খাদ্য শুধুই আমাদের পেট ভর্তি করেনা, মনও ভরাট করে। কোনো এক মহাপুরুষ সেই কবে বলে গেছেন, মানুষের পেটই হল হৃদয়ে পৌছাবার সবচেয়ে সোজা ও সংক্ষিপ্ততম রাস্তা, বিশেষ করে পুরুষের। এখন সে পুরুষ যদি আমার মত হয়, সেক্ষেত্রে হৃদয় বলে জিনিসটাকে শুধুই ধুকপুক করে শরীরটাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য অবশিষ্ট রাখা হয়, যে শরীরে আমার এই সুবিশাল বপুর মাঝে জালার মত পেটখানি ধারণ করেছে। যাবতীয় প্রেম, মোহাব্বত ইশকিয়ার গহ্বর বা খনি আমার ওটিই। আমার স্বর্গীয় ঠাকুরদা, হাসপাতালের নার্সকে সেট করে, ফুলুরি-বেগুনি-আলুরচপ আর ঘুগনি আনিয়ে খেতেন লুকিয়ে, এবং গলায় ফুলুরি আঁটকেই উনি বীরের মত অমৃতলোকের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছিলেন, নার্সিংহোমের বেডে শুয়ে। উনি বছরে অন্তত ৬ বার, ৭ দিন করে নার্সিংহোমে ভর্তি হতেন, রোগ থাকুক আর নাইবা থাকুক। সে গল্প আরেকদিন অন্য অবসরে কওয়া যাবে, আজ আমাদের বিষয় অন্য।

নিরামিশাষী মানুষদের এতটুকু অপমানিত না করেই বলছি, যারা আমিষ খেলোনা তাদের জীবনটাই অর্ধেক স্বাদ নিয়ে শেষ হয়ে গেল। সাগর, নদী, পুকুর, খাল, বিল, একোরিয়ামে এই যে লক্ষ কোটি মাছ কিলবিল করছে তা কি শুধু কুমিরদের জন্য? কিম্বা ধরুন এই ছাগল বা ভেড়া প্রজাতিটা, এদের জন্মের সার্থকতাই বা কোথায় যদিনা ওরা  মাংস হয়ে মনুষ্যকুলের দ্বারা সেবিত হল!

“গো-মেষাশ্ব-মহিষক-গোধাজোষ্ট্র-মৃগ্যেদ্ভবম।

মহামাংসষ্টাকং প্রোক্তং দেবপ্রীতকারকম।।

মহামাংশের ধারনাটা যে আপনার নেই সেটা বোঝাই যাচ্ছে, গোমাংস, মেষমাংস, অশ্বমাংস, মহিষমাংস, গোধামাংস, ছাগমাংস, উষ্ট্রমাংস, ও মৃগমাংস এই আটটি প্রকারের মাংসকে মহামাংস নামে ডাকা হয় শাস্ত্রে। এর মধ্যে মৃগমাংস অপ্রতুলতার কারনে, শুকরের মাংসকে মৃগমাংস রূপে ভক্ষণ করা যেতে পারে, তখন একে কলামাংস বলে অবিভিত করা হয়। ব্রাহ্মণেরা ‘ওঁ ব্রাহ্মার্পমস্তু’ মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে এই সকল মাংস ভক্ষন করলে তা নিরামিষে পরিণত হয়ে যায়।

দেবতারা যেখানে প্রীত হয়েছে, সেখানে আমার মত নিকৃষ্ট এক মানবের সাধ্যি কী দেবকুলের বক্রদৃষ্টিতে কুপিত হওয়ার। মুর্গি ততদিনিই কুলীন ছিল যতদিন দেশে পোলট্রি নামের চাষ আসেনি, তাতে ব্রাহ্মণদের থেকে ওরা যত দূরেই থাকুকনা কেন। বর্তমানে লাউ, শশা বা কুমরোর মতই পোল্ট্রি মাংস বিশুদ্ধ নিরামিষ, এই একই সুত্রে এদিগকের ডিম বড়মাপের মুসুর বা কলাই ডালের মত জ্যান্ত প্রোটিনের গোলক; ব্যাস।

মাংস বিবিধ ভাবে খাওয়া যায়, মসালা সহযোগে। কষা, ভুনা, চাঁপ, কিমা, রেজালা, হালিম, বার্বিকিউ, স্টেক, স্কিউয়ার, সসেজ, স্মোকড, ফ্রাই, সুসির পাশাপাশি বিরিয়ানি, কোর্মা, কোপ্তা, নিহারি, পায়া, কড়াই, হান্ডি, কটাকট, মালাইবোটি ইত্যাদি সবই থাকলেও মাংস খাবার সবচেয়ে সেরা পদ হচ্ছে কাবাব। বুঝেছি, জিভটা বেশ ভিজে গেছে, কিন্তু এটাই নিয়তি।

সভ্যতার শুরুতে মানুষ যখন জ্ঞানবুদ্ধির বাইরে ছিল তখনও পশুশিকার করে কাঁচাই খেতো, কিন্তু তখনও রোদ্রে শুকিয়ে মাংস খাবার চল ছিল, যাকে আমরা ‘তারাজা’ বলে থাকি। আগুন আবিষ্কার হওয়ার পর থেকেই সেই মাংস আগুনে ঝলসিয়ে খেতে শুরু করে মানুষ। ইহাই আসলে কাবাব, সেদিন মশালা ছিলনা, ভিতরের হাড্ডিও ভিতরেই রয়ে থাকত। অতঃপর মানুষ যেমন যেমন সভ্য হতে শুরু করল, তেমন তেমন ভাবেই কাবাবের ক্রম অভিযোজন ঘটে চলল উন্নতির দিকে। লতা, পাতা, শিকড় বেঁটে মাংসের উপরে লেপ দিয়ে জংলী মানুষেরা বুঝেছিল, মাংসের স্বাদ কীভাবে আমাদের রসনাতে স্বর্গীয় সুখ দেয়। সুতরাং সভ্যতার সাথে হাতে ধরাধরি ধরে যে কয়টি অভ্যাস বা বস্তু আজও জীবন্ত তথা প্রাসঙ্গিক, তাদের মধ্যে কাবাব অন্যতম।

এই সভ্যতার শুরুতে ইউরোপিয়ান দেশ আবিষ্কারকেরা জাহাজ ভাসিয়ে ওদিকের ওয়েষ্ট ইন্ডিজ থেকে এদিকের পাপুয়া নিউগিনিতে পৌঁছে গেছিল, তাঁরা আসলে ভারতের খোঁজেই বেড়িয়েছিল, যে ভারতে মশালা পাওয়া যায়। একঘেয়ে মশালাহীন মাংসের স্বাদ বদল করতে মশালার সন্ধানে কেরালার উপকূলে ভাস্কোদার আসাটা কী একেবারেই কাকতালীয় মনে করেন? এই সকল বিশ্বপরিব্রাজকদের ইংরাজিতে এক্সপ্লোরার বলা হয়, যার বাংলা মানে- অনুসন্ধানকারী। কিসের অনুসন্ধান করতেন তেনারা? মাংস তথা কাবাবের মশালার জন্য অনুসন্ধান।

লিখিত ইতিহাস মোতাবেক তুরস্কের কোন এক লেখকের লেখা ‘কাসাই-ই-ইউসুফ’ গ্রন্থে প্রথম কাবাব শব্দটির উল্লেখ পাওয়া যায়, সেটা ১৩৭৭ সাল নাগাদ সময়ের। যদিও গ্রীক আইল্যান্ডের ‘স্যান্টোরিনি-আক্রোতিরি’তে খননকার্য করে একধরনের চুলা আবিষ্কৃত হয়েছে অবিকল আজকের দুপায়া বিশিষ্ট কাবাব সেঁকার উনুনের মত। এটা প্রায় খ্রীষ্টপূর্ব সতোরো শতাব্দীর বলে অনুমান করা হয়।

গোটা পৃথিবীজুড়ে কাবাবকে কত রকমেরই যে আদুরে নামে ডাকা হয় তার ইয়াত্তা নেই। কিবোপ, কেবাপ, কিবেব, কেভাফ, কিবাপি ইত্যাদি নানা নামে ডাকা হলেও আসলে  কাবাব শব্দটার উৎপত্তি ‘কাবাবু’ বা ‘কারব্বাবা’ নামের আরকাদিয়ান শব্দ থেকে, যার বাংলা অর্থ ‘আগুনে পোড়া’। তুরষ্কের বুসরা শহরকে বলা হয় কাবাবের শহর, এখানে মানুষের চেয়েও বড় বড় উচ্চতার কাবাব বানানো হয়, যা প্রমান সাইজের ইন্ড্রাট্রিয়াল হ্যান্ড কাটার দিয়ে কেটে কেটে পরিবেশনা করা হয় খাদ্যশিকারিদের। আমাদের ভারতীয় পুরাণ শাস্ত্রে উল্লেখিত শূল্যমাস, বা শলকামাস এই কাবাবেরই ভিন্ননাম বই অন্য কিছু নয়।

এ তো গেল ইতিহাস, কিন্তু খাবেন কীভাবে?

চুমু খেয়েছেন? প্রেমের আগুনে আমাদের হৃদয়ের উনুনে ধিকিধিকি আঙরা জ্বলতে থাকলে আমরা ওষ্ঠবন্ধনে সঙ্গীকে আবদ্ধ করে নিই। আসলে আমাদের ঠোঁট গুলো ওই কাবাবে পরিণত হয়, চুষে চেটে তীব্র আশ্লেষে জীবনী শক্তি ‘দিয়ে ও নিয়ে’ এ স্বাদ অনুভব করতে হয়, দাঁত ফোটালেই মধুক্ষণের পরিসমাপ্তি ঘটে, কাবাবও এরই অনুরূপ।

কাবাব খাওয়াটা একটা শিল্প। এই শিল্প করায়ত্ব না করতে পারলে কাবাব খাওয়া আর ঝিঙে দিয়ে সোয়াবিনের চচ্চড়ি খাওয়ার মাঝে কোনো ফারাক নেই। কাবাব কক্ষনও চেবাতে নেই, দাঁত লাগিয়েছেন কী কাবাবের রমনীয়তা-কমনীয়তা হরণ হয়ে গেল জানবেন। সুতরাং চেবাতে নেই, গরম ভাপটা কয়েকবার হাহ-হাহ করে ছেড়ে মুখ দিয়ে ছেড়ে, টুকরোটিকে জিভ দিয়ে ব্রহ্মতালুতে পিষে ধরতে হয়। তারপর আস্তে আস্তে ৬০ ডিগ্রি ব্যাসার্ধের মাঝে জিভটিকে শম্বুক গতিতে চালনা করলে, মসলাটা জিভে ছড়িয়ে পরে, তখন চোখ আপনা হতেই বন্ধ হয়ে যায়। পেঁয়াজ, গোলমরিচ, আদার রস, গরম মশালা, লেবুর রস, দারুচিনির আরক, মৌরি, ধনে, কাবাবচিনি, জায়ফল, জৈত্রি, জাফরান আলাদা আলাদা ভাবে পজিশন নিয়ে মুখের লালার সাথে পরকীয়ার লাবডুবাডুব খেলা শুরু করে দেয়। গভীর একটা নিঃশ্বাসের সাথে সেই সুখনীয় অনুভূতি মস্তিষ্কের সমস্ত ধূসর কোষিকাকে আচ্ছন্ন করে দেয় এক অদ্ভুত নেশাতে।

এর পর মুখগহ্বরে যথেষ্ট পরিমান লালারসের সঞ্চার ঘটলে ওটা নিজে থেকেই গ্রাস নালী বরাবর চিৎসাঁতার দিয়ে যাত্রা শুরু করে হৃদয়ের উদ্দেশ্যে থুড়ি পাকস্থলির উদ্দেশ্যে।

আবারও বলছি, ভুলেও যেন কামড় বসাবেননা, দাঁত সইতে পারেনা ওই পেলব নরম শরীর। তাই জ্ঞানী গুনী বিচক্ষণেররা শাস্ত্রে কাবাবে দাঁত ছোঁয়ানোটা ভয়ঙ্করতম শিষ্টাচার বিরোধী ও কৌলিন্যের পরিপন্থী বলে জানবেন। কাবাব খেতে নবাব হতে হয়না, শিল্পী হতে হয়।

বাবুর্চিঃ

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *