বারোয়ারী গল্পঃ মূল্যায়ন পর্যালোচনা

ডিসক্লেমারঃ প্রথমেই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলি, পাঠকের দৃষ্টিতে যেটা দেখেছি সেটাই পরিষ্কার অকপটভাবে লিখছি। কারো সাথে ব্যাক্তিগতভাবে কোনো খার নেই, কেউ ব্যাক্তিগতভাবে নিলে সেটা আমার দুর্ভাগ্য। এটাকে পজিটিভভাবে নিলে লেখকের লাভ হবে বই ক্ষতি হবেনা। আমি নিজে লেখক হিসাবে আমার সীমাবদ্ধতা বুঝি, তাই নিজ ক্ষমতা অনুযায়ী আমার সর্বোচ্চ বোধবুদ্ধি দিয়েই লিখছি, সেটা পাঠকের ভাল লাগুক বা বিরক্তের কারন হোক। তবে আমার নিজের লেখার সমালোচনা এলে সেটাকে আমি আশির্বাদ হিসবেই নেব, আমার দুর্বলতা আমি বুঝে নিয়ে শুধরে নেবার চেষ্টা করব।

সর্ব প্রথমেই আমাদের এই নতুন ধরনের অকপটীয় পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য যে সকল লেখক ও পাঠকেরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহন করেছেন তাদের প্রতিজনকে অভিনন্দন জানাই। নতুন কিছু করতে সাহস লাগে বৈকি, আর সাহসীরাই সফল হন। পাঠকদের উৎসাহ ঠিক মারাকাটারি ভাবে ছিলনা, কারন তারাও বুঝে উঠতে পারেননি এটা ঠিক কী হতে চলেছে বা যাচ্ছে। তাছাড়া স্বাধীনতা দিবসের উদযাপন ও রাখীবন্ধনের উৎসবের আমেজে অনেক সক্রিয় সদস্যই সেভাবে ফেসবুকে আসতেই পারেননি, এটাও একটা বড় কারন।

শুরুতেই বলি, আমাদের ১০ জন লেখকের প্রত্যেকেই আমার নজরে পাশমার্ক সহ উত্তীর্ণ হয়ে গল্পটাকে একটা সম্মানজনক গতি দিয়েছে। ৩০ থেকে ১০০ এর মধ্যে আমি সকলে একটা নাম্বার দেব, যাতে নিজেদের খামতি গুলো বোঝাতে পারি। যাতে আগামীতে এই চলমান গল্পে, তাৎক্ষণিক ভাবে নিজের দক্ষতা দেখাতে পারি। পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজের লেখনী ক্ষমতাকে মেলে ধরতে পারি। এটা করতে যে কী পরিমাণ মুন্সিয়ানা প্রয়োজন সেটা যিনি করেছেন একমাত্র তিনিই সেটা ভালো জানেন। সেই হিসাবে প্রতিজন লেখকে উষ্ণ অকপটীয় অভিনন্দন জানাই। আমার মুল্যায়ন বাকি ১০ জনে করবে, সমালোচনা হবেই, সেটাই উত্তরণের চাবিকাঠি, মুখিয়ে আছি নিজের দোষত্রুটি গুলোকে চিহ্নিত করে নিতে।

পর্ব (১)

শুরুতেই বলব, সুব্রতদার এমন একটা জটিল বিষয় চয়ন করাটা বড় ব্লান্ডার। লেখক হিসাবে আমরা সকলেই নবিশ পর্যায়ের, এবং মান হিসাবে উনিশ-বিশ। কেউ পেশাদার বা স্বীকৃত নই। আমি একটু কমা, তো আরেকজন একটু ভাল এই হচ্ছে ফারাক। যখন সময় কম তখন T-20 ক্রিকেটও ড্রেসিং রুম বলে কিছু রাখেনি, সবাই মিলে বাউন্ডারির বাইরে একটা ছোট্ট ছাউনিতে বসে থাকাটা নিয়ম করে নিয়েছে। সুতরাং টেষ্ট ম্যাচের মত হেলেদুলে নামার স্বাধীনতা ছিলনা এই গল্পে। একটা পর্ব যেখানে ৪৫ মিনিটের মধ্যে শেষ করতে হবে সেখানে এইভাবে ‘ভেবে ভেবে’ লেখার জন্য এমন একটা জটিল মনস্তাত্ত্বিক বিষয় চয়ন ঠিক হয়নি, পরবর্তী লেখককে আগে থেকে ভেবে রাখার স্বাধীনতা হরণ করেছেন ওনার ভাবনা দিয়ে, স্বাধীনতা দিবসের দিনে এটা ছিল বেমানান। ‘আলোছায়া’ একটা ধ্রুপদী গল্পের প্লট নিঃসন্দেহে, কিন্তু এই মঞ্চের জন্য আমার কাছে সঠিক বলে মনে হয়নি।

আলোছায়া নামটা খুব সুন্দর ছিল, প্রতিটি চরিত্রের এই যে দুটো দিক তার সুতো খুলে রাখা ছিল, পুরাতন ও খোয়া যাওয়া প্রেমের অকস্মাৎ প্রাপ্তি, নায়কের বোহেমিয়ান চরিত্র, গর্ভবতী নায়িকা জীবনের কথা, এবং সর্বোপরি একটা মিষ্টি রসায়ন, ডুয়ার্দের প্রেক্ষাপট… রসদের খামতি রাখেননি পরবর্তী লেখকদের ও পাঠকদের জন্য। আমার হিসাবে উচ্চশ্রেণীর দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করবেন লেখক ৫৫ মার্কস সহ।

(২)

আমার বানান ভুল আমার নিজেরই দৃষ্টিকটু লাগছিল, ওটার বিষয়ে আরো যত্নশীল হওয়া উচিৎ ছিল। আমি চেষ্টা করেছি মূল গল্পের ভাষ্যের সাথে অবিকল মিল রেখে গল্পটাকে ছড়িয়ে দিতে, সম্ভাবনার সুতোতে পাঠকের মনের ভাবনাতে একটা কিন্তু কিন্তু পরিবেশ সৃষ্টি করতে। ক্রিকেটের নিয়মে ১১ জনই খেলেন, প্রথম জন স্ট্রাইক নিলে অন্য একজন একটু খুলে খেলে। সেক্ষেত্রে নায়ক নায়িকার মধ্যেকার রসায়নটা আমদানি করে পাণ্ডুলিপির খসড়া জুড়ে দিয়ে ভেবেছিলাম গল্পটা বোধহয় এই পান্ডুলিপিকে কেন্দ্র করেই এগোনো যাবে। মোদ্দাকথা ম্যাচের পিচ বুঝে নিয়ে ড্রেসিংরুমে বার্তা পাঠিয়ে দিয়েছিলাম যে বল কোন লাইনে আসছে, কতটা বাউন্স ইত্যাদি। যদিও আমার সেই ইশারার গোটাটা বাকিদের বোঝাতে ব্যার্থ হয়েছি। নিজেকে ৪৫ মার্কস দেব, ওই ট্যাঁয়েটুয়ে দ্বিতীয় বিভাগ।

(৩)

 তিন নাম্বারের ব্যাটসম্যানের কাজটা খুব কঠিন, ওপেনার তাড়াতাড়ি আউট হলে তাকে ওপেনারের ভূমিকা নিয়ে বলের পালিশ তুলতে হয় ওপেনার সেজে, আবার স্কোরবোর্ডে অনেকটা রান করে ওপেনার আউট হলে ব্যাটসম্যানের ভূমিকা পরিবর্তন হয়ে যায়। সঞ্জয় মঞ্জেরেকর, রাহুল দ্রাবিড় থেকে আমাদের কিং কোহলি এই পজিশনেই ব্যাট করেন। শেহনাজ- আমার ও সুব্রতদার লেখার চরিত্রকে অনুসরণ করে এক্কেবারে প্রায় আমাদেরই মতন করে দুটো চরিত্রকে সুন্দর ভাবে বুনে দিয়েছে। পাণ্ডুলিপি হাতে নায়ক সন্ময়ের চরিত্রের যে ধুপছায়া, মনের চঞ্চলতা তাকে অনবদ্য ফুটিয়ে তুলেছে। অপূর্ণ প্রেমের বর্ণনা, নায়কের মনের আকুলতা, এবং নায়িকার অতীতকে মাস্টারমশাই নামের চরিত্রের মাধ্যমে নায়িকা ‘মীরার’ গোটা জীবনকে বলিয়ে দিয়ে, ৩০ ওভারেই ১ উইকেটে ২৩০ স্কোর করে দিয়েছে। এবারে যারা আসবে তারা একটু ধরে খেললেই সাড়ে তিনশো কে আটকায়। অসাধারন মুন্সিয়ানা দিয়ে গল্পটাকে একটা অধি বৃত্তের মাঝে খুঁটে বেঁধে দিয়েছেন।

আমি লেখিকাকে ৮৫ দেব, এক্কেবারে লেটার মার্কস।

(৪)

ভীষণ প্রতিভাবান খেলোয়ার অনেকেই জন্মেছে, কিন্তু সকলেই টিকে থাকতে পারেনি। কমিটমেন্টের অভাব তাদের ছিটকে দিয়েছে বৃত্ত থেকে। আজকের ঋষভ পন্থ, বা অতীতের ভেনুগোপাল রাও অনেক উদাহরন রয়েছে। এই চতুর্থ নাম্বারের পর্ব লেখার জন্য যে অকপটু নিজে থেকে সময়টা বেছে নিয়েছিলেন, তিনি সময়ে উপস্থিত না হয়ে হিট উইকেট করে দিয়ে গায়েব থেকে গেছিলেন। নূন্যতম একটা মেসেজও করতে পারতেন, কারন ওনার নির্দিষ্ট সময়ের কিছু পূর্বেই টাইমলাইনে নিজের ডিপি পরিবর্তন করেছেন দেখেছিলাম। ফলাফল স্কোর শূন্য আর গ্যালারি ও ড্রেসিংরুমে একরাশ হতাশা। সাধে কী আর চার নাম্বার পজিশনের জন্য বিগত ৪ বছর ধরে ভারতীয় দলে একটা মিউজিক্যাল চেয়ার হয়ে গেছে, অথচ বিশ্বজুড়ে চারে নামা ব্যাটসম্যনদের কী দুরন্ত রমরমা।

স্কোরবোর্ড এখানে গাধা।

(৫)

বিশ্ব সংসারে যখনই সঙ্কট উপস্থিত হয়েছে, তখনই ত্রাতা মধুসূদন হিসাবে কেউ না কেউ উপস্থিত হয়ে হাল ধরেছেন। আমাদের পঞ্চম লেখক অভিজিৎ দা এই বারোয়ারী গল্পে ত্রাতার ভূমিকায় এসে পিঞ্চ হিটারের কাজ করেছেন। তৃতীয় পর্ব পর্যন্ত গল্পটা যে কোনো সময়ের বলে চালানো যেত সেটা ১৯৫০ হোক বা ২০২০। তাড়াহুড়োর ফলেই হোক বা স্বতন্ত্রভাবে উনি গল্পটাকে বর্তমান সময়ের গোঁজে বেঁধে দিয়েছেন হোয়াটসএপের আমদানি করে। লেখককে ধূমপায়ী বানিয়ে একটা সুন্দর স্বকীয়তার ছাপও রেখেছেন। খুব ছোট্ট পরিসরে গল্পকে সেভাবে না ছড়িয়ে এবং না গুটিয়ে পূর্বক্তো আবর্তের মাঝেই নিজেকে আবদ্ধ রেখেছেন, পাণ্ডুলিপিতে হাত না দিয়েই। গল্প আড়ে বেড়েছে বহরে নয়, তবে সময় পেলে আরেকটু আড়ে বাড়ত বলেই আমার বিশ্বাস। এক্ষেত্রে লেখার জন্য ৫০ ও ওই সময়ে ত্রাতার ভূমিকাতে অবতীর্ণ হবার জন্য ২০ মিলিয়ে চোখ বন্ধ করে ৭০ পেলেও লেটার মার্কস পাবেননা।

(৬)

অভিজিৎ দা যেখানে শেষ করলেন নয়নরঞ্জনদা সেখান থেকে শুরুটা না করে উনি নায়িকার মনজগতের উথালপাথালী যে উচাটন বর্ণনা করেছেন, সেটা আলোছায়া নামের সাথে সমার্থক। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি গল্পকে এগিয়ে না নিয়ে গিয়ে অতীতে টেনে নিয়ে অনেকটা বিস্তৃত করে দিয়েছেন। গল্পের নায়ক নায়িকা ও পাণ্ডুলিপি এই তিনটের মাঝের যে বন্ধন সেখানে পৌছাতেই পারেনি। একটা পাণ্ডুলিপি যখন কেউ দিচ্ছে, কেন দিচ্ছে! সেটার গুরুত্ব নিয়ে লেখক ভাবেননি, অনেকটা পূর্বসঙ্কল্পিত ভাবে লেখাটা শেষে হয়েছে। ভারতীয় দলে এই স্থানটা ধোনীর, সেঞ্চুরি ২০ না টপকালেও ১০ হাজার রান করার মত বিরল কৃতিত্বের অধিকারী উনি। তাই আরো একটু ভাল খেলাই যেত, ওনার মধ্যে সে ক্ষমতাও আছে। আগামীতে নয়নদা নিজেকে কালচার করলে অনেক ভাল ভাল গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস আমরা পেতেই পারি। সময়ের বাঁধার জন্য উনি ৩৯ বছর বয়সের ধোনীর মত রান আউট হলেন। আমার তরফে লেখক উচ্চশ্রেণীর দ্বিতীয় বিভাগেই থাকবেন, এট্টুখানির জন্য প্রথম বিভাগ মিস করেছেন। প্রাপ্ত নাম্বার ৫৯।

(৭)

প্রতিটি গল্পের একটা আত্মা থাকে, আর প্রতিটি আত্মা স্বতন্ত্র। আমাদের অষ্টম লেখক আত্মার বিনাশ ঘটিয়ে প্ল্যানচেটে টিরোনোসরাসের আত্মাই ঢুকিয়ে দিতেন, যদি পারতেন। নিরামিষাশীকে মাংসের বাজারে নিয়ে যেতে নেই, তাতে তার শরীর খারাপ হয়। সিক্স ডাউন ব্যাটসম্যান মানে তিনি অলরাউন্ডার, দরকারে মারবেন বড় বড় ছক্কা, আবার ক্রিজে সেট ব্যাটসম্যান থাকলে সিঙ্গেল নিয়ে প্রান্ত বদল করবেন। উনি দ্বিতীয়টি করার চেষ্টাই করেছেন, টুক করে একটি রান নিতে গিয়ে রান আউট হয়ে প্যাভিলিয়নে, ক্রিজের অন্যজনকেও বুকে ছ্যাঁচড়াতে বাধ্য করেছেন। সংলাপের পর্বে অবতারণা গত যে মুন্সিয়ানা ছিল তা অনবদ্য, একটা সম্পর্ককে স্বাভাবিক করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু গল্পের যে ধ্রুপদীয়ানা, ভাষাগত বিন্যাস, পূর্বের অলঙ্করণকে সপাটে মাঠের বাইরে পাঠিয়ে একদিক, দ্বিতীয়দিক ও দুইদিক করে গল্পের শ্রীঘ্রপতন করিয়ে ছেড়েছেন। কিশোরবেলার প্রেমিক প্রেমিকাকে কীভাবে উনি একই স্কুলে পাঠাতে পারেন উপরের তথ্য বিকৃতি ঘটিয়ে বা একটা অপরিণত পুরুষকে প্রেমিকার গর্ভে অন্যের সন্তানের নামকরন করতে পারেন! দুইজন আকুল প্রেমিক প্রেমিকা যারা দুজনেই পরিণত বয়স্ক, তারা সাজতে বসবে? একই মফঃস্বল শহরে তাদের বাস, মানে ঢিল ছোড়া দুরত্বে, তারা হোয়াটসএ্যাপে কেন কথা বলবে যখন নায়ক জানে নায়িকার গার্জেন সে নিজেই! এই সময়টা ছিল চরিত্রের যে বিভিন্ন সেডস, সম্পর্কের টানাপোরেন সেগুলোকে ফুটিয়ে তোলার। তা নাহয়ে অষ্টাদশীদের মত তারা সাজতে বসে গেছে, এটা হাস্যকর লেগেছে যা মূল গল্পের ভাবনার যে ব্যাঞ্জনা তাকে হাস্যকর করে ছেরেছে। এবং পরবর্তীদের লেখকদের জন্য গল্পকে নেতাধোপানির উদ্দেশ্যে ভেলা ভাসিয়ে দিয়েছে। আমার হিসাবে এটা গোগোল তুমি অঙ্কে তেরো মত, তবুও এই চটজলদি লেখার মাত্রাতে আমি লেখককে ৪৫ দেব।

(৮)

এইখানে লেখক আমাকে সবচেয়ে বেশি হতাশ করেছে। এনার পর মাত্র আর চারজন আছেন, এখানে মানবীয় চরিত্রের বিশ্লেষণ স্ফুরণ হওয়ার সবচেয়ে ভাল স্থান। ইনিংস যা বিল্ডাপ করার সেটা হয়ে গেছে, এখন গুটানোর শুরু, সেখানে লেখক পরিস্থিতিকে না বুঝে ওপেনার বা ওয়ান ডাউন টু ডাউনের মত ঠুকে খেলতে গিয়ে সম্পূর্ণ গল্পের যারা মূল চরিত্র সেই সন্ময়, আলোছায়া ও পাণ্ডুলিপি থেকে সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে মিরাকেল ঘটিয়ে গল্পকে প্যারালাইজড করে দিয়েছেন। গল্পের ভিতরে নতুন একটা গল্প রচনা হয়েছে।

যে কৌতুহল প্রথমেই ছিল সেই পাণ্ডুলিপি কেন ছাপতে দিল তার ভিতরে কী লেখা আছে সেটা নিয়েই লেখক লিখতে পারত, কারন লেখক দুর্দান্ত কবিতা লেখে, পান্ডুলিপিতেও কবিতা লেখা ছিল সেগুলোর পরিস্ফুটন করতেই পারতেন। লেখকের দর্শনবোধ খুবই উন্নত, লেখিকার পাণ্ডুলিপির খসড়া উন্মোচনের আড়ালে সে নিজে কিছু দর্শনবোধ দিতেই পারত। টেলি সিরিয়ালের মত অযাচিত চমক আনতে গিয়ে বাকিদের জন্য ভীষণ কঠিন করে দিলেন এই পর্বে। এখানে পাণ্ডুলিপির গুরুত্ব সম্পূর্ণভবে লোপ পেয়ে মীরা কার কাছে যাবে- লম্পট স্বামী না প্রাক্তন প্রেমিক, সেটাই বড় হয়ে দেখা দিল। আসলে হঠাৎ করে কোথা থেকে শুরু করবে সেটা বুঝে উঠতে না পারার দরুনই যে এইটা ঘটেছে সেটা বোঝাই যায়। এই পর্যায়ে লেখককে আমি পাশমার্ক টুকুই দেব, ৩৪।

(৯)

প্রেম বাবুর লেখাটা আমাকে দড়াম করে একটা রামধাক্কা দিল। আগের দুই লেখকের যাবতীয় লেখা জোখাকে অনায়াসে এক লাইনে স্বপ্ন বানিয়ে দিয়ে গল্পকে আমার মেনস্ট্রিমে ফিরিয়ে এনেছেন। বিবাহিত প্রেমিকার সাথে অবিবাহিত সেই প্রেমিকের মাঝেকার যে দুরত্ব সামাজিক ও মানসিক ভাবে, সেটাকে সুন্দরভাবে ফিরিয়ে এনেছেন। বিশেষ করে পাণ্ডুলিপিতে গল্পকে এনে ফেলেছেন। মীরার জীবনের যে আলোছায়া সেটাকে হয়ত লেখকের বয়সের অভিজ্ঞতার গুনেই এত সুন্দর ভাবে ব্যাখ্যা করতে পেরেছে। তার সাথে গল্পকে আবার নতুন করে প্রাণ দিয়েছেন। ওনাকে আমি উচ্চশ্রেণীর প্রথম বিভাগে রাখব, ৭৫ দিলাম।

(১০)

প্রদীপ গল্পটাকে থামিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে, এর পরেই গল্পটা গুটিয়ে আনার মূল ক্ষেত্র ছিল। লেখক নায়ককে কোলকাতায় এনে নায়ক নায়িকার মাঝে একটা বিগোয়ান্তক বিচ্ছেদ ঘটিয়ে মেলোড্রামার গোটা ক্ল্যাইম্যাক্সটা সাজিয়ে দিয়েছিল, সময়টা গল্পে অনেকটা এগিয়ে বাচ্চা প্রসবের সময়ে পৌঁছে দিয়ে একটা ধুম তা না না না না সুরের অদৃশ্য মিউজিকের উপস্থিতি সৃষ্টি করেছিল, যেখানে ক্যামেরা কার উপরে ফোকাস করবে সেটা নিয়ে যথেষ্ট বিব্রত হতে পারত। এখানে বিশেষ ভাবে কিছু করার থাকেনা লেখকের, তবে দর্শনতত্ত্বের অভাব লক্ষনীয়, যেটা স্বগতোক্তির মতন করে লেখকের মুখ দিয়ে বলা কথাগুলো লেখকের হৃদয়কে বিদ্ধ করতে পারত। লেখককে আমি ৬৫ দেব।

(১১)

যেখানে গল্পটাকে দুর্দান্তভাবে একটা সমাপ্তি দেওয়া যেত, সেখানে ধান ভানতে শিবের গীত হয়ে গেছে। গল্পের ফাঁসজাল গুটিয়ে এনে গেঁড়ি গুগলি সবটাই পাঠকের পাতে তুলে দেওয়ার কথা ছিল, সেখানে উনি আরো দুটো অহেতুক চরিত্রের আমদানি করে, গল্পের গতিপথ এক্কেবারে ‘রায়তা’ ছড়িয়ে দিয়ে নায়িকার মৃত পিতামাতার মৃত্যু রহস্যে এনে উপস্থিত করে ছেড়েছেন। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে এ লেখা আগে থেকেই লেখা ছিল, প্রথম পর্ব দেখেই। তাতে আগের ৫জন লেখক যাই লিখত বা এই লেখক যে পজিশনেই লিখত উনি এটাই লিখতেন।  আগের পর্বের লেখকেরা যেগুলো লিখে গেছেন সেগুলোকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে উনি নিজে চরিত্র রুপায়ন করতে গিয়ে- গল্পের এই পর্যায়ে এসে যে স্বাদ, সেটাতে জল ঢেলে দিয়েছেন। পুরাতন চরিত্রগুলোকে লালনপালন না করে নতুন চরিত্র সৃষ্টি করতে গিয়ে তাদের অনাথ করা হয়েছে। লেখকের বয়সের অভিজ্ঞতা অনুসারে যে দর্শন রাখার স্থানটা ছিল সেটা উনি জলে ডুবিয়ে দিয়েছেন। আমি লেখককে ৩০ দেব। সবচেয়ে হতাশ করেছে এই পর্বটা।

(১২)

বাপ্পাদিত্য শেষটা করেছে, ওর মত অসহায় অবস্থায় পরলে আমি এক্কেবারে ছড়িয়ে দিতাম এ নিয়ে সন্দেহ নেই, কিন্তু সেও নায়ক সন্ময়কে, পাণ্ডুলিপিকে অগ্রাহ্য করে, নায়িকার প্রসবক্ষণকে নিয়েই অনেকটা শব্দটা ব্যায় করেছে। অরূপ রায় নামক যে চরিত্র আগের পর্বে সৃষ্টি হয়েছিল, তাকেও ব্যবহারই করতে পারেনি। কে নায়ক সেটাই গুলিয়ে দিয়েছে। পাণ্ডুলিপির মাঝে সে ওই অসামান্য লেখা, সেটাকে সম্পূর্ণ ব্রাত্য রেখে ক্ল্যাইম্যাক্সে নিলয়কে দিয়ে গোঁজামিল ভাবে শেষ করেছে, যেখানে নিলয় ও সন্ময়কে পূর্বপরিচিত দেখাচ্ছে। অথচ শুরুতে সন্ময় জানতই না মীরার কে কে আত্মীয় আছে। পুরো ঘ্যেটে ঘ। তবে আগের ওই ঝোলানো অবস্থা থেকে এই ভাবেও শেষ করাটা মোটেই সহজ ছিলনা। আমি ভীষন আপ্লুত এতে। আমি বাপ্পাকে ৬৫ নাম্বার দেব।

একজন লেখকও পাণ্ডুলিপির ভিতরে কী আছে সেটাতেই ঢুকলোনা। লেখিকার যন্ত্রনার কথা সেখানেই রয়ে গেল, পাঠকেরা জানতেই পারলনা। অত বড়লোকের মেয়ে, এতো সম্পত্তির ওয়ারিসান কেন সে স্কুল টিচার হল সেটা আবিষ্কার করার দায় কেউ দেখায়নি, অথচ পাণ্ডুলিপি খুললেই সেটা পাওয়া যেত। সকলের চেষ্টা ছিল নতুন চরিত্র সৃষ্টি করে ‘নিজস্ব’ একটা ছাপ রাখা, কিন্তু বারোয়ারী মানেই হল ‘একটিকেই’ আমার বলে ভাবা এটার ভয়ানক অভাব ছিল। এখানে সফলতাটা ছিল লেখাটা ঠিক একটা লেখার মত হবে দেখার মধ্যে, শরবতের মাঝে চিনি, নুন, আলাদা আলাদা থাকলে তাকে শরবত বলেনা। সন্ময়, মীরা, ও পাণ্ডুলিপিকে নিয়েই যদি সকলে খেলত তাহলে এটা একটা অন্যতম সেরা বড় গল্প হত, কিন্তু এটা একটা সাধারণ ফেসবুকের গল্প হয়ে রয়ে গেল। সবে মিলে এই নতুন ধরনের বারোয়ারী গল্প আগামীতে আমাদের প্রত্যেককে নতুন করে অক্সিজেন জোগাবে বলেই বিশ্বাস করি।

ধন্যবাদ।      

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *