অবশিষ্ট- লকডাউন

আজ লকডাউনের নবমদিন, এই কটা দিন সেভাবে বাজারে যাইনি। শুরুর দিন আর মাঝে ১ দিন সব্জি বাজারে গিয়েছিলাম, তারপর আজ। আলু, পেঁয়াজ, চাল, আটা, চিনি ডাল, তেল যথেষ্ট পরিমাণে মজুদ করে নেওয়া হল, তাতে মাস দেড়েক ভালভাবে চলে যাওয়া উচিৎ, টেনে চালালে ওটা আরো ১৫ দিন গেলেও যেতে পারে। গ্যাসের যোগান কম, তবুও দুটো সিলিন্ডার মজুদ রয়েছে, তারপরেও কাঠের উনুনেই রান্না হচ্ছে দুপুর ও রাত্রের খাবার। সকালের প্রাতঃরাশ, রাত্রে দুপুরের তরকারি গরম করে নেওয়া ও রুটি ছাড়া গ্যাসের ব্যবহার যথেষ্ট কম।

মজা হচ্ছে যে সকল জিনিস গুলো বাইরে থেকে আসে ও কারখানাতে উৎপন্ন হয় সেগুলো হয় অমিল কিম্বা পাওয়া গেলেও তা দ্বিগুন বা তারও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। সাবান, শ্যাম্পু, মাথার তেল ততটা দাম না বাড়লেও দশ বিশ টাকা করে বেশি পড়ল, কিন্তু মনিহারী দোকানী এটা বলল- “আমাদের ডিস্ট্রিবিউটার বলেছে এখন দোকান বন্ধ করে দিন, যা মাল আছে পরে থাকুক। ১০ দিন পর বেচবেন, চতুর্গুন মুনাফা কামাবেন। কিন্তু আমরা কী আর মেলার দোকানদার, দুর্দিন কেটে গেলে আবার তো সেই আপনাদেরই মাল বেচতে হবে”। সয়াবিন, পোস্ত, সুজি, ম্যাগি, কর্ণফ্লেক্স এর মত দ্রব্য বাজার থেকে উবে গেছে। আটা ময়দা চিনি রেশন করে দিচ্ছে দোকানী, সরষের তেলও তথৈবচ। গুড়ো মসলাপাতি মোটামুটি ঠিকঠাক দামের মাঝে রয়েছে, যদিও গোটা ধনে, জিরে পাইনি। ডাল বাজারে রয়েছে কিন্তু দেড় গুনেরও বেশি দামে বিকোচ্ছে। যদিও ধুপ, নকুলদানা, বাতাসা, গোলাপজলের বিক্রি দেখলাম যথেষ্ট বেশিই।

প্যাকেট জাত দুধ পাওয়া গেলেও তার দাম ভীষণ চড়া, তার চেয়ে স্থানীয় ঘোষের থেকে নিলে সেটা বেশ সস্তা। শিশুখাদ্য রয়েছে কিন্তু দাম বেশি, ওষুধের যোগানও কমতির দিকে, আগে যে ছাড় পাওয়া যেত সেগুলো আর নেই। বাজারে চালানি মাছ নেই বললে ভুল হবে বরং হাহাকার রয়েছে, দিশি বাটা বা পোনার দাম দু’শো টাকা বা তার উপরে বিকোচ্ছে। অন্যান্য মাছ সকালে আধাঘন্টার মধ্যেই ফর্সা হয়ে যাচ্ছে। ব্রয়লার মুরগি আজও ৮০ টাকা পিস গোটা, ওই দুকেজি প্লাস সাইজের। পোলট্রি ডিম ৪-৫ টাকা পিস। খাসি কাটেনি শুনলাম অনেকদিন, শুয়োর বা গরুর খবর নেই।

মুশকিলে পরেছে সব্জি ব্যবসায়ীরা, শহরে সেভাবে মাল যাচ্ছেনা এদিকে আমদানি প্রচুর। টমাটো, শশা, পেয়ারা ৫-৭ টাকা কেজি। পটল, ঝিঙে, ভিন্ডি, বেগুন, উচ্ছে, বরবটি ১০ থেকে ১৫ টাকার মধ্যে। পুঁইশাক, কাটোয়া ডাটা, পাটশাক, কলমিশাক, লালশাক, কচুর লতি ইত্যাদি ১০ টাকার নিলে ৫ জনে সংসারে ২ দিন ফেলিয়ে ছড়িয়ে শেষ হচ্ছেনা। কুমড়ো, লাউ ঐ একই দশা, ১০-১৫ টাকা পিস। আলু খোলা বাজারে ২৪ টাকা কেজি, পেঁয়াজ ১৮টাকা, আদা ৮০টাকা, রসুন ১২০টাকা। কাঁচা লঙ্কা ফ্রি দিচ্ছে একজনের কাছে অনেকটা বাজার করলে। পাতিলেবু ১০ টাকায় ৭-৮টা দিচ্ছে, ইঁচড় ৩০ টাকা কেজি, কাঁচা আম ২০ টাকা কেজি, সজনে ডাটা ৫০টাকা কেজি। বাঁধা কপি ফুলকপি নিলে বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছে।

সকালের দিকে রাস্তাঘাট দেখে ভুলকরেও মনে হওয়ার জো নেই যে লকডাউন চলছে। পোশাক, গহনা, মোবাইলের দোকান, চা এর দোকানের মত হাতেগোনা কিছু দোকান ছাড়া সবই প্রায় খোলা। রাস্তা জুড়ে অসংখ্য টোটো, ইঞ্জিন ভ্যান চলছে গতকাল থেকে। সার বীজের দোকান গুলোও খোলা সব, ইমারতি দ্রব্যের দোকানের শাটার বন্ধ হলেও ব্যবসা চলছে। তাঁত বোনা শুরু হয়েছে, যাদের টাকা আছে সস্তার শ্রমের কাপড় তারা মজুদ করছে, পরে বেশি দামে ঝাড়বে নিশ্চই। রেশন দোকানে মাথাখারাপ ভিড়, পঞ্চায়েত অফিস, বিডিও অফিস থেকে থানার বাইরের মাঠেও মাছি গলার জাইগা নেই। লকডাউন চলছে, এটা কিন্তু সবাই জানে, ওই পর্যন্তই।

রাজমিস্ত্রিরাও কাজে যাচ্ছে ইতস্তত, গুল ফ্যাক্টারি চলছে, ইটভাটা চলছে, মাঠে মুনিষ যাচ্ছে, পাটের জমিতে নিরেন হচ্ছে, পেঁয়াজ শুকানো চলছে, মিষ্টির দোকানে পরোটা খাবার ভিড়, ফিরিওয়ালারাও গাঁয়ের ভিতরে সাইকেলে তাদের ব্যবসা শুরু করে দিয়েছে। আসলে করার কিছু নেই সম্ভবত, না বের হলে খাবে কী! তাই সবাই নিজের মত করে শুরু করে দিয়েছে। করোনা এলে আসবে, ভাবখানা এমন। অনেকে এখন ভাবছে এগুলো গুজব, নিশ্চই সরকারের কোনো চাল রয়েছে। মহামারী এলে করোনাই ভরসা, অদি সে কাউকে রক্ষে দেয়, নতুবা সব মায়ের ভোগে যাবে।

ব্যাঙ্কের অবস্থা সবচেয়ে ভয়াবহ, স্টেট ব্যাঙ্ক, বন্ধন ব্যাঙ্ক, ইউকো ব্যাঙ্ক ও গ্রামীণ ব্যাংকের বাইরে অন্তত কয়েক হাজার মানুষ বালবাচ্চা নিয়ে গিজগিজ করছে কড়া রোদের মধ্যে। আজ নাকি তাদের একাউন্টে কোনো সরকারী অনুদান ঢুকেছে বা ঢোকার কথা। সামাজিক দুরত্ব বজায়ের মা মাসী এক হয়ে গেছে। প্রশাসন দাঁত কেলাচ্ছে, একজন সিভিক পুলিশকে শুধাতে সে বলল, “না ক্যালালে শুনবেনা কেউ। ক্যালালে আমার চাকরি যাবে, পোঁদ মারাক শালারা”

বুঝলাম আমাদের ওই পোঁদ টুকুই অবশিষ্ট রয়েছে, বাকি সবই দেবোত্তর হয়ে গেছে।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *