ছক্কাদা

গতকাল লক্ষ্মী পুজোর সন্ধ্যায় একটু আড্ডা দিতে বেড়িয়েছিলাম, আজকাল ভার্চুয়াল লাইফের ফাঁদে পড়ে বস্তুগত আড্ডাটাই জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছে। সে যাই হোক ভোলার চায়ের দোকানেই আমাদের পুরাতন আড্ডার ঠেক, ভোলা দাদু মারা গেছে দেড় যুগ আগে এখন ওনার ছেলে দোকান চালান, যার বয়স আমার চেয়ে বেশি। দোকানটি বাজারের মাঝে, মুলত বেলা বারোটা পর্যন্তই বেচাকেনা হয়, বিকালের দিকে আমদের মত কয়েকজন ছাড়া কেন আসেনা তেমন। এর ঠিক একপাশে বৃদ্ধের দল তাস খেলেন বস্তা বিছিয়ে, অন্যপাশে একটা ছোট মাঠ, যেখানে বিকালে বাচ্চারা খেলাধুলা করে এবং সন্ধ্যার পর সেখানেই সিজন অনুযায়ী বড়দের খেলাধুলা হয় ও আমাদের পূর্বতন সাপ্তাহিক ফিস্টের স্থান।

আমাদের ছক্কাদা, তিনি দেখলাম আজও আড্ডার মধ্যমণি। একসময় বিভিন্ন ধরনের দালালি করতেন, এদেশ বিদেশও কম করেননি। পৈত্রিক মাঠাল সম্পত্তি বেশ কিছু রয়েছে, এছাড়া আমাদের বাজারে একটা শরিকি মার্কেটও রয়েছে, সেখান থেকে ভাড়ার বখরা যা আসে তাতে অকৃতদার মিতব্যায়ী ছক্কাদার হেসেখেলেই চলে যায়। আমরা যখন ক্লাস সিক্স-সেভেনে পড়ি তখন থেকেই এই ঠেকে যাতায়াত, শেষ বছর ৫-৭ আমি প্রায় অনিয়মিতেরই দলে। তখনকার থেকে আজকে প্রায় ২০ বছর অতিক্রান্ত, পিন্টু, ঝন্টু, বাটুলদের একেবারে পাশেই বাড়ি তাই এরা ছাড়া একমাত্র ছক্কাদাই নিয়মিত। সেই ক্লাস সিক্সের শৈশব থেকে আজ এই ছত্রিশের জীবন, ছক্কাদা কিন্তু অবিকল একই রকম রয়ে গেছে।

আমি পৌছাতেই একটা উল্লাসের হর্ষধ্বনি দিয়ে সম্ভাষণের পর হরেক গল্পগাছা শুরু হল। শুধালাম- ‘কী ছক্কাদা খবর কি তোমার’! তিনি বল্লেন- ‘আমি তো আর তোদের মত স্বার্থপর নই যে আমার বয়স বাড়বে, তোরা বউ ছেলেপুলে পেয়ে যুবক বয়সের উচ্ছাসকে ভুলে গেছিস। তাই আমি ভালই আছি’। বললাম- সত্যি মাইরি, তা কত বয়স হল তোমার’। জবাব দিলেন- ‘যারা বুড়ো হবে তারা বয়সের হিসেবে রাখবে, আমি কোন দুঃখে সে হিসাব রাখব’। সত্যিই তাই, বাবার চেয়েও বড় এই মানুষটির শরীরে জরা সেভাবে দাঁত ফোটাতেই পারেনি।

পাশের মাঠে আলো জ্বেলে, আসিফ দেখি ব্যাডমিন্টনের কোর্ট কাটছে,- ‘কিরে, খবর কি আসিফ’! বলে হাঁক পাড়লাম। সে কী জবাব দিল শুনতে পেলামনা, শুধু ছক্কাদার আওয়াজ কানে এলো- ‘শীত আসছে’। দোকানের ভিতরে ক্যারামে সদ্য ছোকরার দল ভিড় জমিয়েছে, তাদের মাথার উপরের উঁচু তাকে রাখা টিভি থেকে ভেসে এলো- ‘আমাদের দাদা সৌরভ গাঙ্গুলী বিসিসিআই সভাপতি হতে চলেছেন’। সকলে বলে উঠল- একেই বলে মধুর প্রতিশোধ। ছক্কাদা বলল- ‘ওসব কিছু নয়রে, বাঙালী রাজনীতিটা ভালই বোঝে, সৌরভও তো বাঙালীই, তবে এটাকে কাব্যিক বিচার বললে ভুল হয়না’। এবারে খেয়াল করলাম ছক্কাদার জুলফির চুলে বেশ পাক ধরেছে, শুধালাম- ‘কলপ করতে পারো তো’! মধু কোত্থেকে দেখি এক মালসা খিচুড়ি যোগাড় করে এনেছে, সেখান থেকেই এক চ্যাঙর তুলে খেতেখেতে বললেন- হ্যাঁ, এসেছিও তো আর কম দিন হলনা, মৃত্যু আগত প্রায়, এরা তাদেরই দূত’।

এর মাঝে হঠাৎ করে টিভিতে দেখাচ্ছে- বারমুলা সেক্টারে পাকিস্তানের সংঘর্ষ চুক্তিবিরতি লঙ্ঘন, একটা পরিত্যক্ত গাড়িতে জঙ্গিদের বিস্ফোরণ। ফটিক তারস্বরে বল্লো- ‘সেকিগো, নোট বন্দি, কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা লোপ ইত্যাদির পরেও জঙ্গিহানা’? সবাই আমরা চুপ, এখানে অধিকাংশই ভক্ত শ্রেনীর মানুষদের ভিড়। হঠাৎ করে এই সন্ধ্যেবেলায় কারেন্টটাও চলে গেল, বাইরে ফুটফুটে জ্যোৎস্না। মণ্ডপের মাইকের আওয়াজ, ক্যারামের ঠকঠকাস হঠাৎ বন্ধ হতেই যেন নিশ্ছিদ্র নিস্তব্ধতা গ্রাস করল।

তখনই নিস্তব্ধতা খানখান করে একটা লম্বা সশব্দ চুমুকের শব্দে সকলের কান খাড়া হয়ে উঠল, বুঝলাম ছক্কাদা চায়ের গ্লাসে চুমুক দিয়েছেন। এবার খানকটা স্বগতোক্তির মতই তিনি বলে উঠলেন- ‘বুঝলি, এটা নতুন ভারত। এখানে সব কিছুই পরিকল্পনামাফিক হয়’। অন্ধকারের মধ্য থেকেই কেউ বলল- ‘বুঝলামনা দাদা, কি পরিকল্পনা! কোন নতুন ভারত’!

আবার তেমনি একটা লম্বা চুমুকের শব্দ করে ছক্কাদা বলল- ‘নিশ্চয়ই কোথাও গুরুত্বপূর্ণ ভোট আছে আমাদের দেশে, নতুবা পাকিস্তান আর তাদের জঙ্গিগুলো জেগে উঠত না’।

পূর্ণিমার আলোয় তখন চরাচর প্রায় দিবালোকের মতই দৃশ্যমান, ছক্কাদার উক্তিটাও।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *