গুরুদাম্বার বিভীষিকা

ঘটনাটা কয়েক বছর আগেকার এমনই এক পুজোর ছুটির সময়কার। সদ্য গঠিত নীতি আয়োগ নামের যে দপ্তরটি সৃষ্টি হয়েছিল তার অধীনে বদলি হয়ে এসেছি কোলকাতা অফিসে, নতুন দপ্তর তাই সেভাবে কাজের চাপ কিছু ছিলনা। স্ত্রী সুনন্দা তার অফিসের কোন এক কলিগের থেকে রাজস্থানের গল্প শুনে শুনে ‘রাজস্থানেই যাব’ বলে একতরফা ভাবে আমাদের চার জনের ঘাড়ে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছে। চারজন বলতে আমি অম্বিকা সান্যাল, কেন্দ্রীয় সরকারি অফিসার। আমাদের একমাত্র কন্যা অঙ্কিতা ও পুত্র অরিত্র ও আমার মা মলিনা দেবী।

লক্ষী পুজোতে বাড়িতে যথেষ্ট ধুম হয়, আমি নিজে নাস্তিক হলেও আমার মা ও গিন্নী দুজনেই ভীষণ পরিমানে আস্তিক। আমি অবশ্য কারোর বিশ্বাসে জবরদস্তীতে জোর খাটানোতে বিশ্বাসী নই, তবে নিজে সবসময় স্বতন্ত্রতা রক্ষা করে চলি। লক্ষ্মী পুজোর দিন বরাবরের মত আমার বাড়িতে সেই দাদুর আমল থেকেই পাড়ার সর্বসাধারণের জন্য ভোগ হয়ে। কোলকাতা কর্পোরেশনের মধ্যে সাবেক কোলকাতার অংশ এটি, তাতেও আমাদের বাড়ির এই রেওয়াজ অনেক পুরাতন বলে আর ভোগ খেয়ে পূণ্যার্জনের লোভে সংখ্যাটা বেশ কয়েক হাজারে পৌছায় প্রতিবারই। সেখানেই পাড়ার মুদি দোকানীর ছোকড়া শিবনাথ বলল- “বাবুদা, তোমরা ঘুর্তে যাবেনা এবারে”? আমি বললাম- “যে তো যাবই, নাহলে কী তোর বৌদি আর ভাইজির থেকে নিস্তার রয়েছে”! “তা কুতায় যাচ্চো এবারে”- শিবে শুধালো। জবাবে বললাম- “রাজস্থান”। শিবে চোখ বড় বড় করে অ্যাঁৎকে উঠে বল্লো- “এর পরেও তোমরা যাচ্চো”? “এর পরে মানে? এর আগে কি হয়েছে”?- অরিত্র ততোধিক উৎকণ্ঠা নিয়েই পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিল। শিবে বলল- “আমার ভাই তিলু, সে তো রাজোস্তানেই থাকত। কদিন আগেই ফিরে এসেচে, বলল নাকি কী সব শুয়োরের ফুলু হচ্ছে নাকি, আর তাতেই পটাপট হয়ে লোকজন মরে যাচ্চে জ্বর হয়ে”! আমি বললাম- “কই শুনিনি তো তেমন কিছু”। এর পর একথা সেকথাতে সারাদিনের ব্যাস্ততায় সেই রাত্রেও আর কিছু জানা হলনা, ক্লান্তিতে বিছানাতে শরীর দিতেই ঘুমের পাহাড় চোখের উপরে চড়ে বসল।

সকাল বেলা উঠে জলখাবারের পর হঠাৎ বেড়াতে যাবার কথাটা মনে আসতেই মেয়েকে ডাকলাম, অঙ্কিতা ক্লাস নাইনে উঠবে সামনের বছর। ছেলে প্রেসীডেন্সিতে ইকোনমিক্স সেকেন্ড ইয়ার, ভীষণ শরীর সচেতন। নিয়মিত জিমে যায়, ঠিক মেয়ের বিপরীত স্বভাবের। পুজোর সময় তাকে ঘরে দেখতে পাওয়া ধর্মতলাতে ডায়নোসর দেখতে পাওয়ার চেয়ে বেশি কঠিন। আমি মোবাইলে তেমন সড়গড় ছিলামনা তখন, তাই মেয়েরই স্মরণাপন্ন হতে হল, সেখানে জানলাম শুধু রাজস্থানই নয় বরং গুজরাত, মধ্যপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রের একটা বড় অংশে এই সোয়াইন ফ্লুর প্রকোপ দেখা দিয়েছে। বিকল্প স্থানের খোঁজ করতে গিয়ে দিল্লি বাদ গেল কারন সেখানে ডেঙ্গির প্রকোপ, নেপালে ভূমিকম্প ইত্যাদি। রাত্রে সুনন্দা মজা করে বলল- ‘গত জানুয়ারিতে ওবামা আমাদের শেষে এসেছিলেন, আমাদেরও কী উচিৎ নয় ওদের দেশে ভ্রমণ করা”! আমিও মজা করেই বললাম- “আমাদের প্রধানমন্ত্রীর নতুন স্লোগানটা শোনোনি বুঝি? ওই ‘গিভ ইট আপ’ ক্যাম্পেনের মত ট্যুরের নেশাটা মন থেকে ঝেরে ফেলো দেখি, আমিও তাহলে কয়েক বছর পর বন্ধনের মত একটা ব্যাঙ্ক খুলতে পারব”। সুনন্দা বলল- “ছেলেকে ক্যালিফর্নিয়া যেতে দাও; তখন তোমাকেও দেখাবো আমরা ওবামার দেশে কেমন ডেলি প্যাসেঞ্জারি করি”। শিলং গেছি বেশ কয়েকবার, তাছাড়া আমার অত্যন্ত শ্রদ্ধার প্রণম্য মানুষ কালাম সাহেব কিছুদিন আগেই ওখানে মৃত্যুবরণ করেছেন, তাই সেটাও হিসাবের বাইরেই রেখে দিলাম মনখারাপে।

ইতিমধ্যে আমার মা তার মেয়ের কাছে এই বিষয়ে পরামর্শ চেয়ে বসেছে, যেমন সুনন্দা তার বাবার কাছে। আমার বোন নন্দিনী প্রবাসী বাঙালী, দিল্লির স্থায়ী বাসিন্দা, আমার শ্বশুর বীরভূমের মানুষ; কিন্তু দুজনের মাঝে একটা বিষয়ে অদ্ভুত মিল- দুজনেই নিজেকে সর্বজ্ঞ মনে করে। ওদের ননদ-ভাজের মাঝেও একটা অদৃশ্য প্রতিযোগিতা কাজ করে- সুতরাং বোন মাকে পুরী যাবার বুদ্ধি দিয়েছে। মা ততোধিক উৎফুল্লতার সাথে আমাকে বলতেই আমি পত্রপাঠ সেটাকে নাকচ করে দিলাম, কারন এর আগে অন্তত আমরা ১৫ বার পুরী গেছি কারনে ও অকারণে। পুরী আর আমাদের কাছে বেড়াবার স্থান নয়, সেকেন্ড হোম টাইপের। এদিকে সুনন্দা রাত্রে তার বাবার পরামর্শের কথা আমাকে বলল। শ্বশুরের নামটা শুনতেই বিরক্তিতে আরো ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে গেলাম।

পরদিন সকালে সুনন্দা তার বাবার বলে দেওয়া গ্যাংটকের জন্যই জেদ ধরতে লাগল, যদিও গ্যাংটকটা একবার আমরা সকলে গেছি তখন অঙ্কিতা খুবই ছোট। দুপুরে ধর্মতলার একটা জনপ্রিয় ট্যুর অপারেটরের অফিস গিয়ে যা জানলাম তাতে চক্ষু চড়কগাছ, দার্জিলিং এ রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য এ বছর গ্যাংটকে ভাল হোটেলই অবশিষ্ট নেই- আমারা যে সময়ে যাব বলে ঠিক করেছি। অগত্যা ব্যার্থ মনোরথে বাড়ি ফিরে এলাম। একথা শুনে মেয়ে তার দাদাকে কোত্থেকে ধরে পাকড়ে সন্ধ্যার ব্রহ্মমুহুর্তে বাড়িতে আনার মত অসাধ্য সাধন করে ফেলেছে। ইন্টারনেটে হরেক সাইট থেকে তথ্য যোগাড় করে বলল- “বাবা, গ্যাংটক না গিয়ে চলো আমরা উত্তর সিকিম ভ্রমণ করি এবারে। সেখানে নিশ্চিত ছোটো হোটেল বা হোম-স্টে ব্যবস্থা করে ফেলব”। এই হোম-স্টে ব্যাপারটা আমার কাছে খুব উপভোগ্য লাগে, কেমন একটা আত্মীয় বাড়ি যাবার মত অনুভূতি হয়। ছেলে বড় হয়েছে, তাই বললাম- “তোরা দুই ভাইবোন মিলে ঠিক কর এবারে কোথায় যাওয়া হবে, আমি নাক গলাবোনা”।

৭ই অক্টোবর রাত্রের কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেসে আমাদের ৩ জনের কনফার্ম টিকিট পাওয়া গেল তৎকাল, ফেরা ১৪ তারিখ রাত্রের ট্রেনে সেটাও তৎকালেই কাটতে হবে, প্রচুর ওয়েটিং। কিন্তু শনিবারে যাত্রা হওয়ার দরুন মায়ের সাথে সাথে সুনন্দাও আপত্তি তুলল। এদিকে তৎকালেও টিকিটের যা আকাল তাতে শনিবার না গেলে এবারে অন্তত ট্যুরে যাওয়া হবেনা, অফিস খুলে যাবে। আমার নিশ্চুপতাতে সাহস পেয়ে ছেলে-মেয়ে দুজনেই হৈ মেরে উঠল, সুনন্দাও আমাদের দলে ভিড়ে গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই। মা কিন্তু খুঁতখুঁতানি প্রদর্শনটা বন্ধ করলেননা মোটেই, সারাক্ষণ বিড়বিড় করে যেতে লাগলেন ট্রেনে উঠেও।

নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে যখন নামলাম তখন সবে আলো ফুটেছে, লম্বা ফ্লাইওভার টপকে মায়ের পক্ষে স্টেশনের বাইরে আসাটা যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। আমি দুটো ব্যাগ নিয়ে তাড়াতাড়ি করে ষ্টেশনের বাইরে এসে চা খেয়ে নিলাম, তারপর গ্যাংটক যাওয়ার গাড়ি ঠিক করতে লাগলাম। অঙ্কিতা আমার সাথেই এসেছে, সুনন্দা অরিত্র ও মা তিনজনে ধীরেসুস্থে পিছনে আসছে। ঠিক করলাম আগে ভিড়টা কেটে যাক তারপর ফাঁকা হলে একখান সস্তার গাড়ি করা যাবে। ওমা কোথায় কী ফাঁকা, একের পর এক ট্রেন ঢুকতে লাগল আর তাতে জনসমাগম নুন্যতম কিছুই কমলনা, এদিকে পরিবারের সকলে ভীষণ অধৈর্য প্রকাশ করতে লাগল। ছোট গাড়িগুলোই ৩০০০ টাকা চেয়ে বসেছে, সুমো বা ওই জাতীয় গাড়ি গুলো ৪০০০ টাকা হাঁকছে। আসলে চতুর্দিকে দালালদের ভিড়, মূল গাড়ি ওয়ালা হয়ত আড়াই তিন হাজার টাকা পাবে গাড়ি হিসাবে, বাকিটা এদের হিস্যা। আমাকে অনেকক্ষণ ওই দরদাম করতে দেখে দেখে একজন নেপালি ছোকরা এসে ফিসফিসিয়ে বলল যে তার গাড়ি আছে, কিন্তু সেটা সামান্য দূরের কোনো এক পেট্রোল পাম্পে রাখা। এখানে গাড়ি আনতে পারবেনা কারন এদের ইউনিয়নের সদস্য নয় সে। প্রস্তাবটা মন্দ লাগলনা আমার, তাই সকলকে নিয়ে একটা অটোতে ১০০ টাকা দিয়ে চড়ে বসলাম বাক্সপ্যাটরা সহ, সেই প্রেট্রোল পাম্পের উদ্দেশ্যে। পাম্পে পৌছতেই ছেলেটি যেভাবে আমাদের অভ্যর্থনা জানালো, যেন সে আমাদের পেয়ে ভীষণ উপকৃত হয়েছে। ভাড়া কত নেবে শুধতে সে জড়ানো হিন্দিতে বলল- ‘যা খুশি একটা দেবেন’।

অরিত্র তার কাছ থেকে গাড়ির কাগজপত্র, ড্রাইভিং লাইসেন্স ইত্যাদি পরীক্ষা করে নিল চটাপট। আজকালকার ছেলেরা এসবে ভীষণ দক্ষ, শুধু তাই নয় এক কপি করে ছবি তুলে সেটা কোন একজন বন্ধুকে পাঠিয়ে দিলো হোয়াটসএ্যাপ মারফৎ, সুরক্ষার স্বার্থে। এদিকে সুনন্দা  ভাড়া আগে ঠিক না করে গাড়িতে উঠবেনা, উত্তরাখন্ড ভ্রমণের তিক্ত স্মৃতি আমাদের আজও পীড়া দেয়। যতবারই ছেলেটিকে বলি কত টাকা নিবি বল, সে কিছুই বলেনা নিজে থেকে। অগত্যা বললাম যদি ভাড়া নাই বলবি তাহলে আমরা যাবনা যা। বেগতিক বুঝে ছেলেটি বলল- “আমাকে ২২০০ টাকা দেবেন আর রাস্তায় যে টোল গুলো পরবে তার খরচা গুলো দেবেন”। সুনন্দা শুধালো- “সেটা কত”? সে বলল- “খুব একটা বেশি নয়, ওই শ-তিনেক টাকার মত”। আমার তখন খুশি দেখে কে, যেন মার দিয়া কেল্লা; অতক্ষণ ধরে প্রতীক্ষার দাম পাওয়া গেল অবশেষে, যেটা মোটেই সস্তা ছিলনা।

আমি সামনের সীটে, মধ্যের সীটে তিন মহিলা ও পিছনে লটবহর সহ মোবাইলে মুখ গুঁজে থাকা অরিত্র। গাড়িতে উঠে একটু থিতু হয়ে ড্রাইভার ছেলেটিকে শুধালাম- “তোর নাম কী ভাই”? উত্তরে ছেলেটি বলল- “নরবু, নরবু সাংপো”। জানালা দিয়ে বেশ ফুরুফুরে ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকছে, মা এতক্ষনে কথা বলে উঠল- “ওটা আবার কেমন নাম বাছা”? ছোকরাটি কিছু বলে ওঠার আগেই আমার মেয়ে জবাব দিল- “এটা তিব্বতী নাম ঠাম্মী। আসার আগে আমি কয়েকদিন সিকিম সম্বন্ধে পড়ে এসেছি”। ছেলেও দেখলাম এ বিষয়ে বেশ উৎসাহিত, যদিও স্বভাবগত ভাবে একটু চাপা প্রকৃতির; অন্য আর পাঁচটা সমবয়সীদের মত প্রগলভ বা উচ্ছল নয়। তবুও সে বলল- “জানো ঠাম্মি সিকিমের যে ইতিহাস রয়েছে, সেটা খুব বেশি পুরাতন নয়। সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি নামগিয়াল রাজবংশ দ্বারা এই জনপদটি গঠিত হয়। তিব্বতের সাথে আমাদের বাংলার যে বানিজ্য পথ ছিল সেটা এই গ্যাংটক হয়েই যেত। বনিকের দল এটাকে বিশ্রামস্থল হিসাবে ব্যবহার করত। ১৯৭৫ সালে ভারত প্রজাতন্ত্রে অন্তর্ভুক্তির আগে পর্যন্ত সিকিমে রাজতন্ত্র ছিল, তার অবসানেই গ্যাংটক রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি পায়”। আমি ভীষণ রকমের আশ্চর্য হয়ে গেলাম ছেলেকে এমন প্রাণখোলা ভাবে কথা বলতে দেখে, বললাম- “আজকের দিনে হলে চায়না আর একে ভারতে ঢুকতে দিতনা, সেই সময় বলেই সম্ভব হয়েছিল”। সে মুচকি হেসে বলল- “এদের জনসংখ্যার ৬০%ই নেপালী বংশোদ্ভূত, বাকি ১৬% ভুটিয়া ও ১৩% লেপচা উপজাতির মানুষের বসবাস। ১% অন্যান্য উপজাতিরাও রয়েছে”। ড্রাইভার ছোকরাটির উদ্দেশ্যে মা বলল- “ও বাবা নবু, রাস্তায় একটু দাঁড় করিও তোমার গাড়িটা, আমার আবার হাঁটুর ব্যাথা। খানিকক্ষণ পর পর একটু হেঁটে চলে না বেড়ালে অসুবিধা হয়”।

সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আমরা বেলা দুটোর আগেই গ্যাংটক পৌঁছে যাব, মায়ের জন্য যদি কয়েকবার দাঁড়াতেও হয় সেক্ষেত্রে আরো একঘন্টা বেশি লাগুক ক্ষতি নেই। গ্যাংটকের পথের বিবরণ দিয়ে পাঠককে বিরক্ত করবনা, শুধু বলি- পথমধ্যে রাস্তায় আমরা শুধু তিন জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। এরমধ্যে মাঝের জাইগাতে বেলা ১২টা নাগাদ বাঁধাকপি, গাজর, স্কোয়াসের ‘মিক্সভেজ’ ও ডিম আলুর ঝোল দিয়ে আতপ চালের ভাত ব্যাজার মুখ করেও সকলেই খেলাম, মেয়ে বাদে; সে ম্যাগি খেলো। নোবিতা-সিনচ্যান দেখে বড় হওয়া প্রজন্ম এরা, মাসের পর মাস চাউমিন-মোমো খেয়েই কাটিয়ে দিতে পারে।

গ্যাংটক যখন পৌছালাম তখনও ঘড়ির কাঁটা দুটো ছুঁইছুঁই, শহরের মূল কেন্দ্র থেকে সামান্য পায়ে-হাঁটা দূরত্বে ‘ডেঞ্জং সাংগ্রিলা’ নামের একটা তিনতারা হোটেলে এসে উঠলাম। আজকে রাতের জন্যই থাকা, সেইভাবেই ছেলে বুক করেছে। আসার পথে ড্রাইভার ছোকরা শুধিয়েছিল আমরা কোথায় ঘুরতে যাচ্ছি ও আগামী কাল শহর সাইট-সিয়িং করব কিনা। ছেলে জবাব দিয়েছিল যে আমরা উত্তর সিকিমটা ঘুরে দেখার পরিকল্পনা নিয়ে এসেছি, আপাতত লাচুং যাব কাল। ড্রাইভার ছেলেটি উৎসাহের সঙ্গে জানিয়েছিল, আমরা চাইলে সে তার গাড়িতে করেই নিয়ে যেতে পারে। তার মালিকের নানা সাইজের আরো খান তিনেক গাড়ি রয়েছে। এছাড়া তার নিজ বাড়িও ওইদিকেই, চুংথাং এর ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামে। ওই রুটেই সে নিয়মিত গাড়ি চালায়, গ্যাংটক থেকে এনজিপি সে তেমন একটা যাতায়াত করেনা, যার জন্য ওখানকার ইউনিয়নের সাথে তার যোগাযোগ নেই। পাম্পে গাড়ি রাখার বিষয়টা পরিষ্কার হল এতক্ষণে।

যাত্রার ক্লান্তিতে হোটেলে পৌঁছেই আমি বিছানা নিয়ে নিলাম, ওদিকে মা ভীষণ ক্লান্ত হয়ে তাদের মহিলা রুমে শয্যা নিলেন। ছেলে ও আমার একটা রুম, সে কিছুক্ষণের মধ্যের বাইরে বেড়াবার জন্য রেডি হয়ে গেলো। ওদিকে তার বোনও রেডি, ওরা নাকি রোপওয়ে চড়তে যাবে। সুনন্দাকেও দৃশ্যত ক্লান্ত দেখাচ্ছিল, কিন্ত বাচ্চাদের ওই বয়সে আর ক্লান্তি কোথায়। সুনন্দা তাদের একা ছাড়তে নারাজ- অগত্যা তাকেও সাথে যেতে হল। তারা ফিরলে পরে ডোরবেলের শব্দে ঘুম ভাঙল, খোলা জানালাটা দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঢুকছে, সন্ধ্যার পাহাড়ি শহর তখন লক্ষ জোনাকির মত আলোকমালায় সেজে উঠেছে। চা ও হালকা স্ন্যাক্স খেয়ে আমরা সকলেই পদব্রজে এমজি মার্গের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।

দ্বিতীয় খন্ড

গ্যাংটক শহরটিতে মাত্র ৩০ হাজার লোকের বসবাস, মূলত বৌদ্ধ তীর্থস্থান হিসেবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। এর প্রধান আকর্ষণই হল সুবিশাল দৃষ্টিনন্দন পাহাড়ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। নানান বৈচিত্র্যময় উদ্ভিদ ও প্রাণিকুল সবমিলিয়ে প্রকৃতি প্রেমীদের স্বর্গরাজ্য এই লাল পান্ডা, অর্কিড, রডোডেনড্রনের দেশ। ছোট বড় নানান পাহাড়ী ঝরনা, উষ্ণ প্রস্রবণ এবং কাঞ্চনজঙ্ঘার অপ্রার্থিব লালিত্য আপনাকে বিমোহিত করে রাখতে যথেষ্ট। এছাড়া বেশ কয়েকটি হ্রদও রয়েছে, কাছাকাছি গুলোর মধ্যে সমগো ও মেনমেগো হ্রদ বেশি পরিচিত। শহর থেকে ৪৫ কিমি মত দূরে ছাঙ্গু লেকের মনোরম দৃশ্যের টানে লক্ষ লক্ষ পর্যটকের সমাগম ঘটে। সন্ধ্যা যাপনের জন্য শহরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থান হচ্ছে মহাত্মা গান্ধী মার্গ, হরেক রকম ফুল দিয়ে সাজানো পাথুরে রাস্তার দুই পাশের মাঝখানে বসার জন্য জায়গা। সুসজ্জিত দোকানপাট, পরিচ্ছন্ন রাস্তাঘাট ও দুষণমুক্ত পরিবেশ- সব মিলিয়ে এক অনন্য স্বর্গীয় পরিমণ্ডল, যেটা ভারতবর্ষের অন্যান্য যেকোনো শহর থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র।

সবে একটা বেঞ্চে বসে মানুষজনের বিকিকিনি ও বাতাবরণের ওম নিতে শুরু করেছি অমনি তাল কাটল। সুনন্দা দেখি ছেলের সাথে তর্ক জুড়ে দিয়েছে, ছেলে কাছের কোন এক মনেষ্ট্রিতে যেতে চায় আর তার মা তাকে একা ছাড়তে নারাজ। সব শুনে আমি ছেলের পক্ষই নিলাম, একা যাওয়ার পক্ষেই মত দিলাম। ব্যাটা ছেলে মানুষ, কুড়ি বছর বয়স, এখন যাবে না তো কখন যাবে! এ নিয়ে তার মায়ের সাথে আমার তর্ক যখন চুড়ান্ত পর্যায়ে ততক্ষণে ছেলে এলাকা থেকে গায়েব। পরবর্তী সকল সময়টুকু আমার মন, কান ও চোখের মারাত্বক রকমের দূষণ ঘটিয়ে সুনন্দা তার নানান রকমের বাণ নিক্ষেপ করে যেতে লাগল। মেয়ে অবশ্য এসবের উর্ধ্বে তখন, সন্ধ্যার রঙিন আলোতে সে প্রজাপতির মত এ দোকান ও দোকানে অনুসন্ধিৎসা মেটাবার চেষ্টা করে যেতে লাগল, অল্প বিস্তর কিছু শপিংও করল মনে হল। ছেলেমেয়ের ধর্মে-কর্মে তেমন মতিগতি না থাকলেও মন্দির, মসজিদ, গীর্জা ও এই মনেষ্ট্রি ইত্যাদি দর্শনে তাদের প্রবল আগ্রহ।

রাত সাড়ে সাতটা নাগাদ আমরা ফিরে এলাম হোটেলে, দেখি রিসেপশনে সেই সকালের ড্রাইভারটি হাজির। শুধালো কালকে আমরা তাকে নিয়ে যাব কিনা! আমি পাল্টা শুধালাম- “এখান থেকে লাচুং কত কিলোমিটার”? সে বলল- “৫-৬ ঘন্টা মত লাগবে”, বুঝলাম, পাহাড়ি পথে কিলোমিটারে কেউ দুরত্ব মাপেনা, এখানে সময়ই একক। সে বলল- “ওদিকে যেতে গেলে খুব ভোরে উঠে সরকারী পাস যোগাড় করতে হবে, তাই তাড়াতাড়ি বলুন”। বিষয়টা সম্বন্ধে আমার তেমন কিছুই জানা ছিলনা, হোটেলের ম্যানেজার ভদ্রলোকের সাথে চোখাচোখি হতে তিনিও চোখের ইশারাতে ড্রাইভার ছোকড়াটির কথাটাকে সমর্থন করল, আমিও আর কালক্ষেপ না করেই তাকে হ্যাঁ বলে দিলাম। আবার যথারীতি তাকে শুধালাম- “কত ভাড়া নিবি”? সে এবারও বলল- “যা হয় খুশী হয়ে দেবেন বিবেচনা করে, আপনারা শিক্ষিত মানুষ; আমার বিশ্বাস আছে আপনারা আমাকে ঠকাবেননা”। এর পর আর কোনো কথা থাকেনা, ছেলেটি ভীষণ চালাক, কীভাবে যাত্রীদের চরিত্র বুঝে মন জয় করতে হয় তা সম্বন্ধে যথেষ্ট জ্ঞান রয়েছে। দুপুরের ৫ ঘন্টার যাত্রাতে তার প্রতি আমার একটা ভরসা হয়ে গিয়েছিল, তাই বললাম- “ঠিক আছে, সে নাহয় একটা ব্যবস্থা করা যাবে’। ছেলেটি বলল- “আমি বড় গাড়ি নিয়ে যাব সাহাব, আরও যদি তিন চারজন যাত্রী রাস্তা থেকে তুলি আপনাদের আপত্তি আছে কি”? আমি বললাম- “মোটেই না, কিসের আপত্তি। তোর যদি কিছু অতিরিক্ত রোজগার হয় তা তো অত্যন্ত আনন্দের, তবে দেখিস আমাদের বসার যেন কোনো অসুবিধা না হয়”। আমার পরিচয় পত্রের জেরক্স ও ছবি না থাকায় সে তার মোবাইলে ছবি তুলে নিয়ে বিদায় নিল।

সে চলে যেতে আমি সুনন্দার রুমে আসতেই সুনন্দা চেঁচিয়ে বলে উঠল- “অরিত্র কোথায়? তার ফোন লাগছেনা কেন”? আমি খানিকটা থতমত খেয়েও বললাম- “পুরুষ মানুষ, সদ্য যুবক, আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। সে ভারত ভূখন্ডেই রয়েছে, এতো উত্তেজিত হওয়ার কিছু নেই”। জোর দিয়ে বললাম বটে কিন্তু আধাঘণ্টা পরও যখন অরিত্র ফিরলনা তখন আমিও ভিতরে ভিতরে ভয়ঙ্কর রকমের উষ্মা অনুভব করলাম। বাইরে বেজায় ঠান্ডা, গায়ে শোয়াটারের উপরে শালটা জড়িয়ে রিসেপশনে সবে পৌঁছেছি, দেখি আরো কয়েকজন স্ত্রীপুরুষের দলের সাথে অরিত্রও হোটেলে ঢুকছে। কিছুটা উত্তেজিত হয়েই তাকে ধমক দিতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু ওর সাথের দুজন ভদ্রলোক এসে ক্রমান্বয়ে আমার সাথে করমর্দন করে নিজেদের পরিচয় দিল। প্রথমজন জয়দীপ লাহিড়ী, অবসর প্রাপ্ত বিচারপতি। স্ত্রী নিয়ে বেড়াতে এসেছেন, অন্য জন বছর চল্লিশের নীহার মজুমদার, ইনিও সদ্য সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে নিজে একটা ব্যবসার চেষ্টা চরিত্র করছেন, সাথে স্ত্রী ও দুই যমজ ছেলে মেয়ে। এদের সাথেই অরিত্র ‘এনচে’ মনেষ্ট্রিতে ছিল।

ছেলে রুমে ঢুকতেই সুনন্দা এক্কেবাতে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল ঝাঁ ঝাঁ করে, শত প্রশ্নের কামান ছুড়তে লাগল। ছেলে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমাতেই সমস্ত প্রশ্নগুলো উহ্য করে বোনকে দেখাতে লাগল সে কী কী এনেছে। একটা বৌদ্ধ ঘুর্ণি চক্র, একটা রুপোর বুদ্ধ লকেট ও আরো বেশ কিছু হাবিজাবি জিনিসপত্র। মেয়েও দেখি একটা ছোট থাঙ্কা, বুদ্ধের ছবি আঁকা বাহারি ফুলদানি, কিছু চুলের ক্লিপের সাথে একটা উজ্জ্বল পাথর খচিত খ্রিষ্টীয় ক্রস। সেটা দেখা মাত্রই ছেলে ওটিকে গলায় পড়ে নিল, বিনিময়ে বোনকে একটি রঙিন সুতোর তৈরি একটি ব্যান্ড দিলো যাতে একটি সহাস্য বুদ্ধের লকেট রয়েছে। সুনন্দা আবার শুধালো- “তোর ফোন কেন লাগছিলনা”? সে বলল- “ছবি তুলে ব্যাটারির চার্য শেষ হয়ে গেছিলো”। সুনন্দা নাছোড়বান্দা- “তোর প্যান্টের টিকিট পকেটে তো একটা অতিরিক্ত ব্যাটারি নিয়ে ঘুরিস, সেটা কবে কাজে আসবে বাঁদর” বলে গজগজ করতে লাগল। ছেলে উত্তর দিল- “ওটা ব্যাগে আছে, রাত্রে চার্য দেব, আর এমনতর কাজ হবেনা”। এসব পর্ব মিটলে ডিনার করে আমরা যে যার যার ঘরে শুতে গেলাম, ছেলে কিন্তু ঘুমালোনা। সে দেখি ‘সিকিমের ইতিহাস’ নামের একটা ইংরেজি পেপার ব্যাক বই এর পাতা উল্টাচ্ছে। আমি বললাম শুয়ে পর, কাল ভোর ভোর বের হতে হবে। সে জবাব দিল যে, যাত্রাপথে গাড়িতে ঘুমাবে, এখন তার পড়ার মুড। আমি আর বাক্যব্যায় না করে চোখের পাতা বুজতেই ঘুমের অতলে তলিয়ে গেলাম।

ক্রিক ক্রিক করে ফোনটা বেজে উঠতেই ঘুমটা ভেঙে গেল। ছেলেই ফোনটা ধরে বলল রিসেপসন থেকে ফোন, ড্রাইভার চলে এসেছে। শুধালাম- ঘুমাসনি? সে জবাব না দিয়ে বলল- “মাকে তুলতে যাচ্ছি”। মিনিট চল্লিশ পর তৈরি হয়ে ভোর প্রায় সাড়ে পাঁচটার সময় আমরা গাড়িতে চড়ে বসলাম, বিচ্ছিরি রকমের শীতে সকলে জড়সড়, এবারে ছেলে ড্রাইভারের পাশের সিটটা দখল করে নিল। বেশ বড় গাড়ি, সামান্য দূরে আরেকটা হোটেল থেকে গত রাত্রের সেই দুই পরিবারও আমাদেরই গাড়িতে চড়ে বসল, সাথে অপর দম্পতীর দুই বাচ্চা। বুঝলাম রাত্রেই ড্রাইভার এদের সেট করে নিয়ে এই ঢাউস গাড়ির ব্যবস্থা করেছে। ড্রাইভারকে শুধালাম- “এর পরেও আবার রাস্তার প্যাসেঞ্জার তুলবি নাকি রে”? একটু হেসে সে জবাব দিল- “নেহি সাব”। আমাদের সকলের লাগেজ গাড়ির ছাদের বাঙ্কারে বাঁধা রয়েছে। পিছনের সিটে আমরা দুজন পুরুষ ও আমার মেয়ে, মাঝের বেঞ্চ সীটে ৪ জন মহিলা যাত্রী ও সামনের সীটে ছেলে ও বৃদ্ধ জয়দীপ বাবু। তার গলায় দেখলাম বেশ একটা লম্বা লেন্সের দামী ক্যামেরা, নিজেই বললেন- অবসরের পর তিনি এখন শখের ফটোগ্রাফার, সারা জীবন আইনের কানাগলিতে চক্কর খেতে খেতে পৃথিবীটাকেই নাকি তার দেখা হয়েই উঠেনি।

ছেলে দেখি ড্রাইভারের সাথে নিচু স্বরে কী সব গল্প ধরেছে, জয়দীপ বাবু পটাং পটাং করে ছুবি তুলছেন কুয়াসার মধ্যেও। নীহারবাবুর কোলে তার চার বছরের পুত্র ঘুমাচ্ছে, সহোদরাটি সামনের সীটে মায়ের কোলে। তিনি শুধালেন- “লাচুং থেকে আগের প্ল্যান কি”? আমি বললাম- “এবারে আমার কোনো প্ল্যান নেই, সামনে আমার যে অভিভাবক বসে আছে সে ই সব কিছু ঠিক করছে” বলে হো হো করে হেসে উঠলাম দুজনেই। যদিও ছেলের এদিকে কোনো ভ্রুক্ষেও ছিলনা, কিন্তু ড্রাইভার ছোকরাটি আমাদের কথা শুনেছে, সে বলল- এই সব অঞ্চলেই তার দৈনন্দিক কাজ, সে গত ৬ বছর ধরে নিত্যদিন মরশুমী পর্যটকদের পরিসেবা দেয়। মনে মনে আমি একটু খুশিই হলাম। একটা স্ট্যান্ড থেকে স্থানীয় কিছু মহিলাকে গাড়ির বাম্পারে চড়িয়ে তার গন্তব্যে পৌঁছে দিল, বিনামূল্য সার্ভিস। মাঝেমাঝেই এভাবে স্থানীয় লোকজনেদের পরিসেবা দিচ্ছে আমাদের এই নরবুর মত কোনো কোনো ড্রাইভার। ব্যাপারটাতে বেশি খুশিই হলাম, নতুবা এমন দুর্গম অঞ্চলে এরা কিভাবেই বা যাতায়াত করবে।

কুয়াশা পরিষ্কার হয়ে সামান্য রোদের ঝিলিক দিতেই এ সকল অঞ্চলে যেটা দেখা যায় সেটা এমনই- পাকদণ্ডী বেয়ে একদিকে পাহাড় অন্যদিকে গভীর ঝোপে ঢাকা খাদ। দুধারেই ধাপে ধাপে বাড়ি, নিচু বারান্দায় রঙিন কম্বল গুলো উদিত সূর্যের দিকে তাক করে মেলে রাখা, পাহাড়ি ফুলের ভারে আচ্ছন্ন সবুজ লতারা উঁচু থেকে ঝুলে পড়েছে রাস্তার উপরে, মধুমাধবী লতার দল, অজানা অর্কিডের গাছড়া। বড় বড় লোমওয়ালা কুকুর গুলো শীতের জড়তা কাটিয়ে খাদ্যের সন্ধানে চলেছে। সবুজ উপত্যকায় কুলুকুলু ঝড়ে চলা ঝর্ণারা ঝলমলিয়ে উঠে পাহাড়ি ফুলের সাজে। পাকদন্ডির উপর থেকে অনেক নীচে আঁকাবাঁকা নদী গুলোকে বড্ড নরম সিদ্ধ নুডলসের মত লাগে এখান থেকে। আহা, এখানেই যদি থেকে যাওয়া যেত, কতইনা ভাল হত। পাহাড়ের দেশে ঝুপ করে সন্ধে নামে, বড্ড তাড়াতাড়ি। যখন ছায়া পড়ে আসে অর্ধেক পাহাড়ে, উল্টোদিকের ঢালুতে তখনও কটকটে রোদ। সকাল থেকে বিকাল অবধি প্রাণভরে প্রকৃতিকে কাছ থেকে দেখে তাকে উপলব্ধি করে সন্ধ্যা ঢললেই নিস্তব্ধতাকে সাথী করে সারা জীবনের সঞ্চয়িত অভিজ্ঞতাগুলোকে লেখালেখি করে অবশিষ্ট জীবনটাকে কাটিয়ে দেওয়ার মত সুখ আর কিসে থাকতে পারে?

গ্যাংটক থেকে কাবি, ফোদং, মংগন, সিংঘিক হয়ে গাড়ি যখন চুংথাং পৌঁছালো তখন ঘড়ির কাঁটা ১১টার ঘর ছাড়িয়েছে। এই চুংথাং ই তিস্তা নদীর উৎস স্থল, লাচুং-চু আর লাচান নামের দুটো শাখানদী মিলে এই তিস্তা নদীর প্রবাহের সৃষ্টি করেছে। প্রতিটি স্থানের নামই সেতারের টুংটাং শব্দের মত ভীষণ মিষ্টি। এখান থেকে চু নদীর খাদের উপরি কিনারা বরাবর আমরা চললাম ছেলে অরিত্রর বুক করা হোমস্টের উদ্দেশ্যে। আমাদের নামিয়ে গাড়ি বাকিদের ড্রপ করতে যাবে তাদের নিবাসে। ডানদিক বরাবর লাচুং ফরেষ্ট ব্লক অঞ্চলেরই একটা ছোট্ট পাহাড়ি গাঁয়ে আমাদের গন্তব্যে এসে পৌছালাম, গ্রামটির নাম ইয়াংচি। ছবির মত সাজানো প্রাকৃতিক দৃশ্যের মাঝে কয়েকটা কাঠের বাড়ি, আমাদের বাড়িটির চারিদিকে ফুলের বাগান এমনকি বারান্দাতেও। অদূরে তিরতির করে ঝরে চলা একটা পাহাড়ি ঝর্ণা, সামান্য নিচেই নদী যাতে ট্রাউট মাঝের ঝাঁক খেলে বেড়াচ্ছে স্রোত ঠেলে, এক স্বর্গীয় পরিবেশ যেখানে কারো কোনো তাড়া নেই।

গ্রামে আরো পাঁচ ছয়টি বাড়ি রয়েছে, এরা সকলেই হাতে বোনা শীতের পোশাক ও কার্পেট তৈরি করে, হোম-স্টে বিষয়টা বছর চারেক চালু করেছে এরা। বাড়ির মালিকের নাম কুঙ্গা ভুটিয়া, আমরা তাদেরই অতিথি আগামী ৪ দিন। এখান থেকে লাচুং মাত্র ৮ কিলোমিটার, ইউমথাং উপত্যাকা ৩৫ কিমি। বাকি যাত্রীদের টাটা করে ২০০০ টাকা ভাড়া মিটিয়ে আমরা ওদের ছেড়ে দিলাম। কুঙ্গার স্ত্রী কাঁচের গ্লাসে একধরনের পানীয় দিয়ে স্বাগত জানালো, একটু টক স্বাদের ঘোল জাতীয় পানীয়। এর উপরে সিদ্ধ আলু, পেঁয়াজ, শশা সহ আরো অনেক নাম না জানা পাতা-কন্দ কুচিয়ে তাতে টপিং দেওয়া রয়েছে। অপূর্ব তার স্বাদ, শুধাতে বলল এর নাম হচ্ছে ‘মোহি’, ঐতিহ্যবাহী লেপচা পানীয়।

দ্বিপ্রাহরিক ভোজনের শেষে সামান্য বিশ্রামের পর বেলা থাকতে থাকতেই আমাদের ওই কাঠের বাড়িটির দোতলার বারান্দার এসে দাঁড়ালাম, অন্যেরাও বোধহয় সকলেই ঘুমাচ্ছে। পাহাড়ের জঙ্গলে এক অপরূপ সন্ধ্যা হয়, অদূরে ঝর্ণার অবিশ্রান্ত সুরেলা আওয়াজে নাম না জানা পাখিদের কলতান, উপরে পাহাড়ের মাথায় পাইন, সিডার, দেবদারু আরও কত অচেনা গাছের ঘনসবুজ জঙ্গলের মাঝখান থেকে ছড়িয়ে পড়া, মাতাল করা বুনো গন্ধের আবেশ, পাতলা কুয়াশার দাপটে সূর্যটাকে দেখা যায় না তখন। ইলেকট্রিক ফ্লাক্সে বানানো গ্রিনটির পেয়ালাতে চুমুক দিয়ে তাকাতে মনে হল গোটা পৃথিবীর সবুজ বোধহয় এখানেই ঢেলে দিয়েছে সৃষ্টিকর্তা। হঠাতই কানে এলো ঘন্টার শব্দ, নিশ্চই কাছাকাছি কোনো মন্দির  আছে, কুঙ্গার স্ত্রীকে শুধাতে সে বলল কাছেই একটা মনেষ্ট্রি রয়েছে, সামান্য ট্রেকিং করে চড়াই ভাঙতে হয়। কখন দেখি আমার মা ও ছেলে আমার পাশে বারান্দাতে এসে দাঁড়িয়েছে। কুয়াশা শুরু হয়েছে অল্প, সাথে মাঝে মাঝে দমকা বাতাস যেন হিম জমিয়ে দেবার ধমকি দিয়ে যাচ্ছে বারেবারে। ছেলের সাথে চোখাচোখি হতেই সে বলল আমি রাজি, আমাদের মাঝে টেলিপ্যাথি যোগে ওই মনেষ্ট্রিতে যাবার বিষয়টা পাকা হয় গেল। মাকে বলে আমরা রওনা দিলাম, কুঙ্গাও আমাদের সাথে চলল কারন অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই সন্ধ্যা এসে যাবে।

তৃতীয় পর্ব

যতই এগোচ্ছিলাম, ঘন্টার গুম গুম ধ্বনি আরো তীব্রতর হচ্ছিল। একটা ন্যাড়া পাহাড়ের চুড়োতে একটা জীর্ন কাঠ ও পাথরের বৌদ্ধ মন্দির। কাছে যেতেই কড়া সুগন্ধী নাকে এলো, শুনলাম তিব্বতী ভাষায় মন্ত্রোচ্চারণ হচ্ছে। আরো কাছে যেতে ছেলে বলে উঠল- “এমন মনেষ্ট্রি তো দেখিনি কোথাও, কোলকাতাতে বুদ্ধ মন্দির দেখেছি, দার্জিলিং যাবার পথে বা গ্যাংটকে গত কালই এনচে মনেষ্ট্রিতে অনেকক্ষণ ছিলাম সেখানে এমন স্থির অথচ কেমন যেন রাগী বুদ্ধ মুখায়বের মূর্তি দেখিনি”। এই মুর্তিটির অনেকটা নিচে স্ফটিকপাত্রে কালচে মত তরল কিছু রাখা আছে, একটা প্রদীপ প্রজ্বলিত সেখানে, হয়ত পূতঃপবিত্র জল। চারিদিকে পত পত করে উড়া পতাকা গুলো রং-বেরঙের বদলে লাল ও কালো রঙের। এখানে কোনো পাখিই যেন নেই, অরন্যের সবুজ নীরবতার সাথে বাতাসের হিসহিসানি আর মাকড়সার জালের মত কুয়াশার আস্তরন সামান্য ভেদ করে আসা দিনে আলো। অরিত্র কুঙ্গাকে শুধালো- “এটা কোন ধর্মের মুর্তি”? কুঙ্গা হিন্দি-নেপালি-ভুটিয়া মিশ্রিত ভাষায় বিস্তারিত ভাবে যেটা বলল সেটা এমনতর-

দক্ষিণ তিব্বত থেকে দেশান্তরী হয়ে আসা চারটি আদিবাসী ও উপজাতি সম্প্রদায় হল ‘লোহ-মন-সঙ ও সুন’। এই চারটিই মূল জনজাতি। এদের মধ্যে লোহ থেকে লোফো জাতির উদ্ভব হয়েছিল ও সেই লোফোরাই পরবর্তীতে ভুটিয়া জাতি হিসাবে বিকশিত হয়েছে। লোফো জাতি মূলত যাযাবর প্রজাতির, যেমন রোং জাতিও যাযাবর। এই রোং জাতির পূর্ব পুরুষ হচ্ছে মন উপজাতি, এরা অত্যন্ত হিংস্র, আর রোং জাতির আধুনিক অংশটা হচ্ছে লেপচা জাতি। ঠিক তেমনই সঙ থেকে লিম্বা বা লিম্বু উপজাতির উদ্ভব। সুন জাতি এখনও সেই প্রাচীন পন্থার আদিবাসী ধর্মের অনুসারী, আগে তারা গহীন পার্বত্য এলাকাতে থাকত, বর্তমানে বহুদিন তাদের কোনো খোঁজ নেই। তারা হয় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে কিম্বা বাকি তিন ধারার সাথে মিশে গেছে। নেপালি রাই, গুরুং, শেরপা, তামাং, নেওয়ার, মাঙ্গার, গোর্খালি, শর্মা, ছেত্রী জাতি-উপজাতিরা উনিশ শতকের শুরুতে দলে দলে এসে বর্তমান সিকিমের জনসংখ্যা দখল করে নিয়েছে বলে এরা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। এরা জঙ্ঘাং, গুর্মা, লিম্বু, শুনুরাং, থুলুং, তিব্বতি, ইয়াখা প্রভৃতি আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে। এই লিম্বু শব্দ ‘সু-খেইম’ থেকেই সিকিম নামের উৎপত্তি, সু মানে নতুন আর খেইম মানে দেশ বা ঘর।

এসব শুনে আমাদের দুই বাপ ব্যাটার তো চোখ ছানাবড়া, এ বলে কী! আমদের অবস্থা দেখে সেই নিজে থেকে বলে উঠল- “আসলে অনেক পর্যটকই আমাদের কাছে এগুলো জানতে চান, তাই আমি এগুলো জেনে রেখেছি। আমি নিজেও রোং উপজাতির মানুষ। আমাদের ভাষা প্রাচীন থুলুং ভাষা, এই ভাষাতে বুদ্ধকে ডাকা হয় ফাদং-চু নামে, যিনি সমগ্র পৃথিবীর দেবতা। আমাদের এই বজ্রযান বৌদ্ধ ধর্মের শাখাটিই সবচেয়ে প্রাচীন তিব্বতি বৌদ্ধ ধর্মের শাখার অন্যতম। আমাদের লেপচাদের আদি বংশ রোং ও সুন রাই এই মতবাদেই দুইটি শাখা- যারা বুদ্ধকে নারীজ্ঞানে সাধনা করে, কিন্তু সুন জাতি আর নেই, তাই আমরাই একমাত্র। এই দেবীর নাম ‘নোজিওগনইউ’, এর পাশাপাশি পৃথিবীকে মাতৃজ্ঞানে পূজা করে যার নাম ‘ইটাবু-মো’। এই সকলেরই আত্মাগুলি একটাই, যার নাম ‘বানু-ও’। আমাদের মাথা ঝিমঝিম করছিল, এমন সময় একটি ছোকরা মত সন্ন্যাসী যে কালো বস্ত্র পরিধান করে রয়েছে সে আমাদের তিন জনকেই একটি পাথরের পাত্রে উষ্ণ দুধ দিয়ে গেল। কুঙ্গা বলল এটা চমরি গাই এর দুধ।

যথারীতি ছেলে আবার শুধালো- “এ কালো পোশাক কেন পরিধান করে রয়েছে”? কুঙ্গা বলল- “এদের পাদেম নামে ডাকা হয়, এরা ব্রহ্মচর্য পালন করছে ভবিষ্যতের শামান হওয়ার জন্য। আমাদের ভাষাতে শামান মানে গুরু, সমাজের যিনি মাথা তাকেও অবশ্য শামান বলা হয় আবার যিনি পুরোহিত তিনিও শামান। তবে প্রত্যেকের মর্যাদা আলাদা, আমাদের জীবনধারাতে সকল উৎসব গুলোই ধর্মকেন্দ্রিক তাই শামানদের প্রভাব প্রতিপত্তি এই ছোট্ট ছোট্ট জনগোষ্ঠীগুলোর মাঝে বিপুল পরিমাণে রয়েছে”।

আরো কয়েকটি নানা বয়সের শামানকে দেখলেও বয়স্ক বা মাঝবয়স্ক কাউকেই দেখলামনা আশাপাশে, কুঙ্গা বলল তারা অন্য কোথাও গেছে হয়ত। আরেকটু দিনের আলো নিভে যেতে একটা বড় মশাল মত জ্বলে উঠল, দেখলাম বুদ্ধমুর্তিটি এক ধরনের উজ্জ্বল সোনালী পাথর কেটে বানানো হলেও মুখমন্ডলটি স্বচ্ছ স্ফটিক দ্বারা নির্মিত, মুর্তির ঠিক মাথার পিছনে একটা প্রজ্বলিত প্রদীপের আলো ওটাকে আধা অন্ধকারে দ্বীপ্তমান করে রেখেছিল। মুর্তির পায়ের অদূরে বলিকাঠের মত পাথরের তৈরি কিছু একটা দেখা গেল, কুঙ্গার থেকে জানলাম ওখানে নাকি বলি দিয়ে অশুভ আত্মাদের তৃপ্ত করার একটা বিধান ছিল, এখন সেই আচার বিলুপ্ত হয়েছে। এবারে ফেরার পালা, সন্ধ্যার নিঝুম বনভূমির পাইন, ফার, ধুপি গাছের সারি আকাশ অবরোধ করে অন্ধকারকে আহ্বান করছে, তার মাঝখান থেকে মোমের মত নরম আলো এসে রডড্রেনড্রনের ঝোপে যেন ভয়াল পরিবেশের সৃষ্টি করে তুলছে। কুঙ্গা সাবধান করল- “সাবধানে চলবেন, কারন জোঁকের উপদ্রব আছে”। কুড়ি মিনিটের হাঁটা পথ, ফেরার সময় ১০ মিনিটেই পৌঁছে বুঝলাম আমরা প্রায় একঘন্টা ওখানে ছিলাম। সুনন্দা তেমন আগ্রহ না দেখালেও মেয়ে আমার উপরে মৃদু রাগের প্রদর্শন করতে লাগল কেন তাকে আমরা সেখানে নিয়ে যায়নি এই জন্য।

আমার মা ও সুনন্দা ওদিকে কুঙ্গার স্ত্রীর রান্না ঘর থেকে অনেক তথ্য হাজির করে এসে আমাকে যেটা বলল তার সারমর্ম- ওরা এখানে আর থাকতে রাজি নয়, কারন এরা নাকি গরু-শুয়োর সবই খায়। মেয়ে বেশ রাগত স্বরে বলল- “ওইভাবে ভাবলে বাইরে বেড়াতে আসতে বলে কে তোমাদের? প্যাকেট খাবার খাও নতুবা ভেজ খাও, ব্যাস ঝামেলা মিটে গেল”। কথা শেষ হওয়া মাত্রই মেয়ের উপরে শ্বাশুরি বৌমার জোড়া অগ্নিদৃষ্টি, “বাবাগো’ শব্দে মেয়েকে আমার পিঠের পিছনে আশ্রয় নেওয়ালো। সুনন্দাকে শুধালাম- ‘কী কী রান্না জানলে বা শিখলে শুনি’। সে উৎসাহের সাথে জানালো- “জানোতো এরা মোমো আর চাউমিন খায়”। মেয়ে আবার তাচ্ছিল্য হেনে বলল- “ওটাকে নুডলস বলে, চাউমিন নয়”। আমি সুনন্দাকে শুধালাম- “আর কিছু জানোনি”? সে বলল- “থুপকা, যেটা টাটকা সব্জি সিদ্ধ করে ওই চাউমিন দিয়ে বানায়, এটাতে স্যুপ থাকে যাকে আমরা ঝোল বলি। এরা খাবার পর ‘ছুরপি’ নামের মুখশুদ্ধি খায়, যেটা চমরি গাইয়ের দুধ থেকে তৈরি হয়, সামান্য টক জাতীয় খাবার। ‘গুন্দ্রুক’ স্যুপ যেটা শাক জাতীয় সব্জি দিয়ে বানানো হয়, আর ‘সিনকি’ স্যুপ সামান্য গ্যাঁজানো ডাল দিয়ে বানানো। এছাড়া ‘পেজের’ স্যুপ, ‘থেন্টুক’ ও ‘নিংরো’ নামের বিশেষ ধরনের ফার্নের স্যুপ এরা উৎসবে খেয়ে থাকে। গাঁজানো সোয়াবিন দিয়ে এরা ‘কিনামা’ নামের একটা পদ তৈরি করে। চর্বিযুক্ত মাংস দিয়ে ‘ফাক্সাপা’ নামের একটা খাবার এরা খেয়ে থাকে। এরা সিঙাড়াকে ‘সিফালে’ বলে ডাকে, তবে এতে মাংসের পুর থাকে। আজ লাঞ্চে যেটা খেলে সেটা মুরগির মাংসের সাথে ভাত দিয়ে খিচুরির মত পদ- সেটাকে এরা ‘আওয়াচিয়া’ বলে। আর মাংসের পদটা ছিল ‘ঘিমা’, ছেঁচা মাংস দিয়ে বানানো সসেজ”।

এরপর অনেকক্ষণ ধরে পারিবারিক আড্ডা হল একটা প্রজ্বলিত অগ্নিকুণ্ডের চারিপাশে। আরো একটু রাত হলে কুঙ্গার স্ত্রী আর একটি কিশোর ছেলে খাবারের প্লেট এনেদিল। চালের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি জিলাপির মত প্যাঁচানো রুটি, শুধাতে বলল এটাকে এরা ‘সিল রুটি’ বলে। সাথে আলু টম্যাটোর তরকারি ও ‘মেসু’ মানে কচি বাঁশের চাটনি। বড় গ্লাসে ধুমায়মান চা জাতীয় পানীয়ও দিল, এর গন্ধটা কেমন যেন ঝাঁঝালো, শুধাতে বলল একে বলা হয় ‘ফো’, শুকনো চা তেতো হওয়া পর্যন্ত ফুটিয়ে উপরে চমরীগাই এর দুধের নোনতা মাখন দিয়ে তৈরি। এই পদটি আমি আর মেয়ে ছাড়া কেউ ছুঁয়েও দেখলনা। কুঙ্গার বউকে শুধালাম আর কী নতুন পদ খাওয়াবে গো, সে লাজুক হেসে বল্লো- রাত্রে ‘তোংবা’ দেওয়া হবে ডিনারের ডিনারের পর। এতে হালকা নেশা হয়, তাই সুন্দর ঘুম হয়। বার্লি আর মিলেটের বীজ গেঁজিয়ে তৈরি তরল পানীয়। মা ছাড়া সকলেই তোংবা খেয়ে বেশ খানিক্ষণ গল্পগাছা করে তাড়াতাড়িই শুয়ে পড়লাম।

পরদিন সকাল সকাল আমরা রওনা দিলাম, কাক ভোরেই লহিড়ী বাবু ও নীহার বাবুদের সপরিবারে সাথে নিয়ে নরবুর গাড়ি হাজির। শুরুতেই আমরা লাচুং এর গুম্ফাটি দর্শন করে কার্পেট বুনন কেন্দ্র হয়ে ইউমথাং এর উদ্দেশে রওনা দিলাম। কিছুক্ষণ চলার পর সত্যিই মনে হয় ‘হাজার বছর ধরে পথ হাটিতেছি আমি…’, অজস্র নাম নাজানা পাহাড়ি ফুলেদের মাঝে রডোড্রেনডনের মতই ঝোপ বিশিষ্ট একটা গোলাপি ফুলের তীব্র গন্ধ আমাদের সকলকে আচ্ছন্ন করে তুলছিল, নরুবু বলল এটার নাম এজিলিয়াস; এই সময়েই ফোটে। বেশ কিছুক্ষণ পর পৌছালাম নিসর্গপুরী তথা দেবলোকে। চতুর্দিকে বরফে ঘেরা সুউচ্চ পাহাড়ের পাদদেশ পর্যন্ত শুভ্র বরফের চাদরে মোড়া, অনতিদূরে নীলরঙা নদী ও ভ্যালির সুবজ জমি- আহা সে যেন একটুকরো স্বর্গরাজ্য। এখানে গামবুট, গ্লাভস ও মোটা জ্যাকেট ভাড়ায় পাওয়া যায় বরফে যাওয়ার জন্য, সকলেই বরফের দেশের মজা লুটে নিল প্রাণভরে ওই স্বল্প সময়ের মধ্যে। এখানে একটি শিবমন্দির ও একটি উষ্ণপ্রসবণ রয়েছে যা আপনাকে আশ্চর্যান্বিত করবেই। সেখান থেকে আরেকটু এগিয়ে আমরা ইউমেসামডং জিরো পয়েন্ট ও ফেরার পথে অনন্ত বরফের দেশ চীন সীমানের কাছে ‘কাটাও’ নামক স্থানে ঘুরে এলাম।

গোল বাঁধল এর পর, ছবি তুলে তুলে ক্লান্ত লাহিড়ীবাবুর উদরে নিন্মচাপ দেখা দিয়েছে। ড্রাইভারকে শুধালাম, সে বলল কাছাকাছি কোথাও টয়লেট নেই; এদিকে তিনি যেকোনো উপায়ে পেট হালকা করতে মরিয়া। নরবু বললো এখানের ঝোপ গুলোতে ভয়ানক প্রজাতির জোঁকের উপদ্রব, পায়ুপথে দিয়ে নাকি এরা পেটের ভিতরে চলে যায়। একথা শুনে সে যাত্রায় রাশভারী জজসায়েব লাহিড়ী বাবুর বেগ সাময়িকভাবে বিরতি দিল, বুঝলাম ভয়ের চেয়ে জরুরী আর কিছু নেই। কিন্তু কিছুদূর যাবার পরেই আবার যে কে সেই, অগত্যা একটা ঝর্ণার পাশে গাড়ি দাঁড় করাতেই লাহিড়ী বাবু দৌড় লাগালেন, নরবু বলল এই ঝর্ণাটার নাম অমিতাভ বচ্চন। এখানেই আঁখে সিনেমার শুটিং হয়েছিল বলে এই নাম। যাই হোক, বাকি পথ নিরুপদ্রবেই আস্তানাতে এসে পৌছালাম।

পরদিন আমরা সোজা গুরুদাম্বা লেকের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম, আজকে আমরাই প্রথম যাত্রী। চুংথাং হয়ে আমরা লাচেন এলাম, এখান থেকে ওই দুই পরিবার সাথে যোগ দিলেন। নীহার বাবু গাড়িতে উঠেই আমাদের সকলকে হোমিওপ্যাথিক ওষুধ কোকা-৩০ খাইয়ে দিলেন, এটা তিনি সেনাবাহিনীতে থাকাকালীন শিখেছিলেন। কম অক্সিজেনে এতে শ্বাসকষ্ট উপশম হয় এবং বলল তার সাথে কর্পুরও রয়েছে, গা-বমি দিলে এটা নাকি ভীষণ উপকারী। আজ আমাদের সাথে মাকে নিয়ে আসিনি, সে কুঙ্গার বৌ এর তত্বাবধানে ঘরেই থাকবে, কারন বয়স্ক মানুষ ওই অতি উচ্চতাতে শ্বাসকষ্টের দরুন হিতে বিপরীত হতে পারে। প্রথমেই গন্তব্যের শেষ বিন্দুতে যাবো, থাঙ্গু ভ্যালী হয়ে গেলেও সেখানে ফেরার পথেই ঢুঁ মারব সেখানে, কারন গুরুথাম্বাতে বেলা একটার পর থাকা যথেষ্ট বিপজ্জনক, যখন তখন আবহওয়া বদলে যায়, তুষার ঝড় শুরু হয়। আজ একজন অতিরিক্ত ড্রাইভার সাথে নিয়েছে নরবু, শুধাতে বলল তার নাম তোম্বা সেরিং।

বছর ত্রিশের ঝকঝকে তরুণ, বাংলা হিন্দির পাশাপাশি নেপালি ঝরঝর করে বলতে পারে আর ইংরাজি সবটা বুঝতে পারলেও বলতে পারেনা। তারা নিজেদের মাঝে অন্য একটা উপজাতি ভাষাতে কথা বলছিল। যাত্রাপথের দুধারে সাদা, বেগুনী, গোলাপি রডোড্রেনড্রনের সাথে সবুজ কর্ণিফারের উপরে পেঁজা তুলোর মত তুষারের শয্যা, কুড়িতে শিশিরের বিন্দু চুমু খেয়ে যাচ্ছে। লাচেন থেকে প্রায় ৩ ঘন্টার পথ গুরুদম্বা লেক। কিছুক্ষণ চলার পরেই ঘন কুয়াশা ও তীব্র শীত আমাদের ঘিরে ধরল, এবং যাত্রা বেশ ঝাঁকুনি যুক্ত হয়ে পড়ল। রাস্তা বলে এই অংশটিতে কিছু নেই, স্বীকৃত রাস্তা কখনও থাকলেও থাকতে পারে, বর্তমানে ধসে খাদে তলিয়ে গেছে। যেটা নতুন বানানো হয়েছে এটা একেবারেই এবড়োখেবড়ো, আমাদের গাড়িতে ১০ জন প্রাপ্তবয়স্ক ও দুজন শিশু যেন ট্রাক্টারে চড়ে এগিয়ে চললাম। চতুর্দিকে নীল আকাশ পাহাড়ে বেড়া, মেঘেরাই আমাদেরই সঙ্গী, দুধারে রুক্ষ জমির যেটুকু বরফের বাইরে অবশিষ্ট সেটুকু বাদামী বর্ণের, মাঝে কোথাও সামান্য সুবুজ ঘাসের চাদর কোথাও মৃতপ্রায় গুল্ম জাতীয় পাতাবিহীন ঝাড় গুলো কঙ্কালের রুক্ষ সৌন্দর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে।

অনেক দূরে দূরে এক আধটা ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে কাঠের বাড়ি ঠিক রাস্তার ধারে পেরিয়ে যাচ্ছি, এগুলো পরিযায়ী পশুপালকদের অস্থায়ী আস্তানা। অদূরেই ন্যাড়া পাহাড়ের চারণভূমি, বড় কোনো গাছগাছালির চিহ্ন মাত্র টুকু নেই। মাঝে একবারই দেখলাম একটা স্থানীয় দল তাদের পালিত ভেড়া ও চমরীগাই এর দল নিয়ে হেঁটে চলেছে আর খান তিনেক সেনার গাড়ি উল্টোদিকে যেতে দেখেছি। যত উঁচুতে উঠছি তত পাল্লা দিয়ে ঠান্ডা বাড়ছে। চীন সীমান্ত এখান থেকে ১০ কিমির মধ্যেই তাই সীমান্ত সুরক্ষার বিষয়ে কোনো কার্পণ্য নেই। এর পর একটা চটিতে এসে যেখানে গাড়িটা থামল সেটা বড় বড় নুড়ি বেছানো পাথুরে জমি, দলের প্রায় প্রত্যেকেই যাত্রার ধকলে কাহিল তবুও সকলেই ক্লান্ত শরীরটাকে টেনে টেনে এগিয়ে চললাম। এখান থেকে হেঁটে যেতে হল প্রায় ২০০ গজ মত, মারাত্বক রকমের শ্বাস কষ্ট হচ্ছিল এই সামান্য চড়াই উঠতে। এখানে প্রকৃতি ভয়ানক রুক্ষ ও চরমাভাপন্ন, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৭৮০০ ফুট উঁচুতে রয়েছি আমরা। বাতাসের একটানা শোঁ শোঁ গর্জন ছাড়া এখানে অন্য কিছু নেই, তীব্র বাতাসের বেগের ভয়ধরানো শিরশিরানি ডাক কখনও শুনিনি আগে।

চতুর্থ পর্ব

লেকের ধারে পৌঁছে তার রূপ দেখে সকল কষ্ট, সকল পরিশ্রম সার্থক বলে মনে হতে লাগল। যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম সেখান থেকে প্রায় ফুট পঞ্চাশ নিচে লেকের জল। হ্রদটি অনেকটাই বড় কিন্তু পাহাড়ের আড়ালের দরুন এটির অল্প অংশই পর্যটকেরা চোখে দেখতে পায়। দলের অন্যতম বয়স্ক মানুষ লাহিড়ীদার ক্যামেরাতে পটাপট বন্দি হতে থাকল সেই অপূর্ব নৈসর্গিক দৃশ্য। আমরা আগেই গামবুট, মোটা জ্যাকেট, দস্তানা ভাড়া করে এনেছিলাম তাও চোখের পাতায় যেন বরফ জমে যাচ্ছে। তোম্বা বলে ছেলেটির কাছে দেখলাম থার্মোমিটার আছে, সে জানালো তাপমাত্রা মাইনাস এক ডিগ্রী। মজুমদারের স্ত্রী খুবই শান্তশিষ্ট মহিলা, সে বাচ্চাদের নিয়ে গাড়ির কাঁচ বন্ধ করে ভিতরেই রইল, তার স্বামী গাড়িতে ফিরলে অরিত্র ওনাকে গিয়ে নিয়ে এলো। তোম্বা জানালো অষ্টাদশ শতাব্দিতে গুরু পদ্মসদ্ভাব এই হ্রদটিকে আবিষ্কার করেন, এছাড়া লোকশ্রুতিতে রয়েছে গুরু নানক একবার তিব্বত থেকে ফেরার পথে এই লেকের ধারে এসেছিলেন, স্থানীয় মানুষদের শীতের সময় জলকষ্ট দেখে তিনি নাকি তার অলৌকিক ক্ষমতার প্রদর্শন করে হাতের তালু স্পর্শ করেন, তাই প্রচন্ড শীতেও এই হ্রদের জল সম্পূর্ণ জমে যায়না। বলাই বাহুল্য গুরুদাম্বা নামটিও এই কারনেই।

বরফাচ্ছাদিত তুষার শৃঙ্গের মায়াবী প্রতিবিম্ব পড়ছে হ্রদের নিশ্চল সবুজাভ-নীল জলে। জলটি এতোই স্বচ্ছ যে তলদেশ অবধি দেখা যাচ্ছে। তোম্বা বলল এই জলাধারই নাকি তিস্তা নদীর মূল উৎস। হ্রদের তিনধারেই পাহাড়ের মাথায় হিমবাহ, তুষার ধবল পর্বতচূড়াতে সুর্যের আলোক বিচ্ছুরিত হয়ে মনে হচ্ছে যেন লক্ষ লক্ষ টন সোনা দিয়ে পাহাড় গুলোকে মুড়ে ফেলা হয়েছে; এই হিমবাহগুলোর জলেই এই হ্রদ পুষ্ট। ধ্যনমগ্ন বুদ্ধের মতই এই জল নির্বিকার ধ্যনস্থ, যেন পৃথিবীর যাবতীয় সকল বিকারের উর্ধ্বে। পাহাড়গুলোর ঠিক ওপারেই তিব্বতের পবিত্র ভূমি, মানস সরোবরের দেশ কৈলাস। ভাবতেই আমার সর্বাঙ্গে শিহরন অনুভব করলাম, মনে মনে সেখানে যাবার বাসনাও তৈরি করে ফেললাম।

৪০ মিনিট মত সেখানে থেকে এবারে ফেরার পালা। ফেরার সময় উত্তেজনা কম থাকায় লক্ষ্য করলাম রাস্তার দুধারের কিছু কিছু স্থানে গার্ড ওয়াল রয়েছে, যদিও পাশে তেমন খাদ নেই অনেক স্থানেই। একটা মিলিটারি ক্যাম্পও চোখে পড়ল, তাদের ক্যান্টিনে দাড়িয়ে চা খেয়ে শরীর গরম করে নিলাম। পথের মধ্যে চোপতা নামের একটা উপত্যাকাতে আমরা খানিক ছবিটবি তুলে থাঙ্গু যাব বলে স্থির করলাম। কিন্তু কিছুদূর যাবার পরেই প্রকৃতি সম্পূর্ণ বদলে গিয়ে রুদ্রমূর্তি ধারণ করল। ভয়ানক শোঁ শোঁ বাতাসের বেগবান গর্জনে গাড়ি এগোনোই অসম্ভব হয়ে গেল, আমাদের সাথে আরেকটি ছোট গাড়ি ছিল, তারা ও আমরা পরপর একটা পাহাড়ের বাঁকের আড়ালে আপেক্ষাকৃত চওড়া স্থানে গাড়ি দুটো দাঁড় করিয়ে প্রতীক্ষা করতে লাগলাম। ভয়ানক মেঘের আচ্ছাদনে দৃশ্যমানতা কমে মাত্র কয়েক ফুটে পৌঁছেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হল প্রবল বৃষ্টিপাত। তোম্বা বলে ছেলেটি নাভি থেকে একটা বিচিত্র ‘অ্যাঁ’ শব্দের অব্যয়সূচক বাক্য বেড়িতে এলো, বুঝলাম সে ভিতরে ভিতরে উত্তেজিত তাই ছটপট করছে।

আমার মেয়ে, আমি, ড্রাইভার ও তার সঙ্গীটি ছাড়া সকলেই দেখি ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছে। হঠাত শুনি- “বাবা, ও বাবা ওঠো” শব্দে মেয়ে ডাকছে, বুঝলাম আমিও ঘুমের প্রোকোপেই চলে গেছিলাম। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি বেলা তিনটে দশ, মানে আর কিছুক্ষনের মধ্যে ঝুপ করে স্বাভাবিক সন্ধ্যা নামবে, অথচ আমাদের এখনও ২ ঘন্টারও বশি পথ বাকি, এই দুর্যোগের রাত্রে সেটা দ্বিগুন সময় নিলেও আশ্চর্যের নয়। এখানে ফোনের সিগন্যাল নেই যে লাচেনে কাউকে জানাব, যদিও পারমিটের কারনে প্রশাসনের কাছে আমাদের আসার সম্পূর্ণ তথ্য রয়েছে। আরো খানিকক্ষণ পরে অগত্যা আমরা একপ্রকার মরিয়া হয়েই কেন্নোর মত ধীরে যাত্রা শুরু করলাম। সামনের গাড়িটির ড্রাইভার আমাদের বয়সী, অনেক বেশি অভিজ্ঞ তাই তিনিই সামনে সামনে চললেন। আমার মেয়ে আর শিশুদুটি বাদে সকল মহিলারাই ঠাকুরকে ডাকতে লাগল ভীষণ উৎকণ্ঠাতে।

মুহুর্ত যেন কাটতেই চাইছেনা, ঘন্টাখানেকে বোধহয় আমরা মাত্র কয়েক কিলোমিটারই পথ পেরোতে পেরেছি। হঠাৎ আমাদের সামনের গাড়িটা থেমে গেল, বৃষ্টি তখনও অঝোরে পড়ছে। তোম্বা গাড়ি থেকে নেমে অন্য ড্রাইভারটির কাছে গেল, সে এসে যা খবর দিল তাতে আমাদের মাথায় বজ্রাঘাতের চেয়েও বেশি কিছু হল। উপর থেকে পাথর গড়িয়ে নেমে এসে রাস্তা জ্যাম, এই পাথর না সরানো পর্যন্ত কোনো ভাবেই যাওয়ার উপায় নেই। নীহারবাবু একটু সাহসী মানুষ কিন্তু তার স্ত্রী ভেউ ভেউ করে কেঁদে উঠতেই বাচ্চারাও কান্না জুড়ে দিল। স্বাভাবিক ভাবেই বাকি মহিলারাও কান্নাতে যোগ দিল। শুনতে পেলাম সামনের গাড়ি থেকেও বিলাপের আওয়াজ আসছে, কেউ একজন বলছে- “বারংবার করে বললাম আজ এই অমাবস্যার দিনে এখানে না আসতে, কে শোনে এ কথা”। আমার বুকটাও ছ্যাঁৎ করে উঠল, আজকেই তো সেই করালী অমাবস্যা, স্কন্দ পুরাণে রয়েছে “মহারাত্রীঃ সমুৎপন্না চতুর্দশ্যাঃ মুনীশ্বরঃ”। জজসাহেব বললেন- “কালী বিলাসতন্ত্রে- ‘কার্তিকে কৃষ্ণ পক্ষে তু পক্ষদশ্যাং মহানিশি/ আবির্ভূতা মহাকালী যোগিনী কোটি ভিসহা”। প্রতিজ্ঞা করলাম আজ বেঁচে ফিরলে আর কক্ষনও এই সময়ে ভ্রমণে আসবনা। এদিকে সুনন্দা ফিরেফিরে বলে যেতে লাগল- “আমি পইপই করে শনিবার বারবেলাতে যাত্রা করতে নিষেধ করেছিলাম, কিন্তু শুনবে কেন”! ইত্যাদি। ছেলের মৃদু ধমকে সে গলার স্বর নিচু করলেও বিলাপ কিন্তু থামালনা।

বৃদ্ধ জয়দীপ বাবুও সম্ভবত নাস্তিক, তিনি মোটেই না ঘাবড়ে সকলকে সাহস দিয়ে বল্লেন- “আমরা এতোগুলো মানুষ আছি, আমাদের সাথে শুকনো খাবার, জল রয়েছে যখন, এতো ঘাবড়াবার কি আছে! সকাল হলে সেনাবাহিনীর গাড়ি আসবেই, তখনই নাহয় আমরা হোটেল পৌঁছাব। এমন ছোটখাট বিপদ তো হতেই পারে, কী বলো নীহার”! নীহার বাবুও একটা ওই রকমেরই ছোট বক্তিতা দিয়ে থামলেন। খানিকক্ষণ পর সামনের গাড়ির ড্রাইভার এসে পিছন পানে কিছুটা ফিরে যেতে অনুরোধ করল, যেখানে মিলিটারি ক্যাম্পটা রয়েছে সেখান অবধি যেতে পারলে দুশ্চিন্তাটা থাকবেনা। তোম্বা পিছনপানে নিকষ কালো অন্ধকারের মাঝে একটা টর্চ লাইট নিয়ে হাঁটতে লাগল, আর দুই ড্রাইভার শম্বুক গতিতে গাড়ি ব্যাক গিয়ারে ঠেলতে লাগল।

এদিকে ছেলের দেওয়া এক তথ্যে আমাদের সকলে রোম খাড়া হয়ে উঠেছে, পিটার বায়ার্ণ নামের এক পর্বোতারোহি এই অঞ্চলের আশেপাশেই নাকি ইয়েতি বা ভয়ানক তুষার-দানবের দেখা পেয়েছিল। ইয়েতির প্রথম দাবীও এই অঞ্চল থেকেই উঠেছিল সেই ১৮৮৭ সালে এক চীনা অভিযাত্রীর বয়ানে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পাহাড় চূড়োয় আতঙ্ক গল্পের কল্যাণে আমরা সকলেই ইয়েতির বিবরণ নিয়ে ওয়াকিববাল। কোলকাতায় বাড়ির ড্রয়িংরুমের সোফায় গা এলিয়ে ইয়েতির কল্পনা করা আর উত্তর সিকিমের এই দুর্গম পাহাড়ে এমন ভয়ানক দুর্যোগপূর্ণ সন্ধ্যাকালীন আবহওয়াতে ইয়েতি নামের হিংস্র দানবের আশেপাশে উপস্থিতির কথা শোনা এক নয়, যারা এমন পরিস্থিতিতে পড়েনি তারা কখনও অনুধাবন করতে পারবেনা এই বীভৎসতা। মেয়ে বলল- “তবে ইয়েতি থাকুক বা না থাকুক, তুষারচিতা ও তুষারভালুক এ অঞ্চলে আছেই আর তারা ভয়ানক হিংস্রও বটে। এ অঞ্চলে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের থাকার উপস্থিতিও মিলেছে কিছুদিন আগের খবরে”।

মিনিট দশেক পরই একটা প্রশস্ত স্থানে গাড়ি গুলোকে সামনের দিকে ঘুরিয়ে নেওয়া হল। এ অঞ্চলের দৃশ্যপট এতোটাই বদলে গেছে যে খানিকক্ষণ আগে বৃষ্টি হচ্ছিল সেটা বোঝারই উপায় নেই। আকাশের দিকে তাকালে মনে হচ্ছে আজ দীপাবলি উপলক্ষে যেন কোটি কোটি প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছে কেউ। আকাশে যে এতো তারা থাকে আমার ধারণার বাইরে ছিল, মেলার গিজগিজ করছে যেন। এতো পরিষ্কার আকাশ কখনও দেখেছি বলে মনে হয়না, কোলকাতার দূষণে ঢাকা আকাশ দেখা সকলকে ডেকে দেখালাম বিষয়টা, যেটা এই বিপদের মাঝেও একটু প্রসন্নতা এনে দিল। হঠাৎ করে নাম না জানা কোনো পাখির গগনভেদী চিৎকারে সমস্ত নিঃস্তব্দতাকে ঝনঝন করে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিল, সেই ধ্বনি দূরের পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে বারেবারে ফিরে আসতেই আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি উঠল। সাথে সাথে রাস্তার ধারের ঝোপ গুলোতে একটা আলোড়ণের ঝটপটানি শুরু হল। তোম্বা আশ্বাস দিয়ে বলল এতে ভয়ের কিছু নেই, এ অঞ্চলে কস্তুরী হরিণের বাস, তাছাড়া তিব্বতি বরফ মুরগি ও হিমালয়ান মুরগিদের চারণক্ষেত্র এই সকল অঞ্চল। এই প্রতিধ্বনিতে তারাও ভয় পেয়ে ছোটাছুটি করছে।

হঠাত করে যেন পাহাড় ফুঁড়ে একটা আলোর রেখা দেখা গেল, খানিক পরেই সেনার পোষাকে দুজন মানুষ আমাদের ঠিক সামনে জিপ নিয়ে এসে দাঁড়ালো। তোম্বা তাদের সাথে স্থানীয় ভাষাতে কথা শুরু করল, সে তাদের কথাতে খুব একটা সন্তুষ্ট হচ্ছে বলে মনে হলনা, তাই আমাদের পিছনের গাড়ির ড্রাইভারকে ডেকে নিয়ে আবার ওই লোক দুটোর কাছে গেল। গাড়ির ভিতরের লাইট জ্বলে উঠল, নীহার বাবু গাড়ি থেকে নামতে যাচ্ছিল, কিন্তু আমাদের ড্রাইভার নরবু মানা করল, সে বলল- “তোম্বা এই অঞ্চলেরই ছেলে, এখন লাচেনে থাকে এই কাজের সুত্রে। ওর পায়ের সিনবোনের সাথে ছুরি ও কোমরে জামার নিচে কুকরি রয়েছে। সে মার্শাল আর্টেও দক্ষ, তাই আপনারা নিশ্চিন্তে থাকুন। বাইরে ভয়ানক ঠান্ডা”। নীহার বাবু বলল- “আগ্নেয়াস্ত্র তো আর নেই”। নরবু ইঙ্গিতপূর্ণ মুচকি হেসে বলল- “ভরষা রাখুন সাব”! বুঝে গেলাম, তোম্বাকে এই জন্যই এ নিয়ে এসেছে; এবং সে শুধু আমাদের জন্য নয় পিছনের গাড়িটার দায়িত্বেও সে ই রয়েছে।

তোম্বা আমাদের কাছে সংক্ষেপে যেটা বলল- “ওদিক থেকে সেনার গাড়ি ওয়্যারলেসে রাস্তা বন্ধের খবর দিয়েছে, সেই খবর পেয়ে এরা আসছে উপরের ক্যাম্প থেকে। বিকল্প রাস্তা দিয়ে এরা লাচেন পৌঁছে দেবে রাত্রেই”। তোম্বা কিছু না-সূচক বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু আমাদের সকলে মিলে সমস্বরে চিৎকার করে ওকে থামিয়ে দিয়ে, ওই সেনাদের সাথে যাওয়া হবে বলে একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। ‘কর্তার ইচ্ছাই কর্ম’কে মেনে নিয়ে দুটো গাড়িই সামনের দিকে ওদের পিছন পিছন চলতে লাগল। যতই সময় যাচ্ছে তোম্বার মধ্যে উসখুসানি বেড়ে যাচ্ছে লক্ষ্য করলাম, মাঝে মধ্যে জানালা দিয়ে ঘাড় বের করে ওদের সাথে স্থানীয় ভাষাতে কথা বলছিল উত্তেজিত ভাবে। প্রায় এক ঘন্টা চলার পর আমরা রুক্ষ পাথুরে জমি ছেড়ে জঙ্গলের পথে ঢালুতে নামতে লাগলাম। তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে, রাস্তা তুষারপাতে পিচ্ছিল, ড্রাইভার বলল ব্রেক সামান্যই কাজ করছে এখানে।

এরই মধ্যে দেখলাম তোম্বা গাড়ি থামাবার নির্দেশ দিল নরবুকে, ঘড়িতে সন্ধ্যা সোয়া ছটা। সে চিৎকার করে সামনের ওই জিপের দুজনকে কিছু একটা বলল। নরবুকে শুধাতে সে বলল- “তোম্বা বলছে সামনে কয়েক কিমির মধ্যে চীনের বর্ডার তাই ওদিকে কেন আমরা যাচ্ছি, আমরা যাবনা আর”। নরবু তোম্বাকে বলল- “এখানে সামনে যাওয়া ছাড়া আমাদের কিন্তু উপায় নেই, তুষারপাতের দরুন রাস্তা ভয়ানক পিছল, ব্যাকগিয়ারে যাবার কোনো উপায় নেই। তাতে করে যদি ইঞ্জিন বিগড়ে যায়, হিটার বন্ধ হয়ে যাবে। সবকটা মানুষ সমতলের, ঠান্ডায় মরে যাবে”। অগত্যা আবার চলতে লাগলাম সামনের দিকে। একটা স্থানে এসে বুঝলাম আমরা কোনো উপত্যাকায় এসে পৌঁছেছি, বেশ সমতল রাস্তা। কয়েকফুট দূর দিয়েই একটা সরু পাহাড়ি নদী বয়ে যাচ্ছে জলপ্রবাহের আওয়াজ কানে আসছে।

সকালে দেখা পশুপালকদের অস্থায়ী কাঠের ঘরগুলোর মত একটা বেশ বড় ঘরের অদূরে এসে গাড়িটা থামল, তবে এ ঘরের সব দেওয়াল নেই। এক মুহুর্তের জন্য হেডলাইট বন্ধ হতেই মনে হল, যেন একড্রাম কালো আলকাতরা ঢেলে দিল কেউ চোখের উপরে। বাইরে প্রেতের মত সারি সারি গাছেদের দল যেন আমাদের ভয় দেখাবার জন্যই দাঁড়িয়ে। তোম্বা গাড়ি থেকে নেমে ওদের কাছে যেতে আবার আলো জ্বলে উঠল গাড়ির, খানিক পর তিনজনের মাঝে বিতন্ডার আভাস লক্ষ্য করলাম। বাইরে এতটাই ঠান্ডা যে জানালার কাঁচ খুলে শুনব সে উপায় নেই। এবারে ওরা গাড়ির লাইটের অন্তরালে চলে যাবার পর একটা তীব্র গগনভেদী আর্তনাদে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে তুলল। মহিলারা ঘুমাচ্ছিল, তাদের একআধজন জেগে বসে পড়ল। আমরা কিছু বুঝে উঠার আগেই দেখি আমাদের পিছনের গাড়ির চালক আমাদের গাড়ির ঠিক সামনেটাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, সাদা বরফ তখন লাল বর্ণ ধারণ করে এলাকা বিস্তার করছে। একটা তীব্র শব্দে আমাদের গাড়ির বাম পাশের  জানালার কাঁচ ভেঙে যেতেই তীব্র ঠান্ডা হাওয়া গাড়িতে প্রবেশ করল। সাথে নাকে একটা তীব্র ঝাঁঝালো দুর্গন্ধ অনুভব হল, আর কিছু মনে নেই।

পঞ্চম পর্ব

যখন জ্ঞান ফিরল নিজেকে একটা কাঠের মেঝের উপরে হাত বাঁধা অবস্থাতে আবিষ্কার করলাম, সাথে কাঁধে তীব্র যন্ত্রণা। বেশ কিছুটা দূরে বাইরে একটা মশাল জ্বলছে, সেখানে একটা ফাঁকা চাতাল মত এলাকা, বাকিটা গহিন জঙ্গল সম্ভবত। এই ভয়ানক তমসাতে ঠিক কাদের খপ্পরে পড়েছি বুঝতে পারছিনা, চীনা সেনার কব্জাতে কি? কিন্তু এটা দেখে তো কোনো সেনা ব্যারাক মনে হচ্ছেনা। ফিসফিসিয়ে শুধালাম আর কেউ আছো, নীহার বাবু সহ আরো দুজন মানুষের জবাব এলো গোঙানির আওয়াজে। শুধালাম- “আপনারা কারা”?  একজন বলল- “আমি রফিকুল খান, মেদনীপুরের লোক আপনার সামনের গাড়িতে ছিলাম”, অন্যজন বলল “আমি রাধামাধব দেবনাথ, নবদ্বীপে আমার বাড়ি”। আরো কয়েকবার মৃদু স্বরে চেঁচিয়ে ডেকে বুঝলাম আমার ছেলে বা লাহিড়ী বাবু কেউ এখানে নেই বা তাদের জ্ঞান ফেরেনি, আমাদের সাথে মহিলারাও এখানে কেউ নেই। শুধালাম- “আপনাদের সাথের মহিলারা কোথায়”? তিনজনেই জবাব দিল জানিনা। আবার শুধালাম কী অবস্থাতে আছেন আপনারা! জবাব এলো- “যন্ত্রনাদায়ক শক্তভাবে হাত ও পা বাঁধা এক দড়িতে”, বুঝলাম প্রত্যেকেরই এক অবস্থা।

একেক মুহুর্ত শতাব্দীর চেয়েও বেশি সময় মনে হচ্ছে, চূড়ান্ত ভয়ে, আতঙ্কে ওই শীতেও ঘেমে উঠলাম। খানিক ওই অবস্থাতে ধাতস্থ হতে ঠাওর করলাম আমরা চারটে প্রানীই নই, আরো কিছু শ্বাসপ্রাশ্বাস মালুম আশেপাশে রয়েছে, বুঝলাম নজরদারিতে রয়েছি। কিছুক্ষণ পর সামনের মশালটাও নিভে গেল বা কেউ নিভিয়ে দিল। রাত যে এতো গভীর হতে পারে আমাদের কারই ধারণা ছিলনা, সত্যিই এখানে শিশিরের শব্দ শোনা যাচ্ছে এমন অদ্ভুত নিস্তব্ধতা, গাছের পাতা বেয়ে তুষার পাতের স্পষ্ট আওয়াজ শোনা কানে আসছে। আরো কিছুক্ষণ পর অন্ধকারে চোখ সয়ে এলো, এবারে আমরা প্রত্যেকটা অস্পষ্ট ছায়া ছায়া উপস্থিতিগুলো সকলেই ঠাওর করতে পারছিলাম, কিন্তু চিৎকার করার বা উঠে দাঁড়াবার শক্তি ছিলনা শরীরে। গাড়ির কাঁচ ভাঙ্গার সাথে সাথে যে তীব্র গন্ধটা নাকে লেগেছিল সেটা নিশ্চিত কোনো তীব্রক্ষমতা যুক্ত বেহুঁশ করবার জড়িবুটি। সেটার প্রকোপেই আমাদের স্নায়ু অবশ হয়ে রয়েছে নিশ্চিত, এখন জ্ঞান ফিরলেও অঙ্গপ্রস্তঙ্গ নিজেদের বসে আসেনি, কখন আসবে বা অদৌ আসবে কিনা সেটাও জানিনা। অদূরের একটা জলাশয়ের উপরে একটা আলো প্রতিফলিত হয়ে জঙ্গলের কিনারাতে এসেই আঁধারে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। অনেকক্ষণ পর পর একটা আধটা জলজ প্রানীর ছটপটানিতে তন্দ্রা ছুটতেই মনে হচ্ছে কোনো পিশাচীনির দল বোধহয় প্রমোদ স্নানের পুলকে মাতোয়ারা। ক্ষণে ক্ষণে এলাকার রঙ পরিবর্তিত হচ্ছে, হয়ত আকাশে মেঘের উপস্থিতির উপরে কেন্দ্র করে এই মোহিনী মায়া।

এখান থেকে পালাবার নুন্যতম ভাবনা ভাবার শক্তি টুকু হারিয়েছি সকলেই। নিশ্চিত মৃত্যুর জন্য প্রতীক্ষা করা ছাড়া মনে হয়না আমাদের মাঝে কেউ কিছু ভাবছে। অতিরিক্ত বলতে নীহারবাবু চাপাস্বরে ক্ষোভ প্রকাশ করছে, সন্তানদের জন্য বিলাপ করছে। হঠাৎ করে অস্ফুট চিৎকার করে তিনিই বলে উঠলেন- “লাহিড়ী বাবু”। অপরিচিতদের মাঝে কেউ একজন বললেন- “কোথায়”। নীহার বাবু বললেন- “আমার পায়ের কাছে রয়েছেন। আমি ঘষটে ঘষটে ওনার কাছ পর্যন্ত পৌঁছেছি, গলায় ঝোলা ক্যামেরাটা দেখেই ঠাওর করলাম এটা জয়দীপ গাঙ্গুলীই”। শুধালাম- “বেঁচে আছে”? নীহার বাবু বললেন- “আমি ওনার নাকের কাছে মুখ নিয়ে যাচ্ছি”, কয়েক মুহুর্ত পরে ওনার জবাব এলো ইংরাজিতে- “he is no more”, যে দোর্দোন্ডপ্রতাপ মানুষটা কিছুক্ষণ আগেও আমাদের মাঝে ছিলেন, তিনি নেই ভাবতেই চরম কষ্ট দলা পাকিয়ে কন্ঠ অবরুদ্ধ করে দিল। পরক্ষণেই যখন ভাবলাম আমাদের বাকি সদস্যেরা বেঁচে আছে তো! আমার মেয়ে! ছেলে! স্ত্রী! তীব্র আর্তনাদ করে চিৎকার করে উঠলাম আপনা হতেই। সেই চিৎকারের ধ্বনি পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এসে আতঙ্কের মাত্রা বাড়িয়ে তুলল, কিন্তু কোনো প্রাণী কোথা থেকেও এলোনা। প্রাণপণে বেশ কয়েকবার চিৎকার করে রাগের বহিঃপ্রকাশ করে ক্লান্ত হলাম, কোনো বারেই কোনো জবাব বা প্রত্তুত্তর এলোনা।

খানিক পর রাত্রি আর গভীর হলে বেশ কয়েকজন অল্প বয়সী রোগা রোগা পুরুষের দল ভাবলেশহীন মুখ করে নিঃশব্দে আমাদের চারজনকে বাঁশের মাঝে ঝুলিয়ে নিয়ে যেতে লাগল, ঠিক যেমন করে মৃত পশুদের ভাগাড়ে ফেলতে নিয়ে যায়। অন্ধকারের ভিতর শুধু ছায়া অবয়ব টুকুই বোঝা যাচ্ছে। প্রায় মিনিট পনেরো চলার পর আমাদের যেখানটাতে এনে ফেললো, তার অদূরেই একটা পাথুরে মেঝেতে হোমের কুন্ডের মত অল্প শিখা সম্বলিত কাঠের আগুন প্রজ্বলিত রয়েছে। অগ্নিস্থল থেকে ঠিক যতটা দূরে আমরা, উল্টো দিকের ঠিক ততটা দূরেই মনে হল আরো অনেকে আমাদের মত ওইভাবেই পড়ে রয়েছে। যন্ত্রণাতে কাঁধ ফেটে যাচ্ছে, কারন হাতটা বাঁকিয়ে পিছমোরা করে বাঁধা। নীহারবাবুর অদুরে একটা প্রস্তরখন্ড উঁচু হয়ে আছে, কেমন যেন মনে হল উনি শুঁয়োপোকার মত বুকে হেঁটে চলছেন হাঁটুর বলে। কিছুক্ষণের মধ্যে সত্যিই ওকে আর দেখতে পেলামনা।

হঠাত যেন শুনলাম আমার মেয়ে বাবা বলে ডাকছে, তারপর আবার সেই পাষাণের নিস্তব্ধতা। তাহলে কী আমি উন্মাদ হয়ে গেলাম? কয়েক মুহুর্ত যেতেই পিছন থেকে একটা আলোর আভা ক্রমেই উজ্জ্বল হতে লাগল, সেদিকে তাকিয়ে দেখি দূর থেকে একটা অগ্নিগোলক আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে। ধীরে ধীরে সেটা যখন আমাদের কাছে এসে থামল দেখি অন্তত গোটা ত্রিশেক প্রমান সাইজের জলন্ত মশালবাহীর একটা দল এসে সেই অগ্নিকুণ্ডের সামনেটাতে দাঁড়ালো, আমাদের মাথার দিক করে। কুয়াশা ভাব সামান্য থাকলেও অত্যন্ত পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে সকল কিছু, এমন আলোর তেজ। পায়ের দিকটাতে বেশ কিছু জানোয়ারের সমাগম হয়েছে, সেগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত হতে চোখ কেমন ধাঁধিয়ে গেল। সাদা শুয়োর, বিকট সাইজের মোরগ, কিছু সাদা হরিণ বা ছাগল জাতীয় প্রাণী ও নীল রঙের ভেড়া। হ্যাঁ সকল কিছুই সমতলের ভেড়াদের মত, শুধু রঙটা এক্কেবারে নীলকণ্ঠ ফুলের মতই গাঢ় নীল। বাহ্যিক জ্ঞানবুদ্ধি বোধহয় লোপ পেতে শুরু করেছে আমার, তাই এমন দৃষ্টিভ্রম।

একটা গগনভেদী ঘন্টাধ্বনীতে কান ফেটে যাবার উপক্রম হতেই তন্দ্রা ছুটল, আমরা তিনজনে একে অন্যের দিকে যুগপৎ চেয়েই ঘাড় বেঁকিয়ে মাথার পিছনের দিকে তাকাতেই দেখি সেখানে এক পাথর কেটে জীর্ণপ্রায় কাঠে তৈরি মঠ বা মন্দির; আমার হাত-পা সমস্তকিছু আমার পেটের ভিতরে ঢুকে যাবার উপক্রম হতে লাগল। গত পরশু সন্ধ্যায় কুঙ্গার সাথে যে মঠ’টাতে গেছিলাম প্রায় হুবহু ওই রকমেরই এটিও, তেমনই কালো পোষাকের পাদেম’দের দল চারিপাশে। মাথা উঁচু করে দেখলাম সেখানেও একটি গাছের সাথে অন্য গাছ পর্যন্ত লাল ও কালো ত্রিকোনা পতাকার চেইন বাঁধা সারি সারি। এবারে আমাদের তিনজনকেই খাড়া করে দাঁড় করানো বাঁশের সাথে বেঁধে, মাথার উপরে এক আঁজলা বিশ্রী কটূ গন্ধযুক্ত তরল ঢেলে দিল কিছু ভাবলেশহীন পাদেমের দল, ঠিক যেখানটাতে পশুগুলো বাঁধা আছে তার সামনেই। দেখলাম আমাদের ডানদিকে মহিলারা সকলেই পড়ে আছে, যদিও বেঁচে আছে কিনা বোঝা যাচ্ছেনা। আমাদের গড়ির ড্রাইভারের বুকে একটা কুকরি ঢোকানো, বিকৃত মুখে উলঙ্গ হয়ে মরে পরে আছে পশুগুলোর মাঝে।

সামনের মন্দিরের দেওয়ালে আরো কিছু মশাল জ্বলে উঠল। দেখলাম মন্দিরে একটা গাঢ় সবুজবর্ণের থ্যাবড়া নাকের নারী মুর্তির গায়ে লাল শালু। রফিক সাহেব বলল- “সর্বনাশ, এটা প্রাচীন তিব্বতীয় ‘তারা’ মুর্তি। হিংস্র তান্ত্রিক দেবী”। মুর্তির পায়ের কাছে একটা বড় ধাতুর পাত্রের তরলে কিছু ভাসছে, একজন পাদেমে সাদা মত দন্ড দিয়ে সেটাকে নেড়ে চলেছে নির্লিপ্তভাবে। অদূরে সেই পাথরের হাড়িকাঠ, তাতে বুনোফুলের মালা জড়ানো। খানিক পরে পাদেম গুলোর মধ্যে একটা চঞ্চলতা লক্ষ্য করলাম, তারা নিজেদের মাঝেই ব্যাস্ত হয়ে পড়ল। রফিকুল বাবু বল্লেন- “নিশ্চিত আমরা প্রাচীন তিব্বতী হিংস্র জনজাতির খপ্পরে পড়েছি”, রাধামাধব বাবু শুধালেন- “আপনি কীভাবে জানলেন”? উত্তরে রফিক সাহেব বল্লেন- “আমিও আমার স্ত্রী দুজনেই অধ্যাপক। আমি নৃতত্ত্ববিদ্যার অধ্যাপক, স্ত্রী উদ্ভিদ বিদ্যার। সে তার কলেজের ছাত্রছাত্রীদের সাথে কলেজ ট্যুরে এসেছিল। সদ্য বিয়ে হয়েছে আমাদের, তাই আমরা কটাদিন অতিরিক্ত রয়ে গেছি একান্তে সময় কাটাবো বলে। PhD করার সময় প্রাচীন তিব্বতীয় জনগোষ্ঠীর উপরে গবেষণা করেছিলাম”।

এর ফাঁকে দেখি সামনের ওই মঠের সামনের চত্বরে রীতিমত প্রাচীন অর্ক্রেষ্ট্রার আসর বসেছে। মোষ জাতীয় কোনো পশুর লম্বা সিং এর চওড়া অংশে- ধাতব চোঙা যুক্ত বাঁশি, গোঁ গোঁ আওয়াজে বেজে উঠতেই গোটা বিশেক থালার সাইজের হাত ঢোল সশব্দে ককিয়ে উঠল। এর সাথে বিশালাকৃতির ঘন্টাটি প্রবল ভাবে বেজেই চলছিল। এবারে বিলাপের স্বরে উপস্থিত সকল পাদেম রূপী ওই কিশোর-যুবক সন্ন্যাসী গুলো কিছু একটার ফরিয়াদ করতে লাগল। রফিক সাহেব বলল- “ওরা আত্মাদের আহ্বান করছে”। বিকট শব্দে ইতিমধ্যে মেয়েরাও জেগে উঠেছে, নীহার বাবুর স্ত্রী উচ্চস্বরে চিৎকার করছেন- “আমার সন্তানেদের ফিরিয়ে দে শয়তানের দল…”। আমার মেয়ে কয়েকবার বাবা বলে ডেকে উঠলেও বাকিরা পরিস্থিতির আকস্মিকতাতে হয়ত বধির দশা প্রাপ্ত হয়েছে।

বিলাপ চরমে উঠলে আমাদের বামদিকে আবার আলোকের শিখা দেখা গেল, তিব্বতী ঐতিহ্যবাহী পোষাক ‘ঝুইগুই’ পরিহিত একটা হোমরাচোমরা গোছের কেউ, চমরীগাই এ চড়ে এসে নামল। তাকে ঘিরে রয়েছে বড় চাকু হাতে গাঁট্টাগোট্টা চেহারার কয়েকজন লোক, সম্ভবত বডিগার্ড হবে। সে আসতেই উপস্থিত পাদেমের দল, যারা সুরেলা বিলাপ করছিল তারা কিছু একটা বলেই হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে দিল। গোটা বিষয়টা যেন কোনো ইংরেজি সিনেমা দেখছি বলে ভ্রম হচ্ছিল, সত্যি বলতে ভয়টা সেই ক্ষণের জন্য মন থেকে গায়েব হয়ে গেছিল। এবারে ভয়ালদর্শন কুকুরের মত দেখতে একজোড়া জন্তুতে টানা নিচু রথে করে একজন অতি বৃদ্ধ হাজির হল, যার চোখের ভ্রু গুলো পর্যন্ত সাদা হয়ে গেছে। মুখে অজস্র বলিরেখা, খোঁচা খোঁচা বিসদৃশ্য গোঁফ। কোমর পর্যন্ত ঘিয়ে রঙের লম্বা চুল বিনুনি করা, মাথায় বড় পাখির পালকে সজ্জিত ঢাউস সাইজের একটা বিচিত্র টুপি। তিব্বতী যোদ্ধাদের মত পোশাক পড়ে রয়েছে সে, তার পাশে আরো ডজন খানেক মাঝবয়সী লোক। তাদের পোষাকও অবিকল একই ধরনেরই শুধু তাদের মাথায় টুপি নেই তার বদলে কোমরে কুকরি জাতীয় অস্ত্র খাপে গোঁজা।

কোথেকে একটা সুদৃশ্য বেতের তৈরি চৌকি হাজির করে ফেললো পাদেমের দল। যাতে ঐ আগত বিশিষ্ট মানুষ দুটো আসন গ্রহণ করল। তাদের মুখ থেকে যে কথাগুলো কানে বারেবারে বাজছিল সেগুলো- বুন্টাং, বংগি ইত্যাদি। আমাদের মেয়েরা সকলেই প্রায় কাঁদছে, কিন্তু যন্ত্রের আওয়াজে কিছুই কর্ণগত হচ্ছেনা। রফিক সাহেবের দিকে চাইতেই তিনি বললেন- “যদি খুব ভুল না হই এরা তিব্বতের লুপ্তপ্রায় সুন উপজাতি, রোং হলেও আশ্চর্যের কিছু নেই”। আমি থরথর করে কাঁপতে লাগলাম, কুঙ্গার মুখে শোনা সেই হিংস্র জাতি এরা, “এরা কী নরবলি দেয়”? স্বগতোক্তির মত কথাটা মুখ দিতে বেড়িয়ে এলো। রফিক সাহেব বলল- “আমার অনুমান ভুল না হলে আজ আমাদের সকলেই বলির শিকার হতে চলেছি”।

ষষ্ঠ পর্ব

তীব্র গরম অনুভব করাতে চোখ খুলে তাকিয়ে দেখি একটা অগ্নিকুণ্ডের মাঝে রয়েছি, বুঝলাম বলির কথায় মুর্ছা গিয়েছিলাম। কতক্ষণ ছিলাম জানিনা, ভাল করে দেখে বুঝলাম আগুনের মাঝে নেই ঠিকিই তবে আধ হাতের মাঝেই পশুর চর্বিতে লেলিহান আগুনের হোম। আমি এখন রয়েছি মন্দিরটার ভিতরে, পা আঙটার সাথে দড়ি দিয়ে বাঁধা। আমার থেকে কয়েকফুট দূরেই আরো একটা বড় কাঠের হাড়িকাঠ, সেখানে ছেলে অরিত্রকে শুইয়ে রেখেছে; তার উর্ধাঙ্গ অনাবৃত, পড়নে শুধু ফুলপ্যান্টটা। কয়েকজন পাদেম তার গায়ে লাল রঙের মাটির মত কিছু লেপছে ও পাশে সেই তিব্বতী সৈনদের মত টুপি বিহীনের একটা দল বিড়বিড় করে মন্ত্রোচ্চারণ করে চলেছে। চিৎকার করে উঠলাম, সেটা ঘন্টার শব্দেই ঢাকা পরে গেল। সামনে বেশ কিছু উপজাতি মহিলার দলও এসে উপস্থিত হয়েছে উৎকট পোষাক ও বিচিত্র টুপিতে সজ্জিত হয়ে। কয়েকজন পাদেম রফিক সাহেবকে হিঁচড়াতে হিঁচড়াতে আমার কাছে আরেকটি আঙটাতে বেঁধে দিল, দুজনেরই হাত পিছমোড়া করে বাঁধা।

প্রায় কেঁদে বললাম বাঁচার কোনো উপায় আছে কী! তিনি কিছু একটা বলতে গিয়ে, নিচের দিকে তাকিয়েই আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে ধপ করে পিছনপানে মাটিতে পরে গেলেন, আমিও প্রচন্ড চিৎকারে হিতাহিত জ্ঞানশূণ্য হয়ে গেলাম আবার। নীহার বাবুর দুই সন্তানের লাশ ভাসছিল সেই বড় ধাতব গামলাতে, খানিক আগেই একজন পদেম এটাকে একটা হাড়ের দন্ড দিয়ে নাড়ছিল। মুর্তির পায়ের কাছে সেই বড় গামলা, তরলটা কালচে লাল হয়েছে বাচ্চা দুটির রক্তে। নৃশংতা বর্বরতার যেন প্রদর্শনী চলছে পাইকারি হারে। ঘন্টার আওয়াজেই কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান ফিরে এলো, খানিকক্ষণ পর হঠাৎই সকল আওয়াজ থেমে গেল, বেতের চৌকির উপর ওই দুজন চড়ে দাঁড়িয়ে বক্তিতা শুরু করল তিব্বতী ভাষাতে। রফিক সাহেব তার সারমর্ম যেটা তরজমা করলেন, সেটা ছিল-

“এদের দু’জনের যার মাথায় টুপি সে হচ্ছে ধর্মীয় প্রধান, তার পদের নাম ‘বুন্টাং শামান’, অন্যজন এদের সমাজিক প্রধান বা মোড়ল; এনার পদের নাম ‘বংগি সামান’। রীতি অনুসারে, পাদেমেরা পূর্বপুরুষের আত্মাদের আহ্বান করছিল যা শুনে এদের সমাজপিতা আসে। তাকে তাদের পূর্বপুরুষ অতৃপ্ত আত্মাদের বিষয়ে কথা শোনাতে গিয়ে সকল পাদেমের দল ওইভাবে কাঁদছিল। সেই কান্না শুনে ওদের ধর্মীয় প্রধান ভয়ালদর্শন ‘মাস্টিফ’ কুকুরে টানা রথে করে উপস্থিত হয়েছে। আমরা যেখানে রয়েছি এই স্থানটির নাম ইবতু বা মন্দিরের গর্ভগৃহ। আমাদের সকলকেই বলির জন্যই এখানে আনা হয়েছে, আত্মারা এসে উপস্থিত হয়ে বেছে নেবে- সে আমাদের মধ্যে কার রক্ত পেলে তুষ্ট হবে। সেই ক্রমানুযায়ী বলি হবে, বিশেষ করে যে ছেলেটিকে শোয়ানো রয়েছে সে এদের ঘোষীত শত্রু, খ্রিস্টান। ওকে বলির মাধ্যমেই এই উৎসবের রাত্রির পরিসমাপ্তি ঘটবে।

উপজাতিদের লোভ দেখিয়ে তাদের ধর্মান্তরিত করে এই সুন ধর্মকে বিলুপ্তপ্রায় করেছে খ্রীষ্টানেরা। তাই ওর বলিটা দুই শামানের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত, এর মৃতদেহটা পুলিস যাতে পায় সেই ব্যবস্থা করে প্রশাসনকেও বার্তা দেওয়া হবে। কারন এরা এই ‘তিস্তা ও রাডং’ অঞ্চলে আধুনিক সভ্যতার বিকাশের ঘোরতর বিরোধী। এতে তাদের যে ঐতিহ্য তা নাকি হারিয়ে যাচ্ছে, অস্তিত্বের সঙ্কট তৈরি হয়েছে সমতলের মানুষদের জন্য। সুতরাং সমতলের মানুষ মানের এদের শত্রু, তাদের বলি দিলে তবেই এদের পূর্বপুরুষের আত্মা শান্তি পাবে”। সমতলের দেবতা ‘সানডঙ্গ’কে সন্তুষ্ট করতে বলি দিতেই হবে কোন সমতলের শত্রু নারীকে। পাহাড়ের দেবী কাঞ্চনজঙ্ঘা, ঘরের দেবতা চিউ-রাম-ফাট ইত্যাদিদের জন্য বলি দেওয়া হবে পশু। এগুলো যথাক্রমে মোরগ, ছাগল, ও শূকর। বলির রক্ত গায়ে মেখে নেওয়ার জন্য দুই শামান ওদের সকল মহিলাদের আহ্বান জানাচ্ছে, এই রক্ত সর্বাঙ্গে মেখে নিলে তারা দীর্ঘ যৌবনবতী হবে”।

অপর দিক থেকে আমাদের মহিলারা নিরবিচ্ছিন্নভাবে উন্মাদের মত গালিগালাজ ও বিলাপ করছিল। কী কুক্ষণেই গ্যাংটকে মেয়ের কেনা ক্রস লকেটটা গলায় পড়েছিল অরিত্র, আজ শুধু এই জন্যই ও এদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির শিকার হতে চলেছে। অরিত্রকে এবারে জাগাবার প্রচেষ্টা করতে লাগল, আমার মাথার শিরা উপিশিরা সব বিস্ফোরণের অপেক্ষায়। তীব্র যন্ত্রণা ফেটে পড়তে চাইছে, চোখের সামনে নিজের ছেলের এভাবে নৃশংস মৃত্যু দৃশ্য সহ্য করতে পারছিলামনা। উপজাতীয় সাজে সুসজ্জিত মহিলার দল বিরক্তিকর কাঁদুনে গলায় গান গাইতে লাগল, লম্বা বাঁশির শব্দ যোগে। রফিক সাহেব বললেন- “এটা একধরনের প্রার্থনা, এই ফিসফিসানি গান যা দুষ্ট আত্মাকে বসে আনতে সাহায্য করে, এর নাম ‘ঝাংলেন্ত’”। এ গান শেষ হতেই, প্রমান সাইজের উইন্ডচিমে কাঠের হাতল ছুঁইয়ে অপূর্ব সুরের মূর্ছনা সৃষ্টি করে দল বেঁধে নাচতে লাগল সকলে। যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখে রফিক সাহেব বলল- “তাদের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় গন সঙ্গীত ‘লাংতে’ হচ্ছে, শুভ আত্মাদের আহ্বান হচ্ছে”। একটা ঘোরের মধ্যে আচ্ছন্ন করে দিল আমাদের সকলকে।

পুরুষ মহিলা উভয়েই ‘বাকুস’ নামের এক ধরনের ঐতিহ্যবাহি পোষাক পরিধান করে নাচছে, মহিলারা ‘হঙ্গু’ নামের একধরনের ব্লাউজের মত পোষাক পড়ে। এবারে সেই শিশু দুটির মৃতদেহ যে পাত্রে ছিল সেই পাত্রের জল প্রত্যেক ‘সুন’ নরনারী, একটি ছোট পাথরের পাত্র করে পান করতে লাগল। বিবাহিত মহিলারা শয়তানকে উপহার প্রদান স্বরূপ, নামের পবিত্র হাড়ের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি ‘চি’ নামের পাত্রে- শিশু দুটির মাথা ফাটিয়ে ঘিলু খেতে খেতে ভয়ঙ্কর ভাবে মাথা দোলাতে থাকল নারকীয় উল্লাসে। ইচ্ছা হচ্ছিল এসব দেখার চেয়ে আগুনে ঝাঁপ দিয়ে এখনি এই পিশাচদের হাত থেকে মুক্তি নিয়ে নিই। এবারে অদৃশ্য কারো সাথে কথা বলে ওই উপজাতি মহিলাদের একজন, বৃদ্ধ রাধামাধব বাবুর দিকে আঙুল তুলে দেখালো। সাথে সাথে দুজন পাদেম ওনাকে বলি কাঠের উপরে এনে তাতে শুইয়ে, গলা থেকে তুলসী কাঠের কন্ঠীমালাটা আগুনে ছুঁড়ে ফেলে, একটা লিকলিকে হাড়ের ছুড়ি তার গলায় চালিয়ে দিল একজন বুন্টাং সামান। বৃদ্ধ রধামাধব বাবু বয়সের ভারে এমনিতেই ন্যুব্জ, তার উপরে স্নায়বিক ভাবে অবশ থাকার দরুন বিন্দুমাত্র প্রতিরোধ করতে পারলেননা। কয়েকবার হাঁ করে নিঃশ্বাস নেবার চেষ্টা করলেন, কিন্তু গলার দ্বিখণ্ডিত শ্বাসনলী দিয়ে রক্ত ছাড়া কিছুই বের হলনা। দীর্ঘদেহী শরীরটা কয়েকবার ঈষৎ কেঁপে চিরতরে ঠান্ডা হয়ে গেল। খোলা চোখ দিয়ে মনি দুটো যেন ঠিকরে বাইরে বেড়িয়ে এসেছে এমন বীভৎসতা। ওদিকে ফিনকি দিয়ে ছিটিয়ে পরা রাধামাধব বাবুর রক্ত নিজেদের সাদা পশমের বেল্ট ‘পেংদেনে’ মুছে নিচ্ছিল বিবাহিত মহিলাদের দল। রাধামাধব বাবুকে কোনো পবিত্র আত্মার চাহিদা মাফিক বলি দেওয়া হল। এবারে অনুর্ধ্ব পঞ্চম বর্ষীয় শিশু দুটির মাংস কেটে কেটে নিয়ে হোমের আগুনে ফেলা হচ্ছিল, অতৃপ্ত পুণ্যাত্মারা যাতে মোক্ষ লাভ করে সেই বাসনাতে। পরবর্তীতে ওই একই পদ্ধতিতে রফিক সাহেবের স্ত্রী ও নীহার বাবুর স্ত্রী বলিপ্রাপ্ত হয়ে গেলেন। সেই রক্ত পান করে ও বাকিটা মুখমণ্ডলে মেখে নিল সমাজ প্রধান বংগি শামানের প্রধান স্ত্রী ও উপস্ত্রীরা।

এবারে উৎসবের সূচনা করল ওই বৃদ্ধ বুন্টাং, রুমাল সদৃশ্য ‘কাড়া’ ব্যবহার করে। এদের ভাষায় এই ধর্মের নাম বোংথিংজম, জাতের নাম সুন; যা লেপচাদের মুন বা মুনিজমের মত বহুশাস্ত্রবাদী। সুপ্রাচীন বৌদ্ধ ধর্মের সাথে চীনা লোককথা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এক প্রথাগত ধারণার বাইরের ধর্ম। এর আচার অত্যন্ত কঠিন ও ব্যায়বহুল। এরা মূলত প্রকৃতির পূজা করে ইংরাজিতে যাকে এ্যানিমিজম বলে, এদের ভাষাতে যা ফাদং চু নামে পরিচিত। এরা মনের দুটো রঙ নির্ধারন করে, একটি সাদা মন যা পবিত্র, তার নাম- ‘তাং-লি-মুং’, অন্যটি নররূপী পশু যাকে ওরা ‘মুগ-সেক-মুং’ বলে ডাকে। এদের মতে এই কালো আত্মাই যাবতীয় বিপর্যয়, অপরাধ, অসুস্থতা ও ক্ষতিকর জাদু বিদ্যার কারন। এই আত্মার বাস গাছ, ঝোপ, পাথর ও নদীর ঘুর্নিতে। এদের ধর্ম পালন আর উৎসবে কোনো পার্থক্য নেই দুটোই একে অপরের পরিপুরক।

কিম্বদন্তী পুণ্যাত্মা ‘থেকংথে’ কে তুষ্ট করতে পারলে তবেই মোক্ষ লাভ হয়, যেটা একজন ‘সুন’এর জীবতকালে এক-আধবারই ঘটে থাকে। এবারে অরিত্রকে নিয়ে যাওয়া হল হাড়ের তৈরি সব আসবাব ইত্যাদি দিয়ে ঠাসা একটা চাতালে, সেখানে তার দুই হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল কেটে নিয়ে ওই সবুজ মুর্তির পায়ে অর্পণ করল দুইজন সহকারী ধর্মীয় শামান, ঠিক এই সময় অদৃশ্য থেকে কেউ একজন হুঙ্কার দিয়ে উঠল। অরিত্র সম্পূর্ণ জ্ঞানহীন অবস্থাতে কিছুটা গড়িয়ে গিয়ে আগুন থেকে কয়েক ইঞ্চি দূরে পড়ে রইল। এবারে একজন মুখোশ পরিহিত প্রায় তিনচার মানুষ লম্বা একটা ভয়ানক কালো লোমশ জীবের আবির্ভাব ঘটল। কাছে আসতে বুঝলাম ওটা একটা বহুরূপী, ভিতরে একাধিক মানুষও থাকতে পারে। হাড়ের তৈরি তীক্ষ্ণ ধার বিশিষ্ট একগুচ্ছ কঙ্কপত্রর নিয়ে এল সে, সম্ভবত এদের শয়তান পুজোর পুরোহিত এই বহুরূপী, ‘ঝাকরি’ নামে ঢাকছিল তাকে। প্রথমেই সে একে একে ওই কঙ্কপত্র গুলোর ডগা বিষাক্ত জড়িবুটিতে ডুবিয়ে নিয়ে আমাদের শরীরের বিভিন্ন পেশীতে গেঁথে এফোঁড়ওফোঁড় করে দিতে লাগল। এগুলো স্নায়ুকে অকেজো করে দিচ্ছিল, যাতে বলি দেওয়ার সময় নড়াচড়া না করতে পারি। যদিও তার আগে থেকেই আমরা বলহীন হয়ে পড়েছিলাম।

সেই সহকারী শামানদের একেকজন করে ওই ঝাকড়ির সামনে এসে বসতে লাগল ও তাদের উপরে ভর হতে লাগল আত্মাদের। তাদের মুখ দিয়েই কাকে বলি হিসাবে চাই দেখাচ্ছিল। সেই মত অনেকগুলো শুয়োর, নীল ভেড়া, মোরগ ছাগল ইত্যাদি বলি হচ্ছিল, এর মাঝে নৃশংশ ভাবে খুন হল একটি অচেনা বালক।

এমন সময় বৃদ্ধ বুন্টাং শামানের শারীরে পুন্যাত্মার অলৌকিক সত্তার প্রকাশ হল, এটাই উৎসবের ব্রহ্মমুহুর্ত। তিনিই অরিত্রকে বলি দেবেন। বংগি শামানও সে একই ভাবে মাথা দোলাতে লাগল, তার মাঝে দুষ্ট আত্মার নেতা ভর করেছে, তার হাতেও হাড়ের তৈরি ধারালো বিষ মাখা অস্ত্র। মাঝখানে রেফারির মত দুই উন্মত্ত খুনী ‘সুন’ বৃদ্ধ পিশাচকে মিছিমিছি নিবৃত্ত করার প্রচেষ্টা করতে লাগল ওই বহুরূপী। রীতিমাফিক সে ব্যার্থ হয়ে অতৃপ্ত ও অশুভ আত্মাদের তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে বলিপ্রদত্তের কাছে গিয়ে মন্ত্রোচ্চারণ করতে লাগল। ওদিকে মহিলাদের শরীরে ওই বিষাক্ত ভোজালি ফোটাতে সকলেই বীভৎস চিৎকার করতে লাগলো, সেটা ঢাকতে বাদ্য যন্ত্র গুলো বাজাতে শুরু করে দিল পাদেমের দল। আমার মেয়েকে একজন রাক্ষুসী সুন মহিলা টানতে টানতে হোমকুন্ডের পাশে নিয়ে আসবে, হঠাৎ একটা আর্তনাদ সব কিছু থামিয়ে দিল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পরপর আরো কয়েকটা একই রকমের আর্তনাদ। দুই শামানের তৎপরতা তখন তুঙ্গে, যত তাড়াতাড়ি বলি সম্পন্ন করতে হবে, দুষ্ট আত্মারা চলে এসেছে। সামনে অরিত্র, একদিকে রফিক সাহেব ও অন্য দিকে আমার মেয়ে। হঠাত তীব্র বিস্ফোরণে হোমের আগুনের কাছটা সশব্দে কেঁপে উঠল, অরিত্রের আদুর দেহটা ওই কালো লোমশ বহুরূপীটার পেটের কাছে আছড়ে পরতেই লোমে আগুন ধরে গেল। টাল সামলাতে না পেরে দুই শামান মাটিতে ভুপাতিত। এর মধ্যে বুন্টাং শামান মানে সাদা বিনুনি করা চুলের বৃদ্ধের হাতে থাকা হাড়ের ধারালো বিষাক্ত ছোরাটা অসংলগ্ন নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে নিজের পেটেই গাঁথিয়ে ফেলে মৃত্যু যন্ত্রণাতে ছটপট করতে লাগল মুর্তিমান পিশাচটা।

কিছু বুঝে ওঠার আগেই অন্ধকার ফুঁড়ে চিতা বাঘের মত ঝাঁপিয়ে পড়ল দুজন মানুষ ওই ‘সুন’ দের উপরে, দেখতে পেলাম তোম্বা আর নীহার বাবু তাদের মার্শাল আর্টের প্রকোশলে একে একে ধারাশায়ী করছে পাদেম ও শামানদের। বংগি শামান পাল্টা আক্রমণ করতে গেলে,  তাদের হাতের আগ্নেয়াস্ত্র দিয়েই ভবলীলা সাঙ্গ করে দিল তোম্বা। দুই মুখ্য শামানকে মৃত্যু যন্ত্রণাতে কতরাতে দেখে পাদেমের দল ও সুন মহিলারা আতঙ্কে ভয়ে দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে অন্ধকারেই জঙ্গলে দৌড়াতে লাগল। এরই মধ্যে দেখি কুঙ্গা সহ আরো বেশ কিছু জন এসে উপস্থিত হয়েছে, তোম্বার আগ্নেয়াস্ত্র কয়েকবার সশব্দ আওয়াজ করে গোটা তিন-চার শামানকে তাদের আত্মাদের কাছে পাঠিয়ে দিল। এটা দেখে অবশিষ্টরাও দ্রুত অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

চারমাস দক্ষিণ ভারতে চিকিৎসার পর ছেলেকে মৃত্যু মুখ থেকে বাড়ি ফিরিয়ে এনেছি। কোমরের কাছের অনেকটা অংশ থেকে মাংস উড়ে গেছিল, হাতের বুড়ো আঙুল দুটো আগেই খোয়া গেছিল, শরীরের অনেকটা অংশ ঝলসেও গেছিল। এখন পূর্ণ সুস্থ, কলেজও যাবে। রাধামাধব বাবুর স্ত্রী সেখানেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান স্বামীর নৃশংস মৃত্যু সহ্য করতে না পেরে। অঙ্কিতা মানসিক বিকারে ভুগেছে ২ বছর টানা, এখনও মাঝে মাঝে চিৎকার করে, সুনন্দা বাক শক্তি হারিয়েছে চিরদিনের তরে। গাঙ্গুলীবাবুর স্ত্রী এখন আমাদেরই পরিবারের অংশ, স্মৃতিভ্রষ্ট হয়ে যাবার দরুন ছেলের সাথে যায়নি। আমাকেই ছেলে হিসাবে মনে করেন তিনি, তাই আমিও আমার মায়ের একজন বান্ধবী রূপে ওনাকে আমাদের পারিবারিক সদস্য করে নিয়েছি। নিহারবাবুর জন্য সবচেয়ে বেশি যন্ত্রণা হয়।

হাসপাতালের বিছানাতে শুয়ে শুয়ে উপরের ওই পিশাচদের পোষাক, ওদের আচার, দেবতাদের নাম ও তার ব্যাখ্যা গুলো শুনেছিলাম রফিক সাহেবের মুখে।

অরিত্র তার মোবাইলের একটা অতিরিক্ত ব্যাটারি প্যান্টের গোপন পকেটে রাখত। গাড়িতেই মোবাইলটা প্যান্টের পকেটে রেখে দিয়েছিল। মোবাইলের ব্যাটারি লিথিয়াম আয়ন দিয়ে তৈরি হয়। এতে দুটো ইলেক্ট্রোড থাকে, একটা পজিটিভ ক্যাথোড অন্যটা নেগেটিভ এনোড। এদের মাঝে খুবই একটা পাতলা পর্দা অংশ দুটিকে আলাদা করে রাখে। চার্জিং এর সময় ক্যাথোড থেকে ইলেক্ট্রোলাইট বা লিথিয়াম আয়ন গুলো নেগেটিভ এনোডের দিকে ধাবিত হয়। ব্যাটারির চার্য খরচের সময় ঠিক উল্টোটা ঘটতে থাকে। এখন এই সঞ্চিত বিদ্যুৎ বা শক্তি যখন ধীরে ধীরে খরচা হয় তখন তা সম্পূর্ণ নিরাপদ। কোনো কারনে সঞ্চিত সমস্ত শক্তি যদি একবারে ছেড়ে দিতে যায় বা দেবার উপক্রম হয় তখনই বিস্ফোরণ ঘটে। এক্ষেত্রেও অরিত্র অনেকক্ষণ প্রায় আগুনের উপরেই অচৈতন্য হয়ে পড়ে ছিল, ওর কোমরের কাছেই ছিল মোবাইল ও একটা অতিরিক্ত ব্যাটারি। দুটোই প্রচন্ড উত্তাপে শর্ট সার্কিট হয়ে যায় ও ফেটে আগুন ধরে যায়।

পিছনের ঘটনাটা কিছুটা এই রকম ছিল- এই হিংস্র জাতিরা আমাদের প্রথম দিন থেকেই টার্গেট করেছিল যখন ইয়াংচি গ্রামের সেই মঠে গেছিলাম। সেই মত গুরুদাম্বাতে আসতেই ফেরার পথে ওরা রাস্তায় পাথর ফেলে আমাদের আঁটকে দেয়। প্রকৃতিও ওদের অনুকুলেই ছিল সেদিন। সেনার বেশ ধরে আমাদের বোকা বানিয়ে সেই রাত্রে প্রথভ্রষ্ট করে ওই জঙ্গলের মাঝে নিয়ে আসে, যেটা গভীর পাহাড়ী দুর্গম অঞ্চল। ওখানেই ওই লুপ্তপ্রায় সুন জাতির বসবাস। ওদের গতিবিধি দেখে প্রথমেই সন্দেহ হয় তোম্বা নামের ছেলেটির, কিন্তু আমরাই সমস্বরে ওকে থামিয়ে দিয়ে সেনাবেশীদের সাথে যেতে সায় দিই। দুর্ঘটনার আগে তোম্বা ওই দুটো লোকের সাথে বিতন্ডাতে জড়িয়ে পরে, ও যখন বুঝতে পারে যে ওরা সেই সুন জাতি। দূরে আরো অনেকেকে আসতে দেখে, তখন সে জিপের সেনার পোশাক পরিহিত দুজনের একজনকে হত্যা করে পালিয়ে কাছাকাছি অঞ্চল থেকে সভ্য লোকেদের সাহায্যের খোঁজে চলে যায়। পথেই দেখে কুঙ্গার সাথে তার দেখা হয়, সন্ধ্যার পরও আমাদের সাথে ফোনে যোগাযোগ না হওয়ার দরুন সে স্থানীয় প্রশাসন থেকে লোক নিয়ে আমাদের খোঁজে বেরিয়ে এদিকেই আসছিল।

আমাদের সাথের অপর গাড়িটির ড্রাইভার যতক্ষণে তোম্বার খোঁজে আমাদের গাড়ি পর্যন্ত এসেছে, ততক্ষণে ওই খুনে পাদেমের দলও অন্ধকারের মাঝে এসে পৌঁছে গেছে। তাদেরই নিক্ষেপিত হাড়ের তৈরি বিষাক্ত তীর তার হৃৎপিণ্ড স্তব্ধ করে দিয়েছিল। অজ্ঞান করবার বনজ ঔষধি মেশানো একটা পাথরের বোল্ডার আমাদের গাড়ির কাঁচে ছুঁড়ে মারে, যার দরুন আমরা অজ্ঞান হয়ে যায়। তখন ওরা আমাদের বেঁধে ওই অন্ধকার গুদামে ফেলে রেখেছিল। নীহার বাবু ছিলেন প্রাক্তন সেনা অফিসার, নিজেকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে আড়ালে আত্মগোপন করেছিলেন ওদের কোনো অসতর্ক মুহুর্তের প্রতীক্ষায়, সুযোগ পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে। এদিকে উৎসব যখন চুড়ান্ত পর্যায়ে তখন তিনি একটা একটা করে প্রায় ১৫-২০ জন পাদেমকে নিঃশব্দে ঘাড় মটকে হত্যা করে অন্ধকার জঙ্গলের সুযোগ নিয়ে। পরে ওদের পোষাক পরিধান করে শামানদের দলে ভিড়ে হত্যালীলা করতে থাকে, কিন্তু তোম্বা ওনাকে ‘সুন’দের লোক ভেবে আক্রমণ করে বসে ও তোম্বার গুলি…

আজ তিন বছর অতিক্রান্ত, সেই বিভীষিকাময় রাত্রের স্মৃতি আজো চোখের পাতায় বসা। পাহাড়ের পাঁজর ঘেঁষে যেসব শতাব্দীপ্রাচীন মহীরুহ উদ্ধত অহংকারের মত দাঁড়িয়ে আছে বহুকাল, তারাই সকল ঘটনার নিশ্চুপ সাক্ষী। ঝর্নার জলে ভেজা পাহাড়ি রাস্তা যেখানে মেয়েদের সিঁথির মত ধবধবে, সেখান সবুজে ঘেরা প্রকৃতির তৈরি পাথরের দুর্গম দেশে, হৃদয়কে বিশুদ্ধ অক্সিজেনে ধুয়ে পরিষ্কার করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে লক্ষ লক্ষ পর্যটক পাড়ি জমায় এই ধোঁয়া ধুলোর শহর থেকে পালিয়ে এসে। কিন্তু চিরযৌবনা অপরূপ সৌন্দর্যের আড়ালেও কতকাল ধরে বেঁচে রয়েছে নিষ্ঠুর প্রাণপ্রবাহ! মানুষের বেশে পিশাচের দল, মাতালের মত যাদের আচার। অনুভুতিরাও কখনও কখনও রিক্ত হয়ে যায় পাহাড়ি শুষ্ক বাতাসে, অশ্রুপাত বয়ে চলে শ্বাসনালী দিয়ে, যা ব্রহ্মতালুতে এসেই শুকিয়ে যায় প্রবৃত্তির তাড়নাজনিত নিদারুণ বিভীষিকাতে, গুরুদাম্বার বিভীষিকা।

-সমাপ্ত

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *