বারোয়ারী স্বাধীনতা

স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে, আমাদের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলী জ্ঞাপন করে ও মহান স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্মরণ করে, আমাদের প্রতিজন সদস্যকে জানাই গ্রুপের পরিচালকমণ্ডলীদের তরফ হতে উষ্ণ শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

স্বাধিনতা শব্দের ব্যাপ্তি লক্ষ লক্ষ শব্দে কত শত লেখক ততোধিক লেখনি দিয়েও সম্পৃক্ত করতে পারেননি, আগামীতেও তা সম্ভব হবেনা। আমাদের অকপট, মূলত সাহিত্যধর্মী ফেসবুকীয় গ্রুপ, তাই এই ৭৩তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের সুখে, লেখনিতেও থাক স্বাধীনতার সুখ।

বারোয়ারী দূর্গাপুজোর নাম আমরা সকলেই জানি, কিন্তু বারোয়ারী লেখা তেমন ভাবে দেখেছেন কী? রিলে অনশন, বা রিলে রেসের ক্ষেত্রে যেমনটি হয় আমাদের এই বারোয়ারী লেখাও ওই একজনের ছেড়ে যাওয়া অংশ থেকে অন্যজন শুরু করবেন। তিনি একটি পর্ব লিখে আবার পরবর্তী জনের জন্য ছেড়ে দেবেন। এভাবেই সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ১২জন অকপটু একটা গল্পকেই ১২ভাবে শেষ করবেন নিজস্ব ভাবনার স্বাধীনতাতে। প্রতি ঘন্টায় নিজস্ব ছন্দে একজন করে লেখক আগের গল্পের সাথে তাল রেখে, তার লেখাটা কমেন্টে জুড়ে দেবেন। আমরা প্রথম লেখাটার সাথে সেটা জুড়ে দেব, গল্প নাম্বার, লেখকের নাম, ও সময় সহ।

পাঠকেরা শুধুই পড়ে মজা নেবেন, বা প্রতিজন লেখকদের আলাদা আলাদা আঙ্গিকের লেখনীর তুল্যমূল্য বিচার করে উৎসাহিত বা সমালোচনা করবেন।

আমাদের এডমিনদের মধ্যে থেকে, আমি, সুব্রত মণ্ডল, জয় ব্যানার্জী, শেহনাজ আলম, নয়ন রঞ্জন দাস এই পাঁচজন লিখব এটা চূড়ান্ত। বাকি কোন কোন অকপটু এই ‘বারোয়ারী’ লেখাতে নাম লেখাতে আগ্রহী, তারা নিজেদের মত ব্যাক্ত করুন কমেন্টে। ১২ জনের দল ঠিক হয়ে গেলে, নিজেদের মধ্যে সময়ের এডজাষ্টমেন্ট করে নিয়ে আগামীকালের জন্য প্রস্তুতি শুরু করে দেব।  

উদাহরন স্বরূপ এই গল্পটা দিলাম, এটা আমি লিখেছি। অন্য তিনটে পর্বের একটি জয়দা, পরের দুটির একটি নয়নদা ও অন্যটি শেহনাজ লিখেছে-

নিরাপদ রসনাভ্রমণ

(১)

প্রথম পর্ব

লেখকঃ তন্ময় হক

নিরাপদ বাবু খুবই শান্তশিষ্ট গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ, দীর্ঘ কর্মজীবনে গ্রামেরই ইস্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন। নিজস্ব বিষয় ছিল ভূগোল। দাপটের সাথে কত গাধাকে যে ঘোড়া করেছেন তার লেখাজোখা নেই, আবার যারা ঘোড়া ছিল, তাদের পক্ষীরাজ বানিয়ে দিয়েছেন। ঋজু শালগাছের মত চেহারাতে বারো-হেতে ধুতিও হাঁটু ছুঁয়েই শেষ হয়ে যায়, সারাজীবনে কাকডিম রঙের ফতুয়া পরেই কাটিয়ে দিয়েছেন, খোঁচা খোঁচা গোঁফের উপর কখনই তেমন যত্ন নেননি সাজ পোশাকের মতই। প্রশস্ত কপালের উপরে ঠিক কোথা থেকে টাক’টা শুরু হয়েছে, ইঞ্চি মেপে বলা ভীষণ কঠিন। চরিত্র গঠনই মানুষের একমাত্র কর্ম, এটাই ছিল ওনার বীজমন্ত্র। বৃদ্ধ বয়সে পৌঁছে  চুলের রঙে আর কোথাও কৃষ্ণ বর্ণের রেখা অবশিষ্ট নেই, হঠাতই নিয়মভঙ্গের বড় শখ জন্মেছে আজকাল; সেই নিয়ম, যে কঠিন বলয়টা উনি নিজেই নিজের চারিদিকে বানিয়েছিলেন দীর্ঘকাল ধরে। একটা সময় তিনি বিশুদ্ধ নিরামিষাশী থাকলেও আজকাল টুকটাক মাছ ডিম খেতে শিখছেন, যদিও মাংসে এখনও পৌঁছাতে পারেননি। জীবনের তেষট্টিটা বসন্ত পাড় করে ওনার বোধদয় হয়েছে- আরেকটা যদি জন্ম না পায়, তাহলে এই আমিষের স্বাদটা চির জীবনের মত অধরা রয়ে যাবে। তবে হ্যাঁ, তাই বলে অখাদ্য-কুখাদ্য তিনি এর পরেও ছোঁবেননা, শুধুই সুখাদ্য এটা প্রতিজ্ঞা করেছেন।

নিরাপদ সামন্ত তেমন বনেদী বাড়ির ছেলে না হলেও গেরেস্তবাড়ির সন্তান বটে, বেশ কয়েক বিঘা মাঠাল ধেনো জমির সাথে, বাগান, পুকুর, সব্জি ক্ষেত ও বিলের পাশে দখলি জমি নিয়ে একর বিশেক হবে, একমাত্র সন্তান হাবুলকে বেশ গুছিয়েই দিয়েছেন। মাতৃহীনা হাবুল ইংরেজি শেখা আধুনিক মানুষ, জেলা সদরে একটা উকিলের দপ্তরে আর্দালির কাজ করে বেশ দু-পয়সা রোজগার করে। এক সহৃদয় মক্কেলের দাক্ষিণ্যে একটা সেকেলে মোটরগাড়িও জুটিয়ে গাঁয়ে হাজির করেছে কিছুদিন হল। চড়া হোক বা না হোক, বাড়িতে একটা মোটরগাড়ি রয়েছে, এটা কী কম অভিজাত্যের কথা! এই মোটরগাড়ি দেখা ইস্তক নিরাপদ বাবুর মাথার ভেতরটা কিলবিলিয়ে উঠল, খুঁটে বাঁধা গেঁয়ো জীব হয়েই তিনি রয়ে গেছেন এতকাল। অথচ ম্যাপবই জুড়ে ছিল তার অবাধ যাতায়াত, কখনও তিনি গোবি মরুভূমিতে মরুদ্যান খুঁজছেন তো পরক্ষণেই পেরুর মাচুপিচুর পাহাড়ে ট্রেকিং করছেন, এই তিনি অষ্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডে বিচে পায়চারী করছেন তো পরক্ষণেই খাইবারের গিরিখাতে পথ ভুলে একসা কান্ড। সারাজীবনে স্কুল আর সাংসারিক দায়িত্বকে অগ্রাহ্য করে কোলকাতা শহরেই মাত্র দু’বারের বেশি যাওয়া হয়ে ওঠেনি।

সারাজীবন যে কৃচ্ছসাধন করে এসেছেন, এবারে তার পুরস্কার পাবার বেলা। নিজেই নিজেকে পুরষ্কিত করবেন বলে ঠিক করলেন নিরাপদবাবু। অবশিষ্ট জীবনটা তিনি দেশে দেশে ঘুরে ঘুরে বেড়াবেন, পেনশনের টাকায়। ওনার বাবা স্বর্গীয় তারাপদ বাবু ৮১ বছরের পরমায়ু লাভ করেছিলেন, ঈশ্বর হরিপদ সামন্ত মানে নিরাপদ বাবুর ঠাকুরদা ৭৫ বছর বয়সে গত হন, তেনার পিতা শ্যামাপদ… না থাক, লিষ্টি যথেষ্ট লম্বা হয়ে যাচ্ছে ভেবে নিরাপদ বাবু থেমে গেলেন। তবে এটুকু বুঝলেন, যে ওনাদের বংশের গড় আয়ু ওই ৭২ বছরের মত, সেই হিসাবে উনি আরো ৯ বছর বাঁচবেন। সুতরাং, জীবনকে তিনি আর বছরে বা মাসে নয়, এক্কেবারে দিনের হিসাবে ভাগ করে নিলেন। সাকুল্যে ৩০০০ দিনের কিছু কমবেশি দিন তার পরমায়ু অবশিষ্ট, যদিনা এর মাঝে অপঘাতে মৃত্যু হয়।

অতএব, প্রতি দশদিনে নতুন একটা স্থানে পৌঁছাতে পারলে অন্তত ৩০০টি স্থান তিনি দর্শন করতে পারবেন, ২০০ হলেই বা ক্ষতি কি! নিতান্ত ১০০ হলেও তিনি যারপরনাই খুশি। সেখানে গিয়ে প্রাণভরে তিনি খাবেন স্থানীয় সব সুস্বাদু খাবার, ঐতিহাসিক স্থানে ভ্রমণ করবেন; কারন এ জীবন আর ফিরে পাবে কিনা কেউ জানেনা। তাই যে কটা দিন বাঁচবেন – বাঁচার মতই বাঁচবেন বলে পণ করলেন। বিলের ধারের জলাজমিগুলোকে হাতফিরৎ করে বেশ কিছু নগদা আমদানি করে নিলেন, হাবুল ও বৌমা দুজনের জোড়া আপত্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সামনের বুধবারই যাত্রা শুরু করবেন বসে স্থির করলেন। চতুর্দিকের যেকোনো দিকেই তিনি যেতে পারতেন, কারন নির্দিষ্ট কোনো স্থানে যেতেই হবে এমন কোনো বতিক তার নেই, তবুও নাতি বিল্টুর সাথে ছোটবেলার সেই –‘ইশ বিষ ধানের শিষ’ ছড়া কেটে, পশ্চিম দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।

(২)

দ্বিতীয় পর্বঃ

লেখকঃ জয় ব্যানার্জী

নিরাপদ বাবুর গাড়ির লাভ ইউ জিন্দেগীর হর্নের টোনে তখন গ্রামবাসী বুভুক্ষু বাঁশবাগানের কাজলা দিদি থেকে শুরু করে পুত্রবধূর ধুপকাঠির ধোঁয়াতে প্রায় অন্ধ। পরিস্থিতিকে স্লাইডিং মোডে ডজ দিয়ে ,ড্রাইভারের সিটে বসে এফ এমে ‘হরেন পক পক’ শুনতে শুনতে , গলিখুঁজির জিপিএস অন করে যেই নদীর পাড়ের প্রথম মোড় ঘুরেছেন, ধপাস শব্দে গাড়ির চাকা গর্তে পড়ে দুরদর্শনের প্রথম আগমনের রিলিং মোডে ঘুরতে শুরু করে। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসাবে বাজতে থাকে ‘হরেন পক পক ‘ আর পিছনে কাজলা দিদির খিক খিক হাসি !

দিলওয়ালে দুলহানির কাজল হয়ে একবার ‘পলট’ মেরেই গিয়ারকে চতুর্থ শ্রেণীতে আনতেই, গাড়ির হর্ন বেজে ওঠে। ‘লাভ ইউ জিন্দেগী’ ! গ্রামের আম, জামরুল বাগান ডজ দিতে গিয়ে কতই না স্মৃতি ইতিহাসের পাতা থেকে নিরাপদ বাবুকে ইশারায় থামতে বলে। সেন্টিমেন্টের বুকে তেজ পাতা দিয়ে চচ্চড়ি বানিয়ে, তিনটি গ্রাম আর চারটে মফঃস্বল পেরিয়ে যখন উনি হাওড়া ব্রিজের ধারে পৌঁছলেন, গাড়িটির সাথে লঞ্চে করে গঙ্গা পার হলেন। দুর্গা, দুর্গা বলে।

অহংকারী মানুষ। ব্রিজের উপর দিয়ে ওনার গাড়ি গেলে, হাওড়া ব্রিজ ভাঙতেই পারে।

(৩)

তৃতীয় পর্ব- ক

লেখকঃ নয়ন রঞ্জন দাস

আনন্দের আতিশয্যে নিরাপদ বাবুর মন কেমন যেন বাঁধনছাড়া হয়ে পড়েছিল। ভূগোলের শিক্ষক হয়েও উনি বিজ্ঞানের টাইম মেশিনে চড়ে বেশ কয়েক দশক এগিয়ে ভবিষ্যৎ যাত্রা সেরে মনকে শান্ত করলেন।এরপর ঠিক করলেন নিজ রাজ্যের পশ্চিম দিক থেকেই শুরু করবেন।

তিনি হঠাৎই ইতিহাসের প্রতি একটা টান অনুভব করলেন। তিনি অল্পবিস্তর যেটুকু শুনেছিলেন জঙ্গলঘেরা বাংলার পশিচমাঞ্চল নিয়ে মোগল মারাঠাদের টানাটানির কাহিনী। পরে আলিবর্দি খাঁ মারাঠাদের কাছে পরাজিত হয়ে একটা চুক্তি করেন, সুবর্ণরেখার দক্ষিণ পাড় ওড়িশা এবং উত্তর পাড় বাংলার থাকবে। ছোট নাগপুর মালভুমি থেকে উৎপন্ন সুবর্ণরেখার অববাহিকা অঞ্চল এখন জঙ্গলমহল নামেই পরিচিত। সেখান থেকেই তিনি অশ্বমেধ ঘোড়া হওয়ার বাসনা নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন।

আদপে ছাপোষা মানুষ হলেও অনেক ছাত্রের জীবন বদলে দেওয়া এবং হাবুলকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারার আনন্দে একটু আধটু আত্মসুখে ভোগেন। সেহেন নিরাপদ শালে ভরা জঙ্গল এবং প্রকৃতির অমুল্য সম্পদে ভরপুর জঙ্গলমহলের মানুষদের জীবন যাপন দেখে হতবাক হয়ে গেলেন। নিজেকে কূপমন্ডুক মনে করতে লাগলেন। তিনি ঠিক করলেন চৈতন্যদেব পুরী উদ্দেশ্যে যাত্রা করবার সময় কলাইকুন্ডার কাছে যে গ্রামে রাত্রিযাপন করেছিলেন সেখানেও একবার যাবেন। উনি এখন দাঁতনের সেই বড়ো দিঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে যা সম্রাট শশাঙ্ক সেচের সুবিধার জন্য বানিয়েছিলেন। তিনি ইতিহাসের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়েও চিন্তামগ্ন, জঙ্গলমহলকে আরও দেখবেন না অন্য কোথাও যাবেন। তারপর বনবাংলোর দিকে যেতে যেতে ঠিক করলেন রাতের জঙ্গল উপভোগ করে সকালে ঠিক করবেন কি করা যায়।

তৃতীয় পর্ব- খ

লেখিকাঃ শেহনাজ আলম

শহুরে যানজটে অনভ্যস্ত নিরাপদ বাবু গ্রাম থেকে শহরের কেন্দ্রে আসতেই খানিক ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। সাথে আবার দুটো ঝোলা, ছোট ঝোলাটিতে পুত্রবধূ রাতের খাবার বেঁধে দিয়েছে। ট্রেন সেই রাত ৮:০৫ এ। হাতে এখনও ঘন্টা তিনেক সময়। দেশ ভ্রমণে যখন বেরিয়েছেন তখন কোথায় যাওয়া যায়, কোথায় যাওয়া যায় ভাবতে ভাবতে প্রথমেই ওনার মাথায় আসে, – “আরে ভ্রমণের আরেক নাম হচ্ছে বিহার, অতএব বিহার প্রদেশ দিয়েই শুরু হোক যাত্রা।”

হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে খানিক জিরিয়ে, যাত্রাপথের পরিকল্পনা মনে মনে কষতে কষতেই ষ্টেশনের চায়ের গুমটি থেকে দু কাপ চা আর সাথে টিফিনে থাকা ঘিয়ে ভাজা চিড়ে-বাদাম খেয়ে; প্রাকৃতিক কাজকম্ম সেরে ট্রেনে চড়ার জন্য প্রস্তুত হলেন। ঘড়ি ধরে সঠিক সময়ের ২৫ মিনিট আগেই চড়ে বসলেন গরীব রথে, গন্তব্য পাটনা।

“যাত্রাটা গঙ্গা বরাবরই হোক যতদূর যায়, তারপর না হয় যমুনা পেরিয়ে সিন্ধু ছুঁয়ে দেখবো। তারপর কচ্ছ, বিদর্ভ পেরিয়ে বিন্ধ্য ও মালাবার হয়ে আবার পূর্বে মাদ্রাজ ও নিজামের দেশে। এর ফাঁকে গয়ায় গিয়ে পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে পিন্ডিদানটাও সারা হয়ে যাবে, আবার ঐতিহাসিক নালন্দার শতাব্দীপ্রাচীন স্তুপের থমকে থাকা বাতাসের গন্ধে ইতিহাসকে অনুভব করার সুযোগ কে হাতছাড়া করতে চায়?”– জানালার ধারে বসে আপন মনে আওড়ে যাচ্ছেন নিরাপদ বাবু।

ইতিমধ্যে পুত্রবধূর দেওয়া খান ছয়েক তালের রুটি, আলু ভাজা আর গ্রামের হরিমোহন ময়রার বোঁদের লাড্ডু দিয়ে রাতের আহার সারলেন তিনি। এবার এসব দেশজ খাবার বাদ দিয়ে হরেক হরেক খাবার চাখার সুযোগ হবে, ভরপেট খাওয়াও হবে- এই ভেবেই জানালা থেকে আসা ফুরফুরে হাওয়ার মতোই নিরাপদ বাবুর মেজাজটাও ফুরফুরে হয়ে গেল। পরদিন সকাল ৫:৩০ তে পাটনা।

উত্তেজনাবশত রাত পেরোতে না পেরোতেই ভোর ৪:৩০ থেকেই নিজেকে গুছিয়ে নামার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলেন। জানালা দিয়ে আসা ভোরের স্মিত আলোতে আবারও মনে মনে ম্যাপবই এ ঘুরতে লাগলেন। পাটনা মানেই ষোড়সমহাজন পদের সেই মগধ, যার রাজধানী ছিল পাটুলিপুত্র বা আজকের পাটনা। ময়ূর সাম্রাজ্য, গুপ্ত সাম্রাজ্য, নন্দ বংশ, উফ কী এক গভীর নেশা ধরিয়ে দিচ্ছিল নিরাপদবাবুকে । তার উপরে বিম্বিসার, সম্রাট অশোক, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য, চাণক্য- কী সব ভারি ভারি নাম! ইতিহাসের এই নামগুলো সহকর্মী সাধন বাবুর গলায় পাশাপাশি ক্লাশে কত বছর যে শুনে এসেছেন! এবার সেগুলো ছুঁয়ে দেখার পালা। এসব ভাবনায় বুঁদ হয়ে গেলেন।

ট্রেন পাটনা ঢুকতে ঢুকতে ৬ টার কাঁটা পার করে দিল। ষ্টেশনে নেমেই ভাবনার নেশায় আরও রোমঞ্চিত ও পুলকিত হলেন নিরাপদ বাবু। যদিও আশেপাশে গুটকার ছোপ খানিকক্ষণের মধ্যেই ওনার নেশা মুহূর্তেই কাটিয়ে দিল। এদিকে পেটে ইঁদুর দৌড়ানোও শুরু হয়েছে। ষ্টেশনের চৌহদ্দিতেই দেখলেন দু-তিন জায়গায় কিছু লোকের জটলা, সাথে বেশ লুচি ভাজার মতো গন্ধ ভেসে আসছে। পেটের খিদে আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল। অতি উৎসাহে এক প্লেট ইশারাতে দিতে বললেন। কড়াতে ছাঁকার সময়ে লুচি সদৃশ খাদ্যগুলি দেখে মনে মনে বললেন, “নাহ এতো আমাদের ঘরের সাদা সাদা ফুলকো লুচি নয়! আবার পুর ভরাও আছে। যাইহোক খেয়েই দেখা যাক না”! স্টিলের প্লেটে চার পিস ছাতুর পুরভরা আটার কচুরী, আলুর চচ্চড়ি মতো এক হলদেটে ছোলা ওয়ালা তরকারি আর সাথে গরম গরম জিলিপি, স্থানীয় কথায় ‘পুরী-সব্জি অউর জলেবী’। নতুন খাবারের স্বাদ নিতে চোখ বড় বড় করে গরম গরম পুরী গোগ্রাসে খেতে লাগলেন নিরাপদ বাবু, সাথে জলেবীর মিষ্টতা। এই প্রথম নিজের গ্রামের বাইরে অন্য কোনো জায়গার অন্য প্রকারের খাদ্য উদরস্থ করলেন তিনি। এই খুশিতেই ভ্রমণের শুরুতেই তার প্রাণ নির্মল আনন্দে ভরে গেল।

ষ্টেশনের নিকটবর্তীই এক অনামী হোটেলে দুদিনের জন্য আশ্রয়ের ঠিকানা যোগাড় করলেন।

বুঝলেন তো, গল্প কিভাবে বারোয়ারী ভাবনাতে শরিক হয়েছে!



এই ভাবেই আগামীকাল সুব্রত মণ্ডলের শুরু করা একটি গল্প আমি গ্রুপে পোষ্ট করব ঠিক সকাল আটটাতে,  আমাদের বাকি ১১জন অকপটু সেটাকে নিজশ্ব ‘স্বাধীন’ ছন্দে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। যারা আগামিকালের ইভেন্টে সুযোগ পেলেননা, তাদের মন খারাপের কিছু নেই, ২৪ তারিখ অকপটের জন্মদিন, সেই দিন থেকে পরপর ৩ দিন এই রিলে গল্পের আসর চলবে; তখন প্রাণের আশ মিটিয়ে নেবেন নাহয়।

তাহলে আর কি, কে কে নাম লেখাচ্ছেন!    

…ক্রমশ

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *