নীলমণিধন ও ‘কলুরু’ গ্রহের ভীনগ্রহী

রিলে গল্প

নীলমণি খাসনবিস আমাদের খালাসিটোলার এক সওদাগরি আপিসে মুহুরির কাজ করে নিয়মিত মাসমাইনের পাশাপাশি ছুটির দিনে পিয়ারলেস আর জীবনবীমার দালালি করে সংসার খরচের টাকাটা ঠিক জুটিয়ে নেন। বেতনের টাকাটা জমিয়ে রাখেন প্রতি মাসে, ইচ্ছা ভবিষ্যতে বড় একটা কিছু করবেন তিনি। ওনার ছেলে মনিলাল গ্রামের পাঠশালাতে তৃতীয় শ্রেনীতে পড়ে। ওর উপরে তিনটে দিদি, বড়টা শাড়ি পড়ে, ১৩তে পরেছে। বাহুল্যতা না থাকলেও বেশ স্বচ্ছলভাবে কেটে যায় খাসনবিশ পরিবারের। খালাসিটোলার মুটেমাল্লাদের হরেক বিমা করিয়ে মা লক্ষীর কৃপাতে নীলমণি বাবুর বরাতে বেস্পতি বিরাজ করছেন বেশ কিছু বছর ধরে। 

এই গল্প সেই সময়ের যখন কোনো পাড়াগাঁয়ে বিজলীবাতি এসে পৌঁছায়িনি, সন্ধ্যার পর মায়েরা সন্তানদের বাইরে যেতে দিতেননা, শেয়াল বা হায়নাতে টেনে নিয়ে যাবে এই ভয়ে। বিষয়ী নীলমণি বাবু হুগলীর আরামবাগের কোনো এক অজ পাড়াগাঁয়ের বাসিন্দা হলেও বর্তমান নিবাস গড়লগাছা অঞ্চলে, ডানকুনি ইস্টিশানে নেমে দক্ষিণে ক্রোশ দেড়েক হেঁটে গেলেই ওনার বর্তমান গাঁ। বছর কুড়ি আগে যখন নীলমণি বাবু শুধুই নিলু ছিল, গোঁফের রেখা সবে স্পষ্ট হয়েছে , তখন থেকেই বিয়ের নানান সম্বন্ধ আসতে থাকে ইংরাজি জানা এই ছেলের জন্য। নীলমণি বাবু স্বভাব বিচক্ষণ মানুষ, উনি ওই সব সুন্দরী বা রূপসীদের ফাঁদে ভুলবার ছেলে ছিলেননা; কারন হালদার পাড়ার বিষ্টুদা কী সুন্দুরীটাই না বিয়ে করে এনেছিল, নীলমণি বাবু তখন সবে ষোলো বছর পেরিয়েছেন। তারপর সেই বৌঠানকে নিয়ে কত স্বপ্নটাই না দেখেছেন, মালোপাড়ার হরির ফুটফুটে নধর বৌখানি আসার আগ পর্যন্ত। বড় রাস্তার মোড়ের মাথার রসুল মিঞার দ্বিতীয় পক্ষের রূপের ছটায় নাকি কয়েক বছর ও পাড়ায় চাঁদ ওঠেনি লজ্জায়, এহেন সুন্দরীদের রুপও ৫টা বছর যেতে না যেতে ঝুল ন্যাতা হয়ে সুশলের মা পঞ্চীর মত হয়ে যেতে দেখেছিলেন তিনি। তাই রাসমনির সম্বন্ধটা যখন এলো তখন নীলমণি বাবুর মা বাবা সহ ছয় দাদার সকলেই এক বাক্যে মানা করে দিয়েছিল, কিন্তু নীলমণি বাবু ওর থেকে বছর সাতেকের বড়, পোড়া শোলমাছের মত গায়ের রঙ বিশিষ্ট রাসুকেই বিয়ে করবে বলে গোঁ ধরল।

অগত্যা, বাড়ি থেকে ত্যাজ্য হলেও স্ত্রী রাসমনি পিতার একমাত্র কন্যা হওয়ার দরুন অত্যান্ত খাতির যত্নে ঘরজামাই হিসাবে চলে এসেছিলেন নীলমণি বাবু, এই গরলগাছাতে। রাজকন্যার সাথে অর্ধেক নয়, গোটা সম্পত্তি। বাড়িতে ৭ ভাইয়েদের মধ্যে আগামীর কামড়াকামড়ি থেকে বাঁচতে ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা নীলমণিবাবু রাসমনির লক্ষ্যে তীর বিঁধিয়ে দিয়েছিল। যাকে বলে মণিতে মণি চেনা। ওদিকে রাসমনির পিতা গোমস্তা ধরণীধর বাবু গত একযুগের অনন্ত প্রচেষ্টার পর, সাক্ষাৎ মা কালীর অবতার রূপীনি বামন কন্যার জন্য, যখন এমন কার্তিক ঠাকুরের মত জামাই পেলেন, সেই খুশি ধরে রাখতে না পেরে উনিও অমৃতলোকের উদ্দেশ্যে রওয়া দিলেন স্ত্রী সাবিত্রীকে সবকথা সামনাসামনি বলবেন বলে, বিবাহ সম্পন্নের কিছুদিনের মধ্যেই। সেই থেকে এই বিশাল বাড়ির লাগোয়া, পুকুর বাগানের মালিক একা নীলমণি বাবু। আর মাত্র কটা বছর কাজ করে, তিনিও অবসর নেবেন, এমনই তার মনের ইচ্ছা।

নীলমণি বাবুর মাথা জোড়া কালচে চকচকে টাক, প্রত্যহ ক্ষৌরকার্য সম্পাদন করেন। কালো চামড়ার পাম্পসু, সাথে ‘সুধীরের ১২ হেতে শৌখিন’ ধুতিটা কাঁচা মেরে পরেন। খাটো পাঞ্জাবির উপরে চোপর বছর ধরে একখানি চটে যাওয়া কালচে সাহেবি কেতার কোট চড়ানো থাকে, যখন তিনি রাস্তায় বেড় হন। হাতের লম্বা বাঁটের ছাতাটা রোদ বৃষ্টির পাশাপাশি লাঠির কাজও করে বৈকি, সাথে কাঁধে থাকে একটা মোটা সুতোয় বোনা সবুজ ঝোলা ব্যাগ, যেটা ওনার ব্যাক্তিত্বতে একটা স্বপরিচিতি দিয়েছিল।

আশ্বিনের শেষাশেষি পুজোর ঠিক প্রাক মূহুর্তে আকাশের মুখ ভার করে টিপটিপে বৃষ্টি শুরু হয়ে আবহাওয়াটাকে বড় অস্বস্তিময় করে তুলেছিল। আপিসের অন্যান্য কর্মচারীদের বেতন, খালাসি মুটে মাল্লাদের বোনাস ইত্যাদি দেওয়ার চাপে ফুরসৎ টুকু মেলেনা এই সব দিনে। স্বভাবতই বাড়ি ফিরতে ভয়ানক দেরি হয়ে যেত। সাতটা পাঁচের ট্রেনে ইদানিং বাড়ি গেলেও এদিন রাত সাড়ে ন’টা বেজে গেল। ডানকুনিতে ট্রেনের শেষ স্টপেজ, কিন্তু ওনার মত যে গুটি কয়েক যাত্রী ট্রেন থেকে নামল, তারা সকলেই স্থানীয়।

তৃতীয়ার চাঁদ কখন যে উঠে ভোঁদরের মত মেঘের আড়ালে লুকিয়ে গেছে সেটা সম্ভবত কেউই জানেনা, বৃষ্টি বন্ধ থাকলেও গুমোট আবহাওয়াতে অন্ধকারের মধ্যেও একটা অস্পষ্ট নতিউজ্জ্বল আলোকরেখা ধরে পরিচিত পথে বাড়ির উদ্দেশ্যে পথ চলতে রইলেন। ষ্টেশন ছাড়িয়ে অনেকটা খোলা জমির পরে ভুশুণ্ডির মাঠ যেখানে তেপান্তরে মিশেছে সেখান থেকে মাগুরজলাটার শুরু। মাগুরজলা আসলে একটা দীঘির নাম, মস্ত বড় তার এলাকা। তার একপাড়ে বুড়ির থানের জঙ্গল, অন্যপাড়টা দিয়ে গড়লগাছার পূবপাড়া‍য় নীলমণি বাবুর ঘর যাবার রাস্তা।

আশেপাশের বেশ কয়েকখানা গাঁয়ের দু’ঘর বাসিন্দা যাদের সমাজচ্যুত করা হয়েছে মানে একঘরে করে রাখা হয়েছে, সেই মফিজ জোলা আর নিত্যানন্দ মুদি এই পাড়েই সরখেলদের বাঁশ বাগানের ভেতর বেওয়ারিশ জমিতে ঘর বেঁধে রয়েছে তাদের বালবাচ্চা নিয়ে। সেই পর্যন্ত নীলমণি বাবু পৌছাতেই কে যেন তার নাম ধরে ডেকে উঠল। নীলমণি বাবু কারোর সাতে পাঁচে থাকেননা, তাছাড়া ভিন গাঁয়ের লোক ঘরজামাই হয়ে এসে গাঁয়ের লোকের হক্কের বারোয়ারী হতে বসা সম্পত্তিতে ঘাঁটি গেঁড়েছে বলে ময়মুরুব্বিদের তেমন সুনজরে নেই সেটা উনি বিলক্ষণ জানেন। শুধু পয়সার জোরে নয়, মিষ্টি ব্যবহারের তিনি টিকে আছেন। সমাজ যাদের ধোপা নাপিত বন্ধ তেদের সাথে কথা কইতে কেউ দেখে ফেললে তার আর রক্ষে নেই, উনি হনহন করে পিছল রাস্তাতেও হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলেন।

মিনিট খানিকও হয়নি, আবার সেই ডাক এবারে আরো জোরে। কেউ একজন বলে উঠল- নীলমণি বাবু, আমার নাম ‘জাম জাম পাতাই’, কলুরু গ্রহ থেকে এসেছি, আপনার সাথে আলাপ করতে…।  নীলমণি বাবুর রোম খাঁড়া হয়ে উঠল, আশেপাশে নজর দিয়ে ভাবলেন তেনাদের পাল্লায় পরেছেন। রামনাম জমতে জপতে যেইনা ডানদিকে তাকিয়েছেন, অমনি তিনি দেখলেন বাঁশ বাগান যেখানে শেষ হয়ে মানকচু আর শ্যাওড়ার জংলার সাথে মিশেছে, সেখানে যেন গাঢ় লাল রঙের কয়েকশত হাজ্যাকের আলোয় সার্কাসের তাবুর মত কিছু একটা কেউ পেতেছে। নীলমণি বাবু বেমক্কা ঘাবড়ে গিয়ে ওখানেই দাঁড়িয়ে রইলেন, ভাবতে লাগলেন- ভূত কখনও আলো জ্বেলে তো কেত্তন করবেনা, ডাকাতও যদি হয় তারাও এমন আলোর রোসনাই জ্বেলে চোদ্দ গাঁয়ের লোককে জানান দেবে কেন! এরা তাহলে কারা? নীলমণি বাবুর শিরদাঁড়া দিয়ে হিমশীতল বরফের স্রোত বয়ে গেল। এমন বিদঘুটে নাম সে বাপের জন্মেও শোনেনি- বলে কিনা জাম জাম পাতাই, এমন কারো নাম হয়?

খানিক চোখ সয়ে যেতেই দেখলেন, ঠিক তার থেকে হাত দিনেক দূরে, একটা হাত দুয়েক লম্বা সবুজ রঙের জীব, যাদের পেটটা উপরের দিকে, আকাশ পানে পা দুইখান। তিনটে গোলগোল ভারী নিরীহ চোখ, সাথে মাটির দিকে মুখ করা কানদুটো যেন কেরোসিনের ফোদলের মত। দুই কানের মাঝে একটা এন্টেনার মত ছোট্ট আদুরে কালো সিং, যেটা নড়ছে মাঝেমাঝে। এরই নাম ওই জাম জাম পাতাই, নিয়নের বাতির মত সারা গাঁ দিয়ে সবুজ আভা ছিটুকে বেরোচ্ছে। নীলমণি বাবুরই তিন নাম্বার ভাই রিকিটগ্রস্থ বিশুকে ছোটবেলায় উল্টো করে দিলে যেমন লাগত, ঠিক তেমনই দেখতে এটাকে।

তারপর লিখবেন……  

আসাদুল্লাহ খান      

https://www.facebook.com/groups/jukti.tokko/2938164823076389

আসাদুল্লাহ ভাইয়ের লেখাঃ-

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *