ইস্কুলবেলা

পর্ব- ১

স্কুল জীবন নিয়ে স্মৃতিচারণ মূলক লেখা অকপট গ্রুপে সারম্বরে শেষ হয়েছে সদ্য, এবারে রেজাল্ট বেড়াবার পালা শুধু। আমিও লিখতে বসেছিলাম উপোরোক্ত সাহিত্যবাসরের জন্য, কিন্তু সে লেখার রেল ১৫ হাজারের শব্দ সংখ্যার কাছে চলে যাওয়াতে ওটা আর দিনের আলো দেখেনি। ওটা ছিল আমার কলেজ জীবনের একটা নির্দিষ্ট ঘটনা ও নির্দিষ্ট সময়ের বিষয়। অবশ্যই একটা বেদনাদায়ক প্রেমের বিয়োগান্তক পরিণতি। এটা আমার মাধ্যমিক স্কুল জীবনের সময়কার কয়েকটা বছরের কথা। লেখায় প্রতিটি চরিত্র স্বনামে আছে, কারো ক্ষেত্রেই বিড়ম্বনার কারন হবেনা এ লেখা। এরও পর কেউ যদি আঘাত পেয়ে থাকেন, মলমটা নিজেই কিনে লাগিয়ে নেবেন প্লিজ, কারন আমাকে প্রত্যেকেই চেনেন, চেনো বা চিনিস তো, মহা ত্যাঁদড়। আমার বড় মেয়ে সদ্য দশ বছরে পা দিয়েছে, আর বছর চারেকের মধ্যেই সে এগুলো পড়ে একটা ধারণা করতে পারবে তার পাপার সম্বন্ধে, পরবর্তী গুলোকে সেই বুঝিয়ে দেবে। তাই এটা আমার সরল স্বীকারোক্তি, আমার উত্তরপুরুষদের জন্য।

আমাদের জীবনকে ভাগ করলে দেখা যাবে, সবচেয়ে মধুর সময় কেটেছিল ইস্কুল জীবনটাই।  এটা প্রায় সকলেই একবাক্যে স্বীকার করবেন। তখন না থাকে কোন পিছুটান, মনে থাকেনা কোন টেনশন নামক মহামারী, খাওয়া পরার চিন্তা মুক্ত দিনাতিপাত। শীত গ্রীষ্ম বর্ষা কোনকিছুই আলাদা করে মনে রাখার দায় নেই, শত্রুতা মনে রাখার দায় থাকেনা বন্ধুবৃত্তের জীবনে। একটা মুচকি হাসিতেই বিনা কারনে বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। থাকেনা রাজনীতি আর ধর্মের কূটকচালির পাঁকে নিমজ্জিত ভাবনারা, সামাজিক ভালমন্দের অত দায় নিতে হতনা। কঠিন ভুল করে ফেললেও একবার ভ্যা… করে কেঁদে ফেল্লেই সব মাফ। জুতটা পালিশ আছে কিনা, জামা ইস্তিরি করা আছে কিনা, আয়নাতে কেমন দেখতে লাগছে, চুলের জন্য ছোট চিরুনি, পকেটে রুমাল, সানস্ক্রিন বা কোল্ড ক্রিম মাখা হয়েছে কিনা ইত্যাদির মত সকল মামলার উর্দ্ধ্বে। পকেটে একটা টাকা থাকলেই সেই দিনের জন্য ‘আমি’ই রাজা। বড় সুখের ছিল সে সময়।

হৃদয়ে যৌবনের রং লাগে নাকি হৃদয়ের রঙই যৌবনকে রাঙায়! এ তর্ক থাক, তবে যেটাই হোক বয়ঃসন্ধির পরেই যখন খুব একা একা লাগত, যখন চারিপাশে কত আত্মীয়স্বজন, তাও কেমন ফিকে বিস্বাদ হয়ে যাচ্ছিল জীবনটা। স্কুল, টিউশনি, খেলার মাঠ, হ্যারিকেনের আলোতে পড়তে বসার নামে কাঁচের গায়ে কালির প্রলেপ শিল্প দেখতে দেখতে ঢুলুনি, আর সেই ঢুলুনির পথ বেয়ে সাথে সাথেই পৌছে যেতাম কল্পলোকে। সেই কল্পলোক, যেখানে কোন এক নাম না জানা স্বপ্নচরী মুখের উপর এক অদৃশ্য মায়াপরশ ছুইয়ে দিত। বড় সুখ পেতাম সেই স্বপ্নে। চেষ্টা করতাম তাকে ছোঁয়ার, অস্থির ভাবে হাত বাড়াতাম। প্রতিবারই সে মিলিয়ে যেত স্বপ্নের মধ্যেই। “ওঠ ভাত খেয়ে নে” – মায়ের ডাকে তন্দ্রা কাটত, কিন্তু মনে রয়ে যেত সেই স্বপ্নের আবেশ। পরদিন স্কুলে, খেলার মাঠে, টিউশনিতে , পথে চলতে চলতে সারাক্ষণ মাথার মধ্যে থাকত সেই আগের সন্ধ্যায় দেখা স্বপ্নটা। কত খুজতাম আশেপাশে, যদি একঝলক তাকে দেখতে পায় মানুষের ভিড়ে এই আশাতে। বিফল মনোরথে দমে না গিয়ে প্রতিবারই নব নব উদ্যমে একই ক্রিয়ার পুনরাভিনয় চলতে থাকতে ঋতুর পর্যায়ক্রমে।

প্রেমিক হিসাবে আমি বরাবরই অতি উচ্চ ঘরানার। নিয়মিত প্রেমে পড়াই ছিল আমার নিয়তি। জানিনা সেগুলোকেই প্রেম বলে কিনা, আজও বুঝিনি। প্রেমিক হবার একটা মন ছাড়া সেদিন অবশ্য কিছুই ছিলনা। সেটা আজ বুঝলেও সেদিন এটুকুও জানতাম না। একসাথে বড় হওয়া প্রতিবেশি খেলার সাথী বান্ধবীদের কাছে গেলে তারা কেমন একটা দুরত্ব বজায় রাখতো। আমিও সেই সময় কেমন যেন অজানা কারনে দুরত্ব রাখতাম, মানে বাহ্যিক মন চাইত তাদের সাথে মন খুলে গল্প করি, কিন্তু অবচেতন মন থেকে একটা বাঁধা পেতাম। কাওকে পছন্দ হলেই কোনোরকম ভাবনা চিন্তা না করেই তার প্রতি মুগ্ধতার গাঢ় প্রলেপে জড়িয়ে চলাফেরা শুরু করেদিলাম, অন্য আরেকজনকে তার স্থানে প্রতিস্থাপন না করা অবধি। এ ই ভাললাগা ছিল বিশুদ্ধু, নিষ্কাম ও একতরফা, তাই কাউকে কৈফিয়ত দিতে হতনা, বিচ্ছেদের বেদনা থাকতনা, অওকাত নিয়ে প্রশ্ন তুলতনা- সবে মিলে এক্কেবারে উইন উইন সিচুয়েশনে দিনযাপন করা। স্কুলে টিউশনিতে সহপাঠিনীদেরকে হঠাত করেই কেমন যেন আমাদের বা আমার থেকে আলাদা বলে মনে হতে লাগল। এটা আরো মারাত্বক আকার নিল, যখন ক্লাশ নাইনে উঠলাম। আমাদের শারীরিক গঠন বদলে গেল খুব অল্প সময়ের মধ্যে; মেয়েরা স্কুলে গাঢ় সবুজ পাড়ের শাড়ি পরে আসত, বামদিকের সারির বেঞ্চ তাদের জন্য নির্দিষ্ট হল। আমাদের মধ্যে দু একজন ছাড়া কেউই ফুলপ্যান্টটুকু পড়ত না এর আগে অবধি, তবে মাস চারেকর মধ্যেই এক আধজন ছাড়া সকলেই ফুলপ্যান্ট বাবু হয়ে গেল অকারণে।

আমাদের মাঝে নরত্তোমের মত একআধ জনের দাড়ি গোঁফের জঙ্গল থাকলেও, আমাদের গ্রুপের প্রায় কাররোই নুন্যতম গোঁফের রেখাটুকু ছিলনা। নরোত্তম আজ আমাদেরই সমুদ্রগড় হাইস্কুলের শিক্ষক হয়েছে শুনেছি। আমি তো আবার এক কাঠি বাড়া ছিলাম, আমার মাথায় বাবুই পাখির বাসার মত এক ঝাঁকা চুল ছাড়া, ভ্রু তেও খুব কমই লোম ছিল। ক্লাস এইটে আমার ওজন ছিল সাতাশ কেজি। খুসখুসে চামড়ার নিকষ কালো রঙে চন্দন কাঠ ঘষলে সেটা নিমেষে আবলুস কাঠ হয়ে যেত। লম্বা ডিমের মত থুতনির হাড় বের করা মুখ। দুর্ভিক্ষের কবলে পরা কালাহান্ডি বা আমলাশোলের মানুষের মত পাঁজর বের করা শরীরের সাথে লটকে থাকা রিকেট রোগীর মত মানানসই চারপিস হাতপা। আমাজলের জঙ্গলে ছেরে দিলেই কোন একটা জংলীর দল, স্বজাতী বলে ঠিক নিজেদের দলে ভিড়িয়ে নিতই নিত। তার উপরে সম্বৎসরকাল সর্দি-জ্বর-পেটখারাপ-জন্ডিস ইত্যাদি রোগে ভোগার দরুন, হাতে পায়ে, মাজায়, গলায় মিলিয়ে কেজি দুয়েক মাদুলি, তাবিক, কবজ, শিকরবাকর ইত্যাদিও ছিল। এক কিম্ভূতকিমাকার দুপেয়ে জন্তু মনে হত নিজেকে।

এই বিশেষ প্রজাতির দেহগত বৈশিষ্টের দরুন, মনের ভিতর কখনই প্রেমের পাখি বাসা বাঁধেনি। অন্যকে দেখে ভাবনা এলেও, জন্ডিস, আমাশা আর ম্যালেরিয়া ভোগা জীবনে সে আত্মবিশ্বাস কখনই ফুসকুড়ির সাইজের চেয়ে বাড়তে পারেনি। তবে গাছে চড়া, সাইকেল চালানো, দৌড়ে পগার পাড়, বা গঙ্গাতে সাঁতার কাটতে আমার জুড়ি মেলা ভার ছিল। একই জীবদ্দশাতে আন্ডার ওয়েটে ও ওভার ওয়েটের সুফল ও কুফল খুব কম মানুষই পেয়েছেন। আক্ষরিক অর্থেই ঝড়ের সময় মা আশঙ্কায় থাকতেন, যে আমি সামান্য বেগের বাতাসেও হাওয়াতে উড়ে যেতে পারি। এমনই কেটেছে আমার কৈশরবেলা, আবার ফিরি স্কুলের ঘটনায়।   

ক্রমেই বুঝলাম, আমাদের মধ্যে কিছু তো একটা পরিবর্তন ঘটছে। আজকালকার অতিআধুনিক বাচ্চাদের মত আমরা মোটেই পরিণত বুদ্ধির ছিলাম না। আমি একা নয়, আমাদের তৎকালীন বন্ধুচক্রের প্রায় সকলেরই একই দশা ‘গ এ গোবর্ধন’। তিনজনের বাৎসরিক রেজাল্টের গুনে, রোলনাম্বার তাদের  ৬০ এর পরে হলেও আমাদের বাকি ৬ জন প্রথম ১০ এর মধ্যেই থাকতাম। অবশ্য তাতে আমাদের বন্ধুত্বের পথে সেটা কখনই অন্তরায় ছিলনা। তবে প্রথম হত মিঠুন গোস্বামী, আর ও ছিল আমাদের সকলেরই জাতশত্রু। ওই সিক্স থেকে নাইনের চারটি বছর- কত বাবা মা যে নিজের সন্তানকে মিঠুন বানানোর স্বপ্ন দেখত তার ইয়াত্তা নেই। আমাদের বিশেষ করে আমার বাবা মার কাছে কিছু চাইলেই একটাই কথা, আগে মিঠুনের মত রেজাল্ট কর, তারপরে ভাবব। তারপরে ভেবনা আমার পক্ষে যাবে না বিপক্ষে যাবে, এই সিদ্ধান্ত না নিতে পারার দরুন কখনই আর ক্লাসে মিঠুনের মত রেজাল্ট করা হয়নি, আমাদের কারোরই। বাড়িতে বোঝাতেই পারিনি যে মিঠুন ফুটবই খেলতে জানেনা, সাইকেল চালাতে পারেনা, ব্যাট করতে শেখিনি, যে ব্যাটাচ্ছেলে খেলোয়াড়দের নাম পর্যন্ত জানেনা- ওটা আবার মানুষ হল!!

পর্ব- ২

বাসু, নিমাই, সুবীর (এর আসল নামটা মনে আসলনা, তাই সুবীরই লিখলাম। কোনো বন্ধু যদি পড়িস এ লেখা অবশ্যই যেন কমেন্টে লিখবি এ কথা কমেন্টে) এই তিনজনই ক্লাস নাইনের হাফ ইয়ার্লির আগেই বাকি পরিচিত-অপরিচিত মেয়েদের সাথে দারুন সখ্যতা গড়ে তুলল। অপরিচিত মেয়ে মানে, পাশেই দুটো গার্লস স্কুলে ক্লাস এইট পর্যন্ত ছিল, নাইনে আমাদের ইস্কুলেই একসাথে এক ঘরে ক্লাস হত। ওদের মধ্যে বাসু, বাসুদেব দেবনাথ আদর্শ ভাই মার্কা রোগা পাতলা চেহারার। সে আজও তাই, স্কুলেরই কাছে একটা স্টুডিও করেছে সাথে জেরক্সের দোকান, যথেষ্ট প্রতিষ্ঠিত মানুষ। ভাই দ্বিতীয়ার বা রাখির দিনে সবাই অজানা শঙ্কাতে স্কুলে অনুপস্থিত থাকলেও বাসু ছিল বিন্দাস। নিমাই পাল বাসুর সাথে সাথেই থাকত। লম্বা কালো প্যাকাটি মার্কা চেহারা। চোখগুলো কোটরে ঢোকা, উষ্কখুষ্ক চুল। নিন্মবিত্ত চাষী পরিবারের সন্তান। মাঝখান থেকে ও কীভাবে যেন করে ক্লাসের অন্যতম সুন্দরী দীর্ঘাঙ্গী সোমার অতি ঘনিষ্ট হয়ে গেল। মানে টিফিনের সময় তারা দুজনে বকুলতলায় গিয়ে বসত, সোমার আনা টিফিন নিমাই লজ্জা লজ্জা মুখ করে খেত। কামরাঙা, পেয়ারা। বিলাতি আমড়াতে নিমাই ঠিক ভাগ পেতো। সোমার পরিবার পুর্ববঙ্গের বসাক, লাল ইস্কুলের মেয়ে। পৈতৃক তাঁত কাপড়ের ব্যাবসা, কাজেই হাতখরচের জন্য যথেষ্ট টাকা থাকত সাথে।

আমরা হা-ঘরে হাভাতের দল। পড়াশোনাটা কিছুটা মন দিয়েই করতাম, তবে প্রেম কী বস্তু তখনও জানিনা। বাড়ি থেকে প্রায় কিছুই টাকা পয়সা দিতনা। দাদুর কাছে চেয়েচিন্তে, আর দোকানের ক্যাশবাক্স মেরে যৎসামান্য যেটুকুই জুটতো, বিড়ি আর খেলার সরঞ্জামের চাঁদা দিতে অপর্যাপ্তই বাঁচত। সারাদিন সাইকেল চালানো, ক্রিকেট ফুটবল ক্যারাম নিদেনপক্ষে বর্ষায় তাসও খেলা হত বিনা বিরামে। এহেন নিমাই এর কাজকর্ম দেখে, একমাত্র ঈর্ষা জনিত কারনেই, ও আমাদের ঘোষিত প্রকাশ্য শত্রু রূপে চিহ্নিত হল অচিরেই।

ওদিকে বাসু, ভাই সেজে গোপিনীকুলের মাঝে লীলা করতে করতেই তার দিনমান ফুরসৎ থাকতনা। সুতরাং সে ও খুব অল্প সময়ের মধ্যেই, আমাদের দল থেকে প্রায় বিতারিতের দলে নাম লিখিয়ে ফেলল সাফল্যের সাথে। সুবীর বৈশাখি নামের এক মাসীমা মাসীমা সদৃশ্য মেয়ের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। বৈশাখী আমাদের থেকে নাহলেও প্রায় বছর পাঁচ-সাত বছরের বড়। ভারী পরিনত চেহারা, বুদ্ধিতেও পরিপক্ক। সুতরাং চোদ্দ পনেরোর সুবীরকে কেন সে পাত্তা দেবে? এদিকে সুবীরও নাছোড়বান্দা। রোজ চিঠি লেখে বৈশাখীকে, দামি কাগজে সুগন্ধ কালির কলমে। টিফিনে নারানদার দোকানের আলুকাবলি আচার এনে খাওয়ার জন্য সে কি সাধ্য সাধনা। মুনি ঋষিরা এর অনেক কম প্রচেষ্টাতে অপ্সরাদের কাছে ধরা দিয়েছে, কিন্তু বৈশাখী নট নরনচরণ। হুমকি নাকি দিয়েছে যে হেডস্যারকে বলে দেবে। স্কুলে দুলাল পালকে সরিয়ে ব্রজেন মাস্টারকে হেড মাস্টার করে দিয়েছিল, নিয়োগ সংক্রান্ত দুর্নিতীতে চন্দ্রজীৎ পাল নামের একজন অর্থনীতির শিক্ষক এসেছেন আমাদের স্থানীয় লোক। এই নিয়ে স্কুলে স্যারেদের অফিসে অশান্তি ছিল রোজকার পরিচিত ঘটনা, তাই ওসবে আমরা অভ্যস্ত ছিলাম। একবার তো বোমা চার্জ পর্যন্ত হয়েছিল দুই বিবাদমান গোষ্ঠীর মাঝে। কিন্তু এসব নয়, কোনো এক অজানা কারনে শেষ পর্যন্ত কোনদিনিই স্যারদের কানে সুবীরের কথা বৈশাখী তোলেনি। সুতরাং সুবীরকেও আমরা জেনেবুঝেই ত্যাগ করলাম।

গৌরাঙ্গ, শুভেন্দু নির্বিকার চিত্ত, ওদের এসব কিছুতেই কোন হোলদোল ছিলনা। বাকি ছেলেরাও পুজোর আগে আগেই কোন না কোন মেয়ের সাথে সখ্যতা স্থাপন করেনিল। রয়ে গেলাম আমরা হতভাগা জনা ছয়েক। এতে করে ফ্রাস্টু খেয়ে আমাদের দৌরাত্বপনা মারাত্বক হারে বেড়ে গেল। আমরা সমগ্র জুটিদের সামনে “দেখ কত ভাল আছি” গোছের দেখাতে দেদার খরচ করতে লাগলাম, চুরি করে জমানো হাতখরচার জন্য বরাদ্দ টাকা ওখানেই শেষ। সুতরাং খেলার ব্যাট বল, ফেদার র‍্যাকেট বা ফুটবল কেনার জন্য অগত্যা অভাবদোষে চুরি বিদ্যাতে হাত পাকালাম। তখনকার এক বিগোয়ান্তক ঘটনা হচ্ছে – ভোঁদা নামের এক বন্ধুর ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু, যা আজও মনটা ভারাক্রান্ত করে তোলে।

চোর হলেও অত্যন্ত বিনয়ী আর ভাবাদর্শ মেনে চলা ছিঁচকে চোরে রুপান্তরিত হলাম। সন্ধ্যায় স্কুলের নেপালী বাহাদুর, অন্যান্য দেশওয়ালি ভাইদের সাথে পাশের কোল্ডস্টোরের আড্ডাখানায় গেলে আমরা, সরাসরি খেলার মাঠ থেকে স্কুলবাড়ির ছাতের গা পাইপ আর কার্নিশ ধরে সোজা তিনিতলার বিল্ডিংএ। সবে নতুন ক্লাস রুম সাজানো হয়েছে, তাই এখনো ওখানে কোন ক্লাস হতনা। জানালা দরজার বালাই নেই, শুধু চেয়ার বেঞ্চি। এর পর গোটা দুয়েক বেঞ্চ সমবেত ভাবে ধরাধরি করে, উপর থেকে সোজা মাটিতে। আর মাটিয়ে পড়তে পড়তেই সেই বেঞ্চ উনুনে জ্বালানোর এক্কেবারে উপযুক্ত হয়ে যেত। এবার সেগুলোকে জড়ো করে সাইকেলের ক্যারিয়ারে বেঁধে সোজা ময়রার দোকানে কিলো দরে বেচে দেওয়া। তাতে গোটা দশেক ভিকি বা খান্না ক্যাম্বিস বলের দাম উঠে যেত, মানে দু হপ্তার দায়ে নিশ্চিত।

আমরা আমাদের প্রতিবেশিদের কাছে এখনকার ভাষায় ‘তোলা’ তুলতেও গেছিলাম। আমরা গ্রামের ছেলে, খেলার সরঞ্জামের জন্য মাসিক দশ টাকা চাঁদা চাই। বলাই বাহুল্য, এক দুজন ছারা প্রত্যেকেই চাঁদার বদলে বিচ্ছিরি ভাবে গালিগালাজ করেছি, সুদ হিসাবে বাড়িতে নালিশও করেছলে। সুতরাং, শোনবামাত্র আমাকে গোয়ালের খুঁটিতে বেঁধে, গোঁজ দিয়ে গনপিটুনির আয়জন সম্পন্ন করেছিল আমার মা। আমার সাথিদেরও ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে একই দশার শিকার হতে হয়। সপ্তাহখানেক লজ্জাতে বাইরে বেড় হয়নি কালশিটে দাগের লজ্জাতে। সেই ফাঁকে বাড়ির আশেপাশের পাখিদের বাসা খালি হয়ে যেতে লাগল। বাচ্চা ধরে এনে তাকে রেশনের চাল গম খাওয়ানোর ব্যার্থ প্রচেষ্টা, আর ডিম গুলো সিদ্ধ করে খাওয়া। এরকমই গোসাপের ডিম যে কত খেয়েছি তার ইয়াত্তা নেই। আমরা রাস্তার ধারের নতুন বাড়িতে থাকতাম, কয়েকশো পা হেঁটে গেলেই আড়াইশো বছরের পুরাতন কোঠা দালান বাড়িতে তখন দাদু ঠাকুবা ও তাদের ভাইদের বাস, বাস রাস্তার ধারের বাড়িতেও হলে একান্নবর্তী হেঁশেল তখনও ওই পুরোনো বাড়িতেই। বিশাল বাঁশ বাগান দিয়ে ঘেরা বাড়ির সামনে সারি সারি ধান, ডালের গোলা তার পর পুকুর।  শীতের দিনে যখন খেলা থাকতনা তখন সামুকখোল, বিদেশী বক যারা পুকুরের পাড়ের গাছে ডিম পাড়ত, সেগুলো দিয়ে আমার ফিস্টি হত দিনে বেশ কয়েকবার। যাই হোক, ওই গোঁজ ঠ্যাঙানির পর মনের মাঝে জ্বলে উঠে প্রতিশোধের স্পৃহা। সুতরাং সেই সকল কালপ্রিট প্রতিবেশীদের সবক শেখানোটা অবশ্য কর্তব্যে দাঁড়িয়ে গেল। সাথী হিসাবে আরো কয়েকজন পাড়ার ছোকরাকে পেয়ে গেলাম সরল ঘুষের বিনিময়ে। শুরু হল নতুন এক ধরনের দুঃসাহসিক অভিযান।

পর্ব- ৩

ফি সপ্তাহে বৃহস্পতি আর শনিবার নির্দিষ্ট টার্গেটের বাড়িতে সকলে পৌছে, তার বাড়ির নারকেল বা আম গাছ থেকে যাবতীয় সমস্ত ফল পেড়ে পরদিন সকালে এক বেপাড়ার দালাদের কাছে বেচে দিতাম। সেখানে থেকে প্রাপ্ত অর্থ থেকে, বাড়িতে বলার দরুন তিনগুন ক্ষতিপূরন সহ আমাদের চাঁদা, দশ টাকা মাথা পিছু আমাদের ৯ জনের মজুরী, বাজারে নিয়ে যাওয়ার ভ্যানভাড়া ফিক্সড ২০ টাকা সহ বাকি সমস্ত টাকা সেদিন সন্ধ্যায় দরজার ফাঁক দিয়ে গলিয়ে দিতাম। এর মধ্যে আমাদের ৯ জনের বাড়িও সামিল ছিল। কারন আমি বরাবরই সমষ্টিকে ব্যাক্তি স্বার্থের উর্ধ্বে স্থান দিয়েছি। ফল মাকড় না থাকলে, মাচার পাটকাটি, পালার খড়, এমনকি কয়েক জনের নধর পাঁঠাও সদগতি করে দিয়েছিলাম।

তবে আমরা আদর্শ নিয়ে চলা মানুষ, সুতরাং ও পয়সায় কেও একটা বিড়ি পর্যন্ত কিনে খাইনি। বিনয়ী আর ভাবাদর্শ গুন গত চোর। সকলেই জানত এগুলো আমাদেরই কান্ড, কিন্তু প্রায় সব বাড়িরই ছেলে আমাদের সাথে খেলত বলে কোনদিনিই ধরা পরিনি। তবে বেশ কয়েকবার তাড়া খেয়ে চম্পট দিতে হয়েছে, অন্ধকারে খানাখন্দ- জলাজঙ্গলে পড়ে গিয়ে গা-হাত ছড়েও ছিল। একবার তো আমি একটা দুতলা বাড়ি সমান নারকেল গাছে, ডাব পাড়তে উঠেছি, আর সেই গাছে ছিল পেঁচা। পেঁচার ডানা ঝাপটানিতে বাড়ির নেড়িটা বেদম ক্যাও ক্যাও জুড়ে দিল। নিচে যারা ছিল, তারা পাশের পানা পুকুরের নিরাপদ আশ্রয়ে আত্মগোপন করল, আমিও সড়াৎ করে নামতে গিয়ে, বুকের আর দু বাহুর সমস্ত ছাল বাকল নারকেল গাছেই ছেরে রেখে এলাম। সে রাত্রে বাড়ি ফিরে আর কৈফিয়ত দেওয়া যায়না, বাবা এলে ঠ্যাঙানি হবেই, ভয়েই অস্থির। বাবা আসার আগেই তেড়েফুঁড়ে জ্বর চলে এলো, সে যাত্রায় মানে মানে রক্ষে। পাক্কা দু সপ্তাহের রোগভোগের পর মামরিপড়া বুক নিয়ে মুক্তি। সেই আমার জীবনের শেষ চুরি, আর শেষ পরের গাছে চড়া। অবশ্য এর পর মন চুরিতে মননিবেশ করেছিলাম।

অবশ্য মাস আটেক পর কারেন্ট আসার পরপরই এই অভিযানের পরিসমাপ্তি ঘটে। ব্যাক-টু আবার স্কুল। এবার আর বেঞ্চ নয়, এবার বাল্ব। একটা বাল্ব খুলে বেচলে দু’টাকা পাওয়া যেত, যদিও নতুনের দাম পাঁচ টাকা। গোটা দশেক বাল্ব বেচলেই দু হপ্তার কাজ কমপ্লিট। অবশ্য অন্য স্থান থেকে আনা বাল্ব ভাঙা ওখানে কিছু ভাঙ্গা কাচ ছিটিয়ে দিতাম, যাতে মনে হয় কোন নিওশাচর পাখীর কাণ্ডকারখানা। দেখতে দেখতে মাধ্যমিক এসে গেল। বাড়ি থেকে বেড়োনো প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। সকল অভিযানের ওখানেই পরিসমাপ্তি ঘটল।

শর্ট হাইট আর ওই কয়েক কেজির শরীরটার জন্য যথারীতি মাধ্যমিকের সেন্টার থেকে বেড় করে দিল প্রথমদিন শুরুতেই। এটুকু বিড়ম্বনা ছাড়া প্রায় নিরুপদ্রপেই মাধ্যমিক দিলাম। তারপর তিনি মাসের অনন্ত ছুটি রেজাল্ট বের হওয়া পর্যন্ত, ভেবেই ছিলাম আবার পুরাতন সাথীদের সাথে পুরাতন জগতে ফিরত যাব, কিন্তু ললাট লিখন অন্য ছিল। বাবা কান ধরে হিড়হিড় করে সাথে করে দোকানে নিয়ে যাওয়া বাধ্যতামূলক করলেন। আনুষ্ঠানিক ভাবে আমার কর্মজীবনের সূচনা ঘটল শিক্ষানবিশি মালিক রূপে। এরপর কিছুদিন নিরস কাটলেও, সপ্তাদুয়েক পর থেকেই ওটা অভ্যাস হয়ে গেল। কোথা দিয়ে যে তিনটে মাস কেটে গেল বুঝতেই পারলামনা। যথারীতি সময়ে রেজাল্ট বেড় হল। রেজাল্ট দেখে বাবা-মা অত্যন্ত হতাশ হলেন, তারা বোধহয় ভেবেছিলেন তাদের সন্তান বাংলায় প্রথম দশে থাকবে। তবে আমার প্রাপ্ত নাম্বারের দরুন, প্রতিবেশী সহপাঠিগনের অবিভাবকদের ঈর্ষার কারন- বাবা মায়ের সে দুঃখ কিছুটা লাঘব করেছিল। উল্লেখযোগ্য ভাবে আমি সেই… মিঠুনের থেকে অনেকটাই ভাল রেজাল্ট করেছিলাম।

ওই স্কুলেই ভর্তি হলাম, ইচ্ছাছিল সাহিত্য নিয়ে পড়ব। বাবার ইচ্ছা ছেলে বিজ্ঞানি হোক, মায়ের ডাক্তার। কিন্তু ছেলে জানে তার অদৃষ্টে উন্মাদ হওয়া লেখা আছে। অনেক দড়িটানাটানির পর বাবা মায়ের মিলিত ইচ্ছার প্রকোপে বিজ্ঞান বিভাগেই ভর্তি হলাম এক কাকার চক্করে। পুরাতন বন্ধুদের একজনই আমার সাথে, সাইন্সে ভর্তি হল প্রদীপ। বাকি সকলই অপরিচিত ছেলেমেয়ের ভিড়ে আর একজনই পরিচিত, সে হল গৌরাঙ্গ।

স্কুলেরই এক শিক্ষকের কাছে সন্ধ্যাবেলা অংক শিখতে যেতাম। তিনি আবার বনেদী পরিবারের সন্তান, স্কুলের পাশেই বাড়ি। সেই পুরাতন আমলের ঢাউস কড়ি-বরগার ঘরদোর। আমি ছাড়া আর তিনজন পড়ুয়া সহপাঠি ছিল। ক্লাস টুয়েলভের পাত্রদা, শ্রীরুপাদি, আর স্যারের দাদার পালিতা কন্যা। বড় দুজন দাদা দিদি, তারা ও আমি সর্বদাই নিরাপদ দুরত্ব বজায় রাখতাম। আমার কথা বলার কেওই থাকতনা। একাই পড়াশোনা করে বাড়ি ফেরা, এটাই রুটিন। স্যার এলে তবেই ওই অপরিচিতা মেয়েটি স্যারের পাশে এসে কেরোসিন বাতির কাছে মুখ ঝুকিয়ে একমনে পড়তেন। দিনে কখনই তাকে দেখিনি।

ওই কেরোসিনের আলোতেই দেখতাম, আমার চেয়েও অল্প বয়সী এক মেয়ে এক মনে পড়াশোনা করে চলেছে। কেরোসিনের বাতির মৃদু আলোক যেন ওই লাবন্যকে মোহময়ী করে তুলেছে। ধীরে ধীরে জানলাম ও ক্লাস এইটে উঠেছে সবে। নামটা জানলাম অভিশ্রী। আমার যাবতীয় লৌকিক চিন্তাধারা যাবতীয় আবর্তিত হতে থাকল ওই মৃদু আলোকে দেখা একটা বালিকার মুখচ্ছবিকে ঘিরেই। উথালি পাথালি মনের গলিঘুঁজিতে ভাবনার জোয়ারভাঁটা খেলে যেতে লাগল নিয়মিত, বয়ঃসন্ধির সময় হরমোনের কার্যকলাপ সম্বন্ধে তখন সামান্য কিছু পড়লেও তা আর কতটুকুই বা বুঝতাম। ভালবাসার কোনো শিক্ষক হয়না, প্রথাগত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করার বিকল্পও নেই। প্রতিটি আলাদা মানুষের পরিবেশ পরিস্থিতি আলাদা আলাদা, তাই একই বাড়ির দেওয়ালের অন্যপ্রান্ত হলেই ভালবাসার চরিত্র বদলে যায়। প্রতিটা বুকে ভালবাসার স্রোত সম্পূর্ন তার নিজের মত করে, যেটা কখনই আরেকজনের সাথে হুবহু মেলেনা মিলতে পারেনা। তাই প্রেমের অনুভূতির প্রতিটা মুহুর্তকে কোনো কবি বা উপন্যাসিকই ঠিক ‘আমার মত করে’ ধরতে পারেনিনি, অবকাঠামোগত ভাবে যে বর্ননাগুলো লিখে গেছেন সেই ‘কমন’ গুলো পাওয়ার দৌলতেই আমরা মাতোয়ারা হয়ে যায়। উপলব্ধিতে রাজার ছেলের চেয়ে অনেক ধনী হতেই পারে ফকিরের ছেলে। হয়ত তার প্রেমটা কোনো রাজকন্যার সাথেই, বা ভাবনাতে সাধারণকে রাজকন্যা বানিয়ে নিয়েছে। এখানেই প্রেমের জয় যেখানে কল্পনারা স্বাধীন। সে যাই হোক আবার আমিতে ফিরি, কিছুদিন পর আমার অবস্থা এমন দাঁড়ালো, যে শুধু মাত্র ওই মৃদু আলোকের রূপ দর্শনের জন্যই পড়তে যাওয়া হয়ে গেল, পড়া তো ছুতো। সে অবশ্য ততোদিনে কোনোদিনিই আমায় একবারের জন্যও দেখেছে বলে মনে হয়না। আমার মনে হতে লাগল, এ ই তো সেই , যাকে আমি সেই কৈশরের সূচনালগ্নে, সন্ধ্যার ঢুলুনির ঘোরে যে মায়াবিনিকে দেখতাম, সেটা তো এরই মুখচ্ছবি। একেই তো আমি হন্যে হয়ে পথেঘাটে খুঁজে চলেছি অহর্নিশ। সারাদিনিই একটা স্নিগ্ধ আবেশের ঘোরে থাকতাম ওই সন্ধ্যার প্রতীক্ষাতে। যেখানেই কোনো প্রেমিক যুগলকে দেখতাম, সেখানেই ওই হ্যারিকেনের অনুজ্জ্বল বাতির চ্ছটায় দেখা ছোট্ট কিশোরীর মুখশ্রীটা দেখতে পেতাম, অদ্ভুত একটা ভালোলাগা আমাকে গ্রাস করত।

একটা একটা করে দিন গড়ায়, ওই ভাললাগাটা ক্রমে নেশায় পরিণত হয়ে গেল, পরে মহামারীতে। তাকে নিয়ে কত রংবেরঙের স্বপ্ন দেখা শুরু হয়ে গেল, অপর প্রান্ত নিশ্চিন্ত নির্বিকার। এরই মধ্যে সময় অসঙ্কুলান জনিত কোন কারনে বড় দুই সহপাঠী দাদা দিদি সকালের ব্যাচে চলে যাওয়াতে অপ্রত্যাশিত ভাবে উন্মুক্ত ২২ গজ পেয়ে গেলাম দৌড়ে রান নেওয়ার জন্য, আমি সম্পূর্ণ একা। তাতে করে আমার কল্পলোকে বিরাজ করতে আরো সুবিধেই হল। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটাতে স্যার যেতে বললেও আমি সেই পাঁচটা থেকেই স্যার বাড়ির আনাচে কানাচে ঘুরঘুর করতাম, যদি দিনের আলোতে মুখটা দেখা যায় সেই আশাতে।

পর্ব- ৪

এমনই একদিন, তখন আমি স্যারের বাড়ির প্রায় বাতিলের খাতায় নাম লেখানো, একটা কালিমাখা কাঁচের হ্যারিকেন নিয়ে কিছু একটা ভাবছি, হঠাৎই মিহি অচেনা সুরে অন্ধকার বলে উঠল- “আজ ছোটকা বাড়ি নেই”। আমি আচ্ছা বলে বাইরে যাব, মনে এল কে বলল এ কথা? দ্রুত আবার ঘরে ঢুকতে গিয়ে সামনা সামনি ধাক্কা অন্ধকারে। মা গো বলে, একটা মেয়েলী কন্ঠের চিৎকার শুনে বাড়ির অন্যান্য মহিলারা ছুটে এলেন। আলো আসতে দেখলাম- সেই রূপসী। মাথায় একটু জল টল দিয়ে দিল স্যারপত্নী, সেদিন এক অজানা ব্যাথা নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। প্রথম ছোঁয়ার যে কি আনন্দ, কি যে সুখ- যে ছুঁয়েছে কেবলমাত্র সে ই জানে। সারারাত সেদিন ছাদে ছিলাম। এমনিতে মশারা আমার সন্ধান পেলে পৃথিবীর সকল কিছুকে অগ্রাহ্য করে আমাকে কামড়ানোই তার জন্মের একমাত্র কারন ভেবে নেয়। কিন্তু মশারীতে আমার আরেক সমস্যা, ওখানে ঢুকিয়ে দিলে মনে হয়- কেউ যেন আমার টুঁটি টিপে ধরেছে। আজও আছে এই রোগ, সেদিনও ছিল। কিন্তু জীবনে সেই প্রথমবারের জন্য আমার মনে নেই মশারা আমাকে কামড়ে ছিল কিনা, প্রতিটা তারার মাঝে আমি অভিকে খুঁজে পাচ্ছিলাম, শিহরিত হচ্ছিলাম মুহুর্মুহু। সেদিনিই বিকালে তার স্কুলের খোঁজ পেয়েছিলাম, অতএব আমার কাজ বাড়ল।  

পরদিন আবার সন্ধ্যা ছটাতে হাজির। যথারীতি বাড়ির কাজের মাসি হ্যারিকেন সাপ্লায় দিয়ে গেলেন।খানিক পরেই – “এ্যাই, কাল আমার স্কুলের সামনে ঘুরঘুর করছিলে কেন”? আমি চমকিয়ে দেখি, মোহময়ী। আমি বিচ্ছিরি লেভেলের থতমত খেয়ে বললাম,

– ইয়ে, না- মানে এমনিই। আমি তো ওই রকমই ঘড়ে বেড়ায় ( মন চাইছে, আমি শুনেই যায় আর সে অনন্ত কাল জুড়ে ওভাবেই আমাকে শাসনের ঢঙে জিজ্ঞাসা করতে থাকুক। পৃথিবীর অন্ত পর্যন্ত ওই জিজ্ঞাসা যেন শেষ না হয়…)

– এমনি মানে কী? ওই কতগুলো নচ্ছার ছেলেদের সাথে ঘোরাঘুরি! ছোটকাকে বলব?

– না মানে ওরা তো আমার বন্ধু, একসাথে পড়ি…

– ম্যা গো, কি বন্ধু ছিরি। সব কানকাটাদের দল। আমদের দেখে সবকটা সিটি মারে-

– আমি তো কখনও কাউকে দেখে সিটি মারিনি

– তুমি সিটি মারবেটা কীভাবে শুনি, ওই তো শরীরের ছিরি, সিটির হাওয়াতে প্রানটাই না বেড়িয়ে যায়। জঘন্য…

আমি পেশাদার সিটিবাদক, বাকিরা আমারই শিষ্য তাই ইচ্ছা হচ্ছিল আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে একটা সিটি দিয়ে আমার আত্মাকে অপমানিত করার শোধ নিই। কিন্তু এমার এতেও যেন মনে শান্তির উড়োজাহাজ ল্যান্ড করল। কিন্তু আমাকে কিছু বলার সুক্সোগ না দিয়েই সে আবার তিন লাফে দোতলায় উঠে গেল। মা ছাড়া অন্য কোন মহিলা এতটুকুও শাষনও করেনি কোনোদিন আমায়, কক্ষনও নয়। মাসী নিঃসন্তান, একতরফা বাঁদর তৈরির আদরের আখারা ছিল সেটা, পিসিদের সাথেই আমি রাত্রে শুতাম। ওরা সারারাত হাওয়া করা, সুড়সুড়ি দেওয়ার কাজ করত, শাসন করেনি। এমনকি আমার বোনও আমার বিরুদ্ধে যেতনা, অন্তত প্রকাশ্যে। আমরা এমনিই কোন কারন ছাড়া বিভিন্ন স্কুলের সামনে দলবেধে সাইকেল নিয়ে যেতাম। রাত্রে শুয়ে এটুকু বুঝলাম, স্কুলের ওতো দূর থেকেও ও আমাকে নজরে করেছে। ব্যস, আর আয় কোথা- এটা ভেবেই আমার সারা শরীরের রোম খাড়া হয়ে গেল।    

এর পর থেকে আমি যাওয়ার খানিক পরেই একটা পরিষ্কার কাঁচের বাহারি ডিমলাইট নিয়ে আমার সাথে এসে যোগ দিতে লাগল সেই অপরূপা। স্যার আসত প্রায় আটটার সময়, আমার তো লটারি লেগে গেল। এমন ভাবে একমাসেই একটা সুন্দর বন্ধুত্ব তৈরি হয়ে গেল। তখনও আমি তাকে দিনের আলোতে কখনো দেখিনি, তাই জানতামই না সে কালো না ফর্সা, লম্বা না বেঁটে, আদতে সুশ্রী না কুৎসিত। লাভের মধ্যে স্যারের প্রিয় পাত্র হতে চাওয়ার দরুন রিলেশন-ফাংশন, বীজগনিত-ক্যালকুলাস, ত্রিকোণমিতি- ভেক্টর- প্রোবাবিলিটির অনেকটা শিখে গেলাম কীভাবে সেটা আজ বুঝতে পারি। গোটা সময়টা জুড়ে এটাই লাভ, নতুবা আধুনা সরকারি স্কুলে শিক্ষিকার পদে যোগদেওয়া আমার বোনের মত অঙ্কে ‘জিরো’ পেতাম। সে যাই হোক- একদিন হঠাত সেই রূপসী বললো- “আজ আমাদের স্কুলে বিজ্ঞান মঞ্চের বাস আসবে, তাতে নাকি নানা ধরনের দর্শনীয় জিনিসপত্র থাকবে। যাবে”? আমি শুধালাম-

– আমাকে এল্যাও করবে?

– হ্যাঁ, কাল বন্ধুদের এলাও আছে। তবে একটা কথা, এখানে আসবে না। আমি বাসস্ট্যান্ডে থাকব, তুমি ওখানে এসো, তারপর একসাথে যাবো।

সর্বনাশের শুরুটা এখান থেকেই। ওর বাড়ি থেকে ওদের স্কুল প্রায় ৮-৯ কিলোমিটার দূরে, পৌরসভা এলাকায়। সত্যি বলতে সে রাত্রে আমি ঘুমাতেই পারিনি। এই প্রথম কোন মেয়ের যাচা নিমন্ত্রণে কথাও যাব, এর আগে আমার বহুবার যেচার শখ হয়েছে হয় সাহসে কুলায়নি নতুবা প্রত্যাখ্যিত হয়েছি। সুতরাং, সারা পৃথীবির যাবতীয় সুখের ঘোরে ডুবে গেলাম আমি। বুঝতেও পারছিনা এটাই প্রেম কিনা! আবার কাওকে শুধাতেও পারছিনা। এক দমবন্ধ সুখানুভুতি। আগেই বলেছি, চোষা ডাটার মত আমার চেহারা, যে পোষাকই পরিনা কেন, ঠিক মর্কটই লাগে। খুব ভাল মনে আছে, একটা ফুলহাতা ইস্ত্রি না করা জামা সেদিন গুজে পরেছিলাম। ঘরের পারফিউম মাখলে সে নানা কৈফিয়ত, তাই কাকিমার কাছ থেকে লুকিয়ে সেন্ট নিতে গিয়ে, কাকার একখানি বেল্টও পেয়ে গেলাম।

হুশ করে সাইকেল চালিয়ে সোজা বাসস্ট্যান্ড। উত্তেজনায় আমি তখন রোবট, দেখি কেও কোত্থাও নেই। মনটা খারাপ করে প্রায় এক ঘন্টা বিড়ি ফুঁকে ফুঁকে অস্থির হয়ে যাবার পর এক্কেবারে বিধ্বস্ত ভাঙ্গা মন নিয়ে যখন ফিরে আসব বলে সাইকেলে চড়ছি, হঠাৎ সামনের বাস থেকে চিৎকার।

– ওই… দাঁড়াও দাঁড়াও?

– আমাকে বলছেন?

– তো আর কাকে বলব, হুনুরাম

ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম, হনুরাম আমাকে কেউ বলেনা। রাগ করব কিনা সে সিদ্ধান্তও নিতে পারছিনা। ক্ষানিক বাদেই, বাস থেকে কালো ফ্রম আর গোলাপী একটা টপ পরে একটা বছর তের চোদ্দোর মেয়ে সামনে দাঁড়ালো। কোথায় যেন দেখেছি একে মনে করতে পারছিনা। ভীষণ ফর্সা হাতপা, গাল দুটো পুরো গোলাপী; যেন টোকা দিলে রক্ত ঝড়বে। হাতের গলার নীল শিরা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, ঠিক বিদেশী পুতুলের মত নাকচোখ। বয়সে তুলনায় বেশ লম্বা চওড়া। জুলফির লোম অনেকটা নিচে পর্যন্ত নেমে এসেছে, চোখের চাওনি এক্কেবারে আমার চোখ লক্ষ্য করে তাক করা, ফালাফালা সে দৃষ্টি।

আসলে মনটা এমনিতেই ভারাক্রান্ত। এমনিতেই আজও সরাসরি মেয়েদের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারিনা, সেদিন তো আরো, আড়চোখে ওই টুকু দেখে নিয়ে শুধালাম, কিছু বলবে?

– নেকু, কিছু বলবে! তোমার নাম কি?

– আমি বেশ আশ্চর্যের সাথে বললাম- নাম জানো না আবার কী দরকার?

– বেশ বোলোনা, রাত্রে যেন আর আমার সাথে কথা বোলোনা।

কথাগুলো এবার আমার মনখারাপের ঘোর কাটিয়ে বাস্তবের সামনে নিয়ে এলো। এবার চিনতে পারলাম, এ তো সেই অন্ধকারের লাবন্যময়ী। সে বেশ জোরের সাথে বলল- কি হল?

– আসলে আমি ঠিক তোমায় চিনতে পারিনি, মানে কোন দিন দিনের আলোতে দেখিনি তো, তাই…

এক নিঃশ্বাসে কথাকটা বলেই থামলাম।

– থাক আর মস্করা করতে হবেনা। এমা, এটা তো বাথরুমের পাশে দাঁড়িয়ে আমরা, চলো ইস্কুল পানে যাওয়া যাক।

আমি মন্ত্রাবিষ্টের মত ওর পিছন পিছন সাইকেল সহ চলতে লাগলাম।

– আচ্ছা, কুড়ে তো তুমি, সাইকেল থাকলে আমরা হাঁটছি কেন!

আমি বললাম ঠিক আছে তুমি চালাও, আমি হাঁটছি। একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে, সাইকেলের সামনের রডে চড়ে বসল। অনুভব করলাম ওর শিরদাঁড়া বেয়ে ঘাড়ের কাছ দিয়ে কেমন একটা মাতাল করা সুমিষ্ট গন্ধ আসছে ফেরোমনের গন্ধ। চুলগুলো হাওয়াই উড়ে আমার মুখচোখ ছুঁয়ে সুড়সুড়ি দিয়ে যাচ্ছে, আমি ক্রমেই নিস্তেজ হয়ে পড়ছি। আমার সারা শরীর কাঠ হয়ে গেছে, শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা হিমেল স্রোত বয়ে চলেছে। কেও যদি দেখে ফেলে কি হবে এই ভাবনাতেও আমার হার্ট ফেল করার দশা। ওর গলার ডানদিকে একটা ভিমরুলের সাইজের কালো মাংসপিন্ড ছিল, যেটা ওই ফর্সা শরীরে ভীষণ ভাবে চোখে আঁটকাচ্ছিল; শুধাতে বলেছিল ওটা জুড়ুল- ব্যাস। এর পর ঠিক কি কথা বার্তা বলেছিলাম মনে নেই আমার।

পর্ব- ৫

স্কুলের গেটে ঢুকতে গিয়েই দেখি আমার নিজের বোন অদূরে, খুড়তুতো বোন সহ ওদের বান্ধবীদের পুরো টিম যথারীতি হাজির। ওই সামনেই বিজ্ঞান মঞ্চের ঢাউস খান দু-তিন বাস দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওমা আর দু-পা যাবার সাথে সাথে দেখি আমার মা ও এসেছেন বোনেদের গার্ড হয়ে। আর কী আমি এলাকাতে থাকি! তিন লাফে প্রায় টেনে হিঁচড়ে ওকে নিয়েই নিরাপদ দূরে এসে বললাম- তুমি যাও আমি কোনমতেই স্কুলে ঢুকবনা, কারনটাও বললাম। সে বলে গেল- খানিক দাঁড়াও, যাব আর আসব। পালিয়ে যেওনা যেন।

আমি একটা ময়রার দোকানের বেঞ্চিতে বসে ভাবতে লাগলাম, এ কি ওই মেয়েটাই? পৃথিবিতে কেউ এতো রূপসীও হতে পারে? কীভাবে সম্ভব! ওর পাশে নিজেকে এক ড্রাম দুধে একটা মাছি মরে পড়ে আছে মনে হচ্ছিল, ওর রূপচ্ছটায় সূর্যকেও সেদিন ম্লান লেগেছিল আমার।           

আসি যায় ক্লাস করি, মোটকথা পড়াশোনাতে কেমন একটা গা ছাড়া ছাড়া ভাব আমাকে ঘিরে ধরল। আরো মাস দুয়েক কাটার পর আমি মোটামুটি বাবার আস্থাভাজন হয়ে উঠলাম ব্যবসাতে, যদিও গালি খাওয়ার পরিমান বহুগুন বেড়ে গেছিল সেই অধ্যয়ে। মাধ্যমিকের আগে বাবাকে দেখলেই তার সামনে থেকে পালাতাম, রাশভারী মানুষ, সপ্তাহে কদিচ কদাচিৎ মুখোমুখি হতাম। এখন তো পড়াশোনার সময়টুকু ছাড়া প্রায় সর্বক্ষনই পিতৃ সহচর্যে। ইতিমধ্যে বোন কিছুটা বড় হওয়াতে ও মায়ের অনেক কাছাকাছি চলে এসেছিল। ব্যাবসার গদিতে বসার দরুন পয়সার অভাব মিটে গিয়ে, ব্যাক্তির যোগ্যতার তুলনায় অপ্রতুল টাকা থাকত পকেটে। খেয়াল করলাম টাকা আসার সাথে সাথেই সেই ক্লাস সিক্স-সেভেন-এইটেই ইচ্ছা গুলোও মরে গেছে । তখন ভাবতাম যেদিন টাকা রোজগার করব, সেদিন ব্যাটা তোর গোটা ঘুগনির গামলাটাই কিনে নেব ‘নারাণ’। অথচ মাত্র তিন চার বছরের ব্যবধান, পকেটে বাজেটের অতিরিক্ত টাকা আছে, অথচ সামনের বাচ্চা বাচ্চা ভাইগুলোর ‘কাকু আমাকে দাও, কাকু আমাকে দাও’ করে অধৈর্য চিৎকার ডিঙিয়ে একপ্লেট ঘুগনি খেতে পারিনি একদিনও। মানুষের মনস্বত্ত্বের এ এক অদ্ভুত পরিহাস।

সময় দ্রুত বদলে যাচ্ছিল, দেশের উন্নয়নের পালে বিশ্বায়নের হাওয়া লেগেছে বলে চতুর্দিকে শুনতাম। সেটা প্রতক্ষ্য পরিলক্ষিতও হচ্ছিল সমাজের সর্বস্তরে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি আর যোগাযোগ ব্যাবস্থা উন্নত হতে শুরু করার দরুন সহজে কাঁচা টাকার আমদানি শুরু হয়ে গেল এলাকাতে। সাধারনত গরীব গ্রামাঞ্চলে যেমনটি হয়ে থাকে, অধিকাংশ সহপাঠীই “অনেক পড়াশোনা হয়েছে,” ভেবে নিয়ে টাকা রোজগারের তাগিদে জীবনযুদ্ধে নেমে পরল। সুতরাং হারাধনের অন্তিম কয়েকটি সন্তান রূপে আমরা কয়েকজন টিমটিম করে টিকে রইলাম গোটা এলাকায়।      

তখন বাবার দুটো মোটর সাইকেল, একটা বাজাজ M-80, আরেকটা পানাগড় থেকে কেনা ‘সেকেন্ডহ্যান্ড’ আর্মির জাঁদরেল বুলেট। ওই ভারী বুলেট সামলানো আমার কম্ম ছিলনা, যদিও শখের অন্ত ছিলনা। যাই হোক, তখন মাঝে মাঝে মা কে পটিয়ে, বাবার অনুপস্থিতিতে ওই M-80 নিয়েই স্কুলে যেতে লাগলাম। কিছুদিন পর ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে গেলেও বাবা আর উচ্চবাচ্য না করার দরুন, ওই M-80 একপ্রকার আমারই হয়ে গেছিল। কিন্তু বুলেটর প্রতি একটা তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল। আজও সেই মোটর সাইকেলের বিলাসিতা আমি কাটিয়ে উঠতে পারিনি, সেই শখ ২০১২ থেকে চুটিয়ে পূর্ণ করে চলেছি।  

ধীরে ধীরে ইলেভেনের ক্লাস শুরু হয়ে গেছিল, কঠিন সময়। ততদিনে আমার প্রথম প্রায়োরিটি হয়ে উঠেছে প্রেম, ও সমান তলে ব্যাবসা। সারাদিন ব্যাবসা সংক্রান্ত নানান কাজকর্মের ফাঁকে সময় পেলে তবেই পড়াশোনা। এই প্রত্যক্ষ ব্যাবসাতে থাকার কারনে আমার মনস্তত্বেরও চরম পরিবর্তন খেয়াল করছিলাম। খেলাধুলার পাঠ প্রায় ডকে উঠেছিল, আড্ডা মারার সময় ছিলনা। তাছারা সব থেকে বড় কথা তখন হাতে হঠাৎ করে লক্ষীর ঝুলি খুলে গিয়ে শখ গুলো সব বিভিন্ন দিকে মোর নিয়ে নিল, যেগুলোর ভাবনা একবছর আগে মাথাতেও ছিলনা। যেমন তখন সবে স্পাইস মোবাইল কোম্পানি উঠেছে, কোলকাতা ছাড়া কোথাও টাওয়ার নেই। কিন্তু পকেটে পয়সা থাকলে, আর খরচের স্থান না থাকলে যা হয়, এক ঢাউস মোটোরোলার সেট কিনে বাড়িতে নিয়ে এলাম, এলাকাতে মোবাইল পরিসেবা না থাকলেও। জীবনে শনির দৃষ্টিপাত শুরু হল।

তবে পড়াশোনা হোক আর নাইবা হোক, অঙ্ক শেখাতে আমার কোনো ফাঁকি রইলনা। নিয়মিত সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটাতে টিউশনিতে গিয়ে মুখোমুখি বসে ‘আমার বনলতা সেনের’ রূপে ঝলসে পুড়ে যাবার সুখে গড়াগড়ি থেকে ডিগবাজি সবই খেতাম। তবে এটা ঠিক, চাহিদা বলতে তখন আমার মনে শুধু একটু ‘ছুঁয়ে দেখব’ এর বেশি কখনও ভেবে উঠতেই পারিনি, লালসা নামের শব্দ আমার জীবনে তার বহু পরেও ছিলনা, এটা আমার অক্ষমতা বা গুণ যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক- ঘুড়ে ফিরে এই সত্যটাই প্রতিষ্ঠা পাবে যে, নিজের শারীরিক গঠন ও দর্শনে আমি এতটাই বেশি হীনমন্যোতাতে ভুগতাম, তাতে করে ওই ছোঁয়ার বেশি ভাবনার সমর্থ্যই ছিলনা। ললনাটির সাথে আজও আমার যোগাযোগ আছে, ফেসবুক হোয়াটসএপেও; তবে ওই বাৎসরিক হাই হ্যালোতেই সীমাবদ্ধ। তার জীবনের প্রথম প্রেম আমি, আর আমার জীবনের প্রথম প্রেমগত সফলতা সে। মৃত্যুতেও এ সত্য বদলাবেনা, সুতরাং নিজেদের ভোলার কোনো প্রশ্নও নেই। কৈশরের বিচ্ছেদের পর অদ্ভুত ভাবে তার সাথে পরিচয় ঘটে রাস্তাতে, মানে ট্রেনের ডিব্বাতে। বর্তমানে সে এক পুত্রের জননী, আমারই বড় কন্যার বয়সী; সে কথা জীবনের অন্য কোনো গল্পে বর্ননা করা যাবে ক্ষণ।

তার তরফে সে সময় সেটা ঘটেছিল, সেটা সেই সময় না বুঝে এলেও আজ এই ৩৫শে এসে যথেষ্ট উপলব্ধি করতে পারি। সে ছিল সোনার খাঁচায় বন্দি। শরীরে-মনে নারীত্বের প্রকোপ দেখা দিতেই পৃথিবীকে দেখার নজর তারও বদলেছিল, কিন্তু ঘেরাটোপে থাকা জীবনে সেভাবে পুরুষের দেখা পাওয়া বা সংস্পর্শে আসার অবকাশ ছিলনা। যে বারান্দাতে কখনও ময়না-টিয়া-কাকাতুয়া বসেনি, যে চোখ মাছরাঙা-ম্যাকাও-বুলবুলির সৌন্দর্য দেখেনি, স্বভাবতই সে নিয়মিত কাকের সহচর্যে ঐটিকেই আদর্শ ও একমাত্র পক্ষী বিবেচনা করে নিয়ে তার প্রেমে পড়ে গেছিলো। প্রথমেই বলেছি ওই অঙ্কের স্যার আমাদের এলাকার অন্যতম বনেদী বাড়ির সন্তান। তিনি ছিলেন শান্তিনিকেতনের ছাত্র, সঙ্গীতজ্ঞ ও গনিতজ্ঞ। ওনার দাদার বৈবাহিক জীবন এক যুগ পাড় করলেও সন্তানাদি আসেনি সংসারে, স্যারেরও বিয়ের বয়স চার বছরের অধিক হয়ে গেছিল- ফলাফল একই। কোনো এক মহা তান্ত্রিকের পরামর্শে বাড়িতে বাচ্চার উপস্থিতি থাকলে এই ভৌমদোষ কাটবে এই বরাভয়ে বাচ্চা নামে এই কাঁচ্চাটিকে বাড়িয়ে আনয়ন, সম্পর্কে স্যারের বৌদির বোনঝি। সাকিন আসানসোল, পিতা কোলিয়ারির সরকারী কর্মী। এগুল অনেক পড়ে জেনেছিলাম, ঘটনাক্রম এলে সবই পরিষ্কার হবে কি-কেন-কিভাবে ইত্যাদি। বর্তমান স্টাট্যাস অনুযায়ী স্যারের দাদা আজও নিঃসন্তানই কিন্তু ওই সময়ের আরো বছর সাত-আট পর স্যারের একটি কন্য হয়েছে বলে শুনেছি।

বিগ-বাবুলের সাথে তখন স্টিকার পাওয়া যেত, সে প্রতিদিন যেকটা স্টিকার পেত তার সবকটা আমার গালে-কপালে-থুতনিতে লাগিয়ে শান্তি পেত। আর আমি ওর ওই নিচু শব্দের খিলখিলানি হাসিতে এক পৃথিবী ঐশ্বর্যের মালিক হতাম রোজ। বাড়িতে মাকে জবাবদিহি করতে পারতামনা কেন আমি রোজ ওগুলো বাচ্চাদের মত মুখে লাগায়! কী উপহার ঠিক কিনে দেওয়া যায় বা উপহার দেওয়াটা অদৌ যুক্তিযুক্ত কিনা সেটাই বুঝে উঠতে পারতামনা তখন। বন্ধুদের সাথে যে আলাপ আলোচনা করব সে উপায় ছিলনা, স্বঘোষিত নিয়মাবলী অনুযায়ী– প্রেমে পরেছো মানেই তুমি দলের শ্রেণীশত্রু, সেখানে দলপতির এমন পদস্খলন হলে দলটাই যে ভাগাড়ে উঠবে সেটা বলাই বাহুল্য। কিন্তু, নতুন প্রমের খবর আর সদ্য ওঠা লোমফোঁড়ার বার্তা চেপে রাখা অসাধ্য; শুভেন্দুকে বলেই ফেললাম। তার মুখ বেয়ে বাকীদের কাছেও খবর পৌছালো শব্দের গতিতেই। যথারীতি আমাকে এতটুকুও আশ্চর্য না করে তারা বিষয়টাকে ডাহা মিথ্যা ভেবে নিয়ে– আমার শরীর খারাপ হয়েছে তাই ভুল বকছি, এমন ভাব দেখাতে লাগলো। পরদিন স্কুল ছুটির ঠিক আগে আমি শুভেন্দুকে নিয়ে হাজির হলাম নবদ্বীপ বাসস্ট্যান্ডে। চারটে পঁয়তাল্লিশের কালনা লোকালের যাত্রী সে, লুকিয়ে অনেকক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে নিশ্চিন্ত হয়ে বাসের পিছন দিকের ভিড়টাতে চড়লাম ঠিক বাস ছাড়ার আগ মুহুর্তে। এক্ষেত্রে পর্যবেক্ষনে সামান্যতম ত্রুটি মহা প্রলয় ঘটাতে পারত আমার বাড়িতে, কারণ বোনও ওই বাসেরই যাত্রী, দুজনেই ঈশানীর ছাত্রী।

পর্ব- ৬

ঠিক ওর পিছনটাতে দাঁড়িয়ে যতটা সম্ভব ওর ঘাড়ের কাছে নাকটা নিয়ে গিয়ে ঘামেভেজা পিঠ থেকে ফেরোমনের উগ্র গন্ধ নিয়ে মাতাল হতে না হতেই, সে পিছন ফিরে বেশ জোরের সাথে কপাল কুঁচকে বিস্ময় সূচক ভাবে বলে উঠল- তুমি! আমি চোখ বুজে পিছন দিকে ঘাড় ঘুড়িয়ে ইশারা করে বলে দিলাম- এরা বিশ্বাস করছেনা তো আমি কি করব! কাজকম্ম ফেলে আসতেই হল। বাস ততক্ষণে নবদ্বীপধাম রেল ষ্টেশন থেকে ভিড় বাড়িয়ে সামনের দিকে চলেছে। হঠাৎ আমাকে বিশ্রীভাবে অবাক করে দিয়ে কন্যরত্নটি সামান্য দূরে রেলগেট স্টপেজে নেমে পড়ে, একটা চায়ের দোকানের ছাউনির ছায়াতে দাঁড়িয়ে গেল, আমিও হাঁ হাঁ করে ওকে দ্রুত অনুসরণ করতে গিয়ে সহযাত্রীদের গালিখিস্তিতে স্নান করে বাস থেকে নামলাম শুভেন্দুকে বগলদাবা করে। ওমা নেমে দেখি একা শুভেন্দুই নয়, আমার দলের বাকি চার মর্কটও বিস্ফোরিত নেত্রে ডায়নোসর দেখছে।

অভিশ্রী আমাকে ডাকতে আড়ষ্ট পায়ে ওর কাছে যেতেই চেঁচিয়ে বলল- এত গুলোকে নিয়ে দল বেঁধে পিছু করার মতলবটা কী? রাস্তার লোকজন আমাদের দেখছে, আমতা আমতা করে আমি বললাম- আমি তো শুধু শুভেন্দুকেই এনেছিলাম, এই জীবজন্তুদের খবর ছিলনা আমার কাছে, শুভেন্দুও ঘাড় নেড়ে সায় দিল। শ্রী বলল- হনুরামের চ্যালা লালমুখো বেবুন, ব্যাটা শুড়ির সাক্ষী মাতাল। আমি নিশ্চিত শুভেন্দুর যা শিক্ষাদীক্ষার দৌড় তাতে সে বেবুন মানে কি, সেটা জানতনা নিশ্চিত। বাকিদেরকে শুধালাম- ‘এই হারামিরা, তোরা ক্যানে এসেচিস’! ওরা সমস্বরে জবাব দিল- আমরা পথচারী, যেখানে পথ আছে আমদের যেখানে যেতে বাঁধা নেই। অভিশ্রী দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল- কী কুক্ষনেই শকুনটাকে যে লাই দিয়েছিলাম, উফ মাগো…।

আমি শুধালাম- তোমার ডাকনাম কিছু আছে! চোখটা ছোটছোট করে রাগত স্বরে জবাব এলো- টুঙ্কি। পরক্ষনেই আরো একটা প্রশ্ন- শুভেন্দুর এই হনুরাম বন্ধুটির নামটা কী আজ বলা যাবে? পিছন থেকে চারজন পথিকের দল একসাথে বলে উঠল- উড়িশালা, এরা তো নামই জানেনা, বাপ্পা… তুই যে বললি প্রেমঘটিত ব্যাপার। আমার পক্ষে তীব্র অপমানসূচক সেই পরিস্থিতিকে দ্রুত সামলে টুঙ্কি বলে উঠল- আমার বয়ফ্রেন্ডকে আমি যে নামেই ডাকি, পথিকদের তাতে কী এসে যায়! এবারে লক্ষ্য আমি- ওই ব্যাটা, নাম বলবি কিনা! বড় ভাও খাওয়া হচ্ছে কটা মাস ধরে! চার পথচারী আর শুভেন্দুর মধ্যেই কেউ একজন স্বেচ্ছাসেবক হয়ে- আমার নাম সহ উর্ধ্বতন ৫-৬টা পুরুষের নাম ঠিকুজি পর্যন্ত এক নিঃশ্বাসে বলে দিল। উত্তরে সে নাকি শুধু বলেছিল- মুসলমান!! আমি অবশ্য সেটা শুনিনি তখন, কারন আমার কাছে তখন নাদিম-শ্রাবণ জুটির হিট মেলোডির অদৃশ্য অর্ক্রেষ্ট্রা বাজাচ্ছিল কেউ, তাই সে মুসলমান বলেছে না জম্বুবান, সেটা শোনার মত প্রার্থীব জ্ঞান লুপ্ত হয়েছিল বয়ফ্রেন্ড শব্দের কল্যাণে।

তন্ময় নামটা স্যারেদের একআধজন ছাড়া কেউই ডাকতনা, ডাকনাম ‘তনা’’ই ছিল সর্বাপেক্ষা প্রচলিত। এর বাইরে ঝোড়োকাক, ভাগাড়ের শকুন, ইত্যাদি সর্বনামে পিঠ পিছনে অনেকে ডাকতো। বাড়িতে বোন দাদা বলত, মা ডাকে খ্যাদা, বাবার মুড ভাল থাকলে সর্বনামে ডাকে আর খারাপ থাকলে পাঁঠা বা সর্বোচ্চ নিজেকে শুয়োর বলে সম্বোধন করে। তাই অমন সুরেলা কন্ঠে তন্ময় ডাক কানে আসতেই আমার সকল তন্দ্রা ছুটে চোখ চেয়ে দেখলাম আমাকে পেয়ারা মাখা অফার করা হচ্ছে। চার পথচারীর কেউ এনে দিয়েছে খরিদ করে। আমাকে ডাকার উদ্দেশ্য- “এই, এই রেললাইন ধরে সমুদ্রগড় কদ্দুর হবে গো!” উত্তর দেবার জন্য আমাকে খাটতে হলনা, কেউ একজন বলল- রাস্তায় গেলে পাঁচ কিমি, লাইন বরাবর কিছু কম হবে। সে বলল- চলো, আজ আমরা লাইন ধরে হেঁটে হেঁটে ফিরব, রাস্তায় অনেক চেনা লোকজন থাকে, মাসীকে বলে দিলে কেস জন্ডিস হয়ে যেতে পারে’। বুঝলাম বয়স ওর- আমার চেয়ে বছর দুয়েকের ছোট ঠিকিই কিন্তু বুদ্ধিতে তিন-তিরিক্কে ৯ বছরেরও বেশি। চরম এক্সাইটমেন্টের কবলে পড়ে শুভেন্দু সহ, প্রদীপ, গৌরাঙ্গ, সহিদুল, অসীম থুক্কুরি ‘চার পথিক’ সিটি বাজিয়ে সেটাকে সমর্থন করতেই শুরু হল রেললাইন ধরে পথচলা। সে যাত্রায় আমি গুণে গুণে দুটো বা তিনটে কথা বলেছিলাম, বাকিটা ৩০ শতাংশ পাঁচজনের প্রশ্নের উত্তরে নিরিবিচ্ছিন্ন জবাবে ৭০ শতাংশটা পুরো করছিল অভিশ্রী একা। আমি পুনরায় অর্ক্রেষ্ট্রার মোডে ফিরে গিয়ে অলীক সুখে ভেসে ভেসে যাচ্ছিলাম।

এতদিন আমি কখনও প্রেমের কবিতা লিখিনি, সে রাত্রেই প্রথম প্রেমের কবিতা লিখেছিলাম। সন্ধ্যায় আর পড়তে যাওয়া হয়ে উঠেনি, পরদিন সেই কবিতা সমৃদ্ধ কাগজটি সাথে করে নিয়ে গেলাম ওকে দেব বলে। কাকতালীয় ভাবে সেও একটা কাগজে কিছু একটা লিখে আমার হাতে দিলো, বলল বাড়ি গিয়ে খুলতে। আমার সেই স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে লেখা কবিতার কোনো কপি আমার কাছে ছিলনা, আজ মনেও নেই কী লিখেছিলাম। তবে অঙ্ক খাতার শেষ দু পৃষ্ঠার এদিক ওদিক করে টানা চার পাতা জুড়ে কিছু হিজিবিজি যে লিখেছিলাম এটা বেশ মনে আছে। সেদিন রাত্রেই প্রথববারের জন্য ওর চোখের দিকে চোখ রেখেছিলাম বিনা লজ্জাতে, গতকালের ওই বাসের ঘটনা ও পরে রেললাইন ধরে সকলের নজর বাঁচিয়ে আসাটা মনের মাঝে একটা আত্মবিশ্বাস এনে দিয়েছিল।

বাড়ি ফিরে সেই চিঠি খুলে পড়তেই চক্ষু চড়কগাছ, তাতে লেখা- ‘ওদের সাথে মজা করে তোমাকে বয়ফ্রেন্ড বলে দিয়েছি, প্লিজ তুমি কিছু মনে কোরোনা। আমরা শুধুই বন্ধু, বাকি কিছুর জন্য আমাদের সব ঠিক নেই’। শেষের লাইনটা বেশ অসংলগ্ন আর অগোছালো, শুরুতে ভীষণ হতাশ লাগলেও রাত্রি গভীর হতেই মনটা ভারী উৎফুল্ল হয়ে উঠল। কারন শুধু যদি বন্ধুত্বই হবে এই সম্পর্ক, তাহলে সেটা চিঠি দিয়ে জানানোই বা কেন! উপেক্ষা করে গেলেও পারত, তার উপরে শেষের লাইনের ওই ধাঁধাঁ- কী ঠিক নেই আমাদের! যাই হোক নাদিম শ্রাবণের অর্ক্রেষ্ট্রাকে কানের মঞ্চে উপবিষ্ট করে নিয়ে ঘুমের অতলে তলিয়ে গেলাম।

ঘনিষ্টতা আগামী এক মাসেই ভীষন গভীরে পৌঁছে গেল। একে অন্যকে দিনে একটিবার না দেখলে যেন বেঁচে থাকারই মানে খুঁজে পেতামনা। আমার মত উৎশৃঙ্খল গেছো বাঁদর সদৃশ্য কেউ রাতারাতি ভোজবাজির মত শান্ত হয়ে গেলে বাড়িতে যে খুশির প্লাবন বয় সেটাও প্রতক্ষ্য করলাম, নিশ্চিত এমনই কিছু রাসায়নিক পরিবর্তন উল্টোদিকেও ঘটেছিল; এবং শনির দশার পূর্বাভাস ছিল এটাই। প্রথম বারের জন্য প্রস্তাবনা দিলাম সিনেমা দেখতে যাবার। নবদ্বীপে তখন একটাই ভদ্রসভ্য হিন্দি সিনেমা দেখার প্রেক্ষাগৃহ বা সিনেমাহল- পপুলার। বাকি নদীয়া টকিজে পুরাতন সিনেমা চলত, আলোছায়াতে ইংরাজি আর প্রাপ্তবয়স্কদের সিনেমা, শ্রীগুরুতে সারাবছর বাংলা সিনেমা। অতঃপর পপুলারে সালমান খানের ‘বই’ এসেছে খবর সংগ্রহ করলাম, রোববার সকালে কুন্তল স্যারের ইংরেজি টিউশনি থেকে ফেরার পথে। সোমবার সন্ধ্যায় হ্যারিকেনের আলোকে নিঃশব্দ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকও হল, চারদিন পর শুক্রবার ম্যাটিনি শো-টাইমে যাওয়া হবে বলে গৃহীত ‘মিনিটস’, পরদিন বিশদে চিঠিতে লিখে জানানো হল। চিঠি লিখে প্রেম করার যে কী সুখ, সেটা আজকের ইনবক্স প্রজন্ম কক্ষনোও উপলব্ধি করতে পারবেনা। প্রতীক্ষার সেই সুখ সেটা আজ কোথায়! আজকের দিনে মেসেজ গেলে দুটো দাগ, পড়লে নীলবর্ণ ইত্যাদির সুবিধা- জীবন থেকে বহু অনুভূতি কেড়ে নিয়েছে, হারিয়ে গেছে বিশুদ্ধ কল্পনা সুখ।

পর্ব- ৭

শুক্রবার দিনটা বাছা এই জন্য কারন ওই দিন জুম্মাবার, আমার বাড়ির কোনো পুরুষ সদস্যের এই সব সিনেমা হলের দিকে আসার চান্স নেই, এমনকি মহিলারাও নয়। অপর দিকে বৃহস্পতিবার কন্যের মা আর দাদা আসবে আসানসোল থেকে, শুক্রবার স্বাভাবিক ভাবেই গল্প-গাছাতে ওনাদের দিন কাটবে, তাই তার পক্ষেও সময় ফাঁকা। নির্দিষ্ট দিনের আগেই আমি ১২ টাকা করে ব্যালকনির দুটো স্পেশাল টিকিট কেটে রাখলাম, কারন যে হারে মাঝেমাঝেই এ সিনেমা নাকি হাউসফুল হচ্ছে তাতে রিস্ক নেওয়া যায়না। এমনিতে আমি তখন হিন্দি তেমন বুঝিনা, তার পরেও হিন্দি সিনেমা দেখতে যাবার উদ্দেশ্য আসলে না বোঝা হিন্দিকে সহজে উপেক্ষা করে সুন্দরীর সহচর্যে মোহিত হয়ে থাকা। পরবর্তী তিনদিনে আমার চোখের নিচে অনেকটা অংশ বসে গিয়ে কালি পড়ে গেল, কারন প্রথববার তাকে ছুঁতে পাওয়ার পূর্ণ সুযোগ পাবো, এই ভাবনার আহ্লাদে খাওয়া বা ঘুমাবার অবকাশ ছিল কোথায়!

এরই মাঝে আবিষ্কার করলাম- ইউক্যালিপ্টাসের হলুদ ফুলের অসামান্য সৌন্দর্য, মেহগনির অমন ডিমের মত ফলটার নস্যি রঙে কী অবিমিশ্র রূপটাই না ফুটে বেড় হচ্ছে। সজনে পাতার পিরামিডাকার বিনুনি সজ্জার নিপুণতা বা কালচে হলদে রঙের সুপুরির ঝুলন্ত থোকাতে এমন মূর্ত বাহার কীভাবে আমার নজর এড়িয়ে ছিল এই ষোল বছরের জীবনে! দৃষ্টি আর ভাবনার প্রতিটি মুহুর্তে তখন আমি আদর খুঁজে বেড়াতে লাগলাম, যেখানে কোনো ঘৃণা ছিলনা, বিদ্বেষ ছিলনা, কারো সাথে কোথাও বৈরিতা ছিলনা। অদ্ভুত এক মায়া দুনিয়ায় একাকী যাত্রী হিসাবে অনন্তের পথে পাড়ি দেওয়ার প্রসন্ন বলয় আমাকে পরিবেষ্টন করে রেখেছিল।

তারপর আর মাঝে দু’দিন আর টিউশনিতে যায়নি, আসলে খিদেটা বাড়িয়ে নিচ্ছিলাম। এ দু’দিন না দেখতে পাবার আকুতিটা ওই দিন যাতায়াতের পথে দু ঘন্টা ও সিনেমা হলের ৩ ঘন্টাতে সুদে আসলে মিটিয়ে নেব এই প্রতিশ্রুতি নিজেই নিজেকে দিয়েছিলাম। আমার বাড়ি থেকে প্রায় দু কিমি দূরে ও তার বাড়ি থেকে এক কিমি দূরে টালিখোলার মাঠ নামের এক স্থানের কাছে আমরা উপস্থিত হলাম পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচী অনুযায়ী। এখনে সে আমার সাইকেলের সামনে চড়ে বসল। সোজা পথে অনেকে চেনা পরিচিত, তার উপরে দুজনেই স্কুল পোষাক পরিহিত, যে কারো নজরে পড়ে যেতে পারি আর তারপর বিপদের শেষ থাকবেনা। যদিও সে তার ব্যাগে একটা স্কার্ট আর টপ নিয়ে রেখেছিল, পরে টের পেয়েছিলাম, এই বুদ্ধি আমার মাথায় আসেনি সে সময়। সুতরাং ৪ কিমির সোজা পথ ছেড়ে আমরা বিদ্যানগরের ভিতর দিয়ে যাব বলে সিদ্ধান্ত নিলাম, সেখান থেকে শ্রীরামপুর ও বিষ্ণুপ্রিয়া হয়ে নবদ্বীপ বড়ালঘাট, যেখানে সিনেমা হল। একপাশে পাতলা কিছু বসতি, অধিকাংশই পূর্ববঙ্গ থেকে সদ্য আসা মানুষেরা বিলের ধারের পরিত্যক্ত জমিতে আবাদ গড়েছে, কাউকে চিনিনা তাই এ এলাকাতে এক্কেবারে নিশ্চিন্ত। যতটুকু প্যাডেল না করলে সাইকেল মাটিতে পড়ে যাবেনা তার চেয়ে এতটুকুও বেশি শক্তি প্রয়োগ না করে শম্বুক গতিতে গাছের ছায়াঘেরা মোরামের পথ বেয়ে এগোতে লাগলাম।

সবে সকাল সাড়ে দশটা, সাড়ে বারোটার মধ্যে সিনেমাহলে পৌঁছালেই হবে। হাতে দু’ঘন্টা সময়, যে পথে এসেছি সেটা দিয়ে নবদ্বীপ প্রায় ১১ কিমি দূর, যেটা সোজা পথে ৪ কিমি মাত্র, তবুও দুটো ঘন্টা কাটাবার জন্য- পারলে আমি হেঁটেই যেতাম। এর মাঝে কিশোরীর যে স্বাভাবিক চপলতা সেটাকে একটা ভীরু কিশোর তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করে যাচ্ছিল। অবিশ্রান্ত কথার লাভাস্রোতে এক অচেনা কিশোরীকে খুঁজে পেলাম, যে আমারই মত প্রগলভ। বহু দূরের তারা- আমার ঠিক কোলের কাছটাতে , মাঝে মাঝে পিছন ঘুরে তাকালে তার আর আমার মাঝে নাকের দুরত্ব কয়েক সেন্টিমিটার বা তারও কম। খিলখিলে মুক্তঝরানো হাসিতে আমি পথ ভুলে আরো চার-পাঁচ কিলোমিটার বেশি চলে গেলাম। এরই মাঝে কখন যে পারুলিয়া পৌঁছে গেছি সেটা হিসাব কষা হয়নি। হুঁশ ফিরতেই এবারে পোঁ-প্যাঁ করে ভিতরের কাঁচা রাস্তা ধরে যখন হলের ভিতরে এসে পৌছালাম তখন বিজ্ঞাপন দেখানো শুরু হয়ে গেছে পর্দাতে। এরমাঝে ষ্টেশনের ওয়েটিং রুমের বাথরুমে ঢুকে সে স্কুলড্রেস চেঞ্জ করে নিয়ে ফ্রকে সজ্জিত হয়ে এক্কেবারে একটা ছোট্ট পুতুল সেজে বেড়িয়ে এসেছে।

দু’টাকার দু’ঠোঙা বাদামভাজা নিয়ে যখন হলের ভিতরে ঢুকলাম তখন সেখানে ভয়ানক অন্ধকার, গুমোট গরমে টর্চের আলোতে হাঁতরে হাঁতরে ওই প্রচন্ড ভিড় আর গমগমে একটা আওয়াজে, এর তার পা মাড়িয়ে নিজের সীটে এসে বসলাম। কাঠের সিট, মাঝে ফোল্ডিং হাতল। আমাকে ভয়ানক অবাক করে দিয়ে ওর হাতের ছোট্ট রুমালটা দিয়ে আমার ঘাম মুছিয়ে দিল, বার কয়েক। মা ছাড়া এতটা আদর করে কেউ কখনও মুছিয়ে দিয়েছে বলে মনে পরলনা তখন, এবারে সে মাঝের হাতলটা তুলে দিয়ে আমার আরো ঘনিষ্ট হয়ে কাছ ঘেঁসে এসে বসল। সিনেমার নাম দেখাচ্ছে ইংরাজিতে, স্পষ্ট পড়লাম- হাম দিল দে চুকে সনম। পাশ থেকে কানে কানে জবাব এলো- ম্যাইনে ভি। বেশ আশ্চর্য হয়েই শুধালাম- হিন্দিও জানো! সে বলল- আসানসোলের স্কুলে পড়েছি, ইংলিশ কম্পালসারি, বাংলা ফার্ষ্ট ল্যাঙ্গুয়েজ আর হিন্দি সেকেন্ডারি। বুঝলাম এ গোটা সিনেমাটাই দেখবে, মনটা খারাপ হয়ে গেল।

ততক্ষণে অন্ধকারের মাঝে চোখটা সয়ে গেছে, আমাদের গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে থাকাটা অনেকেরই নজরে পড়েছে পরিষ্কার বুঝতে পাচ্ছিলাম। তবে আরো অনেকেই এইভাবে বসে থাকার দরুন ওটা দৃশ্য দূষন মনে হচ্ছিলনা। পর্দাতে ‘হাওয়াকা ঝোঁকা’ নামের একটা হাসির দৃশ্যে সে যখন হাসতে হাসতে আমার গায়ের উপরে ঢলে পড়ল, তখন বুঝতে পারিনি যে এটা একটা দ্বিধা কাটাবার পন্থা ছিল, প্রথমিক আড়ষ্টতা কেটে যেতেই সে আমার বাহুলগ্না হয়ে ঘাড়ে মাথাটা রেখে দিয়েছে ততক্ষণে। আমার ওই ১৬ ইঞ্চির বুকের পাঁজরার জাফরিতে থাকা হৃৎপিণ্ডটা ধড়াস ধড়াস শব্দ যোগে মুখ দিয়ে বেড়িয়ে আসতে গিয়ে আলজিহ্বার বাম্পারে লটকে গিয়ে খাবি যাচ্ছে ততক্ষণে। উল্টোদিকে কিন্তু নির্বিকার চিত্ত, পর্দায়- ‘আঁখো কি, গুস্তাখিয়া… মাফ হো’ আমাদের এই চার মাসের সম্পর্ক তো ওই চোখে চোখেই ছিল, অন্ধকারেই মধ্যেও চার চোখে নিজেদের খুঁজে নিয়ে তাতে নতুন সভ্যতার বীজ খুঁজে পেতে ব্যাস্ত। ঘামের নোনতা স্বাদ আর মুখে পেয়ারা-কদবেল-শশা-বাদামের মিশ্র গন্ধ উপেক্ষা করে বেশ কয়েকবার দুজোড়া ঠোঁট অনেক কবার একে অন্যের সাথে ছুঁয়ে গেল আনাড়ির মত। আমার বিড়ি ফুঁকে কালো হওয়া ঠোঁট, কমলার কোয়ার মত পেলব ঠোঁটের কোমলতাতে নিজেকে পরিশুদ্ধ করে নিতে লাগল। নিম্বুরা নিম্বুরার উদ্দাম তালে আমাদের ঘোর কাটল। ফাই-টাইমের আলো জ্বলে উঠতেই সামনের দুটো রো আগের চেয়ারে খেয়াল করলাম আমার বাবার এক খুড়তুতো ভাই তথা আমার শৈশবের শিক্ষক, তিনিও তার বান্ধবী নিয়ে সিনেমা দেখতে এসেছে, চোখোচোখি হতেই আমরা একে অন্যের অচেনা হয়ে গেলাম। বাড়িতে ধরা খাবার চান্স মোটেই রইলনা, কারন ম্যাচ ড্র পজিশনে। অভিশ্রী চুলগুলো খুলে এলোমেলো করে নিজের মুখের উপরে টেনে দিল যাতে তাকে চেনা না যায়।

এবারে ‘তরফ তরফ কি ইস দিল- কি আহ নিকালতি রহি…’ আমি বাক্যের মানে সেভাবে না বুঝলেও দেখি পাশের জন ভাবুক হয়ে পরেছে এই গানের দৃশ্যে, তার মানে সে বুঝে বুঝে সিনেমা দেখছে। দেখুকগে, আমি সেই হালকা আধোছায়াতে আমার হিরোইনকে কাছ থেকে চোখ বুজে দেখতে থাকলাম অনুভবে, গালে চোখে মুখে -নাক ঠেকিয়ে। পর্দায় ডায়লোক- ‘দেখো দেখো চান্দ নিক্যাল আয়া হ্যায়’, আমার দৃষ্টি আমার চাঁদের পানেই নিবদ্ধ। গান হচ্ছে ‘চান্দ ছুপা বাদল মে, শরমাকে মেরি জানা’। আমার হৃৎপিণ্ড গলায় সেভাবেই লটকে, কিন্তু কিডনি, ফুসফুস, পাকস্থলী, লিভার, এমনকি গলব্লাডারটাও কী সুন্দর ছন্দে ছন্দে নেচে নেচে উঠছে। আমার পিলে হতে একটা অতীব সাহস গলায় হৃৎপিণ্ডের কাছাকাছি এনে আমিও তার আঙুলের মাঝে আমার আঙুল চালান করে দিতেই সেই দশ আঙুলের সমন্বয় উভয় দিক হতেই মুষ্ঠিতে পরিণত হয়ে গেল। গরম নিঃশ্বাস বুকের উপরে পড়ছে, বুঝলাম আমার শরীরের আরো অনেক অংশই সারা দিচ্ছে এর সাথে। ঐভাবে ঐ অন্ধকারে ঐ দিনিই ওটা ঐ ভাবে প্রথম অনুভব করলাম, শুধু হৃদয়ই জাগ্রত হয়না প্রেমে, আরো অনেক কিছুই হয়।

পর্ব- ৮

কথায় আছে অতি লোভে তাতি নষ্ট, প্ল্যান ছিল সিনেমা শেষ হব হব করলেই আমরা হল ছেড়ে বেড়িয়ে আসব। কিন্তু হলে ঢুকে আর সিনেমা দেখা হল কোথায়, নিজেরা নিজেদের নিয়েই ব্যাস্ত ছিলাম। পিছন থেকে চুলের ঝাঁকা থুড়ি মুঠিতে টান পরতেই দেখি আমার হিরোইনের মাসীমা আমার ঝাঁকড়া চুল রাগত শারীরিক ভঙ্গিমাতে টেনে ধরে রয়েছেন, হিরোইন ঠকঠক করে কাঁপছে, অদূরে স্যারের স্ত্রী ও ওই মাসিমার সদৃশ্য আরেকজন মহিলা অবাক চোখে তাকিয়ে, বুঝলাম ওটাই হিরোইনের মা। অত্যন্ত বাছা বাছা ‘পাকা’ গালিগালাজ দিয়ে আমার চুলের বজ্রমুষ্ঠি ছেড়ে নিজেদের মেয়ের হাত ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে চলে গেলেন মাসীমা। আমি খানিক ভ্যাবলার মত দাঁড়িয়ে থেকে টর্চ ওয়ালার তাড়া খেয়ে বেড়িয়ে কোনো রকমে সাইকেলটা নিয়ে বাড়ি পৌছালাম।

পরবর্তী ৪-৫ দিন আর টিউশনি মুখো হইনি, দারুণ জ্বরে পড়ে গেছিলাম। হয়ত মানসিক পীড়নের সাইডএফেক্ট- একদিন স্কুলে যখন স্যার শুধালেন- ‘কিরে রাত্রে আসছিসনা কেন’! এতে বেশ একটা আশ্চর্য হয়ে বুঝেছিলাম বাড়ির পুরুষ সদস্যদের কাছে সিনেমাহল কাহিনী গোপন করা হয়েছিল। পরবর্তী শুক্রবার রাত্রে যখন স্যারের কাছে পড়তে গেলাম, আমার জন্য বাড়ির বাইরে একটা অস্থায়ী ছাউনি ঘরে বসার বন্দোবস্ত দেখে পরিস্থিতি অনুমান করে নিলাম যে, এ বাড়ির ঠিকানা আমার কাছে দীর্ঘ দিনের জন্য উপলব্ধ নয়। কিন্তু তিনি কোথায়! পরবর্তী কয়েকটা দিন তন্নতন্ন করে খুঁজে ফিরে সারা হয়ে গেলাম, কিন্তু তার কোনো খোঁজ পত্তর পেলামনা, বাড়ির ভিতরে যাওয়ার অনুমতিও ছিলনা যে শুধাবো। অগত্যা প্রতীক্ষা ছাড়া উপায় রইলনা, বিরহের সে এক অশেষ অধ্যয়। চোদ্দ কী পণেরতম দিনের দিন আমি দুপুরে দোকানের ভিতরে একাকী বসে, বাবা বাইরের অফিসে। সে জানত আমি এই সময়টাতে দোকানেই থাকি- অনেকটা দূর আমাকে ইশারা করতে আমি ভাবলাম বোধহয় স্বপ্ন দেখছি, পরক্ষনেও দেখি একই দৃশ্য। আমাদের দোকানের খাতা লেখক আমাকে বলল- তোমাকে এক মা-মনি ডাকছে বাবু, এবারে আমি প্রায় উড়ে গিয়ে তার সামনে হাজির হলাম। এক বাজার লোক দেখছে, সাথে আমার বাবাও, কিন্তু কিছুই বলেননি সেদিন। পরদিন ওর স্কুলে গিয়ে ফেরার পথে শুনলাম, সে তার মাকে আমাদের বিষয়টা বোঝাতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু গ্রাজুয়েশনের আগে পর্যন্ত মার্জিত মেলামেশা রাখতে বলেছেন, কিন্তু ওর মাসীমা যেকোনো শর্তে আমার সাথে মেশা যাবেনা- এটা দিব্যি দিয়েছে।

মহিলা মহলে ততদিন এই ‘ভিন জাতে’ মেলামেশার বিষয়টা রাষ্ট্র হয়ে উঠেছে, বোনের মাধ্যমে সেটা মায়ের কানেও পৌছেছে অনেকটা কলেবরে বৃদ্ধি পেয়ে, কপালে মার না জুটলেও প্রচুর শ্লীলতাহানি হয়ে ছিল পাইকারি হারে। কিন্তু সে প্রেম কী আর এই বকাঝকাতে যাবার রোগ! ওদিকে আমার প্রেমের বাগানে স্যারের বাড়ির পাশের এক হিরো মার্কা ছাগলের উৎপাত শুরু হয়েছে ততদিনে, নাম অর্জুন (পরিবর্তিত) রায়চৌধুরী, সে নিজেকে প্রতারিত মনে করা শুরু করল। বেপাড়ার ছেলে এসে পাশের বাড়ির ফুল তুলে নিয়ে যাবে, আর সে বা তাদের মত বাকি অন্যরা বসে বসে দেখবে, এটা চলতে দেওয়া যায়না! সে আমার এক ক্লাস উঁচুতে ইকোনোমিক্স নিয়ে পড়ত, শারীরিক ভাবে সুশ্রী আর বলবানও বটে। তবে আমাকে মারবে সে সাহস ছিলনা। এক তো আমার স্যাঙাৎ দলের বিভীষিকা, তার উপরে আধুনা হাতে পয়সা ও মুখে কাঁচা খিস্তির ফাটা ক্যাসেটের সম্ভার- যেকোন স্বাভাবিক মানুষের কাছে যথেষ্ট ভীতিদায়ক ছিলাম। সে যেভাবে হোক জেনেছিল, যেদিন যেদিন টিউশনি থাকেনা সেই সেই দিন সন্ধ্যায় আমি অভিশ্রীর সাথে ওদের বাড়ির খিড়কি দরজা দিয়ে পিছন দিকটায় পুকুরপাড়ের ঝোঁপটার কাছে অনেকক্ষণ গল্পগাছা করি। যে সময় ওর মাসী প্রায় ৪০ মিনিট ধরে সন্ধ্যা-আহ্নিক করেন, ঠাকুরকে জল দেওয়া ইত্যাদি উপাচার সারেন, সুররাং অখন্ড ও নিরাপদ সময়।

এমনই একদিন আমি সন্ধ্যার একটু দেরি করে পৌঁছেছি, দূর থেকে দেখি অর্জুন সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওর আবার এখানে কী কাজ, ভেবে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পর মাগো-বাবাগো শব্দে আওয়াজ করে ভীষণ জোরে অভিশ্রীর চিৎকারে ওদের বাড়ি সহ আশেপাশের জ্ঞাতিগোষ্ঠীর বাড়ি থেকে বেশ কয়েকজন স্ত্রী-পুরুষের দল বেড়িয়ে এলো। আমিও প্রায় হাঁফাতে হাঁফাতে সেখানে উপস্থিত হয়ে দেখলাম ভয়ার্ত অভিশ্রী দাঁড়িয়ে, তার গলার কাছটাতে আঁচড়ের দাগ। মাঝখান থেকে সেই অর্জুনই চিৎকার করে বলে উঠল- তন্ময়ই রোজ এখানে আসাযাওয়া করে, ও ই মেয়েটির সাথে নষ্টামি করছিল। বাকি সমবেত আওয়াজকে ছাপিয়ে গিয়ে আমি বা অভিশ্রী কেউই আমাদের মত প্রতিষ্ঠা করতে পারলামনা। ততক্ষণে জটলা ভিড়ে পরিণত হয়েছে, আমার হাত পিছমোড়া করে বেঁধে আমাদের দোকানে বাবার সামনে এনে হাজির করা হল।

আমাদের তখন ফার্টিলাইজার, পেস্টিসাইডস আর কৃষিজাত পন্যের বীজের পাইকারি দোকান। এলাকার সবচেয়ে বড় দোকান, যার মূল বেচাকেনা শুরুই হত বৈকালের পর থেকে। বড় চাষিরা এখানে এসে জমত, পাশেই কয়েকটা চায়ের দোকান। দোকানের সামনেটাতে এলাকার প্রায় সকল কৃষিকাজের সাথে যুক্ত মজুরদের সমাগম ঘটত, সাথে লাঙল ওয়ালা, ট্রাক্টর ওয়ালা, স্যালো মেসিন ভাড়া যে দেয় ইতাদি হরেক শ্রেনীর মানুষেরা এই একটা বিন্দুতে উপস্থিত হত। আজ আমাদের সে ব্যাবসা আর নেই তবে দোকান ঘরটা আছে, এই কৃষিজীবি মানুষদের এই সমাগমটা আজও এভাবেই রয়েছে। যাই হোক, ওই ভাবে পিছমোড়া করে বেঁধে আনাটা মোটেই সম্মানের ছিলনা বাবার কাছে, তিনি বামবিরোধী রাজনীতির অতি পরিচিত মুখ জেলা রাজনীতিতে। একটা প্রমান সাইজের চড় ছাড়া আমার কপালে বেশি কিছু খারাবি জুটলনা, আমাকে একটা পাটের গুদামে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে শাটার নামিয়ে দেওয়া হল। অনেকক্ষণ আলাপ আলোচনার পর স্যারেদের বাড়ি ও পাড়ার লোকেরা চলে যেতে আমাদের দোকানের এক কর্মচারী আমাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে গেল।

আমাদের দোতলা তখন সবে তৈরি হচ্ছে, জানলা দরজার ফ্রেম লাগানো হলেও পাল্লা ঝোলেনি। সেই রাত থেকেই প্রথম একা শোয়া শুরু করলাম, দোতলাতে একটা তক্তাতে পুরাতন বিছানা পেতে বিনা বালিশে ঘুম। এই অবস্থা থেকে যিনি আমাকে রক্ষা করতে পারতেন তিনি মাস ছয়েক আগেই নার্সিংহোমের বেডে শুয়ে শুয়ে ফুলুরি খেতে গিয়ে পটল তুলেছেন, আমার দাদু। অবস্থা সঙ্গীন হয়ে উঠল, বাইরে পর্যন্ত বেড়োতে দিতনা। কয়েকদিন পর অবস্থা স্বাভাবিক হলে, শুভেন্দু এসে খবর দিল যে- অভিশ্রীকে নিয়ে আজ সকালের বাসেই তার বাবা ও মা ফিরে গেছে আসানসোল। সেদিন বাড়ি ফিরে সারাদিন কেঁদেছিলাম, অর্জুনের উপরে চূড়ান্ত প্রতিশোধ স্পৃহা জেগে উঠলেও, পরক্ষনেই মনকে শান্ত করেছিলাম, কারন তাতে করে অভিশ্রীকে কীভাবে ফিরত পাবো? আজও রাস্তায় দেখা হলে আমার থেকে পালিয়ে পালিয়ে বেড়ায় ওই অর্জুন, এই ২০ বছর পরেও। বিষয়টা বেশ উপভোগ্য, সে আজও সাজা পাচ্ছে মনে মনে।

বাবা বুঝে গেছিলেন, ছেলে আমার অজ্ঞান, জাতে উন্মাদ তৈরি হয়েছে। সুতরাং বিজ্ঞানী বনাবার ভাবনা কবর দিলেও, মা তার ছেলেকে ডাক্তার করার স্বপ্নে জল ঢালতে নারাজ ছিল। অযাচিত ভাবে জো এসেছে- অতএব, কোলকাতায় চাকুরিরতা মামার সাথে শলাপরামর্শে আমাকে কোলকাতায় রেখে পড়াশোনা করানোর পরিকল্পনা পাকা করে ফেললো মা। ওদিকে এই মাঝ মরশুমে ওখানে কে আর ভর্তি নেবে, তবুও কোলকাতাতেই থাকাটা নিয়তি হয়ে দাঁড়ালো। এদিকে বাবা বেঁকে বসলেন, কারন ততদিনে ব্যাবসার ৮০ % দৈনন্দিক কাজকর্ম আমাকেই করতে হতো। আর মা লক্ষ্য করলেন যে, এই ব্যাবসার গুঁতো আর কাঁচা টাকার পাল্লায় পড়েই ছেলে উচ্ছুন্নে যাচ্ছে। বাবা তীব্র অমত সত্বেও শেষমেশ রাজি হয়ে গেলেন। আমার তখন মৃতপ্রায় জীবনের অবস্থা, সমুদ্রগড়ই হোক বা কোলকাতা বা হিল্লি দিল্লি যা খুশি- রূপকথার দৈত্যের মত আমার প্রানপাখী তখন আসানসোলের কোনো এক প্রান্তরে একাকী ঘরে আমারই জন্য চোখের জলে বুক ভাসাচ্ছে হয়ত। এভাবেই সমাপ্তি ঘটল আমার বর্ণময় স্কুলজীবনের। শুরু হল কোলকাতার বন্দি জীবনের এক নিদারুণ কাহিনী।

আমার বড় মেয়ে তখন সদ্য জন্মেছে, ২০১০ সাল, একটা সাদা খামে একটা চিঠি দিয়ে গেল সেই চার ‘পথিক’ বন্ধুর অন্যতম প্রদীপ কোলে। আমার নামে সেই তবেই একটা চিঠি পাঠিয়েছিল আমার স্কুলের ঠিকানাতে, আমার নামে; আমি তখন কোলকাতার নির্বাসনে। প্রদীপ সেটা বাড়িতে দেবার দায়িত্ব নিয়েও বিগত ১১ বছর ধরে সেটা সে নিজের কাছেই রেখে দিয়েছিল। সে পেশাতে শিক্ষক, তাই তাকে আর অতিরিক্ত গালগালাজ করিনি। হুবহু টুকে দিলাম-

 “কোন এক সময় শুধু তোমাকে নিয়েই আমার সকল স্বপ্ন ছিল। সকল আশা, সকল চাওয়া পাওয়া ছিল শুধুই তুমি। বলতে পারো- তুমিই আমার একটা গোটা পৃথিবী ছিলে। ভাবছো কথাগুলো মুখের কথা! না এটা তুমি ভাবতে পারনা কারন তুমি জানতে তোমাকে কতটা ভালোবেসে ছিলাম, কিন্তু এখন ভুলতে চাইছি ভীষণ রকম ভাবে। আজ হয়তো ভাবছ হঠাৎ করে আমি এত বদলে গেলাম কেন? শুধু সাময়িক মুক্তি নিতে চাইছি এই নষ্ট স্মৃতিগুলো থেকে। আগামীদিনে তোমাকে নিবিড়ভাবে পাবার জন্য যে বল দরকার সেটা হাসিল করতে গেলে অনেকটা শক্তি নিয়ে নিজের পায়ে তোমাকে-আমাকে দাঁড়াতে হবে, তাই তোমাকে ভুলতে চাইছি আমি। আপাতত ভেবে নিও, কেউ একজন ঠিক এভাবে অসাধারন মিথ্যা ভালোবাসার অভিনয় করে কষ্ট দিয়েছে তোমায়। সত্যিই আমিও বদলে যাচ্ছি, তুমিও বদলে যাও। তোমার জন্য অপেক্ষায় থাকবে আমার প্রতিটি রোমকূপ, তোমার পরশে যারা যৌবনের স্বাদ পরখ করেছিল প্রথমবারের জন্য, হৃদয়ের ভালবাসার কলসিতে আমাদের চাওয়া পাওয়া গুলোকে টিপে টিপে ভরে রাখো। যেদিন আমাদের মিলন হবে সেদিন এই কলসি উপুর করে সেই ঝর্নাতে আমরা অনন্তকাল ধরে ডুবতে থাকব। মুছে দাও আমি নামের অস্তিত্বকে, আমি চাই না কোন এক পথের বাকেঁ তোমার সাথে আমার দেখা হয়ে যাক যতক্ষননা তুমি প্রতিষ্ঠিত হয়ে আমার হাত ধরে নিয়ে যেতে পারো। প্রমান করে দেব আমরা, সুখের জন্য সব পারি, যে হৃদয় ও ভাঙ্গতে পারে সেটা আবার জোড়া লাগতে পারে। সেদিন আর বেশি দুরে নয়, তুমি সফল হও। সেদিন যদি আমার কথা মনে নাও থাকে, জেনো আমি এতটুকু কষ্ট পায়নি, সেদিন হয়তো মনের অজান্তেই একটু হাসবো আমি; তোমার সুখের অলীক ভাগীদার হিসাবে”।

……জীবন চলছে, তাই ক্রমশ।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *