বাপিদা

পুজোয় গন্ধ বাতাসে এলে প্রেম কোনও নতুন বিষয় ছিলনা আমাদের বন্ধুদের দলটিতে। শুধু কি আমরাই! আমাদের প্রাইভেট টিচার ছিলেন রত্নদ্বীপ ভাদুরী মানে বাপী’দা, আমাদের ক্রিকেট মাঠের ৩ নং ব্যাটসম্যানও বটে। ক্রিকেট মাঠে স্ট্যাম্প গার্ড করে দাঁড়ানো দাঁড়ানোটা ছিল ওনার ভীষণ বদঅভ্যাস, এবং তার জন্য আমাদেরই বন্ধুদের মাঝ খান হতে কখনো কোন আম্পায়ার রূপী বন্ধু যদি ওনাকে আউট দিত, তার কপালে শনির দশা ছিল আবশ্যিক। উনি আমাদের সাইন্সের টিচার ছিলেন, মানুষটা একজন মোটা থলথলে মার্কা এবং ভাবনাচিন্তাতে আমরা মনে করতাম যথেষ্ট গোদা টাইপের একজন মানুষ।

তিনি ফিজিক্সের ক্লাসে এমন বিটকেল মার্কা প্রশ্ন করতেন বা কেমিস্ট্রির ইকুয়েশন নিয়ে এমন ভাবে আমাদের মগজে হিজিবিজি ভয় ঢুকিয়ে দিতেন যে- ছেলেপুলে তাকে যথেষ্ট পরিমাণে ভয় করতো। তাই ওনাকে কেউ এলবিডাব্লু দিতেননা তথা দু’ওভার বেশি খেললে বা কোথাও ম্যাচ খেলতে গিয়ে ওনাকে তিন নম্বরে নামানোটা জবরদস্তি নেমে পরাটা আমাদের বন্ধুদের মধ্যে কেউই কোনো রকম কথা তুলতো না বা আপত্তি করতনা।

সারাক্ষণ ভীষণ গম্ভীর মুখে তিনি জ্ঞানগম্যি দিয়ে যেতেন,  বাড়ি একদম কাছেই এক প্রাইমারি স্কুলে তিনি সরকারি শিক্ষকতা করতেন। ক্রিকেট প্রেমী ও গোমড়ামুখো স্বভাবের বাইরে বাপীদার যে কোন চরিত্র থাকতে পারে সেটা আমাদের কাছে মারিয়ানা খাতের অতলে থাকা বস্তুর মতোই অজানা ছিল তখনও।

পুজোর সময় আমাদের সমুদ্রগড়ে ঠাকুর দেখার যথেষ্ট ধুম হয়, বিশেষ করে ভাসানের দিন। তখন 11-12 ক্লাসে পড়ি, সন্ধ্যায় বেরিয়েছি বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় হুল্লোড় করছি। আমরা সকলেই নেশাখোর মানে বিড়ি সিগারেট খায়, পুজোর ৩-৪ দিনে একটু আধটু প্রেমের পিছনে ধাওয়া সকলেই করত। আশেপাশে যাদের এক আধাজন প্রেমিকা ছিল তারা আলাদা হয়ে গেল, এবার আমাদের মত একজন যারা হতভাগা মানে ভালো ভদ্র বাপের মেয়ের সঙ্গে প্রেম করে, তারা অন্তত পুজোর সময়টা এলাকাতে থাকেনা, বেড়াতে চলে যায় পাহাড়ে-সমুদ্রে। সুতরাং, প্রেমিকার সাথে ঘুরে বেড়াবার চান্স পাওয়া যায়না, অতএব আমরা নতুনের সন্ধানে ঘুরে বেড়াতাম।

এমনই দিনে আমরা তখন প্যান্ডেলে ঘুরে বেড়াচ্ছি, দশমীর দিন সন্ধ্যার পরে। যে রাত্রে বাজি পোড়ানো হয় সেই অনুষ্ঠানের কিছু আগে হঠাৎ এক জায়গায় দেখি দূরে এক পরিচিত লোক। বাপিদা না? মোটেই চেনার উপায় নেই লোকটাকে, সারা জীবন যাকে সর্ষের তেল দিয়ে আঁচড়ানো পরিপাটি করে আঁচড়ানো চুলে দেখেছি- তাকে অমন জেল করা চুল আবার, নিচের ঠোঁটের নিচে ছোট্ট একটুখানি দাড়ির ঝুটি, মোটা গালপাট্টা জুলফি, তার সঙ্গে একটা ক্যাটক্যাটে গোলাপি রঙের পলকা ডট জামার সাথে সাদা রঙের একটা জিন্সের প্যান্ট গুঁজে পরিহিত। তার সঙ্গে লাল স্নিকার জুতো, এক হাতা গোটানো তাতে লোহার বালাটা দেখা যাচ্ছে, অন্য হাতে একটা জলন্ত সিগারেট।

সে এক এলাহি ব্যাপার, চেনাই যায় না লোকটাকে। ডেকে উঠলাম- ‘ও বাপিদা কী খবর? আর এখানে কোথায় গো’? যথারীতি আমাদের চিনতে না পেরে হাঁটার গতি আরো বাড়িয়ে দিল ভিড়ের মধ্যে। আবার চিল্লিয়ে বললাম-  ‘আমি তনু, তন্ময়…’। তিনি আরো একবার চাইলেন বটে, চেয়ে একটা জলন্ত অহুনে দৃষ্টি হেনে পরক্ষণেই আবার অচেনা হয়ে ভিড়ে মিলিয়ে গেলেন।

তিনি অচেনা হয়ে যেতেই পারেন, তাবলে তো আমরা পারিনা- এইরকম চকরাবকরা ঝিলিক মারা সিল্কের শার্টের সাথে রূপসী মেয়েটি কে? ওমা- মেয়ে দেখি আমাদেরই সহপাঠি সোমা; সোমা বিশ্বাস। আমাদের সঙ্গেই পড়ে সাইন্স নিয়ে, বাপিদার কোচিঙয়েই। সে বাপীদার থেকে অন্তত 10-12 বছরের ছোট হবে কমপক্ষে, এখন সেই মেয়েকে নিয়ে বাপিদা বেড়াতে বেরিয়েছে। বর্তমানের ঘনষ্টতা মোটেই ছাত্রী-শিক্ষকের সম্পর্কের দৃষ্টান্ত নয় তা ব্লাই বাহুল্য। যাই হোক পরবর্তীতে শুভেন্দু মানে আমাদের অন্যতম বন্ধু, তাকে বলেছিলাম- ‘কিরে, আমরাই তাহলে একমাত্র চার অক্ষরের রয়ে গেলাম!’

সে বলল- ‘আমরাই সবচেয়ে হতভাগা, তাতে কোনো সন্দেহ নেই’। ভোদাই বলল- তা বলে বাপীদার মতো এমন গোল আলু মার্কা তেল-কেষ্টও এমন উর্বশী জুটিয়ে ফেললো, আর আমরা পাছা চুলকে ঘা করে ফেললাম! এরচেয়ে ট্যাঙ্কের জলে ডুবে মরা ভাল ছিল তনু’-।

বিজ্ঞ শুভেন্দুর জবাব ছিল- ‘আরে ও কিছু না ভাই, এ সব পুজোর প্রেম; সবাই করে’। আমরা বাকি তিন চারজন আঁতকে উঠে বললাম- ‘তা বলে বাপিদা’? সমাজে আমাদের কোনো প্রয়োজন আছে? শুভেন্দুর স্বগতোক্তি- ‘পুজো মানেই অনেক অসাধ্য হয় রে পাগলা- একেই বলে পুজো, পুজো আর প্রেম অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত’। আমাদের সর্বাঙ্গে শীতল শিহরণ খেলে গেল একটা।

এর একটা পজিটিভ দিকও ছিল, আমাদের মনে আত্মবিশ্বাস দিয়ে গেল যে- বাপিদা যদি আমাদের ব্যাচের অন্যতম সুন্দরী মেয়েটিকে প্রেমে ফাসাতে পারে তাহলে, আমাদের সকলের হতে পারে। শুধু লেকেহ থাকতে হবে সু-সময়ের প্রতীক্ষায়।

আজও সেই অর্থে আমরা বাপীদা কেই গুরু বলেই মানি।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *