স্বসাত্রাস

ভয় কাকে বলে সেটা দেবার থেকে ভাল অনেকেই জানেনা। শিশু বেলায় বাবার আচমকা মৃত্যুর পর মা যখন দ্বিতীয় বিবাহ করেছিল, তখন ওকে অনেক দূরে শিমলার বোর্ডিং স্কুলে রেখে আসে অভিভাবকেরা। গুমরে মড়া শৈশবের গোটাটা জুড়েই ছিল নিঃসঙ্গ নামের ভয়ের গুদামঘর, কিছুদিন মা-বাবাকে খুঁজে বেড়ালেও বছর কয়েকের মধ্যে তার জীবনে ওঁদের অস্তিত্ব মুছে যায়, প্রথমে রাগের দরুন পরে অভ্যেসে। বাবার মৃত্যুর পর অনেকটা নগদ সম্পদ আদালতের নির্দেশমত দেবার জন্য ওর নামে গচ্ছিতের ব্যবস্থা করা দিয়েছিল দাদু-মামারা মিলে, প্রতিমাসে ব্যাঙ্ক থেকেই টাকা চলে যেত স্কুলে। স্কুলের পাঠ চুকিয়ে কলেজে ভর্তি হলে তখন ঐ অল্প টাকাতে আর খরচা চলতনা, ওদিকে ব্যাঙ্কের গচ্ছিত টাকা ২৫ বছর বয়সের আগে তার ব্যবহারের অধিকার নেই কোর্টের রায় মোতাবেক।

শুরুর দিকে দাদু, ছোটকা, মামা, মামাবাড়ির দাদু-দিদা খোঁজ নিলেও সেটা ঐ বছর ৫-৬ মাত্র কন্টিনিউ করেছিল। কারন মোবাইলের রমরমাতে ল্যান্ডলাইন কাটা পড়তেই যোগাযোগের মাধ্যম শেষ হয়ে যায়। কারন হস্টেলে একদনিই ১০ মিনিট করে ফোন করার অনুমতি ছিল, পরবর্তীতে সকলের কাছেই মোবাইল ফোন চলে এলেও দেবার কাছে আসেনি অর্থাভাবে। হস্টেলের বৃদ্ধ ওয়ার্ডেন সুনীল বাত্রাই ওর পরিবার সেই ক্লাস ফাইভ থেকে, ছুটিছটাতে দেবাকে সাথে করে ওনার নিজের বাড়িতেই এনে রাখত। সেই থেকে ওটাই ওর পার্মানেন্ট এড্রেস।

ও হ্যাঁ, দেবার ভালো নাম দেবাঞ্জন মিত্র, বর্তমানে ব্যাঙ্গালুরুতে একটা MNC তে কর্মরত। শিল্পা নামের আধা বাঙালী সুন্দরী সহকর্মীরে সাথে এনগেজমেন্টটা সারা হয়ে গেছে মেয়ের বাড়িতে না জানিয়েই, সামনের বৈশাখে ওদের পরিণয়ে আবদ্ধ হবার ইচ্ছা। শিল্পাকে সাথে করে নিয়ে শিমলাতে গিয়ে ‘বাবা’ সুনীল বাত্রা ও ওনার স্ত্রীর আশির্বাদ নিয়ে এলেন, বলে এল যে বিয়ের সময় বাবা-আন্টিকে ব্যাঙ্গালুরু নিয়ে আসবেন। এবারে শিল্পার বাড়িতে যাওয়ার পালা, গোলটা বাঁধল সেখানেই। শিল্পার বাবার সোনার গহনা প্রস্তুতের ব্যাবসা, মা একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের বুনিয়াদী শ্রেনীর শিক্ষিকা। দেবাঞ্জনের ঘন চাপ দাড়ি ছাড়া কোনো সমস্যা ছিলনা শিল্পার বাবা মায়ের তরফে। পাণ্ডে বাড়ির মেয়ে কুলভ্রষ্ট্রা হবে এটা নিয়ে কিছুটা অমত স্বত্বেও কোষ্ঠী বিচারের জন্য লিখিত ভাবে নাম ঠিকানা দিতেই আসল পরিবার পরিচিতির জন্য গোঁ ধরে বসল শিল্পার মা, কারন প্রাথমিক পরিচয়ে দেবা বলেছিল সে বা তার বাবা সুনীল বাবু শিমলার বাসিন্দা।

এদিকে সত্যি বলতে দেবাঞ্জনের কাছে ব্যাঙ্কের ঠিকানাটুকু ছাড়া দেশের বাড়ির কিছুই জানা নেই, সেই পাঁচ বছর বয়স থেকে এই বোর্ডিংস্কুলে, লজ্জার কথাটা হচ্ছে মায়ের মুখটাই ভুলে গেছে সে। এদিকে বৈশাখের মধ্যে বিয়ে করতেই হবে, নতুবা লোকলাজের ভয়। শ্রাবণ মাস মানে জুলাইয়ের শেষে শিল্পার ডেলিভারির তারিখ দিয়েছে ডাক্তার, মোটকথা বৈশাখে ৫ মাসের বেবিবাম্প নিয়ে বিয়ের সর্বোচ্চ ধকল নেওয়া যেতে পারে, চৈত্রে বিয়ে হয়না। বাংলাতে সেভাবে দেবার কোনো পরিচিতি ছিলনা, তাই কীভাবে কী করবে সেটা নিয়ে বড় দুশ্চিন্তায় ছিল। শিল্পা প্রস্তাব দিল, ফেসবুক গ্রুপের সুত্রে বেশ কিছু চেনাজানা মানুষ রয়েছে, তাদের সাথে যোগাযোগ করলে কেমন হয়! যেমন ভাবা তেমন কাজ, একটা সাহিত্যচর্চা গ্রুপের সিনিয়র জনপ্রিয় সদস্য অম্বিকা বাবুকে বলাতে তিনি অতি উৎসাহে নিমন্ত্রণ করে দিলেন দেবাঞ্জনকে। বিষয়টা জানাজানি হতেই চাঁপা দিদি, মনোহর বাগচি বাবু, আসফাকুল্লাহ বাবু, সহ অনেকেই তাদের অতিথি হতে আমন্ত্রণ জানালেও অনির্বান চক্রবর্তীর কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল দেবা।

অনির্বানের সাথে আলাপ হল ফোনে, সে বিজ্ঞাপনের ফিল্ম বানায় এমন একটা সংস্থার সাথে যুক্ত। এয়ারপোর্ট থেকে সোজা VIP রোড সংলগ্ন বাগুইআটির একটা বহুতলের নিচে এসে পৌছালো মেসেঞ্জারে পাঠানো গুগুল লোকেশন মোতাবেক। অকৃতদার অনির্বানবাবু বছর চল্লিশের মানুষ দু,জন পার্টনারের সাথে ফ্ল্যাট শেয়ার করে থাকেন। সেরাত্রে জমিয়ে আলাপ পর্ব সেরে পরদিন একাই ডালহৌসির UBI হেড অফিসে গেল দেবা, কারন ওই ব্যাঙ্কেই তার সেই পুরাতন একাউন্টটা ছিল, পরবর্তীতে সে অন্য ব্যাঙ্কে সব টাকা স্থানান্তরিত করে নিয়েছিল। সেখানে খুব একটা সুরাহা না হলেও, যে ব্রাঞ্চে মূল একাউন্টটা ছিল সেই বর্ধমান বৈদ্যনাথ কাটরার হদিশটা পেল। পরদিন সকালে বর্ধমান লোকাল ধরে সোজা গন্তব্যে, একজন নিন্মপদস্থ কর্মচারীকে কিছু অতিরিক্ত উৎকোচের বিনিময়ে সেই একাউন্টের হদিশ বের হল।

বসন্তের বীরভূম মানে আমাদপুর নামক স্থানে যাবার কথা শুনে অনির্বাণ নেচে উঠল, সে তার রুমমেট সহ কয়েকজন বন্ধুদের নিয়ে যাবার প্রস্তাব রাখল। অচেনা অজানা স্থানে একদম অচেনা লোকেদের মাঝে পরার চেয়ে দুদিনের স্বল্পচেনা লোক উত্তম এই ধারণার বসবর্তী হয়ে দেবা ওদের পাঁচজনকে সাথে করে পরদিন অফিস করে শুক্রবারের বিকালে বিশ্বভারতী এক্সপ্রেসে চড়ে বসল, রোববার ফেরার পথে শান্তিনিকেতনটা ঢুঁ মেরে আসা যাবে। ট্রেন সাড়ে আটটার মধ্যে আমাদপুর পৌঁছে যাবে, সেখান থেকে হাঁটা পথে কুচিঘা বলে কোনো এক গ্রামে দেবাদের আদিবাড়ি। লেট ট্রেন যখন আমাদপুরে ঢুকলো তখন রাত্রি পৌনে দশটা, লোকজন যারা নামলো তারা সকলেই নিজেদের বাহনে ফিরে গেল। কয়েকটি ভ্যান অবশ্যি ছিল, কিন্তু তারা যতক্ষণে হেলেদুলে স্টেশনের বাইরে এসে পৌছালো- একজন চপওয়ালা তার দোকান গুটাচ্ছে দেখা ছাড়া আর কোনো জনপ্রাণী নজরে এলোনা। আরেকটু এগিয়ে আসতেই তারা একটা রেলগেটের সামনে এসে উপস্থিত হল, পাশে একটা চা গুমটি খোলা রয়েছে, উল্টোপিঠে একটা গ্রিলে ঘেরা মদের দোকান।

ওদের দলের অর্ণব বলে একজন, অতি উৎফুল্লতার সাথে বেশ কয়েকটা বোতল খরিদ করে নিল বাকিদের প্রশ্রয়ে। চা গুমটির ছেলেটি দিক নির্দেশ দিলেও মদের দোকানি কিছু সাহায্য তো করলই না উল্টে দোকানের শাটার বন্ধ করে দিল। মোবাইল নেটের অবস্থা যাচ্ছেতাই, তার উপরে কুচিঘা বলে কোনো স্থান গুগুলে শো করছেনা। অগত্যা একটা হোটেলের খোঁজ করতে সেই চা দোকানি যেন আকাশ থেকে পড়ল, এখানে হোটেল কোথায়! সিউরি, সাইথিয়া বা শান্তিনিকেতন এখান থেকে প্রায় সমদূরত্বের, থাকার দরকারে ওই তিনস্থানের কোথাও চলে যায় পথিকেরা। অবস্থা বেগতিক দেখে আবার স্টেশনে ফেরাই ঠিক করল, সেখানে পৌঁছে স্টেশন মাস্টারকে সব কথা খুলে বলতে তিনি খানিক অপেক্ষা করতে বল্লেন। কিছুক্ষণ পর রামপুরহাট দিক থেকে শেষ প্যাসেঞ্জারে এক হাড়জিরজিরে আদিবাসী সম্প্রদায়ের বৃদ্ধ লোক এসে উপস্থিত হল, সে এ অঞ্চলের অনেক পুরাতন লোক। স্টেশন মাস্টারের নির্দেশ মত তাকে সব খুলে বলতে সে দেবাঞ্জনের দাদু রমনীমোহন মিত্রের নাম চিনতে পারল। কিছু একটা বলতে গিয়েও সে থেমে গেল, পরক্ষণে বলল– ‘সে ঘর তো উধা’য় বটেক, কুচ্চুঘাতায় লয়’। যাই হোক আর যেখানেই হোক, নিজের পৈতৃক ভিটে বলে কথা, একটা অজানা শক্তির বলে ওরা নিজেদের মাঝে ঠাট্টা ইয়ার্কি করতে করতে হাঁটতে লাগল বৃদ্ধের পিছন পিছন।

শহুরে লোক সকলেই, অল্প হেঁটেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। ফিটনেশ ওয়াচে দেবা দেখল তারা মাত্র দেড় কিলোমিটারই হেঁটেছে। বৃদ্ধের কথাতে কোনো ভরষা করা যাচ্ছেনা, সে শুরু থেকে বলছে- “এই তো হেথায়, আর চাট্টিখানি”। প্রায় একঘন্টা হেঁটে ক্লান্ত শরীরে যেখানটাতে এসে পৌছালো সেটা একটা প্রেতপুরীর চেয়ে কিছু কম নয়। ত্রয়োদশীর চাঁদ ধুইয়ে দিচ্ছে রাত্রের অন্ধকার, সামনে ইটের তৈরি বিশাল এক সিংহ দুয়ার পেরিয়ে নুড়ি বেছানো পথটি একটা সিঁড়ির সামনে এসে শেষ হয়েছে। সাম্প্রতিক অতীতেও এই বাড়ি যে বৈভবের দৃষ্টান্ত ছিল সেটার সাক্ষী দিচ্ছে প্রতিটা ইঞ্চি, -‘কে’ শব্দে একটা গম্ভীর আওয়াজে জড়িমা ছুটল দেবাঞ্জনের। একটা যান্ত্রিক আর্তনাদ করে দরজাটা খুলে যেতে, মাফলারের মত গামছা ঢাকা একজন বৃদ্ধ একটা কুপির আলো তার নিজ মুখের সামনে তুলে ধরে শুধালো– “কাকে চাই”। আমাদের সাথের বৃদ্ধ নিচু স্বরে শুধালো- “কর্তাবাবা নেই, আমি পুল্টুন”? সামনের সেই বৃদ্ধ বলল- “কর্তার জ্বর, বাড়িতে আর কেউ নেই। তুমি তো সবই জানো।” আরো খানিকক্ষণ বাবা বাছা করে তাকে কনভিন্স করা গেলে, সে দেবা সহ বাকিদেরকে নিয়ে চলল কর্তার কাছে।

  • “কে বাবা এতো রাত্রে, কটা দিন ধরে রাত্রের দিকে ইলেকট্রিক থাকছেনা। তোমাদের তো ঠিক চিনতে পারলামনা বাবা”। বেশ রাশভারি কন্ঠে ঘরের কোনে রাখা এক সাবেক পালঙ্ক থেকে আওয়াজটা এলো। ঘরের দেওয়ালের একটা কুলুঙ্গিতে একটা মোমবাতি জ্বলছে, যার ক্ষমতা নেই এই নিকষ অন্ধকারের সাথে লড়াই করে। দেবা বলল-
  • “আজ্ঞে আমার নাম দেবাঞ্জন, দেবা…”
  • “দেবাঞ্জন!! মানে…”
  • “মানে আপনার পুত্র রাতুলের একমাত্র সন্তান, যাকে…”

দেবাঞ্জন থেমে যেতে একটা চিশ্ছিদ্র নিস্তব্ধতা গ্রাস করল গোটা অন্ধকারকে ছাপিয়ে। পরিচয় হতেই দেবা একটা টুল টেনে নিয়ে পালঙ্কের কাছটাতে বসে, অনেকটা অনুনয়, আক্ষেপ সহ বেশ সোহাগভরা আলাপ বিলাপের পর, বৃদ্ধ চাকরটি সকলকে ডেকে এনে নিচতলাতেই দুটো ঘর খুলে দিল পাঁচজনের শোয়ার জন্য। বলল কর্তাবাবা আশক্ত চলৎশক্তি হীন বছর তিনেক ধরে, চোখেরও ব্যারাম; আলোর তেজ সহ্য হয়না।

সেরাত্রে কেউ কিছু খেলোনা, ট্রেনেই হাবিজাবি খেয়েছিল। সাথের বোতলে থাকা জল খেয়ে শুতেই ঘুমিয়ে পড়ল সকলে। পরদিন খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেল সকলের। দেখল সব আসবাবপত্রই পাতলা কাপড় দিয়ে ঢাকা। বাথরুম খুঁজে না পেয়ে ঘরের বাইরের ঝোপেই সবাই হিসি করে এলো। সেই বৃদ্ধ চাকর এখনও আসেনি, দাদুর কাছে যেতে তিনি রান্নাঘরের দিক দেখিয়ে বল্লেন- “রেঁধে খেতে দাদুভাই”, তৈজসপত্র ও টাটকা আনাজ রয়েছে ঘরেই। বিশাল দোতলা প্রাসাদ বাড়ি, পশ্চিম দিকে দিঘীর মত পুকুর পাড়ে বেড়ে উঠা অবিন্যস্ত নানান ফলের গাছেদের জঙ্গল, অনেকটা এলাকা নিয়ে গোটা বাড়িটাই প্রাচীর ঘেরা। সাথীরা সেই পুকুরে মাছ ধরার বায়না করতে বৃদ্ধই বললেন “উপরে তেতলার চিলেকোঠা ঘরে বা দোতলার ভাঁড়ারে- ছিপ, জাল উভয়ই পাবে। পুকুর পাড়ে কেঁচোর অভাব নেই। নিশ্চিন্তে মাছ ধরো”। সকলে হৈ হৈ করে উঠল, দোতলার ভাঁড়ার খোঁজার চেয়ে একেবারে তে’তলার চিলেকোঠা পানে যাওয়া সহজ; সেখানে দুটো ছিপ মিলল। শোনাগেল, দাদু ঘরথেকেই বলেছেন- “এই পুকুরে বেশ কয়েকবছর মাছ ধরা হয়নি, প্রমান সাইজের কাতলা থেকে রাঘব বোয়াল সবই পাবে”।

পুকুরে যাবার পথটা বুনো লতায় ভরে গেছে। অবিন্যস্ত ভাবে বেড়ে চলা আম, জামরুল, নিম, শিরীষ গাছেরা একে অন্যকে পাল্লা দিয়ে বাড়তে গিয়ে আকাশকেই প্রায় ঢেকে দিয়েছে। ব্রেকফাস্ট পুকুড়পাড়ে বসেই করা হবে, সবাই মাছ ধরতে চলে গেলে, দেবা গেল বাজারের দিকে ব্রেকফাস্টের সামগ্রী কিনতে। বেশ কিছুটা দুর গিয়ে মোড়ের মাথায় একটা গুমটিতে কী পাওয়া যাবে শুধাতে বলল, “বান রুটি আর কলা পাওয়া যাবে”। যদিও সেটা চায়ের দোকান, কিন্তু বানানো চা বয়ে নিয়ে যাবার পাত্র নেই কারো কাছেই। একটু দূরে একটা মুদি দোকানের হদিস দিল চা দোকানি। সেই দোকান থেকে চা পাতা, চিনি, পাউডার দুধ নিয়ে ফিরবে এমন সময় দোকানী কৌতুহল বসত দেবাঞ্জনকে শুধালো সে কথায় এসেছে! দেবাঞ্জন বেশ হাসিহাসি মুখ করে বলল যে, সে এই গাঁয়েরই ছেলে, গত রাত্রে এসেছে মিত্রবাড়িতে, অমুকের নাতি। মুদি দোকানীর মুখটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেল, যেটা তাড়ায় থাকা দেবাঞ্জনের নজর এড়িয়ে গেল।

দেবা ফিরে এসে সোজা পুকুরপাড়ে উপস্থিত হল রুটি আর কলা নিয়ে। সবাই একটা শ্যাওলা ধরা শুকনো পাতায় ঢাকা শানবাঁধানো ঘাটের উপরে বসে গল্পগাছা করছে। সকালের নরম রোদের সাথে ঘন ছায়ার লুকোচুরি, দমবন্ধকরা এক নিঃস্তব্ধতার আবেশ, যেন ঝোপের ভিতরে অজানা শ্বাপদেরা ওৎ পেতে রয়েছে কোনো অসতর্ক মুহুর্তের প্রতীক্ষাতে। দেবা সেখান থেকে উঠে ভাল করে বাড়ির চারিপাশে ঘুরে দেখতে লাগল, নাহ তার ছোটবেলার কোনো স্মৃতিই আবিষ্কার করতে পারলনা এই পরিবেশে। সদরের সামনেটাতে এসে দাঁড়াতে মনে হল গাঁয়ের বাকি সব অংশটার থেকে এই বাড়িটা যেন একটা বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ড, পৃথিবীর যাবতীয় কোলাহল ও ব্যাস্ততা থেকে আলোকবর্ষ দূরে। সঙ্গীসাথীরা সেই সকাল থেকে বসে আছে, আশ্চর্যটা হল- যে পুকুরে এতো মাছ ও কয়েকবছর জাল বা ছিপ পড়েনি, সেখানে একটাবারও ফাতনা ডোবেনি, আশ্চর্য। দলের একজন মজা করে বলল, মাছেরা বোধহয় এখনও ঘুম থেকে উঠেনি, চলো কাল রাত্রের বোতল খোলা যায়; দেবাই গৃহকর্তা সুতরাং ওকেই জলের ব্যবস্থাতে যেতে হলো। শুকনো রুটি আর কলা খেয়ে বাকিদেরও জল তেষ্টা পেয়েছিল, দেবা জলের বোতল আর দোতলার ভাঁড়ার থেকে একটা জালের ব্যবস্থা করতে গেল।

সে সটান দাদুর ঘরে ঢুকলো, ভাঁড়ার ঘরটা কোনদিকে শুধাবে বলে, কাউকে দেখতে না পেয়ে পেয়ে সে নিজেই রান্নাঘর খুঁজে সেখানের পিতলের ঘড়া থেকে কয়েকটা বোতলে জল ভরে নিল, দেখল পাশেই সিলপ্যাক মশলার প্যাকেট, টাটকা হরেক সব্জি রাখা রয়েছে কয়েকটা ধামায়। জল ভরে বাইরের বারান্দায় রেখে, আনমনে দোতলাতে চলে গেল। বেশ কয়েকটা ঘরের দরজা খুলে দেখল সবকটাই শোয়ার ঘর বা ওই ধরনের, পাতলা পাতলা চাদর দিয়ে ঢাকা আসবাবপত্রে ঠাসা। একটা ঘর অনেকটা প্রশস্ত লম্বা হলঘর মত, একটা বড় আয়তকার টেবিল রয়েছে মাঝে; সম্ভবত ডাইনিং রুম, তার দেওয়াল জুড়ে অনেক মানুষের ছবি। ঘরের জানালা পশ্চিমপানে, যেখান থেকে পুকুড়পাড়টা দেখা যাচ্ছে। পশ্চিমের আলো খুবই নরম, দেওয়ালের ছবি গুলো কাদের- দেখতে যাবে বলে লাইট জ্বালতে গিয়ে মনে পড়ল রারেন্টই তো নেই। ওদিকে পুকুর পাড় থেকে চিৎকার করতে শুরু করেছে- “দেবাঞ্জন বাবু, জল নিয়ে আসুন, অনিন্দ্যর হেচকি উঠছে”। দেবা রুম থেকে বেড়িয়ে গিয়ে টুক করে আরো দুটো ঘরের মধ্যে থেকে ভাঁড়ার ঘড়টা পেয়ে যেতেই, তার দোয়ালের একটা আঙটাতে ঝোলানো একটা খ্যাপলা ও একটা ফাঁস জল পেড়ে, বারান্দা থেকে জলের বোতল নিয়ে চলল পুকুর পাড়ে। যেতে যেতে মনে হল কেউ যেন ওকে ডাকছে, থমকে দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে কাওকে দেখতে পেলনা, শুধু একটা ভয়ালদর্শন বিড়াল কার্নিশ থেকে লাফ মেরে পাঁচিল বেয়ে দেওয়ালের ওপাড়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। কেমন যেন একটা শিহরন খেলে গেল সারা শরীরে কাঁটা দিয়ে। কেমন যেন সব ঠিকঠাক মনে হচ্ছিলনা দেবার, মোটা প্রাচীন গাছগুলো যেন নিজেদের মাঝে ফিসফিসিয়ে ওকে নিয়েই কোনো মারণ শলাপরামর্শ করছে মনে হতে লাগল। দিনের বেলাতে এমন অদ্ভুত ভয় সে আগে কখনও পায়নি।

অস্বস্তি নিয়েই আরো ত্রস্তপায়ে দ্রুত হেঁটে ঘাটে পৌঁছে গেল, একটা জলের বোতলে লিকার মিশিয়ে তখনই ওরা দারুপার্টি শুরু করে দিল। দেবার মদ সহ্য হয়না, তার উপরে ওর মন ওই ছবিগুলোর দিকেই পড়ে ছিল; ‘বাবা কেমন দেখতে ছিল, বাকি ছবি গুলো কী পূর্বপুরুষদের! কি নাম ওনাদের’- ইত্যাদি হরেক প্রশ্নেরা ওকে অস্থির করে তুললো। সে বলল– “আমি একটু আসছি দোতলা থেকে”। বলেই, সে দ্রুত পদচালনা করে পুনরায় দোতলার সেই ডাইনিং হলে এসে উপস্থিত হল। প্রথমে আলোর দিক থেকে ছবি গুলো দেখতে লাগল। ছবির নিচে নাম লেখাঃ শৌর্যনারায়ণ মিত্র, নিশ্চই দাদুর দাদু বা তেনারও বাবা হবেন হয়ত- দেবা ভাবল। নৃপতি নারায়ণ, সমিধ নারায়ণ, মঞ্জুকিশোর, এমন অনেকগুলো ছবি পেরিয়ে ওর দাদুর একটা পোট্রেটের সামনে এসে উপস্থিত হল।

রমণীমোহন মিত্র, পাশেই আরো একটা ছবি; সেখানে রমোণীমোহন, তার স্ত্রী ও চার সন্তান একত্রে এক ফ্রেমে। দেবাঞ্জন ভীষণ রকম উতফুল্লিত ও আশ্চর্য হয়ে তার বাবাকে দেখতে লাগল, অবিকল যেন তারই ছবি, শুধু মাথায় ঊনার ঝাঁকড়া চুল, ক্লিনসেভড। অন্য জন বালক, নিশ্চই কাকামণি এবং বাকি দুজন নিশ্চিত পিসিই হবে। অনেকক্ষণ ধরে সেই ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একটা ঘোর মত এসে গেছিল, মনে হল কেউ যেন চিৎকার করছে। দেবা ভাবল, ওই মাতাল গুলো চেল্লাচেল্লি করছে, করুকগে; ওদের আনাটাই মনেহয় ভুল সিদ্ধান্ত। এবারে সে পরের ছবিটার দিকে এগিয়ে গিয়ে দেখল, সেটা ওরই বাবার ছবি; সম্ভবত ওনার বিয়ের পরপরই তোলা, পাশের জন তাহলে নিশ্চিত ওর মা। মায়ের মুখটা ওর মনে ছিলনা এটা দেখার আগে পর্যন্ত, কিন্তু দেখেই মনে হল খুব চেনা একজন কেউ। মনটা প্রশান্তিতে ভরে গেল, মায়ের প্রতি সন্তানের ভালোবাসা বোধহয় একেই বলে।

সে নিশ্চিত করার জন্য তৎক্ষণাৎ দাদুর কাছে ছুটল, একটা চাপা উৎকণ্ঠা, ভাললাগা, হঠাৎ পাওয়ার স্ফুর্তি একসাথে কাজ করছে দেবার মন মস্তিষ্কে। কত বড় বংশের ছেলে সে, অথচ সময়ের অবিচারে এই সকল সুখ-সুবিধা থেকে কত যোজন দূরে চলে গিয়েছিল, আজ আবার সেই সময়ই তাকে এখানে এনে ফেলেছে। দাদুর ঘরে গিয়ে এবারও কাউকে দেখতে না পেয়ে সে আপন মনে সিঁড়ির কাছে আসতেই আবার পুকুরপাড় থেকে একটা আর্ত চিৎকার কানে এলো। সে দৌড়ে ডাইনিং হলের জানালাতে গিয়ে ব্যাপারটা দেখবার তরে যেইনা একতলার সিঁড়ি পেরিয়ে দোতলার ল্যান্ডিং এ এসে পৌঁছছে, অমনি তার হৃদস্পন্দন কয়েক মুহুর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল, পরক্ষণেই বিস্ফোরিত স্থির দৃষ্টি সহ তার সর্বাঙ্গ যেন ফ্যাকাশে রক্তশূণ্য হয়ে গেল।

গতকালই শুনেছিল তার দাদু চলৎশক্তিহীন, গত তিন বছর ধরে। তাহলে সামনে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন তিনি কে! কীভাবে সম্ভব! মাথা ঝিমঝিম করছে, বোধবুদ্ধি লোপ পাবে এমন সময় সেই বৃদ্ধ বলে উঠল- “কি দাদুভাই, মাকে দেখলে? হতচ্ছাড়ি একজন পাঁড়েকে বিয়ে করে চলে গিয়েছিল, ছোটখোকার গোটা পরিবারই একটা রাস্তা দুর্ঘটনাতে মারা গেছে সেটাও বছর পাঁচেক আগে। এখন এইসব কিছুর মালিক তুমি, তুমি একা…”। এবারে এই বৃদ্ধের আওয়াজকে ছাপিয়ে সেই পশ্চিমের জানালার দিক থেকে “শিজ্ঞিরি এ বাড়ি ছেড়ে পালাও, পুকুরে কঙ্কাল…”। আওয়াজটা যেন সদরের ওপাড়ে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছিল। সিড়ির মুখে বৃদ্ধ বা ভূত বা যে ই হোক, দেবাঞ্জন হিতাহিত জ্ঞানশুণ্য হয়ে ওই ডাইনিং রুমের জানালা লক্ষ্য করে দৌড়াতে গিয়ে একটা চেয়ারের সাথে ধাক্কা খেয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ল, চোখ চেয়ে দেখল উপরে ওর বাবা মায়ের ছবিটা রয়েছে।

জ্ঞান লোপ পাওয়ার আগে তার মনে এলো- “শিল্পার মা তার বাবার সাথে কেন”? তাহলে কী- পাঁড়ে আর পান্ডে!! পরক্ষণেই শিরদাঁড়া বেয়ে বরফের সাপেরা খেলা করতে লাগল তার গোটা শরীর জুড়ে। এক অজানা আতঙ্কে, ক্ষোভ, লজ্জা, ঘৃণায় নিজের মুখটা খামচিয়ে ধরল, মনে হল কেন সে এখানে মরতে এসেছে! মনে হল পিঠের নিচের মেঝে সরে গিয়ে সে পাতালের দিকে চলেছে, মস্তিষ্কে অসহ্য যন্ত্রণা…, বাকি আর কিছু মনে নেই।

গ্রামবাসীকে দ্বারা উদ্ধার হয়ে বোলপুরের হাসপাতালে শুয়েই দেবা শোনে- তিন বছর আগে ডাকাতদের হাতে খুন হয় বৃদ্ধ রমনীমোহন। পুকুরের জলে লাস ডুবিয়ে রাখা হয়েছিল, যার কঙ্কাল ওই জালে উঠেছিল। দাদুর ভূত ছিল ওটা না তার তীব্র কল্পনা শক্তি? রাত্রে কোন বৃদ্ধের সাথে কথা বলেছিল টুলে বসে? রসুইঘরে টাটকা আনাজ কে এনে রেখেছিল? নাহ এই সব প্রশ্নের কোনোটাই তাকে ততটা ভীত করে তুলতে পারেনি, যতটা তাদের আগামীর দাম্পত্য সম্পর্কের পরিণতি কী হবে ভেবে দিশেহারা হয়ে চলেছে। কোটি কোটি লোকের মাঝে তারই সাথে কেন এমনটা হল, এ কোন অভিশাপ- দেবাঞ্জন উত্তর খুঁজে ফেরে নিরুদ্দেশে।

-সমাপ্ত

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *