একটা প্রবাদ ছোটবেলায় ক্যাম্বিসের খাটে দাদুর সাথে সন্ধ্যার ছাতে শুয়ে থাকতে থাকতে বহুবারই শুনেছি। যদিও কখনও আমার মানা হয়নি বা ওনাকেও মানতে দেখিনি। সেই ছোট্ট বেলাতে ও কথার মানে বোঝার মত মাথা আমার ছিলনা, আজও আছে কিনা জানিনা, তবে উপলব্ধি করি যথেষ্ট – ঠেকে ও দেখে শিখে।

“ফি-লুকমায় মাছের মুড়ো খাবি,

উঠানে হাঁট বসাবি,

তিন মাথার বুদ্ধি নিবি।”

আজ বুঝেছি, ফি-লুকমায় মাছের মুড়ো মানে প্রতিটি গ্রাসে মাছের মাথা থাকতে হবে, অর্থাৎ চুনো মাছ খাবে। অর্থনৈতিক ভাবে এমাছ যথেষ্ট সাশ্রয়ী ছিল, শারীরিক ভাবে বিশেষ করে হাড় ও চোখের জন্য এটা খুবই কার্যকর মাছ। উঠানে হাঁট বসানো মানে- আঙিনার আশেপাশে হরেক রকমের মরসুমি সব্জির চাষ করতে বলা, সেক্ষেত্রে কাঁচাসব্জির খরচ ও তাজা অর্গানিক ফসল খাওয়াটা কপালে জুটবে খুবই স্বল্প খরচে। তিন মাথার বুদ্ধি মানে তিনজন মানুষ নয়, গ্রামাঞ্চলে বৃদ্ধেরা দুই হাঁটু জোড়া করে পায়খানা করতে বসার মত কর মাটিতে পাছা পেতে বসে থাকেন, তাদের মাথাটা ওই দুই হাটুর ঠিক মাঝখানটাতে সামান্য উঁচু হয়ে থাকে, এনাদেরকেই তিনমাথা বলা হয়। এনারা বয়স ও অভিজ্ঞতায় অতিপ্রবীন, কর্মঠ হওয়ার দরুন মেদবিহীন শরীর। এদের থেকে জীবনের পরামর্শ তথা বুদ্ধি নিতে বলেছেন। সবে মিলে একটা দুরন্ত শিক্ষণীয়  ব্যাপারস্যাপার ছিল।

“খাবি কচু, থাকবে কিছু

খাবি ঘি, বাঁচাবি কি”?

এটাকে ব্যাখ্যা করার কিছু নেই, এটা পরিষ্কার লেখা।

আমি আজকাল এককাঠি সরেস, চুনো মাছ ছেড়ে মাছের ডিমে চলে এসেছি সটান, প্রতিকামড়ে কয়েকশত মাছ। ইলিশের মরসুমে আজ আধা পিস ভাল ‘ভাজা বা ভাপা’ বিনে মাছ আমার তেমন পছন্দের বিষয় নয়, তবে হ্যাঁ কেনাতে আমি ভীষণ দর। বাড়িতে মা, বৌ, মেয়ে ও আত্মীয়স্বজনেরা এলে ওনারা মাছ খুবই পছন্দ করে। তাই লোটে, ভোলা, পাঙ্খা থেকে চিংড়ি, ইলিশ, দেশী কাতলার মত খানদানী সব ধরনের মাছই ফ্রিজে ঢোকে উল্লাসের সাথে। মাসে আমার ৩-৪ দিনই বাজার হয়, সুতরাং যখন কেনাকাটা হয় তখন সেই হোটেলের একদিনের বাজারের মত পরিমানই নিয়ে আসা হয়, ঢাউস ঢাউস ব্যাগে করে।

মাছের ডিমের বড়া, গোলগোল করে কাঁচা লঙ্কা ও পরিমিত পেঁয়াজের সাথে, মৌরিবাঁটা ও আরো কিছু সাধারণ মশালা সহযোগে, গরম গরম তাওয়া থেকে যখন ওই কালচে মামরির ভিতর হলদেটে সাদা অংশটা দৃশ্যমান হয়, পাকস্থলীর প্রতিটা কোষ যেন জিভের স্বাদকোরোক গুলোকে বল্লম দিয়ে খুঁচিয়ে জাগিয়ে দেয়। শরীরের ব্যাহিক কোষে খোঁচা মানে রক্তক্ষরন আর স্বাদকোরকে ভোগের বাসনার খোঁচা লালাক্ষরণ ঘটিয়ে তোলে। তারপর! তারপর আবার কি! রসনার পেশিখন্ডটা তখন অন্তর থেকে উলু দিয়ে উঠে, গোটা প্লেট যে কখন শেষ হয়ে যায় আজ পর্যন্ত কখনও টেরই পায়নি।

বাঙাল বাড়ির প্রায় প্রতিটি ঘরে কচুর শাক পদটির মহিমাকীর্ত্তন লিখতে বসলে তা দুইশত মহাভারতের  পরিমাণের চেয়েও যে বেশি হবে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। সব্জি বাজারের এক কোনে মরা সাপের মত এরা শুয়ে থাকলেও এটাকে সঠিক ভাবে রান্না করতে পারলে, বিরিয়ানি, পোলাও না খেয়েও সত্যিই পূর্ববঙ্গের মানুষদের মত গর্ব করা যেতেই পারে। কেউ কালোজিরে দিয়ে রান্না করে, কেউ ইলিশের মাথাটা দিয়ে, মোটকথা এর রন্ধনপ্রণালী অগুন্তি। ভাতে একবার মাথা হয়ে গেলে সড়াৎ সড়াৎ করে মুখের ভিতর দিয়ে তা উদরে নিমিষে চালান হয়ে যায়। বোনের শ্বাশুরি কাঠ বাঙাল, আমার ঘরণী খাজাছাপ উড়িয়া বিহারী তার উপরে জিনগত ভাবে  খোট্টাজাত। তার পরেও এনাদের দুজনের যুগলবন্দিতে রেসিপি আদানপ্রদান হয়েছে বিগত ৭-৮ বছর ধরে, ফলাফল নিচের ছবিদুটি।

সুতরাং, শুধুই কাবাব, বিরিয়ানি নয়, মাঝেমাঝে এই সবের মাঝেও স্বাদের অমৃতভান্ডার লুকিয়ে থাকে, শুধু সেই স্বাদটা পিষে বেড় করে আনতে হয় এইযা, এর জন্য অবশ্যই দক্ষ বাবুর্চি লাগে।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *