গল্পের আত্মহত্যার গল্প

১)

ভীষণ রকম হতাশ হয়ে তিনকড়ি চাঁদ কুণ্ডু,

বিচ্ছিরি সিদ্ধান্ত নিল, যার নেইকো মাথামুণ্ডু;

নিরুদ্দেশে যাবে! নাকি করবে আত্মহত্যা!

কৌশল তার যাই হোক, সে রাখবেনা তার সত্তা।

ভাবতে ভাবতে দিন ফুরিয়ে রাতের পরে ভোর,

ফকির সাধুর আবাস হয়ে গনৎকারের দোর;

তাবিজ কবজ ঝাড়ফুঁকেতে হয়নি কোনো কাজ,

বাস্তুশাস্ত্র যোগবিদ্যাও মিথ্যা হল আজ।

প্রথম বারে বিফল চেষ্টা, রেল লাইনে শুয়ে,

শিরদাঁড়াতে হিমেল স্রোত, ভয়ের পালক ছুঁয়ে।

জলে ডুবে মৃত্য! অতি উত্তম। সাঁতার সাধল বাধ,

উঁচু উঠলে ঘোরে মাথা, তাই ভাবনাতে নেই ছাদ।

গলায় দড়ি, কী বীভৎস- জিভ বেড়িয়ে ভয়ানক;

বিষ খেয়ে যে ছটপটানি, সয়ে থাকা যায় কাঁহাতক!

মরতে তাকে হবেই, সে স্বপ্নে দেখে রোজ-

কিন্তু সেটা কোন উপায়ে! চলছে তারই খোঁজ।

২)

চক বাজারে মোড়ের মাথায় দশকর্মার টঙ,

তিনকড়ি চাঁদ কবিতা লেখে, ভাবনাতে নেই জং।

গাজন মেলায় ফি-বছরে সাজে শিবের সঙ,

নিন্মবিত্ত জীবনযাত্রা, হরেক রকম রঙ।

পুরুল্যাতে শ্বশুরবাড়ি, ললিতার বাপ ঘর,

পাল-পাবনে পাড়ার সভায়, তিনুর ভীষণ দড়।

খুকির বিয়ে শ্রীরামপুরে, জামাই দা-রোগা

খোকাটাই শুধু অকর্মন্য, ভীষণ পেট রোগা।

গিন্নির উপর বলবে কথা, এমন সাধ্যি নাই,

তার আদরে বাঁদর খোকা, বাপের হোটেলে খায়।

কাজের প্রশ্নে ধমকায় মাকে, বয়স ছুঁয়েছে পঁয়ত্রিশ;

কথার মাত্রা- ‘ঘর ছাড়ব, কিম্বা খাবো বিষ’।

আট কেলাসে তিনবার ফেল, অঙ্কে ভিক্ষাজীবী,

ইতিহাস জ্ঞান ভুগোলের খাদে, বিলাপের পৃথিবী।

বসলে টঙে করে চুরি, কুঁড়ের হদ্দ খোকা;

বাজার গেলে কানা দরবেশ, চারঅক্ষরের বোকা।

৩)

নির্বোধ ওই ছেলের দয়ায়, মুখ লুকানো দায়-

আজকাল নাকি পড়েছে প্রেমে, মাঝরাতে গান গায়।

ছেলের মা সে ভীষণ খুশি, আহ্লাদে আটখানা,

বিয়ে দিলেই দুদিন পরে ঘরভর্তি ছানা।

তিনকড়ি চাঁদ ভাবে, ‘ছেলের নেই কোনো রোজগার-

ঝোঁকের মাথায় করলে বিয়ে, বাড়তি পেটের ভার…’;

ছেলের জন্য করল মানত, ভক্তি বাড়ল দেবদ্বিজে,

দোকানে কম, থানে বেশি- শঙ্কিতভাব নিজে।

বহুকষ্টে জুটিয়ে চাকুরী, পাঠিয়েও ছিল বিদেশ;

গুণধর ছেলে বিভূঁই গিয়েও, ঝামেলা বাধালো বেশ।

বিপুল ঋণে পনবন্দি, ঘরে পাঠালো তার,

ভগিনীপতি ফন্দি বানায়ে, সে যাত্রায় ছার।

রাজনীতিতেও হয়েছিল শখ, মাস আষ্টেক আগে;

নধর পাঁঠা, চামচার দল- পেল তাকে বেশ বাগে।

নেতার পাপ মাথায় নিয়ে গণপিটুনির শিকার,

ডান পায়েতে রিঙটাল হল, মস্তিষ্কে বিকার।

৪)

বহু শখ করে ছেলের নাম, রেখে- ছিল ঈশ্বর;

নামার্থ আজ গঞ্জনা দেয়, বুকে এসে বাঁধে শর।

ঈশের প্রণয়ী মেয়েটির পিতা, দালালির কারবারি

বদমেজাজী, অতিশয় ধুর- টাকা আছে কাঁড়ি কাঁড়ি।

কীভাবে যেন পেয়ে সে খবর, ছুটলো তিনুর বাড়ি

ধমকি দিলো- ‘বোঝাও ছেলেরে- নইলে ভাঙব হাঁড়ি।

তারও পরে না শোধরালে ভিটেয় চড়াবো শকুন,

আমার মেয়ের ছায়া মারালে, বংশ করব খুন’।

নিখোঁজ হল ঈশ্বরচাঁদ, সাথী সেই দালাল কন্যা!

সালিস সভায় তিনকড়ি চাঁদ, বেইজ্জতির বন্যা।

ভিন জাতেতে করল বিয়ে! এত্তোবড় সাহস!

শত অপমানেও তিনকড়ি চাঁদ- মনে পায় পরিতোষ।

ছেলের মা’ও কেঁদে ভাসে, সান্তনা দেয় স্বামী;

সময় থাকতে মানুষ করলে, হতনা সে আসামী।

জামাই বলে- ‘সাবালক, তাদের নেইকো কোনো ভুল।

থাকবে তারা, আমরা কারা? সরাও মনের ঝুল’।

৫)

মোল্লা পাড়ার নিদান আসে, মুন্ডুটা চায় কুণ্ডুর;

টিকিধারীরাও সমানে-সেয়ানে, ধর্ম যাতনা ভরপুর।

দুটো মানুষ নিজের মত, বাঁচতে চাওয়ার অধিকার,

সমাজ নামের ব্যবস্থা কেন করবে সেটা ছারখার?

তিনকড়ি চাঁদ নিঃশ্বাস নেয়, বুকে নিয়ে এসে বল-

করবে লড়াই সমাজের সাথে, নয় সে যে হীনবল।

ওমা সেসব কোথায় কী! পাঁচটি দিন পরে-

গুড়গুড়িয়ে ঈশ্বর চাঁদ এলো একা ফিরে ঘরে।

বলল এসে-‘ভুলবশত ভুল ট্রেনেতে চড়ে;

ভুল জায়গায় পৌঁছে- ভয়ে, ধরেছিল তাকে জ্বরে।

অচিন গঞ্জে চিকিৎসা সেরে, ফিরতি রেলের গাড়ি,

দিবা-রাত্রি সফর শেষে, ফিরল যে নিজ বাড়ি।

দালাল বাবুর কন্যাটি শাদি, করেছে চাকুরীজীবীকে

ঈশ্বর চাঁদ বিফল মাকাল, নির্গুন সবই দিকে।

এমন ছেলের বাপ হয়ে বেঁচে থাকাটাও পাপ-

আত্মহত্যা বিধির বিধান, নেই তাই কোনো মাফ।

-সমাপ্ত

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *