গর্বিত বাঙালী

আমরা মানুষ, জাতিতে বাঙালি। ভারত ভূখণ্ড তথা গণতান্ত্রিক বা গণপ্রজাতান্ত্রিক ভারতবর্ষে আমাদের বাস। ধর্মবিশ্বাস গত ভাবে আমরা কেউ সনাতনী, কেউ ইসলামপন্থী, কেউ আদিবাসী, কেউ বৈষ্ণব বা কেউ বোউদ্ধ বা ক্রিশ্চান; কিন্তু সকলকে নিয়েই আমরা বাঙালি, আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলি। বাংলা আমাদের গর্ব, আমাদের পরিচয়, আমাদের মা, আমাদের আবেগ-অনুভূতির বহিঃপ্রকাশের মাধ্যম।

আজকে বহু ভাষাভাষী বহুসংস্কৃতির মিলনতীর্থ এই ভারত ভূমিতে, রাষ্ট্রের অযোগ্য শাসক যখন অপর একটা আঞ্চলিক ভাষাকে গোটা ভারতের ভাষা রূপে জোর করে চাপিয়ে দিতে চাইছে, তখন আঞ্চলিক ভাষা গুলি তরফ থেকে বাঙালি হিসাবে আমাদের প্রতিবাদ অবশ্য কর্ম, ও ধর্ম। নতুবা আমরা ক্ষামরাও অযোগ্য।

“মোদের গরব মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা”- কবি অতুলপ্রসাদের এই অমর বাণীটি আমাদের বাঙালির মন্ত্র হওয়া উচিৎ। বাংলা শুধুমাত্র একটি প্রান্তিক আঞ্চলিক ভাষা নয়, বিশ্ব মানচিত্রে একটা সম্পূর্ণ দেশ রয়েছে যাদের ভাষা বাংলা। পৃথিবীর মোট ব্যবহারকারীর সংখ্যা অনুসারে বাংলা বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম ভাষা এবং মাতৃভাষা হিসেবে বিশ্বের ষষ্ঠ স্থানে। অন্তত উইকিপিডিয়া সেটাই বলছে, শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়- ত্রিপুরা, আসাম, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ সহ আরো অনেকগুলো রাজ্যে এই বাংলা ভাষাভাষী মানুষ বসবাস করেন নিজস্ব সংস্কৃতিতে।

যদি ভাষার ইতিহাসের দিকে লক্ষ্য রাখেন তাহলে দেখা যাবে, চর্যাপদ ১৩০০ বা তারও বেশি বছরের পুরাতন। নবজাগরণ পরবর্তী থেকে স্বাধীনতা আন্দোলন হয়ে আজকের সন্ধ্যার শুরু পর্যন্ত ভারতীয় কৃষ্টি, সংস্কৃতি, সভ্যতা, শিক্ষা, ক্রীড়া, গীত-বাদ্যের  প্রভৃতি ক্ষেত্রের নিজস্ব জগতের ইতিহাস- ‘বাংলা ও বাঙালি’কে বাদ দিয়ে কখনো লেখা সম্ভব নয়।

দশম শতকের পর থেকেই সংস্কৃত ভাষা হতে উৎপন্ন ইন্দো-আর্য ভাষাসমূহের মধ্যে মাগধি-প্রাকৃত, পালির মত বিভিন্ন ভাষা গুলো সৃষ্টি হয়, যেখান থেকে আমাদের বাংলা ভাষার উৎপত্তি। ভারত ভূখন্ডে ও বাংলাতে মুসলমানেদের শাসনাকালে মধ্যযুগীয় ফার্সির পাশাপাশি মধ্যযুগীয় যে বাংলার প্রচলন ছিল, নদীয়ার নবদ্বীপ  অঞ্চলের সৃষ্ট লিখিত বাংলাভাষা রুপটাই আজকের দিনে একমাত্র স্বীকৃত। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পরবর্তী সময় থেকে বাংলা ভাষা যে লিখিত রূপ, সেটাই আমরা বর্তমানে যেটা পড়ছি বলে ধরে নেওয়া যায়।

এ তো গেল বাংলা ভাষার কথা, এবার যদি আমরা বাঙালি প্রশ্নে আসি তাহলে শুরুতেই আমি শ্রীচৈতন্যদেবের প্রসঙ্গে আসব। কারণ সমাজ সংস্কারক হিসেবে তার অবদান এই বাংলাতে তা বিস্মৃত বাঙালির অনেকেই আজ জানেন না। আজকের গোবলয় বা দক্ষিন ভারতে দলিত ‘জাতিভেদ প্রথা’, মানুষের মধ্যে যে উঁচু নীচ বিভেদ বর্ণ অনুযায়ী; মধ্য ভারতে সন্ত কবির তার দোঁহা দিয়ে সংস্কারের শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে পরাধীন ভারতবর্ষের দক্ষিনে পেরিয়ার রামাস্বামী বা মধ্য ভারতে কাঁশীরাম অনেকটা চেষ্টা করেছিলেন সমাজের মধ্যে নানা ধরনের যে সমস্ত অস্পৃশ্যতা রোগের প্রকোপ সে গুলোকে থেকে মানুষকে রক্ষা করা। তারা সম্পূর্ণ সফল হতে পারেননি। বাঙ্গালীদের মধ্যে এই ‘নিচুজাত’ সংক্রান্ত নিকৃষ্টতা বহুলাংশে কম কারণ শ্রী চৈতন্যদেব। সেই সময় তিনি হরিজন, মুসলমান এবং সমাজের অন্ত্যজ শ্রেনীর মানুষদের নিয়ে একটা বৃহত্তর সমাজ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাই বাঙালি সংস্কৃতিমনষ্ক আজকের বাঙালি কৃষ্টি-সভ্যতা ‘শ্রীচৈতন্যদেব’ ছাড়া শুরু করা সম্ভবই নয়।

স্বামী বিবেকানন্দকে ছাড়া আধুনিক ভারতীয়ের জীবন দিশা অসম্পূর্ণ, তিনি আমাদের বাঙলার সন্তান। তার যে মতাদর্শ, সকল ধর্মীয় অরাজকতার উর্ধ্বে উঠে মানবের জয়গান গেয়েছিলেন বিশ্বের দরবারে, বাঙালিকে পরিচিত করিয়েছিলেন তাঁর জ্ঞাণদর্শন দিয়ে। যদি আর একটু পিছিয়ে যায় তাহলে এই সমাজ সংস্কারকদের তালিকাতে প্রথমেই থাকবে ডিরোজিওর নাম। যিনি বাঙালি না হয়েও একজন আদ্যোপান্ত বাঙালি। ব্রাহ্মসমাজের রাজা রামমোহন রায়, কেশব চন্দ্র সেন, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রমুখেরাও এরকমই ছিলেন। পরবর্তীতে মাদার টেরিজা আর্তের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন এই বাংলাতে বাঙালি হয়েই।

দেশের স্বাধীনতার জন্য বাঙালির মতো আত্মত্যাগের ইতিহাস কটা জাতির রয়েছে সেটা যথেষ্ট গবেষণার বিষয়। ক্ষুদিরাম বসু, প্রফুল্ল চাকী, পুলিনবিহারী দাস, বিনয় বসু, দীনেশ গুপ্ত, কানাইলাল দত্ত, বিনোদ বিহারী চৌধুরী, অম্বিকা চক্রবর্তী, বাদল গুপ্ত, গোপাল মুখার্জী, লোকনাথ বল, বীণা দাস, বিপিন বিহারী গাঙ্গুলি, অনন্ত সিংহ, তারকেশ্বর দস্তিদার, মতিলাল, রামকৃষ্ণ বিশ্বাস, কানাইলাল ভট্টাচার্য, মাতঙ্গিনী হাজরা থেকে বিপ্লবী যতীন দাস। রাসবিহারী দত্ত, অবিভক্ত ভারতের মাস্টারদা সূর্য সেন, জাতীয় কংগ্রেসের হয়ে চিত্তরঞ্জন দাস প্রমুখেরা স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসাবে বাঙালির ইতিহাসকে ভীষণভাবে ঋদ্ধ করেছেন।

সেনা তথা যুদ্ধ বিভাগে যদি কারো কথা বলতে হয় প্রথমে আসে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস ও তাঁর আজাদহিন্দ বাহিনী। পরাক্রম ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে যে স্বাধীনতার লড়াই শুরু করছিলেন তা ভারত নামক দেশের কাছে শৌর্যের প্রতীক। এছাড়া স্বাধীন ভারতবর্ষে আর্মি চিফ জয়ন্ত নাথ চৌধুরী, ইন্ডিয়ান নেভি অধর কুমার চট্টোপাধ্যায়, ভারতের প্রথম মিলিটারি হেলিকপ্টারের পাইলট এয়ার কমান্ডার সুধীন্দ্র কুমার মজুমদার, এয়ার মার্শাল সুব্রত মুখার্জি, যিনি এয়ার ফোর্সের প্রধান হয়েছিলেন। পরবর্তীতে তার উত্তরসূরী অরূপ রাহা এছাড়াও জেনারেল শঙ্কর রায়চৌধুরী, ইন্দ্রলাল রায়দের উপস্থিতি প্রমাণ করে বাঙালি ভীরু জাতি নয়।

সাহিত্যকর্ম, দর্শনে যদি বাঙালি হিসেবে কিছু বলতে হয় তাহলে সাহিত্যের দিকে যদি নজর রাখা যায়, শুরুতেই আকাশজুড়ে রয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তার সমন্ধে ‘আমি’ বিশদে বলব, এমন ধৃষ্টতাপূর্ণ ধারনা মনের মধ্যে পালন করার সাহস কখনও করিনি। তিনি নিজেই একটা গোটা পৃথিবী হয়ে, বাংলা এবং বাঙালিকে পরিপূর্ণ করেছেন। বিশ্বের দরবারে বাঙালীকে পরিচিত করিয়ে দিয়েছেন, তিনি আমাদের প্রাণের গর্ব, আমাদের ভারত রাষ্ট্রের রাষ্ট্রগানের রচয়িতা বিশ্বকবি স্বয়ং।

এর পূর্বে আমরা যদি মধ্যযুগীয় সাহিত্যে দেখি, সেখানে বড়ু চন্ডীদাস, বিদ্যাপতি, কৃত্তিবাস ওঝা, কৃষ্ণ চরণ দাস, রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র, পরবর্তীতে মদনমোহন তর্কালঙ্কার, প্যারীচাঁদ মিত্র, অক্ষয় কুমার বড়াল এনারা আমাদের বাঙলাকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। এরপর যাদের নাম প্রাতঃস্মরণীয় তেমন কিছু মানুষদের মধ্যে গদ্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর; এনাদের পাশাপাশি আধুনিক লেখকদের মধ্যে সত্যজিৎ রায় বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। সত্যজিতের কথা আসলে তার বাবা সুকুমার রায় আসবেন এমনটা মোটেই নয় সেটা আমরা জানি। সুকুমার রায়ের সাহিত্যকর্মে যে হাস্যরস সৃষ্টি হয় মনজগতে, অমন উদ্ভট কল্পনা সাহিত্য- বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে বিরলতম। এছাড়া আরও যে সমস্ত সাহিত্যিকদের নাম না নিলেই নয়, তারা হলেন- শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মহাশ্বেতা দেবী হয়ে নবারুণ ভট্টাচার্য প্রমুখদের মত বরেণ্য মানুষদের সাহিত্য কর্মে বাঙালি ভীষণ কুলীন আর পাঁচটা ভাষাভাষী জাতির থেকে।

এবার যদি আমরা কবিদের দিকে নজর রাখি, অতুলপ্রসাদ, অজিত দত্ত থেকে শুরু করে কাজী নজরুল ইসলাম নিজের অন্যতম মহীরুহ। এছাড়া আধুনিক কবিদের প্রাণপুরুষ জীবনানন্দ দাশ, তরুণ কবি কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য, কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়- তালিকা সকলের নাম যদি সকলের নাম লিখতে শুরু করি তাহলে তালিকা পড়ে শেষ করা সময় সাপেক্ষ। কয়েকজন বরেণ্য কবির নাম উল্লেখ করলাম মাত্র।

আজকে বাঙালি সাংবাদিকদের যদি নাম নিতে হয় তাহলে প্রথমেই আসবে কুলদীপ নায়ারের কথা। এর পর মৃণাল চাটার্জী, কাবেরী গায়েন, মতি নন্দী, প্রীতিশ নন্দী, দেবাশীষ দত্ত, গৌতম ভট্টাচার্য বাঙালি হিসেবে সাংবাদিকতাকে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

বাঙালি অভিনয় জগতে টালিগঞ্জ তো বটেই, বলিউডেও গুণী বাঙালীদের ছড়াছড়ি। আঞ্চলিক হলেও নিজস্ব কৃষ্টিতে সংস্কৃতিতে আমাদের বাংলা সিনেমা যথেষ্ট কুলীন। দেবকি বসু থেকে শুরু করে ভানু বন্দোপাধ্যায়, তুলসি চক্রবর্তী, বিশ্বজিৎ, হারীণ চ্যাটার্জী, জয়া ভাদুড়ি, মৌসুমী, মিঠুন চক্রবর্তী এনারা অভিনয় জগতের উজ্জ্বল তারকা। এদিকে বাঙালি আইডল উত্তম কুমার এবং তার সময়ের মহিলা মহলের অন্যতম জনপ্রিয় সৌমিত্রের যে স্বাস্থ্যকর লড়াই তা বাঙালির স্বপ্নের অন্যতম সুখ।

গানের জগতে বাঙালি ছাড়া ভারতীয় মর্ডান বলিউড সংগীত কতটা টিকে থাকবে বলা খুব কঠিন। বাঙালি শিল্পী সকল সময়েই অগ্রগণ্য শিল্পের এই ধারাতে। শচীন কর্তা দিয়ে শুরু করলে আজকের অরিজিৎ সিং প্রজন্ম পর্যন্ত প্রায় গোটাটাই বাঙালী দিয়ে ঘেরা। হিন্দি গান লেখে বাঙালি, সুর দিয়েছে বাঙালি, গেয়েছে বাঙালি। কিশোর কুমার, মান্না দে, কুমার শানু হোক বা অভিজিৎ শ্রেয়া ঘোষাল, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শান বা মহঃ আজিজ, প্রত্যেকে নিজ গুণে গুণী। রাহুল দেব বর্মন তিনি তো নিজেই একটা প্রতিষ্ঠান। বিশ্ব বিখ্যাত গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন আরেকজন বরেণ্য বাঙালি শিল্পী পন্ডিত রবি শংকর তার সুযোগ্য কন্যা নোরা জোন্স।

বাঙালি শিল্পীদের মধ্যে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার পেয়েছেন রাইচাঁদ বড়াল, নিতীন বোস, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, কানন দেবী, মান্না দে, ধীরেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলী, অশোক কুমার, হৃষিকেশ মুখার্জী, পঙ্কজ মল্লিক, দেবকী রানী, সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, তপন সিনহা ও বি এন সরকার।

আজকে যেসকল বাঙালিরা ভারতরত্ন পেয়েছেন তাদের মধ্যে সত্যজিৎ রায়, বিধানচন্দ্র রায়, অমর্ত্য সেন, অরুনা আশরাফ আলী, পণ্ডিত রবিশঙ্কর ও রাজনীতিবিদ প্রণব মুখার্জী প্রত্যেকে ভীষণ শ্রদ্ধার পাত্র। প্রত্যকের কর্মজীবন অত্যন্ত রঙিন ও বর্ণময়। দানবীর হাজি মহম্মদ মহসিনের নাম আমরা অনেকেই স্মৃতির অন্তরালে বিসর্জন দিয়েছি।

ভারতীয় শিল্পীদের মধ্যে চিত্রজগতে গণেশ পাইন, রামকিঙ্কর বেইজ এর মত ভাস্কর বাঙালি জাতিকে পুষ্ট করেছেন। এরপরে নন্দলাল বসু, অবন ঠাকুর, যামিনী রায় এনাদের শিল্পকর্ম তুলনা মেলা ভার। জাদুকর পিসি সরকারের ভোজবাজি শিল্প বিশ্বের দরবারে ভারতের তথা বাঙালির নাম উজ্জ্বল করেছে, যেমন দেহসৌষ্ঠব প্রতিযোগিতায় বিশ্বশ্রী মনোহর আইচ আজও বাঙালির কাছে বিস্ময়ের অপর নাম। বাঙালি কার্টুনের মধ্যে নারায়ন দেবনাথ শিশু কিশোর মন থেকে শুরু করে বয়স্ক মনেও খুশির ঢেউ তুলে যান। এখানেও সত্যজিৎ রায় নিজের ছাপ রেখে গেছেন, এর পাশাপাশি কার্টুনে অন্যতম বড় নাম চন্ডী লাহিড়ী।

এতে গেল কলাশিল্প, বানিজ্য-শিল্পগত ভাবে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় বাঙালির অন্যতম পথিকৃৎ, বাঙালি ব্যবসা বোঝেনা এটা ভুল কথা তিনি প্রমান করেছিলেন। অর্থনীতিবিদ হিসেবে শুরুতেই অমর্ত্য সেনের নাম নেব, কারন ওনার নাম আমরা অবশ্যই জানি কিন্তু যে নামগুলো হয়তো অনেকে জানিনা তাদের মধ্যে রয়েছেন কৌশিক বসু, অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রণব বর্ধন, পি.সি. ভট্টাচার্য্য, অমিতাভ ঘোষ, দেবরাজ রায়, মৈত্রিশ ঘটক প্রমুখ।

গণিতবিদ হিসেবে ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিক্যাল ইনস্টিটিউট এর প্রতিষ্ঠাতা প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশ একজন বিশ্বমানের বাঙালি। অংকের ত্রিকোণমিতি বিষয়কে যিনি গুলে খেয়ে ছিলেন সেই বাঙালী রাধানাথ শিকদার এভারেস্টের উচ্চতা মেপে ছিলেন। বাঙালির বিজ্ঞান গবেষণায় জগদীশ চন্দ্র বোস, ডাঃ মেঘনাথ সাহা, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, প্রসাদ মিত্র, অশোক সেন, পার্থ দাশগুপ্ত, কুমার ভট্টাচার্য এরা সকলেই রয়েল সোসাইটি থেকে ফেলোশিপ সম্মান পেয়েছিলেন।

খেলাধুলার ইতিহাসে বিশ্বের সামনে বাংলার মুকুটকে উড্ডীন করেছেন আমাদের প্রিয় দাদা সৌরভ গাঙ্গুলী, এছাড়া গোষ্ঠ পাল, সূর্যশেখর গাঙ্গুলী, দিব্যেন্দু বড়ুয়া, পিকে-চুনী, এনারা তো রয়েছেনই অন্যদিক গুলোতে লিয়েন্ডার পেজ রয়েছেন, রয়েছেন লেসলি ক্লদিয়াস; এনারা সকলেই বাঙালি।

চিকিৎসা শাস্ত্রে বাংলার রূপকার, বাংলার সফল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, ডঃ বিধান চন্দ্র রায় প্রবাদপ্রতিম বাঙালী। নীলরতন সরকার, রাধাগোবিন্দ করের উত্তরসূরি ডক্টর রায় বাঙালির গর্ব।

বাঙ্গালী নিজেই একটা চলমান, তাই এই তালিকা শেষ হবার নয়, এমন কোনো দিক নেই জীবনযাত্রা, শিল্প সংস্কৃতি ইত্যাদির, যেখানে বাঙালি তার নিজের গর্বে গরীয়ান নয়। আজকে এই বাংলা ও বাঙালিকে অপদার্থ কেন্দ্রীয় সরকারের কিছু মাথা, তারা গ্রাস করতে উদ্যত। একবার বাংলাকে ভেঙেছে ধর্মের দোহাই দিয়ে আজ আবার বাংলা ভাষাকে বিলীন করতে উদ্যত একটা অবাঙালী দুষ্টচক্র।

হিন্দি থাক, উর্দু থা্‌ তামিল, অসমীয়া, তেলেগু, মালায়ালী থাক গুজরাটি সহ সকল আঞ্চলিক ভাষা বেঁচে থাক তার নিজের সংস্কৃতি নিয়ে। আদিবাসীরা তাদের অলচিকি ভাষাকে জীবিত রেখে দিক। আমরা চাপিয়ে দেয়ারও বিরুদ্ধে, জোর করে চাপিয়ে দেওয়া সভ্যতার পথে এক বড় অবক্ষয়।

এই দুর্দিনে বাঙ্গালী জাগ্রত হবে না আজ? তার গরিমাতে পদাঘাত করছে কিছু হিন্দুস্থানী বর্বর। আমরা প্রতিটি মাতৃভাষাকে সম্মান করি, মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধ সমান। অন্যকে যেমন সম্মান করি তেমনি নিজেদের ভাষাকেও সর্বাগ্রে সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী করে তবেই অন্যকে স্থান। আজকে সেই ভাষার জন্য, জাতিসত্তার গৌরবের প্রশ্নে আমাদের এক হতে হবে, আমাদের সামাজিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তাদের ঘৃন্য ও নিকৃষ্ট ভাবনা যাতে রুপায়ন না করতে পারে সেই লক্ষ্যে আমার সামাজিক লড়াই তীব্রতর হোক।

আমরা বাঙালি আজ ইতিহাস পড়তে ভুলে গেছি, তাই কিছু সস্তার রাজনীতির কারবারিদের লাই দিয়ে বসেছি। বাংলার ভাগ্য নিয়ন্তন করবে বসে স্বপ্ন দেখছে হিন্দি বলয়ের কিছু অসামাজিক মানুষজন যারা ক্ষমতার দম্ভে কিছু পা-চাঁটা স্তাবক লালন করে চলেছে। এরার স্বাধীনতার সময়ে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ব্রিটিশদের হাতে ধরিয়ে দিত, এরাই স্বাধীনতা উত্তর ভারতের জাতীয় পতাকাকে অস্বীকার করেছিল, এরাই ধর্মের দোহায় দিয়ে ভায়ে-ভায়ে অশান্তির বীজ বুজে ক্ষমতাতে টিকে থাকে। এদের থেকে সামধান, আরো ভয়াজন যারা মুখোশধারী দালাল শ্রেনীর রাজনৈতিক অমানুষের দল। সেটা রবি ঠাকুরের শান্তিনিকেতন দেশের কোন বড় নেতা হোক অথবা মাতঙ্গিনী হাজরার মাটির কোন বর্বর মানুষ; আমরা নেতা করেছি তাদের, যাদের পেটে চার পয়সার শিক্ষা-দীক্ষা নেই, এটা বাঙালি হিসেবে অবক্ষয়ের বৈকি। আজ আমাদের সেই পাপ তাপ সমস্ত ধুয়ে দেওয়ার সময় এসেছে, আমরা বাংলা ভাষাকে কতটা ভালোবাসি, বাঙালি হিসেবে কতটা গর্ব করতে পারি সেই বিষয়টা বুঝে নেওয়া ও বুঝিয়ে দেওয়ার সময় সামনে।

যার জন্য আগামী ২৬শে সেপ্টেম্বর বাঙালি সবচেয়ে বড় আইকন ‘পন্ডিত ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর’ মহাশয়ের জন্মদিনে আমরা অকপটে ‘বাঙালি দিবস’ হিসেবে দিনটিকে পালন করব। সেই বিদ্যাসাগর মহাশয়, যার বর্ণপরিচয় পড়ে আমাদের প্রাথমিক অক্ষর জ্ঞান হয়েছিল।

বাকিটা আপনার শুভবুদ্ধির উদয় ও তার প্রচেষ্টার উপরে বাঙালির ভবিষ্যৎ নিহিত।

-সম্পূর্ণ লেখাটির তথ্য ঋণ উইকিপিডিয়া

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *