা; মেয়েদের বাসে তুলে দিতে যাবার প্রস্থে এই এলার্ম। নিচ থেকে এসেই শুরু হয় যাত্রাপালার বিবেকের গান- ‘পাখপাখালি, গাছগাছালি, ধোপা মজুর অফিসার সব্বাই যে যার কাজে পৌঁছে গেল, এনার চোখ সেলাই করা। আল্লাহ, দুনিয়াতে ৩০০ কোটি পুরুষের মধ্যে আমাকে এটার ঘাড়েই কেন ফেললে’! ওদিকে সব্জি কুটতে কুটতে দৈববাণীর মত মায়ের আওয়াজ আসে- ফোনটা কেড়ে নিতে পারিসনা রাত্রে, সারারাত জাগলে সকালে পরে পরে ঘুমাবেনা কী করবে।

আমি মনে মনে ভাবি, রাত্রে ফোনে থাকবনা তো কী করব! তিন তিনটে সাপের বাচ্চার কেউনা কেউ ঠিক ফনা তুলে বসবেই বসবে, যখনই একটু দুষ্টু হতে মন যাবে। যারা ১০-১২ টা করে সন্তানের পিতা হবার গৌরব অর্জন করেছিলেন সত্য যুগে, তাঁরা কিভাবে যে অসাধ্য সাধন করেছিল কে জানে! আমার শয়নকক্ষে, রাত্রে যেন দেবাসুরের যুদ্ধ বাঁধে, তারাও তাদের মাকে লেপ্টে শুয়ে থাকবে, আমিও ওদের ঘুমপাড়িয়ে বা যেনতেন উপায়ে ছাড়াবার প্রচেষ্টাতে রাত কেটে যায় বা ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে যায়। মাঝে মাঝে ভাবি দৈবাৎ আমাকে সন্তান সহ রমনীকে বিবাহ করতে হলে- সারা জীবন বাঁজা পুরুষের বদনাম নিয়েই কাটাতে হত।

যাই হোক, শুরুতে ফিরি। ঘরে বৌ থাকার সুবিধা। কোর্টে যাব, হাজিরার তারিখ আছে, চায়ে চুমুক দিয়ে ফেসবুক খুলতেই জয়ন্তের লুচির পোষ্ট। ভুঁড়ি ভিজে গেল নোলার চোঁয়ানো রসে, এদিক ওদিক দেখে নিয়ে মিনমিনিয়ে বললাম- হ্যাঁরে, আজ বড় লুচি খেতে মন চেয়েছে, হবে নাকি! আমাকে সত্তরগুন আশ্চর্য করে জবাব দিল- জয়ন্তর পোষ্ট দেখে নোলায় বান ডাকল বুঝি! এর পর আর কিছু বলা যায়না, নসীবে সেই শুকনো পাউরুটিই নাচছে। মন দিয়ে খবরের কাগজ মুখস্ত করে, স্নান সেরে জামা কাপড় পরে রেডি হতেই দেখি গরম লুচি আর ধুমায়িত আলুর অরকারির প্লেট হাতে শ্রীময়ী আমার দাঁড়িয়ে। আবেগে গলা বুজে আসছিল, জোর সামলে নিলাম । নতুবা লাঞ্চে আবার ওই ওল বা কিচুতে ফিরবেনা কিনা তার গারান্টি কে নেবে! কিন্তু মনের মাঝে যে প্রেম জেগে উঠল বৌয়ের প্রতি, সেটা যে বমি না করলেই নয়- তাই এই পোষ্ট লিখে ফেললাম কোর্টে বসে মাছি তাড়াতে তাড়াতে।

সাকিল, বিয়ে করেই নে ভাই। বৌ হেব্বি ইন্টারেস্টিং জীব এই বৌ প্রাণীটি। মাঝেমধ্যে বাপের বাড়ি গেলে বোঝাযায় এ ঘরে কেউ একজন নেই। বুড়ো মা রান্নাবাটি করে দেয়, কাজের দিদি এঁটো বাসন, ঘরদোরও সাফ করে দ্যায়। কিন্তু মাঝরাত্রে পিঠ চুলকে দেওয়া, বগলের গন্ধ তাড়াতে ছোবড়া ঘসে স্নান করিয়ে দেওয়া, বিকালের দিকে ক্লাবে বা চায়ের দোকানে এসে দৈনিক পৃথিবীর প্রেমে পরে যাওয়া ( কারন বাড়িতে থাক মানেই মগজের ঘিলু পাকিয়ে দেওয়া- ইত্যাদি), মনে হয় কি যেন নেই জীবনে। অতএব একঘেয়েমির নো চান্স। স্ত্রী চরিত্র বুঝে উঠা বড়ই জটিল, তুলনামূলক দাম্পত্য অনেক সোজা।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *