ভাবনার রঙে রঙিন

আমি ও আমরা কয়েকজনের চরিত্রকে বর্ণনা করতে গেলে কবি ‘ঢেন্ডনপা’ এর রচিত সান্ধ্যভাষায় লেখা মিলনসাগর থেকে একটা উদ্ধৃতিকে আমার পক্ষ থেকে প্রকৃষ্ট বলে মনে হয়- “টালত মোর ঘর নাহি পরবেষী/হাঁড়িতে ভাত নাহি, নীতি আবেশী”। কবি এখানে অন্নের দারিদ্রতার কথা উল্লেখ করলেও আমাদের মাঝে যেটার অভাব আছে সেটা জ্ঞানের ও জানার অভাব। নিরন্তর শিখে চলা তথা জ্ঞান ভিক্ষা করে জীবন অতিবাহিত করে দিতে পারলে তার চেয়ে বড় সুখ-আহ্লাদ আর কিসে! এক্ষেত্রে বলি- চর্যাপদের এই কবি ঢেন্ডণপা এর নামের পূর্বাংশ ‘ঢেন্ডণ’ শব্দের উৎপত্তি হছে ঢেন্ড ধাতু থেকে যার মতলব হচ্ছে ডুগডুগি। ঢেন্ডণপা মানে ডুগডুগি বাজিয়ে ভিক্ষা করা, আমরা অনেকেই এই পথেরই পথিক। অকপট নামের ডুগডুগি বাজিয়ে বিশ্বচরাচরকে জানার অন্বেষণ চলে নিত্য, যা একটি বহমান প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে জীবনভরের ব্রত।

মানুষের জীবনে কখনও কখনও এমন মুহুর্তগুলো আসে যখন ভাবনার কলসি ছাপিয়ে যায় প্রাপ্তির ধারাপাতে। ব্যাক্তিজীবন তো বটেই এই ভার্চুয়াল জীবনে ও অকপটের এই বর্গ-গোলকের মধ্যেও অনেক বন্ধু পেয়েছি যাদের সাথে বস্তুজীবনের ধুম্রজালের মাঝে করমর্দন করার সুযোগ হয়েছে; যাদের মধ্যে কয়েকটি সম্পর্কই হৃদয়ে উষ্ণতার প্রলেপ এঁকে দিয়েছিল, বাকিরা সময়ের আবর্তে দূরকক্ষে বিলীন হয়ে গেছে। আগামীতেও অনেক মানুষের সাথেই নিশ্চই আলাপচারিতা হবে, বন্ধুত্ব হবে কিন্তু হৃদ্যতা মস্তিষ্ক আর হৃদয়ের মাঝে চোখ দিয়ে সেই সম্পর্ক প্রতিফলিত হবে কিনা সেটা অদৌ আমরা জানিনা।

আজ এমনই একটা সম্পর্কের কথা বলব। সম্পর্কটা শুরু হয়েছিল কিছুটা তিক্ত ভার্চুয়াল বাক্যালাপের মাঝ দিয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা কিন্তু মানুষের মুখ- তার ঠিকানা তার সামাজিক পরিচয় কিছুই জানতে পারিনা, শুধু তার মনের তরঙ্গ আমাদের ভাবনার রাডারে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে যায় অথবা অন্তরের পৃষ্ঠতলে শোষিত হয়ে একটা বহুমাত্রিক প্রতিলিপি তৈরি করে। ইনি তেমনও ছিলেননা, খুব অল্প ধারণা নিয়ে আমাদের কাছে একটা পাতলা ঝিল্লি তৈরি করতে সমর্থ হয়েছিলেন, স্বভাবতই আমরা তার নিমন্ত্রিত হয়ে গেছিলাম অনবরত আন্তরিক নিমন্ত্রণের জখম সহ্যাতীত হয়ে যাবার দরুন।

যেহেতু আমরা গুটিকয়েক মানুষ খাদ্যবিলাসি, তাই যেকোনো একটা বাহানা পেলেই হল আমাদের রসনার খিড়কী থেকে সিংহদুয়ারের অবগুন্ঠন আপনাথেকে খুলে এসে নিষ্ঠীবনের নদী বইয়ে দিই। সে আই হোক, দিনটা ছিল রোববার, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ। কোলকাতার স্বাভাবিক বায়ুমণ্ডলের আদ্রতা সমৃদ্ধ গরম আবহাওয়ার চেয়েও ডুয়ার্সে বস্ত্রদানের জন্য খরিদদারিতে আরো বেশি উষ্ণতা ছড়িয়ে দিয়েছিল আমাদের মাঝের উপস্থিত সকলের মধ্যে, এটা অবশ্য আগেরদিন শনিবারের ঘটনা। সন্ধ্যার দিকের সামান্য একটা গড়মিল পরদিনের অনুষ্ঠানের গোটাটাই প্রায় মাটি করতে চলেছিল, কিন্তু শুভকর্মে এমন ছোটখাটো বাঁধা আসবেই এটা ভেবে সর্বদিকের পরিমাপ পূর্ণ করে রোববারের সকাল হল।

সুব্রতদা যথারীতি ঘনিষ্ট অনেক বন্ধুদের মাঝে নিমন্ত্রণ দিলেন যারা ঐদিন আসতে সক্ষম যদিনা গুরুত্বপূর্ণ কর্ম থাকে। আগের দিন সন্ধ্যা থেকে অবশ্য গৃহকর্তা সমানে আমরা কতজন যাচ্ছি তার হিসাব নিয়ে যাচ্ছিলেন লাগাতার, এখন বারবার আস্বস্ত করছিলেন যে অতিথি সংখ্যা ১৫-১৬ জন হলেও তার পক্ষ থেকে কোনো সমস্যা নেই। নানান পূর্বঅভিজ্ঞতা ও ওদেখা তথা প্রথমবারের জন পরিচয়ে কারোর বাড়িতে আচ্ছি এমন বাক্তিকে দুম করে বিড়ম্বনাতে ফেলাটা মোতেই ভদ্রোচিত কর্ম নয়, তবুও কিংশুকদা, আমি, পলাশ কাকু এই চার পূর্ব পরিচিত রওনা দিলাম সুব্রত মণ্ডলের বাড়ি তথা আমাদের অনেকের মেসবাড়ি থেকে, আজ্ঞে ওটাই আমাদের মাগনা মেসবাড়ি উইথ ফুডিং।

ঐতিহাসিক ভাবে আমাদের বুড়ো কর্তার তৈরি হয়ে কোথাও বের হওয়া মানে ব্লেডের উপরে কত্থক নৃত্যের সমান, প্রতিবারই ট্রেন-বাস-টাক্সি-ফ্লাইট-জলজাহাজ এমনকি শুভলগ্নও তুলসীতলায় অন্তিম হেঁচকি তুলতে তুলতে ওনাকে সাথে নিয়ে নিজেকে ধন্য করে। এদিনও তার ব্যাতিক্রম ঘটবে এমন কোনো কর্মসূচী ছিলনা, আমরা যখন রওনা দিলাম ততক্ষণে ভূ-ভারতের অনেক স্থানেই মধ্যাহ্নভোজন সমাপ্ত হয়েছে। তবুও যখন পৌছালাম অপরাহ্ণের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সূর্যদেব। প্রথমবারের জন্য উপস্থিত আমরা সকলেই @এন্টিগ্রা এর সাথে প্রথম চাক্ষুষ আলাপ হল। আসলে এমরা দৈনন্দিন এতো বেশি একে অপরের সাথে মানসিকভাবে সম্পৃক্ত যে ওটা এ আমাদের প্রথম দেখা ছিল মনেই হয়নি একটি বারের জন্যও।

বেলগাছিয়া মেট্রোর বাইরে এসে ওলা-উবের বুক করতে করতে কিংশুকদার সেই অকৃত্রিম ইচ্ছার কথা আজও ভুকভুকিয়ে হাসির উদ্রেগ করে- “পরজন্ম বলে সত্যিই যদি কিছু থাকে তোমাদের বিশ্বাস মত, আমি কিন্তু কুকুর হয়ে জন্মাতে চায়। বড়লোকের বাড়ির পোষা কুকুর”। কুকুরে মদ খায়না ও ১১ মাসের খরা কাটিয়ে ভাদ্রমাস এসতে আসতেই এ শেষ হয়ে যাবে এই মন্তব্যের ফলে হাসতে হাসতেই পৌঁছে গেলাম রাজারহাটের কাছে আমাদের গন্তব্যে।

মূল রাস্তার এক্কেবারে উপরেই ছিমছাম পাহারাদার প্রহরিত সুসজ্জিত কেতাবি ধাঁচের আবাসনের দ্বিতীয়তলে সুন্দর ও আধুনিক ফ্ল্যাটে যনি আমাদের স্বাগত জানালেন তিনিই গৃহকর্তা, আপাতরুক্ষ চেহারাতে ঝোলানো রয়েছে অকৃত্রিম অতিথিবৎসল হাসি যাতে কিছুটা উৎকণ্ঠার মৃদু ছায়া থাকলেও সেটা পরিতৃপ্তির সুরাতে সম্পূর্ণ নিষিক্ত ছিল। আবাসনের পাঁচিলের সাথেই হয়ত বিমানবন্দরের পাঁচিল শুরু হয়েছে, কারন যেভাবে নিন্ম উচ্চতা দিয়ে বিকট কর্ণবিদারক শব্দজল্লাদেরা মস্তিষ্কে হাতুরি পিটছিল তাতে এটাই আমার ধারণা হয়েছে।

ইয়ে সুরার কথায় মনে এলো- আমাদের বুড়ো কর্তাকে কেউই সেই মানের আতিথেয়তা দিতে পারবেননা ততক্ষণ যতক্ষণনা ওনাকে একপাত্তর ওনার পছন্দের মদিরা দিয়ে সম্ভাষণ জানানো হচ্ছে। এদিনও তার ব্যাতিক্রম ঘটলনা, আমাদের জন্য অবশ্য নানান ধরনের পানীয়ের বন্দ্যোবস্ত ছিল। তখনও কী জানতাম আমাদের জন্য কোন অত্যাচার অপেক্ষা করছে!

হ্যাঁ, অত্যাচারই বটে। ছোট্ট বাটি করে ডাল, পরিমিত ভাত, স্যালাড আর ঘরোয়া রান্নার সুগন্ধে ভরপুর হাওয়া আমাদের জিহ্বাকে জ্রাগ্রত করে তুলেছে ঠিক তখনই একের পর এক আক্রমণ শুরু হল, চিকেন , মাটন, মাছ, মিষ্টি… উফ আর কী কী যে আমার বড়দিদি স্বরূপা শতরূপা দিদিভাই তার হেঁশেলে রান্না করেছিলেন তার আর খবর নেওয়া হয়নি। রীতিমত খেয়ে ক্লান্ত শরীরে রজত গাজীর ‘প্লেন দেখবো’ ঝোঁক ধরার দরুন ছাদে উঠতেই নগর সভ্যতার এক পরিপূর্ণ চিত্র চোখের বায়স্কোপে ধরা দিল। আরো অনেক কিছুই ঘটেছিল, সেটা আমাদের বাক্তিগত সুখস্মৃতিতেই ধরা থাক নাহয়।

এর সাথে ছিল শুভঙ্করদার কেনা এক বান্ডিল নতুন কম্বল, ডুয়ার্সের জন্য। এছাড়া প্রাণ উপুর করে যথাসাধ্য নগদ অর্থও দিলেন ঐ পরিবারের উপস্থিত সকলেই যা আমাদেরকে নিজেদের দায়িত্ব সম্বন্ধে আরো সচেতন ও নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল।

উপসংহারে বলি, মানুষের রূপ বা লৌকিক মাত্রিকতাই আমাদের পরিচয় নয় তার চেয়েও বড় আমাদের অন্তর। আমরা জানিনা বা জানতামনা শুভঙ্কর বাবু কী কর্ম করেন, প্রয়োজনও বোধ করিনা; এমনকি ওনার পদবীটুকুও জানিনা, আজও জানার প্রচেষ্টা টুকুও করিনি। নামে কিইবা এসে যায়- সেক্সপিয়ারও আসলে @ ই ছিলেন?

অকপট ধন্যবাদ রইল অমন সুন্দর আতিথেয়তার জন্য।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *