“আমি একা……………………”

বৈজ্ঞানিক ‘গবেষক গবুচন্দ্র জ্ঞানোতীর্থ জ্ঞানরত্ন জ্ঞানবুদ্ধি জ্ঞানচুড়োমনি’ কে মনে আছে আপনাদের? হীরক রাজার দেশে সিনেমার কথা মনে করুন, সেখানে যখন বাঘা তাকে তাচ্ছিল্যের সাথে বলেছিল যে- ‘তুমি তো রাজার দলে’; তখন ভীষন রেগে গবেষক বলে উঠেছিলেন- ‘আমি একা… আমি একক, আমি একঅদ্বিতীয়ম’। আজকে সৌরভ গাঙ্গুলীর এহেন প্রশাসক হিসাবে সাফল্যের চুড়োতে দেখেও মনে হচ্ছে, তিনি ওই গবেষকের মতই হয়ত হাত তুলে- লাফিয়ে লাফিয়ে একান্তে কোথাও উল্লাস প্রকাশ করছেন- ‘আমি একা’ বলে। অবশ্য তিনি যে দুহাত বুষ্ঠিবদ্ধ করে উল্লাস করেন সেটা আমরা সেই ন্যাটওয়েস্ট ট্রফির সময় থেকেই জানি, ইনফ্যাক্ট ওটাই তার কেরিয়ারের ‘সিগ্নেচার’ পোজ।

কৃষকের মন্ত্র, শ্রমিকের মন্ত্র, শিক্ষকের মন্ত্রের মতই সৌরভের কাছেও ক্রিকেটীয় মন্ত্র, অনুপ্রেরণা মন্ত্র ও অমিতবধ মন্ত্রের সম্ভার রয়েছে, পারফেক্ট মগজধোলাই যন্ত্র। তাতে মমতা ব্যানার্জী থেকে বর্তমান সময়ের প্রবল রাজনৈতিক ক্ষমতার আধার তথা দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে পর্যন্ত বশীকরণ করে ফেলতে সক্ষম।

অনেকেই ভাবছেন অমিত শাহ বোধহয় সৌরভকে ভারতীয় ক্রিকেটের সর্বোচ্চ পদে নিয়ে এসেছে। আমি সম্পূর্ণ এর বিপরীতে ভাবছি, কারন অমিত শাহ ২০০৯ সাল থেকেই ক্রিকেটের ব্যাকস্টেজে কাজ করছেন। ২০১৪ সাল থেকে গুজরাত ক্রিকেট এ্যাসোসিয়েশনের সর্বময় কর্তাও ছিলেন এই কিছুদিন আগে পর্যন্ত। অমিত শাহ সংবিধানের ধারাকে নাকের পোঁটার মত ছুঁড়ে ফেলে কাশ্মীরে যিনি ৩৭০ ধারা গায়েব করে দিতে পারেন, তিনি সামান্য (ওনার পদের কাছে BCCI পদ) ক্রিকেট প্রশাসকের শীর্ষে ছেলেকে বসানোর জন্য সৌরভের মত কাউকে বাছবেন, বা ছেলেকে প্রমোট করাবার জন্য একজন সৌরভকে দরকার এটা হাসকর যুক্তি। কারন অনুরাগ ঠাকুরের মত জুতো চাঁটা অপদার্থ গুলো আগে থেকেই এই কাজের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে রেখেছিল। তেমন হলে নিয়মের ‘মা-ব্যাহেন’ করে ওখানে ছেলে-বৌ-শালা-শালার শালা যাকে খুশি বসালেও কারোর টুঁ করার মুরোদ নেই এই মুহুর্তে।

অস্থায়ীভাবে সামান্য কিছুদিনের জন্য ছাড়া ক্রিকেটের এই সর্বচ্চো পদে প্রতিষ্ঠিত কোনো প্রাক্তন ক্রিকেটার এদ্দুর এসে পৌঁছায়নি। R E Grant Govan সাহেবের হাতে তৈরি এই সংগঠনটির শীর্ষপদে শুরুর দিকে বিভিন্ন রাজা, মহারাজা নবাবদের আধিপত্র ছিল, তারপর স্বাধীনতার পর থেকে ঐতিহ্যগত ভাবে এই পদটিকে রাজনৈতিক ব্যাক্তত্ব ও বিশিষ্ট ব্যবসাদরেরাই অলঙ্কৃত করে এসেছেন। এটাকে টাকার খনি বানিয়ে দিয়েছিলেন আরেক বাঙালী জগমোহন ডালমিয়া, সেই থেকে পদটি প্রপ্তির জন্য আজ এতো কামড়াকামড়ি। ডালমিয়ারই লেগাসি বহন করেই আজকে সৌরভ গাঙ্গুলি ওই চেয়ারে বসতে চলেছেন।

অমিত শাহ এর ছেলে টাকা কামাবার জন্য ওই পদে গেছে বলে আমি অন্তত বিশ্বাস করিনা, ওটা ওই মাপের বাপের ছেলেরা গ্ল্যামারের দুনিয়াতে নিজেকে ভিনিয়ে নেবার আকাঙ্ক্ষা ও তার পিতার সব ক্ষমতার উৎস আমি এই ধারনাকে সযত্নে লালল করার মানসিক সুখের ভাণ্ডার। যেমন সৌরভও টাকার জন্য ওই পদে যাচ্ছেনা অলেই আমারও বিশ্বাস, গাঙ্গুলি ক্ষমতার পিছনে দৌড়াচ্ছেন আর শাহ এ জীবনের মত কিছু ম্যাচ মাঠে বসে দেখবে ও তার স্বপ্নের নায়কদের পাশে বসে আগামী ভারতের ক্রিকেটের রূপরেখা নির্ধারনের লাইভ কমেন্ট্রি শুনবে। যতই রাজনৈতিক ক্ষমতা থাক অমিশ শাহ এর, নিজেকে সর্বজনগ্রাহ্য হিসাবে তুলিতে গেলে রাজনীতি নয় ভারতের মত দেশে ক্রিকেটই সবচেয়ে বড় হাতিয়ার, এর চেয়ে বড় মঞ্চ আর কিচ্ছুটি নেই।

খুব আনন্দ লাগছে, যে একজন বাঙালী তার কূটনৈতিক বুদ্ধি বলে অমিত শাহের মত একজন ধুরন্ধর রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব ও একজন গুজরাতিকে টুপি পরিয়ে ক্ষমতা দখল করতে চলেছে। জয় শাহ একটা রাবার স্ট্যাম্প বিনা আর কিছু হবার যোগ্য বলে আমি অন্তত মনে করিনা। আজকের এই জয় শাহ, এর কিশোরবেলা বা যে সময়টাতে একজন প্রেকেটপ্রেমীর ক্রিকেটীয় প্যাশন চুড়ান্তে বিরাজ করে, সেই সময়টা নিঃসন্দেহে সৌরভের যুগ ছিল ভারিতীয় ক্রিকেটে, তাই নিজের টাইমের হিরোর সামনে তার নিজস্ব পার্সোনালিটির প্রকাশ কেমন হবে সেটা অনুমান করাই যায়। বাপত্ব ক্ষমতার বলে একটা পদ পেয়েই এ ছেলে নিশ্চিত খুশি, হবে সেটা বলাই বাহুল্য। যারা জয় শাহের সচিব পদে আসাতে গেল গেল রব তুলছেন তাদের ভাবটা এমন যেন এর আগে যারা এই পদে ছিল তারা সকলে ভীষণ কৃতি ছিলেন। পূর্ববর্তী ৫ জন সচিবের নাম বলতে বললেই বিপ্লব ফুস হয়ে যাবে।

সৌরভ এক ঠিলে দুই পাখী মারল, প্রথমত একচ্ছত্র ক্ষমতা দখল করল; কারন সচীবের ক্রিকেটীয় জ্ঞান তার প্রেসিডেন্টের বুড়ো আঙুলের মাপের। দ্বিতীয়ত, কেউ কিছু বললেই জয় শাহকে দেখিয়ে দেবে, মানে প্রায় নির্বিরোধী একটা সাম্রাজ্য। জয় শাহের বাপের নাম অমিত শাহ, আর অমিত শাহ মানেই বিচারক ‘লোয়া’র মুখ ভেসে উঠা, সকলেরই ভাই পরিবার পরিজন আছে, তাই সৌরভকে জ্বালাতন করার জন্য অন্তত আগামী সাড়ে চার বছর কেউ নেই ভূভারতে, সে নিজে নিজেকে না বিপদে ফেললে। তদ্দিনে সে ICC পানে চলে যাবে। জালি ডিপ্লোমাধারী দিলীপ ঘোষ নোবেল পুরষ্কারজয়ী অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমালোচনার পাশাপাশি মুখ ফসকে সৌরভের ICC প্রেসিডেন্ট বলাটা নিছকই দুর্ঘটনা হলেও সৌরভ যে সেই পথেরই পথিক সেটা শুধু সময়ের অপেক্ষা।

পাঁচ বছর আগে ঠিক একই কায়দাতে যখন রাজ্য ক্রকেট প্রশাসকের চেয়ারে বসেন, তখন মনে হয়েছিল মমতা ব্যানার্জী বুঝি একজন ইয়েস ম্যানকে বসালেন। আসলে সে সময় তিনি মাননীয়ার অনুপ্রেরণা ঢাল করে ডালমিয়া পুত্রকে সচিব পদে বসিয়ে সেই থেকে একা রাজ্যপাঠ চালিয়ে যাচ্ছেন। ডালমিয়া পুত্র শুধুই একজন সৌরভ নামক লেগাসির তল্পি বাহক, তার বেশি কিছু নয়। আসলে ক্রিকেটার হিসাবে সৌরভের এগ্রেশন ও পরিসংখ্যানের সামনে বাকি আর ওনার বৃত্তের আশেপাশে সকলকেই বামন বলে মনে হয়।

শচিন বা ওই মানের কেউ প্রশাসকের চেয়ারের দিকে নজর দেয়নি। তবে হরভজন, যুবরাজ সহ এমন অনেকেরই হয়ত এবারে ভাগ্য খুলবে নানান আঙ্গিকে, যেমন ধোনীর ভাগ্যাকাশে হ্যালির ধুমকেতুর লেজটিই দেখা যাচ্ছে; সৌরভ নামের নক্ষত্র যতদিন এই আকাশে জ্বলবে ধোনী তারা তদ্দিন ধুমকেতুর লেজে ভয় দিয়েই ব্রহ্মান্ড প্রদক্ষিন করবে। রবিশাস্ত্রী সহ ক্যাপ্টেন কোহলীর দল পরিচালনাতে যে নারকীয় দাম্ভিক ঔদ্ধত্য তার শুধু রাশই টানা হবে তাই নয়, পাগলা ঘোড়ার মুখে লাগামও পড়বে বলেই আমার বিশ্বাস। এবং এটা আগামীর ভারতীয় ক্রিকেটের পক্ষে অত্যন্ত শুভ লক্ষণ।

তিনি বোঝালেন শুধু অফসাইডেই ঈশ্বরের পর তিনি নন, ভারতীয় রাজনীতিতেও কূট চালে উপরওয়ালার পর এই মুহুর্তে একমাত্র তিনিই রয়েছেন। কারন এখানেও তার স্কোরিং এড়িয়া অফসাইডেই ৯ জন বাঘা বাঘা জন্টি রোডসেরা দাঁড়িয়ে ছিল। কাকে কোথায় কখন কীভাবে কতটা পরিমাণে ব্যবহার করে নিতে হয় সেটা সৌরভ গাঙ্গুলী নামের প্রতিষ্ঠানটি ক্রিকেটীয় জীবনের ওঠাপড়া সাফল্য ব্যর্থতা থেকেই সম্ভবত শিখেছেন।

রাজনীতিটা বাঙালির মজ্জায়, সেটা প্রয়োগ করার জন্য যে সাহসটা দরকার সেটাই বাকি অন্যান্য নেতা বা ক্রিকেটীয় প্রজ্ঞাতে দক্ষ অন্যদের থেকে আলাদা করে দিয়েছে, নেতা হিসাবে গাভাসকর অন্য অনেকেই হয়ত ওই পদে যোগ্য ছিল। তার পরেও একটা গোবেচারা মার্কা মুখভঙ্গি নিয়ে, অন্তরের ভাবনাকে ফলিত রূপে ব্যবহার করার যে সাহস সেখানে বাজি মেরে বেড়িয়ে গেল সৌরভ।

ক্রিকেট প্রশাসনে আবার সেই রাজরাজড়ার যুগ ফিরে এলো মহারাজের হাত ধরে। এটুকুই ভাবতে পেরেছি চুম্বকে, কারন আসল সত্য কখনই কোথাও হয়ত প্রকাশ পাবেনা জনগণের জন্য। এখানেও সেই সত্যজিতের লাইন ধার করেই বলি- “জানার কোনো শেষ নাই, জানার চেষ্টা বৃথা তাই”।

অকপট পোষ্টঃ-

https://www.facebook.com/photo.php?fbid=777187142734492&set=gm.2990284924531045&type=1&theater

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *