প্রথম পর্ব

ইরাণের বিপ্লবী বাহিনী ‘কুদস ফোর্সে’র সুপ্রিম কমান্ডার তথা দেশের সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাধাকারীকে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে হত্যা করা হয়েছে। এটা পুরাতন খবর, এই ইরাণী সেনাবাহিনীর জেনারেলের নাম কাশিম সুলাইমানি সাবেক ইরাক-ইরাণ যুদ্ধের সময় থেকে স্বদেশে নায়কের সম্মান পেয়ে এসেছেন ও অবিসংবাদিত প্রবাদপুরুষ ছিলেন। বিপ্লব পরবর্তী ইরাণে প্রথম বারের জন্য গত বছর ‘অর্ডার অফ জুলফিকার’ নামে দেশের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মানেও ভূষিত হয়েছিল, স্বভাবতই মনে হতেই পারেযে- এহেন ব্যাক্তি CIA-MoSAD এর হিটলিষ্টের কোহিনূর হবে সেটা বলাই বাহুল্য।

‘কুদস’ শব্দটা ফার্সি, এরর অবিধানিক অর্থ পবিত্র; এই কুদস ফোর্স নব্বই এর দশকের মাঝামাঝি প্রতিষ্ঠা হয় এই সুলাইমানির নেতৃত্বে। সেই থেকে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে তথা ইরানের বাইরে বিভিন্ন ছোট ছোট বিচ্ছিন্নতাবাদী গষ্ঠীগুলোকে মদত দেওয়া ও শিয়া সাম্রাজ্যের পরিধি বাড়িয়ে ইরাণের ক্ষমতা প্রদর্শনই ছিল এদের মূল লক্ষ্য। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস ও ইসলামিক জিহাদ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের ‘ফাতেমিয়ুন’ আর ‘জাইনাবিয়ুন’ নামের অসংখ্য ছোটবড় মিলিশিয়া গ্রুপ এবং ইয়েমেনের হুতিরা এই ‘কুদস’ গ্রুপ থেকে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা পেয়ে এসেছে। সিরিয়া-ইরাকে শিয়াদের অনেক প্রশিক্ষিত বাহিনী রয়েছে ‘কুদস ফোর্স’-এর অধীনে যারা ISIS এর বিরুদ্ধে লড়াই দিয়ে যাচ্ছে। অন্তত ১৫-২০টি দেশে সরাসরি কিংবা সীমিত পরিসরে- ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশের সাথে ইরাণের স্বার্থের বিপরীতে ছায়াযুদ্ধে লিপ্ত। আন্তমহাদেশীয় চরিত্রের এই যোদ্ধাদলতির সঠিক আকার ও সদস্যসংখ্যা আঁচ করা শুধু কঠিনই নয় প্রায় অসম্ভব। ইরান এদের নাম দিয়েছে ‘প্রতিরোধের অক্ষশক্তি’।  সৌদি আরব তার তেলক্ষেত্রে অজ্ঞাত উৎস থেকে পরিচালিত এ রকম এক অভিযান দেখেছে গত ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯ তারিখে।

এতদিন ধরে ইজরায়েল বা সিআইএ কেউই এঁকে ছোঁয়ার সাহস করেনি, বরং মশা মারার চেয়ে তারা জঙ্গল সাফ করাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোকে নিকেশ করত তারা। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি ভিন্ন, ভারতে যেমন বিজেপি ও তার ভাবাদর্শগত পিতা RSS নামের মৌলবাদী সংগঠন পোষিত বিভিন্ন গোষ্ঠী বিপদে পড়লেই পাকিস্তানকে স্মরণ করে চকিতে জনগণকে প্রকৃত সমস্যা থেকে ভাবনার দিক পরিবর্তন করে দেয়, আমেরিকার রাজনীতিও সেই পথেরই পথিক। একটা সময় কিউবা ছিল, কখনও ভিয়েতনাম, মাঝে উত্তর কোরিয়া তো আবার কখনও আফগানিস্থান তথা মধ্যপ্রাচ্য। মাঝে চীন নিয়ে যে ট্যাঁফুঁ করেনা তা নয়, কিন্তু তাদের ক্ষমতার কাছে মার্কিনীদের দাপট দিনের আলো দেখেনি আজও।

ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইমপিচ করা হয়েছে মার্কিন কংগ্রেস হাউজ অফ রিপ্রেজেন্টেটিভ কক্ষে, ক্ষমতার অপব্যবহার ও নির্বাচনে অবৈধ হস্তক্ষেপের দায়ে। ঠিক এই মুহুর্তে মার্কিন সেনেটে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও এই বছরেই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী জাতীয় নির্বাচন, যেখানে ডেমোক্রেটদের বিপুলভাবে ফিরে আসার সম্ভাবনা প্রবল। এহেন পরিস্থিতিকে ট্রাম্পকে দু-বছরের মেয়াদ পূর্তির মধ্যেই হোয়াইট-হাউজ ছাড়তে হতে পারে, সেক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট হবে বর্তমান ভাইস মাইক পেন্স। সুতরাং দেশভক্তির ঢলঢলে সিরাপই একমাত্র মার্কিনীদের আবার ট্র্যাম্প তথা রিপাবলিকানদের ক্ষমতাতে বসিয়ে রাখতে পারে। এমতাবস্থায় যেকোনো মূল্যে মধ্যপ্রাচ্যে ইরাণী সেনা অধ্যক্ষের মত মাপের কাউকে হত্যা করা ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনো তাস আস্তিনে ছিলনা।

ট্রাম্পের ট্রাম্পকার্ড তো খেলা হয়ে গিয়েছে, কিন্তু এটা ‘সেভেন কার্ডে কালার’ ছিল। স্বভাবতই গোলাম, নক্কা, টেক্কা কার কাছে রয়েছে না জানা থাকলেও রঙের পেয়ার রয়ে গেছে ইজরায়েল তথা ইহুদীদের হাতে। সুতরাং বিশ্বক্ষমতার ভরকেন্দ্র হিসাবে আমেরিকার স্থলাভিষিক্ত হতে চলেছে ইজরায়েল কারন আমেরিকার এখন প্রকাশ্য যুদ্ধে যাওয়া ছাড়া দ্বিতীয় কোনো বিকল্প নেই সেটা রিপাবলিকান হোক বা ডেমোক্রেট। আর এই যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করবে মার্কিন সেনাবহরে সুসজ্জিত ইজরায়েল। বিশদে না গিয়ে শুধু ছোট্ট করে বলে যায়- ঋণের ভারে জর্জরিত মার্কিনিদের দেউলিয়া হওয়া শুধুই সময়ের অপেক্ষা। কীভাবে? কারন ধর্মগত দিকের কারনে।

পৃথিবীতে বর্তমান মার্কিনী সভত্যাতে জঙ্গি মানেই মুসলমান সেটা তাদের অর্থ ও প্রচার ক্ষমতার দৌলতে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। অথচ প্রাকৃতিক খনিজ জ্বালানীর নিরিখে মধ্যপ্রাচ্যের তথা মুসলমান ধর্মীয়জাতি সম্পন্ন দেশ গুলো বাকি বিশ্বের তুলনাতে কয়েকশো যোজন এগিয়ে। এখন এদের মাঝে যদি অশান্তি না থাকে অচিরেই অর্থক্ষমতাতে বলীয়ান হয়ে এরা আবার ক্ষমতাধর হয়ে উঠে পশ্চিমা বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেবে, ঠিক এই কারনেই আপতদৃষ্টিতে মধ্যপ্রাচ্যের অশান্তির অন্যতম কারন হিসাবে বর্ণনা তথা ব্যাখ্যা করায় যায়। দ্বিতীয়টা যেটা মুক্ত সত্য সেটা হল অস্ত্রের রপ্তানি ব্যবসা। সারা বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রই সবচেয়ে বেশি অস্ত্র রপ্তানি করে, পরিমাণটা প্রথম দশের বাকি ৯ জনের সম্মিলিত যোগফলের চেয়েও কিছুটা বেশি; আর সৌদি আরব সবচেয়ে বেশি অস্ত্র আমদানি করে, এখানে চতুর্থ স্থানে রয়েছে ভারত ও দশম স্থানে পাকিস্তান। এই যে ইরান বা সোলাইমানির কুদস বাহিনী যে অস্ত্র ব্যবহার করে সেই গুলোর বেশী অর্ধেকটাই রাশিয়া সরবহার করে, বাকিটা চীন- হ্যাঁ চীন। সুতরাং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ বাঁধিয়ে রাখাটা তাদের দেশের শক্তিশালী অর্থনীতির একটা গুরুত্বপূর্ন অংশ বিশ্বের তিন প্রান্তের তিন দাদাদের।

আবারও বলি- বাকি আরো একটা দিক আছে, ধর্ম।

কীভাবে? চলুন একটু ভূগোল পড়ি।

কাস্পিয়ান সাগরের পূর্বপ্রান্তের দেশ তুর্কমেনিস্তানের সাথে ইরানের যে অংশটা যুক্ত তার নাম খোরাসান অঞ্চল, নামটা মুখস্ত করে রাখবেন কারন আগামী পৃথিবীতে বহুকিছুর জন এই অঞ্চল দায়ী থাকবে। এরা আশেপাশে উজবেকিস্তান, তাজাকাকিস্তান, কিরঘিজিস্তান প্রমুখ দেশ গুলোর মুসলমান জনসংখ্যা ৮৫% এর উপরে। এদিকে জঙ্গিবাদের উৎপাটনের জন্য স্বনিয়োজিত বিশ্বের ঠিকাদার দালাল আমেরিকা গত ২০১৯ এর ডিসেম্বরেও সেনা হামলা জারি রেখেছে আফগানিস্থানের খোরাসান অঞ্চলে ও নিরীহ মানুষদের খুন করছে নির্বিচারে। মজা হল আফগানিস্থান ছাড়া বাকি ‘স্তান’ দেশগুলোর রাজধানীর নাম টুকুও আমরা জানিনা। তাসখন্দের নাম শুনলেও সেটা কোন দেশে সেটা জানিনা, এই দেশ গুলো সম্বন্ধে আধুনিক বিশ্বের কাছে সেভাবে কোনো তথ্যই নেই গুগুলের সাহায্য বিনা।

কাস্পিয়ান সাগরের পশ্চিম প্রান্তের দেশগুলোর সম্বন্ধেও বাকি বিশ্বের তেমন কোনো আগ্রহ নেই, বিশেষত আজারবাইজান, জর্জিয়া বা আর্মেনিয়া। এদের সম্বন্ধেও বাকি বিশ্ব তেমনভাবে জানেনা কারন বর্তমান সভ্যতার ধর্মপিতা আমেরিকা এদের নিয়ে খুব একটা উৎসুক নয়, এবং এরা কেউ ক্রিকেটও খেলেনা যে উপমহাদেশের মানুষ এদের নিয়ে ভাববে। আমাদের অনেকে উইঘুর মুসলিম নিয়ে অনেক কথা শুনেছি কিন্তু এটা চীনের কোথায় সেটা জানিনা। এটা আমাদের কাশ্মীর ও লাদাখের ঠিক উপরের দিকের যে অংশটা সেটাই উইঘুর বা চীনের সিংজিয়াং প্রদেশ। এই সিংজিয়াং প্রদেশের বর্ডার শেয়ার রয়েছে ভারত ছাড়াও কিরগিজিস্তান, কাজাকিস্তান ও তাজাকিস্তানের সাথে।

আমরা যার উদাসীন তাদের কথা ছেড়ে দিন কিন্তু আব্রাহামীয় ধর্ম মোতাবেক এই সকল দেশগুলোর গুরুত্ব কিন্তু অপরিসীম, সুতরাং চরমপন্থীদের যে এখানেই নজর নিবদ্ধ থাকবে সেটা বলাই বাহুল্য। কেন! তার আগে একটু প্রেক্ষাপট জেনে নেওয়া যাক।

আপনি বলবেন মুসলমানেরা সবচেয়ে বেশি গোঁড়া বা ফান্ডামেন্টালিষ্ট, ১৪০০ বছরের পুরাতন ধ্যানধারণা আজও পোষণ করে চলেছে। আরেকদল বলবে বর্তমান ভারতের এক শ্রেনীর হিন্দুরাই বেশি উগ্র কিন্তু উহুদীদের চেয়ে সবচেয়ে ধর্মান্ধ জাতি ভূমন্ডলের আর কোথাও আছে কিনা জানিনা। নতুবা ইজরায়েল দেশটা প্যালেস্তাইন বা ফিলিস্তিনের ভূমি দখল করে গড়ে উঠতনা, আমেরিকার বহু রাজ্যের মাটিতে ইজরায়েল রাষ্ট্র বা রাজ্যের স্থাপনা করতে পারত। যেকোনো দুজন ইহুদির মাঝে শেষ কথাটা Good bye বা see you later বাক্য বলেনা, তারা বলে “লা’শানা হাবা’আ” যা তাদের ধর্মীয় সঙ্গীত ‘পাশওভার শেডের’ বিশেষ অংশ বিশেষ।

ইহুদি ধর্মবিশ্বাসের মতে তাদের ধর্মের বয়স ৪০০০ বছরেরও অধিক। সালেম নামের সূর্যদেবতার উপাসনা করা ‘জেবুসাইট’ জাতিরা এখানে বাস করত বলে স্থানটির নাম হয়েছিল জেরুজালেম। পরবর্তীতে নানান কেচ্ছা-কাহিনী সমৃদ্ধ ঘটনাবলির মাধ্যমে এই জেবুসাইটরা সেই ৪০০০ বছর আগে নিজেদের ভূমিতে ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হয়। সেই থেকেই তাদের মন্ত্র “দেখা হবে আগামী বছর জেরুজালেমে”। সুতরাং অবৈধ জবরদখল করে ইজরায়েল নামের রাষ্ট্রটি গড়ে উঠেছে ধর্মীয় বিশ্বাসের উপরে ভিত্তি করেই, নতুবা ওই ঊষর ভূমিতে কঠিন পরিশ্রম করে দেশ বানাতনা। পরবর্তীতে এই জেরুজালেমের অদূরে নাসারা নামক স্থানে যীশু খ্রীষ্ট্রের জন্ম নয়, ও পরবর্তীতে ইসলাম ধর্মের উৎপত্তি হলে তারাও ইসলাম পূর্ববর্তী সকল ইহুদি ও খ্রীষ্ট ধর্মপ্রচারকদের নিজেদের নবী বলে স্বীকার করে নেওয়াতে জেরুসালেম এক অমীমাংসিত ধর্মীয় স্থান হিসাবে পৃথীবির প্রায় ৬০% মানুষের কাছে ‘নিজেদের স্থান’ হিসাবে রয়ে গেছে। প্রসঙ্গত ইসলাম ধর্মের শুরুর দিনে মুসলমানেরাও জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদের দিকেউ মুখ ফিরে তারা উপাসনাতে বসত, মক্কা তখনও ইসলামের কেন্দ্র হিসাবে চিহ্নিত ছিলনা।

ইহুদীদের লক্ষ্য সেই থেকেই ইজরায়েল দেশ গঠনের তরে ছিল গত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই যা তারা রূপায়ন করতে সক্ষম হয় হিটলারের হলোকাষ্টের মিথের উপরে ভিত্তি করে। ইহুদিরা সংখ্যাতে অতি অল্প হলেও ঐতিহগত ভাবে ইউরোপীয় উপনিবেশ যুগের শুরুর দিক থেকেই বিশ্ব অর্থনীতির ভাণ্ডারকে তাদের আশ্চর্যজনক কূটকৌশলে করায়ত্ত বা কুক্ষিগত করে নেয়। অস্ত্র ব্যবসা, কাগজের মুদ্রা, উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ও সুদি বাঙ্কিং ব্যাবস্থার রাশ নিজেদের পক্ষে এনে সরাসরি রাজনীতিতে না থেকে ক্ষমতাধরদের পরিচালনা করার মধ্যে দিয়ে নিজেদের প্রতিপত্তি উত্তোরোত্তর বৃদ্ধি করে নিয়েছে, নেপোলিয়নের সাথে ব্রিটেনের যুদ্ধে ইহুদি ব্যাঙ্কার রুথচাইল্ড পরিবার দুই দেশকেই অর্থ ধার দিয়েছিল, এটা একটা সামান্য প্রমান। আজকের দিনে নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের স্ত্রী বা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরাণ খানের স্ত্রী এই রুথচাইন্ড পরিবারেরই কন্যা, এনাদের যোগ্যোতার উপরের মাখনটা যে কোথা থেকে আসে সেটা আর নিশ্চই বলার অপেক্ষা রাখেনা।

…ক্রমশ

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *