মোদীজির নোবেল প্রাপ্তি ও গুজরাত রাষ্ট্রঃ একটা সম্ভাবনা

শুধু গুজরাতিরাই কেন বিপুল টাকা মেরে দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে? ২৮ জনের ২৮ জনই গুজরাতি। যত ব্যাঙ্ক জালিয়াতি তাদের প্রায় সকলেরই কেন্দ্রে গুজরাতিরাই কেন? প্রতিটি অর্থনৈতিক জালিয়াতির ও দুর্নীতির মূল ভরকেন্দ্র গুজরাতই কেন? তাদের এই চুরির দায় কেন নেবে বাকি ভারতবাসী? নোটবন্দির সুদুরপ্রসারী উদ্দেশ্য কি ছিল? দেশের এতো শিল্পপতির মাঝে গুজরাতি আদানী-আম্বানীকেই কেন বর্তমান সরকার প্রোমোট করছে? ভেবেছেন কখনও এই প্রশ্নগুলো নিয়ে?

এভাবে চললে কতদিন ভারত থাকবে? অদৌ থাকবে?

একটু আয়না দেখি আসুন

**********

সোভিয়েত ইউনিয়ন নামটা কী শোনা আছে আপনাদের? আজকের এই ভারতের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল এই সোভিয়েত ইউনিয়ন। তাদের হাতে সেদিনও ভেটো ক্ষমতা ছিল, যেটা আজও আছে; অবশ্য সেটা রাশিয়ার নামে। তৎকালীন আমেরিকার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল এই সোভিয়েত, যাদের কাছে ছিল রাসায়নিক অস্ত্র, পরমানু অস্ত্র, বিশ্বের একচেটিয়া সমরাস্ত্র বাজার, বিপুল পরিমান পেট্রলিয়াম সম্পদ, বিজ্ঞান ও মহাকাশ গবেষণায় উৎকর্ষতা, ক্রীড়া ক্ষেত্রে শীর্ষ স্থান ইত্যাদি সবই ছিল সোভিয়েতের দখলে। সোভিয়েতের মুদ্রা ‘রুবেল’ তখন পাউন্ড, স্টার্লিং, ডলারের সাথে তুল্যমূল্য বিচারে ছিল। তবুও টুকরো-টুকরো হওয়া থেকে বাঁচতে পারেনি নিজেকে। সোভিয়েত ১৫টা টুকরো হয়েছিল রাশিয়া সহ; সিটবেল্ট বেঁধে নিন, ভারতকেও মোদীশাহসুর ভেঙেই ছাড়বে। প্রশ্ন হচ্ছে কটা ভাগে ভাঙবে?

সোভিয়েত রাশিয়া একটু একটু করে জুড়ে জুড়ে একটা পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র হয়েছিল, ৬৭ বছর ধরে। ভারতও কাশ্মীর জুড়লো এই হালে, ৭২ বছর বয়সে এসে। এর আগে ১৯৭৫ সালে সিকিম ভারত রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। সোভিয়েত দেশটি ছিল খ্রীশ্চান, ইহুদী ও ইসলাম এই তিনটি পরস্পর বিরোধী আব্রাহামীয় ধর্মের মানুষ নিয়ে গঠিত ‘সমাজতান্ত্রিক’ দেশ, যা সেই ঐতিহ্য রক্ষা করে এসেছিল দীর্ঘদিন ধরে। যেমন আজকের ভারত বহু ধর্মের সমন্বয়। দুটো দেশই বহু ভাষাভাষী, বহু আলাদা আলাদা কৃষ্ট্‌ সংস্কৃতি, খাদ্যাভাস, ধর্মচারণ নিয়ে গঠিত ছিল। তবুও হিন্দু-মুসলমান বিভেদ, ইহুদী-খ্রিষ্টান বিভেদের মত মহামারি প্রকারের নয়। এহেন USSR ভেঙে মধ্য এশিয়ায় ৫টা ইসলামিক দেশ তৈরি হয়েছিল। বাকিগুলো নেটে খুঁজে নিলেই পাবেন।

ভারতের ‘নরেন্দ্রাইল মোদীচেভ’ আগামীতে এটাই উপহার দেবেন, ভারত লুঠে করে তিনি গুজরাত রাষ্ট্র বানাবেন। সেটা করতে গিয়ে অবশিষ্টটা যতগুলো ভাগ হয় হোক, তাতে ওনার কী এসে যায়! লিখে রাখুন, আজ প্রলাপ মনে হচ্ছে, কিন্তু এটাই এদের উদ্দেশ্য। ভারতের টাকা নিয়ে গুজরাত দেশ গড়ে উঠবে। সেই পুরাতন লুন্ঠনের ইতিহাস, নাদির শাহ ভারত লুঠ করেছিল, আজ তারই দুষ্ট রক্তের উত্তরসূরি অমিত শাহ আজকের ভারত লুন্ঠন করছে।

যুদ্ধটা দৃশ্যত হয়ত সৈনদের মাঝে হয় কিন্তু জয় পরাজয় নিশ্চিত করে গোয়েন্দাবাহিনীর সফলতার উপর। আমেরিকার CIA যখন KGB কে টেক্কা দিল তখনই সোভিয়েতের ললাট লিখন স্পষ্ট হয়ে গেছিল।

সমাপন গুলো দেখুন, পতনাভিমুখ সোভিয়েতের গোয়েন্দা সংস্থা KGB এর মতই আমাদের RAW ও প্রায় কোমায় চলে গেছে, নতুবা ওইটুকু টিউমারের সাইজের দেশ পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ISI বলে বলে নিত্যনতুন হামলা চালাতে পারতনা RAW এর চোখে ধুলো দিয়ে। প্রতিটি জঙ্গি হামলাই কিন্তু গোয়েন্দা ব্যার্থতা, এটা ইচ্ছাকৃত ভাবে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়েছে, নতুবা আমাদের গোয়েন্দা সংস্থা এমন অমেরুদণ্ডী ছিলনা আগে।

একটু অন্য প্রসঙ্গ পড়ুন-

মোদী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল। তার ছেলে শৌর্য ডোভালের ছেলের কোম্পানির একটির নাম ‘টর্চ ইনভেস্টমেন্ট’, যার হেড অফিস সিঙ্গাপুরে। এই কোম্পানির অন্যতম পার্টনার বা মালিক- ‘সৈয়দ আলী আব্বাস’ একজন পাকিস্তানী। ‘জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা’, যার কাজ পাকিস্তানের বর্বরতা জঙ্গি কার্যকলাপের হাত থেকে কীভাবে দেশ বাঁচবে সেটার উপদেশ দেওয়া, তার ঘরেই পাকিস্তানীর বাস- কী কিউট তাইনা?  এর পরেও আপনার ভক্ত মন বিশ্বাস করে যে এগুলো RSS ও PMO দ্বারা অনুমতি না নিয়েই চলছে। এর পরও দেশপ্রেমিকেরা আপনাকে পাকিস্তানের নামে মুর্দাবাদ দিয়ে আপনাকে দেশপ্রেম শেখাতে আসবে, যাদের নেতা অশিক্ষিত গাম্বাট দিলীপ ঘোষ।

সোভিয়েতের সংবাদ সংস্থা ‘তাস’ ও সংবাদ পত্র ‘প্রাবদা’র অন্তর্জলী যাত্রা ঘটেছিল গর্বাচেভের আমলেই। ‘RSS পরিচালিত বিজেপির প্রধানমন্ত্রী’ নরেন্দ্র মোদীর শাসনেও ‘RSS’ এর মুখপত্র ‘পাঞ্চজন্য’ এর থেকে রিপাবলিক টিভির অর্ণব গোস্বামীর দড় অনেক বেশি। PTI এর কথা ছেড়েই দিন, সে তুলসীতলায় অন্তিম শ্বাস তুলছে। সংবাদ মাধ্যমের নুন্যতম বিশ্বাসযোগ্যোতা নেই।

যারা আজকের ভারতে প্রোপ্যাগান্ডা ছড়াচ্ছে এরা কারা? চলুন একটু দেখে নিই-

রিপালবিক টিভির মালিকানা অর্ণব গোস্বামীর ‘সার্জ মিডিয়ার’ কোম্পানির সিংহভাগ শেয়ারের মালিক ‘জিরা জয়েস শাহ’ নামের এক গুজরাতির, যার প্যান কার্ড নাম্বার GGAPS9507L, এই সমস্ত তথ্য ‘আমি’ মিনিস্ট্রি অফ কর্পোরেট এফেয়ার্স থেকে পেয়েছি। সুতরাং,  রিপাবলিক টিভি নামের যে প্রোপাগন্ডা মেসিন, সেটারও প্রোমোটার একজন গুজরাতিই। এদের চ্যানেলের ট্যেকনিক্যাল পার্টনার রাজীব চন্দ্রশেখরকে বিজেপিই রাজ্য সভার MP বানিয়ে দিয়েছে, যেমন Z-news এর কর্নধার সুভাষ চন্দ্রকে MP বানিয়ে দিয়েছে। আরেকটা প্রোপ্যাগান্ডা নিউজ চ্যানেল টাইমস নাও, যার মালিক ইন্দু জৈন- বিশ্বের প্রথম সারির ধনকুবের। যাকে ২০১৬ সালে মোদী সরকার পদ্মবিভূষণ পুরস্কার দিয়েছিল- ইনিও গুজরাতি। প্রোপ্যাগান্ডা কারা ছড়াচ্ছে দেশে? একটাই জবাব- গুজরাতি।

সোভিয়েতে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা ছিল, অমিত শাহও সেই প্রস্তাবের পক্ষেই চতুর্দিকে ধুয়ো তুলছে আজকাল। সোভিয়েতের অন্তিম লগ্নে ‘রুবেলের’ অবস্থা ইন্ডিয়ান রুপির মতই বামন হয়ে গেছিল। অবমূল্যায়নে এমন প্রতিরূপ মেলা মুশকিল, ইন্ডিয়ান কারেন্সি রোজই কিছু না কিছু কমছে।

মিখাইল গর্বাচেভ পৃথিবী পরিক্রমা করতে ভালবাসত, মোদীও তাই। দুজনেই প্রথমে পার্টির প্রধান হয়ে রাষ্ট্রের প্রধান হয়েছিল, গর্বাচেভের একটা বরিস ইয়েলেৎসিন ছিল, মোদীরও একটা অমিত শাহ আছে। দুজনের পার্টির বরিষ্ঠ সদস্যদের বিতারিত/নিষ্ক্রিয় করেছে, পার্টি তথা দেশের ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছিল।

দেশের কর ব্যবস্থাকে রোজ এমন ভাঙ্গাচোরা করবে যে আপনি বুঝতেই পারবেননা কী ছিল আর কী হবে। বেশি কিছু প্রশ্ন করলেই দেশপ্রেমের প্রশ্ন তুলে আপনাকে পাকিস্তান পাঠানোর বন্দোবস্ত করবে, আরো বেশি এগোলে কালিবুর্গি, দাভালকর করে দেবে। ভারত ভাঙার জন্য কোনো বিদেশী শত্রুর দরকার নেই এই মুহুর্তে, একা গুজরাতি বেনিয়ারাই যথেষ্ট, এবং তাদের পরিকল্পনাও সফল এখনও পর্যন্ত প্রয়োগে।

কেন ভাঙবে?

আমার আপনার সংসারে অশান্তি কখন শুরু হয়? যখন অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি হয়, মূলত তখন। এক্ষেত্রেও পরিস্থিতি সেই দিকেই নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ১১ বছররেরও বেশি সময় ধরে মোদী মুখ্যমন্ত্রী ছিল গুজরাটের, এখনও তিনি গুজরাতেরই মুখ্যমন্ত্রী। বাকি দেশটা ফাও। ওটা লুটে নেওয়ার জন্য গুজরাতিদের লুটেরাদের হয়ে রাষ্ট্রশক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করছেন।

Ministry of Statistics and Programme Implementation এর তথ্য অনুযায়ী- ভারতের ৩৩ টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির মধ্যে গোয়ার মাথাপিছু আয় সবচেয়ে বেশি। রাজধানী দিল্লি ভারতের দ্বিতীয় ধনী অর্থনীতি। সিকিম, চন্ডীগড় ও হরিয়ানা তৃতীয় স্থানে রয়েছে। সমস্ত শীর্ষ অঞ্চলগুলির জনসংখ্যা ২ কোটিরও কম। দক্ষিণ ভারতের পাঁচটি রাজ্যেরই মাথাপিছু GDP ভারতের গড়ের চেয়ে বেশি। মজার বিষয় হচ্ছে- গোবলয়ের বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড, ছত্রিসগড়, ওড়িশা এবং উত্তরপূর্বের মণিপুর ও আসাম শীর্ষ স্থানীয় দরিদ্রতম রাজ্য। গোবলয়ের সবকটি রাজ্যের চেয়ে অরুণাচল প্রদেশ বা জম্মু-কাশ্মীরের GDP per capita বেশি। রাজ্যওয়ারি GDP এর তুলনাতে মহারাষ্ট্র প্রথমে, যেখানে গুজরাত পঞ্চমে ও আমাদের রাজ্য ষষ্ঠে। সুতরাং দেশ জুড়ে আয়ের যে চূড়ান্ত বৈষম্য সেটা তো আছেই এর সাথে জুড়েছে যে অর্থনৈতিক মন্দা এটাকে সামাল দিতে না পারলে ‘ভারত’ ছিল হয়ে যাবে অচিরেই। কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের ৫% DA দিয়ে মজন্তালী সরকারের মত হাত উঁচু করে দেখো আমি জল মাপছি করে কদিন টানে সেটাই দেখার।

সোভিয়েতের আমলে রাশিয়ার ‘পার-ক্যাপিটা-ইনকাম’ ছিল ১৪ থেকে ১৮ ডলার, বর্তমানে তা ২৪ হাজার ডলার। আমার আশঙ্কা গুজরাতকেও আলাদা দেশ করে দেওয়া হবে। তখন সমস্ত চোর গুলো যারা ভারতের টাকা নিয়ে বিদেশে পালিয়েছিল বা মোদীশাহসুরের তত্ত্বাবধানে বিদেশের আশ্রয়ে ছিল, তারা গুজরাত রাষ্ট্রে ফিরে আসবে। গুজরাতে ৩৭টা জল বন্দর রয়েছে, সাথে কাম্বে অঞ্চলের প্রেট্রোলিয়াম সম্পদ। আর আছে মোদী, অমিত শাহ, আদানী-আম্বানী ইত্যাদি ইত্যাদি…

আপনার আমার আছে পাকিস্তান, আসাম, NRC, ডিটেনশন ক্যাম্প, জাতপাত, ভোটের মৃত্য, মহরমের তাজিয়া, দুর্গা পুজোর মন্ডপ সজ্জা, মব লিঞ্চিং, JNU যাদবপুর, দিলীপ ঘোষ- চিন্ময়ানন্দ নিয়ে পরে আছেন। গুজরাতিরা কিন্তু প্ল্যান মাফিক এগোচ্ছে।

মমতা ব্যানার্জীও কিন্তু ন্যানোকে গুজরাতে পাঠিয়েছিল, বাঙলার সর্বশেষ শিল্প সম্ভাবনা। এই মমতা ব্যানার্জীই বাংলায় NRC এর ভিত পুজো করেছিল, বাঙলাকে অশান্ত করতে। সবটাই কী ভীষণ রকমের কাকতালীয় তাইনা? আমাদের নিষ্পাপ মননে এসব ভাবার জটিলতা থাকতে নেই, থাকলে ঠাকুর পাপ দেবে। রিনা ঠাকুর।

এটা বাজপেয়ী-আদবানীর বিজেপি নয়, এটা মোদীশাহসুরের বিজেপি, দুটো এক নয়। ধর্ম ধর্ম করতে করতে দেশ ভেঙে ২০ টুকরো করে দেবে। পার্শি শাহ যখন হিন্দু ধর্মের ধারক হয় তখন এমনটাই যে হয় সেটা বলাই বাহুল্য। আজকে শুধু বাঙালী বা অসমিয়া বা মুসলমানেরাই বিপদে নয়, ‘ভারত’ রাষ্ট্রের অস্তিত্বই আজ চরম সঙ্কটে; পরিকল্পিত চক্রান্তের কবলে। আমরা শুধুই দর্শক মাত্র, কারন কবে মুসলমান হওয়ার দোষে যে ডিটেসশন ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেবে জানতেও পারবনা। এক বিয়োগান্তক সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের মহেন্দ্রক্ষণে আমরা দাঁড়িয়ে, এরপর শ্বশুরবাড়ি ভুবনেশ্বর যেতে গেলে হয়ত ভিসা লাগবে।

দেশদ্রোহীদের মত পোষ্ট তাইনা? তেতো সত্যি তো, তাই কষ্ট হচ্ছে হজম করতে।

সুতরাং মোদী যে নোবেল পুরষ্কার পাবেই তাতে কী সন্দেহ রয়েছে? ভারত ভেঙে দিতে পারলেই পুরস্কার বাঁধা, যেমন গর্বাচেভ নোবেল পেয়েছিল সোভিয়েত ভেঙে।

আমরা মোদীজির নোবেল শান্তি পুরষ্কারের প্রতীক্ষায় রইলাম।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *