পেটুক

বাক জলপানের অনুকরণে নাটক

চরিত্র

  1. পেটুক
  2. ঝাঁকিওয়ালা
  3. আঁতেল ১
  4. আঁতেল ২
  5. কবি
  6. খোকা
  7. খোকার কাকু

ছাতা মাথায় এক পেটুকের প্রবেশ, পিঠে লাঠির আগায় লোট-বাঁধা পুঁটলি। টাকমাথা, ইয়া ভুঁড়ি, গলায় ডায়জিন, ওমেজ, এন্টাসিডের মালা। হাতে এল্যুমিনিয়ামের থালা, উদভ্রান্ত চেহারা, জুলুজুলু চোখে এদিক ওদিকে ইতস্তত নজর-

পেটুকঃ নাহ ‒ একটু বিরিয়ানি না পেলে আর চলছে না। সেই কাল সকাল থেকে সফর করে চলেচি, এখন‌‌ও প্রায় তিন দিনের সফর বাকি। নেশাতে নোলার সব লালা ঝরে ঝরে শুকিয়ে উঠল। কিন্তু বিরিয়ানি চাই কার কাছে? এসব এলাকাতে সুইগি-জোমাটোর ডেলিভারিও বাড়ন্ত। আশেপাশে কোনো বিরিয়ানির দোকান নেই, হোটেলগুলো ‘কেশো পোনার ঝোল’ আর আলুপোস্ত নিয়ে ঝিমোচ্ছে, গেরস্তের বাড়ি দুপুর রোদে দরজা এঁটে সব ঘুম দিচ্ছে, ডাকলে সাড়া দেয় না। বেশি খিদে খিদে করে চেঁচাতে গেলে হয়তো আবার দুপুরের মত পুঁইচচ্চরি ঘ্যাট খাইয়ে দেবে।  পথেও ত লোকজন দেখছিনে। ‒ ঐ একজন আসছে ! ওকেই জিজ্ঞেস করা যাক ।

গলায় ঝাঁকি নিয়ে এক ব্যক্তির প্রবেশ, মাথায় ফেট্টি করে গামছা বাঁধা। ঝাঁকিতে ধুপ জ্বলছে, পান খেয়ে ঠোঁট মুখ লাল। গলায় খোট্টাদের মত গান- ‘পানওবা খাইকে এ মনুইয়া মিলাইলে’

পেটুকঃ-  মশাই, একটু বিরিয়ানি কোথায় পাই বলতে পারেন?

ঝাঁকিওয়ালাঃ (মাথা চুলকাতে চুলকাতে) বিড়ি য়ানি! বিড়ি এখন কোথায় পাবেন? এ ত আর মুর্সিদাবাদ নয়, যে ঘরে ঘরে বিড়ি বানায়। টুরিষ্ট এলাকা, দিশি বিদিশি সিগারেট চাইলে দিতে পারি, দেখতেই পাচ্চেন আমি পান বেচি। গুটকা, বিমল এসবও আছে। কানে কানে বলি- বোতলও  দিতে পারি ( পকেট থেকে বেড় করে দেখিয়ে) ‒

পেটুকঃ-  না না, আমি তা বলিনি‒

ঝাঁকিওয়ালাঃ না, সিগারেট আপনি বলেননি, কিন্তু বিড়ি আনি দিতে বলছিলেন কিনা, তা ত আর এখন এনে দেওয়া যাবে না, তাই বলছিলুম‒

পেটুকঃ-  না হে, আমি পান- সিগারেট চাচ্ছিনে‒

ঝাঁকিওয়ালাঃ-  চাচ্ছেন না ত ‘কোথায় পাব’ ‘কোথায় পাব’ কচ্ছেন কেন? খামকা এরকম করবার মানে কি?

পেটুকঃ-  আপনি ভুল বুঝেছেন‒ আমি বিরিয়ানি চাচ্ছিলাম‒

ঝাঁকিওয়ালাঃ-  বিরিয়ানি চাচ্ছেন তো ‘বিরানী বা ব্রিয়ানি’ বললেই হয়‒ ‘বিড়ি আনি’ বলবার দরকার কি? বিড়ি আনি আর বিরানী কি এক হল? কিল আর সা-কিল কি সমান ? জয় ব্যানার্জী যা ভাইপো ব্যানার্জীও তাই? পরাগ মানেই কি ওনাকে রাগী হতে হবে? গরুমারাতে গিয়ে কি আপনি গরু মারবেন?

পেটুকঃ-  ঘাট হয়েছে মশাই। আপনার সঙ্গে কথা বলাই আমার অন্যায় হয়েছে ।

ঝাঁকিওয়ালাঃ-  অন্যায় তো হয়েছেই। দেখছেন ঝাঁকিতে পান-গুটকা নিয়ে যাচ্ছি‒ তবে বিরিয়ানিই বা চাচ্ছেন কেন? ঝাঁকিতে করে কি বিরিয়ানি ফেরি করে কেউ ? লোকের সঙ্গে কথা ক‌‌ইতে গেলে একটু বিবেচনা করে বলতে হয়।

পেটুকঃ-  দেখলে ! কি কথায় কি বানিয়ে ফেললে ! যাক, ঐ বুড়ো আসছে, ওকে একবার বলে দেখি।

এক হাতে গোঁফে তা দিতে দিতে, অন্য হাতে ভুঁড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে। কাঁধে লাল সালু, স্যান্ডো গেঞ্জি আর পাতলুন পরিহিত। এই ভয়ানক শীতে বাঁদর টুপি পড়ে এক মাঝবয়স্ক লোকের প্রবেশ।

বৃদ্ধঃ-  কে ও? পেদো তুলসী নাকি?

পেটুকঃ-  আজ্ঞে না, আমি কোলকেতার লোক‒ একটু বিরিয়ানির খোঁজ কচ্ছিলুম‒

বৃদ্ধঃ-  বল কিহে? কোলকেতা ছেড়ে এখেনে এয়েছ বিরিয়ানির খোঁজ করতে? ‒ হাঃ, হাঃ, হাঃ । তা, যাই বল বাপু, অমন বিরিয়ানি কিন্তু কোথাও পাবে না। খাসা বিরিয়ানি, তোফা বিরিয়ানি, চমৎ‌কা-র-র বিরিয়ানি ।

পেটুকঃ-  আজ্ঞে হাঁ, সেই কাল সকাল থেকে ট্রেনে বাসে ভোমোণ করচি, বেজায় লোলুপতা মানে বিরিয়ানির খিদে পেয়ে গেচে ।

বৃদ্ধঃ-  তা ত পাবেই । ভালো বিরিয়ানি যদি হয়, তা দেখলে খিদে পায়, নাম করলে খিদে পায়, ভাবতে গেলে খিদে পায় । তেমন তেমন বিরিয়ানি ত খাওনি কখনো ! – বলি হায়দেরাবাদি বিরিয়ানি খেয়েছো কোনোদিন ?

পেটুকঃ-  আজ্ঞে না, তা খাইনি-

বৃদ্ধঃ-  খাওনি ? অ্যাঃ ! মেদনীপুর হচ্ছে আমার দেশের বাড়ি‒ আদত হায়দেরাবাদি বিরিয়ানির জায়গা। সেখানকার যে বিরিয়ানি, সে কি বলব তোমায়? কত বিরিয়ানি খেলাম‒ আমিনিয়ার বিরিয়ানি, আর্সালানের বিরিয়ানি, সিরাজের বিরিয়ানি, হাজির বিরিয়ানি, রয়্যালের বিরিয়ানি‒ কিন্তু দেশেরবাড়ির হসপিটাল মোড়ের যে হায়দেরাবাদী  বিরিয়ানি, অমনটি আর কোথাও খেলাম না। ঠিক যেন কিউবায় মার্ক্স, ঠিক যেন SFI এ লাল। ফোন নাম্বারটা দিয়ে রাখো আমায়, হোয়াটসএপে কল করে আরো ঠিকানা দিয়ে দেব বিরিয়ানির দোকানের।

পেটুকঃ-  তা মশাই আপনার বিরিয়ানি আপনি মাথায় করে রাখুন‒ আপাতত এখন এই খিদের সময়, যা হয় একটু বিরিয়ানি আমার জিভে পড়লেই চলবে‒

বৃদ্ধঃ-  তাহলে বাপু তোমার কোলকেতায় বসে বিরিয়ানি খেলেই ত পারতে? চাসসো কিমি পথ উজিয়ে এই জঙ্গলে বিরিয়ানি খেতে আসবার দরকার কি ছিল ? ‘যা হয় একটা হলেই হল’ ও আবার কি রকম কথা? আর অমন তচ্ছিল্য করে বলবারই বা দরকার কি? আমাদের বিরিয়ানি পছন্দ না হয়, খেও না- বাস্‌‌ । গায়ে পড়ে নিন্দে করবার দরকার কি? অর্থনীতি আর ইনফ্লাকচুয়েশনের সাথে বিরিয়ানির বিষয়টা বলতেই দিলনা! আমি ওরকম ভালোবাসিনে। হ্যাঁ- ইনক্লাব… [রাগে গজগজ করিতে করিতে বৃদ্ধের প্রস্থান]

দর্শকাসন থেকে মাথা তুলিয়া আর এক বৃদ্ধের হসিমুখ সহ দন্ডায়মান

বৃদ্ধঃ- কি হে ? এত তর্কাতর্কি কিসের? GST ফাঁকির কেস নাকি!

পেটুকঃ-  আজ্ঞে না, তর্ক নয় । আমি বিরিয়ানি চাইছিলুম, তা উনি সে কথা কানেই নেন না- কেবলই সাত পাঁচ গপ্‌‌প করতে লেগেছেন । তাই বলতে গেলুম ত রেগে মেগে অস্থির !

বৃদ্ধঃ-  আরে দূর দূর ! তুমিও যেমন ! জিজ্ঞেস করবার আর লোক পাওনি? ও মেদনীপুরী ভুতটা তো খালি ফোনে বকর বকর করে, আর লাল দেখে চতুর্দিকে। ও হতভাগা বিরিয়ানির জানেই বা কি, আর বলবেই বা কি? ওর যে কলিগ আছে, ব্যাম্বুভিলায় চাকরি করে, সেটা ত একটা মস্ত আঁতেল । ও মুখ্যুটা কি বললে তোমায়?

পেটুকঃ-  কি জানি মশাই- বিরিয়ানির কথা বলতেই আমিনিয়ার বিরিয়ানি, আর্সালানের বিরিয়ানি, সিরাজের বিরিয়ানি, হাজির বিরিয়ানি, রয়্যালের বিরিয়ানি, মেদনীপুরের হায়দেরাবাদী বিরিয়ানি, ব’লে পাঁচ রকম ফর্দ শুনিয়ে দিলে-

বৃদ্ধঃ-   হুঁহ ‒ ভাবলে খুব বাহাদুরি করেছি । তোমায় বোকা মতন দেখে খুব চাল চেলে নিয়েছে। ভারি ত ফর্দ করেছেন । আমি লিখে দিতে পারি, ও যদি পাঁচটা বিরিয়ানি বলে থাকে তা আমি এক্ষুনি পঁচিশটা বলে দেব- মনে রেখো আমিও পুরসভার ইস্কুলের হেডমাস্টার ছিলাম-

পেটুকঃ-  আজ্ঞে হ্যাঁ । কিন্তু আমি বলছিলুম কি একটু খাবার জন্য বিরিয়ানি‒

বৃদ্ধঃ-  কি বলছ ? বিশ্বাস হচ্ছে না ? আচ্ছা শুনে যাও । লৌক্ষৌর বিরিয়ানি, কাচ্চি বিরিয়ানি, দম বিরিয়ানি, আফগানি বিরিয়ানি, কাশ্মিরী বিরিয়ানি, জর্দা বিরিয়ানি, করাচী বিরিয়ানি, কিমা বিরিয়ানি, চেন্নাইএর কারিপাতার গন্ধে মাখা বিরি-য়ানি, ধাই কিরিকিরি উড়ে কটকি বিরি‒য়ানি, সুগন্ধে ভুরভুর মেমোনি বিরি-য়ানি, কুচো কুচো মাংসের তুষে ডোবা অম্বুর বিরি-য়ানি ‒ কটা হল? গোনোনি বুঝি ?

পেটুকঃ-  না মশাই, গুনিনি‒ আমার আর খেয়ে দেয়ে কাজ নেই‒

বৃদ্ধ : তোমার কাজ না থাকলেও আমাদের কাজ থাকতে পারে ত? যাও, যাও, মেলা বকিও না। সাঁঝ হয়ে এলো, ও ইন্দ্র গ্লাস রেডি হল!! ‒একেবারে অপদার্থের একশেষ! [ধপ করে দর্শকাশনে আবার বসে পরা]

পেটুকঃ- নাঃ, আর বিরিয়ানি-ফিরনি চেয়ে কাজ নেই‒ এগিয়ে যাই, দেখি কোথাও বিরিয়ানি স্টল বা সেন্টার পাই কি না ।

[লম্বা লম্বা চুল, নাকে চশমা আঁটা, হাতে খাতা পেন্সিল পাঞ্জাবি আর জিন্স পরিহিত, পায়ে বাহারি জুতা, একটি ছোকরার প্রবেশ]

পেটুকঃ-  লোকটা নেহাৎ‌ এসে পড়েছে যখন, একটু জিজ্ঞাসাই করে দেখি । মশাই, আমি অনেক দূর থেকে আসছি, এখানে একটু বিরিয়ানি মিলবে না কোথাও?

ছোকরাঃ-  কি বলছেন? ‘বিরিয়ানি’ মিলবে না? খুব মিলবে। একশোবার মিলবে! দাঁড়ান, এক্ষুনি মিলিয়ে দিচ্ছি‒ বিরিয়ানি বাবুয়ানি দারোয়ানি ধরেআনি ‒ মিলের অভাব কি? ডিম বিরিয়ানি-ভেজ বিরিয়ানি-বাসি বিরিয়ানি- খাসী বিরিয়ানি, খানদানী, পানদানি, পিকদানি, আতরদানি, সুইট হানি, বেক-বিরিয়ানি খাইখাই, রেওয়াজি-বিরিয়ানি আরোচাই‌, সাথে কাবাব আর কোপ্তা-, পাত পেরে খায় ফি হপ্তা। হালিম, আলীম, কলিম- তন্দুর, ভুরভুর, সুরসুর‒ কত চান ?

পেটুকঃ : এ দেখি আরেক পাগল ! মশাই, আমি সে রকম মিলবার কথা বলিনি ।

ছোকরাঃ- তবে কি রকম মিল চাচ্ছেন বলুন ? কি রকম, কোন ছন্দ, সব বলে দিন‒ যেমনটি চাইবেন তেমনটি মিলিয়ে দেব, যেমন ব্ল্যাকহোল-গোলগোল-ডিমের ঝোল কিম্বা একসাথ-খাইভাত- বারাসাত।

পেটুকঃ-  ভালো বিপদেই পড়া গেল দেখছি‒ (জোরে) মশাই ! আর কিছু চাইনে, ‒(আরো জোরে) শুধু একটু বিরিয়ানি খেতে চাই !

ছোকরাঃ-  ও বুঝেছি । শুধু-একটু-বিরিয়ানি-খেতে-চাই । এই ত ? আচ্ছা বেশ । এ আর মিলবে না কেন ?‒ শুধু একটু বিরিয়ানি খেতে চাই ‒ভারি খিদে প্রাণ আই-ঢাই । চাই কিন্তু কোথা গেলে পাই‒বল্‌‌ শীঘ্র বল্‌‌ নারে ভাই । কেমন ? ঠিক মিলেছে ত ?

পেটুকঃ : আজ্ঞে হ্যাঁ, খুব মিলেছে‒খাসা মিলেছে‒ নমস্কার । (সরিয়া গিয়া) নাঃ, বকে বকে মাথা ধরিয়ে দিলে‒ একটু ছায়ায় বসে মাথাটা ঠাণ্ডা কনে নি । [একটা বাড়ির ছায়ায় গিয়া বসিল]

ছোকরা : (খুশী হ‌‌ইয়া লিখিতে লিখিতে) মিলবে না? বলি, মেলাচ্ছে কে? সেবার যখন আখতার দাদা ‘ম্যাপ পয়েন্টিং’ কিসের সঙ্গে মিল দেবে খুঁজে পাচ্ছিল না, তখন ‘ফুন্টসিলিং’ বলে দিয়েছিল কে? ফুন্টসিলিং কোথায় জানো ত? ইন্ডিয়া ভুটানের বর্ডার হচ্ছে ফুন্টসলিং। অকপট-ঝটপট-খটমট-লটপট… (পেটুক কে না দেখিয়া) লোকটা গেল কোথায় ? দুত্তোরি ! [প্রস্থান]

[বাড়ির ভিতরে বালকের পাঠ‒ আদর্শ বিরিয়ানির তিন ভাগ চাল এক ভাগ মাংস । ফুটপাতের বিরিয়ানি সস্তা, অতি বিস্বাদ]

পেটুকঃ-  ওহে খোকা! একটু এদিকে শুনে যাও ত?

[সৌম্যমুর্তি, মাথায় রঙিন চুল, খোকার কাকু বাড়ি হ‌‌ইতে বাহির হ‌‌ইলেন]

কাকুঃ  কে হে? পড়ার সময় ডাকাডাকি করতে এয়েছ?‒ (পেটুককে দেখিয়া) ও! আমি মনে করেছিলুম পাড়ার কোন ছোকরা বুঝি । আপনার কি দরকার?

পেটুকঃ-   আজ্ঞে , বিরিয়ানির খিদেয় বড় কষ্ট পাচ্ছি‒ তা একটু বিরিয়ানির খবর কেউ বলতে পারলে না।

কাকুঃ-   (তাড়াতাড়ি ঘরের দরজা খুলিয়া) কেউ বলতে পারলে না? আসুন, আসুন। কি খবর চান, কি জানতে চান, বলুন দেখি ? সব আমায় জিজ্ঞেস করুন, আমি বলে দিচ্ছি। [ঘরের মধ্যে টানিয়া ল‌‌ওন‒ ভিতরে নানারকম যন্ত্র, নকশা, বড় বড় হাঁড়ি, উনুন, খুন্তি, বই ইত্যাদি ]

কি বলছিলেন? বিরিয়ানির কথা জিজ্ঞেস করছিলেন না?

পেটুকঃ-  আজ্ঞে হ্যাঁ, সেই সকাল থেকে বনে জঙ্গলে ঘুরছি‒

কাকুঃ-  আ হা হা ! কি উৎ‌সাহ কি উৎসাহ ! শুনেও সুখ হয়। এ রকম জানবার আকাঙ্খা কজনের আছে, বলুন ত? বসুন ! বসুন ! [কতকগুলি ছবি, হাঁড়ি আর খুন্তি বাহির করিয়া ] বিরিয়ানির কথা জানতে গেলে প্রথমে জানা দরকার, বিরিয়ানি কাকে বলে, কীভাবে বিরিয়ানি বানানো হয়, বিরিয়ানির কি গুণ‒

পেটুকঃ-  আজ্ঞে, একটু খাবার বিরিয়ানি যদি‒

কাকুঃ-   আসছে‒ ব্যস্ত হবেন না। একে একে সব কথা আসবে। বিরিয়ানি হচ্ছে তিন ভাগ চাল আর এক ভাগ আলু, মাংস আর মসলা‒ [খাতায় আঁক কেটে লিখিলেন]

পেটুকঃ-  এই মাটি করেছে !

কাকুঃ-   বুঝলেন? রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় বিরিয়ানিকে বিশ্লেষণ করলে হয়‒ নিরামিষ আর আমিষ। বাসমতি চালের সাথে আর চন্দ্রমুখী আলু আর রেওয়াজি মাংসে সঠিক মসলা সংযোগ হলে তবেই বিরিয়ানি ! শুনছেন ত?

পেটুকঃ- আজ্ঞে হ্যাঁ, সব শুনছি। কিন্তু একপ্লেট খাবার জন্য বিরিয়ানি যদি দেন, তাহলে আরো মন দিয়ে শুনতে পারি ।

কাকুঃ-  বেশ ত ! খাবার বিরিয়ানির কথাই নেওয়া যাক না। খাবার বিরিয়ানি কাকে বলে? না, যে বিরিয়ানি পরিস্কার, স্বাস্থকর, যাতে ডালডার নাই, ডায়রিয়ার বীজ নাই‒ কেমন? এই দেখুন এক প্যাকেট বিরিয়ানি‒ আহা, ব্যস্ত হবেন না । দেখতে মনে হয় বেশ সুস্বাদু, কিন্তু অনুবীক্ষন দিয়ে যদি দেখেন, দেখবেন পোকা সব কিলবিল করছে। কেঁচোর মতো রোটা ভাইরাস, সালমোনেলার মতো সব পোকা‒ এমনি চোখে দেখা যায় না, কিন্তু অনুবীক্ষন দিয়ে দেখায় ঠিক এত্তো বড় বড়। এই হাঁড়ির মধ্যে দেখুন, শিলিগুড়ির ফুটপাতের বিরিয়ানি; আমি এইমাত্র পরীক্ষা করে দেখলুম; ওর মধ্যে রোগের বীজ সব গিজ্‌‌গিজ্‌‌ করছে‒ কলেরা, উদারময়, ওলাউঠা, ডিসপেপসিয়া ‒ও বিরিয়ানি খেয়েছেন কি মরেছেন ! এই ছবি দেখুন‒ এইগুলো হচ্ছে কলেরার বীজ, এই উদারময়তার, এই রেক্টাম ইনফেক্সন, সিওপিডি ‒সব আছে । আর এই সব হচ্ছে বিরিয়ানির পোকা‒ বিরিয়ানি পচে গেলে তার মধ্যের আলু মাংস যা কিছু থাকে ওরা সেইগুলো খায়। আর এই বিরিয়ানিটার কি দুর্গন্ধ দেখুন! ভাগাড়ের মাংসের বিরিয়ানি‒ মাংস ফেলে দিয়েছি, তবু গন্ধ ।

পেটুকঃ-  উঁ হুঁ হুঁ হুঁ ! করেন কি মশাই ? ওসব জানবার কিচ্ছু দরকার নেই‒

কাকুঃ-    খুব দরকার আছে । এসব জানতে হয়‒ অত্যন্ত দরকারী কথা !

পেটুকঃ-  হোক দরকারী‒ আমি জানতে চাইনে, এখন আমার সময় নেই‒

কাকুঃ-   এই ত জানবার সময় । আর দুদিন বাদে যখন বুড়ো হয়ে মরতে বসবেন, তখন জেনে লাভ কি? বিরিয়ানিতে কি কি দোষ থাকে, কি করে সে সব ধরতে হয়, কি করে তার শোধন হয়, এসব জানবার মতো কথা নয়? এই যে সব মড়কের কবলে খামর কে খামার মুরগী ছাগল অক্কা পাচ্ছে, সেই সব মরা পাখি-জন্তু গুলো মাংস হয়ে শহরে আসছে, ভিনিগারে চুবছে, ম্যারিনেট করা হচ্ছে, রং করে ভাজা হচ্ছে‒ এরকম কেন হয়, কীভাবে হয়, তাও ত জানা দরকার?

পেটুকঃ-  দেখুন মশাই ! কি করে কথাটা আপনাদের মাথায় ঢোকাব তা ত ভেবে পাইনে। বলি, বারবার করে বলছি‒ খিদেয় জিভের লালা শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে গেল, সেটা ত কেউ কানে নিচ্ছেন না দেখি। একটা লোক খিদেয় বিরিয়ানি-বিরিয়ানি করছে তবু বিরিয়ানি খেতে পায় না, এরকম কোথাও শুনেছেন?

কাকুঃ-   শুনেছি বৈকি‒ চোখে দেখেছি । বদ্যিনাথের রক্তে কোলেস্টেরল পাওয়া গেল, বদ্যিনাথের হল লাল মাংস আর তেলে মানা‒ তার উপরে মর্নিং-ওয়াকাতঙ্ক। আর বিরিয়ানি খেতে পারে না‒ যেই বিরিয়ানি খেতে যায় অমনি সকাল বেলার সাধের ঘুম ভুলে ৫ কিমি হাঁটার বিভীষিকা। মহা মুশকিল !‒ শেষটায় আধুনিক কুক ডেকে, সোয়াবিন দিয়ে বিনা তেলে বিরিয়ানি রেঁধে খওয়ালো, তাবিজ দিয়ে মাংস ভোলাবার প্রচেষ্টা হল‒ কিছুতেই কিছু হলনা, তখন সে উপলব্ধি করল – ‘একদিন তো মরেই যাব, কি লাভ বিরিয়ানী হীন জীবনে বেঁচে’। তারপর সে ‘বিদাই পিতিবি’ বলে বিরিয়ানি খেয়ে বাঁচল। ওরকম হয়।

পেটুকঃ- নাহ‒ এদের সঙ্গে আর পেরে ওঠা গেল না‒ কেন‌‌ই বা মরতে এসেছিলাম এখেনে? বলি, মশাই, আপনার এখানে ভাগাড়ের বিরিয়ানি আর দুর্গন্ধ বিরিয়ানি ছাড়া ভালো খাঁটি সুস্বাদু বিরিয়ানি কিছু নেই?

কাকুঃ-  আছে বৈকি! এই দেখুন না বয়াম ভরা টাটকা খাঁটি ‘বিরিয়ানি পিপারেশন’‒ যাকে বলে ‘would be বিরিয়ানি’, সব পারফেক্ট মাপে সরঞ্জাম রেডি, জাইকাদার বিরিয়ানির পরিমাপ।

পেটুকঃ-  (ব্যস্ত হ‌‌ইয়া) এ বিরিয়ানি কি খায়?

কাকুঃ   : না, ও বিরিয়ানি খায় না‒ ওতো রান্না করা হয়নি‒ একেবারে কাঁচা সরঞ্জাম কিনা, এইমাত্র তৈরি করে আনল‒ এখনো খাদ্যযোগ্য নয়।

[পেটুকের হতাশ ভাব]

তারপর যা বলছিলাম শুনুন‒ এই যে দেখছেন গন্ধওয়ালা নোংরা বিরিয়ানি‒ এর মধ্যে দেখুন ফুরফুরে সাদা বিরিয়ানির ভাত ঢেলে দিলুম‒ বাস, সাদা রঙ উড়ে ঘিনিঘিনে পামতেলে মাখা হলুদ হয়ে গেল । দেখলেন ত?

পেটুকঃ- না মশাই, কিচ্ছু দেখিনি‒ কিচ্ছু বুঝতে পারিনি‒ কিচ্ছু মানি না‒ কিচ্ছু বিশ্বাস করি না।

কাকুঃ-   কি বললেন ! আমার কথা বিশ্বাস করেন না?

পেটুকঃ- না, করি না। আমি যা চাই, তা যতক্ষণ দেখাতে না পারবেন, ততক্ষণ কিচ্ছু শুনব না, কিচ্ছু বিশ্বাস করব না।

কাকুঃ-   বটে ! কোনটা দেখতে চান একবার বলুন দেখি‒ আমি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছি‒

পেটুকঃ- তাহলে দেখান দেখি। খাঁটি জাফরানে ছোপানো, রেওয়াজি পাঁঠার মাংসে ঠাসা, গরম গরম, এক প্লেট খাবার বিরিয়ানি এনে দেখান দেখি। যাতে ভাগাড়ের মাংস নেই, কলেরার পোকা নেই, পামতেল, রঙেভাজা মরা ছাগলের ছাঁট টাট কিচ্ছু নেই, তা দিয়ে পরীক্ষা করে দেখান দেখি। খুব বড় এক বারকোশ ভর্তি বিরিয়ানি নিয়ে আসুন ত।

কাকুঃ-   এক্ষুনি দেখিয়ে দিচ্ছি‒ ওরে পলাশ, দৌড়ে রান্নাঘর থেকে ডিনারের জন্য তৈরি এক থালা বিরিয়ানি নিয়ে আয় ত।

[পাশের ঘরে দুপদাপ শব্দে পলাশের দৌড়]

নিয়ে আসুক তারপর দেখিয়ে দিচ্ছি । ঐ বিরিয়ানি কি রকম হয়, আর এই নোংরা বিরিয়ানি কি রকম তফাৎ‌ হয়, সব আমি এক্সপেরিমেন্ট করে দেখিয়ে দিচ্ছি।

[বিরিয়ানি ল‌‌ইয়া পলাশের প্রবেশ]

রাখ এইখানে রাখ।

[বিরিয়ানি রাখিবামাত্র পথিকের আক্রমণ‒ কাকুর হাত হ‌‌ইতে বিরিয়ানি কাড়িয়া এক মুখে হইতে একদলা থুতু থুঃ থুঃ করিয়া ছিটাইয়া, সেটি নিজের এলুমিনিয়ামের থালায় ঢালিয়া খাইতে শুরু করে দিল]

পেটুকঃ-  (আপন মনে) আঃ ! বাঁচা গেল !

কাকুঃ-   (ভয়ানক চটিয়া) এটা কি রকম হল মশাই?

পেটুকঃ-  পরীক্ষা হল‒ এক্সপেরিমেন্ট! এবার আপনি ভাগাড়ের মাংসের বিরিয়ানিটা একবার খেয়ে দেখান ত, কি রকম হয়?

কাকুঃ-   (ভীষণ রাগিয়া) কি বললেন !

পেটুকঃ- আচ্ছা থাক, এখন নাই বা খেলেন‒ পরে খবেন এখন । আর এই গাঁয়ের মধ্যে আপনার মতো আনকোরা পাগল আর যতগুলো আছে, সব কটাকে খানিকটা করে খা‌‌ইয়ে দেবেন । তারপর খাটিয়া তুলবার দরকার হলে জয় ব্যানার্জীকে খবর দেবেন‒ তিনি খুশী হয়ে ছুটে আসব‒ হতভাগা জোচ্চোর কোথাকার ! [দ্রুত প্রস্থান]

[পাশের গলিতে সুর করিয়া কে হাঁকিতে লাগিল‒ এই বিরিয়াই পঞ্চাশ টাকা প্লেট এই বিরিয়ানি বিরিয়ানি, কোলকাতা বিরিয়ানি]

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *