এই বৃষ্টির দিনে চেয়ারে বসে বেশ সুন্দর ভাবে চারমিনারের রিং ছাড়ছিল ফেলুদা হঠাৎ করে দরজায় টোকা পড়তেই তোপসে দৌড়ে গিয়ে পিয়ন এর হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে ফেলুদাকে দিল৷ চিঠিটা পড়তে পড়তে ফেলুদা বলল তোর সতীশ পাকড়াশী কে মনে আছে সেই যে…..

মাধ্যমিক পরীক্ষায় পর চুপচাপ ঘরে বসে আগামী দিনের আগাম প্রস্তুতিতে বিভিন্ন বিষয়ের বই উল্টে সময় কাটছিল না তোপসের৷ ফেলুদার কথাতে রহস্যের গন্ধ পেয়ে দৌড়ে গিয়ে টেলিফোন ডিরেক্টরি পাতা উল্টে বলল তিনজন সতীশ পাকড়াশী আছে৷

ফোনটা না নামিয়ে রেখেই তোপসে কে বললো বার হতে হবে রেডি হয়ে নে৷ এমন সময় দরজায় আবার টোকা পড়লো৷এক ঠোঙা সিঙ্গারা হাতে লালমোহন বাবুর প্রবেশ।ছাতাটা রাখতে রাখতে বললেন,এই বৃষ্টিতে আর পারা যায় না মশাই৷ ফেলুদা প্রশ্ন করলেন আপনার সাথে গাড়ি আছে তো?

আনন্দ পুরস্কার পেয়েছিলেন এবার জ্ঞানপীঠ প্রাপকের তালিকায় নাম উঠতেই অনেকগুলি টাকা হাতে নিয়ে একটি নতুন গাড়ির সন্ধানে তোপসকে সাথে নিয়ে বেশ কদিন কলকাতার বিভিন্ন শোরুমে ঘুরে শেষে শহরের খানাখন্দ আর বর্ষার দিনে গড়পারের জলের কথা মনে মাথায় রেখে দুধসাদা মারুতি জিপসি কিনেছেন৷

ড্রাইভারের পাশের সিটে ফেলুদাকে বসিয়ে দিয়ে পিছনের সিটে তোপসের পাশে বসেই প্রশ্ন করলেন ব্যাপারটা কি ভায়া?সত্যি কথা বলতে গেলে সতীশ পাকড়াশী নামটা ছাড়া কোন কিছুই তোপসের কাছে পরিষ্কার নয় তবুও আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বলল, চলুন না ওখানে গেলেই সব বোঝা যাবে।

সেই ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলা, চেহারাটা একই রকম ধরে রেখেছেন কিন্তু মিস্টার পাকডাশীর কথাতে লালমোহনবাবুর চক্ষু চড়কগাছ৷

পেনিসিলভেনিয়া স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানের একদল অধ্যাপক
সার্ভে করে জানিয়েছেন 
অপরিকল্পিত বন নিধনের কারণে আগামী ৫০ বছরের মধ্যে বিলীন হয়ে যেতে পারে আমাজন অরণ্য৷ফলে পৃথিবী জুড়ে নষ্ট হবে পরিবেশের ভারসাম্য আর সমগ্র পৃথিবী হারাতে পারে বিপুল পরিবেশ বৈচিত্র।এই ব্যাপারে তথ্য অনুসন্ধান করে লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের পুলিশ এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে বিপুল জীববৈচিত্র্য আর দুষ্প্রাপ্য সব কাঠের সন্ধানে চোরাচালানকারীদের মুক্তাঞ্চল হয়ে উঠেছে আমাজন অরণ্য অববাহিকা৷ ওনাদের অনুরোধেই ইউনেস্কো নিজের হেরিটেজ সাইট রক্ষা করার জন্য একটা দলগঠন করেছে৷ সেই দলেই ফেলুদা অ্যান্ড কোম্পানির নাম নথিভুক্ত করিয়ে দিয়েছেন মিস্টার পাকড়াশী। উনি এখন ইউনেস্কোতে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন।

ফিরতি পথে গাড়িতে বসে চিঠিটা দেখিয়ে ফেলুদা লালমোহন বাবুকে প্রশ্ন করলেন যাবেন নাকি মশাই আমার সাথে? আমার কিন্তু দুজন সহকারি নেবার সুযোগ আছে।ফেলুদার প্রশ্নে উত্তেজনায় নিজেকে সংযত রাখতে না পেরে লাফিয়ে উঠতে গিয়ে লালমোহন বাবুর মাথা ঢুকে গেল গাড়ির ছাদে৷সিধু জ্যাঠার বাড়িতে ঢুঁ মেরে ফিরতে গিয়ে আরও ঘন্টা খানেক কেটে গেল।

এই ধরনের বৃষ্টিতে রাতে ফেলুদার ঘরে খিচুড়ি আর ইলিশ মাছ ভাজা দিয়ে ডিনার সারতে সারতে লালমোহনবাবু প্রশ্ন করলেন আমাদের কি জীবনহানির আশঙ্কা আছে? ফেলুদা ওনাকে আশ্বস্ত করে বললেন সঙ্গে সরকারি সিকিউরিটি আর দোভাষী থাকবে৷ ফেলুদা তোপসে কে বললেন চটপট নোটের খাতাটা বার কর,অনেক কিছু নোট নিতে হবে। কাল আমাকে একবার কলেজস্ট্রিট ঘুরে আসতে হবে।ইংরেজি থেকে পর্তুগিজ ভাষার একটা অভিধান জোগাড় করতে হবে। লালমোহনবাবু আপনি তো এসপারান্ত জানেন,সেটাও মনে হয় এবার আপনার কাজে লেগে যাবে৷ তাছাড়াও বেশ কিছু অ্যানথ্রোপলজিক্যাল জার্নাল সংগ্রহ করতে হবে।এত টেনশনে আর থাকতে না পেরে লালমোহন বাবু ঢক করে এক গ্লাস জল খেয়ে নিলেন৷ আজ রাতটা উনি এ বাড়িতেই কাটাবেন৷ তোপসের নোট নেওয়াও ব্যাপারটা সামনে থেকে দেখবেন।বাইরের ছোট ঘরে ড্রাইভারের শোবার ব্যবস্থা হল।

ফেলুদা বললেন লালমোহন বাবু আপনার পাসপোর্টটা যত শীঘ্র সম্ভব এখানে দিয়ে যাবেন৷ আমাদের আবার লিসবন ঘুরে তবে রিও তে নামতে হবে৷ দিল্লিতে দুটো দেশের এমব্যাসি থেকে ভিসা করাতে হবে সাথে সাথে ইউনেস্কোর দপ্তর থেকে যাতায়াতের টিকিট আর লিঁয়াজো অফিসারের নাম্বারটা জোগাড় করতে হবে৷

ফেলুদা তোপসেকে বলতে শুরু করলো৷ কোন একটা দেশের সম্বন্ধে কিছু ভাবতে গেলে ঐ দেশের ইতিহাস, ভূগোল ভালো করে জানা দরকার৷ব্রাজিলের 
ইতিহাস,ভূগোল,অর্থনীতি বিশেষ করে আমাজান নদী আর তার অববাহিকা নিয়েই কাজ কারবার ফলে মনোযোগটা ও দিকেই দিতে হবে৷ ব্রাজিল দক্ষিণ আমেরিকার সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র। জনসংখ্যা ও ভৌগোলিক আয়তনের দিক থেকে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম দেশ। আমেরিকা মহাদেশের একমাত্র পর্তুগিজ ভাষী দেশ এবং বিশ্বের সর্ববৃহৎ পর্তুগিজ ভাষী রাষ্ট্র। 
পর্তুগিজ উচ্চারণে ব্রাজিউ নামে বেশী পরিচিত৷

পেদ্রু আলভারেজ কাবরাউয়ের ব্রাজিলে প্রথম পর্তুগিজ উপনিবেশ স্থাপন করেন৷পরে যুক্তরাজ্য, পর্তুগাল ও আলগ্রেভিজ মিলে একটা যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলে কিন্তু নেপোলিয়ন পর্তুগাল আক্রমণ করাতে সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দু লিসবন থেকে ব্রাজিলের রিও তে সরে আসে।১৮২২ সালে ব্রাজিল, পর্তুগালের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে।
লালমোহন বাবু সময়টা খেয়াল করবেন আমাদের থেকে একশ পঁচিশ বছর আগে ব্রাজিল স্বাধীনতা লাভ করে৷

তোপসে এটা খাতার দ্বিতীয় ভাগে নোট কর..

আমাজন পৃথিবীর দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী, উৎসস্থল পেরুর আন্দিজ পর্বতের 
নেভাদোমিস্‌মি নামের চূড়া৷ প্রায় ৩০০০ মাইল পাড়ি দিয়ে পাঁচটি দেশ বিধৌত হয়ে আটলান্টিক মহাসাগরে গিয়ে পড়েছে। এই নদী যে পরিমাণ জল ধারণ করে তা বিশ্বের যেকোন নদীর তুলনায় বেশি।আমাজন নদী যেখানে সাগরে গিয়ে মিশেছে সেখানে প্রতি সেকেন্ডে ৪.২ মিলিয়ন ঘন ফুট জল সাগরে গিয়ে পড়ে। বর্ষা মৌসুমে এই পরিমাণ গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ৭ মিলিয়ন ঘন ফুট।

আমাজান জঙ্গল আমাজন নদীর অববাহিকায় অবস্থিত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নিরক্ষীয় বন,যা দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের উত্তরভাগে অবস্থিত ৯টি দেশের অন্তর্ভুক্ত। আমাজন অরণ্যের ৬০ শতাংশ রয়েছে ব্রাজিলে,১৩ শতাংশ রয়েছে পেরুতে এবং বাকি অংশ রয়েছে কলম্বিয়া,ইকুয়েডর, ভেনেজুয়েলা,গায়ানা,
বলিভিয়া, সুরিনাম এবং ফরাসি গায়ানা জুড়ে।পৃথিবী জুড়ে যে রেইনফরেস্ট তার অর্ধেকটাই এই অরণ্যে।

এর আয়তন প্রায় সাড়ে পাঁচ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার। আমাজান বন অত্যন্ত দুর্গম। তবে দক্ষ গাইডসহ নদী পথে ভ্রমণ এই নিরক্ষীয় বনের প্রাকৃতিক বিষ্ময় দেখার সবচেয়ে ভালো উপায়। প্রাচীনকাল থেকেই অভিযাত্রীরা আমাজানে যাত্রা করে মূলত স্বর্ণ,রৌপ্য এবং ধন-রতে খোঁজে। পর্তুগিজ অভিযাত্রীরা বিশ্বাস করত, বিশাল এ বনের মধ্যেই কোথাও লুকিয়ে আছে ‘এলডোরাডো’ নামক এক গুপ্ত শহর, যা পুরোপুরি সোনার তৈরি। এই ভ্রান্ত ধারণাটি এসেছে গ্রিক পৌরাণিক গল্প থেকে যেখানে বলা হয়েছে যে ‘এলডোরাডো’ নামক সোনায় মোড়ানো শহরটি পাহারা দেয় এক শ্রেণীর বিশেষ নারী যোদ্ধারা, যাদেরকে গল্পে ‘আমাজন’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। পর্তুগিজ,স্প্যানিশ এবং ফ্রেঞ্চ অভিযাত্রীরা প্রতিযোগিতায় নামে এই ‘এলডোরাডো’ শহর আবিষ্কারের জন্য। কিন্তু কেউ এই কাল্পনিক শহরের খোঁজ পায়নি। শহরের সন্ধান না পেলেও স্থায়ী হয়ে যায় সেই নারী যোদ্ধাদের নাম। তাদের নামানুসারেই এই জঙ্গলের নাম হয় ‘আমাজান’ জঙ্গল। 
আমাজানকে রেইনফরেস্ট বলা হলেও এর অর্থ কিন্তু এই নয় যে, এখানে সারা বছর বৃষ্টিপাত হয়। বরং রেইনফরেস্ট বলা হয় এখানকার অত্যধিক আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাত বর্ষাতে এবং গরম আবহাওয়ার কারণে। প্রচণ্ড গরম এখানে আর্দ্রতা এবং বৃষ্টিপাত বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ। এই গরম আবহাওয়া, বৃষ্টিপাত এবং আর্দ্রতার কারণে এ বনে উদ্ভিদ ও প্রাণীকুলের বৈচিত্রময় সমাহার দেখা যায়। এখানে আছে ১২০ ফুট উঁচু গাছ, ৪০ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ, ২.৫ মিলিয়ন প্রজাতির কীট-পতঙ্গ ১,২৯৪ প্রজাতির পাখি, ৩৭৮ প্রজাতির সরীসৃপ, ৪২৮ প্রজাতির উভচর এবং ৪২৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীসহ হাজারো প্রজাতির অজানা জীব-অণুজীব। এখানকার প্রাণীবৈচিত্র অতুলনীয়। মজার বিষয় হলো হাজারো রকমের প্রাণীর সমাহার থাকলেও এখানকার ইকোসিস্টেম অত্যন্ত শক্তিশালী যা মিলিয়ন বছর ধরে টিকে আছে। এই বনের স্তন্যপায়ীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জাগুয়ার, গোলাপি ডলফিন, তামানডুয়া, তাপির, মানাতি, ইঁদুর, কাঠবিড়ালি,বাদুড় ইত্যাদি।পাখিদের মধ্যে ঈগল, টুকান, হোয়াটজিন, দ্রুতগামী হামিং বার্ড এবং আরও রঙ-বেরঙের অনেক পাখি দেখা যাবে। পৃথিবীর সকল পাখির এক পঞ্চমাংশ পাখি এই বনের অধিবাসী।মাছের মধ্যে আছে মাংসাশী লাল পিরানহা, বিপদজনক বৈদ্যুতিক মাছ এবং স্বাদু পানির অন্যতম বড় মাছ-পিরারুকু, যার ওজন ১৫০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। উভচর প্রাণীর মধ্যে লাল চোখ বিশিষ্ট গেছো ব্যাঙের নাম না বললেই নয়। সরিসৃপের মধ্যে আছে বিখ্যাত সাপ বোয়া যা তার শিকারকে পেঁচিয়ে ধরে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলে। তাছাড়া রয়েছে কুমির, অ্যালিগেটর, কচ্ছপ প্রভৃতি। এছাড়াও বিভিন্ন প্রজাতির পিঁপড়া, বড় তলাপোকা, রঙ-বেরঙের প্রজাপতি, শুঁয়োপোকা আর জানা অজানা হরেক রকমের পোকা-মাকড়ের বসতি এই আমাজনে।

আমাজন অরণ্যের গুরুত্ব অসীম,পৃথিবীর ২০ শতাংশ অক্সিজেন আসে আমাজন থেকে। আমাজন পৃথিবীতে প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চার্যের একটি। এই বনের নদী বা আমাজন নদী বেশির ভাগ নদীর উৎস। এই নদী বিশ্বে প্রচুর জলের যোগান দিয়ে থাকে। আমাজন নদীতে ৩০০০ প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণী আছে।

লালমোহন বাবু আপনাকে কিন্তু দীর্ঘক্ষন সিট বেল্ট বেঁধে বসে থাকতে হবে৷ উনি উত্তেজনার বশে বলে উঠলেন কেন কেন?

ফেলুদা বলল তোপসে নোট কর….

ব্রাজিলে প্রায় ২,৫০০ বিমানবন্দর ও বিমান অবতরণের স্থান রয়েছেI আমাদের তাই মোটামুটি গোটা ব্রাজিল টা বিমানে বিমানে কেটে যাবে মনে হচ্ছে৷সাও পাওলো শহরে কাছে অবস্থিত সাও পাওলো গুয়ারুলহোস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্রাজিলের সর্ববৃহৎ ও ব্যস্ততম বিমানবন্দর। দেশটির অভ্যন্তরীন জনপ্রিয় ও বাণিজ্যিক পরিবহনের একটি বড় ও বৈচিত্রময় অংশ এই বিমানবন্দরে সম্পন্ন হয়। এছাড়াও আন্তজার্তিকভাবে এই বিমান বন্দরটি ব্রাজিলকে বিশ্বের সকল বড় শহরগুলোর সাথে যুক্ত করেছে।

নোট নেবার লোভে লালমোহনবাবু সব কাজকর্ম ছেড়ে দিয়ে ফেলুদার বাড়ি গত তিনদিন ধরে পড়ে আছেন৷

ফেলুদা আবার নূতন আবার নতুন করে শুরু করেছে লালমোহন বাবু আপনি কিন্তু সাবধানে সবকিছু পড়ালেখা করবেন না হলে গতবারের সেই ব্রাজিলের বিচ্ছুর মত হয়ে যাবে৷

তোপসে আরেকটা নতুন তথ্য পাওয়া গেছে এটা নোট করে রাখ…

আমাজান নদী বিধৌত অঞ্চল ব্রাজিলের অ্যাকরি রাজ্যের পেরুর সীমান্ত ঘেঁষা অঞ্চলের গভীর আমাজান জঙ্গলে এখনো সভ্যতার আলো ছাড়া বাস করে প্রাচীন উপজাতীয় মানবগোষ্ঠী। যাদের অনেকের সঙ্গেই কোনো যোগাযোগ নেই সভ্য দুনিয়ার। যাদের পরনে এখনও কোন কাপড় নেই।

অবৈধভাবে ভূভাগে কেউ প্রবেশ করেছে কিনা তা দেখার জন্য গত সপ্তাহে পেরু সীমান্তে টহলের সময় ব্রাজিলের একটি বিমান থেকে তাদের এই ছবি তোলা হয়। আকাশ থেকে তোলা ছবিটিতে দেখা যায়, গভীর অরণ্যে কলাগাছের বাগান ঘেরা কয়েকটি কুঁড়েঘরের নিচে নগ্ন অবস্থায় কিছু মানুষ আকাশের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে বিমান দেখে। তাদের কাউকে কাউকে বর্শা হাতে ভয় দেখাতেও দেখা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, অরণ্যচারী মানবগোষ্ঠীটি ছোট এবং তাদের সঙ্গে সভ্য জগতের কোনো সম্পর্ক নেই।

ব্রাজিল সরকারের ধারণা মতে দেশটির অ্যাকরি রাজ্যের দুর্গম গভীর অরণ্যে বাস করা এই মানবগোষ্ঠীটির লোকসংখ্যা প্রায় দুশো। নানা কারণে হুমকির মুখে থাকা এই ছোট্ট গোষ্ঠীটিকে বাঁচাতে সরকার ইচ্ছে করেই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ না করার পলিসি গ্রহণ করেছে। তবে ছোট্ট গোষ্ঠীটি সভ্য মানুষদের অরণ্যধ্বংস,মাইনিং, গবাদি পশু পালন, মাছধরা,অবৈধ শিকার সহ স্বেচ্ছাচারিতার বলি হয় কিনা সেদিকেও খেয়াল রাখছে।আমাজান জঙ্গলে এখনো সভ্যতার আলো ছাড়া বাস করে প্রাচীন উপজাতীয় মানবগোষ্ঠী৷জানা গেছে, প্রাচীন আসহানিনকা উপজাতীয় গোষ্ঠীর লোকেরা অন্য ছোট গোষ্ঠীর লোকদের সঙ্গে ওই অঞ্চলে ভাগাভাগি করে থাকে। এছাড়াও আমাজানে সভ্য জগতের সঙ্গে যোগাযোগবিহীন আরেকটি ছোট্ট গোষ্ঠী আছে।ধারণা করা হচ্ছে এটিই সেই গোষ্ঠী।এইসব গোষ্ঠীগুলোকে যেন তাদের জায়গা থেকে তাড়ানো না হয় সেজন্যে ব্রাজিল সরকার ও এনজিওগুলো কাজ করছে।

শোন বলেছিলাম আমরা কিন্তু লিসবন ঘুরে যাব তাই লিসবন সম্বন্ধেও দু-এক কথা লিখে রাখ।লিসবন পর্তুগাল রাজধানী শহর,দক্ষিণ- পশ্চিমাঞ্চলের তাজোর নদী মোহনায় কারাবাসের উত্তর 
উপকূলের উপর অবস্থিত।১৭৫৫ সালের বড় ভূমিকম্পের পর একটি নতুন শহর তৈরি করা হয়েছিল।

শিল্পের শহর লিসবনে অনান্য সব শিল্পের সাথে তামাক শিল্প বিখ্যাত।এখানে ভাস্কো দা গামা মিউজিয়ামে নৌকা আর প্রাচীন ব্রাজিল সম্বন্ধে কিছুটা পড়া লেখা করে নিতে হবে৷ তোপসে এটা আলাদা করে লিখে রাখ৷

লালমোহন বাবু এবার কিন্তু জঙ্গলে জঙ্গলে বড় স্যুটকেস নেওয়া যাবে না৷ তিনজনেরই তিনটে পিঠে ব্যাগ, হাঁটু অব্দি চামড়ার জুতো, একটা শক্তিশালী, টর্চ বেশকিছু দড়ি,একটা কম্পাস,বাইনোকুলার আর ছুরি ভরে নিতে হবে৷

প্লেন লিসবন এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করল।

(২)

এয়ারপোর্টের পথে আমি একটা ট্যাক্সি বুক করে নিয়েছিলাম। লালমোহন বাবু দেখি এক্কেবারে সাহেব সেজে এসেছেন, মাথায় একটা কাউবয় হ্যাট, ফেলুদা শুধালো- ‘এ জিনিস কোত্থেকে যোগার করলেন মশাই’, জবাবে উনি বললেন ‘আমাজন মানেই রহস্য রোমাঞ্চ, সেখানে এমন একটা টুপি পড়লে অভিযাত্রী ফিলিংসটা গাঢ় হয়ে আসে আরকি’। ফেলুদা বলল-

-‘সে নাহয় বুঝলাম, আপনি কী জানেন ওদেশে টুপি নামের একটা নৃতত্ব জাতিগোষ্ঠীর বাস আছে! সে ছাড়ুন ও প্রসঙ্গে পরে আসা যাবে, কিন্তু আপনি হঠাৎ আপনার প্রিয় মাদ্রাজি সবুজ রঙ ছেড়ে সাদা জিপসিতে মন আঁটকালেন কীভাবে! রাজনীতিতে নাম লেখাবার ইচ্ছা হয়েছে নাকি!’

– ‘আর বোলেননা মোহাই, বল্লে কিনা এই গাড়ি সবুজ রঙে পাওয়া যাবেনা, তাছাড়া সাদায় একটা আভিজাত্য আছে, কি বলো ভাই তোপেস! হেঁ হেঁ হেঁ’

আমিও একটা সম্মতিসূচক ইশারা করলাম। সেবারে লন্ডনে যাবার পর থেকে দেশে ফিরে অবধি আর সেভাবে ক্ষণে ক্ষণে রোমাঞ্চিত হতে দেখেনি ওনাকে, লন্ডন ঘুরে নাকি এই সব ছোটখাটো বিষয়ে আর ওনার এড্রেনালিন গ্রন্থি সচল হয়না; কিন্তু এবারে আমাজন নাম শোনা ইস্তক কত ভাবে যে নামটাকে উচ্চারণ করার চেষ্টা করেছেন তার গোনাগুন্তি নেই। কখনও এসপারেন্তো, কখনও পর্তুগীজ আবার কখনও খাঁটি ব্রিটিশ এক্সেন্টে, একবার তো ঢাকাই বাঙালদের মত উচ্চারণ করতেও শুনেছি। ফেলুদা বললেন- ‘ব্রাজিলে কমপক্ষে ১৮০ ধরনের ভাষা প্রচলিত আছে, তাছাড়া ওদের পর্তুগীজ ভাষাটা সেই ১৬০০ শতকের মত অবিকল; আপনার কলেজস্ট্রিটের সহজে ‘পর্তুগীজ শিখুন’ খুব বেশি কাজে আসবে বলে মনে হয়না। ব্রাজিলে সবচেয়ে বেশি বিদেশী হিসাবে জাপানিদের বাস রয়েছে, ওই ভাষাটা শেখা থাকলেও কাজে আসবে’। ফেলুদার এই হোমওয়ার্ক আমাকে সকল সময় আশ্চর্য করে, সিধু জ্যাঠার থেকে নেওয়া জ্ঞান গুলো না লিখে রেখেও দিব্যি নির্ভুল ভাবে বলে যেতে পারেন।

সিকিউরিটি চেক ইন করে নেওয়ার পর আমাদের তিনজনের মিলিয়ে একটা যে বড় লাগেজ, সেটা বিমান কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করে দিয়ে, ফেলুদার রিভালবারটার স্পেশাল পার্মিশন সংক্রান্ত কাজকর্ম সেরে, ভিতরের লাউঞ্জে বসা ইস্তক টারম্যাকে বড় বড় এয়ারবাস গুলোকে দেখলেই লালমোহন বাবু আমার দিকে ইশারা করে আমাকে নিশ্চিত করছিলেন যে এটাই আমাদের আমাজনে নিয়ে যাবে। পরবর্তীতে আরেকটা আসতেই প্রথমটাকে ছেড়ে, সেটাকেই আমাদের বলে চিহ্নিত করছিলেন। আমি যখন বললাম– আমাদের প্লেন আমাজনে যাবেনা, যাবে পর্তুগাল। আর সেখানে বিমান পরিবর্তন করে ব্রাজিলের রিও-দ্যা-জেনেইরো শহরে, তারপর সেখান থেকে বহু সড়ক ও নদী পথ পেরিয়ে তবে আমাজনের জঙ্গল।

ফেলুদা পাশের একজন রোদে পোড়া তামাটে বর্ণের লালচুলো ভদ্রলোকের সাথে কথোপকথন করতে করতেই ফুট খাটল-‘আপনি যে প্লেনগুলোকে আমাদের বলে মার্ক করছেন ওগুলো সব পণ্যবাহী’। ভদ্রলোক কেমন যেন দমে গেলেন, তারপরেই খানিকটা চমকে দিয়ে চেয়ারে বসে বসে প্রায় উদাত্ত কন্ঠে একটা কবিতা আবৃত্তি করতে শুরু করে দিলেন-

—‘ ধরনীর ফুসফুস তুমি আমাজন/ সপ্তাশ্চর্যের অন্যতম প্রাকৃতিক বন/ কত শত রহস্য আপন বুকে লয়ে/ মানুষের লালসায় যাচ্ছো তুমি ক্ষয়ে’

  • ‘কী কালজয়ী লিখে গেছেন মহাই, ভাবতে পারেন! আমার প্রিয় শিক্ষক মল্লিক বাবু, বৈকুন্ঠ মল্লিক’।
  • ফেলুদা বললেন- ‘ভদ্রলোকের দূরদৃষ্টি ছিল মানতে হবে’।

এয়ারোব্রিজ বেয়ে ‘এয়ার ইন্ডিয়া’র বোয়িং এয়ারবাসে চড়তেই এয়ার হোস্টেজরা নমস্কার করে অভিবাদন জানালো, লালমোহন বাবুও তাদের সব্বাইকে একে একে ওদের মত করেই নমস্কার করা শুরু করতে মুহুর্তে একটা হাসির পরিবেশ তৈরি হল। সিটবেল্ট বেঁধে ফ্লাইট রানওয়েতে গতি নিতেই উনি স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে বিড়বিড় করে দূর্গা নাম জপ করতে লাগলেন। ফেলুদা আমাদের সামনের সীটে, পাশে সেই লাউঞ্জের লালচুলো ভদ্রলোকের সাথেই ইংরেজিতে কথাবার্তা বলতে ব্যাস্ত, আমি আর লালমোহন বাবু ওনাদের পিছনের সীটে, উইন্ডো সীটটা আমি ইচ্ছাকৃতই লালমোহন বাবুকে ছেড়ে দিয়েছিলাম। জানালা দিয়ে কোলকাতা বিন্দুবৎ হয়ে মেঘের আড়ালে চলে যেতেই, উনি বিখ্যাত গায়ক ললিত মোহন বটব্যালের কয়েকটি ঠুমরী, আকাশ-বাতাস-মেঘ নিয়ে বাঁধা কিছু গান, ওনার বেসুরো গলায় গুনগুনাতে লাগলেন। সন্ধ্যায় রওনা দিয়েও আমরা যখন দিল্লিতে ল্যান্ড করলাম সেখানেও তখন সন্ধ্যা, ফেলুদা বলল- ‘আমরা গ্রিনিচের অভিমুখে চলেছি’। দিল্লি থেকে একজন লালচে গোঁফ ও সেই রঙের জুলফিওয়ালা টাকমাথা যুবক তার কেবিন লাগেজটা উপরে তুলতে গিয়ে লালমোহন বাবুর গায়ের উপরে ফেলে দিয়ে সে এক কান্ড বাঁধিয়ে বসলেন, কিন্তু লালমোহন বাবু এতটুকুও না রেগে বললেন আমাকে আশ্চর্য করে বলে উঠলেন-‘ বেম-ভিন্দো, এস্তে এ’উমা কুয়েস্তো পেকুয়েনা’, একটা বিজয়ের হাসি হেসে আমাদের দিকে তাকালেন। ফেলুদা বললেন- ‘বটে, এরই মধ্যে ভাল উন্নতি করেছেন দেখছি পর্তুগীজে’। আমি কিছু না বুঝে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলাম।

  • ‘ভদ্রলোক প্রবাসী ভারতীয়, টেনসনে আছে’- ফেলুদা ফিসফিসিয়ে লালমোহন বাবুকে বলল।
  • ‘কি করে বুঝলেন মশাই’!
  • খেয়াল করলে আপনিও বুঝতে পারতেন, ওনার ব্যাগে হ্যান্ডেলের কাছে গনেশের ছবি সাঁটা রয়েছে, সাথে N.B এই দুটো অক্ষর, সম্ভবত নিজের নাম আর পদবির অদ্যাক্ষর। গোঁফ ও জুলফির বার্গেন্ডি রঙ প্রমান দিচ্ছে শৌখিন মানুষ, কিন্তু গোঁফদাড়ি এমন অবিন্যস্তভাবে বেড়ে যাওয়াটা টেনসনে থাকার লক্ষণ। তাছাড়া বাইরের স্যুটের সাথে ভিতরের ওয়েষ্ট কোটটি বড় বেমানান। বাইরের কোটে খাবারের উচ্ছিষ্টও লেগে রয়েছে। এর সাথে গায়ের চামড়ার খয়েরি রঙ বলছে ট্রপিক্যাল অঞ্চলে এনার বাস।
  • জিনিয়াস 

কোলকাতা থেকে তো দুরস্থান, দিল্লি থেকেও লিসবনের কোনো ডায়রেক্ট ফ্লাইট নেই, কিন্তু আমাদের ওখানেই পৌঁছাতে হবে। প্রায় ৯ ঘন্টা পর প্যারিসে আমাদের ড্রপ করে দিয়ে এয়ার ইন্ডিয়ার প্লেনটা যখন লন্ডনের দিকে উড়ে গেল তখন স্থানীয় সময় রাত সোয়া দু’টো। লালমোহন বাবু ঘুমচোখে যেভাবে চোখ গোলগোল করে ‘পর্তুগাল’ বলে একটা শব্দ করলেন, ভাস্কো-দা-গামাও ভারতে পৌঁছে এমন উল্লাস করেছিলেন বলে মনে হয়না। ফেলুদা শুধরে দিয়ে বল্লেন- ‘এটা প্যারিস, ফ্রান্স। এখানেই ইউনেস্কোর সদর দপ্তর, এখান থেকে একটা প্রতিনিধি দল উঠবে, পরবর্তীতে আপনার পর্তুগাল, সেখান থেকে বাকিটা চাটার্ড বিমানে’। ইয়াব্বড় একটা জিভ কেটে ‘জটায়ু’ বললেন- ‘আরেকটু আগে থেকে বলবেনতো মোহাই, প্রেমের শহর বলে কথা…’। আমি বললাম– এটা এখন পৃথিবীর ফ্যাসন হাব, ফেলুদা বললেন- ‘গুড’। এতো কাছে বাস্তিল দূর্গের দেশে এসে শ্যেন নদী আর আইফেল টাওয়ারটা মিস হয়ে গেল বলে লালমোহন বাবু নিজের মনেই বিড়বিড় করে আক্ষেপ করতে লাগলেন অস্ফুটে।

লাউঞ্জে এসে বসতেই একজন লালমুখো ফ্রেঞ্চকাট দাড়ির ভদ্রলোক এসে ফেলুদার দিকে হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডসেক করে শুধালেন- ‘মিঃ মিটার’! বলেই  একটা ভিজিটিং কার্ড ফেলুদার হাতে দিলেন। ফেলুদা স্বভাব গম্ভীর ভাবে জবাব দিলেন- ‘ইয়েস মিঃ ক্যাসে’। লালমোহন বাবু আমার কানে ফিসফিসিয়ে বললেন ‘ভায়া দাড়িটা দেখেছো, খাঁটি ফরাসি’, এবারে ফেলুদার হাত থেকে কার্ডটা নিয়ে পড়লেন- ‘জিয়ান পাইরে ক্যাসসলে’, ফেলুদা বললেন- ‘আপনার প্রোনাউন্সসিয়েসনে ওটাই ঠিক, যদিও এরা সেটা বুঝবেনা, সঠিক উচ্চারণটা হল…’ – কথাটা শেষ করতে না দিয়েই আগন্তুক ভদ্রলোক বল্লেন- জ্যা পিঁ ক্যাসে, আই আন্ডারস্ট্যাণ্ড আ লিটিল বেঙ্গলি, আই ওয়ার্কড ফর সামটাইম ইন সুন্দরবন- দ্যা লার্জেষ্ট ম্যানগ্রোভ ফরেষ্ট অ্যান্ড আ ইউনেস্কো হেরিতেজ অলসো’। সকলে হো হো হো করে হেসে উঠলাম। প্রায় ঘন্টা দশেক ধূমপান না করার করার রেসটা, পরপর কয়েকটা চারমিনার ধরিয়ে পুষিয়ে নিল ফেলুদা, মি ক্যাসের সাথে স্মোকিং কর্ণারে গিয়ে গল্প করতে করতে।

ঘন্টাখানেক ধরে অপেক্ষা পিরিয়ডে লালমোহন বাবু ইউসেবিও, বেকেনবাওয়ার, পেলে, মারাদোনা নিয়ে ভুলভাল ছন্দে গান বাঁধার চেষ্টা করতে চেষ্টা করছিল, যদিও এর মাঝে কখনও কলম্বাস, কখনও নেপোলিয়ন, কখনও জুলুয়াস সিজারও আসছিল। এখানে যে বিমানটাতে উঠলাম, সেটা অপেক্ষাকৃত ছোট। ক্যাসে ভদ্রলোক ছাড়াও আরো জনা সাতেক ইউনেস্কোর প্রতিনিধি আমাদের সঙ্গী হলো। ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে লিসবনের হুমবের্তো দেলগারো এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে পৌঁছে আমরা সকলে ফ্রেস হয়ে নিলাম, এখান থেকে দলের আরো বাকি জনা কুড়ি সদস্যেরা আমাদের সাথে যোগ দেবেন। মিঃ ক্যাসে বললেন- ‘পেনসিলভ্যানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা সহ লিসবনের ‘কোইম্বরা’ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন প্রফেসর-গবেষকও যাবেন। ইউরোপের সপ্তম প্রাচীন এই কোইম্বরা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ঐতিহ্য কম কিছু নয়’। তিনি আরো বেশ কিছু তথ্য দিলেন পর্তুগাল সম্বন্ধে, বললেন- ‘দোরু নদীর মোহনায় থাকা রোমান সাম্রাজ্যের পোর্তুজ নামের শহর থেকে এই পর্তুগাল শব্দের উৎপত্তি। রোমান সাম্রাজ্যের পর পরই এদেশে জার্মানেরা আসে, ও তার পরে মুসলমান শাসকেরা। এরাই ইউরোপের সর্বপ্রথম ঘৃন্য দাসপ্রথার সূচনা করেন ও পরবর্তী সেটা লুপ্ত করতেও এদের অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি। এদের শিল্প সংস্কৃতির নমুনা হিসাবে এদের ব্যাবহারে টাইলসের ইতিহাস সুপ্রাচীন, একটা আস্ত টাইলস মিউজিয়ামও আছে। এটা ইউরোপের অন্যতম অনুন্নত দেশ হলেও পৃথিবীর শান্তিময় দেশ হিসাবে দশম স্থানে রয়েছে’।

ফেলুদা যোগ করলেন- ‘বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন বুকস্টরটি এই লিসবন শহরেই অবস্থিত নাম বার্টান্ড। তাছাড়া ব্রিটিদের চা খেতে পর্তুগীজেরাই শিখিয়েছিল। সারা বিশ্বের ৯টি দেশের অফিসিয়াল ভাষা এই পর্তুগীজ, কলোনি হওয়ার সুবাদে। আজকের দিনেও ম্যাকাও দ্বীপ পর্তুগালের উপনিবেশ’। খানিক পর লাউঞ্জে ঘোরাঘুরি করে লালমোহন বাবু ভীষণ গদগদ হয়ে এসে জানালেন- পর্তুগীজেরা নাকি সবাই মোহনবাগানী, কারন সর্বত্র তিনি সবুজ মেরুন রঙের বাহার দেখছেন। ফেলুদা শুধরে দিয়ে বলল- ‘এদের পতাকার রং ওই দুটো রঙে, তাই সবুজ মেরুন দেখছেন। অবশ্য আপনি গড়পাড়ের ঘটি, মোহনবাগানী হিসাবে খুশি হতে মানা নেই, চালিয়ে যান’। এর পর লালমোহন বাবু লাউঞ্জের ‘ক্যাস্তেলো ক্যাফে’ নামের একটি বারে ঢুকে কাউন্টারে ওনার পর্তুগীজ ভাষার দৌড় পরীক্ষা করছেন। ফেলুদা ইশারা করতে উনি আমাদের কাছে ফিরে এসে শুধালেন, -‘ডিমটোষ্ট পাওয়া যায় কিনা শুধাচ্ছিলাম’। ফেলুদা বললেন, আমরা এখন ইউনেস্কোর প্রতিনিধি দলের অধীনে, সব কিছু ওদের অনুমতিক্রমেই করতে হবে’।

লালমোহন বাবু বললেন- ‘আমরা সত্যিই লিসবনে এসেছি তো মোহাই! রিসেপশনের লোকটি মোটেই লিসবন বলছিলনা, তাছাড়া চতুর্দিকে ভিঞ্চি লেখা রয়েছে, এটা আবার মাফিয়াদের দেশ ইতালি নয় তো’? ফেলুদা বললেন- ‘এই এয়ারপোর্টটা ভিঞ্চি গ্রুপের তত্ত্বাবধানে রয়েছে বলে সর্বত্র ঐ নাম, স্থানীয়রা একে পোর্তেলা এয়ারপোর্ট বলে ডাকে; তাছাড়া এরা লিসবন উচ্চারণও করেনা, লিসবোয়া বলে ডাকে’। লালমোহন বাবু শুধালেন- ‘এদের এখানে দিশি মোরগ খাবার উৎসব চলছে, বুইলেন! সর্বত্র মোরগের ছবি ঝুলতে দেখেছি’। ফেলুদা হেসে জবাব দিলেন- ‘অষ্ট্রেলিয়ার যেমন ক্যাঙারু, আমাদের অশোকস্তম্ভ যেমন রাষ্ট্রীয় প্রতীক তেমনি পর্তুগালের রাষ্ট্রীয় প্রতীক হচ্ছে মোরগ। আপনার গোয়া ভ্রমনটা সারা থাকলে এতোটা বেগ পেতে হতনা, পর্তুগীজরা ৪৫০ বছর ধরে গোয়া শাসন করেছিল’।

প্রাতরাশ করার জন্য আমরা বিমানসংস্থার ভিআইপি ‘ট্যাপ প্রিমিয়াম’ লাউঞ্জে এলাম। এখানকার স্মোকিং লাউঞ্জটাও ফেলুদা বেশ কয়েকবার ঘুরে এলো। বহুবিধ খাবারের সমাহারের মধ্যে ভ্যাবচাকা হওয়া আমি আর লালমোহন বাবু, ফেলুদার দেখাদেখি নিজেদের প্লেটে ফেলুদারই পছন্দ মত খাবার তুলে নিয়ে একটা ডাইনিং টেবিলের সোফাতে এসে বসলাম। ফেলুদা বললেন- ‘বুঝতে পারছেন, এখান থেকেই কত শত নাবিকেরা ভারতবর্ষের খোঁজে বেড়িয়েছিলেন সামান্য মশলার সন্ধানে, আর সেভাবেই দুই আমেরিকা মহাদেশ আবিষ্কার’। লালমোহন বাবু বললেন- ‘ভুল করে ঠিক হয়ে যাওয়া আরকি’। ফেলুদা বলে চললেন- ‘ভাস্কো দা গামাকেও দারুচিনি আর এলাচের লোভেই তৎকালীন পর্তুগালের রাজা ম্যানুয়েল-১ ওনাকে ভারতের সন্ধানে পাঠিয়েছিলেন সেই ১৪৯৭ সালে। আরব বনিকদের থেকে তিনি এই মশলার স্বাদের খবর পেয়েছিলেন’।

লালমোহন বাবু শুধালেন- ‘যেগুলো খাচ্ছি, কী নাম এই খাবার গুলোর’? জবাবে ফেলুদা বললেন- ‘এরা সকালে সের্ফ এক মগ কফি ছাড়া তেমন কিছুই খায়না, তাই ব্রাজিলে উপনিবেশের সাথে সাথেই কফি চাষের প্রচলন করেছিল এরা, যেটার দরুন আজ ব্রাজিল বিশ্বের সর্বোচ্চ কফি উৎপাদনকারী দেশ। তবে আপনি যে ব্রেড টোষ্টের কথা বলছিলেন সেটাও এদেরই জিনিস। যদিও সেটা বাটার টোষ্ট, পর্তুগীজে যা ‘তোররাদা কোম মান্তিয়েগা’ নামে পরিচিত। আপনার গড়পারের মতন করে এরা ডিমটোষ্ট খায় বলে মনে হয়না’। আমি বললাম- ফেলুদা, শুনেছি যে শুক্তোও নাকি এদেরই খাবার! লালমোহন বাবু কেমন একটা অবিশ্বাসী চোখে আমার দিকে চেয়ে রইলেন, ফেলুদা বললেন- শুধু শুক্তোই কেন, লঙ্কা, টম্যাটো এমনকি আলুও এদের হাত ধরেই ভারতবর্ষে এসেছিল। লালমোহন বাবু বললেন- ‘তাহলে আমাদের দেশের মুনিঋষিরা আলু ছাড়া আলুনি আর ঝাল ছাড়া সব্জি খেত বলছেন’? ফেলুদা বললেন- ‘আমি কী আর বলছি! ইতিহাস বলছে। কেন পুরীর জগন্নাথ দেবের প্রসাদে আলু দেখেছেন? সেখানে কচু থাকে। তবে এখানে যে সব খাবার গুলো দেখছেন সেগুলো সারা পৃথিবীর প্রায় সব এয়ারপোর্টেই পাবেন এখন’।

(৩)

এবারে আমাদের ওই ‘ট্যাপ এয়ারওয়েজের’ চাটার্ড ফ্লাইটে জনা ৩০ এর প্রতিনিধি দলটা রওয়া দিল ব্রাজিলের উদ্দেশ্যে। এখান থেকে প্রায় ১০ ঘন্টার টানা জার্নি, ফ্লাইটের স্বল্পবসনা বিমানবালাদের দেখে লালমোহন বাবু যেন কিঞ্চিৎ লজ্জা পেয়ে সারাক্ষণ জানালার দিকে চেয়ে মেঘ দেখতে দেখতে পর্তুগীজ ভাষা শিক্ষার বইটা ঘাঁটতে লাগলেন। মাঝে শুধু একবারই বড় দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে শুধিয়েছিলেন- ‘ভায়া, আমাদের লাগেজটা এসে পৌছাবে তো! ফেলুবাবুর কোল্টটা যে ওখানেই আছে। যেভাবে কাটা গাড়িতে আমরা চলেছি…’। ফেলুদা এক কাফ্রী পর্তুগীজের সাথে আমাদের সামনের সিটেই বসে গল্প জুড়েছেন ইংরেজিতে। আমি একটা ম্যাগাজিনের পাতায় চোখ বোলাতে বোলাতে একটা ছবি দেখে থমকে গেলাম, ফেলুদাকে খোঁচা মেরে দেখাতেই সে বলল- ‘জানি, রিওতে নেমে সব বলব’।

আমি বা লালমোহন বাবু এই যাত্রা সম্বন্ধে সেই অর্থে তেমন কিছুই জানিনা, কেনই বা ফেলুদা যাচ্ছে, ওখানে ওর ভূমিকা কী হবে সবটাই আমাদের কাছে ধোঁয়াশা। এর মাঝে ঘটনা বলতে ক্যাপ্টেনের ঘোষণা হল– ‘আমরা এখন ৪২০০০ ফুট উঁচু দিয়ে উত্তর আতলান্তিক মহাসাগরের উপর দিয়ে উড়ে চলেছি’। ঘোষণা শেষ হতেই বেশ বড় একটা এয়ার পকেটে ফ্লাইটটা পড়ে, বেশ খানিকটা নাচানাচি করে স্থির হলেও ততক্ষণে লালমোহন বাবু চোখ কপালে তুলে রামরাম বলে অস্ফুট একটা চিৎকার জুড়ে বসেছেন। স্বভাবতই সমবেত যাত্রীদের মধ্যে একটা চাপা হাসির রোল উঠল। লালমোহন বাবু বললেন- ‘ফেলু বাবু, হাইলি সাসপিসাস। এই এয়ার টারবাইন গুলো ওই ক্রেণ ক্যাপিট্যালিজমেদের কারসাজী নয়তো? আমাদের গাড়ির সকলকেই আমার কেমন ভালমানুষ মনে ঠেকছেনা’। ফেলুদা বললেন- ‘গোয়ান্দার সহকারী হিসাবে ওই অবিশ্বাসটাই স্বাভাবিক, আর ওটা টারবাইন নয় টার্বুলেন্স, ক্রেণ নয় ক্রণি। আর প্লেনকে বারে বারে গাড়ি বললে পরে, এরা বাঙালা বুঝলে সারাক্ষনই আপনাকে দেখে হাসতো’।

দুপুরের লাঞ্চের সময় এক এয়ারহোস্টেজ যখন আমাকে জাগালো, লালমোহন বাবুও তখন অধর ময়রার পানতুয়া ঢুকে যাবে এমন হাঁ করে ঘুমাচ্ছিলেন। আমি ঠেলা দিতেই কিছুটা লালা হাতে মুছে নিয়ে জেগে উঠলেন। আমাদের প্রিমিয়াম ইকোনমি ক্লাসের মিল, উপরে লেখা বন এপেটিস খুব সম্ভবত ফ্রেঞ্চ ভাষা। লালমোহন বাবু এমনিতেই এদের সারাক্ষণ মদ্যপয়ান নিয়ে কেমন বিরক্ত হচ্ছিল, এর উপরে খাবারের প্যাকেটে ভাত বা রুটির কোনোটাই দেখতে না পেয়ে হতাশ হয়ে শুধালেন – ‘ভাই তপেস, এই গোলাপি মাংস গুলো আবার অখাদ্য বা নিষিদ্ধ কিছু নয় তো? মটর, গাজর, ট্যমাটোর সাথে কাঁচা সবুক শাকপাতা, সব যেন আলাদা আলাদা ভাবে গোঁসা করে রয়েছে, কেউ কারো সাথে মিশবোনা এমন ভাব। আমার তো দেখেই পেট গুরগুর করছে ভায়া’।

ফেলুদা শুনে জবাব দিল—‘আপনি ছ্যাঁচড়া আর পাঁঠার মাংসের প্রতীক্ষা করছিলেন নাকি!। চেখে দেখুন অখাদ্য নয় মোটেই, তবে এ সবই প্রায় অলিভ ওয়েলে রাঁধা, সাথে ওয়াইন; আমাদের দেশের মত এতো মসলা খায়না। তবে হ্যাঁ, নার্ভ ধরে রাখুন, এ্যাটল্যান্টিকের মাঝ বরাবর রয়েছি আমরা, আগেকারটার মত বা তার চেয়েও ভয়ানক টার্বুলেন্সের সম্মুখীন হতেই পারেন বাকি যাত্রাপথে’। লালমোহন বাবু কী বুঝলেন কে জানে, সব খাবার গুলো এক নিশ্বাসে খেয়ে নিয়ে দিব্ব্যি ঘুমিয়ে গেলেন। খেয়ে দেয়ে আবার একপ্রস্থ সামনের ছোট্ট স্ক্রিনে ইংরেজি সিনেমা দেখতে দেখতে আমিও ঘুমিয়ে গেলাম।

রিওর গালেনো এয়ারপোর্টে যখন আমরা ল্যান্ড করলাম তখন রাত্রি হয়ে গেলেও, ডিপার্চার গেটে আমাদের জন্য এলাহি সম্ভাষণের আয়োজন ছিল। সাম্বা সুন্দরীরা তাদের ট্র্যাডিশনাল পোষাকে অভিনব কায়দাতে গালে গাল ঠেকিয়ে অভিবাদন জানাচ্ছিল আমাদের আগন্তুক প্রতিনিধিদের। লালমোহন বাবু ঠিক আমার সামনে, তার আগে ফেলুদা অত্যন্ত স্বচ্ছন্দভাবে ওদের থেকে অভিবাদন নিয়ে এগিয়ে গেল। লালমোহন বাবু অত্যন্ত গজগজ করে শুধুই নমষ্কার করাতে তরুনীটি কেমন যেন একটু বিরক্তই হলেন, আমিও ওনার পথ অনুসরণ করে নমস্কারই করলাম। এর পরেই সবুজ রঙের বোতলে পানীয় খেতে দেওয়া হচ্ছিল আমাদের, লালমোহন বাবু বল্লেন- ‘বুঝলেন ফেলুবাবু, মগনলালের ঘরের সেই শরবতের কথা মনে আছ তো! সেই থেকেই শরবত দেখলেই কেমন মনটা কু ডেকে উঠে’। চতুর্দিকের স্বল্পবসনা সুন্দরীদের ভিড় থেকে কতক্ষণে পালাবেন সেটারই তাল খুজলেও ওই ক্যাসে সাহেবের অনুমতি বিনা যাওয়া মানা। ইউনেস্কোর তরফে এই শহরে আমাদের যে লিয়াজো অফিসার সেই ভদ্রলোক আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চললেন। লালমোহন বাবু শুধালেন- ‘ও মশাই, মানুষ খেকো আদিবাসীরা…’ ওনার কথা শেষ করতে না দিয়ে ফেলুদা বললেন- ‘এখান থেকে অন্তত চার হাজার কিলোমিটার দূরে তাদের বাস। রিও বিশ্বের অন্যতম আধুনিক শহর, আপনি নিশ্চিন্তে এয়রপোর্টের বাইরে আসতে পারেন’।

ম্যাপে দেখেছিলাম অশ্বখুরাকৃতি আকৃতির একটা বিশাল মাপের গুয়ানাবারা নামের উপসাগরীয় দ্বীপে এই বিমানবন্দরটি অবস্থিত। এখান থেকে আমাদের ‘মীরামার উইন্ডসর’ হোটেলটি বেশ দূরে, প্রায় ২৬ কিলোমিটার। এখান থেকে আমাদের গোটা ট্যুরের দায়িত্বে রয়েছে ‘ত্রাফালগা’ ট্যুর এজেন্সি, উপরোক্তো অভিবাদন তাদেরই প্যাকেজ ছিল। বরণ অনুষ্ঠান শেষ হলে আমাদের ট্যুর হোস্ট কাম লিয়াজো মিঃ ব্রুনো মেনেন্দেজ দলের সকলের হাতে একটা করে পত্রিকা তুলে দিলেন, যেটার একদিকে পর্তুগিজে লেখা অন্যদিকে ইংরাজিতে। বই এর নাম ‘পালমোয়েস ভেরদেজ’ বাংলা করলে যার অর্থ দাঁড়ায় ‘সবুজ ফুসফুস’। ইউনেস্কোর তরফেই এই বই দেওয়া হয়েছে, এই অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘এক্সপিডিকাও ভেরদেজ’।

আমরা তিনজনে ‘লিভা ভোক’ কোম্পানির হলুদ ট্যাক্সিতে চড়ে হোটেলের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। ফেলুদা বলল- ‘ব্রুনো গাঢ় বাদামী চামড়ার পেদ্রো জাতির মানুষ, যারা এ দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৪৩%। ৪৭% সাদা চামড়ার মানুষের সাথে ৮% আফ্রিকান কৃষ্ণাঙ্গ ও ১% এশিয়ান মানুষও আছে’। এয়ারপোর্টের বাইরে শহরের বিভিন্ন গন্তব্যে যাবার জন্য বাসের অভাব নেই। উপসাগরের উপর দিয়ে একটা ব্রিজ পেড়িয়ে মূল ভূখণ্ডে এসেও বুঝলাম রাস্তাঘাট বেশ মসৃণ, রাত্রির হলুদ ভেপার লাইটে দৃশ্যমান বর্হিদৃশ্যও বেশ উপভোগ্য, চওড়া রাস্তার দুপাশে অনেকটা করে সবুজ ঘাসের জমির উপরে গাছগাছালি। রাস্তা থেকে বেশ অনেকটা দুরত্ব রেখে অনেক নতুন ইনফ্রাস্ট্রাকচার তৈরি হচ্ছে।

হোটেলটা বেশ পশ এলাকাতে, আমি বা লালমোহন বাবু এর আগে কখনও পাঁচতারা হোটেলেই থাকিনি, এটা আবার সাততারা হোটেল। অনেকটা প্রশস্ত লন সহ পেল্লাই সাইজের সব ওয়াকিং এরিয়া, কমন প্লেস, ভিজিটরস এরিয়া সবে মিলে এক এলাহি ব্যাপার স্যাপার। আমাদের তিনজনের জন্য বরাদ্দ একটা সুইট রুম, যা আমাদের বাড়ির খান চারেক বেডরুমের সমান। বাথরুমটাই বেডরুমের সাইজের। লাগাতার দেড়দিন বিমান যাত্রার পর শরীর এমনিতেই ক্লান্ত ছিল, নরম বিছানাতে শরীর এলিয়ে দিলেও ঘুম এলোনা প্লেনে যথেষ্ট পরিমাণ ঘুমাবার জন্য। ফেলুদা ফ্রেস হয়ে হোটেলের জিমের সন্ধানে চলে গেল, এতে নাকি তার শারীরিক ধকল কেটে যাবে। আমি আর লালমোহন বাবু ইউনেস্কোর ব্রোশিয়ারটা খুলে বুঝলাম, এটা আমাদের অভিযান সম্বন্ধীয় একটা হ্যান্ডবুক। আগত ৫৭ জনের এই বিশাল প্রতিনিধি দলে ‘মিটার সি. প্রদোষ’, ইন্টেলিজেন্সার এর সাথে ‘মিটার টি.আর.’ এসিস্ট্যান্ট অফ ‘মিটার পি.সি.’, ‘গ্যাংগোলি এল.এম.’ নোভেলিষ্ট নামটা দেখেই উল্লাসে অভিভূত হয়ে ‘দারার্স’ বলে একটা অদ্ভুত শব্দে প্রায় নেচে উঠলেন উনি। দারার্স কোন ভাষা শুধাতে বললেন- ‘ভায়া উত্তেজনাতে দারুণ আর চিয়ার্স শব্দদুটো জুড়ে গিয়ে এটা হয়েছে, ডোন্টমাইন্ট’।

ব্রোসিয়ারে তালিকা অনুযায়ী- ইউনেস্কোর দলটি তিনটে এলাকাতে আলাদা আলাদাভাবে কাজ করবে। একটা দল সাও পাওলো হয়ে রন্দোনিয়া যাবে, একটা দল সোজা আমাজনাস রাজ্যের রাজধানী মানাউসে যাবে, আর আমরা টিম-সি—পারা রাজ্য হয়ে আমাজোনাস রাজ্যে গিয়ে রন্দোনিয়া হয়ে সাও-পাউলো ফিরব। সেখান থেকেই ফেরার ফ্লাইট। আমাদের দলেই সর্বাধিক সদস্য ২৬ জন, ও ট্যুর কোম্পানির স্থানীয় লোকজন। আমাদের দলে থাকবে ইউনেস্কোর ‘ব্রাসিউ লাতানিয়া’ অঞ্চলের ডেপুটি ডাইরেক্টর মিসেস ‘আর.জি. ফার্সফেল্ড’, প্রোগ্রাম এসিস্যট্যান্ট ‘হোসে লুগে’, মিটিওরোলজিষ্ট বা আবহাওয়াবিদ হিসাবে কোইম্বরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ডঃ হেলিও সিগাল’, পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ডঃ কিগান ম্যাকক্যারি’ ও তাঁদের একজন করে সহকারী। সোশ্যাল এক্টিভিষ্ট তথা জিওগ্রাফার সেই ‘জ্যা পিঁ ক্যাসে’ সাহেব, কেমিষ্ট ‘ডঃ ফিলিপে পেরেইরা’, ইকোলজিষ্ট ‘ডঃ লিমা দুয়ার্তে’, এনথ্রোপোলজিষ্ট ‘ডঃ সার্জিও বারবোসা’, ইকোনোমিষ্ট ‘ডঃ পাওলো ডি সুজা’, ও বন ও আদিবাসী অধিকার রক্ষা মঞ্চ ‘ফুনাই’ এর তরফে ‘মিঃ রুই মরিয়েরা সেলেস’। এছাড়াও অর্নিথোলজিষ্ট, জুলজিষ্ট, সরিসৃপ বিশেষজ্ঞ, মাটি পরিক্ষক প্রমুখেরা যাত্রাপথের নানা স্থানে দলে যোগ দেবেন বলে উল্লেখ আছে। আমাদের গোটা দলটার নেতৃত্বে চিফ অফ ইউনিট হিসাবে থাকবেন ‘জুয়োলজিক্যাল সার্ভে অফ ব্রাসিউ’ এর যুগ্ম অধিকর্তা ‘ফাবিও রিফিনহো’ সাহেব। লালমোহন বাবু বললেন- ‘ও তপেশ ভায়া, এ যে নাম মুখস্ত করতেই একমাস লেগে যাবে’।

ফেলুদা ঘাম ঝরিয়ে তোয়ালে গলায় জড়িয়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন- ‘ভালই তো, আপনার পরবর্তী রহস্য রোমাঞ্চ সিরিজের জন্য নাম এই বই থেকেই পেয়ে যাবেন, ‘পৈশাচিক পিরানহা’ নামটা আপনার মেচেদার ওই নিউমারোলজিষ্টের কাছে পাঠিয়ে দেখবেন’। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন- ‘ক্যাসে সাহেব শুধু একজন ভুগোলবিদ বা সোশ্যাল এক্টিভিষ্টই নয়, উনি একজন দক্ষ বায়োডার্ভাসিটি এক্সপার্টও বটে। ওনার বই ‘বিয়োজেভেসেদাইজে 360 ডিগ্রি’ ওয়ার্ল্ডে এখন বেষ্ট সেলার’। এরপর ডিনারে গিয়ে লালমোহন বাবু শিখলেন পর্তুগীজ ভাষাতে ডিনারকে ‘জান্তা’ বলে।

(৪)

সকালে উঠে দেখি আমাদের ঘরে সরাসরি সূর্যের রোদ্র প্রবেশ করেছে, বাইরের টেরেসে লালমোহন বাবু গুনগুন করে বেসুরো গলায় একটা গান গাইতে গাইতে সামনের নীল সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ করছেন। অনতি দূরেই বিস্তীর্ন সমুদ্র সৈকতেই বালুকাবেলায় কেউ ম্রর্নিং ওয়াক করছেন আবার অনেকে ঐ সকালেই অনেকে সমুদ্রে জলক্রীড়াতে মত্ত, অনেকেই ফুটবল খেলছে। ফেলুদা স্নান সেরে বেড়িয়ে এসে বলল- ‘আমি আজ দলের সাথে ইউনেস্কোর স্থানীয় অফিসে যাব, সেখানেই সারা দিন ও আগামীকালটা কেটে যাবে অনেকগুলো সেমিনারে। তোরা রিওটা ঘুরে দেখে নে এই দুদিনে, এমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের শহর খুব বেশি দেখবিনা বিশ্বে। সন্ধ্যায় মিট করব হোটেলেই। লালমোহন বাবু বললেন- ‘ও মোহাই, একে তো ভাষা বুঝিনা, তার উপরে তেমন কোনো স্থানই যে চিনিনা; কীভাবে ঘুরবো’? ফেলুদা আশ্বস্ত করে বললেন- ‘দোভাষী চলে আসবে, আমার দরকার নেই, আপনাদের সাথেই ওকে রাখেন’।

পোশাক পরে বেড়িয়ে যেতে যেতে এক্কেবারে দরজার সামনে গিয়ে ফিরে এসে বললেন- ‘আর হ্যাঁ, রিও মানেই গ্রানাইট পাথরে তৈরি করকাভো পাহাড়ের উপরে ক্রাইস্ট দ্যা রিডিমার নামের বিশাল যীশু মুর্তি, অপূর্ব সব বীচের প্যানোরামিক ভিউ, যার মধ্যে কোপাকাবানা-ইপানেমা- আর তিজুকা বীচ অবশ্যই যাবেন। এছাড়া পেলের দেশে এসে মারাকানা দর্শন না করলে ব্রাজিলে আসার কোনো অর্থ হয়না, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক দর্শকাসনের স্টেডিয়াম ওইটিই। সুগারলোফ মাউন্টেনের সাথে সাথে  একবার সাম্বাড্রোমটাও ঘুরে আসবেন এই দুদিনে। যাতায়াতের পথে রাস্তার দুধারের দেওয়াল বা রাস্তাটাকেউ খেয়াল করতে ভুল্বেননা, প্রচুর রঙিন স্ট্রিট বা ওয়াল আর্ট দেখতে পাবি, যাকে গ্রাফিত্তি বলে’। সবটা না বুঝলেও আমরা দুজনে এটুকু বুঝলাম যে এখানে ঘোরার জাইগার অভাব নেই, আমাদের অজানার অন্ধকার সরে গেলেই আমরাও রিও’র রং রূপ বর্ণ গন্ধ অনুভব করতে পারব।

আমাদের রেডি হওয়ার আর কিছুক্ষণ বাকি, ঘরের ইন্টারকম ফোনটা বেজে উঠতেই লালমোহন বাবু রিসিভ করে- ‘থ্যাঙ্কু, ইয়েশ, ইয়ে, মানে, ওয়েট…’ এই শব্দ কটা বলে আমার হাতে ধরিয়ে দিল রিসিভারটা। রিসেপসন থেকে ফোন, -মিস্তার গ্যাউলি, ওয়েলকাম তু হিও, সামওয়াম ওয়ান্ত তু মিত ইউ, মিস আলভারেজ’। উইল আই সেন্দ হার তু ইয়োর সুইত!’ আমি ককী বলব ঠিক বুঝতে না পেরে ‘ইয়েস’ বলতেই ‘ওব্রিগাদো’ বলে ফোনটা রেখে দিল ওপ্রান্তের মহিলা। আজ লালমোহন বাবু আর মোটেই স্যুট ট্রাউজার পরতে চাইলেননা, নিপাট বাঙালির ধুতি-পাঞ্জাবী সাথে চামড়ার পাম্পসু পরে রেডি। আমি স্বাভাবিক ট্রাউজার আর একটা ফ্লোরাল প্রিন্টেড লিলেন শার্ট পড়ে নিলাম।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ডোরবেল বাজতে লালমোহন বাবু দরজা খুললেন, বছর কুড়ির এক সুবেশা তরুনী ঘরে ঢুকে টানাটানা বাংলায় নিজের পরিচয় দিয়ে বলল- ‘নমস্কার মহোদয়, আমি কাতিয়ানা আলভারেজ। রিও ফেডারাল ইউনিভার্সিটিতে ওয়ার্ল্ড লিটারেচর বিভাগে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করছি’। লালমোহন বাবু বা আমি কেউই এমন সোনালী চুলের নীল চোখের ব্রাজিলিয়ান কন্যার মুখ থেকে এমন বাংলা আশা করিনি। মেয়েটি বলল- ‘আঙ্কল, আপনিও উপন্যাসিক আছেন, জেনে করে আমি খুব আনন্দ হয়েছি’। লালমোহন বাবু হললেন- ‘হয়েছি নয় পেয়েছি হবে। আর আমরাও ভীষণ আনন্দিত হয়েছি মা, এই বিদেশ বিভূঁইতে কে কী বলছে কিছুই যে বুঝিতে পারছিনা। খানিক আগেই টেলিফোনের মহিলা কন্ঠটি হিও হিও করছিল, বড় বিড়ম্বনাতে পড়েছি’। মেয়েটি হেসে বলল- ‘ব্রাজিলে অনেক বর্ণের উচ্চারণ করা হয়না। যেমন ব্রাজিলকে এরা বলে ব্রাজিউ, অধিকাংশ ক্ষেত্রে র এর উচ্ছারন হ করে, তাই রিও কে হিও বলে, রোন্দানিয়াকে হোন্দানিয়া’। লালমোহন বাবু বল্লেন- এরা কী সব তোতলা নাকি মামনি, কেমন যেন আধো আধো ভাবে কথা বলে’! মেয়েটি বলল- ‘আমাদের ভাষাতে ট কে ত উচ্চারণ করে, তাই এমন আধো আধো শোনায়’।

মেয়েটি এবার আমার দিকে তাকাতে আমি আমার পরিচিয় দিতে, আমার সাথে একটি করমর্দন করে বলল, ‘আমি রবীন্দ্রনাথ ঠাগুর পড়েছি, নাজরুল ইসলাম, সুমুকা রয়…’, লালমোহন বাবু শুধরে দিয়ে বললেন- ‘মা, ওটা সুকুমার হবে, বাংলাতে বললে যে র বাদ দেওয়া যাবেনা’। কাতিয়ানা বলল- ‘আমি কী আপনাদের পোষাকের বিষয়ে কিছু পরামর্শ দিতে পারি’? আমরা অসম্মতি না করাতে সে ওয়েটারকে ডেকে হোটেলের ওয়্যারড্রোব থেকে একটা ঘিয়ে রঙের উপরে পলকা ডটের ওয়েষ্ট কোট ও গলায় একটা বাটারফ্লাই বো-টাই বেঁধে দিল লালমোহন বাবুর, আর আমার গলায় মিলিটারিদের মতো একটুকরো হলুদ সিল্কের কাপড়ের ক্যাভেট টাই পড়িয়ে দিল।

শুরুতে আমরা এয়ারপোর্টের দিকেই যাত্রা করলাম হোটেলের ট্রেভেল ডেস্ক থেকে একটা ক্যাব নিয়ে। কাতিয়ানা বলল- এটা এভেনিদো আতালান্তিকা, মানে ইংরেজিতে এ্যাটলান্টিক এভেনিউ; আমাদের হোটেলটা একেবারেই সৈকত লাগোয়া। রাস্তার দুপাশে অদ্ভুত জিনিস লক্ষ্য করলাম, পথে চলতে চলতে অনেকে বাচ্চা যুবকের দল দেখি ফুটবল নিয়ে খেলতে খেলতেই যাচ্ছে। গাড়ি রাস্তার পাশ দিয়েই সমান্তরালভাবে সাইকেল লেন চলে গেছে। গোটা যাত্রাপথে ভীষন মিশুকে কাতিয়ানাই আমাদের গাইড-কাম-ইন্টারপিটার্স, সে ই জানালো- আলিঙ্গনের জন্য প্রসারিত বাহু এই যীশুকে স্থানীয়েরা বলে ত্রানকর্তা- ক্রাইস্ট দ্যা রিডিমার। ব্রাজিলের স্বাধীনতার শতবর্ষ পূর্তি উদযাপন উপলক্ষ্যে এই মুর্তি স্থাপনা করা হয়েছিল ১৯৩১ সালের ১১ই অক্টোবর। বিখ্যাত ফরাসি ভাস্কর পল ল্যান্ডেকি এই মুর্তির ভাবনাটা আনেন, যেটা বাস্তবে রূপদান করেছিলেন ব্রাজিলিয়ান প্রকৌশলী ‘হেইটর দ্যা সিলভা কস্তা’। মুখের যে অবয়ব সেটা তৈরি করেন রোমানিয়ান ভাস্কর ‘হোর্হে লিওনাইদা’। সাজিমাটি তথা সোপস্টোন দিয়ে তৈরি এই মুর্তিটি ২৩৪০ ফুট উঁচু পাহাড় চূড়ায় ৯৮ফুট, এর ওজন ৪৩৫ মেট্রিক টন। মুর্তির ছড়িয়ে থাকা দুটি হাতের প্রান্তদ্বয়ের দুরত্ব ৯২ ফুট।

পর্বতচূড়া থেকে রিও শহরের মনমুগ্ধকর দৃশ্য তাক লাগিয়ে দিচ্ছিল, লালমোহন বাবু গেয়ে উঠলেন- ‘চিত্ত যেতে ভয়শূন্য , উচ্চ সেথা শির’ – আমাদের আরো একবার ভয়ানক অবাক করে দিয়ে কাতিয়ানা তাল ধরল- ‘জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর। নৈবদ্য, রবী টাগুরের, ফার্ষ্ট সেমিস্টারে পড়েছি’। উল্লসিত লালমোহন বাবুর তাল কাটল– যখন তিনি শুনলেন যে কাতিয়ানা সাহারায় শিহরন বা দুর্ধর্ষ দুশমন কোনোটাই পড়েনি, ইনফ্যাক্ট ওনার কোনো বইই তার পড়া হয়ে উঠেনি। এ পর্যন্তও ঠিক ছিল, কিন্তু বটতলার ঐ পঞ্চুলালের লেখা ‘পাপিষ্ঠ পাইথন’ বইটা এ মেয়ে পরেছে শুনে ওনার মেজাজটা তিরিক্ষি হয়ে উঠল। তিনি বললেন-  ‘সে তো অক্রুর নন্দীও আমাজনের মানুষখেকো বুনোদের সাথে ওর হিরো ক্যাপ্টেন স্পার্কের গাজাখুরি লড়াই এর গল্প লিখেছিল। এবারে আমিও লিখব- আমাজনের আতঙ্ক, নিজস্ব অভিজ্ঞতার গল্প’।  

এখান থেকে সোজা ব্রাজিলিও শিল্প সংস্কৃতি প্রদর্শনীর আঁতুড়ঘর সাম্বাড্রোমে এসে পৌছালাম, এটা আসলে একটা ওপেন স্টেডিয়াম। মাঝ বরাবর খোলা রাস্তা ময়দানের রেড রোডের মত। এই সাম্বা ড্যান্স ব্রাজিলের ভ্রমণকারীদের কাছে অন্যতম বড় আকর্ষণ। রিও আর বাহাই প্রদেশে এই নাচের প্রচলন, আঠারশো দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে ‘কার্নিভ্যাল’ উৎসবের আয়োজন করে আসছে এই শহর, যেখানে মূল অনুষ্ঠান হচ্ছে সাম্বা ড্যান্স। বিশাল রঙবেরঙের ড্রাগন, পশুপাখির মুর্তি তৈরি করে স্বল্পবসনা ব্রাজিলীয় নারীরা তাঁদের শিল্পকলা তুলে ধরেন বিশ্বের দরবারে। ইস্টার উৎসবের ৫১ দিন আগে এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়, চলে ৭ দিন যাবত। যেটার আয়োজন করে মূলত সাম্বা ড্যান্স স্কুলগুলোর সমন্বয় মঞ্চ, অন্তত ৩ হাজার নর্তক-নতর্কীরা এই প্রদর্শনী করেন সংক্ষিপ্ত বাহারি চিকচিক করা জরির পোষাকে, যেটা দেখতে লক্ষ লক্ষ দেশী বিদেশি মানুষের ভিড় হয়। ওখানেই একটা মিউজিয়ামে  গিয়ে বিখ্যাত নর্তকী সাব্রিনা মিয়ার লাইভ পার্ফর্মেন্স দেখে লালমোহন বাবুর আরষ্টতা কিছুটা হলেও কাটল। উৎসবের মরশুমে গোটা রিও জুড়েই এই সাম্বা প্রদর্শনী চলে, কিন্তু ‘বান্দে দ্য ইপানেমা’ ও কোপাকাবানা বিচ রোড মানে আমাদের হটেলের সামনের রাস্তাতে উৎসবের মরশুমে আলাদা আলাদা করে প্রদর্শনী চলতেই থাকে।

এরপর আমরা গেলাম কোপাকাবানা বিচে। সারা বছরই টুরিষ্টে পরিপূর্ণ থাকে এই বীচ, রঙিন ছাতার নিচে স্বল্পবসনা সুন্দরী, আর সর্বত্র ছেলে বুড়োর দলেদের ফুটবলের স্কিলের প্রদর্শন। ইতস্তত ভাবে কিছু পুরুষ ড্রাম বাজাচ্ছে আর সেই তালে ছন্দে সুন্দরীরা সাম্বা ডান্স করছে। বলিভিয়ার এক লোকদেবী কোপাকাবানার মুর্তি ও গির্জা আছে এই বীচের প্রান্তের একটি দূর্গে, সেই অনুসারে স্থানটির নাম কোপাকাবানা। স্থানীয়দের ভাষায় এই ‘কারিওকাস’ বীচের অন্যতম আকর্ষন হচ্ছে ইংরেজি নববর্ষ পালনের মুহুর্তটা। এখান থেকে সাইকেল ভাড়ায় পাওয়া যায়।

লালমোহন বাবু ড্রাইভার ছোরাটিকে শুধালো- ‘কাওয়েল ই ও সিউ- ইরমাও’, ছেলেটি জবাব দিল- ‘নাপো’। আমি জিজ্ঞাসু চোখে লালমোহন বাবুর দিকে তাকাতে তিনি মিটিমিটি হাসতে লাগলেন, কাতিয়ানা জবাব দিলো- ‘আঙ্কেল আমাদের ড্রাইভারের নাম জানতে চাওয়াতে সে বলল ওর নাম নাপো। আমাদের দেশে সাধারণত নাম জিজ্ঞাসা করলে তার ডাকনামটাই বলা হয়ে থাকে’। এবারে সময় এক্কেবারে বিকালের লগ্নে, লাঞ্চের জন্য আমাদেরকে কাতিয়ানা নিয়ে এলো একটা রেস্তোরাঁতে। ‘এখানে আমাদের ভাষায় আলমোকো বা লাঞ্চ করা হবে’- সে বললো। কিছুক্ষনের মধ্যে পাতে এলো কোরাসাও দি গালিনহা, আর হালকা এলকোহলিক পানীয় কাইপিরিনহা, যা আখের রস থেকে তৈরি। এর সাথে কারুরু নামের একটা পদ এলো, যেটা চিংড়িমাছ ও পেঁয়াজ, সব্জি দিয়ে তৈরি, নারকেলের দুধ- বাদাম ইত্যাদির উপরে কুচো চিংড়ি সহ এক ধরনের রুটি।

খাবার খেয়ে লালমোহন বাবু চোখ পাকিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে দূরে ইশারা করে একজনকে দেখালো—সেই কোলকাতা বিমানবন্দরের লালচুলো ভদ্রলোক, আরো জনা দুই এদেশীয় মানুষের সাথে লাঞ্চ খাচ্ছে। আমাদের দেখে ভদ্রলোক নিজে থেকে সহাস্যে এগিয়ে এসে ইংরাজিতে শুধালেন- ‘আপনাদের দাদা কই? সাথের ইনি কি আপনার বান্ধবী’? আমি ওনাকে জবাব দিলাম। লালমোহন বাবু শুধালেন- ‘আপনিও কী বেড়াতে এসেছেন’? জবাবে ভদ্রলোক বললেন- ‘উনি একজন গ্লোবট্রটার, বর্তমানে উনি দু’বছরের জন্য লাতিন মহাদেশ ভ্রমণ করবেন’। লালমোহন বাবুর মুখ থেকে- ‘… আবার মন্দার বোস’! কথাটা অস্ফুটে বেরোতে ভদ্রলোক শুধালেন- ‘সরি, এনিথিং রং’! আমি বললাম– না না ও কিছু নয়, আঙ্কেলর তো ড্রিংক্স করার অভ্যাস নেই, তাই কাইপিরনহা খেয়ে একটু অসংলগ্ন হয়ে গেছেন আরকি। ট্যাক্সিতে উঠে লালমোহন বাবুকে বললাম, আমি প্লেনের ম্যাগানিজে এনার ছবি দেখেছিলাম, ফেলুদাকে সাথে সাথে দেখাতে তিনি বলেছিলেন- ‘পরে বলব’। লালমোহন বাবু আবার বললেন- ‘হাইলি সাসপিসাস’।

আমরা সরাসরি হটেলে ফিরে আসতে আমাদেরকে তার ফোন নাম্বার দিয়ে কাতিয়ানা বিদায় নিল সেদিনের জন্য। টেরেসে বসে গোটা বৈকাল ও সন্ধ্যা কোপাকাবানা বীচ ও সমুদ্র উপভোগ করতে লাগলাম। সন্ধ্যার সময় রিসেপসন থেকে একটা কল আমাদের রুমে জোড়া হতেই আমি ফোনটা রিসিভ করলাম, ওপ্রান্ত থেকে ফেলুদা বললেন- ‘ রেডি হয়ে থাকবি, ঠিক নটায় গাড়ি পৌঁছে যাবে হোটেলের পোর্টিকোতে। প্রেসিডেন্ট রদ্রোগ আমাদেরর সম্মানে একটা ডিনার পার্টি দিয়েছেন। ওখানেই দেখা হবে, রাখছি। লালমোহন বাবু উত্তেজিত হয়ে বল্লেন- প্রেসিডেন্টের সাথে পার্টি, এ তো বিদিকিচ্ছির ধরনের ব্যাপার ভায়া’।

…ক্রমশ

~প্রেমানন্দ

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *