NRC: ‘আমাকে’ তাড়াতেই

NRC এর নীল নক্সা

আমি নিজে কোন পক্ষে?

আমি চাইছি NRC প্রক্রিয়া অন্তত শুরু হোক। দেখা যাক কারা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী আর কারা এদেশীয়। দুধ আর জলের ফারাকটা হয়ে যাক। আমি বা আমার মত যাদের ১৪ পুরুষের বাস এই দেশেতেই ও যারা ১৮০০ সালের জমির কাগজ যোগাড় করতে পারব প্রয়োজনে, তারা ঠিক কোনো না কোনো উপায়ে বেঁচে বেড় হবই। না হলেও অসুবিধা নেই, সবাই যে মুখে যাবে আমিই বা তাদের চেয়ে আলাদা কেন হব! সত্যিকারের অনুপ্রবেশকারীরা দেশছাড়া হোক এটাই আমার কামনা ও দাবী।

অন্তিম ফলাফল

আমি হাসতে হাসতে ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে যাচ্ছি।

উপসংহার

আমাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে ডিটেনশন ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রসিদ্ধ বিশৃঙ্খলা বাহিনীর দল। আমি জানিনা আমার স্ত্রী, কন্যারা কোথায় আছে! কারন আমি মুসলমান, আমাকে তাড়াতেই না-নাগরিকতার এই নীল নক্সা বানানো হয়েছে।

কেন আমাকে তাড়াতে হবে?

আমার প্রথম অপরাধ আমি ‘মুসলমান’, তাই আমাকে শাস্তি পেতেই হবে। সেটা হয় মৃত্যু অথবা রোজমৃত্যুর আখারা দিটেনশন ক্যাম্পে প্রেরণের নামে, ছলে বলে কৌশলে আমাকে দেশছাড়া ককরিয়ে দেওয়া। আমাকে রাষ্ট্রীয় অধিকার থেকে বঞ্চিত করে পশুদের মত জীবনযাত্রায় বাধ্য করা। আমার ভু-সম্পত্তি, আমার রোজগারকৃত অস্থাবর সম্পত্তি লুঠের মাল জয় শ্রী রাম (নাত্থুপন্থী) ধ্বনি সহ, নিজেদের প্রাপ্য ভেবে নিয়ে, নব্য দেশপ্রেমিকদের মাঝে বিলি বন্টন করে নেবার বাসনাতে। আমার স্ত্রী-কন্যারাও সেই বন্টনের মাঝে পড়বে কিনা জানিনা, ইতিহাসের পরম্পরা অনুযায়ী তাদেরও দেশপ্রেমিকদের মাঝে বিলি বন্টন হয়ে যাবারই কথা। যে ‘আমি’ চাকুরী করি, সেই চাকুরী গুলো নিজেদের মাঝে ‘ঈশ-বিষ-ধানের শিষ’ করে বেছে নিয়ে টপাটপ চেয়ারগুলোতে বসে যাবে।

কারা চেয়েছে এই NRC?

জাতি হিসাবে বাঙালি আর আগেও একবার ছিন্নমূল হয়েছিল। ইতিহাস বলছে সাতচল্লিশে যখন ধেড়ে খোকারা ভারত ভেঙে ভাগ করেছিল, তখন নেহেরু কারো কোনো দায় নেয়নি। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কুর্সির বাইরে খুব বেশি মনোসংযোগ করতে পারেননি। এদিকে নাগপুরের বর্তমান বাছাদের মহাপ্রভু শ্যামাপোকা সরি শ্যামাপ্রসাদ- ‘পাকিস্তান ভেঙে দিয়েছি’ খুশিতে কাশ্মীরে দৌড়েছিল বাংলা ফেলে। এদিকে শেয়ালদা ষ্টেশন চত্বর তখন রিফিউজি ক্যাম্পে পরিণত হয়েছে। দেশভাগের যে দায় তা পাঞ্জাব আর বাংলার উপরই একমাত্র পড়েছিল। একমাত্র বাঙালি হওয়ার কারণেই লাথি-ঝাঁটা, ধর্ষন, হত্যালীলা, ডিটেনশন ক্যাম্প ইত্যাদির জ্বালাতনের কারণে তারা কেউ ত্রিপুরা, কেউ আসাম, কেউ আন্দামান, কেউ দণ্ডকারণ্য, বা কেউ মরিচঝাঁপিতে আশ্রয় নিয়েছিল আলাদা আলাদা সময়ে। এদের একটাই অপরাধ বাঙালি ছিল।

এনআরসি সেই ব্রিটিশ পিতাদের বর্তমান যারা উত্তরাধিকার মানে মনে-প্রাণে, পরাধীন ভারতে যারা ব্রিটিশদের হয়ে গোলামী করত,  সেই ভারতীয় আতঙ্কবাদী সংগঠন ‘সংঘ পরিবার’ বা তৎকালীন হিন্দু মহাসভা বারেবারে গিরগিটির মতো রং ও নাম পরিবর্তন করে বর্তমানে আরএসএস ও সেই আরএসএসের রাজনৈতিক মুখোশ বিজেপি আজ আবার ওই একই কায়দায় রাষ্ট্রের মাঝখানে দাড়ি টেনে দিয়ে বলে দিচ্ছে তুমি বিদেশী তোমার এখানে ঠাঁই নাই। বাঙালী খেদিয়ে গুজ্জুদের স্থান করে দিতে হবে, কারন স্বাধীনতার পর থেকে সবথেকে যে রাজ্যগুলোতে জনসংখ্যার ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে সেগুলোর অন্যতম গুজরাত, বাংলার চেয়ে অনেকটা এই হার বেশি এমনকি রাষ্ট্রীয় গড়ের চেয়েও বেশি।

দ্বিতীয় খন্ড

বাঙালীদের মধ্যে থেকে কারা চাইছে NRC

মুখ্যভাগে

বাংলাদেশ হতে ওদেশর মুসলমানেদের হাতে অত্যাচারিত হয়ে আসা বাঙালের একটা বড় অংশ, শুধুমাত্র কাষ্ট সিস্টেমের সুবিধা উপলব্ধ করার জন্য বাংলাদেশ থেকে ভারতে আসা ধান্দাবাজি বাঙাল নমুনাদের ১০০% এই NRC এর পক্ষে ছিল। ভাবটা এমন যে, ওদেরশের মুসলমানেদের অত্যাচারের দায় আমাদের, যেহেতু আমরাও ধর্ম বিশ্বাসে মুসলমান। তাদের একটাই সুখ, দেখ কেমন মুসলমানেদের গুছিয়ে দিলাম, মুসলমানেদের কষ্ট দুর্দশা দেখে অন্তরে পৈশাচিক সুখ লাভের জন্যই এরা নিজেরা ‘উড়ে এসে জুড়ে বসা’ শরনার্থী হয়েও NRC এর নামে মুসলমান তাড়ানোর সুখে মেতে উঠেছিল। এদের দেখলেই শুধাবেন- একটা RSS স্বাধীনতা সংগ্রামীর নাম বল, দেখবেন খিস্তি দিতে দিতে খেকির মত পালাবে।

এদের মাঝেও তিনটে ভাগ, পরবর্তী সহায়ক দলে ওদের বর্ণনা রয়েছে।

সহায়ক দল

এ দেশীয় হিন্দু, যাদের ‘ঘটি’ নামে ডাকা হয়; তাদের একটা সিংহভাগ অংশ, যারা হোয়াটসএ্যাপ বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে সাম্মানিক ডিগ্রি হাসিল করে স্বঘষিত দেশপ্রেমের ঠিকে নিয়ে বসে আছে।

দুটো দলই মোটামুটিভাবে তিনটে ভাগে বিভক্তঃ-

প্রথম দল এক্কেবারে নিরেট, গাম্বাট, অশিক্ষিত, বর্বর, অসভ্যের দল। এরা দুকান কাটা, প্রকাশ্যে বাংলাতে NRC এর পক্ষে মিটিঙে মিছিলে জিন্দাবাদ ধ্বনি এরাই তুলছে ক্রমাগত। পাকিস্তানকে গালি দিলেও ভাবনাতে এরাই যোগ্য পাকিস্থানি, তাই এদের মাঝ খান থেকেই ISI এর চর থেকে ‘রিনা ঠাকুরের সাবান মামন’ সবই বেড় হয়। তাদের মত এক দেশ এক ধর্ম তত্ত্ব মেনে ‘গণতান্ত্রিক ভারতবর্ষ’কে ‘হিন্দু’স্থান করার স্বপ্নে বিভোর; যেভাবে বৌদ্ধদের হাপিস করেছে। সুতরাং ১৩% মাত্র মুসলমানকে তাড়াতেই হবে, আর ছোটলোক শ্রেনীর অমুসলমান গুলোকে দাস বানিয়ে ফেলা নিজেদের সেবাতে। অবশ্য মহিলাগুলোকে সেবাদাসী বানিয়ে নেবে, ওদের ঘর ওয়াপসি করাবে নতুবা তাদের জাত নেই, যেমন বেশ্যাদের জাত থাকেনা বা মদের গ্লাসে সাম্য থাকে।  

দ্বিতীয় দলটা নীলবর্ণ শেয়ালের মত বর্ণচোরা, এদের সংখ্যাই বেশি সমাজে। এরা মূলত স্রোতের গু’এর মত এঘাটে ওঘাটে ভেসে বেড়ায়। বামবৃত্তে যখন থাকে তখন এরা সিপিএম বিরোধী বামপন্থী, সিপিএমকে এরাই ভাম বলে সম্বোধন করে। মুসলমান বৃত্তে সেকুলার অথবা নাস্তিক সেজে টিকটিকির মত তথ্য সংগ্রহ করে। নিজেরা দু কলম লিখতে পারুক বা না পারুক এরা নাগপুরের বার্তা গুলোকে সমাজের বুকে প্রায় সর্বত্র নাকের সিকনির মত যত্রতত্র ছুঁড়ে ফেলে প্রচার করে বেড়ায়। ধর্মীয় মেরুকরণ ক্যান্সারের মূল কার্সিনোজেন হল এরা। এরা আপনার আমার টাইমলাইন জুড়েও রয়েছে ভেকধারী বন্ধু সেজে। কি করে চিনবেন? গুজ্জু বরাহনন্দটা বা মনুষ্যরূপী শারমেয় দিলীপের ‘মুসলমানদেরই তাড়াবো’ বা ‘লাশের উপর দিয়ে NRC করব’ বানীর পরেও নিশ্চুপ থাকে তারাই আসলে এই নীলবর্ণ শেয়াল। এরাই প্রথম দলটাকে সাহসের সরবরাহটা করে, পাশাপাশি ভুয়ো তথ্যগত যাবতীয় সকল কিছুরই সরবরাহকারী।

তৃতীয় দল, এরা মোটামুটি নির্জীব। এরাও মানসিক ভাবে উপরের দুই দলের সাথেই থাকে। এরা বিত্ত, আশ্রয়, ও ওদের আপদ বিপদে পাশে দাঁড়িয়ে তাদের হয়ে লড়াই করে, নিভৃতে।   

অদৃষ্টের পরিহাস

আমার বাড়ি নদীয়া ঘেঁষা প্রান্তিক বর্ধমানের সমুদ্রগড়ে, যেখানের ৯০ শতাংশ জনসংখ্যাই ৯০ সালের আশেপাশে বাংলাদেশ হয়ে আসা অনুপ্রবেশকারী। সত্যি বলছি ওদের জন্য আমাদের কারো এখানে কোন অসুবিধাই হয়নি, কখনও মনে হয়নি ওরা আলাদা। আমাদের বন্ধু বান্ধবদের অধিকাংশই তারা; বরং আমাদের এই এলাকা ওদের আসার আগে জঙ্গল ছিল, ওদের কারনেই এলাকার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ঘটেছে। আজকাল বাজারে গেলেই আমি ওদের শুধায়- ‘কী ভাই, খবর কি’? ওমা ওতেই ওরা ‘তেষট্টি’ বলার মত ক্ষেপে খ্যাপা ষাঁড় হয়ে যাচ্ছে কেউ তো কেউ নীরবতার খোলসে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে। চালু ওষুধের দোকানদার বসাকদা হোক বা সব্জি বিক্রেতা মিন্টু বা ভটভটির চালক কালাচাঁদ সকলেই ভিটেমাটি চাঁটি হওয়ার ভয়ে ভীত।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আমাদের এই অঞ্চলের সমুদ্রগড়, শ্রীরামপুর, নসরতপুর, ধাত্রীগ্রাম, কালেখাতলা অঞ্চল গুলো সেই বিজেপির জন্মলগ্ন থেকেই ‘জয় শ্রী রাম’ ধ্বনী সহ পঞ্চায়েতের ক্ষমতাতে আসা-যাওয়া করেছে তৃণমূলের সাথে লুকোচুরি খেলে। পাতি বাংলাতে বিজেপি নামের দলটা সর্ব প্রথম যে যে স্থান গুলোতে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করেছিল জন্মের পর- তাদের মধ্যে সারা দেশের নিরিখে আমাদের অঞ্চলটার কুখ্যাতি রয়েছে- সৌজন্যে? ওই পূর্ব বঙ্গ থেকে আসা অনুপ্রবেশকারীররা। যারা ১০১ শতাংশ হিন্দু ধর্মাবলম্বী।

গত কয়েকদিন ধরেই দেখছি, যে বুড়ো ষাঁড় গুলো এককালে ‘হালার মোচোলমান খেদাইমু’ বলে গেরুয়া তান্ডব করত, তারাই রাজনৈতিক ঝান্ডা সরিয়ে পথের ধারে মাইক বেঁধে, কীর্তনের আসরে, পাড়ায় পাড়ায় গ্রাম সভা করে কাঁদুনে গলায় বক্তিমে দিচ্ছে- ‘আমরাই বিজেপিরে দ্যাশে আনসিলাম, রাম মন্দিরের লইগ্যা ব্যাবাক যুদ্ধ করসি- আমাগো তাড়াইবার সোক্রান্ত হইতাসে; এই বিজেপিরে আমরা সোসানে তুইলা দিমু…’। এগুলো যখনই কানে পৌছাচ্ছে অমনি সুখের বীর্যপাতে হৃদয় উপচে যাচ্ছে প্রতিবারে।

সুখের উন্মাদনা তখন আরো বেশি বৃদ্ধি পাচ্ছে, যখন দেখছি ওপাড় বাংলা থেকে আসা শিক্ষক ফেসবুক বন্ধুদের একটা অংশ যখন বলছে- ‘প্রয়োজনে আলাদা দেশ হবে, তার আগে গুজ্জু শুয়োরটাকে শিক্ষা দিয়ে যাব’। কেউ বলছে “২ কোটি তাড়ালে আমরাও যাওয়ার সময় আরো ২ কোটি (নাত্থু) রামভক্তকে ‘রামনাম সত্য হ্যায়’, করতে করতেই ডিটেনশন ক্যাম্প পানে যাব”। যাতে ভারতভূমে RSS নামক সন্ত্রাসীদের কোন বীজ না থাকে”। সত্যি বলছি, একটা তূরীয় আসুরিক উল্লাস বোধ করছি, এদের চখে-মুখে শরীরি ভাষাতে এমন ভয়ের চাষ দেখে। এরাই আমাকে ভয় দেখাতে দেখাতে নিজেরাই চোরাবালিতে পরে গেছে। ‘আমার’ বাড়ির সামনে দিয়ে মিছিল নিয়ে যাবার সময়- ছেঁড়া ছেঁড়া কটুক্তি গুলো ছুঁড়ে দিত আলতো করে।

হঠাৎ কেন তাদের এই ভয়?

আসলে মুসলমান খেদাতে গিয়ে কখন যে অহমীয়া দেশপ্রেমিকদের একটা বড় অংশ ডি-ভোটার ও বিদেশী বলে চিহ্নিত হয়ে গেছে তারা ধরতেও পারেনি। শুরুতে আসামের দেশপ্রমিকেরাও বাঙালী ও মুসলমান তাড়াবার সুখে বুঁদ হয়েছিল। এই সব দেখে এদেশীয় ওই সব ‘হিন্দু বীর’ তাদের অণ্ডকোষ সরষের দানার সাইজে হয়ে গিয়ে কিডনি হয়ে এলজিভের কাছে উঠে এসেছে। এখন না পারছে গিলতে না উগরাতে। কুত্তার লেজে ডাঁশ বসলে কুত্তা যেমন গোল গোল ঘোরে, এদেরও তেমন ছিটিয়াল দশা হয়েছে।

শান্তিপ্রিয় হিন্দুদের এরা সেকু নামে ডাকে, তাদের শান্ত স্বভাবকে দুর্বলতা ভাবে। মুসলমানেদের শুত্রুভাবে, তাতে এরা কেউওই কোনো মুসলমানের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ না হোক। এরা আফগানিস্থানে তালিবান হয়ে বামিয়ানের মুর্তি ভাঙে, এরাই থাইল্যান্ডে আসিন উইথারুর জাত, সিরিয়াতে আইসিস, বাংলাদেশে জামাত, আফ্রিকাতে বোকো হারাম, এরাই হিটলারের সময়ে নাৎসি বাহিনী ছিল, ফ্যাসিবাদের সেনানী হয়েছিল এরাই। ভারতভূমে এরা ‘হিন্দু’ নাম নিয়ে সনাতন ধর্মের ঐতিহ্যে কুঠারাঘাত করছে, নাগপুরী হিন্দুত্ব দিয়ে বিশ্বমঞ্চে আতঙ্কবাদের খাতায় নাম লেখাচ্ছে। প্রসঙ্গত- সকল জঙ্গি দলই নিজেদের বিপ্লবী ভাবে ও সকলেই নিজের সমাজ সংস্কৃতি ও বিশেষ ধর্মের রক্ষাকারী হিসাবে নিজেদের পরিচয় দেয়।

এদের হাতে কালিবুর্গি, পানেসারে, গৌরিলঙ্কেশ খুন হন, রোহিত ভেমুলা আত্মহত্যা করেন। চিন্ময়ানন্দ, সেঙ্গার ধর্ষন করে হিন্দু কন্যাকে। এদের কাছে হিন্দুরাই যেখানে সুরক্ষিত নয় সেখানে নাজিব গুম হবে বা আখলাকদের পিটিয়ে মারা হবে এতে আর আশ্চর্যের কী আছে! এরা হিন্দুত্ব শব্দ নিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে চায়। বেহিসেবী সম্পদের ভোগ করাই উদ্দেশ্য, হিন্দু ধর্মকে ভালবেসে নয়।

একটা প্রশ্ন- ব্রিটেনের অধিবাসীকে আমরা প্রোটোস্ট্যান্ট, অর্থোডক্স, জিউস, মহামেডান বলে ভাগ করিনা, তাদের ব্রিটিশ বলি? চীনের লোক চীনা হয়, জাপানের লোক জাপানী, আমেরিকার অধিবাসী আমেরিকান হলে আমি কেন হিন্দুস্থানে বাসিন্দা ‘হিন্দু’ হবনা? কেন আমার মুসলমানত্বটাই রাষ্ট্রের কাছে বড় পরিচয় হবে? সেই হিসাবে আদিবাসীরা ছাড়া সকলেই এদেশে অবৈধ। 

রাজনৈতিক পরাকাষ্ঠা

শুধুই কি বিজেপি এই না-নাগরিকতার পক্ষে? না মশাই, বাংলাতে NRC করতে হবে এই ধুয়ো তুলে ২০০৫ সালের ৪ঠা আগস্ট তথকালীন লোকসভার স্পীকার সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের মুখের উপরে কাগজের বান্ডিল ছুঁড়ে ফেলেছিল তার নাম কি? তার নাম মমতা ব্যানার্জী, বর্তমান বাংলার মুর্খমন্ত্রী।

আসামে নাহয় বাঙালী খেদাবার ধুয়ো ছিল, কিন্তু বাংলাতে শুধুই মুসলমান তাড়াও রব। পরিষ্কার বিভাজন, কোনো লুকোছাপা নেই। পরিহাসের কথা হচ্ছে, অবাঙালীরা বাংলাতে কথা বললেই তাদের বাংলাদেশী বলে গালি দেয়, সুতরাং গুজ্জুদের পীড়িত ঠিক কোন  পর্যায়ে সেটা বলাই বাহুল্য।

১৯৯৩ সালের বাবরি মসজিদ ভাঙাতে এ রাজ্য থেকে যে সব রামলালার করসেবক তথা ধ্বংসকারীরা গেছিল, তাদের অনেকেই আজ তৃণমূলের টিকিটে MLA MP মন্ত্রী। আজকের নামধারী অশিক্ষিত গাড়ল মুসলমানেরা কখনও ‘দিদিকে বলো’ বলে শুধাবার সাহস অর্জন করতে পারেনি, যে দিদি- “এরা তৃণমুলে কীভাবে”? ওয়াকফ বোর্ডের টাকায় সামান্য টাকার ইমামভাতার প্রচারের আড়ালে কখন যে পুজো কমিটিগুলোকে কোটি কোটি টাকার দানের ব্যবস্থা করবে রাজকোষের টাকায় সেটা তৃণমুলকে যারা ভোট দেয় সেই মুসলমানেদের ভাবনাতে আসেনা। যেমন কি সুচারু ভাবে RSS এর হিন্দুত্বকে প্রোমোট করতে রেডরোডে কার্নিভালের আয়োজন শুরু করে দিয়েছে যেহেতু ওখানেই ঈদের নামাজের জমায়েত হয়। আজ আর কেউ সাচার কমিটির রিপোর্ট নিয়ে শুধায়না, মুসলমান চাকরি পেয়েছে কিনা প্রশ্ন করা যায়না, মুসলমান কেন আজও সবচেয়ে অন্তজ শ্রেনীর হয়ে রয়েছে সেই জিজ্ঞাসা করা পাপ। আজ মুসলমান আওয়াজ করার শক্তি টুকু হারিয়েছে, যেটা ঘোষিত নাস্তিকপন্থীদের শাসনে অক্ষত ছিল। সাচার কমিটির রিপোর্ট বেড় হত, এখন সেটার কষ্ট কল্পনাও করা যায়না। ছুড়ে দেওয়া একটুকরো এঁটো রুটির টুকরো পাওয়ার আনন্দে উল্লসিত আপনি আমি মুসলমান, প্রশ্ন করলেই জেলে নতুবা বেইলে। তার পরেও দিদি আপনাদের কাছে ঈশ্বরতুল্য; ঠিক যেমন RSS এর কাছে সাক্ষাৎ দুর্গা তিনি।


ওনারা হিন্দুত্ব করবেন করুক, ধার্মিকদের নিয়ে সমস্যা কোনো কালেই ছিলনা, কিন্তু এরা ধর্মোন্মাদ। যেমন আফগান, ইরাক, ইরাণ, সিরিয়ার কিছু স্বঘোষিত ইসলামের রক্ষাকর্তা হয়ে দুয়ানিয়া অশান্ত করে রেখেছে, সাথী অস্ত্রের কারবারীরা। ওদের কাছে যেমন কোরানের মূল্য নেই, ফতোয়াটাই সব, তেমনই এদের হিন্দুত্বতে বেদ-উপনিষদ-পুরাণ নেই, একমাত্র মুসলমান মারো, ধর্ষন করো ও তাড়াও এর মধ্যেই এদের ধর্ম সীমাবদ্ধ।

সনাতনী আর ব্রাহ্মণ্যবাদ এক নয়। এই মনুবাদ সংশ্লেষিত ব্রাহ্মণ্যবাদের কবলে পরে বৌদ্ধদের দেশ থেকে বৌদ্ধরা আজ হারিয়ে গেছে। ভারতের মাটির তলায় ‘রামমন্দির’ পাওয়া যায়না, বৌদ্ধ স্তুপা মেলে। আফগানিস্থান থেকে থাইল্যান্ডে বুদ্ধ থাকলেও ভারতভূমে বুদ্ধ নিশ্চিহ্ন। মুসলমানেরা ভারতবর্ষে ৮০০ বছর শাসন করেও হিন্দু ধর্ম আজও ৮০ শতাংশের বেশি। ব্রাহ্মণ্যবাদ বৌদ্ধদের হজম করে নিয়েছে। এখন রামের নামে সনাতনী বহুত্ববাদকে গ্রাসে উদ্যত, তেতো কিন্তু এটাই সত্য। এরাই আজকে RSS নাম নিয়ে এসেছে, বিজেপি-তৃণমূল যাদের রাজনৈতিক ভেক। মুসলমানকে দুধেল গাই নাম দিয়ে পৃথক করে দেওয়া, আমরা শুধাতে ভুলেছি যে- ‘আপনি ৮ বছরে মুসলমানকে কী দিয়েছেন’?

কয়েকজন ইমামকে নিয়ে মুসলমান নয় সেটা কবে আমরা বুঝব? সিদ্দিকুল্লার মত ধান্দাবাজ যারা সুলভে বিক্রি হয়, ফুরফুরার কয়েকটা দালাল আর মুসলমান ট্যাগ ট্যাগ করতে না পারার দুঃখে কাতর হয়ে- সারাজীবন মমতা ব্যানার্জীর ব্যাগ বওয়াই যার একমাত্র যোগ্যতা; সেই নিয়ে মেয়র ও মন্ত্রী হওয়া ফিরহাদ হাকিমরা মুসলমানের মুখ নয়। কিন্তু এরাই মমতা ব্যানার্জীর কাছে একমাত্র বিকল্প। যাদের আত্মসম্মান আছে তারা তৃনমূল হতে পারেনা, যে মুসলমান বিজেপি করে তার মায়ের গর্ভের দোষ নিশ্চিত। মুসলমান মানে নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাত নিয়ে যে তৈরি, আল্লাহতে ইমান আছে। যে নিজেই নিজেকে চেনেনা সে সমাজ বা অন্যের সাহায্য কীভাবে করবে? সর্ব প্রথম সম্মান নিজেকে, নিজের পরিবারকে, নিজের কৃষ্টি সংস্কৃতি ধর্মকে, তারপর তো অন্য কিছু। অতএব মুসলমানকে অত্যাচার করাই যায়, আর সেটাই উচিৎ এমন বিপথগামী জাতির।      

সময় বদলেছে, রাজ্যের পালাবদল হয়ে মমতার সরকার আজ ক্ষমতাতে বিগত ৮ বছর। কিন্তু রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি সহ, ছলে বলে, চিটফান্ড ইত্যাদিতে ৪০০ বছরের পরিমাণ সম্পদ চুরি করে তৃনমূল এখন মোদীশাসুরের কাঠ পুতল। মমতা ব্যানার্জী আজ আবার একটা মিথ্যার চাদর চড়িয়ে মুসলমানেদের ত্রাতা সেজে ক্ষমতাতে রয়ে যাওয়ার চক্রান্তে লিপ্ত। মুসলমানেরা ওনাকে ভোট দিয়েছিল বিজেপির থেকে বাঁচতে, মমতা প্রথমে এদেরই বলি দেবে, কারন RSS এর প্রকাশ্য রাজনৈতিক মুখ হল BJP, কিন্তু রাজনৈতিক মুখোশ হচ্ছে বাংলাতে তৃনমূল, বিহারে নিতীশ, উত্তরপ্রদেশে দলিত সুড়সুড়ির চোর সাম্রাজ্ঞী মায়াবতী, পাঞ্জাবে আকালী, দক্ষিণে এআইএডিএমকে, মহারাষ্ট্রে শিবসেনা প্রমুখ। RSS এর মুখপাত্র প্রকাশ্যে মমতাকে দূর্গা বলেও সম্বোধন করেছিল, আর মমতা ব্যানার্জীর নামে ইউটিউবে সার্চ মারলে লক্ষা লক্ষ ভিডিও পাওয়া যাবে যেখানে তিনি নিজেই বলছেন- ‘তৃনমূল আর বিজেপি স্বাভাবিক মিত্র’।

৩৪ বছরে বামেরা মুসলমানকে অশিক্ষিত লেঠেল বানিয়ে রেখেছিল, কিন্তু ছাদ-ভাত কেড়ে নেয়নি। তৃনমূল (RSS এরই বাংলা শাখা) মুসলমানকে রাষ্ট্র ছাড়া করে দেবার গোটা ছক এঁকে ফেলেছে। তাই যে সকল মুসলমানেরা ভাবছেন দিদি বাঁচাবে, তাদের অবস্থা ধোপার কুত্তার মতই হবে। না ঘরে থাকবে, না ঘাটে। রাজনীতিতে আজও ক্ষীর খায় দক্ষিণ কোলকাতা ও ওপাড় বাংলা থেকে আসা অনুপ্রবেশকারীরা। মুসলমান নিচুতলায় পঞ্চায়েতে লুঠের টাকা ভাগের জন্য লড়ে, একে অপরকে মারে ও মরে।

আমাদের সেকুলার সেজে থাকতে হয়, বাবা মা কে তন্ময় নাম দিতে হয়। এর থেকে বড় রসিকতা আমাদের জীবনে আর কি আছে?

…পরবর্তী পর্ব চলবে

তৃতীয় পর্ব

ব্রহ্মমন্ত্র

~~~~~

আপ্তবাক্যঃ- সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে NRC হচ্ছে।

প্রহসন একঃ- বিচারপতি বৃজগোপাল হরকিষণ লোয়া’র অস্বাভাবিক মৃত্যুর কোনো তদন্ত হয়নি, উল্টে বিচারপতি দীপক মিশ্র PIL খারিজ করে দেয়। হ্যাঁ, লোয়া সাহেব CBI এর স্পেশাল কোর্টের বিচারক ছিলেন। সোহরাবুদ্দিন মামলার অভিযুক্ত বর্তমান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ এর বিচার করছিলেন তিনি। যে CBI দিয়ে তাবড় রহস্যের সমাধান হয় এদেশে, সেই CBI এর স্পেশাল কোর্টের বিচারকের রহস্য মৃত্যুতে, CBI একই অঙ্গে গান্ধীজির তিন বাঁদরের একটি রূপে রূপান্তরিত হয়। হ্যাঁ এটাই ‘আমাদের’ গণতান্ত্রিক ভারতবর্ষ।

প্রহসন দুইঃ আমরা সেই মহান ভারতবর্ষের নাগরিক (আপাতত রয়েছি, কদিন রাখবে জানিনা), যে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের চারজন প্রবীন বিচারক সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সংবাদ মাধ্যমের সামনে অসহায়তা প্রকাশ করেছেন, রেগেছেন- কেঁদেছেন- ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন। সেই দীপক মিশ্রের বিরুদ্ধেই ক্ষোভ, যিনি বিচারপতির লোয়ার মৃত্যু তদন্তে ইতি টেনে দিয়েছিলেন। বিচারের নামে আজ গোটা আইনব্যবস্থাটাই দেশের মানুকে কাছে উপহাসের পাত্র করে দিয়েছে, কিন্তু যেহেতু আইন আইনের পথে চলে তাই অন্য যা কিছু খুলুক, শুধু মুখ খোলা মানা।

আপনি দেশের আইন ব্যবস্থার উপরে ১০০% বিশ্বাস রাখতেই পারেন, আমি কিন্তু বিচারপতি লোয়া ‘নিজে’ সহ, বিচারপতি চোলামেশ্বর, স্যার রঞ্জন গগৈ, স্যার কুরিয়েন, ও স্যার লকুরের যা বিশ্বাস ভারতীয় বিচার ব্যবস্থার প্রতি, আমি সেই বিশ্বাসেই বিশ্বাসী। ওনারাও সবটা বলেননা, আমিও তাই। প্রসঙ্গত স্যার গগৈ এই মুহুর্তে সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারক তথা CJI, তার পরও বিচারপতি লোয়ার মামলা আর জাগেনি; দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর নাম যে অমিত শাহ। হতেই পারে তেনারা বিচারপতি কিন্তু দিনের শেষে একটা সাংসারিক মানুষ তো! তাদেরও ঘরে বউ, ছেলে-পুলে রয়েছে।

ভারতের সর্বোচ্চ তদন্তকারী সংস্থার বিশেষ আদালতের বিচারক খুনের তদন্ত হয়না যে দেশে, সে দেশের সুপ্রিম কোর্টের তত্বাবধানে হয়ে চলা NRC প্রক্রিয়া কোলকাতার গঙ্গার মতই পবিত্র, নিঃসন্দেহে। অথচ গণতন্ত্রে বিচার ব্যবস্থাটা মোদীজির সাফ করা সমুদ্রসৈকটির মতই হওয়া উচিৎ ছিলনা কী? প্রশ্ন আপনি করতেই পারেন, উত্তর আসবে অর্থনৈতিক মন্দার পরিপ্রেক্ষিতে- ৩ টে সিনেমা ১২০ কোটির ব্যবসা করেছের মত।

খুনের কথায় মনে পড়ল, পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায়- যদিও জানিনা ঠিক কোন বিষয়ে তার পাণ্ডিত্য ছিল, তাকেও মুঘলসরাই স্টেশনে গুপ্ত হত্যার শিকার হতে হয়েছিল; এবং সদ্য প্রয়াত বাজপেয়ীর সাথেই সেই মিথেরও পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটেছে, এক্ষেত্রেও মাঝপথে তদন্ত বন্ধ হয়ে গেছিল। হয়ত দীনুবাবু দিলু ঘোষের চেয়েও এলেবেলে মাপের নেতা ছিলেন তাই এগোয়নি, কিন্তু মন্ত্রী থাকাকালীন প্রমোদ মহাজন? প্রাতঃভ্রমণে বেড় হয়ে হাই সিকিউরিটি জোনের মাঝে কয়েকলক্ষ CCTV ক্যামেরার চোখ লুকিয়ে গোপীনাথ মুন্ডেরা ‘এক্সিডেন্ট’র শিকার হয়ে যায় কীভাবে, আপনি ধরতেও পারবেননা। মেয়ে পঙ্কজা মুন্ডে নাহয় মন্ত্রীত্ব পেয়ে মুখে ছিটকিনি তুলে দিয়েছিল, কিন্তু রাফাল কেলেঙ্কারির পরপরই মনোহর পারিক্করের মৃত্যুটা অত্যন্ত স্বাভাবিক ভাবেই হয়েছে, ঠিক যেমন মন্ত্রীত্বের পাঠ চুকাবার পরেই সুষমা স্বরাজ ও নোট বন্দি কেলেঙ্কারির নায়ক অরুন জেটলির স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে! ঠিক যেমন ক্যামেরা, নিরাপত্তাকর্মীদের দ্বারা মামাল্লাপূরম সমুদ্র সৈকত স্ক্যান করার পর, সাফাইকর্মীদের দ্বারা কয়েকটি প্লাস্টিক বর্জ্য একই লাইনে ছিটিয়ে ‘সেট’ সাজিয়ে, ঘেমে নেয়ে সাহেবের শুটিং এর বাকি ছবি গুলো প্রকাশ হবার আগে সকলে সত্য-স্বাভাবিক মনে করেছিল।

ওহ, আপনি তো আবার দেশপ্রেমিক; যে পরিবার থেকে কেউ কখনও সেনাবাহিনীতে ছিলনা। আপনি হোয়াটসএ্যাপ ইউনিভার্সিটির লিপিতে লেখা ছাড়া আপনি পড়তে ও দেখতে পারেননা, ‘জইশ-ই-রাম’ ছাড়া শুনতে চাননা। আজকাল লাশ দেখলেই শকুন আর শেয়ালের মত ঝাঁপিয়ে পরেন RSS কর্মী ছিল ‘বলে’, যাদের জেহাদী মোল্লারা খুন করেছে বলে মুখ-পায়ু উপয় স্থান দিয়ে ফেনা বেড় করে দেন ভার্চুয়ালি। কপি-কল অঙ্গভঙ্গি বিনা শরীরী ভাষা বোঝেননা। আপনি ভীষণ নিষ্পাপ, তাই আপনাকে নিয়েই কিছু কথা না বললে স্বামীজী পাপ দেবেন, স্বামী চিন্ময়ানন্দ।

‘আমাকে’ নিয়ে দুলাইন লিখতে গিয়ে দেখলাম যে, আপনি ছাড়া ‘আমি’ অসম্পূর্ন। আপনি আমার ফেসবুকের বন্ধু তালিকাতে রয়েছেন, আপনি আমার সাথে ব্যবসায়িক লেনদেনে যুক্ত, আপনি আমার পড়শি, আপনি পথচলতি অনেক সহযাত্রীর সংখ্যা গুরু অংশ। আপনি হিন্দু, উঁহু আরো নির্দিষ্ট করে বললে- ‘দেশপ্রেমিক হিন্দু’, নাগপুরের আদর্শে দীক্ষিত হিন্দুস্থানের স্বপ্নে বিভোর হিন্দু। আমাকে মানে আমার মত মুসলমানকে, আমার চোদ্দো পুরুষের ভিটে থেকে উচ্ছেদের নেশাতে দিগ্বিদিগ জ্ঞান রহিত ‘হিন্দু’, গলার শিরা ফুলিয়ে জয় শ্রীরাম নাদে আমাকে পিটিয়ে মারার লিপ্সা অন্তরে লালন করা ‘হিন্দু’। রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার মায়া কাজল চোখে পড়া যন্তরমন্তর ঘরে মগজধোলাই হওয়া একটা বিকৃত পাশবিক সত্তা আপনি, যার প্রাতিষ্ঠানিক নাম ‘হিন্দু’। নিরেট গর্ধব সম্রাট দিলু গোয়ালার সভায় ভিড় করা হিন্দু, বিচারপতি লোয়া’র খুনী অভারতীয় ‘পার্শি’ নাদির শাহ এর উচ্ছিষ্ট বীর্যে জন্মানো গুজ্জু গণশত্রুর সভাতে, জিন্দাবাদ ধ্বনিতে তার ঘৃন্য চক্রান্তে সামিল হওয়া ‘হিন্দু’, শত্রু পাকিস্থানের এক দেশ এক ধর্মকে নকল করা ভারতীয় তালিবান ‘হিন্দু’। দেশের স্বাধীনতার যুদ্ধে  যারা বিট্রিশদের পক্ষে ছিল সেই কুলাঙ্গারের উত্তরপুরুষ সনাতন ধর্মের ‘জীবানু’, নামধারী ‘হিন্দু’,। আপনি যুক্তিহীন ধর্মোন্মাদ আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীর দেশজ সংস্করণ রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের সদস্য ‘হিন্দু’।

আপনার অন্যতম সম্পাদ্য কি? মুচি, মেথর তথা সিডিউল কাষ্ট প্রমুখদের বা আরো ভাল গোবলয়ীয় সাধুভাষায় দলিতকে; ছাড়ুন- পাতি বাংলাতে ‘ছোটোলোকেদের’ ইচ্ছামত খাটানো ও ইচ্ছাখুনের যথেচ্ছাচার অনুজ্ঞা অর্জন করা, তাদের ঘরের মেয়েদের যৌনদাসী বানানো, আবার দাসপ্রথায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার অধিকার আদায় করা। এটাই ‘আপনি’, সঙ্ঘ পরিবারের আদর্শের ‘হিন্দু’, আপনি নিজেও জানেননা আপনি আপনার জঙ্গিতুতো ভাই আইসিসের মতই নৃশংস, ঘৃন্য ও নিকৃষ্ট হয়ে উঠেছেন ওই অসাধু বলয়ে নিয়মিত সহচর্যে।

এটা নাহয় অন্যতম সম্পাদ্য, তাহলে আপনার মুখ্য কর্মসুচী কী?

মুখ্য কর্মসূচী হল ‘আমাকে’ দেশ থেকে তাড়ানো। আমি মানে? আমি মুসলমান, বিশেষ করে গরীব মুসলমানই আপনার লক্ষ্য। আমিই লক্ষ্য আপনার মত ‘হিন্দুদের’, যিনি হিন্দুত্ব নামের নব নাৎসি-ফ্যাসিবাদী বীর্যে জন্মান্ত মানসিক স্থবির একটা যন্ত্র জানোয়ার। ইতিহাস সাক্ষী ক্ষমতার দম্ভে বলীয়ান হিটলারও ইহুদীদের এই একই ভাবে জাতীয় শত্রু ঘোষণা করেছিল। হিটলরাও কমিউনিষ্টদের শত্রু চিহ্নিত করেছিল, যেমন আজকেও কমিউনিষ্টরাই লক্ষ্য মুসলমানেদের সাথে সাথে। অতঃপর ডিটেনশন, হলোকাষ্ট ইত্যাদি ইত্যাদি। বাকিটা অনেকেই জানে, ও চাইলেই জানা যাবে।

হিটলারের সময়ে সেদেশে ইহুদিদের সংখ্যা ছিল ১ শতাংশ মত, তারপরেও সেদেশের গাধা জনগণ বিশ্বাস করেছিল ওই ১ শতাংশই ৯৯% এর দুর্দশার জন্য দায়ী, সুতরাং তীব্র জাতীয়তাবাদের হিড়িকে ভেসে লক্ষ লক্ষ নাজি থুড়ি ভক্ত তৈরি হয়েছিল, সাথে ছিল তৎকালীন সুধীর চৌধুরী-অর্ণব গোস্বামীরা; সেযুগে যাদের নাম কারো ছিল গোয়েবলস বা কারো নাম হেইনরিখ হিমলার কিম্বা মার্টিন ব্রোম্যান।

যাই হোক, ইতিহাস ইতিহাসেই থাক, হিটলারের নৃশংসতা যেভাবে পৃথিবীকে জানানো হয়েছে, কেন্দ্রে কংগ্রেস ও কমিউনিষ্টরা দীর্ঘদিন বাংলাতে ক্ষমতাতে থেকেও RSS এর স্বাধীন ভারতের বিরোধিতা, স্বাধীনতা সংগ্রামীদের হত্যা ও ব্রিটিশদের হয়ে চরবৃত্তি করার ইতিহাস, ওদের তাত্ত্বিক গুরু নিবীর্য সাভারকরের মুচলেকার মত ব্রিটিশ পিতার পদলেহনের ইতিহাস যদি পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্তি করত- সময় থাকতে, তাহলে আজ অন্তত এরা প্রকাশ্যে দু’কান-কাটা হয়ে জয় শ্রীরাম (নাত্থুরামের রাম) ধ্বনিতে গান্ধীর গলায় মালা দিতে পারতনা। সভ্য সমাজ থেকে এদের বাস থাকত অনেক দূরে। এ ব্যর্থতার দায় কমিউনিষ্ট তথা বঙ্গ CPM কে নিতেই হবে।

বিজেপি শাসিত সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ‘আমাদের’ মত মুসলমানদেরকে বিতাড়িত করা হবে ঘোষণা করতেই টাইমলাইনের নির্বিরোধী নিষ্পাপ কিছু ‘হিন্দু ঘটি’ গৌড় নিতাই হয়ে মহানন্দে দুহাত তুলে নাচছেন, প্রকাশ্যে। মন্তব্যে অদ্রীশ বর্ধন খুঁজছেন। প্রথমে মুসলমানেরা বিতাড়িত হবে, ওরা চূড়ান্ত উল্লসিত। তারপর বাঙাল গুলোকে ধরে নিয়ে যাবে, ওরা উন্মাদ হযে যাবার মত উল্লসিত। তারপর বর্ডারের পাশের হাভাতেগুলোকে ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যাবে, ভারত থেকে বিতাড়িত করবে। ওরা উল্লাসের আতিশায্যে জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে; কারন ওরা ঘটি তার উপরে হিন্দু, ওরা সেফ… চুম্বকে এটাই ভাবনা।

একদিন সকালে ওই ‘ঘটি’ ভর্তি জলে গুজ্জু বেনিয়া শৌচ ধৌত করে ‘তাকে’ খালি করে দিয়ে চলে যাবে। চমৎকার কখন যে বলাৎকার হয়ে যাবে – এনারা ধরতেও পারবেনা সেদিন। নগর পুড়লে দেবালয় রক্ষা পায়না। আসামের হিন্দু ও বাঙাল গুলোদের মাঝে কী এক আধটা ‘ওরা’ মানে ভক্ত ছিলনা? হাজারে হাজারে ছিল, তারা মুসলমানদের সর্বনাশের আনন্দে এমন বুঁদ ছিল যে এর ফাঁকে তারা নিজেরাই যে কখন বিদেশী হয়ে গেছে তারা ধরতেই পারেনি।

তাই আমি চাইছি অন্তত প্রথম দফায় NRC এর প্রক্রিয়া শুরুটা অন্তত হোক একটা কাটমার্ক ধার্য করে, এর পর যাত্রা থিয়েটার কল্প বিজ্ঞানগুলো ভাল খুলবে নিজের উঠোনে। প্রত্যেকে নিজের অওকাতটা বুঝতে পারবে, এতে সাময়িক হয়রানির চুড়ান্ত হলেও আগামীর জন্য এটা অত্যন্ত উপশম প্রদানকারী। বিশ্বাস করুন- দেশ থেকে RSS এর বীজ উপরে ফেলতে ছ্যাঁকা খাওয়া ভক্তের দলই লেগে পড়ে উঠবে, যেমন মতুয়াদের পশ্চাদ্দেশ এই মুহুর্তে ব্লাস্ট ফার্নেসের মত লাল হয়ে রয়েছে। যে কেউ সেখানে একটা মুরগি চেপে ধরলে খানিক্ষনের মধ্যে সেটা তুন্দুরে পরিণত হয়ে যাবে। ব্যাটারা, বিজেপিকে দুহাত ভরে দিয়েছিল- এখন না পারছে বলতে না পারছে সইতে।

তবে সেখানেও যারা থাকবে সেখানে সকল পেশার মানুষজনই দরকার। মতুয়ারাও থাকুক, হোপবোল করার জন্য।

এর আগে অবশ্য বিজেপি গোবলয়ে কখনো গোরক্ষার নামে কখনো গো পরিবহনের নামে, আবার আখলাককে তো গোমাংস আছে এই সন্দেহে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। রোহিত ভেমুলাকে মেরে ফেলেছে নাজিমকে গুম করেছে, তখন দেশীয় ভক্তদের সে কী উল্লাস। উল্লাসের কারন শুধান, জবাব আসবে ‘সিয়াচেনে -26’। আপনি যাই কিছু বলুন আপনাকে সেনাবাহিনীর দোহাই দেয়া হবে ভাবটা এমন যেন সেনাবাহিনী সত্ত্ব একমাত্র RSS এর, সেখানে যারা রয়েছে সবাই তাদের আত্মীয় স্বজন। প্রসঙ্গত খুন হয়ে যাওয়া হতভাগা আখলাকের পুত্রই সেনাবাহিনীতে রয়েছে। আপনি সেনাবাহিনীতে এক আধটা মানেক-শ ছাড়া কোনো বলার মত কোনো গুজরাতি সেনা পাবেননা। সেনা বাহিনীতে প্রতি বছর লক্ষ্ লক্ষ যে জওয়ান যোগদান করে তাদের মধ্যে মাত্র কয়েকশো গুজরাতি থাকে তারা আবার অধিকাংশই জাদেজা বা সোলাঙ্কী সম্প্রদায়ের।

ভারত ভাগের নামে আসলে পাঞ্জাব ও বাংলা ভাগ করা হয়েছিল। যারা করেছিল তাদের তিনজন যে মাস্টারমাইন্ড সেই গান্ধী, জিন্না আর প্যাটেল তিনজনেই গুজরাতি। আজকে বাংলা বা পাঞ্জাব এক থাকলে উত্তরপ্রদেশ বা বিহারের যে দাদাগিরি সেটা করছে লোকসভাতে সেটা পারত? সুতরাং গো বলয়ের আধিপত্য বজায় রাখার জন্যই এই নতুন নীল নক্সা। উত্তর প্রদেশের কোনো ‘মিশ্র ব্রিগেড’ আছে? দেশের সেনাবাহীকে সমৃদ্ধ বরাবর করে এসেছে তথাকথিত ছোটলোকগুলো, যারা চাষী ছিল, পরবর্তীতে শ্রমিক হয়েছিল এবং এরাই ভাল সৈনিক।

আজ ভয়ঙ্কর কষ্ট হচ্ছে একটা পরিবার থেকে হয়তো রোজগারে মানুষটা চলে গেলেন না ফেরার দেশে, আবার আনন্দ হচ্ছে কারণ ওই নিবাস সরকার- কৃষ্ণনগরের বগুড়াতে যার বাড়ি ছিল, হনুমান সেজে বিজেপি প্রার্থী জগন্নাথ সরকারের হয়ে ভোটে ক্যাম্পেনিং করেছিলেন। তিনি আত্মহত্যা করেছেন, কারন তিনি বিশ্বাস করেছিলেন মুসলমানদের তাড়ানোর যে সুখ তা একমাত্র বিজেপিই দিতে পারে তাকে, এখন সেই সুখ নিতে গিয়ে কখন যে নিজের ঘরের ঘায় কেটে ফেলেছে তা টের করতে পারেনি সুতরাং সেই অলিক সুখের পরাকাষ্ঠা পিতৃদত্ত প্রাণটা বের করে নিয়ে চলে গেছে।

আজকে যেসব অঞ্চলে বাঙালদের প্রকোপ কম বিশেষত বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, দুই মেদিনীপুরে, সেখানকার ঘটিদের (দেশপ্রেমিক হিন্দু) স্বপ্ন- রাজ্যে মুসলমানদের তাড়াবে বিজেপি, এরপর বাঙালদের তাড়াবে আর আমরা তাদের চলে যাওয়া ভূসম্পদ চাকরি গুলোকে দখল করব। তারা বুঝতে পারছে না যে এনআরসির ফর্মে দৃশ্যত কোন ধর্ম কলাম থাকেনা, লিঙ্গ কলাম থাকেনা, বর্ণ কলাম থাকেনা সেখানে একমাত্র যোগ্যতা নির্ণয়কারী হচ্ছে ‘কাট-অফ-ডেট’ এর নির্ধারিত সীমারেখা নির্ধারণের পূর্বের জমির প্রামাণিক কাগজ আর মুসলমান নাম। মুসলমানদের টার্গেট করে তাড়িয়ে দিলেও আসামের ১২ লক্ষ বা মতান্তরে ১৪ লক্ষ হিন্দুদের মত এবঙ্গের ঘটি হিন্দুদেরও নাম এনআরসি লিষ্টে উঠে কখন যে ডিটেনশন ক্যাম্পের ২ কোটি সংখ্যাটা ভরিয়ে, আমার পড়শী হয়ে যাবে তা ধরতেও পারবেন না

দিলীপ ঘোষ নাহয় নাগপুর পালাবে, হাফ প্যান্ট পড়ে গো পিতা ও মাতার ঘরে ঢুকে পড়বে। পিসি, দীনেশ ত্রিবেদী থেকে অর্জুন সিং সবাই বিহার ঝড়খান্ড উত্তরপ্রদেশ মধ্যপ্রদেশে গিয়ে ঠাই নেবে। যারা বিহারী মুসলমান তারাও এই বিশাল ভারতবর্ষের ঠিক কোথাও না কোথাও গিয়ে নিজেদের বাঁচিয়ে নেবে, পিসির ভাইপো থাইল্যান্ড শ্বশুরবাড়ি পালাবে, আপনি কোথায় যাবেন? আপনাক দেখলেই তো বাঙালী বলে মনে হয়।

আপনার জন্য দুটো জায়গা, এক ডিটেনশন ক্যাম্প, দ্বিতীয় ওই নিবাস সরকারের মত অস্তাচলের পথ। তাই আজকে যারা অট্টহাস্য করছেন তাদের জন্য করুণা হচ্ছে। ‘আমরা’ মানসিকভাবে প্রস্তুত রয়েছি, NRC মোকাবিলার জন্য; তাতে গান্ধীবাদী হলে গান্ধীবাদী পন্থায়, সমাজবাদী হলে সমাজবাদী পন্থায়, আর চরমপন্থী আঘাত এলে চরমপন্থী পদ্ধতিতেই আমরা লড়ব। আসামে পাল্টা মার শুরু হয়েছে, তার নানান ভিডিও আসছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতে। ‘আমরা’ লড়বো কিন্তু আপনারা কাউকে খুঁজে পাবেন না। জয় শ্রীরাম জয় শ্রীরাম করতে করতে কখন যে ‘রাম নাম সত্য হে’ ধরতে পারবেন না।

বিঃ দ্রঃ- বিশ্বহিন্দু পরিষদের একদা আগুন খেকো তোগারিয়া বলদের ছুটে বেড়াচ্ছিল কদিন আগেই। সেখানে ‘আপনি’ দেশপ্রেমিক ভাবধারার নাগপুরী মতাদর্শের হিন্দু’ কোথাকার কোন ক্ষেতের মুলো সেই গণনা আগে করে নিন!

-কাউন্টডাউন শুরু

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *