স্বাধীনতা

বর্ষা এ বছর সেভাবে আর হলো কোথায়, রাত্রেও ঘুম আসেনা বিদঘুটে গরমে। আমার আবার এসির হাওয়া মোটে সহ্য হয়না, বড্ড অস্বস্তিকর কৃত্রিম লাগে, তাছাড়া অফিসে ওই সারাক্ষনই এসিতে থাকতে থাকতে বিরক্তি এসে গেছে। ঘুম থেকে আজ উঠতে একটু দেরিই হয়েছে, মর্নিং ওয়াকের অভ্যাস নেই, তাই প্রাত্যহিক ক্রিয়াদি সেরে, আজ প্রাতঃরাশ না করেই সকাল বেলা হাঁটতে হাঁটতেই অফিস যাচ্ছি। অফিসটা তেমন দূরে নয়, ফ্ল্যাট থেকে দু’তিন কিলোমিটারের মধ্যেই। সদর বাজার থেকে টেগোর রোড পর্যন্ত আমি নিয়ম করে হেঁটেই যায়, এটা সেই শুরু থেকেই অভ্যাস। দিল্লির যা জ্যাম, তার চেয়ে হাঁটাই উত্তম। দৈনিক সন্ধ্যার সময়, বা শীতের দুপরে রামলীলা ময়দানে একটু জিরিয়ে নিতে নিতে মানুষ দেখতে খারাপ লাগেনা। এক ঘেয়েমির জীবনে এই মাঠের হরেক মেলাখেলা প্রাণে অনেকটা ব্যাথার উপসমের মত কাজ করে। আজকাল দিল্লির যা দুষণ, এমনিতেই পরমায়ু ১০ বছর করে কমে গেছে এখানকার সকলেই, তারপরে বৃদ্ধ বয়সে সেই হাজার রোগভোগের মাঝে স্থবির হয়েই তো বেঁচে থাকা, হাঁটাচলার লোভ মানুষ যে কেন ছেড়ে দিয়েছে সেটা আমার মাথায় ঢোকেনি আজও। আমি, মানে আমার নাম ইন্দ্রনীল চট্টরাজ, বাঁকুড়ার আদ্যোপান্ত বাঙালী; আধুনা দিল্লি নিবাসী, একটা তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মী।

 আগেকার দিনে দাসপ্রথা ছিল, সেটা এখন উঠে গিয়ে তাদের নতুন নাম হয়েছে IT কর্মী। একেক সময় খুব বিরক্ত হলে মনে এসব কথাই ভাবতে লাগি। আমাদের পেশাতে সকাল নেই, সন্ধ্যা নেই, আকাঙ্ক্ষা নেই, আছে কেবল গলায় বকলেস দেওয়া পরিচয়পত্র। আমাদের অফিসের অনেকে একে ব্যাঙ্গ করে ঐ দাস প্রথার বেড়ি বা নাম্বার দেওয়া সারমেয়র বকলেস বলে, সাথে রয়েছে বেতনের ফাঁসজাল, এ কেটে বেরোতে বেরোতে বৃদ্ধ হয়ে যায় সকলেই। দাশ প্রথা যুগেও পেট ভরে খাইয়ে দেওয়া হত, যাতে খাটতে পারে অহর্নিশ যতক্ষণ প্রাণ আছে, প্রাণ গেলে বেতনের লোভে ঠিক আরেকটা দাস এসে উপস্থিত হবে দরজার ওপাড় থেকে। যতবড় পদ তত বড় বাঁশ, বাক্তিগত জীবন বলে আর কিছু অবশিষ্ট থাকেনা আমাদের। তাই আজকাল অফিসে আসাযাওয়ার সময়ে রিকশা না নিয়ে সকাল বিকেল হাঁটার মাঝেই যেন মুক্তি খুঁজতে থাকি।

স্ত্রী পুত্র কোলকাতায়, একাকী জীবনে বড় দম বন্ধ হয়ে আসে মাঝেমাঝে। বয়সটা যত বাড়ছে, একাকিত্ব বা বৌ-ছেলেদের প্রতি টানটা ক্রমশই বেড়ে চলেছে। বয়স সবে ৪১ ছুঁলেও, দাসপ্রথাতে ১৮টা বসন্ত পাড় করে পেশাজীবনও সাবালকত্ব অর্জন করেছে। একই ধরনের চাকুরী করতে করতে কিছুদিন পর থেকেই একঘেয়েমি গ্রাস করে, মনে হয় সবকিছু ছেড়েছুঁড়ে পালাই কোথাও, কিন্তু হতভাগা পেটের দায়ে সেই গোঁজে বাঁধা গরুর মতই একটা নির্দিষ্ট কক্ষে জীবন আবর্তিত হতে থাকে। প্রতিদিন অফিস নামের কারাগারে প্রবেশের আগে একটু আলো বাতাস, আহা লেখাপড়া শিখে যদি ঐ অদূরের ইস্কুল বালকদের মত আজীবন এমনই অনির্দিষ্ট ভাবে খেলাধুলা বা ছোটাছুটি করতে পারতাম তাহলে কি ভালটাই না হত। হঠাৎ পকেটের সেলফোনে ভাইব্রেশন শুরু হল, অফিসের সেক্রেটারির ফোন, উফ… এই ফোনটাই সভ্যতা ধ্বংসের জন্য একটা সময় দায়ী থাকবে। মানুষকে আর মানুষ থাকতে দেয়না এ যন্ত্র, সীমাহীন মিথ্যার সাম্রাজ্যে মানুষের জীবনের স্বাভাবিক নূন্য চাহিদাগুলোকে চুরি করে চলেছে এই ফোন নামের যন্ত্রটা। কে যে প্রথম চাকুরিজীবী হওয়ার পদ্ধতিটা আবিষ্কার করেছিল কে জানে!

উদাস মনে হাঁটতে থাকলে যা হওয়ার সেটাই হল, পাহাড়গঞ্জের শেষ মাথায় পৌঁছে একটা ঠোকা লেগে জুতোর সামনেটা কুমিরের মুখের মত হা হয়ে গেল। অফিস যতই বোরিং হোক, ড্রেস কোড মেন্টেন করে যেতেই হবে, সাহেবী কোম্পানি বলে কথা। অগত্যা কোনো চর্মকার ভাইয়ের সন্ধান করতেই হলো। খানিক এদিক ওদিক সন্ধান করে না পাওয়াতে স্মরণাপন্ন হতে হলো- ‘ভাইসাব, মোচি কাহা মিলেগা?’। পানওয়ালা গুমটির ছোকরাটি বলে দিল, ষ্টেশনের টিকিট কাউন্টারের আশেপাশে গেলে ওনাদের সন্ধান মিলবে। মানুষের এই অসভ্যতামি গুলো দেখলে আজও রাগ হয় বড্ড, সেই মুচি না বললে বুঝবেইনা যে কাকে চাইছি আমি, ছ্যাঃ লজ্জা ধরে গেল সভ্যতাতে।

আকাশটা কালো করে আসতে গুমটটা অনেকটা বেড়ে গেছে, খুব বেশিদূর যেতে হলনা। মালগুদামের পাশটাতে চর্মকার বন্ধুর দেখা মিলল। এ অঞ্চলটা সাধারন যাত্রীদের জন্য নয়, পণ্য পরিবহণের সাথে যুক্ত লোকজনেরাই মূলত এদিকটাতে আসে। দেখলাম চর্মকার ভাইটির কাজকর্ম তেমন কিছু নাই হাতে, খৈনী ডলতে ডলতে খোস মেজাজে টিপিক্যাল ভোজপুরী উচ্চারনে একটা রফির গান ভাঁজছে। কয়েকটা ছাতা পাশে পরে রয়েছে, আসন্ন বর্ষার আগে কেউ নিশ্চই রিফু করতে দিয়ে গেছে। ঢাউস কাপড়ের রঙচটা কালো ছাতার নিচে রাখা ব্যাটারির খোলের উল্টোপিঠে আমি ওনার পাশে বসতেই সে যেন কেমন সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল, বলল- সাব, হিয়া পর! আপকা কাপড়া, কুট-প্যান্ট গন্দা হুইল যিবা, লোগন দিখ রহা হ্যায়। বললাম, যে দেখছে দেখুক, আমার জুতোটা দেখিয়ে হিন্দিতে বললাম- সারিয়ে দেবে গো! একটু তাড়াতাড়ি দাও প্লিজ, অফিস যেতে লেট হয়ে যাচ্ছে। সে হাতে নিয়ে বলল- কিল ঠোক দু ইয়া গম লগাদু! বললাম- গম নিয়েই তো জীবন কেটে যাচ্ছে, তাছাড়া আজকাল রাত্রে রুটিই খায়, পেরেক পুতলে পায়ে ভুকতে পারে, বরং আঠাই লাগিয়ে দাও। মনে মনে ভাবলাম খাঁটি ইতালিয়ান প্রাদা’র প্রোডাক্ট না হলে চাঁদু, আজই তোমায় বিসর্জন দিয়ে নতুন এক জোড়া পায়ে গলাতাম। শুধালাম- তোমার নাম কি হে! সে বলল- হামোর নাম, কিষোনবা, জিলা দ্বারভাঙ্গা। থোরা টেম লাগেগা বাবু। অগত্যা, বসে বসে পর্যবেক্ষন করতে পাগলাম চারিপাশ। আরো বুঝলাম, এদের নাম জেলার সাথেই সম্পূর্ণ হয়।

কতদিন এ রাস্তা দিয়ে গেছি তার ইয়াত্তা নেই, তবুও আজকের মত করে কেন যে এগুলো দেখিনি কে জানে। মূলত ওয়াগনের খালাসিরা এদিকে কাজ করে, সকলেই শ্রমিক শ্রেনীর। তাদেরই জন্য তাদেরই মানের সব দোকান পসার। অদূরেই এক বৃদ্ধ দেহাতী মাথায় সাদা কাপড়ের পাগড়ী, খাটো ধুতি ও ততোধিক খাটো ফতুয়া গায়ে ঠেলার আঁচে লিট্টি সেঁকছে। এখানে প্রায় সকলের গায়েই একটা গামছা সদৃশ্য কাপড় রয়েছে। শুধুই যে বিহারী আছে তা নয়, খেয়াল করলাম জাঠ, উত্তরপ্রদেশী, হরিয়ানভি, রাজস্থানী সকলেই আছে। এটা গরীব শ্রমিক অঞ্চল, উপলব্ধি করলাম এরাই সেই প্রলেতারিয়েৎ যাদের কোনো জাত-বর্ণ-ধর্ম থাকতে নেই। অদূরের ফুটপাতিয়া হোটেলের ছোকরাটি পুরী বানাচ্ছে, ওর পাশের কাউন্টারেই ছাতুর শরবৎ। পানওয়ালা দোকানের বাইরে দিকটাতে চিপসের প্যাকেটের সাথে গুটকা ও কন্ডোমের স্ট্রিপগুলো হাওয়াতে দোল খাচ্ছে মৃদুমৃদু। মালিশওয়ালা দেহাতী ভাষায় নিজের দোকানের বিজ্ঞাপন দিতে দিতে দোকান খুলছে বৌনির আশাতে। নিজেই একটু ব্যায়াম কসরতও করছে, ওটাও সম্ভবত ওনার দোকানেরই বিজ্ঞাপনের অংশ।

কিছু ছেলেপুলে ইতস্তত বিক্ষিত ভাবে খেলা করছে, আমাদের ঘরের ছেলেরা এভাবে আর খেলেইনা। স্কুল টিউশনির ফাঁকে যদি কিছুটা ছুটি মেলে তারা কম্পিউটার মোবাইলের নাগপাশে বন্দি হয়ে যায়। ফিজিক্যাল এক্টিভিটি প্রায় শূন্য। জীবন এখানে এখনও সজীব। কৃষ্ণ মানে আমাদের কিষানবা কোত্থেকে আমার জুতোর রঙের ব্রাউন সুতো এনে মন দিয়ে সুখতলা সেলাইয়ের কাজে ব্যাস্ত। ক্লান্ত ঠেলাওয়ালা ভোররাত থেকে খাটুনির পরিশ্রমে সাময়িক বিশ্রামের জন্য ঠেলাটা ঠিক ড্রেনেটাকে মাঝখানে রেখে দুপাড়ে চাকা সেট করে, ঐ ঠেলার উপরদিকে মাথা করে শুয়ে পরল। অদূরে হনুমান মন্দিরের ধুপের ধোঁয়া আর টুংটাং ঘন্টাধ্বনি পরিবেশটাকে মায়াবী করে তুলেছে। কয়েকটি তামাটে বর্ণের চুলের সদ্য যুবক, ভীষণ রকমের রঙবেরঙের পোষাক পরে মহল্লার গুটি কয়েকটি মেয়েদের আকৃষ্ট করার ব্যার্থ চেষ্টা করছে।

আবার পকেটে ভূমিকম্প, হতচ্ছাড়া সেক্রেটারি মনীষাটা লাগাতার রসভঙ্গ করে চলেছে। অগত্যা সুইচ অফ করে দিলাম মোবাইলটার। একজন মা কী পরম মমত্বে তার কিশোরী কন্যার দুই বিনুনিতে ফিতে বাঁধছিলেন। অদূরে ডাই করা ব্যবহৃত সিঙ্গেল ইউজ জলের বোতল, তার ফাঁকে কয়েকটি কুকুরছানা ট্রেকিং ট্রেকিং খেলছে। দুটো বাচ্চা ছেলে শুধু গেঞ্জি প্যান্ট পরিহিত হয়ে সাইকেলের পুরাতন টায়ারে হাতখানেক লম্বা একটা বাখারি দিয়ে গোল গোল ছুটিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে, দুএকজন পথচলতি মানুষ ও স্কুলের পথে চলা কিছু ছাত্রছাত্রীদের দৃশ্যত বিরক্তিকে উপেক্ষা করেই। আমার বুকের অন্তঃস্থল থেকে একটা গভীর দ্বীর্ঘশ্বাস সবেগে টাই এর উপরে আছড়ে পরল।

পরিবেশটা বড় নেশা ধরিয়ে দিচ্ছিল। আচমকাই ওই ছেলেদুটির একটি হোঁচট খেয়ে ভূপাতিত হতেই টায়ারের চাকাটা ভারসম্যহীন হয়ে গেল। ‘কিষনবা ব্যাগ অউর কোট সামাহলো’ বলেই আরেকটি জুতোও খুলে ওখানেই রেখে হঠাৎ লাফিয়ে উঠে ছেলেটির লাঠিটা কুড়িয়ে নিলাম। টায়ারটা পরবে পরবে ঠিক ওই অবস্থায় লাঠি দিয়ে ওটাকে পাকড়াও করে ফেললাম। চাকা দৌড়াচ্ছে, আমিও দৌড়াচ্ছি, সাথে সাথে ঐ দুটি ছেলে। ল্যাকপ্যাকে  চাকা চালানো সহজ কথা নয়, আমি আগেও চালিয়েছি তালডাংড়ার মোরাম বিছানো পথে। কতবার যে হাতের পায়ের চামড়া ওই মোরামের পাথরেই ছড়ে রয়ে গেছে তার ইয়াত্তা নেই, যথেষ্ট সাবধানে পাথর দেখে চালাতে হয়,  সামান্য ভারসাম্যহীনতা মানেই পতন নিশ্চিত।

সামনে একটা বড় নোংরার স্তুপ, একটু ডান দিক দিয়ে ঘুরে ওগুলো কাতিয়ে নিলাম। ওগুলো কাটাবার পর পরল কয়েকটি বাচ্চা মেয়ে, স্কুলে যাচ্ছে। ওরা এমন ভাবে হাটছে যে ডানেও যাওয়া যাবে না, বামে গেলেও বিপদ। মাঝখানে সামান্য জায়গা, আমার চিন্তা জুড়ে শুধুই ঐ চাকাকে গতিশীল রাখা ভারসাম্য না খুইয়ে, কিছুতেই চাকার উপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারানো চলবেনা। মেয়ে দুটোর মাঝখান বরাবর চাকাটা চালনা করে দিলাম, আমার দৌড় কিছুটা থামিয়ে এক্কেবারে বাচ্চাগুলোর সামনে এসে পরতেই কয়েকজন মা নিজ নিজ বাচ্চাদের কোলে তুলে নিলেন ভয়ে। পাশে কে দেখছে, কিভাবে দেখছে, কতটা দেখছে এসব তখন ভাবার অবকাশ নেই। চেনা রাস্তাতে চাকা ঠেঙিয়ে চললাম আমি।

ইতিমধ্যে ভিড়টা সরে গিয়ে আমাকে যাবার রাস্তাটা প্রশস্ত করে দিয়েছে পথচলতি ছাত্রীরা, আবার চাকা নিয়ে সামনে দিকে এগিয়ে যাওয়া। ছোট প্রাইভেট গাড়ি, দোকানপাট, লোকজন সবাইকে ফেলে দিয়ে শৈশবের সেই দৌড়, মেকি লৌকিকতাকেও অনেক পিছনে ফেলে এসেছে ততক্ষণে। সাদা ফুল সার্টে স্ট্রিপড রেড টাই, সদ্য ক্রিজ ভাঙা ডার্ক ব্লু ট্রাউজার, জুতো বিহীন পায়ে সাদা মোজা ততক্ষণে বিশ্রী ময়লা। অনেকেই দেখছে, শুধু আমি ছাড়া; আমার শুধু দৌড় আর দৌড়। কর্পোরেট কর্তা স্যার ‘ইন্দর’ এখন সকল পোষাকি এটিকেট-ম্যানার্স ছুঁড়ে ফেলে রিকশা গুলোকে ডজ করে, মোটর গাড়ি নামের ডিফেন্ডারদের কড়া ট্যাকলকে পাসওভার করে, ডিফেন্স চেরা থ্রু পাশ দিয়ে আমার চাকাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে লাগলাম। চাকা চালাবার সময় কাঠিটা ধরার নির্দিষ্ট নিয়ম আছে, একটু তেরছা করে ধরে নির্দিষ্ট জোরের সাথে বলটা দিতে হয়। মনে পরে গেল ছোট বেলাতেও এমনই দক্ষতার সাথেই টায়ার চালাতাম। সামনে একটা মাঝারি ধরনের খন্দ, আরো খেয়াল করলাম রাস্তা ভর্তি মানুষকে অযাতিত সার্কাস দেখিয়ে চলেছি আমরা; নাহ, আমি একা নই, টায়ারের মালিক ছেলেদুটিও সাথ ছাড়া হয়নি। চাকাটা লাফ দিয়ে গর্তটা পার হয়ে সামন্য টলে গিয়ে মাতালের মত চলতে চলতে আবার সামনের দিকে ছুটতে লাগল, ছেলেদুটি আমার পিছনে পিছনে চলছিল, বুঝলাম এ অঞ্চল ওদের অচেনা। চাকা চলতে লাগল সামনের পানে।

এবারে সামনে বড় রাস্তা, গলি রাস্তা শেষ। অদূরে বেশ কয়েকটা স্পিডব্রেকার, যেন উবু হয়ে শুয়ে আমার চাকাটিকে ভেংচি কাটছে সমবেতভাবে, যেন কাছে গেলেই ঠেলা মেরে ফেলে দেবে। আমিও প্রস্তুত, একটু জোরের সাথে লাঠিটা চালনা করতে পারলেই চাকা লাফিয়ে সামনে চলে যাবে। চাকা বাম্পার লক্ষ্য করে এগাতে লাগল।

স্পিডব্রেকার পাড় হবার জন্য আশেপাশের গাড়ি ও অন্যান্য যানবাহনের অবস্থা বুঝে নিতে হবে নতুবা আমাদের তিনজনেরই আহত হবার চান্স প্রবল। যদিও গাড়ির জ্যাম লাগেনি এখনও, তবুও রাস্তাটা খালিই বলা যায়না। স্পিডব্রেকারটার একদম কাছে, উল্লাসে একটা হেইল তুলে চিৎকার করতে গিয়েই অন্য একটি জলদগম্ভীর আওয়াজ আমাকে দাঁড় করিয়ে দিল অভ্যাসে। ‘রাজ, what the hell you are doing, সারে আম……’!! আমার কোম্পানির এক্সিকিউটিভ ডিরক্টর, সাউথইষ্টার্ন এশিয়া প্যাসিফিক, মিঃ শ্যাননের গলা। শেষ চার বছরের অতি পরিচিৎ আওয়াজ। উনিই আমার চট্টরাজ পদবীকে আরো ছোট করে, শুধু রাজ বলে আমাকে সম্বোধন করেন।

একটা ছোট্ট জানজট তৈরি হয়ে যেতে, মিঃ শ্যানন একপ্রকার আমাকে প্রায় ঠেলা দিয়ে ফুটপাতে এনে দাঁড় করালেন। এতক্ষণে আমি যথেষ্ট ভ্যাবাচেকাটা খেয়ে গেলাম। আজ অপমানিত হওয়াটা বাধ্যতামূলক, সাথে কলিগদের টিপ্পনী ফাউ। লাঠিটা সাথে সাথে ফেলে দিয়ে আকাশ বাতাস আশপাশের লোক দেখতে লাগলাম, এরাই এতক্ষণ আমাকে দেখছিল। চাকাটা এবারে এক্কেবারে প্রথম ডিভাইডারের উপরে টাল খেয়ে পরবে পরবে, ঠিক এই সময় ঐ দুইটির একটি ছেলে ছোঁ মেরে চাকার পতন রোধ করল। আমার তখন স্বজনবিচ্ছেদের বেদনা অবশ করে দিচ্ছে, অতি কষ্টে ইচ্ছেকে দমন করলাম। বাচ্চাদুটো আসার পথ ধরেই ফিরে যেতে উত্যত হলে আমি তাদের থামাতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু তারা আমাকে বিন্দুমাত্র পরোয়া না করে ফিরে ফেল, যেন এতক্ষণ কিছুই হয়নি। টায়ারটা ওদেরই একজনের ঘাড়ে।

মিঃ শ্যননের গাড়িতে করেই মনীষা গিয়ে আমার ব্যাগ, জুতো, স্যুট উদ্ধার করে এনেছে। এর পর আমার কর্মদক্ষতার যাতে হানি না হয় তার জন্য অফিসের খরচাতে একটা ক্যাবের ব্যাবস্থাও হয়েছে।

রাত্রে শুয়ে ভাবছিলাম, মালগুদামের ওই ছেলেদুটি আর্থিক সচ্ছলতা পায়নি, কিন্তু তাদের চাকা চলাবার অধিকার আছে নিজের মত করে। ওদের এটিকেট-ম্যানার্সের তোয়াক্কা নেই, অহেতুক লোকলাজের ভয় নেই, সেক্রেটারি নেই, বস নেই, মোবাইল নেই, কিন্তু গোটা পৃথিবীটা পরে আছে ওদের জন্য। আমার আর্থিক সচ্ছলতা আছে, গাড়ি বাড়ি, স্ত্রী-পুত্র, মান সম্মান সবই আছে, শুধু স্বাধীনতা টুকু নেই।

https://www.facebook.com/groups/jukti.tokko/2932664466959758

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *