অকপট সাহায্যঃ ডুয়ার্স

নমস্কার সকল অকপটুদ বন্ধুদের।

ইতিমধ্যেই জেনে গেছেন এবছর অকপট চড়ুইভাতি আমাদের ডুয়ার্সে হতে চলেছে। এই প্রথম দক্ষিণবঙ্গের বাইরে এই অনুষ্ঠান হতে চলেছে, স্বভাবতই একজন ডুয়ার্সবাসী হিসাবে আমি ব্যক্তিগত ভাবে খুবই আনন্দিত; ভার্চুয়াল জগতকে চাক্ষুষ করার এহেন আয়োজন বড় আন্তরিক চাহিদার বস্তুগত প্রকাশে যেটা বড়ই আহ্লাদের।

এই চড়ুইভাতির মোড়কে ভ্রমণ সহ আড্ডা-আলাপ-খানাপিনা ইত্যাদির অবসরে কিছু সামাজিক কাজ অকপটুদের মাধ্যমে এবার ডুয়ার্সেই হোক এই আহ্বানও করা হয়েছে। উত্তরবঙ্গ তথা ডুয়ার্স মানেই সবুজ চা বাগান, জঙ্গল, বন্যজন্তুর স্বাভাবিক চারণক্ষেত্র; আর এগুলো সবটা মিলিয়ে এক অপূর্ব নৈসর্গিক সৌন্দর্যের প্রতিচ্ছবি, যার পাঁজরে রয়ে আছে কিছু উপজাতিয় মানুষ। এই মানুষেরাই চা-বাগিচার মজ্জা, যাদের পরিশ্রমে চা গাছগুলো ‘মানুষ’ হয়, এরাই জঙ্গলকে লালন করেন ক্ষতিসাধন না করেও।

চা বাগান বাইরে থেকে যতটা সবুজ মনে হয় ভিতর থেকে মোটেই কিন্তু তেমনটা নয়, রয়েছে দীর্ঘ বঞ্চনা, শোষনের ধূসর ইতিহাস, প্রজন্ম ধরে। তন্ময় দার ভাষায়- “অসাধু মালিক-ট্রেড ইউনিয়ন-রাষ্ট্র যন্ত্রের ত্রিবেণী সঙ্গম”। একটি সংগঠিত এবং বিপুল রাজস্ব প্রদানকারী শিল্প আজ মৃতপ্রায় অবস্থায়, যেখানে পার্শ্ববর্তী রাজ্য আসামের পরিস্থিতি এমনটা নয়। বাজারে আপনি ৩০০/- টাকার নীচে এক কেজি ভাল চা পাবেন না, অথচ যাদের তিনপুরুষের রক্ত জল করা মেহনতে তৈরী “ধূমায়িত চা’য়ের কাপ” -আহা তৃপ্তিতে ভরিয়ে দেয় তারা আজ সামান্য বেঁচে থাকবার মৌলিক রসদটুকু পায়না! সভ্যতার কী নির্মম পরিহাস! অনেকে গরীব হয়, কেউ বা তস্য গরীব; কিন্তু এনারা একেবারেই নিঃস্ব। মাথার ছাদ বাগান মালিকের, গতর চললে খোরাক জুটবে নতুবা উপোষ। নিজের বললে প্রানটুকুও নয়, সেটাও নিয়ে পালানো যায়না বা এরা যেতে পারেনা। কিছু ক্ষেত্রে গরীবির সংজ্ঞা লিখতে গেলে ডুয়ার্সের চা শ্রমিক কথাটা ব্যবহার করলে বোধহয় অত্যুক্তি হবেনা।

জন্মসুত্রেই আমি ডুয়ার্সের মানুষ, এবং কর্মসুত্রে চা বাগানেরই গর্বিত অধিবাসী। তাই চা-বাগানের বিগত ২৫ বছরের উঠাপরার ইতিহাস জীবন-যাপনে মিশে আছে, বলতে পারেন একাত্ম হয়ে গেছি। তৎকালীন মালিকরা মুনাফা কামিয়ে সরে পড়েছে ভিনরাজ্যে, বরাদ্দ টাকা সাইফন হয়ে অন্য ক্ষেত্রে লগ্নি হয়ে গেছে প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়ে, ম্যানেজমেন্টও লাগামহীন চুরি করে দেশের অন্যত্র পালিয়েছে, ট্রেড ইউনিয়ন রক্ষক থেকে ভক্ষকে পরিনত হয়েছে…!! সরকারী ঔদাসিন্য আজ একটা কৃষিভিত্তিক শিল্পকে কর্কট রোগাক্রান্ত করে দিয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর প্রতীক্ষাতে দিন কাটাতে করাচ্ছে।

আমারও সুযোগ ছিল বা আছে যে কোন সময় তথাকথিক উন্নততর জীবন বেছে নেবার অন্যত্র। যাইনি বলা ভাল যেতে পারিনি, স্ব-ইচ্ছায় এইখানেতেই আমার বাস। সুব্রত’দার কথায় ‘মানব জনমের ঋণ’ শোধের দায় থেকে যায় বৈকি! কিছুটা ঋণ পরিশোধের সুযোগ আমার মত আপনাদেরও এসেছে, যদি ভাবনাতে ‘প্রত্যেকে মোরা পরের তরে’ বাণীটি অন্তরে স্থান পেয়ে- অন্তরকে বিগলিত করে থাকে। আপনারা অনেকেই বিবেকের তাড়নাতে সাড়া দিয়ে ভালবাসার ঋণে ঋণী করতে চলেছেন, সদিচ্ছা থাকলে ভার্চুয়াল জগতকে বাস্তবে রূপদান সম্ভব এটা তারই প্রমান। অকপট করে দেখাবে সেটা। অকপটের সংবেদনশীল পরিচালক মন্ডলী এবং বর্ধিত পরিবার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।

সাহায্যের রকম সম্বন্ধে কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে রাখি। আপনি/আপনারা সুবিধে অনুযায়ী দান করলে হাত পেতে নেব।


১. শীতবস্ত্র সহ দৈনন্দিন ব্যবহারের কাপড়। ছোট বাচ্চা, বয়স্ক এবং মহিলারা প্রাধান্য পাক। ট্রাকসুট জাতীয় পোশাক, মাঙ্কি টুপি ও মোজা বাচ্চাদের জন্যে। চাদর হলে মহিলারা নানাভাবে ব্যবহার করতে পারেন। বয়স্কদের জন্য কম্বল।


২. কিছু পরিমান খাতা, কলম/পেন্সিল, ইরেজার। ওরাও পড়ুক লিখুক। আগামিতে ওরা কারও দয়ার মুখাপেক্ষী হয়ে যেন না থাকে। বিখ্যাত উক্তি…”শিক্ষা আনে চেতনা, চেতনা আনে মুক্তি!” ওরা দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিক হয়ে না থেকে সহ নাগরিক হয়ে মানুষ রূপে বাঁচুক। আদিবাসী শব্দটা বিস্তার করলে ওদের অধিকার আমাদের চেয়ে বেশীই বলে প্রতীত হয়।

৩. আয়রন সমৃদ্ধ ট্যাবলেট/ক্যাপসুল। মাল্টি ভিটামিন সিরাপ। চামড়ার ফাংগাল ইনফেকশনের মলম।

৪. গুড়ো দুধের প্যাকেট। সয়াবিন বড়ির প্যাকেট।

সিরিয়াস কাজ করাটা আমার কাছে যতটা সহজ, তার চেয়ে অনেক কঠিন সিরিয়াস লেখা। আমার পোস্টগুলো সাধারনত হাসিঠাট্টার পেয়ে থাকবেন আপনারা। আজ অকপটের অনুপ্রেরণায় এবং মনের তাগিদে একটু অন্য ভাবে লিখতে চেষ্টা করলাম, আমার ভাবনাটা আপনাদের সঞ্চারিত করতে পারলেই ধন্য।

কৃতজ্ঞতা সহ প্রনাম।

সাধন চন্দ্র পাল দাদার পক্ষে লেখা

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *