অকপট সম্মাননাঃ ২০১৯

মোমিন মণ্ডলের জন্য

বাংলা ভাষাটাকে সেই দেশভাগের সময় একটা সীমানা দিয়ে দ্বিখণ্ডিত করে দিলেও, পত্রমিতালির যুগে তা সামান্যই অবশিষ্ট ছিল নিয়মিত যোগাযোগে তারকাঁটার সীমানা পেরিয়ে। বর্তমানে ফেসবুক বা এই অন্তর্জালীয় মঞ্চ সেই সীমারেখার ব্যবধান ঘুচিয়ে আমাদের অনেক কাছাকাছি এনে দিয়েছে। যারা যারা আমরা এইভাবে কাছাকাছি আসতে সক্ষম হয়েছি, তাদের মাঝে আমাদের প্রভাত বানার্জী বাবু অন্যতম। অকপটে যে কয়েকজন প্রবীন মানুষ নিয়মিতভাবে বাকিদের সঙ্গদান করেন , প্রভাত বাবু তাদের অগ্রগণ্য। নিজের দেশে যথেষ্ট রাজনৈতিক ভাবে সচেতন ব্যাক্তি, ওনার মন্তব্যে থাকে অভিজ্ঞতার ছাপ। অকপটের এই শুভ অবসরে ওনার মত মানুষকে সম্মান জানাতে পেরে আমরা পুলকিত। ওনার সুস্থ দীর্ঘায়ু কামনা করি।

সুদীপ্তবাবুর সাথে আমার ব্যাক্তিগত স্তরে সেভাবে পরিচিতি না থাকলেও, অকপটের পরিচালক দলে থাকার সুবাদে ওনার পোষ্ট ও কমেন্টের ধরন দেখে মানুষটা সম্বন্ধে একটা মোটামুটিভাবে ধারণা করতে পারি। স্পষ্টবাদী অকপটু বলতে ঠিক যেমন বোঝায় ইনি তেমনই। একদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনা করেন, আবার সুষমা স্বরাজের মৃত্যুতেও শোক প্রকাশ করতে দেখেছি, সুস্থ রাজনীতিটা বোঝেন। ভ্রমণের প্রতি একটা তীব্র নেশার সাথে সাথে লেখার একটা ইচ্ছা মনে পোষেন, আর সেটাতে ভর করেই আমাদের মাঝে মাঝেই ভাল কিছু লেখা উপহার দিয়ে থাকেন। সুদীপ্ত বাবুকে জানাই টিম অকপটের তরফ থেকে প্রাণভরা শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

————————————————————————————-

অপু টিকাদারের জন্য

অন্তর্জালীয় ছায়াপথে ফেসবুক যদি ব্রহ্মাণ্ড হয় তাহলে আমাদের অকপট নিশ্চই একটা মধ্যম মানের গ্রহ, যেখানে প্রানের সঞ্চার আছে। মধ্যম মানেরই গ্রহ, এখানে সেই অর্থে সূর্য কেউ নেই। সমাজ নামের ইয়াব্বর সূর্যের কক্ষে নিজস্ব কক্ষে পাক খেয়ে চলেছে আমাদের অকপট, নিয়ম মেনে দিন-রাত, জোয়ার-ভাটা সবই ছুঁয়ে যায় আমাদের অকপটে। পৃথিবীর আকর্ষনে তার চারিপাশে একটিই চাঁদ ঘুরে বেড়াচ্ছে, কিন্তু অকপট গ্রহের চারিপাশে নিজস্ব স্নিগ্ধচ্ছটা দিয়ে যারা স্বমহিমাতে উজ্জ্বল ও অন্যদেরও সেই জ্যোৎস্নার মায়াবী ঘোরে তাক লাগিয়ে দেন, তারা দুজন হলেন শবনম তালুকদার দিদিভাই ও অভিজিৎ মুখার্জী বাবু। অকপট চন্দ্রের শিরোপা পাওয়ার যোগ্যতম দাবীদার।

শবনম তালুকদার, অকপট ছাড়াও এবাংলার ফেসবুকে রাষ্ট্রজোড়া যার পরিচিতি, উনার অনায়াস শব্দের বুননে মন্তব্য করার সাবলীলতার গুণে এই মঞ্চে উনি অনন্যা। রাজনৈতিক প্রজ্ঞা সম্বলিত এমন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারিণী চাইলেই সর্বত্র খুঁজে পাওয়া যায়না, বহুমুখী জ্ঞান থাকা আর সেটার প্রকাশ করার মত ক্ষমতা সকলের থাকেনা, ইনি সেটা অনায়াস দক্ষতাতে করে থাকেন নিয়মিত। সাহিত্য থেকে ইতিহাস, সৌমিত্রের সিনেমা থেকে অপুর মানসিক দ্বন্দ্বের ধুম্রজাল ভেদ করে দেশে বিদেশে তার অনায়াস উপস্থিতি তাক লাগিয়ে দেবার মত। মন্তব্যে যদি কেউ উপন্যাস আঁকতে পারেন তাহলে সেটা অবশ্যই তিনি, দুর্দান্ত বাংলা ভাষাজ্ঞান, শব্দ চয়ন, আর মোবাইলে টাইপ করার দুরন্ত স্কিল নিয়ে উনি নিজেই একজন পরিপূর্ণ প্যাকেজ। অকপট মানে শবনম তালুকদার ছাড়া তা পূর্ণ হবার নয়। ওনাকে পছন্দ করতে পারেন, অপছন্দ করতে পারেন, কিন্তু উপেক্ষা করতে পারবেননা। ওনাকে জানাই অকপট শুভেচ্ছা অভিনন্দন, আগামীতে অপকপটকে এই ভাবেই সমৃদ্ধ করে চলুন।

‘বুরুন, তুমি অঙ্কে তের’, জলহস্তির মত হেডমাস্টার চোখ পাকিয়ে চেল্লাচ্ছেন। গোঁসাইবাগানের ভূতের মত কথাটাই সর্বপ্রথমে মাথায় আসে এনাকে দেখে, আসলে হেডমাষ্টার কথাটার সাথে যে যে বিষয়গুলো সম্পূরক,  আমাদের এই দ্বিতীয় জনের সাথে সবগুলোই যায় ওই জলহস্তীটা ছাড়া। রাগান্বিত চোখ, ইয়া লম্বা চেহারা, ঝাঁটার মত গোঁফ, খোঁচা খোঁচা চুল, স্কুলের বারান্দাতে একবার হাঁক মারলে ছেলেপুলের দলের যে পিলে চমকে প্যালারাম হয়ে যাবে সেটা বলাই বাহুল্য। সুপুরুষ বলতে যা বোঝায়, একজন নারীর চোখে সম্ভবত তিনি সেটাই, আম বাঙালী পুরুষের ঈর্ষার কারন। দৃশ্যত রাশভারি এই মানুষটির দিলখোলা আরো যে একটা সামাজিক চরিত্র আছে, যেখানে তিনি চরম রসবোধের অধিকারী, শখের চিত্রগ্রাহক ও বন্ধুবৎসল সেটার সাক্ষী এই অকপট। অকপটের সেই শুরুর লগ্ন থেকেই ওনার নীরব উপস্থিতি কেওমাগতভাবে অকপটকে সমৃদ্ধ করেছে। পরবর্তীতে অকপট সাহিত্যের পত্রিকা প্রকাশ অনুষ্ঠানে ওনার উপস্থিতি অনেকের স্মৃতির মণিকোঠাতে উজ্জ্বল। সিনেমাতে নায়ক হলে, ফেলুদা বা আমাদের ব্যোমকেশের চরিত্রে যে অটোমেটিক চয়েস হতেন, তাতে আমাদের সন্দেহ থাকা উচিৎ নয়। ওনার অনায়াস ভাবনাগুলোকে সাদাকালোতে রূপ দেবার ক্ষমতা আমাদের আশ্চর্য করে। মন্তব্যে মার্জিত সাবলীলতা শিক্ষণীয়। সর্বোপরি পেশাগত গাম্ভীর্যতার খোলসমুক্ত হয়ে এভাবে একজন সাধারণ অকপটু হয়ে রয়ে যাওয়াটা আমাদের জীবনের শিক্ষা দেয়, কীভাবে সাধারণ ভাবে থাকতে হয় উন্নাসিকতা তথা অহং বর্জন করে। ওনাকেও জানাই অকপট শুভেচ্ছা আর অভিনন্দন, অকপটকে সমৃদ্ধ করে চলুন এভাবেই।

——————————————————————————–

সামিমের জন্য

নদীকে প্রাণের প্রতীক বলা হয় এর গতিশীলতার জন্য, ক্রমাগত বয়ে চলে জীবনকে পুষ্ট করে বলেই বিশ্বের প্রায় সকল সভ্যতাই কোনো না কোনো নদনদীর তীরে গড়ে উঠেছে। বৃক্ষরাজি দলও পরিণত হওয়ার পথে ঝরে পরা হলুদ পত্রমঞ্জরীর স্থানে নতুন কচি কচি পল্লবেরা অঙ্কুরিত হয়ে সেই চারাকে মহীরুহে পরিণত করে তোলে।

অকপট এই ফেসবুক বিশ্বের একটা চলমান সভ্যতার নাম, এখানে নিয়মিত প্রাণের আগমন লেগে থাকে বলেই অকপটকে কখনও দুই ব্রাকেটের মাঝে বেঁধে ফেলা সম্ভবপর হয়নি। নানান কারন অকারণে অনেক সময় আমাদের অতি উৎসাহী সক্রিয় সদস্য আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন বা আমরা ওনাকে মুক্ত করে দিয়েছি সময়ের কৃষ্ণগহ্বরের কাছে, কিন্তু তাদের সেই শূণ্যস্থান কখনই বাকিদের কাছে সেভাবে কয়েকটা দিনের পর মনেই হয়নি। শুরুর দিকে ঠিক কারা বিশিষ্ট অকপটু ছিলেন সেটার স্মৃতিচারণা করা অনেকটা কষ্টকর বৈকি, কারন নতুন প্রানেরা সদাই টাটকা বাতাসের ঝলক এই ‘ক্লোজড’ গ্রুপের মাঝে এনে অকপটের পরিবেশকে কখনও একঘেয়েমি বা দূষিত হতে দেয়নি, অকপট নামের প্রবাহে এনারা নতুন নতুন সভ্যতা সৃষ্টি করেছেন এনাদের স্বমহিমাময় উপস্থিতি দিয়ে।

সোনা, যার একটা প্রতিশব্দ কাঞ্চন। অকপটের কাঞ্চনলাভটা হল চতুর্থ বর্ষের মাঝামাঝি সময়, উনি ঠিক কবে থেকে অকপটে আছেন সেটা উনি নিজে জানলেও ওনার সক্রিয়তা হওয়া ইস্তক অকপটের সদস্য মহলে নিজের একটা স্থান দখল করে নিয়েছেন, নিজের লেখনী ও কমেন্ট বক্সে উজ্জ্বল উপস্থিতি দিয়ে। ডুয়ার্সের প্রতিনিধি হিসাবে উনি যোগ্য নব্যপটু।

অসাধ্য না হলেও অকপট সাধন লাভ করেছে বিনা সাধনাতেই। সাধন বাবুও সুন্দরী ডুয়ার্সের বাসিন্দা, আমাদের অন্যতম বিশিষ্ট অকপট নব্যপটু। অকপটের হরেক কমেন্টে নিজের রসবোধ দিয়ে নিজের জাত চিনিয়ে ইদানিং সুন্দর সুন্দর পোষ্ট করে অকপটকে মাত করে রেখেছেন।

শক্তির দেবী বলা হয় মা কালীকে, আর মুণ্ডমালিনীর কাছে বলি বিনে সিদ্ধিলাভ কেমনে সম্ভব। অকপট আজ পর্যন্ত অসভ্যতার দায়ে বহুজনকে বলি দিলেও সেটা এতদিন সেটা বড়জোর ওই বাক্যের ছুরি বা চাকু নামক অস্ত্র দিয়ে, বর্তমানে হয়ত মায়ের আশির্বাদেই অকপটের খাঁড়া প্রাপ্তি ঘটেছে। তবে এনার ধার রসবোধে, মানে মিছরির তৈরি আরকি। বাকি বিশদ পরিচয় এনার হরেক রসময় পোষ্টেই পেয়েইছেন আপনারা। অকপটের যোগ্যতম নব্যপটু।

“জাতস্য মে ভবতু কেশব ত্বতপ্রসাদাত ত্বয়্যেব/ শ্রীরাম নারায়ণ বাসুদেব গোবিন্দ বৈকুন্ঠ মুকুন্দ কৃষ্ণ”।। কৃষ্ণ ভজনার সুযোগ পেলে কে আর ছাড়তে চায়, তাও অকপটে! ইনি সেই কেষ্টঠাকুরেরই অবতার কিনা না জানলেও অকপটের এক্টিভিটিতে ইনি যে নব অবতার তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সেভাবে পোষ্ট এক্টিভিটিতে ইনি দড় নাহলেও কমেন্ট ও লাইক বক্সে নীরবভাবে নিজের উপস্থিতি ব্যাক্ত করে নব্যপটুর দলে স্বমহিমাতে স্থান করে নিয়েছেন।

হীরা কয়লার মাঝেই মেলে, আসানসোল কয়লার দেশ, আমাদের এই নব্যপটু অকপটের সেই আসানসোলের পালিশ না করা কাঁচা হীরা। অর্থগতভাবে বিভাস নামের অর্থ ‘প্রাতঃকালীন রাগ বিশেষ’ হলেও আমাদের অকপটের বিভাসবাবুর কোনো সকাল সন্ধ্যা বাছবিচার নেই, সময় ও সুযোগ পেলেই অকপটে মেতে উঠেন। সাকিলের বিয়ের ঘটকালি হোক বা মজাদার সব খাবারের পোষ্ট, রাজনৈতিক সচেতন আমাদের বিশিষ্ট নব্যপটু অকপটের মুষ্টিমেয় সদস্যদের নিয়ে গঠিত হোয়াসএপ গ্রুপেরও মূল উদ্যোক্তা।

অকপটের পঞ্চম জন্মদিনে এই পাঁচ বিশিষ্ট নব্যপটুকে সম্মানিত করতে পেরে আমরা টিম অকপট গর্বিত।

————————————-

শেহনাজের জন্য

উৎসব হবে আর সঙ্গীত হবেনা তা হয়, আর সঙ্গীত মানেই সুর, তাল, লয়ের ছন্দ। মৃদু মৃদু তবলার বোলে সুরের সপ্তক যখন রঙ ছড়ায়, তখনই আকাশে রামধনু খেলে যায়, পাখিরা সান্ধ্য সঙ্গীত গেয়ে উঠে ওই সুরের আবেশে, বাতাসের বোল ফোটে, অন্তর পুলকিত হয়। অকপটের দেওয়াল জুড়ে বছরভর যাদের সুরে থুড়ি কমেন্ট পোষ্টে প্রাণে সুখের পরশ জেগে উঠে, শুভ জন্মদিনের অবসরে তাদের সম্মানিত না করার স্পর্ধা দেখানো অপরাধ। আমাদের অকপটের সাতটি সুর, সাতজন দিদিভাইকে জানাই অকপট শুভেচ্ছা আর অভিনন্দন।

#সা

মিষ্টি হাসির, টুকটুকে গাল

উত্তরপাড়া বাসী,

‘কবিতা’ময় নামের সুখে

অকপট বানভাসি।

#রে

নামের সাথে ‘সুর’ জড়ানো

রান্নাতে বেশ দর,

প্রজ্ঞাপূর্ণ পারমিতা দির

ব্যাঙ্গালুরু ঘর।

#গা

জান্নাতের বাগিচা সম

ডুয়ার্স চিত্রপট ,

মিষ্টি হাসি, কমলার স্বাদ

সাবিনার অকপট।

#মা

শান্তশিষ্ট সুখী মানুষ

অকপটে সৃজিতা,

কলম ছুঁচে ছবি আঁকেন

কোলকাতার নিবেদিতা।

#পা

নবাবগড়ের মালিকা ইনি

বাগ্মী স্পষ্টভাষী,

আপনচাঁদে কাছের মানুষ

সুখী অকপটবাসী।

#ধা

টানাচোখের রূপবতী সে

কমেন্টে যায় চেনা,

অকপটের ছটপটে প্রাণ

নামটি প্রীতিকণা

#নি

সপ্তসুরের প্রান্তিক স্বর

কন্ঠেতে সুর যার

‘নাগ’ বংশের রূপসী রানি

অকপট মজুমদার

অকপটের সদস্য সংখ্যা সহস্রাধিক হলেও প্রমীলা বাহিনীতে ঠিক কতযন যোদ্ধা আছেন সঠিকভাবে না বলতে পারলেও, রোজ রোজ অকপটের দেওয়ালে কতগুলো স্বপ্রতিভ সাতরঙা প্রমীলাদের চাঁদপানা বদন দেখে বাকি অকপটুদের মনপ্রাণ জুড়িয়ে যায়। 

সাতটি স্বর “সা রে গা মা পা ধা নি” এই সাতটি স্বরের একত্রিত নাম হলো সপ্তক ।

সপ্তক সুরের মূর্ছনায় অকপটে রোজ রোজ ধ্বনিত হয় এঁনাদের পোস্টের কাওয়ালী-বাওয়ালী, কমেন্টের ভাংড়া-আংরা, রিপ্লাই এর ভোজপুরি-প্রেতপুরী…. সবেতেই এনারা স্বয়ংসিদ্ধা।

——————–

মোমিনের গল্প

মরুনদের দেশে

বয়স আজ চল্লিশ ছুঁয়ে গেল, এবারে হয়তো চোখে পড়বে চালসে। শতাব্দী পেড়িয়ে নতুনকে ছুঁয়ে গেছে বিবাহের বয়স, চাঁদে সেই কবে মানুষ পৌঁছে গেছে, মঙ্গলে মঙ্গলযান। আমি বাঙালী, পায়ের তলায় সর্ষে হলেও আমার দৌড় ঐ সমুদ্র, পাহাড়, জঙ্গল। সবই এই বাংলার, কিন্তু ভবঘুরে মন কোনদিনও শুধু বাংলায় আঁটকে থাকতে চাইনি।

মন আলোর চেয়ে বহুগুণ বেশি দ্রুত ছুটতে পারে, এক নিমেষে গোটা পৃথিবী ভ্রমণ করে ঘুরে আসে। তবে মন সেখানেই যেতে পারে, আমার অবচেতন মনের দেওয়ালে পড়াশোনা দ্বারা যে যে রেখচিত্র গুলো অঙ্কন করেছিলাম সেগুলোর উপরে সওয়ার হয়েই। আজ ছুটে যেতে পারে মঙ্গলে, চাঁদেও বেড়াতে যেতে পারি। আকাশে উড়ে বেড়ায় যখন তখন, না ব্যাক্তিগত বিমানে নয়, আমার ডানা নেই, গ্যাস বেলুনে চাপার মত অর্থনৈতিক ভাবে শক্তিশালী যে নই সেটা আগেই বলেছি। দুরন্ত বেগে ছুঁটে চলা মনটাকে বল্গাহীন ভাবে ছেড়ে দিই, শরীর সেখানে ভারহীন। মনের তো আর ভিসা লাগেনা নিরুদ্দেশে যেতে, পাসপোর্ট অপ্রয়োজনীয় সামগ্রী। মাঝে মাঝেই তাই উড়ে যায় সেই সব রঙিন শহর লস এঞ্জেলস, প্যারিস, আবার কখনো ভেনিস, কল্পনায়।

সত্যি কথা বলতে কী এই শরীরকে বয়ে নিয়ে যেতে চাই টাকা, যা আমার কোনদিন ছিল না। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর নুন্যতম রোজগেরে হয়ে, আমার মত ছাপোষা আম বাঙালির সাধ্য না থকলেও সাধে কোনো ঘাটতি নেই। শরীরের বয়স বাড়ছে, মেদ জমেছে। এই শরীরের মধ্যে যে মন আছে তার বয়স বাড়েনি সেইভাবে, যেন উপন্যাসের ফিকশ্যনাল ক্যারেক্টারের মত ওই কিশোর বেলাতেই ঘাপটি মেরে রয়ে গেছে, আজও ছেলেবেলার কিছু কিছু কথা স্মৃতির পথ বেয়ে মনের আয়নাতে ধরা দিলে, আপন মনেই হেসে যায়।

তবে মনেরও বয়স বাড়ে, মন বুড়ো হয়। আমি এই মনকে বুড়ো করতে নারাজ। অনেক দিনের স্বপ্ন পিরামিড দেখার, মিশরের পিরামিড। ইতিহাসের পথে বেয়ে জেনেছিছি মমির ইতিহাস, ফ্যারাওদের কথা, খুফু, গিজা, তুতেনখামেন, নীলনদ, নেফারতিতিদের সাম্রাজ্যের রূপকথা। সিনেমার পর্দাতে মমি, পিরামিড দেখে নেশায় পরে গেছি বারে বারে। কতদিনের ইচ্ছে তুতেন খামেনের সমাধির সামনে দাঁড়িয়ে সময়কে মেলাবার। পিরামিড চাক্ষুস করার,  অকৃত্রিম সেই সৌন্দর্য যার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ইতিহাসে বাসা, এই দু’চোখ ভরে মনের অন্তঃস্থল দিয়ে উপলব্ধি করব।

খোলা বালিয়াড়ির অনিঃশেষ এলাকা, মাঝে মাঝে নাতি উচ্চ টিলা চারিদিক দিয়ে ধাপ, তার মাঝখান দিয়েই আবার নীচে পৌঁছানোর পথ। দেখবো সব দেখবো, খুব করে দেখবো। আজই এই পূর্ণিমায় ছুঁটে যাবো বহুদিন ধরে মনের কোণে পুষে রাখা সেই স্বপ্নের দেশ মিশরে। সেখানে এখন কিছুদিন কাটিয়ে আসবো, ঘুরে দেখবো সব শহর মানব সভ্যতার প্রাচীন গন্ধমাখা প্রদেশের। আজ কোন আর্থিক দৈন্যতা আমাকে আটকে রাখতে পারবে না, রাখতে পারবে না বয়স। আমার পাসপোর্ট ভিসা সব গুছিয়ে নিয়ে প্রস্তুতি আজ পরিপূর্ণ।

_______________________________________________

শেহনাজের গল্প

অতৃপ্ত অভিলাষ

ইলিশ মাছের মাথাটা দিয়ে কচুর শাকটা নাড়তে নাড়তেই বাঁ হাতের কড়ে আঙুল দিয়ে টুক করে নোটিফিকেশন গুলো চেক করে নিল। রান্নার হলুদের ছোপ লাগা তৎপর আঙুলের ছোঁয়ায় সকাল থেকে এই নিয়ে ন’বার প্রোফাইলটা ঘুরে এলো। এদিকে তাড়াতাড়ি রান্নাবাড়া শেষ করে ছেলেকে নিয়ে আঁকার স্কুলে নিয়ে যেতে হবে, রবিবার এলেই যত বিপত্তি! সকালে পতিদেবের ইস্পেশাল জলখাবারের ফরমাইশ, ছেলেকে ঘুম থেকে তোলার বায়নাক্কা, বেলা গড়ানোর পাল্লাতেই মাছ-মাংস-তেল-মশলার-সবজির পাল্লা তরতর করে বাড়া ইত্যাদি ইত্যাদি।

‘সংসার’ নামক যাঁতাকলে যখন বেশীরভাগ বাঙালী মহিলারা তাতেই পরিতৃপ্তি খুঁজে নেয়, সংসার আর নিজেকে ব্যাস্ত রাখতে প্রতিদিনকার এই সাংসারিক ঝক্কিগুলোকে হাসিমুখে সুখ ধরে নিয়ে পার করে দেয়, সেখানে শ্রীমতি নীহারিকা সরখেল অনেকটাই আলাদা। সে আধুনিকা মহিলা, আদিখ্যেতা দেখিয়ে স্বামীর পদবির খাঁচায় বন্দি হয়ে আজন্মলালিত পরিচিতিকে কফিনে ভরে ফেলেনি সে, সংসারের জন্য সবটুকু নিংড়ে দেয় নিজেকে। কিন্তু তার পরেও ওর মনে হয়, তার পার্সোনাল একটা স্পেস দরকার, তাই ওই পিতৃদত্ত পদবিটা নিজের কাছছাড়া করেনি কখনও, যেটা বারে বারে মনে করাবে তার ইস্কুল, কলেজ, বেড়ে উঠা, প্রথম প্রেমে পরা সবকিছুকে।

উজ্জ্বল শ্যামলা রঙের আর পাঁচটা বাঙালি গৃহবধূর মতোই গড়ন, শান্তিনিকেতনের আশ্রম পরিবেশে শিশুশ্রেনী থেকে বাংলা সাহিত্যের উপরে উচ্চশিক্ষা শিক্ষালাভ করা, বাংলাভাষায় বিশেষ রপ্ত এহেন নীহারিকা বিগত ২৬ মাস ধরে দন্ডকারণ্যের বাসিন্দা, স্বামীর বদলির চাকুরি। বিবাহ পরবর্তী গত ২২ বছরে নাই নাই করে বাংলার প্রায় এজ ডজন জেলা শহরের অস্থায়ী আস্তানা হাতবদল করে এবারে সটান গিয়ে পড়েছে বাংলার বাইরে। বিদেশ বিভুঁইয়ে অবাঙালিদের মাঝে পড়ে রবীন্দ্রপ্রেমী নীহারিকা তার ৪৫তম জন্মদিনের উপহার হিসেবে স্বামীর কাছ থেকে পাওয়া স্মার্টফোনেই মেনোপজড জীবনের রসদ খুঁজে পেয়েছে।

প্রায় সর্বক্ষণ সাথে থাকা স্মার্টফোনটিই এখন তার প্রাণভোমরা। পড়াশোনা শেষ করে বিয়ের সানাই বাজতে বেশ কিছুটা দেরীই হয়ে গেছিল মেয়েবেলাতেই পিতৃহারা নীহারিকার। বয়সের সাথে সামঞ্জস্য রেখেই ভালো চাকুরির সুদর্শন বরও জুটেছিল তার, প্রত্যাশার থেকে একটু বেশীই ভালো। কিন্তু  “ঘি ভাত সকলের পেটে সয় না” প্রবাদটার মতোই নীহারিকার সাথে তার স্বামীর সাথে সুরতালছন্দ মিললো না। আর পাঁচটা দম্পতির মতো একছাদের তলায় এক বিছানাতে থাকলেও কোথাও কীসের যেন কমতি থেকে গেল! ফলস্বরুপ বিয়েটা যেন সিঁথির সিঁদুর, হাতের শাঁখা আর কপালের লাল টিপেই আবদ্ধ থেকে গেল।

শুরুর দিকে স্বাধীনচেতা নীহারের সাথে অতুল্যর অশান্তি কম কিছু হয়নি। অতুল্য দন্ডপাত, মেদনীপুরের মাটির ছেলে, কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাফল্যের সাথে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে একটি সরকারী ব্যাঙ্কের বড় মাপের কর্মকর্তা। আপোষহীন মনোভাদের জন্যই যে চাকুরীতে এতবার বদলি সেটা বলাই বাহুল্য। বিবাহের ৭ বছরেও যখন সন্তান এলোনা নীহারের গর্ভে, তখন তারা নানান ধরনের ডাক্তারি পরীক্ষানিরীক্ষার পর জানতে পেরেছিল দোষটা নীহারের নয় অতুল্যর, সেদিন থেকে পরবর্তী ১৫ বছরে একবারের জন্যই কখনও এই দণ্ডপাত-সরখেল পরিবারে কোনো অশান্তি হয়নি। অতুল্য ‘এসোজপারমিয়া’ রোগে আক্রান্ত, অর্থাৎ সে একজন বন্ধ্যা পুরুষ। এর পর নীহারিকার হাহাকার যেন বেড়ে উঠে, পরবর্তীতে মাদার হাউজের অরফ্যান হোম থেকে দুষ্ট সোহমকে যখন ওরা নিজেদের সন্তান হিসাবে স্বীকৃতি দেয়, তখন সে মাত্র হাঁটতে শিখেছে। এর পর নিয়ম মেনে সংসারও চলে, ছেলেও সময়ের সাথে বড় হতে থাকে। নীহারিকার মনের অন্তরালে কলকল বয়ে যাওয়া রবীন্দ্রপ্রীতি, আর কীসের এক অপূর্ণতা সহ কিশোরীর চপলতা সে সংসার পুকুরের সর্বক্ষেত্রে খুঁজে বেড়াতে থাকে।

এহেন চঞ্চলমতি নীহারিকা স্মার্টফোন হাতে পেয়ে ধীরে ধীরে সোশ্যাল মিডিয়াতে ঢুকে যায়, অতুল্যই ওকে ফেসবুকে একটা একাউন্ট করে দেয়। প্রথম প্রথম বুঝতে অসুবিধা হলেও ছেলের কাছে শিখে শিখে প্রায় পুরোটাই রপ্ত করে ফেলে, আজকালকার ছেলেরা কেউ ছেলে নয় যেন বাবা। নীহারের হৃদয়ের টুকরো ওই ছেলে, ওকে ঘিরেই এই সংসার সুর্যের আহ্নিক গতি চলতে থাকে আজকাল। স্মার্টফোনের এক একটা স্পর্শেই রবিঠাকুরের হাজার হাজার কথা, গান, কবিতা.. ভেসে ওঠে তার মোবাইল স্ক্রিনে। ব্যাস, চলতি ম্যাড়মেড়ে সংসারের মধ্যেই সে পেয়ে যায় নতুন গতি। সময়ের নিয়মেই জুটে যায় দেশের নানান প্রান্তের চেনা-অচেনা বন্ধুবান্ধবী ওই ৫ সেমি স্ক্রিনের মধ্যেই। সংসারের রান্নাবান্না, ছেলেকে পড়ানো, স্বামীসেবা সবই চলতে থাকে, কিন্তু নীহারিকার কাছে প্রধান আকর্ষণ হয়ে ওঠে ওই জগতটাই।

ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়াতে পুরাতন লেখা পড়ার অভ্যাসটা নতুন করে প্রাণ দিয়ে গড়ে তোলে নীহারিকা। সময়ের ধুলোতে চাপা পড়ে যাওয়া তার সাহিত্য প্রীতি আরও প্রানবন্ত হয়ে ওঠে। লেখার সূত্রেই ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপের এক বড় হোটেলে কর্মরত এক প্রবাসী বাঙালির সাথে পরিচিত ঘটে গেল। দুজনের ‘ঋজুরেখ’ নামের একটা সাহিত্য চর্চাকারী প্রগতিশীল ফেসগ্রুপের মেম্বার। গ্রুপের এক ইভেন্টে সাধারণ পরিচয় কিছুদিনের মধ্যেই গভীর বন্ধুত্বে রূপান্তর ঘটে।

রূপাঞ্জন লাহিড়ী, বয়স সদ্য ত্রিশের কোঠায়, বিবাহিত, পেশায় ভিন্নধর্মী হলেও তুখোড় সাহিত্যবিলাসী। রুপাঞ্জনের লেখার মাধ্যমেই বহু বন্ধুরা ওকে ভীষণ শ্রদ্ধা ও সমীহ করে চলে, এর মাধ্যমেই বহুজনের সাথে যোগসূত্র হয়েছে তার, নীহারিকার ক্ষেত্রেও বিষয়টা ঠিক তেমনই। রূপাঞ্জন বাবু তার আপন পরিধির অগণিত গুণমুগ্ধদের মধ্যে নীহারিকার সাথে বিশেষ কোনো আলাদা টান অনুভব করলেন না, কেননা সেটাই স্বাভাবিক। বিবাহিত স্বয়ংসম্পূর্ণ ঝকঝকে তরুণের কাছে ৪৬ বসন্ত পেরোনো এক গুণগ্রাহীর আলাদা করে কী বা অনুভব থাকতে পারে! যদিও নীহারিকার অজস্র শুভেচ্ছাবার্তা, প্রায় প্রতিটি ওর লেখনিতে আলাদা করে বিশ্লেষণধর্মী মন্তব্য অনেকের মাঝেও একটা শ্রদ্ধার স্থান করে নিল।

কিন্তু নীহারিকা! তার মনের-জীবনের অতৃপ্ততার ওষুধ যেটা এতদিন দরে এই সংসার ডোবাতে খুঁজে মরছিল, সেটারই যেন সন্ধান পেল এই অন্তর্জালের দুনিয়াতে। তার জীবনের সমস্ত অব্যক্ত কথাগুলোকে যেন রূপ দিয়েছে রুপাঞ্জন, ওর প্রতিটি শব্দের মাঝে নীহারিকা নিজেকে খুঁজে পেত। আকুল ভাবে ওই ইথার তরঙ্গ বেয়ে একটা আত্মিক সম্পর্ক বুনে ফেলল নীহারিকা, জীবনের অধরা মাধুরী যে যেন রূপাঞ্জনের মাঝেই পেয়ে গেল। সংসারে থেকেও সংসারে মন নেই, স্বামীর প্রতিও যেটুকু মোহ ছিল তাও যেন হারিয়ে যেতে বসলো!

এতোদিনে তার মনে হতে লাগল, সত্যিই বড় ভুল মানুষের সাথে তার পরিনয়টা হয়ে গেছে। কিন্তু করারই বা কিছিল, আড়াই বছর বয়সে পিতৃহীনা অবস্থাতে তার মা, ওর দিদার হেফাজতে ওকে রেখে নতুন বিবাহ করে দূরদেশে চলে যায়। খুব ছোট বেলাতে যখন মায়ের আদরে বড় হওয়ার বয়স তখন মামীদের গঞ্জনা ঠেলে প্রাইমারির মধ্য অবস্থাতেই ওর দাদু ওকে শান্তিনিকেতনে রেখে আসে। আপনজনেদের শোক ওকে কখনও সাজতে উৎসাহ দেয়নি, প্রেমে পরতে উৎসাহ দেয়নি। পড়াশোনা আর রবীন্দ্রনাথের বাইরে যেটুকু ফুরসত ছিল সেটা অপুর সংসার দেখার পর থেকে সৌমিত্র-সত্যজিতেই ভাগযোগ করে নিয়ে নিয়েছিল। তারপরেই বিয়ে ও অশান্তি।

এহেন নীহারিকা আজ প্রতিদিন নিয়ম করে সাজতে বসে, অতুল্য সংসারে থেকেও যেন সন্নাস্যীদের মত আচরণ। পৃথিবীর কোনো জটিল বা মোহনীয় বিষয়ই আর ওর মনে দাগ কাটেনা, খুব সকালে অফিস চলে যায়, অনেকটা রাত্রে ফেরে। ছুটির দিনে বন্ধুদের সাথে আড্ডাতে সময় কাটিয়ে মাঝরাত্রে ঘরে ফেরে মাতাল হয়ে। এদিকে ছেলের এতদিনের বরাদ্দের সময়েও ভাগ বসালো রূপাঞ্জন প্রীতি। দিনরাত এক আলাদা জগতে বাস করতে লাগলো।  নিজের সাথে নিজে কথা বলা থেকে শুরু করে, রূপাঞ্জনকে ইনবক্সে দিনরাত প্রেম নিবেদন সবই চলতে লাগলো। আর তার সাথে সে কল্পনা করে নিল রূপাঞ্জনও তার প্রতি আসক্ত। দিন দিন অসুস্থতা ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। রুপাঞ্জন আর নীহারিকাকে অভিন্ন হৃদয় কল্পনা করে একটা অবান্তর সুখের তাসের ঘর বানিয়ে নিল অতৃপ্ত অভিলাষে।

আজ সকাল থেকে সে রুপাঞ্জকে খুঁজে পাচ্ছেনা, বহুবার টামলাইন চেক করে , মোবাইল সুইচ অফ-অন করে, ফেসবুক এ্যাপটা আইন্সটল করে ওর পক্ষে যতভাবে সম্ভব সবটা করে ব্যার্থ হয়ে প্রায় পাগলপারা হয়ে উঠল সে। রূপাঞ্জনের ফোন নাম্বার সে জানেনা, জানা থাকলেও ISD কল করার সুবিধা তার কাছে সহজলভ্য নয়, আশাপাশেও কোথাও নয়, এক্কেবারে বিভূঁই, বহু…দূরের মানুষ। কিন্তু বহু দূর বললেই সে মানবে কেন, তার হৃদয়ের সবটা জুড়েই এক এবং অদ্বিতীয় সেই রূপাঞ্জন, ওকে ছাড়া এভাবে বেঁচে থাকার কোনো মানে হয়না, তাই উন্মাদ হয়ে উঠল সে।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *