প্রসঙ্গঃ নিজামুদ্দিন ও করোনা

দিল্লির নিজামুদ্দিন মার্কাজে কয়েক হাজার মানুষ আঁটকা পরেছিল, যাদের মধ্যে মারণ SARS-CoV2 ভাইরাস ছড়িয়ে পরেছে, প্রথমে তাদের মাঝে ও পরবর্তীতে তারা যেখানে যেখানে গেছে তাদের মাঝে। পরিস্থিতি ভয়াবহ।

নিশ্চিতভাবে এদের অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া অপরাধের সামিল, কারন দিল্লি সরকার ১৬ মার্চ ২০২০ তারিখেই সমস্ত রকমের জমায়েত বন্ধ রাখার অর্ধাদেশ জারি করেছিল। যদিও 8-PM সায়েব চার দিন আগে ঘন্টা বাজাবার প্রেসক্রিপশন শোনালেও, লকডাউনের গল্পটা নোটবন্দির মত সার্জিক্যাল স্ট্রাইক ছিল। আরে বাবা আপনি ভাবছেন, “আরে এটাতে জানার কী আছে এটা তো হতই”। আজ্ঞে না স্যার- রেশনের চাল খেয়ে এত বুদ্ধিই যদি থাকত তাহলে কেউ গোমুত্রও খেতনা আর জামাতেও বেড় হতনা।

মার্কাস কি? মার্কাস হচ্ছে মিলনস্থল সেই ব্যাক্তিদের যারা তবলীগ জামাতের জন্য একত্রিত হয়েছেন। নিজামুদ্দিন মার্কাস হচ্ছে এই তবলীগি জামাতিদের বৈশ্বিক কেন্দ্রস্থল বা মূল অফিস বিগত ৭০ বছর ধরে।

তবলিগী জামাত কি ও তাদের কাজ কি? জামাত মানে- দল। পবিত্র কোরানের সুরা আল-ইমরানের একটি আয়াতঃ “তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত(প্রজন্ম), মানুষের(কল্যাণের) জন্য তোমাদেরকে বের করা হয়েছে। তোমরা মানুষকে সৎ কাজের আদেশ করবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে”। (সূরা আল-ইমরান, আয়াত-১১০) । এই বিশ্বাসে দিল্লির একজন ইসলামিক চিন্তাবিদ মৌলানা মুহাম্মদ ইলিয়াস সাহেব ১৯২০ সালে তবলিগী জামাতের প্রথা শুরু করেন ভারতে। পরবর্তীতে যা গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পরে, যদিও বিশ্বজোড়া একটা বৃহদাংশের ইসলামিক ধর্মীয় পণ্ডিতদের মাঝে এই তবলিগী জামাতের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিস্তর মতভেদ রয়েছে।

তবলিগী জামাতের মূল উদ্দেশ্য, মূলত মুসলমান সম্প্রদায়দের জন্য এনারা নিয়োজিত। সামাজিক ও চারিত্রিকভাবে বিপর্যস্ত, ধর্মকর্মহীন, নেশাতে ও বদকর্মে লিপ্ত হয়ে পরা, অশিক্ষিত ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন কে শিক্ষার পথে নিয়ে আসা, ইসলামের মৌলিক ছয়টি বিশ্বাস থেকে চ্যুত, এবং নানারকম বিভ্রান্তির কবল থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে এই তবলীগ দল কাজ করে।

তিনদিন থেকে শুরু করে ছয় মাসাধিককাল পর্যন্ত ধর্মপ্রাণ মুসলমানের একটা দল, নিজের রসদ সাথে নিয়ে সংসার সম্পত্তি সকলকিছু সাময়িক পরিহার করে, নিজের মহল্লা থেকে দূরের মুসলমান গ্রামগুলোতে গিয়ে তারা বিমুখ মুসলমানদের সৎ পরামর্শ ও ধর্মের পথে আসার জন্য আহ্বান করতে থাকেন। তাদের সাথে আপন পরিবারের সম্পর্ক থাকেনা বললেই চলে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোন সাথীদের সাথে তবলিগে যাচ্ছেন সেটাও জানা যায়না। এই মার্কাসে এসে উপস্থিত হলে পরে সেখানকার কর্মকর্তারা রসদ ও ইচ্ছার পরিমাপ অনুসারে জামাতের পথ পরিকল্পনা ও সাথী নির্ধারিত করে দেন একজন মুরুব্বীর অধীনে। ফেরার সময়েও স্থানীয় পর্যায়ের মার্কাসে সূচীত করে তবেই ঘরে ফিরতে হয়। অধিকাংশ জন এই পর্বে ফোন পর্যন্ত ব্যবহার করেনা, মসজিদে শুয়ে নিজেরা রেঁধে খেয়ে দিনযাপন করেন। এই হল সংক্ষেপে তবলিগী জামাত-মার্কাসের ইতিবৃত্ত।

সুতরাং, মার্কাস হচ্ছে সেই স্থান যেখানে সারা বছর মুসলমান ‘সন্ন্যাসী’ বা ‘ভিক্ষু’দের দল একত্রিত হয়েই থাকেন। এটা কেন্দ্র বা রাজ্য, প্রতিটি সরকারের কাছেই বিশদে তথ্য রয়েছে কারন এটা কোনো গোপন অভিযান নয়, বা বিধর্মীদেরও ধর্মান্তরিত করার ‘চক্রান্ত’ নয়। তবলীগিদের বর্তমান গতিবিধি গোটা বিশ্বের সকল দেশ জুড়েই, তাই বিশ্বজোড়া এই স্থানীয় লোকজনের উপস্থিতি নিজামুদ্দিন মার্কাসে অতি স্বাভাবিক বিষয়।

আমার কিছু বন্ধুর এই বিষয়ে জানার বিপুল আগ্রহ, এবং কিছু বিকৃত সংবাদমাধ্যম সমানে এদের বিরুদ্ধে ঘৃণার ছড়ানোর কাজটা হৃদয় দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে। তবলিগীরা অবশ্যই অন্যায় করেছে, শাস্তি হোক। কিন্তু এক যাত্রায় কেন পৃথক ফল হবে? মধ্যপ্রদেশের শিবরাজ সরকার গঠন হল জমায়েত করে, উত্তরপ্রদেশে যোগী রামলালার স্থাপনা করলেন লোক জমায়েত করে, সংসদ চললো লোক জমায়েত করে, পরিযায়ী শ্রমিকদের জমায়েত করতে বাধ্য করা হল অদূরদর্শী পরিকল্পনাহীন লকডাউন করে, কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী ইয়েদুরাপ্পা নিজে বিয়েবাড়ির জমায়েতে সেলফি তুললেন, কণিকা কাপুরের পার্টিতে কয়েকশো বিধায়ক সংসদ জমায়েত করলেন- অন্যায় তো সকলেই করল সরকারের আদেশের পর। তাহলে সকলেরই এক ধারাতে শাস্তি হোক।

এতদিন করোনা কেবল মাত্র রোগ ছিল, এখন এটা জিহাদ হয়ে গেছে সংবাদ চ্যানেলে। কিন্তু মামার সন্তানেরা এটা শুধাচ্ছেনা যে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কেন এমন নড়বড়ে, কেন স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নেই, কেন আজও পর্যন্ত পর্যাপ্ত কিট সর্বত্র পৌছায়নি, কেন ১৯শে মার্চের আগে কেন্দ্র বিষয়টিকে সিরিয়াস না নিয়ে কিট, মাস্ক, স্যানিটাইজারের অর্ডার করেনি? না এরা সেটা করবেনা, কারন পুঁজি আর অসাধু রাজনেতাদের সঙ্গমে এই সংবাদিক গুলোর জন্ম। এরা ঘৃণা ছড়াতেই জানে, করোনার থেকেও ভয়াবহ। এই মহামারীর মাঝে সামান্যতম সাম্প্রদায়িক উস্কানির সুযোগ এই পিশাচেরা ছারেনা।

ওহ, দুঃখিত। বিজেপির জন্য তো আইনে ছাড় আছে অলিখিত, নতুবা দিল্লি পুলিস আজও কোমল শর্মাকে খুঁজে পায়নি। দিল্লি দাঙ্গার সময় ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে নিধনযজ্ঞ চালাতে দেয়, পরবর্তীতে মাস্টারমাইন্ড কপিল মিশ্রাকে প্লাস নিরাপত্তা প্রদান করে। দোষ কেবল গরীব, দলিত আর মুসলমাদের হয় এই ভারতে। নতুবা এ দেশের বিজেপি-RSS নেতাদের বুক ফেটে যায় বিদেশী হিন্দুদের জন্য, আর এদেশের হতদরিদ্র গরীবগুলো যখন হেঁটে হেঁটে ২২ জন প্রাণ দেয় তখন তারা হিন্দু ছিল কিনা জানার প্রয়োজন অনুভব করেনা। কারন তাদের বুকে DD ন্যাশনালের রামায়ণ, শক্তিমান আর চাণক্য সিরিয়াল ভর করে থাকে। এটাই আচ্ছে দিনের ভারত।

এবার আসি তথ্যে, নিজামুদ্দিন মার্কাসের পক্ষ থেকে সরকারী আধিকারিককে গোটা বিষয়টা জানিয়ে তাদের কাছে সরকারী সাহায্য চাওয়া হয়েছিল, কিন্তু নিরুদ্দেশে থাকা মোটাভাই এর দিল্লি পুলিস চোখে পটি বেঁধেছিল, কেজরিওয়াল সরকারও তাই। আসলে মুসলমানেরা বলছে, এতে অতো গুরুত্ব দেওয়ার কী আছে! কিন্তু আজ রোগ ছড়িয়ে পড়তেই প্রমাদ গুনেছে নেতারা, কারন মারণরোগ হিন্দু মুসলমান, গরীব বড়লোক, দলিত ব্রাহ্মণ, নেতা প্রজা- মানেনা। তাই নিজেদের আঁতে ঘা এর সম্ভাবনা তৈরি হতেই টিভি চ্যানেল গুলোতে কুকুরকেত্তন শুরু করে দিয়েছে।

8-PM সায়েব, রাতারাতি লকডাউন ঘোষণা করার আগেই সমস্ত পাবলিক ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম বন্ধ হয়ে গেছিল। এই লোকগুলো সেকথা প্রশাসনকে জানিয়েও ছিল লকডাউনের আগে। পরিকল্পনাহীন লকডাউনের ফলে আজকে এই মহামারী, দায় কার? তবলিগী, পরিয়ায়ি শ্রমিকেরা যদি দায়ী হয়, তাহলে যাদের জন্য এই পরিস্থিতি তারা কেন দায়ী হবেনা? এর উত্তর পাওয়া যায়না, যাবেনা।

আর হ্যাঁ, ধর্মপ্রাণ মুসলমানেদের বলি- “জান বাঁচানো ফরজ” এই শব্দটা লেখা না থাকলেও; হাদিশ কোরানে রয়েছে বিরুদ্ধ ও ব্যাতিক্রমী পরিস্থিতিতে শুয়োরের মাংস ও মদও হালাল, আত্মহত্যা করলে জাহান্নাম তথা নরকে এতে হবে। অতএব প্রাণ বাঁচানো অতীব প্রয়োজনীয়। সেখানে তবলীগকে ফরজ মনে করে এই বিশ্ব মহামারীর মাঝে নিজে মরে ও সমাজে রোগ ছড়িয়ে কোন ফরজ আদায় করলেন? আপনারা অদৌ মুসলমান? যারা কোরান হাদিস উপেক্ষা করে তারা কীভাবে মুসলমান হতে পারে?

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *